মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৫
jannatul firdaus mithila
“ এতো আলগা ঢং করতে হবে না রে বান্দীর মেয়ে! মা’ই সিসকিস( Siskis) আর বিগার দ্যান ইউ্যরস!”
কপাল গোছালো মাহি। হতবুদ্ধি’র ন্যায় দৃষ্টি করল সরু! এতক্ষণের নিজেকে আড়াল করবার ব্যস্ত প্রচেষ্টায় সামান্য বিরতি টেনে, কন্ঠে একরাশ সন্দিগ্ধতা ঢেলে মিনমিনিয়ে শুধালো,
“ সিসকিস কী?”
মুহুর্তেই সুদর্শনের রিং পরুয়া বাদামী অধরযুগলে দৃশ্যমান হলো এক চিলতে রহস্যময় বাঁকা হাসির রেশ। গৌরবর্ণ মুখখানায় নামল এক আকাশসম দুষ্টভাব। সে আলগোছে হাত সরালো সপ্তদশীর বাঁকান কোমর হতে। তক্ষুনি মেয়েটার দোদুল্যমান ক্ষুদ্র বদনখানি ফের ডুবল পানির গভীরে। নাকানিচুবানি চলমান! তার সুশ্রী মুখাবয়ব রঙ ধরেছে লাল। নড়বড়ে উঁচু হাতদুটোয় হঠাৎ টান পড়ল মাহি’র। দু’টো শক্তপোক্ত হাতের জোরে সে আবারও উঁচু হলো। হাঁপাতে হাঁপাতে কিছু বুঝে উঠবে তার আগেই বলিষ্ঠ পুরুষের রুক্ষ হাতদুটো আচানক আঁকড়ে ধরল সপ্তদশীর কোমল বাঁকান কোমর। পরমুহুর্তেই মেয়েটাকে উঁচিয়ে তুলে বসালো পুলের পাড়ে। সম্পূর্ণ ঘটনাটুকু ঘটে গেল মাহি’র হতভম্বতায়। ন্যানো সেকেন্ডের বিরতিতে তার চোখদুটো বুঁজে আসেনি একবারও। মেয়েটা হাঁপাচ্ছে! মাঘ মাসের হাড় কাঁপানো ঠান্ডার ন্যায় কাঁপছে সে। এরইমধ্যে সম্মুখ থেকে ভেসে এলো চুটকীর শব্দ! সহসা নজর তুলল মাহি। চোখাচোখি হলো রূঢ় মানবের বাদামি চোখজোড়ার সনে। মানব স্থির! ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ টেনে ভরাট কন্ঠে শুধালো,
“ ইউ্য ওয়ান্না নো হোয়াট’স সিসকি রাইট? দ্যান জাস্ট পয়েন্ট ইউ্যর আই’স অন মি!”
হতবুদ্ধির ন্যায় সহসা দৃষ্টি অনড় করল মাহি। উদর সমান পানিতে কদম পেছাচ্ছে মুগ্ধ। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেয়েটাতে নিবদ্ধ। মাহি দৃষ্টি সংকুচিত করল এবার। লোকটা ঠিক কি করতে চাইছে? তার এহেন ভাবনার মাঝেই, পুলের মাঝখানে এসে হুট করে পা থামাল সুদর্শন। বলিষ্ঠ হাতদুটো দু’ধারের পানির ওপর ছড়িয়ে রেখে আচানক টানটান করল নিজ পেটানো প্রশস্ত বক্ষ। দুষ্ট ভঙ্গিতে চোখ টিপে দাঁত ছোঁয়ায় অধর কোণে। অতঃপর নিজ শক্ত মাংসল উপত্যকা দু’টো দক্ষ শারীরিক কৌশলে সংকোচন-প্রসারনে মত্ত হলো অসভ্য মাফিয়া বিস্ট! বুকের দুপাশের পেশীতে তরঙ্গ ছড়িয়ে হাতদুটো উঠিয়ে আনলো মাথার পেছনে। তৎক্ষনাৎ পেটানো উদর খানা টানটান হলো মানবের। তা দেখে হতভম্ব মাহি! লজ্জায় রাঙা হলো তার পেল্লব মুখখানা। মুগ্ধ শ্লেষাত্মক হাসল এপর্যায়ে। মেয়েটাকে আরেকটু লজ্জায় ফেলতে তক্ষুনি হাত ছোঁয়াল নিজ বক্ষে। সেথায় খানিকক্ষণ আবেদনী কায়দায় আঙুল ছুঁইয়ে শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“ যাদের নড়চড় দেখে আপাতত তোর পেটে প্রজাপতি উড়ছে, তাদেরকেই রাশিয়ান ওয়ার্ডে — সিসকিস বলে। ডু ইউ্য গেট দ্যাট বান্দীর মেয়ে? নাকি কাছে এসে তোকে ছুঁইয়ে বোঝাবো? ”
সহসা আগুন লেপ্টালো সপ্তদশীর মুখাবয়বে। লোকটার তখনকার অপমানসূচক বাক্যটুকু মনে পরতেই হাতদুটো হলো মুষ্টিবদ্ধ। লজ্জায় রঙিন হওয়া গালদুটো খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে, মেয়েটা কেমন ঝাঁঝাল কন্ঠে বলে ওঠে,
“ অসভ্য, বেয়াদব, নির্লজ্জ বেহায়া লোক! আপনাকে তো… ”
“ কি করবি বান্দীর মেয়ে?”
দৃষ্টিতে তাচ্ছিল্যের ছাপ ফুটেছে মুগ্ধের। ঠোঁটের কোণে শ্লেষাত্মক হাসি! মাহি কেমন ফোঁস ফোঁস করছে সাপের ন্যায়। দু’হাতে নিজেকে আড়াল করতে বেজায় মত্ত মানবী। রাগে-লজ্জায় থরথর করে কাঁপছে তার বদন। মেয়েটা উঠে দাঁড়াতে উদ্যোত হলো। ঠিক তখনি মুগ্ধ কেমন গমগমে গলায় শুধালো,
“ কোথায় যাচ্ছিস?”
থামল না মাহি। জবুথবু বদনখানি নিয়ে কোনমতে উঠে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা চলমান তার। যুবকের ওমন বাক্য কর্ণধারে পৌঁছাতেই রাগ বাড়ল মেয়েটার। নাকের পাটা ফুলিয়ে তক্ষুনি দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ ম’রতে!”
অলক্ষ্যে ঠোঁট কামড়ে হাসল মুগ্ধ। তবে সে হাসির স্থায়িত্ব খুব বেশিক্ষণ রইল না। ন্যানো সেকেন্ডের বিরতিতে হাসিটুকু মিলিয়ে গেল হাওয়ায়। পরক্ষণে কপট ভাব দেখিয়ে সাঁতার ধরল মাহি’র অভিমুখে। তা টের পাওয়া মাত্রই হড়বড়িয়ে উঠে মাহি। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে যে-ই না সম্মুখে পা বাড়াবে ওমনি পেছন থেকে একখানা বড়সড় থাবা এসে আচমকা আঁকড়ে ধরল সপ্তদশীর পরনের জামার একাংশ। মুহুর্তেই থমকে দাঁড়ায় মাহি। ঝাঁঝ দেখিয়ে বলে ওঠে,
“ ছাড়ুন আমায়!”
শুনল না মুগ্ধ! নির্বিকার ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে একহাত উঠিয়ে রাখল সুইমিংপুলের পাড়ে। সেথায় খানিক ভর দিয়ে ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে আওড়াল,
“ ছাড়ব না। কি করবি?”
অসহায় মাহি! তার সর্বাঙ্গ কাঁপছে ঠান্ডায়। পেছন থেকে অসভ্য লোক জামা টানছে। সম্মুখে কদম বাড়াতে গেলেই টান পড়ছে ভীষণ। মেয়েটা এবার তেতে গিয়ে বলল,
“ কি চাচ্ছেন আপনি?”
ঠোঁটের নিখুঁত রেখাটুকু আচানক হেলে পড়ল রূঢ় মানবের। হাতের জোরে মেয়েটার জামায় টান বাড়িয়ে,দুষ্ট কন্ঠে শুধালো,
“ জানতে চেয়েছিলি সিসকিস কী! বলে.. ওপস মাই ব্যাড, আমি কিন্তু প্র্যাক্টিক্যালি দেখিয়ে দিয়েছি। নাউ ট্যাল মি, মা’ই সিসকিস আর বিগার দ্যান ইউ্যর’স। আর নট দ্যা?”
লজ্জায় কুন্ঠা যাচ্ছে মাহি। দাঁতের রুষ্ট চাপায় পিষ্ট করছে নিজ তুলতুলে অধরযুগল। পারছেনা ভূভাগ চৌচির করে সেথায় টুপ করে মুখ লুকতে। ওদিকে রূঢ় মানবের নিখাঁদ গভীর দৃষ্টি গিয়ে আটঁকিয়েছে মেয়েটার পিঠ বরাবর। সেথায় কিয়তক্ষন অবলোকন চালিয়ে হঠাৎই ঠোঁট পিষে হাসল মুগ্ধ। দৃষ্টি অন্যত্র ঘুরিয়ে বাঁকা কন্ঠে শুধালো,
“ সাদার সাথে কালো! উমম..নট ব্যাড। বাট শুধু কালোটা মেবি বেশি ভালো দেখায়। সো খুলে ফেল!”
তৎক্ষনাৎ শীরঁদাড়া বেয়ে একখানা শীতল স্রোত বয়ে গেল মাহি’র। লজ্জায় হাসফাস করে উঠল সম্পূর্ণ বদন। তড়িঘড়ি করে নিজেকে শক্ত করে চেপে ধরে সপ্তদশী। এরইমধ্যে হুট করে টান পড়ল পেছনে। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকানোর পূর্বে মেয়েটা কেমন আছড়ে পড়ল পেছনের দিকে! তার নরম পিঠের ত্বক গিয়ে ঠেকল রূঢ় মানবের রুক্ষ বক্ষ বিভাজনের সঙ্গে। সহসা আঁতকে উঠে মাহি। ঘটনার পরিক্রমায় কিছু বুঝে উঠবে, এর আগেই নির্দয় মানবের শক্তপোক্ত হাতখানা আচমকা পেছনে থেকে আঁকড়ে ধরে মানবীর কন্ঠা! মুহুর্তেই স্থবির হলো মাহি। দম আঁটকে শীরঁদাড়া সোজা করতেই মুগ্ধ মুখ ঠেকাল মাহি’র কানের পিঠে। সেথায় আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে রেখে হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ ইউ্য নো হোয়াট চাশমিস? আমার হাতে কিন্তু জাদু আছে। যা-ই ধরি, তা বৃদ্ধি পেতে খুব একটা সময় লাগে না।”
তৎক্ষনাৎ নাকমুখ কুঁচকে গেল মাহি’র। ঘৃণায় লেপ্টে গেল মুখ। ওদিকে মাফিয়া মনস্টার আজ বেড়েছে বেশ! মেয়েটার নরম পিঠের ত্বকে ধীরে ধীরে নিজ বাহাতের তর্জনী চালাচ্ছে সে। তার এহেন স্পর্শে কেঁপে ওঠে মাহি। যুবকের আঙুলের স্পর্শ অন্তর্বাসের অতি সন্নিকটে পৌঁছাতেই চেঁচিয়ে ওঠে মাহি।
“ প্লিজ এমনটা করবেন না! দয়া করুন বিস্ট।”
আঙুল থমকায় মুগ্ধের। এক ঝটকায় মেয়েটার পিঠ খানা নিজের বক্ষের সঙ্গে আরেকটু লেপ্টে নিয়ে, বাঁকা হেসে শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে শুধায়,
“ বিস্টের কাছে দয়া ভিক্ষা! ইজ নট ফানি বান্দীর মেয়ে?”
ফোঁপাচ্ছে মাহি। চোখদুটো বুঁজে রেখেছে অসহায়ত্বে। মোটা কন্ঠে পরক্ষণেই আওড়াল,
“ আপনি… আপনি হাত সরান। আমাকে এভাবে ছোঁবেন না। আমি….”
বাক্যটুকু সম্পূর্ণ হবার ফুরসত মিললো না সপ্তদশীর। তার আগেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের চিড়বিড় কন্ঠ!
“ ওহ কাম অন হটি! এটুকু ছোঁয়া সহ্য করতে না পারলে কিভাবে হবে বল? আমার বারণ করা স্বত্বেও ধেই ধেই করে চলে এসেছিস আমার কাছে। তাছাড়া ৬ মাস থেকে অলরেডি ১ মাস শেষ হয়ে গেল অথচ তুই কি-না এখনো সুস্থ আছিস! এ যে আমার চোখ নিতে পারছেনা। সো কাম…লেটস ডু সামথিং হটার!”
ভয়ে কন্ঠা শুকিয়ে কাঠ বনে গেল সপ্তদশীর। সর্বাঙ্গে মোচড় ধরল সাপের ন্যায়। অসহায় ভরা কন্ঠে মেয়েটা কেমন মিনমিনে স্বরে আওড়াল,
“ এমনটা কেনো করছেন আপনি? এপর্যন্ত কম অত্যাচার তো করলেন না! তাহলে নতুন করে আমাকে এভাবে…!”
বোকা মানবীর কানের কাছে নাক ডুবিয়েছে রূঢ় মানব। সেথায় তার স্পর্শ গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে! যা টের পেতেই কন্ঠরোধ হলো মাহি’র। বুকটায় যন্ত্রণা বাড়ল বড্ড! এরইমধ্যে নিজ কাজে মত্ত থেকে রূঢ় মানব হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ তোকে তৈরী করছি বান্দীর মেয়ে।”
মুহুর্তেই ললাটে গোটাকতক ভাঁজ পড়ল মাহি’র। সন্দিষ্ট কন্ঠে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ ক-কেনো? আমাকে তৈরি করতে হবে কেনো? কিসের জন্য তৈরী করতে হবে আমায়? আবার আপনার পোষ্যদের পেটে চালান করবেন না তো?”
এহেন কথায় ঠোঁট পিষে হাসল মুগ্ধ। আচমকা মেয়েটার কানের লতিতে স্পর্শ বসালো নিজ রুক্ষ দাঁতের। ঘটনাক্রমে ককিয়ে ওঠে মাহি। ফোপাঁনোর বেগ বাড়াতেই মানব কেমন গমগমে গলায় বলে ওঠে,
“ উঁহুম! আপাতত রুশদী কিং ক্ষুধার্ত। তার পেটে চালান করব তোকে! তারপর অবশিষ্ট কিছু থাকলে নাহয় পেটে যাবে বাকিদের!”
ভয় বাড়ল মাহি’র। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিললো বারকয়েক। ওদিকে মুগ্ধের চোখেমুখে স্পষ্ট লেপ্টে গিয়েছে এক আকাশসম নেশারঝোঁক। ক্রমশ হারাচ্ছে নিজের বোধবুদ্ধি! চোখের সামনে সিক্ত নারী কায়া’র অপরূপ সৌন্দর্য্যে মোহিত হয়ে, ধীরে ধীরে নাক ডোবালো মেয়েটার চুলের ভাঁজে। লম্বা লম্বা টানে বুক ভরাচ্ছে যুবক। সপ্তদশীর সিক্ত চুলের অদ্ভুত সুঘ্রাণে মাতোয়ারা হচ্ছে বেশ। নিজেকে সামলানোর কথা বোধহয় বেমালুম ভুলে গিয়েছে আজ! মাহি’র গা থেকে ভেসে আসা মেয়েলী সুঘ্রাণে উম্মাদ হচ্ছে মাফিয়া বিস্ট। নিজ উন্মত্ততায় ভুলেই গেল — সপ্তদশীর মনস্তত্ত্ব! মাহি ফোঁপাচ্ছে বেশ। অনবরত মোচড়াচ্ছে যুবকের শক্তিশালী হাতের বাঁধন হতে ছাড়া পেতে। তবে বালাইষাট! ওমন শক্তপোক্ত হাতের বাঁধন থেকে ছাড়া পাওয়া কি আর মুখের কথা? বেপরোয়া পুরুষ কেমন উন্মত্ত কায়দায় হুট করেই টান বসালো মেয়েটার মসৃণ কাঁধে। সেথায় জামার উপস্থিতি বোধহয় সহ্য হচ্ছে না তার। আগ্রাসী থাবায় মানবীর কাঁধ খামচে ধরে জামার অংশটুকু ছিঁড়তে গেলেই শব্দ করে কেঁদে উঠে মাহি! কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে বলে ওঠে,
“ আ-আমার খারাপ লাগছে বিস্ট! প্লিজ লেট মি গো!”
উন্মত্ততায় অন্ধ মাফিয়া বিস্ট! ক্ষ্যাপাটে ষাঁড়ের ন্যায় এক টানে মেয়েটার কাঁধের জামাটুকু ছিঁড়ে ফেলে, বেপরোয়া কন্ঠে হিসহিসিয়ে বলে ওঠে,
“ বাট আই কান্ট লেট ইউ্য গো বিউটি!”
কাঁদতে কাঁদতে দিশেহারা মাহি! শেষ প্রচেষ্টায় অনুনয় জুড়ে বলে ওঠে,
“ প্লিজ…..!”
কপাল গোছালো মুগ্ধ। মেয়েটার সব কথাকে একপ্রকার চুলোয় চড়িয়ে নাক ডোবালো মেয়েটার উম্মুক্ত মসৃণ কাঁধে। তক্ষুনি সর্বাঙ্গ জুড়ে ঝংকার দিয়ে ওঠে মাহি’র। কান্নার বেগ বাড়িয়ে মেয়েটা কেমন হাত-পা ছুঁড়ে বলে ওঠে,
“ না! এমনটা করবেন না আমার সাথে। ছাড়ুন আমায়। আম্মু!!!!”
মেয়েটার এহেন কান্নায় তিতিবিরক্ত মুগ্ধ। বিরক্তির জেরে দৃঢ় চোয়ালখানা তার শক্ত হয়ে গেল মুহুর্তেই। যুবক দাঁত খিচঁল। কঠিন হুংকারে আচমকা বলে উঠল,
“ জাস্ট ফা’ক অফ এভরিথিং বান্দীর মেয়ে! আই থিংক, উই শ্যুড গেট হুকড আপ! বাকি যা হবার সব পরে দেখে নিবো। বাট নাউ…কাম ক্লোজার।”
যুবকের এহেন উদ্ভট কর্মে বাকহারা মাহি। বদনে অস্বস্তিকর স্পর্শ গভীর হতেই তৎক্ষনাৎ চোখমুখ খিঁচে আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ে চেঁচিয়ে ওঠে বোকা মানবী।
“ আআ….!১৭ দিন, আর-ও ১৭ দিন। আপনি বলেছিলেন আরও ১৭দিন।”
মুহুর্তেই টনক নড়ল মুগ্ধের। স্থবির হয়ে গেল তার সকল কর্মকাণ্ড। চোখদুটো বিস্ফোরিত আবির্ভাবে কপাল স্পর্শ করতেই, নিজের পানে একপলক দৃষ্টিপাত করলেন রূঢ় মানব। আর ওমনি নিজের ওমন হুটহাট লাগামহীন বেলেল্লাপনা ধরা পড়তেই আচমকা মেয়েটার কাছ থেকে ছিটকে সরে গেল দূরে। কিছুক্ষণ পূর্বে ঘটাতে চাওয়া নিজ কর্মের কথা দ্বিতীয়বার মনে করে দাঁত খিঁচল মুগ্ধ। সহসা চোয়াল শক্ত করে দু’হাতে খামচে ধরল নিজের চুল। চিড়বিড়িয়ে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“ হোয়াট দ্য ফা’ক আই ওয়াজ গোয়িং টু ডু? কিভাবে পারলাম এসব করতে? ওহ গড!”
অস্থির মুগ্ধ! রাগ-ক্ষোভে টানছে নিজ চুল। তৎক্ষনাৎ একলাফে পুল থেকে উঠে গেল রূঢ় মানব। রাগে গজগজ করতে করতে পা বাড়ায় সম্মুখে। অন্যদিকে, সপ্তদশী এখনো নিজেকে সামলাতে ব্যস্ত। কাপত্রয়ী পল্লবিত আঁখিদ্বয় নিরবে ঝরাচ্ছে অশ্রু। লোকটার প্রতি বুক ভরা ঘৃণায় একদলা থুতু বেরুলো মুহূর্তেই। চলন্ত মুগ্ধ মহাশয় বোধহয় টের পেলো তা। সঙ্গে সঙ্গে পায়ের গতিতে রুখ টেনে, না ঘুরেই চোয়াল শক্ত করে দাঁত খিঁচে ধমকের সুরে বলল,
“ খবরদার আমার দু-চোখের সামনে আর আসবিনা বান্দীর মেয়ে!”
বলেই গটগট পায়ে স্থান ত্যাগ করেন মাফিয়া বিস্ট। তার ওমন ধমকে কেঁপে উঠেছে মাহি। সপ্তদশীর কাপত্রয়ী হাতদুটো আচমকা আঁকড়ে ধরেছে নিজ বুক। ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে উঠে দাঁড়াতে প্রয়াস চালাতেই টের পেলো — পাদু’টো অবশ হয়ে ঝিমঝিম করছে তার। বোধহয় অনেকক্ষণ পা গুটিয়ে বসে থাকার ফল! তবুও মাহি উঠে দাঁড়ায় কোনরকম। গায়ের জোরে ভর দিয়ে এক কদম সামনে এগোতে গেলেই বাঁধল আরেক বিপত্তি! সিক্ত গা হতে চারপাশের তকতকে মেঝেতে জমেছে পানি। সে পানিতে সপ্তদশীর অবশ পা’দুটো আচমকা পিছলে যেতেই, মেয়েটা কেমন ধুপ করে উল্টে পড়ল সুইমিংপুলে। ন্যানো সেকেন্ডের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া ঘটনায় হকচকানোর সময় অব্দি পেলো না মাহি। তার আগেই পানির গভীরতায় দোদুল্যমান হলো তার ক্ষুদ্র বদনখানি। মাথা শুদ্ধ সম্পূর্ণ শরীর একবার ডুবছে, তো আরেকবার উঠছে! নাকেমুখে পানি গিয়ে একাকার অবস্থা। সাঁতার না জানার অভিশাপ স্বরুপ মেয়েটা আজও ডুবে যাওয়ার পথে। দাঁপড়াচ্ছে বেশ!
ঠিক তখনি হাওয়ার বেগে ছুটে এলো মুগ্ধ! ব্যাপক অস্থিরতায় স্থান-কাল ভুলে যুবক ফের ঝাপ দিলো সুইমিংপুলে। একমুহূর্ত সাঁতার কেটে পরমুহূর্তেই আঁকড়ে ধরল ডুবন্ত সপ্তদশীর একহাত! বাঁচার একটুখানি ঢাল পেয়ে তক্ষুনি যুবকের হাতটা আঁকড়ে ধরল মাহি। এক ঝটকায় পানির গভীর হতে মাথা তুলে, আচমকা মানবের হাত ছেড়ে দিয়ে দু’হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল যুবকের সুদীর্ঘ গলা! অতঃপর এক নিমিষেই দিনদুনিয়া ভুলে জড়িয়ে ধরল রূঢ় মানবকে। তক্ষুনি থমকায় মুগ্ধ। থমকায় তার স্পন্দিত হৃৎপিণ্ড! যুবকের ক’টা হার্টবিট ইতোমধ্যেই মিস গেল তা কে জানে! তার ইস্পাত-দৃঢ় বক্ষভাজে আলতো করে পিষ্ট হচ্ছে ধনুকের ন্যায় বাঁকান কোমল নারীদেহের সুচারু দু’টো ভূদৃশ্য! কোমল তুলতুলে পরশে অভ্যন্তরে শিউরে উঠছে মাফিয়া বিস্ট। গায়ের সবগুলো পশম বোধহয় ইতোমধ্যেই নিজেদের দাঁড় করিয়েছে। পানির গভীরতায় বলিষ্ঠ দেহখানা ডুবে থাকা স্বত্বেও খরা নেমেছে তার কন্ঠায়। নারীদেহের উষ্ণ স্পর্শের অতি-পরিশ্রান্ত কোমল অনুভুতিতে চোখ নিভে এলো মুগ্ধের। এ যেন সে-ই তিন বছর আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি! মেয়েটা আজ আবারও পাগল করছে তাকে। যুবক আলগোছে জিভ ঠেলে অধর ভেজালো। অধরযুগলের ফাঁক গলিয়ে উষ্ণ নিশ্বাস ফেলে হিমশীতল কন্ঠে হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“ ছেড়ে দে পিচ্চি! আমি আজ আমাতে নেই! হয়তো এমুহূর্তে আমায় না ছাড়লে, তোর চোখে অতিমাত্রায় ঘৃণিত তকমা পাওয়া কিছু একটা ঘটে যাবে।”
শুনল না সপ্তদশী! ভয়ে কাঁপছে তার সর্বাঙ্গ। পরপরই নরম তুলতুলে হাতদুটোর বাঁধন শক্ত হলো আরও কিছুটা। বাঁচার সর্বাত্মক চেষ্টায় বোকার ন্যায় তক্ষুনি তার পাদু’টো উঠে এলো বলিষ্ঠ পুরুষের পেটানো কোমরে। তড়াক শরীর জ্বলে উঠল মুগ্ধের। বুকের ওঠানামার গতি হলো তীব্র! পুরুষালী বিকট চিন্তাভাবনা মুহুর্তেই জেঁকে ধরল তার মস্তিষ্ক। হাতদুটো নিশপিশ করে উঠল মেয়েটাকে আলতো ধাক্কায় নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে। তবে কান্ড দেখো! রূঢ় মানব কেমন দাঁত খিঁচে নিজেকে সামলে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে তটস্থ বোকা মানবী, নাক-মুখ কুঁচকে আবারও বলে ওঠে,
“ না না! ছাড়বেন না আমায়। আমি সাঁতার পারিনা। আমাকে ওপরে তুলুন। নয়তো ডুবে যাব আমি!”
বুকের সঙ্গে বাদামী অধরযুগলও কাঁপছে মুগ্ধের। ফেলে রাখা হাতদুটো তার, মুষ্টিবদ্ধ হয়েছে আনমনে। কন্ঠায় নেমেছে ব্যাপক শুষ্কতা। যুবক কেমন আলগোছে দাঁতের রুষ্ট চাপে পিষ্ট করল নিজ ঠোঁট। পরপরই কপট রাগ দেখিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
“ নিজে ডুবছিস বলে আমাকেও কেনো ডোবাতে চাচ্ছিস পিচ্চি? আমিতো আগে থেকেই গলা সমান ডুবে আছি! এবার ডুব দিলে হয়তো উঠে আসার রাস্তা হারিয়ে ফেলব চিরতরে। নিজের ভালো চাস তো আমায় ছেড়ে দে!”
মাহি নাছোড়বান্দা! নিজ বক্ষভাজ যুবকের বক্ষের সনে তীব্র ভঙ্গিতে পিষ্ট করে ভয়জড়িত কন্ঠে শুধালো,
“ যা ইচ্ছে হোক! আমি ছাড়ব না আপনাকে। আমায় ওপরে তুলুন!”
সহসা অস্থিরতা বাড়ল মুগ্ধের। নিশ্বাসের গতি হলো তীব্র! সে তক্ষুনি জোরপূর্বক মেয়েটার হাতদুটো নিজ গলা থেকে সরালো। তবে মাহি ছাড়ল না তাকে। ঠিকই পা দিয়ে আঁকড়ে রাখল মানবের কোমর। মুগ্ধ এবার ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল। অতিষ্ঠ ভঙ্গিতে আচানক একহাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল মাহি’র ঘাড়। মেয়েটার মুখটা নিজের বড্ড কাছে এনে সর্তকবাণীতে হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“ আমি খারাপ! খুব খারাপ। আমার সঙ্গ মানে ধ্বংস! এককথায় অভিশপ্ত আমি! এই আমি নামক অভিশাপকে নিজ গায়ে মেখে নিজেকে কলঙ্কিত করতে আসিস না বান্দীর মেয়ে! বিশ্বাস কর, কেউ মেনে নিবে এ কলঙ্ক। ইভেন আমিও মানব না। তাই বলছি ছেড়ে দে আমায়! নয়তো সত্যি কিছু একটা ঘটে যাবে।”
যুবকের মোটা মোটা কথা থোড়াই ঢুকল বোকা মানবীর ঘটে। সে কেমন নাক টেনে বাচ্চাদের ন্যায় হাঁপাতে হাঁপাতে বলে ওঠে,
“ ঘটুক!”
বলেই ফের কোমর নাড়ায় মাহি। তক্ষুনি যুবকের শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে ছড়ালো তীব্র আকাঙ্খা। সে হারালো নিজের বোধবুদ্ধি। সহসা আবেশে চোখবুঁজে অস্থির কন্ঠে অস্ফুটে আওড়াল,
“ ওহ ফা’ক!”
কথাটা বলতে দেরি, রূঢ় মানবের চোখ খুলতে দেরি নেই! সে এবার নিজ উদ্যোগে আচমকা শক্ত করে টেনে ধরল মাহি’র বাঁকান পাতলা কোমর। পরমুহুর্তে এক ভিন্ন আগ্রাসী থাবা মেয়েটার গ্রীবাদেশ আঁকড়ে ধরে, তার সুশ্রী ক্ষুদ্র মুখখানা উঁচিয়ে তুলে হিসহিসিয়ে কেবল বলল,
“ এটা করতে তুই আমায় বাধ্য করলি পিচ্চি!”
হতবাক মাহি! কপাল গোছাতে না গোছাতেই আচমকা মানবের একহাত একযোগে আঁকড়ে ধরল মেয়েটার দু’হাতের কব্জিসন্ধি। অতঃপর চোখের পলকে সপ্তদশীর কাপত্রয়ী নরম তুলতুলে অধরযুগল টেনে ধরল নিজ রুক্ষ ওষ্ঠপুটের রুষ্ট চাপে। মুহুর্তেই স্থবির হলো মাহি! ছটফটাতে লাগল তার সর্বাঙ্গ! অথচ রূঢ় মানব তাকে থোড়াই ছাড়ল! সে আজ মত্ত নিজ ওষ্ঠপুটের তৃষ্ণা মেটাতে। আবেশে চোখদুটো বুঁজে রেখে আশ্লেষে টানছে মেয়েটাকে! তার রুক্ষ দাঁতের রুষ্ট চাপ পিষ্ট করে দিচ্ছে সপ্তদশীর নরম অধরের চামড়া। দাঁত বসাচ্ছে নিজের উপস্থিতির ছাপ! মাহি কেমন ছটফটাচ্ছে দেখো! চোখদুটো তার নিরবে ঝরাচ্ছে অশ্রু। বুক ফুলে আসছে নিশ্বাস না ফেলার কারণে। তবুও দয়ামায়াহীন নির্দয় মানব, থামছেনা আজ। তার হাতদুটোর বাধঁন ক্রমশ শক্ত হচ্ছে। গভীর হচ্ছে চুম্বনের ধাঁচ! অমৃতসূধা পান করতে মত্ত থাকা যুবক ভুলেই বসল মেয়েটার অবস্থা! তীব্র ভয়ে, জড়তা এবং অস্বস্তিতে ধীরে ধীরে জ্ঞান হারাচ্ছে মাহি। একটা সময় পাথরের ন্যায় শক্ত হয়ে থাকা মানবী, নিজ নরম অধরযুগলের ওপর মানবের এহেন ক্রুরতা সইতে না পেরে ঠিক জ্ঞান হারালো! অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই মুগ্ধের। সে কেমন নিজ কর্মে মত্ত!
প্রায় বেশকিছুক্ষণের রুষ্ট দীর্ঘ চুম্বনের আবেশে যুবক হুট করেই মুখগহ্বরে স্বাদ পেলো তীব্র ক্ষারীয় কিছুর। আর ওমনি কপালে ভাঁজ পড়ল মুগ্ধের। চোখদুটো মুহুর্তেই সরালো নিজেদের পর্দা। অচেতন সপ্তদশীর মুখদর্শন হওয়া মাত্রই ধীরে ধীরে ওষ্ঠপুট ছাড়ল নির্দয় মানব। জ্ঞানহীন মেয়েটার নড়বড়ে মস্তক খানিক ঢুলে পড়তে গেলেই আলতো করে মেয়েটার মাথাটা নিজ বুকের সঙ্গে চেপে ধরে নির্দয় মাফিয়া বিস্ট। কোনো বাছবিচার ছাড়াই আচমকা মেয়েটার মাথায় বসালো এক সুতীব্র চুমু। সেথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে রেখে তীব্র গতিতে নিশ্বাস টানতে টানতে আবেশে বুঁজল দুচোখ। পরক্ষণে কেমন ভঙ্গুর কন্ঠে যুবক আনমনে শুধালো,
“ তুই তায়েফ এহসানের মেয়ে না পিচ্চি? তুই ওর মেয়ে না?”
আশ্চর্য! যে কথা আওড়ালে বরাবর রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে মানব, আজ সে কথা আওড়ানোর পরও একফোঁটা রাগ উঠছেনা নির্দয় মানবের। নিজের এহেন পরিবর্তনে বড্ড অবাক মুগ্ধ। পরপরই আজ প্রথমবারের মতো নিজ অবচেতন মনের কোণে উত্থাপিত হওয়া বাক্যটুকু ঠোঁটের ডগায় এনে আওড়াল,
“ তুই যদি তায়েফ এহসানের মেয়ে না হতি! তোর গায়ে যদি ঐ জানোয়ারের রক্ত না হতো, বিশ্বাস কর পিচ্চি — আমি বারবার জন্ম নিয়ে হলেও তোর হতে চাইতাম! তুই জানিস? তুই আমার কে? তুই জানিস তোর নেশায় কতগুলো বছর নিজেকে আঁটকে রেখেছি আমি? তবে তুই আজ এটা কি করলি? আমি কিন্তু এতগুলো বছর নিজেকে সামলে দূরে দূরে ছিলাম পিচ্চি! আমার দেহের খাঁচায় আঁটকে থাকা হৃদয়টাকে,আমি যাযাবরের ন্যায় চুপ করিয়ে এসেছি! তবে তুই কেনো হুট করে ঐ চুপ করে থাকা হিং স্র হৃদয়টাকে জাগাতে গেলি?এবার আমি কি করব? প্রতিশোধ নিবো? না-কি যাযাবরের ন্যায় তোকে লুকাব আমার হৃদয়ে?”
একমুহুর্ত থামল মুগ্ধ! পরক্ষণেই অচেতন মেয়েটার মাথাটা আলতো করে চেপে ধরে, তার মুখ আনলো নিজ সম্মুখে। নিদ্রায় আচ্ছাদিত মানবীর কোমল মুখপানে গভীর দৃষ্টি তাক করে, যুবক কেমন প্রথমবারের মতো তীব্র অসহায় ভরা কন্ঠে আওড়াল,
“ তোকে আমি কি করে নিজের হৃদয়ে লুকবো সিগনোরা? কি করে লুকবো? যেখানে তোর মুখটা দেখতে হুবহু তোর জানোয়ার বাপের মতো। তোর মুখ দেখলে আমার চোখের সামনে ঐ জানোয়ারের বাচ্চার মুখটা ভেসে উঠে। ঐ জানোয়ারের বাচ্চা, যে কিনা আমার মায়ের খুনের সাথে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত! তুই জানিস সিগনোরা? সেদিন তোর বাপের সামনে আমার মা তখনো বেঁচে ছিলো। আমার মায়ের বুকের ওপর শেষ গুলিটা তোর বাপ করেছে তাও আবার আমারই চোখের সামনে! তোর বাপ নিজ হাতে আমায় তুলে দিয়েছিল ঐ জানোয়ারদের হাতে। জানিস? তোর বাপ আমার পিঠে আগুন দিয়ে লিখে দিয়েছে — আমি জারজ! তোর বাপ, তোর বাপ! হ্যাঁ হ্যাঁ তোর বাপ! নিজ হাতে দাফন করেছে আমার মায়ের অনাগত সন্তানকে। তোর ঐ জানোয়ারের বাচ্চা বাপ — তায়েফ এহসান! সারা পৃথিবীর সামনে মুখোশ পরে থাকা জানোয়ার, ওকে আমি নিজ হাতে টুকরো টুকরো করব। ও যেভাবে আমার আপনজনদের আমার কাছ থেকে কেঁড়ে নিয়েছে, আমিও ঠিক একইভাবে ওর কাছ থেকে সবাইকে কেঁড়ে নিবো। এরজন্য যদি আমাকে তুই নামক আমার নেশাকেও পরিত্যাগ করতে হয়, তবে তাই সই! তায়েফ এহসানের দূষিত র ক্তকে আমি কোনোভাবেই নিজ হৃদয়ে স্থান দিতে পারব না। দিতে গেলে হয়তো নিজেকে ভুলতে হবে সিগনোরা!”
ধুপধাপ পায়ের জোরালো শব্দে কাঁপছে রায় বাড়ির অন্দরমহল। বিশালদেহী এক মনিষী এসে মাত্রই দাঁড়ালেন বাড়ির অন্দরমহলে। মুখভর্তি লম্বা লম্বা সফেদ রঙা দাঁড়ি তার, ডানহাতে একখানা কৌটো! বাহাতে একখানা বড়সড় লাঠি। বয়স্ক মনিষীর মুখে সে-কি রাগ! তিনি কেমন হুংকার ছুঁড়ে ডাকলেন,
“ আবে ঐ হিমাংশু রায়! এক্ষুনি বের হ ঘর থেকে।”
এহেন হুংকারে সেকেন্ড ত্রিশেকের মধ্যেই দোতলার রেলিঙ ঘেঁষে এসে দাঁড়ালেন মধ্যবয়স্ক হিমাংশু রায়। শ্যামবরণ মুখখানায় তার লেপ্টে আছে একরাশ দুশ্চিন্তার ছাপ। বিস্ফোরিত দৃষ্টি অন্দরমহলের নিচ তলায় তাক হতেই খানিক হোঁচট খেলেন মধ্যবয়স্ক। সুপরিচিত মনীষীর দেখা পাওয়া মাত্রই তিনি কেমন উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ছুটে এলেন নিচে। অতি ভক্তিতে মনিষীর চরণ স্পর্শ করতে গেলেই রুষ্টতায় কদম পেছালেন মনীষী। অত্যন্ত অসন্তুষ্ট কন্ঠে তিরস্কৃত কন্ঠে গর্জে বললেন,
“ তোর কতবড় স্পর্ধা হিমাংশু রায়, তুই অধীরের সাথে নিরুপমার বিয়ে দিতে চাইছিস! তুই জানিস না? সনাতনী ধর্মে পারিবারিক বিবাহবন্ধন নিষিদ্ধ! এতবড় পাপ কাজ করার মতো স্পর্ধা পেলি কোথায় তুই? আমার অভিশাপে ভস্ম হওয়ার লোভ জেগেছে তোর?”
সহসা আঁতকে উঠে বাড়ির লোকজন! হিমাংশু রায় ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়ালেন জমিন হতে। দু’হাত একত্রে জোর করে মনিষীকে বলে ওঠেন,
“ আপনি আমার সাথে মন্দিরে চলুন বাবা!”
তীব্র অসন্তোষের ছাপ ফুটলো বৃদ্ধ মনিষীর মুখাবয়বে। তিনি সরাসরি নাকচ করে দিলেন এহেন প্রস্তাব। তবুও হিমাংশু রায় জোর করলেন। তীব্র বিনীত অনুরোধ করায় অবশেষে তার সঙ্গে বাড়ির বিশাল মন্দিরের পথে কদম বাড়ালেন মনিষী। হিমাংশু রায় গতি বাড়িয়ে তড়িঘড়ি করে মন্দিরে ঢুকে কিসের যেন একখানা বাক্স বার করলেন! অতঃপর তা নিয়েই ছুটে এলেন মনিষীর নিকট। ব্যস্ত হাতে বাক্স খুলে একখানা মোড়ানো কুন্ডলীপত্র বের করে এগিয়ে দিলেন মনিষীর দিকে। কপাল কুঁচকে কাগজখানার পানে তাকিয়ে রইলেন মনিষী! এরইমধ্যে মধ্যে হিমাংশু রায় কেমন সর্তক কন্ঠে বলে ওঠেন,
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৪ (২)
“ নিরুপমার সাথে অধীরের কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই বাবা! শঙ্কর রায়ের একমাত্র সন্তান ছিলো জমিদার পুত্রী শ্যামৌপ্তী রায়। আর তার সন্তানই হচ্ছে — অধীর রায়। আমি শ্যামৌপ্তীর আপন দাদা নই। আমি শঙ্কর রায়ের বিশ্বস্ত সঙ্গী দেব মল্লিকের সন্তান! যে কি-না বড় হয়েছে — রায় বাড়ির সন্তান হিসেবে।”
