Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪২ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪২ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪২ (২)
jannatul firdaus mithila

“ আমি চরিত্রহীন হলে তুই এখনো আমার কাছে পবিত্র রইলি কি করে বান্দীর মেয়ে? হিং স্র পশুরা তো শিকার দেখলে স্থান-কাল বিবেচনা করেনা!”
মুহুর্তেই স্থবির হলো সপ্তদশীর নড়বড়ে অক্ষিপুট। হৃদয় আঙিনায় ঝংকার তুলল এক অজানা প্রলয়ঙ্কারী ঝড়। সর্বাঙ্গ বোধহয় ডুব দিলো অবর্ণনীয় অসারতায়। মস্তিষ্কে তখনো চলমান রূঢ় মানবের ভরাট কন্ঠনিঃসৃত বাক্যটি। যুবকের তখন কি হলো কে জানে! সে নিরবে বাড়াচ্ছে দুরত্ব। পায়ের গতি বড্ড ক্ষীণ তার, বাদামী চোখজোড়া অটল! আশ্চর্য! রূঢ় মানবের চোখদুটোয় আজ রাগ নেই। সেথায় ভর করেছে একরাশ নিরব হাহাকার। তারা যেন আজ কথা বলতে চাইছে। এক অদ্ভুত অভিনব কায়দায় নিজেদের ব্যক্ত করতে চাইছে। নতমুখী সপ্তদশী থোড়াই দেখল তা! সে তো মহাব্যস্ত যুবকের অটল বাক্য খন্ডন করতে। তার কম্পিত কায়া, কুন্ঠিত নতমুখ, তিরতির করে কাঁপতে থাকা নিখুঁত রেখার অধরযুগলের পানে বারেবারে দৃষ্টি বুলচ্ছে নিদয় মাফিয়া বিস্ট। ঠোঁটের কোণে আকস্মিক ঝোলালো এক টুকরো নিষ্প্রাণ হাসি। যে হাসি ক্ষীণতায় লেপ্টেছে রূঢ় মানবের তামাকে পোড়া বাদামী ঠোঁটযুগলে। তার হৃদয় কোঠায় আটকে থাকা ব্যথারা আজ মাথাচাড়া দিয়েছে। কন্ঠে বহু চেষ্টা চালিয়েও রাগ ঢালতে ব্যর্থ রূঢ় মানব। বিচক্ষণে মস্তিষ্কে কেবল বাজছে “ চরিত্রহীন ” শব্দটা! অবশেষে অব্যক্ত হাহাকারে মত্ত থেকে যুবক আলগোছে নজর সরালো অন্যত্র। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে আওড়াল,

“ কথার জোরে যেমন ক্লান্ত করা যায়, ঠিক তেমনি কথার জোরে শান্তও করা যায় চাশমিস! বলা তো যায় না, কোন কথা আবার হৃদয়ে গিয়ে লাগে।”
ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটল মাহি’র। মুখটা তৎক্ষনাৎ ঘুরে গেল অন্যত্র। ছলছলে চোখজোড়া মেঝেতে ঠেকিয়ে মেয়েটা কেমন তাচ্ছিল্যের সুরে বলে বসল,
“ বিস্টদের আবার হৃদয় আছে না-কি? তারা তো নির্দয়! নির্দয় হৃদয়ে ব্যথার দোল লাগেনা মিঃ বিস্ট।”
রূঢ় মানবের বুকের খাঁচায় লুকায়িত অঙ্গটা ফের আরেকবার মুচড়ে উঠল! সে ব্যথা আর সইবার নয়। যুবক তক্ষুনি ধারালো দাঁতের রুষ্ট চাপায় পিষ্ট করল নিম্নাংশের ঠোঁটখানা। অজানা নিরব যন্ত্রনায় কন্ঠরোধ হয়েছে তার। গলার কাছটায় বোধহয় কাঁটাতারের বেড়ি বসিয়েছে কেউ। সামান্য ঢোক গিলতেও বেগ পোহাতে হচ্ছে রূঢ় মানবের। সে কেমন হুট করেই তাচ্ছিল্যের হাসি টানল ঠোঁটের কোণে। আগের চেয়ে দ্বিগুণ গমগমে গলায় শুধালো,

“ আসলেই ব্যথা হয়না তাই-না?”
সপ্তদশী অনড় নিজ বাক্যে। মুখাবয়বে একরাশ গাম্ভীর্যের ছাপ ফুটিয়ে প্রতিত্তোরে বলে ওঠে,
“ আপনাকে দেখে তাই মনে হয়।”
সহসা ঘাড় বাকিয়ে তাকায় মুগ্ধ। রুষ্টতার চাপায় দাঁতের সনে অধর পিষে হাসল নিঃশব্দে। পরক্ষণে দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে ভরাট কন্ঠে শুধালো,
“ আমিতো বিস্ট! বাট ইউ্য আর আ বিউটি রাইট? তোর ঐ নির্মল মুখে এসব কথা মানায় না বান্দীর মেয়ে!”
তক্ষুনি ললাটে সন্দিষ্ট ভাঁজ পড়ল মাহি’র। ঘাড় ঘুরিয়ে সরু দৃষ্টে তাকাল সুদর্শনের পানে। কপাল কুঁচকে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কি খেয়ে এসেছেন?”
“ হৃৎপিণ্ড!”
যুবকের এহেন উদ্ভট উত্তরে ভড়কায় মাহি। বিস্ময়ে গোল হলো মায়াবিনীর হরিণী চোখদুটো। বিস্ময়াবহে ওষ্ঠপুটের সামান্য ফারাক বাড়তেই নির্দয় মানব কেমন রং পাল্টালেন নিজের। মুখাবয়বে শ্লেষাত্মক ভাবভঙ্গিমা ফুটিয়ে, দাঁতের রুষ্ট চাপায় পিষ্ট করল নিম্নাংশের ঠোঁট। অতঃপর আচানক চোখ টিপে শ্লেষাত্মক কন্ঠে আওড়াল,

“ এ্যাই বান্দীর মেয়ে! তারাতাড়ি চশমা পর। ভুলে যাস না, তোর ধর্মে মানুষ মা-রা হারাম।”
হতভম্বতায় ফের ডুব দিলো মাহি। যুবকের কথাগুলো আজ বড্ড রহস্যময় ঠেকছে তার নিকট। চিন্তিত হচ্ছে মস্তিষ্ক! এরইমধ্যে সুদর্শন পা ঘোরালো উল্টোপথে। উম্মুক্ত চওড়া পিঠখানার মাংসপেশি বড্ড নাড়াচ্ছে সে। হাঁটতে হাঁটতেই গমগমে গলায় বলে ওঠে,
“ বই এনেছি বান্দীর মেয়ে! মন চাইলে পড়িস বাট খবরদার — বই পড়তে গিয়ে আমায় আবার ইগনোর করিস না যেন।”
সহসা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে সপ্তদশী। মুখখানায় এক অদৃশ্য আগুন লেপ্টে চিড়বিড়িয়ে বলে ওঠে,
“ যখন ইচ্ছে হবে ঘরভর্তি বইয়ে আগুন ধরিয়ে দিবেন, আবার যখন মনে চাইবে বই নিয়ে আসবেন! মানুষের র*ক্তের বিনিময়ে এতো টাকা হয়েছে আপনার?”
থমকায় মুগ্ধের ব্যস্ত পদযুগল। ঘাড়টা সামান্য কাত করতেই সুদর্শনের তীক্ষ্ণ খাঁজযুক্ত চোয়ালখানা এসে ঠেকল চওড়া কাঁধের সঙ্গে। ঠোঁটের কোণে ফুটল বাঁকা হাসির টান। কন্ঠে এক আকাশসম দাম্ভিকতা ফুটিয়ে প্রতিত্তোরে বলল,

“ আবার জিগায়!”
নাকের পাটা ফুললো মাহি’র। গালদুটোয় ঘষে গেল এক মুঠো লালিমা। কপালে ফুটল তিতিবিরক্তিতার ছাপ! মেয়েটা কেমন শঙ্কিত কন্ঠে রয়েসয়ে আওড়াল,
❝ সময় বড়ো বিচারক, নীরবে রাখে হিসাব।
আজ যে হাসে অন্যের ক্ষয়ে, কাল তারই নামে জবাব।
আজ আপনার জয়ের পালা, কাল হবে অন্য কারও —
সময়ের রুষ্ট চাকার নিচে, দেখবেন আপনার অহংকারেরও পতন হলো।❞
আমি খুব করে সেদিনটার জন্য অপেক্ষায় আছি মিঃ বিস্ট, যেদিন আপনার মতো নির্দয় বিস্টের পরিণতি বড্ড কঠোর হবে!”
তাচ্ছিল্যের হাসি টানল মুগ্ধ। বাহাতের তর্জনী উঁচিয়ে আলগোছে কপাল চুলকালো খানিক। মুখাবয়বে আগের ন্যায় তাচ্ছিল্যের ভাব ফুটিয়ে ভরাট কন্ঠে শুধায়,
“ দেখিস আবার, আমার পতনের ঝড়ে তোর চোখদুটো যেন অস্থির না হয়ে যায়।”
সপ্তদশী মুখ ঝামটি দিয়ে বসল তৎক্ষনাৎ। কপালের চামড়া গুটিয়েছে তার। দু’হাত ভাঁজ হয়েছে বুকের কাছে। পরক্ষণে ঝাঁঝ মিশ্রিত কন্ঠে আওড়াল,

“ হিং স্রদের জন্য কান্না আসেনা মিঃ বিস্ট!”
মুগ্ধ হাসল এবারেও। সে এক নির্লিপ্ত হাসি! দু’হাত ঢুকল পকেটে। পাহাড়সম উচ্চতার দাম্ভিক মাথাটা উঁচু হলো ফের। দৃষ্টি পৌঁছুল কক্ষের দুয়ার পানে। যুবক গতি টানল পায়ের। গমগমে গলায় স্রেফ বলে গেল,
“ দেখা যাবে!”
শুনল মাহি! প্রতিত্তোরে মৌন রইল মানবী। যুবক ক্রমশ আড়াল হচ্ছে দৃষ্টি সীমানা হতে। মাহি তখনো দাঁড়িয়ে আছে ঠায়। দৃষ্টি আঁটকে আছে দুয়ার পানে। হুট করেই তার পদযুগল কেমন ভার হয়ে গেল মনে হচ্ছে! নড়বড়ে হলো হাঁটুর হাড়। বেচারি কেমন ধপ করে বসে পড়ল মেঝেতে। দু’হাতে খামচে ধরল পরনের শার্টখানা। তার ছলছলে চোখজোড়ার দৃষ্টি ঝাপ্সা হচ্ছে ক্রমশ। কোটর হতে আচানক হাতের উল্টোপিঠে ঝরে পড়ল একফোঁটা বারি কণা! মেয়েটা কেমন কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,

“ যেখানে আপনাতে বিমুগ্ধ হবার কোনরূপ শঙ্কা অবশিষ্ট নেই, সেখানে আপনার ধ্বংসে চোখ ভিজানোর কোনো মানে নেই বিস্ট! আপনি সে-ই মির্জা সায়ান মুগ্ধ নন, যার প্রতি প্রথম দর্শনে আমার সপ্তদশী হৃদয়খানা বিমুগ্ধ হয়েছিল। আপনি সে-ই মির্জা সায়ান মুগ্ধ নন, যে কি-না কলেজ মাঠে সবার সামনে আমাকে কাঁধে তুলে নিয়ে গিয়েছিল — শুধুমাত্র আমি সকালে খাইনি বলে। আপনি সেই মুগ্ধ নন, যে সারারাত ফোন কানে নিয়ে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের গতি গুনেছে। আপনি সত্যিই সেই মির্জা সায়ান মুগ্ধ নন বিস্ট, যে আহির সম্মুখে বলেছিল — কোটি কোটি মাহিরার মাঝেও সে তার চাশমিসকে এক দেখায় চিনে ফেলতে পারবে। আপনি সত্যিই সেই মুগ্ধ নন বিস্ট! আপনি হচ্ছেন অধীর রায়, যেই লোক কেবল প্রতিশোধে বাঁচে। আপনার আসল পরিচয় — আপনি নির্দয় মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার, যার হাতে লেপ্টে আছে অগণিত নিরপরাধ মানুষের নিরীহ লোহু! যার হিং স্র প্রতিশোধের রোষানলে পুড়ছি আমি, আমার সপ্তদশী হৃদয়। যার হিং স্রতায় পিষ্ট হচ্ছে আমার কোমলতা। এতকিছুর পরও আপনার প্রতি মুগ্ধ হতে গেলে আমি হয়তো বিবেকহীন বিবেচিত হবো বিস্ট। হয়তো দোষী হবো — নিজ বিবেকের কাঠগড়ায়।”

সদ্য বৃষ্টির পানিতে নিজেদের রাঙিয়ে শুদ্ধতায় মোড়ানো সবুজ ঘাসগুলো একজোড়া ব্যুট জুতোর শক্ত স্যোলের তলায় পিষ্ট হচ্ছে রুষ্টতার সনে। থৈথৈ করছে পানির ছিটাঁ! কেউ কেউ নিজেদের ছড়াচ্ছে রূঢ় মানবের রুক্ষ পদযুগলে। মানব থামছে না। হেলিপোর্টের দিকে অগ্রসর তার ব্যস্ত কদম। মুখটা বড্ড গম্ভীর! কপালের চামড়া গোছানো। ঠোঁটের ফাঁকে পালাক্রমে জ্বলছে মোটা মোটা সিগার। প্রায় মিনিট দশেকের পথ পেরিয়ে অবশেষে হেলিপোর্টে এসে পা রাখলেন রূঢ় মানব। উম্মুক্ত গায়েই উঠে গেলেন হেলিকপ্টারে। বড় সিট খানায় নিজের পাহাড়সম দেহটা এলিয়ে দিয়ে, পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশে বসল মুগ্ধ। ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে রাখা সিগারখানায় লম্বা লম্বা টান বসিয়ে হুকুম ছুঁড়ল কটমট কন্ঠে,
“ টেক অফ!”

“ ওহে কি করিলে বলো পাইব তোমারে?
রাখিব আঁখিতে আঁখিতে..(২)
ওহে এত প্রেম আমি কোথা পাব নাথ।
এত প্রেম আমি কোথা পাব নাথ।
তোমারে হৃদয়ে রাখিতে
আমার সাধ্য কিবা তোমারে
দয়া না করিলে কে পারে?
তুমি আপনি না এলে
কে পারে হৃদয়ে রাখিতে?
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই
চিরদিন কেন পাইনা?…..”

চোখদুটো বুঁজে তালিম নিচ্ছে সপ্তদশী! পাদু’টো আসন পেতে বসে আছে নরম গদিতে। সপ্তদশীর কোমল কোলে স্থান পেয়েছে বীণা। আলতা রাঙা আঙুলগুলোর মৃদু পরশে বীণার তারে জাগছে কম্পন! তালিম নেওয়ার আবদ্ধ কক্ষের প্রতিটি দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বীণার সুমধুর সুর। সপ্তদশীর সে-কি গলা! যেন ভোরের কোকিল নিজ সর্ব দক্ষতায় সুরেলা কণ্ঠে গাইছে গান। সপ্তদশী তালিমে মত্ত! এরইমধ্যে বিশালাকার কক্ষে পা রাখল আরেক অষ্টাদশী। নাম তার — অঞ্জলি। গায়ে আটপৌরে সাজ তার। লম্বা চুলগুলো বিনুনী গেঁথে দু-কাঁধে পড়ে আছে। অঞ্জলি নিরবে এগুলো। নিঃশব্দে এগিয়ে এসে পা গুটিয়ে বসল তালিমরত সপ্তদশীর সম্মুখে। ভীষণ মুগ্ধতায় গালে হাত ঠেকিয়ে কিয়তক্ষন একমনে শুনল সপ্তদশীর গান। পরক্ষণে মুচকি হেসে কেমন ঠেস মে’রে বলে বসল,
“ এভাবে সুরেলা কণ্ঠে রবি ঠাকুরের গান না গেয়ে, একেবারে অধীর দা’র নাম করে ডাকলেই পারিস সই।”
চট করে সপ্তদশীর বদ্ধ চোখদুটো পর্দা সরালো নিজেদের। বীণার তারের সঙ্গে খেলতে থাকা দক্ষ আঙুলগুলো থমকে গেল মুহুর্তেই। একমাত্র সইয়ের ওমন কথায় রায় জমিদার পুত্রীর চকচকে সোনার রঙে আবরণী ফর্সা মুখখানায় সহসা লেপ্টে গেল এক পশলা লালিমা। মেয়েটা বোধহয় লজ্জা পেল খানিক। তক্ষুনি কোলের ওপর থেকে বীণাটা সস্নেহে সরিয়ে রেখে কপট রাগ নিয়ে বলল,

“ ধ্যাৎ! কি যে বলিস না।”
এহেন কথায় যারপরনাই নেই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবার উপক্রম হলো অঞ্জলির। তার ওমন দিলখোলা হাসি দেখে না চাইতেও ফিক করে হেসে ওঠে নিরুপমা। হাসতে হাসতে নিজেও উঁচু গদি হতে নেমে এসে বসল সইয়ের পাশে। মুখভর্তি হাসিটায় সামান্য রুখ টেনে ধীরে ধীরে বলল,
“ কখন এলি?”
ধীরেসুস্থে হাসি থামায় অঞ্জলি। হাসতে হাসতে বেচারির চোখদুটো টলমল। পরনের ওড়নার একাংশে সিক্ত চোখদুটো আলগোছে মুছে নিয়ে প্রতিত্তোরে বলল,
“ যখন তুই অধীর দা এর স্মৃতিতে বিমুগ্ধ ছিলি তখন।”
ফের লজ্জায় পড়ল নিরু। ফর্সা মুখশ্রীতে তার লেপ্টে গেল লজ্জালু ভাব। তা দেখে দৃষ্টি সরু হলো অঞ্জলির। মেয়েটা কেমন দুষ্টুমির ছলে তক্ষুনি আলতো হাতে আঙুল ছোঁয়াল লজ্জালু সপ্তদশীর টোলপড়া থুতনিতে। নতমুখী নিরুর মুখখানা সামান্য উঁচিয়ে দুষ্ট কন্ঠে মিনমিনিয়ে বলল,
“ সামান্য নাম শুনতেই এতো লজ্জা আমার সইয়ের? তাহলে সে যখন আসবে, তোকে নিজের করে আদর-সোহাগ করবে, তখন কি করবি সই?”
লজ্জায় কানদুটো ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল নিরুর। মেয়েটা তক্ষুনি দু’হাতে ঠেলে সরাল অঞ্জলির হাতখানা। মুখাবয়বে মেকি ভাব নিয়ে বলল,

“ ধূর! তোর মুখে কিচ্ছু আটকায় না।”
খিলখিলিয়ে হাসছে অঞ্জলি। হাসার একফাঁকে আনমনেই বলে বসে,
“ না আঁটকায় না। তাছাড়া আঁটকে রেখে কি লাভ? যেখানে অধীর দা শুধুমাত্র তোরই, সেখানে রাখ-ঢাক রেখে কথা বলার কি আছে? দিনশেষে জোর করে হলেও সে শুধু তোরই থাকবে সই।”
মুহুর্তেই মুখাবয়বের রং পাল্টে গেল নিরুর। চোখেমুখে ছেয়ে গেল গাম্ভীর্যের ছাপ। মেয়েটা কেমন কপাল কুঁচকে অঞ্জলির বলা কথাটা নাকচ করে দিয়ে, গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
“ না অঞ্জলি! তুই ভুল বললি। পৃথিবীতে আর যাইহোক, জোর করে কাউকে আঁটকে রাখা যায় না। আর না কাউকে জোর করে ভালোবাসা যায়। নেহাৎ আমি অপেক্ষায়িত। তবে আমার এতগুলো বছরের অপেক্ষায় যদি বিন্দুমাত্র খাদঁ থেকে থাকে — তাহলে অধীর দা যে আমার হবে না তা আমি জানি।”
শেষটুকু বলতে গিয়ে কন্ঠ কাঁপছে নিরুর। অপেক্ষায়িত চোখদুটো হয়েছে ছলছল। সে চোখের ভাষা আর কেউ না বুঝলেও বুঝেছে সুদীপা রায়, যিনি আপাতত গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কক্ষের দুয়ার পানে। মেয়ের ওমন করুণ সুরের বাক্য কর্ণকুহরে পৌঁছান মাত্রই বুক মোচড়ে ওঠেছে তার। মুখাবয়ব হয়েছে শক্ত। ধরে রাখা পর্দার অংশটুকু হাতের রুক্ষ মুঠোয় দলাইমলাই করতে করতে জমিদার গিন্নী কেমন দাঁত কিড়মিড় করে আওড়ালেন,
“ ভালোবাসায় জোর না খাটলেও অধীরের ওপর তোর জোর খাটবেই মা। তোর এতবছরের প্রতীক্ষা বিফলে যাবে না কিছুতেই। মনে রাখিস, তোর বাবা হিমাংশু রায় এখনো বেঁচে আছে। পৃথিবী উল্টে গেলেও তার বদৌলতে দিনশেষে অধীর তোর হবেই হবে। আসছে দুর্গা পুজোতে অধীরকে আসতেই হবে এখানে। আর তারপর? তারপর তোর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে নিরু!”

সদ্য শাওয়ার সেরে বেরিয়েছে মাহি। সিক্ত চুলগুলো আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে নরম তোয়ালের গা। মানবীর পাদু’টোর গতি ধীর। কচ্ছপের ন্যায় এগোচ্ছে ড্রেসিং টেবিলের পানে। উদাসীনতার আঁধার ভর করেছে সপ্তদশীর সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানায়। রা নেই ঠোঁটের ডগায়। এরইমধ্যে কক্ষের দরজা দিয়ে হড়বড়িয়ে প্রবেশ করল মিলা। মেয়েটা কেমন উদ্বিগ্ন! ব্যস্ত কদমে এগিয়ে এসে খপ করে চেপে ধরল উদাসীন সপ্তদশীর কব্জিসন্ধি। এদিকে তার এহেন কান্ডে ভড়কায় মাহি। নিজ ভাবনার ডোর থেকে হুট করেই ছিটকে বেরুলো মেয়েটা। তক্ষুনি কুঞ্চিত দৃষ্টে তাকাল ঘাড় বাকিয়ে। সম্মুখে মিলাকে ওমন অস্থির কায়দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খানিক সন্দিগ্ধ মাহি। মুখগহ্বরের জিভখানা খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে যেইনা কিছু আওড়াবে তার আগেই কব্জিসন্ধিতে টান বসাল মিলা। স্থবির সপ্তদশীকে নিজের সাথে করে নিয়ে যেতে উদ্যত সে। ব্যগ্র কন্ঠে বলল,
“ চলো তারাতাড়ি! সে এসেছে।”
সহসা ভ্রু গোছালো মাহি। সন্দিহান গলায় প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ কে এসেছে?”
মিলা তৎক্ষনাৎ জবাব দেয়নি। উল্টো মাহি’র নরম-সরম কব্জিসন্ধি আঁকড়ে তাকে নিয়ে এগোতে লাগল করিডর দিয়ে।

মিনিট সাতেক পেরুলো বোধহয়! মিলার পদযুগল এসে থামল তারই ছিমছাম কক্ষের বাইরে। কক্ষের ভেতরটা বিদঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত। অদূরের দেয়ালে ঝুলছে একখানা জানালা। তা দিয়ে বাইরে থেকে আলো আসছে টুকটাক! মাহি কেমন অবোধের ন্যায় তাকিয়ে আছে সেদিকে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিলা তখনো অস্থির। ঘাড়টা এদিক-ওদিক নাড়িয়ে সর্তক হচ্ছে বারংবার। যেই দেখল আশেপাশে কেউ নেই, ঠিক তখনি মেয়েটা কেমন জোর করে মাহি’কে ঠেলে দিলো অন্ধকার কক্ষে। এহেন কান্ডে ভড়কায় মাহি। ত্বরিত বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে মিলার পানে তাকাতেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো ক্ষুদ্র পরিচিত এক ডাক,
“ সানবার্ড!”
সহসা ঝংকার দিয়ে ওঠে সপ্তদশীর ক্ষুদ্র তনু। অস্থিরতায় খপ করে চেপে ধরে জামার একাংশ। ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকাবার সাধ্যি হচ্ছে না তার। অথচ আওয়াজ আসছে পেছন থেকে। মাহি ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলছে। ভয়াতুর দৃষ্টি সম্মুখে দাড়িয়ে থাকা মিলার পানে তাক হতেই মিলা কেমন মৃদু হেসে বলে ওঠে,
“ সে জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে মুনলাইট। তোমার জন্য বড্ড অস্থির বেচারা। তোমার পাগল প্রেমিকটাকে গিয়ে একটুখানি স্বস্তি দাও। যাও, গিয়ে কথা বলো। এডউইন এখন প্যালেসে নেই। আমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। তুমি নিশ্চিন্তে কথা বলো তার সাথে!”
মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়েছে সপ্তদশীর। ঘটে ঢুকছেনা মিলার একটি বাক্যও। তার বিভ্রমে ডুবে থাকা দৃষ্টিযুগলের সম্মুখে হুট করেই আঁধার ছেয়ে গেল। মিলা দু’হাতে ভিড়িয়ে দিয়েছে কক্ষের দুয়ার। মুহুর্তেই এক বিদঘুটে অন্ধকারে ফের নিমজ্জিত হলো সম্পূর্ণ কামরা। মাহি কাঁপছে। ঠিক তখনি পেছন থেকে ফের ভেসে আসে শ্যামপুরুষের গম্ভীর অথচ কাতর কন্ঠ!

“ সানবার্ড! কাছে আসবে না? একটু কথা বলবেনা আমার সাথে? আমি যে তৃষ্ণার্ত তোমায় একপলক দেখার জন্য। দয়া করে এই তৃষ্ণার্তের তৃষ্ণা মেটাও!”
ধীরে ধীরে কাঁপা কাঁপা দেহখানি ঘুরিয়ে দাঁড়ায় মাহি। কাঁপা দৃষ্টি আলগোছে নিক্ষেপ করে অদূরের জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা হুডি পরুয়া শ্যামপুরুষের পানে। মেয়েটা তক্ষুনি ঢোক গিলল সামান্য। ধীর কদমে রয়েসয়ে এগোলো সম্মুখে। জানালা হতে দু’হাত দুরত্বে এসে পা থামিয়েছে মাহি। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আলতো করে জিজ্ঞেস করল,
“ আপনি এখানে কিভাবে এলেন সিড? আপনি না-কি ম’রে গিয়েছেন? তাহলে এখন আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন কিভাবে?”
শ্যামপুরুষ কী হাসল? আলোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকায় তার মুখো অভিব্যক্তি সঠিক ধরা পড়ল না সপ্তদশীর নিকট। সে কেমন নরম কন্ঠে খানিক এগিয়ে এসে শুধালো,

“ আমি সিড নই সানবার্ড। আমি মায়াঙ্ক! কমান্ডার মায়াঙ্ক। ডঃ ইফতেখার এহসান রৌদ্রের ফ্রেন্ড!”
সহসা সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে মাহি’র। ক্ষুদ্র পরিচিত মানবের মুখে নিজ চাচাতো ভাইয়ের নাম শুনে মেয়েটা কেমন আপ্লুত! তক্ষুনি স্থান-কাল ভুলে এগিয়ে এসে দাঁড়াল জানালার বড্ড নিকটে। হড়বড়িয়ে অস্থির কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ রোদ ভাই! আপনি আমার রোদ ভাইকে চিনেন? ভাইয়া আপনাকে পাঠিয়েছে আমার কাছে? আমার পরিবার আপনাকে পাঠিয়েছে? ওরা এখন কেমন আছে? ওদের কোনো খোঁজ খবর আছে আপনার কাছে? ওরা কি আমায় মনে করে? আমার জন্য কাঁদে? আমার আব্বু? উনার প্রেশারের কি অবস্থা? উনি এখন কেমন আছে? আর রোদ ভাই? অনিক ভাই কেমন আছে? উনার না গুলি লেগেছিল? উনি এখন সুস্থ আছে তো? একটু বলুন না সবাই কেমন আছে?”
সপ্তদশীর এহেন উৎকন্ঠা দেখে বুক ভার হয়ে গেল মায়াঙ্কের। চোখে নামল তীব্র ব্যথার ছায়া। মেয়েটাকে খানিক স্বস্তি দিতে সে কেমন কপটতার সঙ্গে বলে বসল,

“ হুম! সবাই ভালো আছে। আমাকে পাঠিয়েছে তোমাকে উদ্ধার করতে। বলো, তুমি যাবে না ওদের কাছে?”
সহসা মাথা ঝাঁকায় মাহি। নিরবে সম্মতি জানালো যুবকের সহিত। মায়াঙ্ক হাসল বোধহয়। ঘাড়টা সামান্য এদিক-ওদিক বাঁকিয়ে সর্তক হলো খানিক। অতঃপর ফিসফিসিয়ে বলল,
“ যদি আবারও ফিরতে চাও তাহলে তোমাকে একটা কাজ করতে হবে সানবার্ড। বলো তুমি করবে তো?”
ভ্রু কুঁচকায় মাহি। কন্ঠে সন্দিহান ভাব ঢেলে আওড়াল,
“ কি কাজ?”
যুবক স্থির রইল একমুহূর্ত। পরক্ষণেই গুরুগম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
“ অভিনয়!”
“ কার সাথে? আর কিসের অভিনয়?”
সপ্তদশীর এহেন সন্দিষ্ট কন্ঠে তৎক্ষনাৎ জবাব দেয়নি মায়াঙ্ক। বাক্যটুকু আওড়াতে গিয়ে জিভ ভার হচ্ছে তার। কন্ঠরোধ হচ্ছে অজানা কারণে। তবুও যুবক দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে পাথর রাখল নিজ বুকে। খানিক ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল,
“ মিথ্যে আবেগের অভিনয়, রুশদী কিংয়ের সাথে।”
তক্ষুনি মাথার ওপর অদৃশ্য বাজ পড়ল মাহি’র। বিস্ময়ে চোখ ছুঁয়ে গেল ললাট। বিস্মায়াবিষ্ট দৃষ্টি তার অনড়ভাবে চেয়ে আছে সম্মুখে। দুরত্ব বাড়ছে দু-ঠোঁটের মাঝে। তার নরম তুলতুলে ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরুলো,

“ অভিনয়?”
ওপর নিচ মাথা নাড়ায় মায়াঙ্ক। তক্ষুনি দু’হাত আলগোছে বাড়িয়ে দেয় জানালার সিকের ফাঁক গলিয়ে। মেয়েটার কব্জিসন্ধি আঁকড়ে ধরতে গেলেই তক্ষুনি দু-কদম ছিটকে দূরে সরে যায় মাহি। মুখাবয়বে অগ্নিমূর্তি ভাব ধারণ করে সপ্তদশী কেমন হুংকার ছুঁড়ে বলে ওঠে,
“ খবরদার পরপুরুষ হয়ে আমাকে ছোঁবেন না! আমি এসব বরদাস্ত করব না।”
মাহি’র এহেন হুংকারে হতবিহ্বল মায়াঙ্ক। তার অক্ষিপুট বোধহয় এক্ষুনি বেরিয়ে আসবে কোটর ছেড়ে। হতভম্বতায় ডুবে থাকা কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো,
“ আমি পরপুরুষ সানবার্ড? আমিই তো তোমার। শুধুই তোমার। গত ৬টা বছর ধরে আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমার হৃদয়ের সম্রাজ্ঞী তুমি! আর তুমি কিনা বলছো আমি পরপুরুষ?”
ফোঁস ফোঁস করছে মাহি। এই প্রথম সপ্তদশী এতোটা রাগল বোধহয়। চোখদুটো ঝরাচ্ছে আগুন! সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানা লাল হয়েছে ইতোমধ্যে। রাগে মুষ্টিবদ্ধ হয়েছে হাতদুটো। যুবকের কথার পিঠে সঠিক উত্তর না দিয়ে সে উল্টো ঝাঁঝ নিয়ে বলল,
“ আর ইউ্য সিরিয়াস কমান্ডার? অভিনয়? তা-ও আবার মিথ্যে আবেগ নিয়ে? অসম্ভব! আমি বেঁচে থাকতে এ কাজ কোনদিন করব না।”

শ্যামবরণ সুদর্শনের মুখো অভিব্যক্তি যথেষ্ট গম্ভীর! সপ্তদশীর এহেন মুখের ওপর নাকচ করে দেওয়া বাক্যে বিরক্তি বাড়ল তার। সে একহাত আলগোছে জানালার বাইরে বের করে এনে, তক্ষুণি ফেলে দিলো মাথার ওপর পড়ে থাকা হুডিটা। মুখো দর্শন স্পষ্ট করে যুবক কেমন চাপা রাগ নিয়ে বলল,
“ কেনো সানবার্ড? কি ক্ষতি এতে? তুমি কেনো বুঝতে পারছো না, এ কাজ করতে পারলে শুধু তুমি নয় বেঁচে যাবে আরও অনেকগুলো তরতাজা প্রাণ!”
সপ্তদশী মানতে নারাজ এহেন বাক্য। চোখেমুখে একরাশ আগুন লেপ্টে অগ্নিদৃষ্টে তাকাল কমান্ডার মায়াঙ্কের পানে। কন্ঠে ঝাঁঝ ঢেলে ফের আওড়াল,
“ মানব হৃদয় কাঁচের চাইতেও বেশি ভঙ্গুর কমান্ডার! আফসোস শুধু একটাই —কাঁচ ভাঙলে থেকে যায় দাগ,আর হৃদয় ভাঙলে উবে যায় বেঁচে থাকার স্বাদ! আমি কারো আবেগ কিংবা অনুভুতি নিয়ে খেলতে পারব না।”
সহসা কপাল গোছালো মায়াঙ্ক। চোখদুটো কুঁচকে গেল চাপা ক্ষোভে। দাঁতকপাটি নিরবে পিষে গেল একে-অপরের সনে। সে কেমন গম্ভীর কন্ঠে আওড়াল,

“ কিসের আবেগ? কার অনুভুতি? যার নাম মনস্টার, যার প্রতিটি কর্মকাণ্ড একটা নর-প-শুর মতো, তার আবার অনুভুতি কিসের? তার হৃদয়টা আস্ত কনক্রিটের তৈরি সানবার্ড! যেথায় সিলমোহর মা-রা। সে শুধু বোঝে মানুষ মা’রতে। এমন একটা নির্দয়ের থোড়াই হৃদয় থাকে!”
সপ্তদশী তাচ্ছিল্যের হাসি টানল ঠোঁটের কোণে। মাথাটা নুইয়ে নিলো আলগোছে। ছলছল দৃষ্টিযুগল আড়াল করে, ভঙ্গুর কন্ঠে থেমে থেমে বলল,
“ হোক সে নির্দয়! তবুও দ্য শ্যাডো মনস্টার দিনশেষে একটা মানুষ। যার বুকের খাঁচায় এখনো হৃদয় নামক স্পন্দিত যন্ত্র উপস্থিত।”
হতবাক মায়াঙ্ক! মেয়েটার কথার টোন অন্যরকম শোনাচ্ছে। যুবক ব্যস্ত হলো তক্ষুনি! পারছেনা জানালা ভেঙে ঘরে ঢুকে পড়তে। সে ফের বলে ওঠে,
“ তাতে কী? তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো সানবার্ড, রাক্ষসের দোরগোড়ায় নীতিবাক্য মানায় না।”
মাহি কানে তুললো না সে কথা। মেয়েটা আজ বড়ো গম্ভীর! দু’হাত আলগোছে বাঁধল বুকের সনে। নিজ বাক্যে অটল থেকে ঝরঝরে কন্ঠে শুধালো,

“ সরি মিস্টার! বাট আই কান্ট ডু দিস।”
বলেই মাহি ঘুরে দাঁড়াল। পা বাড়াল চলে যেতে। ঠিক তখনি পেছন থেকে ভেসে এলো মায়াঙ্কের ভঙ্গুর কন্ঠ!
“ তুমি নীতির কথা বলছো। অথচ একটাবার অন্যের কথা ভাবলে না সানবার্ড। এ প্যালেসে তুমিসহ আরও সহস্রাধিক মানুষ রয়েছে, যারা পরিবারহারা। তাদের পরিবারও হয়তো তোমার পরিবারের মতো অপেক্ষায় আছে। তোমার কি একটুও খারাপ লাগছেনা ওদের জন্য?”
সহসা থমকায় মাহি! নরম দিলে আচমকা মোচড় দিয়ে ওঠে তার। মস্তিষ্ক হলো নড়বড়ে। পরিবারের কথা উঠতেই সপ্তদশী বোধ হারালো নিজের। নিরবে ঝরালো অশ্রু! কাঁপা কাঁপা বদনে ঘুরে দাঁড়িয়ে মোটা কন্ঠে বলল,
“ আমিও চাই ওরা মুক্ত হোক। কিন্তু কারো আবেগের সাথে খেলা করার মতো অপরাধ আমি করতে পারব না কমান্ডার। আপনি আমায় অন্য রাস্তা বলুন!”
কিয়তক্ষন চুপ রইল মায়াঙ্ক। গভীর দৃষ্টে পরোখ করল সপ্তদশীকে। অতঃপর বুক ফুলিয়ে নিশ্বাস টেনে বলল,

“ ঠিক আছে অভিনয় করতে হবে না। কিন্তু অন্য একটা কাজ করতে হবে। এ প্যালেসে একটা গুপ্ত পথ আছে যা মনস্টার ছাড়া কেউ জানে না, তুমি যেভাবেই হোক সে পথ খুঁজে বের করবে। আর এই পথ খোঁজার একমাত্র রাস্তা হচ্ছে মনস্টারের পেন্টহাউজ। এবার বলো সানবার্ড, তুমি কি পারবে আমাকে এ তথ্য এনে দিতে? একবার এটা জেনে গেলে শুধু তুমি নও, সবাইকে উদ্ধার করতে পারব আমি।”
সপ্তদশী একমনে শুনল সব। নিষ্পলক দৃষ্টি এতক্ষণে পলক ফেলল তার। সে খানিক সময় নিয়ে ভাবল কিছু একটা। নরম মনে বোধ জাগল — সকলকে উদ্ধার করার উদ্যেগ। মেয়েটা ওপর নিচ মাথা নাড়িয়ে বলল,

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪২

“ ঠিক আছে আমি এ খবর এনে দিব কিন্তু… ”
মায়াঙ্ক ভ্রু গোটায়! সহসা পাল্টা প্রশ্ন ছুড়েঁ বলে ওঠে,
“ কিন্তু?”
“ এসবে বিস্টের কোনো ক্ষতি হবে না তো?”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here