মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৭ (২)
jannatul firdaus mithila
“ হোয়াট দা ফাআআআআআআআক! তুই আমার হ্যালুসিনেশন নাহ?”
রমণী দাঁত খিঁচল! লজ্জায় তৎক্ষনাৎ দু’হাতের নরম আঁজলায় আড়াল করে নিলো পেল্লব মুখখানা। যুবকের ওমন সন্দিগ্ধ কন্ঠ কর্ণকুহরে পৌঁছান মাত্রই সপ্তদশী অত্যন্ত বিতৃষ্ণা ভরা কন্ঠে পরপরই গজগজ করে শুধালো,
“ আপনি কি অন্ধ? না-কি বেহায়াপনার ওপর পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনকারী নির্লজ্জ বেহায়া পুরুষ? ঘরের ভেতর আস্ত একটা জলজ্যান্ত মানুষ থাকা স্বত্বেও কেউ এভাবে…. ”
থামল মাহি! বাদবাকি কথাটুকু পূর্ণ করতে গিয়ে নিজেই হাসফাস করে উঠল লজ্জায়! পরক্ষণে তিতিবিরক্ততায় কুঁচকে নিলো মুখ। ওদিকে যুবক কেমন তালগোল পাকিয়ে চেয়ে আছে এখনো। সুদর্শন মুখখানায় তার সে-কি সন্দিহান ভাবস্রোত! ধারালো দাঁতের রুষ্ট চাপায় পিষ্ট করছে নিজ নিম্নাংশের ঠোঁট। তার পাদু’টোর ঠিক পাশে, মেঝেতে অবহেলায় লুটিয়ে আছে সফেদ রঙা তোয়ালেটা। রূঢ় মানব কপাল গোছালো। মেরুদণ্ডের হাড় সামান্য বাঁকিয়ে আলগোছে মেঝে থেকে তুলে নিলো অবহেলিত তোয়ালেটা। পরক্ষণে শক্ত মুখভঙ্গি বজায় রেখে, তোয়ালেটা ফের কোমরে পেঁচাতে পেঁচাতে মুগ্ধ কেমন সন্দিগ্ধ গলায় শুধালো,
“ সবটা কি দেখে ফেলেছিস?”
তৎক্ষনাৎ লজ্জায় লাল হলো সপ্তদশীর পেল্লব মুখখানা। কানদুটোর সরু ছিদ্র দিয়ে একনাগাড়ে বেরুচ্ছে লজ্জিত উষ্ণ ধোঁয়া! সপ্তদশী চাপা ক্ষোভ প্রকাশ করার ন্যায় তক্ষুনি তেঁতো কন্ঠে পাল্টা উত্তর ছুঁড়ে বলল,
“ চুপ করুন বেহায়া লোক! কিচ্ছু দেখিনি আমি।”
সহসা দুষ্ট হাসির রেশ ফুটল সুদর্শনের বাদামি অধরযুগলে। মেয়েটাকে জ্বালানোর অভিনব সুযোগ কি আর ওতো সহজে হাতছাড়া করবার মানুষ সে? যুবক কদম বাড়াল। মুখে কপট নাটকীয় ভাবভঙ্গিমা ধরে রেখে আচমকা দুষ্ট কন্ঠে আওড়াল,
“ ওহ-হো বান্দীর মেয়ে! এমন একটা ভিআইপি দৃশ্য ফ্রী-তে দেখার সুযোগ পেয়ে কেউ থোড়াই হাতছাড়া করে! তুই দেখছি বড্ড বোকা! থাক ব্যাপার নাহ। তখন দেখিসনি তো কি হয়েছে? এবার দেখবি! একদম সামনে থেকে, স্পষ্টভাবে।”
লজ্জায় নিশ্বাস আঁটকে গেল মাহি’র। বুক কেঁপে উঠল ধ্বক করে! কাপত্রয়ী পদযুগল তার শিরশির করছে বেশ। উদ্যেগী হয়েছে ছুটে যাবার প্রয়াসে। গুনে গুনে মাত্র একখানা কদম বাড়াল সপ্তদশী, আর ওমনি পেছন থেকে তার নরম তুলতুলে হাতের কব্জিসন্ধিতে টান পড়ল ভীষণ। মাহি থমকায়! ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলল অলক্ষ্যে। রূঢ় মানবের রুক্ষ হাতের মুঠোয় বন্দীরত নিজ কব্জিসন্ধি মোচড়াতে লাগল অনবরত। অভ্যন্তরে ভয়ডর লুকিয়ে রেখে কপট ঝাঁঝাল কন্ঠে আওড়াল,
“ হাত ছাড়ুন!”
নিজ মন-মর্জিতে সর্বদা অটুট থাকা মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার, আজ থোড়াই শুনবে মেয়েটার এহেন বাক্য! সে উল্টো এক হেঁচকা টানে সপ্তদশীকে নিয়ে নিলো নিজের বড্ড কাছে। মাহি মোচড়াচ্ছে! তার পিঠ ঠেকেছে রূঢ় মানবের রুক্ষ বক্ষ ভাঁজের সনে। হাতখানা এখনো ছাড় পায়নি তার! মুগ্ধ বাঁকা হাসল এপর্যায়ে। ছুটন্ত চড়ুইকে দক্ষ কায়দায় একহাতে নিজ বুক পিঞ্জরে আটকে রেখে, অন্যহাতখানা আলগোছে ছোঁয়াল সপ্তদশী’র মসৃণ কাঁধে। মাহি’র নড়চড় বাড়ল তৎক্ষনাৎ। মুক্ত থাকা ডানহাতটা হুট করে এগিয়ে এনে সুদর্শনের সুশ্রী গৌরবর্ণ মুখখানা খামচে ধরতে গেলেই আচানক মুখ সরিয়ে নেয় মুগ্ধ। মেয়েটার এরূপ উপস্থিত বুদ্ধির প্রকাশ দেখে, যুবক কেমন ঠোঁট পিষে হাসল। পরমুহূর্তেই সপ্তদশীর মুক্ত কোমল হাতখানা ঘুরিয়ে এনে হুট করেই চেপে ধরল তারই পিঠের সনে। ঘটনার পরিক্রমায় আটকা পড়ল মাহি! ছটফটাতে লাগল বেশ। রূঢ় মানবের তখন কি হলো কে জানে। তার সুদর্শন মুখাবয়ব থেকে আচমকা উধাও হয়ে গেল এতক্ষণের সকল দুষ্টুমির ছাপ। সেথায় এবার ভর করল আসক্তির উৎসর্গ।
যুবক ঘাড় এগোলো। ধীরে ধীরে আলগোছে মুখ নামালো সপ্তদশীর কানের কাছে। তার উষ্ণ নিশ্বাসের প্রতিটি ঝাপ্টা যেন কাটা ধরিয়ে দিচ্ছে রমণীর গায়ে। মেয়েটা বোধহয় ধীরে ধীরে কুপোকাত হচ্ছে। যুবকের রুক্ষ অধরযুগলের মোলায়েম স্পর্শ কানের লতি ছুঁয়ে দিচ্ছে সপ্তদশীর। অদ্ভুত অজানা অনুভূতিতে বুকের ওঠানামার গতি জোরাল হলো বেচারির। চোখদুটো বুঁজে এলো আবেশে। সুদর্শন হিসহিসিয়ে যাচ্ছে! মেয়েটার কানের কাছে নাক-ঠোঁট ছুঁয়ে হাস্কি স্বরে বলে ওঠে,
“ পাখিটা দেখতে সুন্দর নাহ সিগনোরা? পছন্দ হয়েছে তোর?”
তক্ষুনি বিস্ফোরিত আকারে দৃষ্টি মেললো মাহি। অবোধ্যতায় কুঁচকে নিলো ললাট। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে মিনমিনিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ কোন পাখি?”
তৎক্ষনাৎ অধরে দাঁত বসাল মুগ্ধ। আচ্ছন্নতায় বুদ হয়ে ধীরে ধীরে নিজ রুক্ষ হাতখানা গড়িয়ে আনলো মেয়েটার গা থেকে। মাহি নিস্তব্ধ! নিগূঢ় চোখে চেয়ে আছে সম্মুখে। এরইমধ্যে রমণী স্পষ্ট টের পেলো তার বাঁকান কোমর হতে ধীরে ধীরে গড়িয়ে যাচ্ছে সুদর্শনের শক্তপোক্ত হাত। মুহুর্তেই জমে গেল মাহি! রূঢ় মানবের রুক্ষ আঙুলগুলো আচানক নিজেদের আধিপত্যের ছাপ বসালো সুনিতম্বার সুডৌল কটিদেশে। তৎক্ষনাৎ সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে রমণীর। স্পর্শকাতর অঙ্গে এহেন অস্বস্তিকর পরশ সইতে না পেরে মানবী কেমন ফুপিয়ে উঠে আওড়াল,
“ হা-ত স-রা-ন বিস্ট! আপনি আমাকে এভাবে ছুঁতে পারেন না!”
কথাটা শেষ হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে যুবকের শক্তপোক্ত হাতের মুঠোয় চাপ বাড়ল! সে চাপে পিষ্ট হলো সপ্তদশীর মোলায়েম অঙ্গ। তক্ষুনি ককিয়ে ওঠে মাহি। বেচারির কান্নার বেগ বাড়তেই মুগ্ধ ছেড়ে দিলো তার হাতদুটো। পরক্ষণে চোখের পলকে একহাতে আলগোছে আঁকড়ে ধরল মেয়েটার সুদীর্ঘ মসৃণ কন্ঠা! কান্না থামল না মাহি’র। উল্টো বেড়ে গেল কয়েকগুণ। যুবক ধীরে ধীরে রমণীর গ্রীবা উঁচালো। কানের কাছে মুখ নিয়ে হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“ তোকে যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে ছোঁয়ার সকল অধিকার আমার আছে পিচ্চি!”
বাক্যটুকু বোধগম্য হয়নি মাহি’র। সে-তো কান্নায় মত্ত। যুবকের বেহায়া হাতের অশালীন স্পর্শ গায়ে কাটা ধরিয়ে দিচ্ছে তার। এ কি কম কষ্টের? মুগ্ধ আজ পাত্তা দিলো না সেসবে। মেয়েটাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে দিতে উন্মত্ত সে। ঠিক তখনি মাহি করে বসল আরেক কান্ড! মুক্ত বাঁহাতের কনুই দিয়ে আচানক আঘাত বসালো রূঢ় মানবের পেটানো উদর বরাবর। এহেন আকস্মিক কান্ডে আচ্ছন্নতার ঘোরে ডুবে থাকা সুদর্শন দুলে উঠল খানিক। তার পাহাড়সম দেহটা সামান্য নড়বড়ে হতেই চড়ুইয়ের ন্যায় আবদ্ধ খাঁচার ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে গেল মাহি। বাঁচার প্রাণপণ চেষ্টায় সরে তক্ষুনি সরে দাঁড়াল দু-কদম। হাঁপিয়ে উঠেছে সে। শুষ্ক ঢোক গিলছে অনবরত! কাঁপছে থরথর করে। এরইমধ্যে পেছন থেকে ভেসে এলো যুবকের অগ্রসর পদধ্বনি। তৎক্ষনাৎ আঁতকে উঠে মাহি। ভয়ে চোখমুখ খিঁচে ছুট লাগাল দরজার পানে। তবে কান্ড দেখো! পথিমধ্যে মখমলি দামী কার্পেটের সনে পা বাঁধল মেয়েটার! আর ওমনি বেচারি উল্টে পড়ল মেঝেতে। ভাগ্যিস মোটা মখমলি কার্পেটের ওপর পড়েছে সে। নয়তো এতক্ষণে শেষ রক্ষে ছিলো না তার! মাহি ভয়ে ভয়ে ফের দু’হাতে ভর দিয়ে উঠবার প্রয়াস চালালো। ঠিক তখনি একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে আচমকা টেনে ধরে মেয়েটার ডান-পা। মুহুর্তেই থমকায় মাহি! কিছু বুঝে উঠবার আগেই পায়ে পড়ল বিশাল টান। মুহুর্ত ব্যয়ে বেচারি কেমন এক ঝটকায় পিছিয়ে এলো বেশ। সপ্তদশী দাঁত খিঁচল! তড়াক ঘাড় বাকিয়ে তাকাল বেয়াদব সুদর্শনের পানে। যিনি আপাতত উদোম গায়ে দাঁড়িয়ে আছে সম্মুখে। যার কোমরের বড্ড নিচে স্রেফ একখানা সফেদ রঙা তোয়ালের উপস্থিতি! তার মুখখানার অভিব্যাক্তি ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ধীরে ধীরে ঝুঁকে আসছে ভাবলেশহীন কায়দায়। মাহি তক্ষুনি চোখ বুঁজে নিলো লজ্জায়। কুন্ঠিত কন্ঠে দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ ছাড়ুন আমায় বজ্জাত লোক! কিসব আবোলতাবোল কাজকর্ম করতে চাচ্ছেন আপনি?”
পিয়ার্সিং করা ঠোঁটখানা কামড়ে হাসল রূঢ় মানব! মেয়েটার কথার বিন্দুমাত্র প্রতিত্তোর দেবার প্রয়োজনীয়তা না দেখিয়ে তৎক্ষনাৎ সপ্তদশীকে একটানে তুলে নিলো কাঁধে। মাহি মোচড়ায় ভীষণ! তড়িঘড়ি করে লম্বা লম্বা নখর দিয়ে খামচে ধরল নির্দয় মানবের ফর্সা উদোম পিঠ। সেদিকে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ দেখালেন না মাফিয়া বিস্ট। উল্টো কন্ঠে দুষ্টুমির ছাপ টেনে শুধালো,
“ নখগুলো বাঁচিয়ে রাখ সিগনোরা! ভবিষ্যতে ভীষণ কাজে লাগবে।”
মাহি কানে তুললো না সেসব কথা। খামচাতে লাগল যুবকের পিঠ। ওদিকে ব্যস্ত সুদর্শন, দু-কদম হেঁটে এসে আচমকা মেয়েটাকে ছুঁড়ে ফেলল মখমলি বিছানার কোলে। অতঃপর চোখেমুখে অদ্ভুত আচ্ছন্নতা লেপ্টে, মেয়েটার পানে এগিয়ে আসতে আসতে আলগোছ হাত রাখল নিজ কোমরে পেঁচিয়ে রাখা তোয়ালের গায়ে। তা অবলোকন হওয়া মাত্রই চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো মাহি। অথচ তার এহেন ভাবস্রোতে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে, যুবক অত্যন্ত বেসুরো গলায় গেয়ে উঠল,
“ আয় না করি ফষ্টিনষ্টি, দেখতে নোনতা খেতে মিষ্টি! ও সোনা, ও সোনা!”
এই বুঝি আকাশ ভেঙে পড়ল সপ্তদশীর মাথার ওপর। বেচারি তক্ষুনি দু’হাতে মুখ ঢেকে উবুড় হয়ে নিজেকে আড়াল করল মখমলি বিছানার কোলে। করুণ কন্ঠে আওড়াল,
“ ইয়া খালিদ, উদ্ধার করো! দূর হোন আমার চোখের সামনে থেকে বেহায়া লোক।”
দুষ্ট হাসল মুগ্ধ। তৃষ্ণার্ত চাতকের ন্যায় সপ্তদশীর ক্ষুদ্র বদন পানে খানিকটা ঝুঁকে এসে, একহাতে তক্ষুনি পিছমোড়া করে আঁকড়ে ধরল মেয়েটার দু’হাত। মাহি ভড়কায়! অজানা উদ্ভট চিন্তায় আমতা আমতা করে শুধায়,
“ ক-কি করছেন আপনি? বিস্ট! দে-দেখুন এ-এবার কিন্তু বেশি বেশি হ-য়ে যা-যাচ্ছে!”
কথাগুলো শুনেও না শোনার ভান ধরলেন মাফিয়া বিস্ট। সপ্তদশীর অধিক নড়চড়ে খানিকটা বিরক্ত হয়ে গম্ভীর কন্ঠে শুধালেন ,
“ উমমমমম! ডোন্ট মুভ সিগনোরা। লেট মি ডু মা’ই ওয়ার্ক!”
থামল না মাহি! তড়াক প্রয়াস চালালো বিছানা থেকে উঠে আসার। তবে বালাইষাট! পাহাড়সম বলিষ্ঠ পুরুষের ওমন আগ্রাসী থাবায় আটকা পড়েছে তার দু’হাত, তা কি আর ওতো সহজে ছাড়া পায়? মুগ্ধ সময় নিলো। রয়েসয়ে মোচড়াতে থাকা মাহি’র ঘাড়ের বড্ড কাছে মুখ নামিয়ে আনল মাফিয়া বিস্ট। দেখল — সেথায় অবাধ্য চুলেদের আসর বসেছে। তা যেন বিরক্তি বাড়াল রূঢ় মানবের। সে তক্ষুনি উদ্যেগী হাতে মেয়েটার ঘাড়ের কাছে আঁটকে থাকা চুলগুলো আলগোছে সরিয়ে দিতে লাগল। ধীরে ধীরে উম্মুক্ত হলো সপ্তদশীর মসৃণ মাখনের ন্যায় ঘাড়ের ত্বক! যুবক কিয়তক্ষন তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে রইল সেদিকে। উঁহুম! তাকিয়ে থেকে তৃষ্ণা মিটছে না তার। তাই তো বেপরোয়া যুবক উন্মত্ততায় অলক্ষ্যে শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে, আলগোছে ঠোঁট বসালো মেয়েটার ঘাড়ে। তক্ষুনি ছটফটিয়ে উঠে মাহি। কান্নারা বাঁধ ভাঙল তার। বুকভাঙা আর্তনাদে কাতর হতেই হকচকিয়ে ওঠে মুগ্ধ। হতভম্বের ন্যায় তাকাল মেয়েটার পানে। মেয়েটা কি তাকে ভুল বুঝল? সে-কি সত্যিই ভাবল, নির্দয় মাফিয়া বিস্ট তাকে এখনি কাছে টেনে নিবে? এহেন ভাবনার ডোরে আঁটকে থেকে মুগ্ধ তৎক্ষনাৎ খানিকটা পিছিয়ে গেল। পরপরই আবার কি মনে করে সপ্তদশীর মাথার ওপর আলতো করে হাত ছুঁয়ে শান্ত কন্ঠে আওড়াল,
“ ডোন্ট বি আফ্রেইড মা’ই গার্ল! আ’ম নট আ পেডোফা*ইল! আই ওন্ট ডু এনিথিং উইথ ইউ্য আনটিল ইউ্য টার্ন এ-ইটিন সিগনোরা। আ’ম স্টিল ওয়েটিং।”
সহসা কান্না ভুলে হতবিহ্বল ভাব ধরল মাহি। নাক টানতে টানতে আনমনে ঘাড় বাকিয়ে তাকাল লোকটার অভিমুখে। চোখেমুখে একরাশ অবিশ্বাস্য ছাপ ফুটিয়ে সন্দিগ্ধ গলায় প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ সত্যি?”
“ হুম!”
যুবকের গুরুগম্ভীর উত্তর শুনে খানিকটা স্বস্তি পেলো মাহি। চোখদুটো নামিয়ে এনে নাক টানতে টানতে আচমকা কিছু একটা বোধগম্য হওয়ায় তড়াক বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে ফের তাকাল যুবকের পানে। দেখল — নির্দয় মাফিয়া মনস্টার কেমন নিষ্পলক দৃষ্টিতে তার পানে এখনো তাকিয়ে আছে। মাহি ইতস্ততা জড়ানো কন্ঠে মিনমিনিয়ে শুধালো,
“ তারমানে… আর ১৫দিন পর আমি ১৮ তে পড়লে আপনি আমার সাথে…”
“ ইন্টিমেট হবো!”
কথার মাঝপথে যুবকের ওমন নির্বিকার উত্তরে থতমত খেয়ে বসল সপ্তদশী। লজ্জায় রাঙা হলো মুখ। অস্বস্তিতে তক্ষুনি খামচে ধরল মখমলি বিছানার চাদর। এরইমধ্যে যুবক আবারও মুখ এগিয়ে আনলো মাহি’র দিকে। ঘাড়টা সামান্য কাত করে, দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা লেপ্টে আচমকা আলতো হাতে আঁকড়ে ধরল সপ্তদশীর নরম চুলের গোছা। এহেন অতর্কিত আক্রমণে ভড়কায় মাহি। জিভ নাড়িয়ে কিছু একটা বলতেই যাবে তার আগেই শুনতে পেলো যুবকের গমগমে কন্ঠ!
“ তোর যত ইচ্ছে উড়ে নে পিচ্চি! তোর স্বাধীনতার স্থায়িত্ব আর মাত্র ১৫দিন। সেদিন একদিকে ঘড়ির কাঁটায় ১২টা বাজবে, আরেকদিকে তোর গায়ে সারাজীবনের জন্য দাগ বসবে আমার নামের। যে দাগ তুই ম’রে গেলেও তোর গা থেকে মোছবার ক্ষমতা হবে না কারো, যে দাগ চিরদিন তোকে চিৎকার করে বলে যাবে — ইউ্য, দ্য ফা’কিং বিউটি — হু অনলি বিলংস টু মি।”
শুষ্ক ঢোক গিলল মাহি। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে পরক্ষণেই বলে উঠল,
“ আমি কখনোই আপনার হবো না। আমার সর্বাঙ্গে জোরপূর্বক আপনার কলঙ্কিত ছোঁয়া লাগলে-ও আমি কোনোদিন আপনার হবো না বিস্ট! জাস্ট গেট দ্যাট ইন ইউ্যর মাইন্ড।”
সহসা ধারালো দাঁতের রুষ্ট চাপায় পিষ্ট হলো রূঢ় মানবের অধরকোণ। চেহারায় নামলো চিরচেনা রূঢ়তা! হাতের জোর বাড়িয়ে, কন্ঠে একরাশ আধিপত্যের সুর ঢেলে সে আওড়াল,
“ ওহ মা’ই ফা’কিং সিগনোরা! ডু ইউ্য নো বেইব? আই হেভ টক্সিক ট্র্যাটস ( বিষাক্ত বৈশিষ্ট্য)। সো আ’ম এক্সেপ্টিং ইউ্যর চ্যালেন্জ!”
বিকেলের ম্লান আলোয় গা ঢাকা দিয়েছে সেইন্ট পিটার্সবার্গের আকাশ! ঘুটঘুটে সফেদ রঙা মেঘেদের সে-কি ছড়াছড়ি। রাত নাগাদ স্নোফল হবে নিশ্চিত!
একজোড়া ব্যুট পরিহিত ব্যস্ত কদম পায়চারি চালাচ্ছে প্যালেসের বিশাল অতিথি কক্ষে। পায়চারির মাঝপথে মধ্যবয়স্ক কেমন তন্ময় চোখে তাকাচ্ছে কক্ষের দুয়ার পানে। কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তির অপেক্ষায় অপেক্ষার প্রহর যেন থমকে দাঁড়িয়েছে এক জায়গায়! টলছে না তার অপেক্ষা নামক কাঁটা। মধ্যবয়স্কের গায়ে জড়ানো একখানা কালো রঙা ওভারকোট, দু’হাতে গ্লাবস! মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ। বাইরে যা ঠান্ডা পড়েছে না। কয়েক সেকেন্ড জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা দুষ্কর যেন। মধ্যবয়স্ক বড়ো অস্থির! অস্থিরতার ছাপ ফুটিয়ে দু’হাত কোমরপিঠে আঁটকে রেখে গতি বাড়িয়েছেন পায়ের। ঠিক তখনি কক্ষের দুয়ার হতে ধেয়ে এলো একজোড়া দাম্ভিক কদমের ধুপধাপ শব্দ! তৎক্ষনাৎ ঘাড় বাকিয়ে সেদিকে তাকালেন মধ্যবয়স্ক। আর ওমনি তার তন্ময় চোখদুটো কেমন স্বস্তিতে নিগূঢ় হলো রূঢ় মানবের সুদর্শন মুখপানে। গটগটিয়ে কক্ষে প্রবেশ করছেন মাফিয়া বিস্ট। ঠোঁটের কোণে তার জ্বলন্ত সিগার। দু’হাত গুঁজে রাখা প্যান্টের পকেটে। পরনে একখানা কালো রঙা শার্ট! বুকের মধ্যিখান উম্মুক্ত। তার ওপরে জড়িয়ে রাখা কালো রঙা লং কোট! দাম্ভিকতার জোরে উঁচু ঘাড়টা সামান্য নড়েনি অব্দি রূঢ় মানবের। না উদ্বেগ নিয়ে তাকাল ওতো দূর থেকে ছুটে আসা হিমাংশু রায়ের পানে। অথচ হিমাংশু রায় কেমন ছলছল চোখে তাকিয়ে দেখছেন একমাত্র বোনপোকে। যুবক যখন গটগট পায়ে ডিভানের কাছে এগোচ্ছে ঠিক তখনি হিমাংশু রায় মোটা কন্ঠে শুধালেন,
“ কেমন আছো অধীর?”
থামলেন না মাফিয়া বিস্ট। ব্যস্ত কদমে ঠাটবাট বজায় রেখে ডিভানের কাছে এগোতে এগোতে বলল,
“ যেমন দেখছেন!”
নিরবে মুচকি হাসলেন হিমাংশু রায়। ছেলেটার এহেন ত্যাড়া উত্তরে অভ্যস্ত সে। নতুন করে অবাক হবার কারণ খুঁজে পেলেন না তিনি। কিয়তক্ষন মৌনতা বজায় রেখে পরক্ষণেই আওড়ালেন,
“ জিজ্ঞেস করলে না, আমি কেমন আছি?”
যুবক নিরুত্তাপ! ডিভানের কোলে নিজ পাহাড়সম দেহটা এলিয়ে দিয়ে, রাজার ন্যায় পায়ের ওপর পা তুলে বসল। মন-মর্জিতে বাঁকা কন্ঠে বলল,
“ দেখে তো মনে হচ্ছে বেঁচে আছেন। তাহলে নতুন করে জিজ্ঞেস করে সময় নষ্ট করব কেনো?”
থতমত খেলেন হিমাংশু রায়। ছেলেটা আগে নাহয় কর্কশভাষী ছিলো, তবে এখন যে আরও দু’ধাপ বেড়েছে তার এহেন স্বভাব। মধ্যবয়স্ক খানিক সময় নিয়ে কপাল চুলকালেন। এরইমধ্যে মুগ্ধ কেমন গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কেনো এসেছেন?”
সহসা সটান হলেন হিমাংশু রায়। মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে প্রতিত্তোরে আওড়ালেন,
“ শ্যামার কথা মনে পরছিল। তাই ভাবলাম একটু দেখে যাই! কোথায় ও?”
রূঢ় মানব মধ্যবয়স্কের সম্মুখে পায়ের ওপর পা তুলে সিগার ফুঁকছে। ভদ্রতার লেশমাত্রও নেই তার মধ্যে! তবুও হিমাংশু রায়ের সেদিকে মনোযোগ নেই। তিনি ব্যস্ত নিজ কার্যসাধনে। এদিকে মুগ্ধ ততক্ষণে মুখ খুলল। গমগমে গলায় বলল,
“ যেখানে সবসময় থাকে।”
অতঃপর ফের নিরবতা নামল সম্পূর্ণ কক্ষে। মধ্যবয়স্ক কিয়তক্ষন মৌন থেকে কথা সাজালেন মনে মনে। আড়দৃষ্টে যুবককে এক-আধবার অবলোকন করে পরক্ষণেই কুটিল ভাবস্রোতে বলতে লাগল,
“ একটা কথা জানো অধীর? মানুষের শেষ ইচ্ছে পূরণ নাহলে না-কি তার আত্মা শান্তি পায়না। তুমি তো জানোই, শ্যামার শেষ ইচ্ছে ছিলো ও আমাদের সাথে দূর্গা পূজো দেখবে। কিন্তু ভাগ্যের কি লিলা! এর আগেই আমার বোনটা… থাক ওসব কথা। তোমাকে কতবার করে বললাম, শ্যামার অস্থিগুলো নিয়ে একটাবার এসো কলকাতায়। বিসর্জন দাও ওকে। তবে তুমি তো শুনলেই না!”
থামলেন হিমাংশু রায়। ঘুরে তাকালেন সুদর্শনের পানে। যুবক থমকে বসে আছে। তার আঙুলের ভাঁজে আঁটকে থাকা সিগারটা অনায়াসে পুড়ছে। মধ্যবয়স্ক বেশ বুঝলেন কাজ হচ্ছে! তিনি জানতেন — দ্য গ্রেট রুশদী কিংয়ের পাথুরে মন কেবল তার মায়ের জন্যই নরম হয়, অন্যকিছুর জন্য নয়। আর তাইতো এ সুযোগটা লুফে নিলেন তিনি। মুখাবয়বে কপট কাতরতা লেপ্টে কদম বাড়ালেন মুগ্ধের পানে। কন্ঠ আরও খানিকটা ভেঙে শুধালেন,
“ কি এমন রাগ তোমার আমাদের প্রতি অধীর? ঠিক কতগুলো বছর ধরে তুমি একটাবার নিজের বাড়ির চৌকাঠ মাড়াওনি, সে খবর কি তোমার আছে? শেষবার ৮বছর আগে শুধুমাত্র একটা রাতের জন্য গিয়েছিলে, তাও ফিরে এলে ভোর হতে না হতে। আচ্ছা… তুমি কি এখনো ঐ অতীতের বিষয়গুলো নিয়ে….!”
“ আসছে দূর্গা পূজায় কলকাতায় যচ্ছি! এবার আপনি আসতে পারেন।”
কথাটা বলেই সবেগে উঠে দাঁড়ায় মুগ্ধ। কোনোদিক না তাকিয়ে তক্ষুনি গটগট পায়ে বেরিয়ে গেল কক্ষ থেকে। এদিকে তার চলে যাওয়ার পরপরই প্রাপ্তির হাসিতে মত্ত হলেন হিমাংশু রায়। হাসতে হাসতে সিক্ত হলো তার চোখ। এ যে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! মধ্যবয়স্ক হাসতে হাসতেই আনমনে বিড়বিড় করে আওড়ালেন,
“ এসো অধীর! শুধু একটাবার এসো। বাকি খেলটা নাহয় মাঝরাতে আমিই খেলে দিব।”
মুখাবয়বে আঁধার নামিয়ে বসে আছে মাহি। হাঁটু দু’টো জড়িয়ে ধরে রেখেছে বুকের সনে। কিউটির অনুপস্থিতিতে মনটায় বিষাদ ছেয়েছে তার। পারছেনা ছুটে গিয়ে বাচ্চাটাকে নিয়ে আসতে! এতদিন ভেবেছিল প্যালেসটা একটা কারাগার। অথচ এই গ্লাসহাউজে এসে সপ্তদশীর ওমন চিন্তা একেবারেই উবে গেল যেন। তার ভাষ্যমতে — প্যালেস যদি হয় কারাগার, তাহলে পেন্টহাউজ হচ্ছে টর্চার সেল।
হতাশায় তক্ষুনি সপ্তদশীর বুক চিঁড়ে বেরিয়ে এলো এক দীর্ঘ নিশ্বাস। কাউচের কোলে খানিকটা নড়েচড়ে বসতেই আচানক কক্ষের দুয়ার হতে ভেসে এলো এক রক্ষীর ভয়ার্ত কন্ঠ!
“ হোলা সি-সিগনোরা! মনস্তার ইজ কলিং ইউ্য।”
লোকটা কেমন ভয়ে তটস্থ! মুখগহ্বরে বেশ ক’বার আঁটকে আঁটকে যাচ্ছে কথাগুলো। মাহি কপাল গোছালো তা দেখে। বিরক্তি নিয়ে লোকটার ওমন কথাকে একপ্রকার নাকচ করতেই যাবে ওমনি তড়িঘড়ি করে এক অদ্ভুত ব্যস্ততায় দুয়ার থেকে সরে গেলেন রক্ষী। মাহি হতভম্ব! কি বেয়াদব লোক। তার কথা না শুনেই চলে গেলো? সপ্তদশীর রাগ হলো বেশ। তড়াক বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল পরক্ষণে। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে মনে মনে ভীষণ রাগ নিয়ে আওড়াল,
“ অসভ্য বেয়াদব লোকটা কি মনে করে আমায়? তার হাতের মোয়া? যখন ইচ্ছে ডাকবে, ছোঁবে আবার ব্যথা দিবে। জাস্ট বিরক্তিকর একটা মানুষ!”
মনে মনে কথাগুলো আওড়ালেও বাইরে নিশ্চুপ মাহি। একবার ভাবল — যাবে না। শুনবেনা লোকটার আদেশ! তবে পরক্ষণে সকালের কথা মনে পড়ে যাওয়ায় মুহুর্তেই মুখটা কাচুমাচু হয়ে গেল বেচারির। অতঃপর ভাবতে ভাবতে না চাইতেও পা বাড়ালো কক্ষের বাইরে।
হলদেটে-সোনালী আলোয় ঝলমল করছে পেন্টহাউজের প্রতিটি কোণ। বিশালকার রাজকীয় ডাইনিং টেবিলে সেজেছে হরেকরকম খাবার! সুঘ্রাণে মো মো করছে চারপাশ। এদিকে পা টিপেটিপে ডাইনিং স্পেসের দুয়ারে এসে দাঁড়াল মাহি। সম্মুখের কাচেঁর দেয়াল হতে দামী পর্দাগুলো আলতো করে সরিয়ে দিয়ে সামান্য উঁকি দিলো ভেতরে। ওমনি ডাইনির টেবিল থেকে ভেসে আসে রূঢ় মানবের ভরাট কন্ঠ!
“ কাম ইন সিগনোরা!”
হকচকিয়ে ওঠে মাহি। সে-তো কাঁচের দেয়ালের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। তবে লোকটা তাকে দেখল কি করে? দেয়ালে তো কেবল তার প্রতিচ্ছবিটাই দেখা যাচ্ছে! তাহলে কি এটা ওয়ান-ওয়ে মিরর গ্লাস? সন্দিগ্ধতার জেরে ক্ষুদ্র কদমে দেয়ালের ওপাশ থেকে বেরিয়ে আসে মাহি। ধীরে ধীরে প্রবেশ করল ভেতরে। আনমনে দৃষ্টি উঁচাতেই তা গিয়ে আচানক ঠেকল হেড অফ দা চেয়ারে দাম্ভিকতার সঙ্গে বসে থাকা মাফিয়া বিস্টের পানে। যিনি আপাতত একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে প্লেটের দিকে। মেয়েটার উপস্থিতি টের পেলো কি-না কে জানে! সে কেমন হুট করেই নিজের বাম-পায়ের উরুটা বের করে রাখল চেয়ারের পাশ দিয়ে। অতঃপর মাহি’র পানে না তাকিয়ে, নিজ বাহাতটা বাড়িয়ে দিয়ে আদেশ ছুঁড়ল!
“ কাম! সিট অন মা’ই ল্যাপ!”
দূরে কোথাও বজ্রপাত ঘটল কি-না কে জানে! তবে সপ্তদশীর বিস্ফোরিত নেত্র কপাল ছুঁতেই বোঝা গেল — তার মাথায় বুঝি আকাশ ভেঙে পড়েছে। মানবী তক্ষুনি পিছিয়ে গেল দু-কদম। তেলেবেগুনে জ্বলে উঠার ন্যায় ছ্যাৎ করে বলে উঠল,
“ কিসের ল্যাপ? কোন দুঃখে আমি আপনার কোলে বসতে যাব শুনি? এতোবড় আকাল আমার এখনোওওও…”
বাকিটা জিভ খসানোর ফুরসত মিলেনি বোকা মানবীর। তার পূর্বেই দৃষ্টে আটকালো যুবকের ডানহাতে ধরে রাখা ধারালো নাইফের পানে। যার স্বচ্ছ গায়ে আলো পড়তেই কেমন ঝলক দিয়ে উঠছে। রূঢ় মানব এতক্ষণে ক্রুর দৃষ্টে তাকাল মেয়েটার পানে। ঠোঁটের কোণে বক্র হাসি ঝুলিয়ে হাতে থাকা নাইফটা খানিক নাড়িয়ে চাড়িয়ে ভয়ানক শান্ত কন্ঠে শুধালো,
“ তুই আসবি? না-কি আমি আসবো?”
“ না না না! আমি আসছি, আমি আসছি।”
ভয়ে থরথর করে কাঁপছে মাহি! ক্ষুদ্র কদমে এগোচ্ছে সম্মুখে। তারছিঁড়া লোকটার কথা অমান্য করে সে থোড়াই অকালে প্রাণ দিবে। এদিকে মুগ্ধ তাকিয়ে আছে ঠায়! বোকা মানবী টেবিলের নিকট এসে দাঁড়াতেই যুবক এক হেঁচকা টানে সপ্তদশীকে তুলে এনে বসালো নিজ বা-উরুর ওপরে। তৎক্ষনাৎ জড়সড়ভাব ধরল মাহি। অস্বস্তিতে মোচড়াতে লাগল সাপের ন্যায়। অথচ তার এহেন অস্বস্তিকে আরেকটু বাড়াতে যুবক আলগোছে হাত রাখল মেয়েটার বাঁকান কোমরে। মাহি তক্ষুনি দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ হাত সরান!”
“ ফা’ক ইউ্য!”
মুগ্ধের বেখাপ্পা ভাবলেশহীন উত্তর! তা শুনে মুখ কুঁচকায় সপ্তদশী। ওদিকে ততক্ষণে দু’জন সার্ভেন্ট এসে নতমুখে খাবার সার্ভ করে দিচ্ছে রূঢ় মানবের পাতে। লোক দু’টোর হাতগুলো যা কাঁপছে না! মাহি আড়দৃষ্টে বেশ দেখল তা। মুগ্ধের সেদিকে খেয়াল নেই। সে কি সুন্দর মনোযোগী কায়দায় বেশ গুছিয়ে খাবার তুললো হাতে। অতঃপর ছোটখাটো একখানা লোকমা তুলে এগিয়ে ধরল মেয়েটার মুখের দিকে। মাহি মুখ খুলেনি। উল্টো দাঁত খিঁচে বসে আছে! গুরুগম্ভীর মাফিয়া বিস্ট গম্ভীর মুখেই শুধালেন,
“ হা কর!”
“ করব না!”
মেয়েটার চটপট উত্তর! পরপরই আবারও জোর করে বন্ধ করেছে মুখ। যুবক ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল। মেয়েটার মুখের দিকে খাবারটুকু ধরে রেখে গমগমে গলায় আওড়াল,
“ দুপুরে খাসনি সিগনোরা! আমার সাথে যত ইচ্ছে তেজ দেখা, বাট খাবারের সাথে মোটেও তেজ দেখাবি না। আই ডোন্ট লাইক দিস বুলশিট!”
কপাল কুঁচকায় মাহি। চোখদুটো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র করে নিয়ে আচমকা বলে ওঠে,
“ ইফ ইউ্য ডোন্ট লাইক দিস, দ্যান আই উড ডেফিনিটলি লাভ টু দিস।”
একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল মুগ্ধ। তার মুখাবয়বের অভিব্যক্তি বোঝা বড়ো দায়! বাদামী চোখদুটোর গভীরে কি যেন চলছে। মাহি সেদিকে তাকালও না একবার। যুবক খানিকক্ষণ সময় নিয়ে পরক্ষণেই রাশভারি কন্ঠে বলে ওঠে,
“ আমাকে জ্বালাতে নিজেকে জ্বালাস না সিগনোরা! ইট উইল হার্ট ইউ্য, এন্ড আই ওন্ট টোলারেট দ্যাট।”
“ তাই? আমি নিজেকে জ্বালাই, জ্বালাতে মে’রে ফেলি তাতে…..!”
ঠাসসসস!
আজ বহুদিন পর যুবকের শক্তপোক্ত হাতের রুক্ষ আঙুলগুলো ফের রূঢ়তার সঙ্গে ছাপ বসালো মানবীর নরম তুলতুলে গালে। যার আঘাতে গাল বেঁকে গেল বেচারির। মাথাটা ঘুরতে লাগল ভনভন করে। কানদুটোয় ঝি ঝি পোকারা বাসা বেঁধেছে। মাহি কেমন টলতে টলতে কোনমতে সামলালো নিজেকে। ইশশ! গালের চামড়াটা যেন এক্ষুণি খসে পড়বে। যা জ্বলা জ্বলছে না! ফেটে-টেটে গেল কি-না! সঙ্গে জুড়েছে চোয়ালের ব্যথা। সে আর বলতে! মেয়েটা তক্ষুনি গালের ওপর হাত ঠেকিয়ে ফুপিয়ে উঠল বেশ। ফোপাঁতে ফোপাঁতে নাক টানতেই আবারও সম্মুখে দেখল যুবক খাবার তুলে রেখেছে মুখের কাছে। সপ্তদশী এবার আর ঘাড়ত্যাড়ামি করল না। অতি ভদ্রতা বজায় রেখে হা করে আলগোছে মুখে তুললো খাবারটুকু। চাপার ব্যাথায় বহু কষ্টে চিবুচ্ছে মেয়েটা। তবুও টু শব্দ অব্দি করেনি সে। ওদিকে যুবকের চোয়াল হয়েছে শক্ত! অজানা কারণে ফুলেছে হাতসহ ঘাড়ের সব-কটা রগ। ফর্সা মুখশ্রী রাগের তোড়ে লাল হয়েছে বেশ! বাদামী চোখদুটোয় লেপ্টেছে আগুন। মাহি পরপর ঢোক গিলছে শুকনো। আবারও মা’র খেতে হয় কি-না কে জানে! মাহি তড়িঘড়ি করে মনোযোগ অন্যত্র ফেরালো। সম্মুখের টেবিলে সাজিয়ে রাখা একখানা এন্টিক মোমবাতি স্ট্যান্ডের পানে দৃষ্টি থমকাল তার। মুহুর্তেই গালের ব্যথা ভুলে বিমুগ্ধ হলো সপ্তদশীর হরিণী আখিঁদ্বয়। ওদিকে যুবক আরেকবার খাবার তুলেছে মেয়েটার মুখের কাছে। অথচ মাহি’র সেদিকে ধ্যান নেই! সে কেমন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মোমবাতি স্ট্যান্ডের পানে। তা দেখে যুবকের আগে থেকে রাগে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা মস্তিষ্কে বুঝি এক কৌটো ঘি ঢালল কেউ। সে কেমন শক্ত চোয়ালে কটমট করতে করতে তক্ষুনি এক খাবলায় টেবিল থেকে মোমবাতি স্ট্যান্ডটা তুলে এনে, আচানক ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। মুহুর্তেই বিকট শব্দে চুরমার হলো এন্টিক পিসটি। এহেন অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় মাহি! তড়িঘড়ি করে তাকাল সুদর্শনপর পানে। সন্দিগ্ধ গলায় বলেই বসল,
“ কি করলেন এটা?”
মুগ্ধ ক্ষুব্ধতায় হিসহিসিয়ে যাচ্ছে! চোয়াল ফুটছে বেশ! তার ক্ষুব্ধ দৃষ্টি চুরমার হয়ে পড়ে থাকা মোমবাতি স্ট্যান্ডের পানে। মানবীর কথা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই, মনের কোণে এক অবাধ্য হিংসের আগুন জ্বালিয়ে, সে প্রতিত্তোরে বলল,
“ তুই মুগ্ধ হয়ে ওকে দেখছিলি, আমার সহ্য হলো না।”
হতবাক মাহি! মুখাবয়বে ছেয়েছে এক আকাশসম অবোধ্য ছাপ। যুবকের ওমন উদ্ভট পাগলামো দেখে মেয়েটা খানিক বিজ্ঞ গলায় বলে ওঠে,
“ এটা একটা সামান্য মোমবাতি! এ পৃথিবীতে এমন অনেককিছুই আছে যা আমাদের মুগ্ধ করতে পারে। হোক তা কোনো বস্তু কিংবা মানুষ!”
সহসা ঘাড় বাকিয়ে তাকায় মুগ্ধ! চোখদুটো তীক্ষ্ণ করে হাসল সাইকোপ্যাথের ন্যায়। মাহির অন্তরাত্মা শুকিয়ে কাঠ হলো তা দেখে। রূঢ় মানব কেমন ঠোঁট কামড়ে বলতে লাগল,
“ তোর ঐ চোখদুটো আমি বাদে অন্য কারোর প্রতি মুগ্ধতা ছড়ানোর দুঃসাহস করেই দেখুক একবার, ট্রাস্ট মি সিগনোরা! আমি তেমন কিছুই করব না। জাস্ট ছেড়ে দিব!”
হতবিহ্বল মাহি! বোকার ন্যায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ সত্যি? সত্যিই ছেড়ে দিবেন?”
বাঁকা হাসল রূঢ় মানব। আবারও খাবার তুলে এগিয়ে দিলো মেয়েটার মুখের দিকে। ভারী অথচ অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল,
“ হুম ছেড়ে দিব। উ ত্ত প্ত সালফিউরিক এসিড ভর্তি ট্যাংকে দু’জনকে একসঙ্গে ছেড়ে দিব। কুল নাহ?”
দাঁত কিড়মিড় করে ওঠে মাহি! নরম চোয়ালখানা শক্ত করে ফুটিয়ে ঝাঁঝাল কন্ঠে বলে,
“ ব্লা’ডি সাইকো!”
স্রেফ ঠোঁট পিষে হাসল মুগ্ধ। ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে আওড়াল,
“ ইয়েস আ’ই এম!”
মাহি’র রাগ বাড়ছে তরতর করে। মুখের সামনে সুদর্শনের বাড়ন্ত হাত দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি মানবী। তক্ষুনি খাবার খাওয়ার বদলে ধারালো দাঁত দিয়ে আঁকড়ে ধরল মানবের রুক্ষ আঙুল। ক্রমশ দাঁতের জোর বাড়াচ্ছে মাহি! নিজের সর্বশক্তি দিয়ে কামড় দিচ্ছে মুগ্ধের আঙুলে। অথচ কান্ড দেখো! রূঢ় মানব নিরুত্তেজ। কোনরূপ প্রতিক্রিয়া ছাড়াই গভীর দৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে। মাহি আড়দৃষ্টে দেখল তা। পরক্ষণেই দাঁতের জোর বাড়াল দ্বিগুণ। প্রায় মিনিট পাঁচেকের এরূপ অত্যাচারে আচমকা সপ্তদশী স্বাদ পেলো ক্ষারীয় কিছুর। আর ওমনি হকচকিয়ে ওঠে সে। তড়িঘড়ি করে মুখগহ্বর থেকে যুবকের আঙুলগুলো বের করে এনে সম্মুখে তাক করতেই দেখে — আঙুলের রুক্ষ চামড়া ফেটে অবলীলায় লহু গড়াচ্ছে! নিজ কর্মে অপরাধীত্ব গ্রাস করল সপ্তদশীকে। রাগের জন্য এমন অন্ধ হলো কবে থেকে সে? মায়াবিনী আহত দৃষ্টে তাকাল যুবকের পানে। আর ওমনি স্থির হলো মাহি। যুবক নিষ্পলক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে তার পানে। তার মুখাবয়বে ব্যথার লেশমাত্রও নেই। মাহি কেমন আহত সুরে বলল,
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৭
“ হাতটা সরালেন না কেনো আপনি?”
“ তুই স্বেচ্ছায় ছুঁয়ে দিচ্ছিলি! তাই আর ডিস্টার্ব করিনি।”
