Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৯ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৯ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৯ (২)
jannatul firdaus mithila

“ কলিজায় খুব বেশি সাহস হয়ে গিয়েছে তোর তা-ই না? ঠিক আছে! ড্রয়ারে একটা স্লিভলেস রেড কালার নাইটি পড়ে আছে। গো এন্ড অর দ্যাট! আ’ম কামিং। নাচতে তো পারিস-ই, সো আজ সারারাত তোর নাচানাচি চলবে জাস্ট! তবে নাচটা নাচাবো আমি, তাও আবার আমার পছন্দের, আমার ওয়েতে। বান্দীর মেয়ে!”
এহেন শীতল অথচ হিং স্র হুমকির অভিঘাতে রমণীর সর্বাঙ্গ বেয়ে যেন শীতল শিহরণ নেমে গেল যেন। কাঁপা হাতে ত্বরিত ফোনটি নামিয়ে রাখল মাহি। বুক ধড়ফড় করছে তার। ভয়ার্ত চোখদুটো তক্ষুনি এদিক-ওদিক ছুটলো লুকনোর জায়গা খুঁজতে। ওদিকে, ফোনের ওপাশে থাকা রূঢ় মানবের অধরকোণে ফুটে উঠেছে এক চিলতে বাঁকা হাসির রেশ। হাতে ধরা ফোনটি কপালের সঙ্গে ঠেকিয়ে রেখেই কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ রইলো মুগ্ধ।

এরইমধ্যে নিস্তব্ধ কামরাটির দুয়ারদ্বারে সহসা দুয়েকবার টোকা পড়ল। রূঢ় মানব ভ্রুক্ষেপহীন সেদিকে। বসে রয়েছেন ঠায়! দরজার ওপাশ থেকে হিমাংশু রায় এতক্ষণে ভদ্রস্বরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তবে নিশ্চুপ মুগ্ধ! সুবিশাল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষটির একেবারে আদ্যপ্রান্তে বিছিয়ে রাখা প্রশস্ত একখানা ডেস্ক। সেই ডেস্কের পেছনের চেয়ারে বলিষ্ঠ দেহ এলিয়ে বসে আছে মুগ্ধ। দু’পা তুলে রেখেছে ডেস্কের গায়ে! বাঁ হাতের আঙুলের ফাঁকে জ্বলছে জ্বলন্ত সিগার। ফুঁকছে আপনমনে!
হিমাংশু রায় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আর সময় নষ্ট করলেন না। ত্বরিত দুয়ার ঠেলে সামান্য ত্রস্ত পদক্ষেপে কক্ষে প্রবেশ করতেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো রূঢ় মানবের গম্ভীর অথচ কণ্ঠ—
“দাঁড়ান!”

সহসাই থেমে গেলেন হিমাংশু রায়ের ব্যস্ত কদম। সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন মুগ্ধের দিকে। মুগ্ধ অবশ্য তাঁর এরূপ দৃষ্টির কোনো তোয়াক্কাই করল না। বরং ধীরস্থির ভঙ্গিতে ডেস্কের ওপর থেকে পা দু’খানি নামিয়ে আনল সে। ঠোঁটের কোণে সিগার চেপে নির্বিকার ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো পরক্ষণে। দু’হাত গুঁজল পকেটে! বলিষ্ঠ দেহে কেবল জড়িয়ে রাখা কালো রঙের একখানা শার্ট। বুকের সামনের প্রতিটি বোতাম কেমন হা করে খুলে রাখা। সে এগোলো! ধুপধাপ কদমের প্রতিটি শব্দে দাম্ভিকতার ছোঁয়া লেপ্টে এগোলো। কক্ষের ঠিক বাঁদিকে বিছিয়ে রাখা প্রশস্ত ডিভান! সেথায় পূর্বেই সাজিয়ে রাখা হয়েছে দাবার কোট। মুগ্ধ কেমন নির্বাক ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়ে, তার এক প্রান্তে বসল।
তা দেখে হিমাংশু রায়ের ঠোঁটের কোণে আচমকা ফুটে উঠল এক চিলতে বাঁকা হাসির রেশ। পুরোনো দিনের ক’টা স্মৃতিচারণ করার উদ্দেশ্যে ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন তিনি। চুপচাপ এসে বসলেন মুগ্ধের মুখোমুখি। দাবার ছকে এক-আধবার দৃষ্টি বুলিয়ে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললেন,

“ আমি কিন্তু আগের চাইতেও অনেকটা ভালো খেলতে শিখে গিয়েছি অধীর!”
ঠোঁট পিষে হাসলো মুগ্ধ! চাললো নিজের প্রথম চাল। তবে সে চাল ছিলো নিতান্তই বাচ্চামো চাল, তাও আবার হিমাংশু রায়ের ভাষ্যমতে। হিমাংশু রায় গালভরে হেসে চাল চেলে বলে ওঠেন,
“ এটা কি করলে? জেনে-বুঝে আমায় সুযোগ দিলে? অথচ তুমি চাইলেই আমায় আঁটকে ফেলতে পারতে।”
নির্বিকার মুগ্ধ! তীক্ষ্ণ কুটিল দৃষ্টি উঁচিয়ে তাকালো খেলায় মত্ত হিমাংশু রায়ের পানে। জমিদার কর্তা একপ্রকার নাচতে নাচতে গুটি চাললেন। মুগ্ধের প্রথম চালকে প্রতিহত করলেন অনায়াসে। পরক্ষণে বলে উঠলেন,
“ নাও এবার চালো।”
এবারে দক্ষ কৌশলীর ন্যায় আঙুল চালায় মুগ্ধ। হিমাংশু রায়ের সদ্য চালানো গুটিটার আশেপাশে থাকা আরও দুটো গুটি একসঙ্গে প্রতিহত করলো মাস্টার চালে। এহেন কান্ডে হতভম্ব হিমাংশু রায়। ত্বরিত দুচোখ ডলে তাকালেন কোটের দিকে। একি! তিনি যে ফেঁসে গেলেন। বেচারা ভুল চালের চিন্তায় অতিষ্ঠ, ঠিক তখনি সম্মুখ থেকে শোনা গেল মুগ্ধের গমগমে কন্ঠ!

“ শুনলাম! কাকে না-কি আজকে ছুঁয়েছেন।”
সহসা কপাল গোছায় হিমাংশু রায়। সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকায় মুগ্ধের পানে। জিজ্ঞেস করে,
“ মানে? কার কথা বলছো?”
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়া মুহুর্তেই সম্মুখে তাক করল মুগ্ধ। মুখাবয়বে সে-ই চিরচেনা ভয়ানক ভঙ্গিমা টেনে শুধালো,
“ জানেন না?”
শুষ্ক ঢোক গিললো হিমাংশু রায়। কম্পিত কণ্ঠে কোনমতে আওড়াল,
“ ইয়ে মানে……”

“আসতে পারি?”
দুয়ারপ্রান্ত থেকে ভেসে আসা রিনরিনে নারীকণ্ঠের মায়াবী ধ্বনিতে মুহূর্তেই রূঢ় মানবের হুমকির চিন্তার গভীর ঘোর ভেঙে ছিটকে বেরিয়ে এলো মাহি। ধীরেসুস্থে ঘাড় ঘুরিয়ে দৃষ্টি মেললো দরজার পানে। দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে নিরু। মুখাবয়বে গাম্ভীর্যের প্রগাঢ় ছাপ। দু-হাত বুকের কাছে আলগোছে জড়ানো তাঁর। পরনে বাদামি রঙের চুরিদার, গলার চারপাশে পেঁচানো ওড়নার একপ্রান্ত বাতাসের মৃদু ঝাপটায় দুলছে যেন। কোমর পেরিয়ে হাঁটু ছুঁইছুঁই করা ঘন কেশগুচ্ছ বাতাসের তালে দুলে উঠছে বারংবার।রমণীর কাজলকালো চোখদুটি, যেন এক গভীর খাঁদ!
অষ্টাদশীর এহেন ভুবনমোহিনী রূপে একপ্রকার বিমুগ্ধ মাহি। বিস্ময়ের ঘোরে বেভুলের ন্যায় তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। অথচ যার অনুমতির অপেক্ষায় নিরু এখনো দুয়ারপ্রান্তে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে, তার দিকে তাকিয়ে থাকার এই অনুচিত বেখেয়ালিপনা ঠিক কতক্ষণ স্থায়ী হলো, তার হিসেবটুকু বোধগম্য হলো না মাহি’র। তা দেখে কিছুটা ইতস্ততায় জড়ালো নিরু। সপ্তদশীর ধ্যান ভাঙাতে দিয়ে উঠল মৃদু গলা খাঁকারি। নিরবতার দেয়াল চিঁড়ে ভেসে আসা এহেন হুটহাট প্রতিশব্দে চমকে উঠল মাহি। সম্বিত ফিরতেই নিজের অমন অন্যমনস্কতায় অন্তঃকোণে খানিকটা লজ্জাবোধ হলো তাঁর। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে মুখাবয়বে কপট গাম্ভীর্য টেনে এনে বলল,

“আসুন।”
অনুমতি মিলতেই নিরুর তুলতুলে কদমজোড়া ধীর পায়ে অগ্রসর হলো। নীরবে কয়েক পা এগিয়ে এসে থামলো মাহি’র একদম সম্মুখে। দৃষ্টিতে একরাশ দৃঢ়তা মিশিয়ে, নিরেট অথচ স্থির কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,
“অধীর দা’র সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক?”
অসময়ে উত্থাপিত ওমন উদ্ভট প্রশ্নটি কানে যেতেই মাহি’র কপালের চামড়ায় ফুটে উঠল ক’টা সূক্ষ্ম ভাঁজ। তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল দৃষ্টিযুগল। বুকের কাছে দু-হাত জড়িয়ে গমগমে কণ্ঠে প্রত্যুত্তর করলো,
“তা জেনে আপনি কী করবেন?”
তৎক্ষনাৎ নিরুর মুখাবয়বে গাম্ভীর্য যেন আরও গাঢ় হলো। কণ্ঠে ফুটে উঠল ভারী দৃঢ়তা!
“আপনার সঙ্গে কোনো রকম বাকবিতণ্ডায় জড়াতে আসিনি আমি। এসেছি কেবল দুটো প্রশ্নের উত্তর জানতে।”
সপ্তদশীর কপালের ভাঁজ আরও গভীর হলো এপর্যায়ে। সন্দিগ্ধতায় কুঁচকে গেল দু-চোখ। কিছুক্ষণ নিরুর মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর স্বরে বলল,
“প্রথম প্রশ্নটা যেহেতু করেই ফেলেছেন, তাহলে অপরটাও করে ফেলুন। জবাব দেওয়ার মতো হলে দুটো প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গেই নাহয় দিয়ে দেব।”

কথাটি শুনে একমুহূর্ত স্থির হয়ে রইল নিরু। কয়েক মুহূর্ত নিষ্পলক দৃষ্টিতে পরখ করল মাহি’কে। তারপর কোনো কথা না বলে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সম্মুখে। মাহি’কে পাশ কাটিয়ে একহাত দূরত্বে গিয়ে থামল অষ্টাদশী। বিপরীত দিকে মুখ ফিরিয়ে, কণ্ঠে অটুট দৃঢ়তা মিশিয়ে উচ্চারণ করল,
“অধীর দা লোকমুখে ‘মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার’ নামে পরিচিত। একইসঙ্গে তিনি রাশিয়ার রুশদী কিং। সেদিক থেকে তাঁর ব্যক্তিত্বে নির্দয়তা থাকাটা বড্ড স্বাভাবিক। কিন্তু এই স্বাভাবিক বিষয়টা নিয়ে আপনার এত মাথাব্যথা কেনো?”
থামলো নিরু! চোখদুটোতে বিশাল বিরক্তির ছাপ ফুটিয়ে ঘাড় বাঁকায় সামান্য। ক্রমশ ভারী হয়ে উঠা কন্ঠে ফের শুধালো,

“কেনো আজ দুপুরে আপনি বারবার তাঁর নির্দয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছিলেন? কেনো আমার বাবাকে উত্তেজিত করে তুলেছিলেন, আপনার একের পর এক উদ্ভট প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য? কেনো, কেনো, কেনো? কী সম্পর্ক আপনার অধীর দা’র সঙ্গে? কেনো তাঁকে নিয়ে জানতে আপনার এত কৌতূহল?”
নিস্তব্ধ ঘরের পরিবেশে আচানক পরিবর্তন নামলো। এক গুমোট আবহে আটঁকা পড়লো বিপরীতমুখী দুই রমণী। অদ্ভুত হলেও সত্য — দুজনার কণ্ঠে এমুহূর্তে প্রতিধ্বনিত মানুষটা একজনই! যাকে ঘিরে একের পর এক প্রশ্ন ক্রমশ হানা দিচ্ছে দু’জনার মস্তিষ্কে।
এদিকে, রাগে-দুঃখে কাঁপছে নিরুর সর্বাঙ্গ! চোখদুটো হয়েছে ছলছল। বিপরীতমুখী রমণী এতক্ষণে মুখ খুললো। ভারী তিরিক্ষি কন্ঠে আওড়াল,

“ যার সঙ্গে একই ছাঁদের নিচে থাকছি, তাকে নিয়ে কৌতুহল থাকবে না তো, কাকে নিয়ে থাকবে? তাছাড়া আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন, অধীর রায় ‘ মাফিয়া শ্যাডো মনস্টার ’ হবার পূর্বে সে একজন মানুষ! তিনি মায়ের পেট থেকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্দয় হয়ে উঠেনি, তাকে নির্দয় বানানো হয়েছে। আপনার বাবা বানিয়েছে তাকে এমন একজন মানুষরূপী মনস্টার!”
সহসা শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়ায় নিরু। হতবাক কন্ঠে বলে ওঠে,
“ আপনি জানেন আপনি কি বলছেন? কতটুকু জেনে-বুঝে তারপর কথাটা বলছেন আপনি? অধীর দা’কে মানুষরূপী মনস্টার বানানোর পেছনে আমার বাবা নয়, বরং দায়ী ছিলো অন্য কেউ! আমার বাবা কেবল দীক্ষিত করেছে অধীর দা’কে। কিন্তু….”
কথার পথিমধ্যে শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে হেসে ওঠে সপ্তদশী! ত্রস্ত ঘুরে তাকায় নিরুর পানে। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের ছাপ ফুটিয়ে আওড়ায়,

“ বাবার মেয়ে বলে কথা! বাবার হয়ে সাফাই গাইবেন এটাই স্বাভাবিক।”
মুহুর্তেই মুখাবয়বে ঝাঁঝ লেপ্টে গেল নিরুর। চোয়াল তুললো কটমট শব্দ। রাগান্বিত মানবী কি করতে কি করবে, তাই যেন ভাবছে দাঁড়িয়ে। মুহুর্তব্যয়ে কি ভাবলো কে জানে! পরক্ষণে কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই আলগোছে চেপে ধরল মাহি’র নরম কব্জিসন্ধি। এহেন অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় মাহি! হতচকিত কন্ঠে কিছু বলতেই যাবে, তার পূর্বেই টান পড়ল হাতে। ব্যস্ত নিরু মাহি’র কব্জিসন্ধি আঁকড়ে ধরে এগোচ্ছে দরজার দিকে। মাহি মোচড়াচ্ছে হাত! ছাড়াতে চাইছে নিজ নরম তুলতুলে কব্জিসন্ধি। অথচ গম্ভীর নিরু কোনরূপ উদ্বেগ দেখালো না সেদিকে। সে হাঁটছে! একপ্রকার জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে মাহি’কে।

আধো আলোয় বিভোর বৃহৎ কাছারীঘর! যার চারদিক হতে ভেসে আসছে মাটির স্যাতস্যাতে গন্ধ। লালচে সুরকীর ক্ষয়প্রাপ্ত মেঝেতে বিছিয়ে রাখা মস্তবড় শীতল পাটি। সেথায় আয়েশ করে দু’পা একত্রে ছড়িয়ে রেখে বসে আছেন এক পৌঢ়া। গায়ে তার মাং স নেই এক ছটাক! যেদিকটায় চোখ যাবে, সেদিকটায় দেখা মিলবে কেবল হাড়গোড়। দূর্বল চোখদুটোয় ছানি পড়েছে পৌঢ়ার। ফলে দিন অথবা রাতে খুব একটা পার্থক্য করতে পারেন না তিনি।
নিরুর ব্যস্ত দু’টো কদম কাছারিঘরের সম্মুখে অগ্রসর। তার পিছুপিছু ছুটছে বারকয়েক হোঁচট খেতে গিয়েও কোনরকমে বেঁচে যাওয়া, মাহি’র নরম তুলতুলে পাদু’টো। বেচারি শঙ্কিত বিজড়িত কন্ঠে বারংবার আওড়াচ্ছে,
“ কোথায় নিয়ে এলেন আমায়? হাত ছাড়ুন বলছি।”

শুনলো না নিরু। বরং হেঁটেই চললো সম্মুখে। খানিকবাদে একহাতে কাছারিঘরের কাঠের দুয়ার ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল সে। পিছুপিছু টানলো মাহি’কেও। বোকা সপ্তদশী ভেতরে কদম রেখেই বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে নিলো তৎক্ষনাৎ। আনমনে আধো আলোয় এদিক-ওদিক দৃষ্টি বুলাতে গিয়ে চোখদুটো আচমকা আঁটকে গেল তাঁর। অদূরের অদ্ভুত দেখতে পৌঢ়াকে অবলোকন করা মাত্রই ভয়ে কেঁপে ওঠে বেচারি। ভয় বিজড়িত কন্ঠে চিৎকার করতেই যাবে, ওমনি সম্মুখ থেকে ধেয়ে এলো নিরুর মোলায়েম হাত! মুহুর্তেই চেপে ধরল মাহি’র মুখ। এহেন কান্ডে যারপরনাই হতবাক মাহি। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে নিরুর পানে তাকাতেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো নিরুর চাপা স্বর!
“ হুঁশ! টুঁ-শব্দটিও করো না। শুধু চুপচাপ শুনে যাও সবকিছু।”
বোধগম্যহীনের চেয়ে রইল মাহি। মুহুর্ত খানেক পার হতেই অদূরে বসে থাকা বৃদ্ধা কেমন কম্পিত কণ্ঠে শুধালো,

“ কে? কে?”
সহসা জড়সড়ভাব ধরে নিরু। আলগোছে ছেড়ে দিলো মাহি’র মুখ। ধীরপায়ে এগিয়ে গেল পৌঢ়ার সন্নিকটে। রয়েসয়ে নিজ তুলতুলে হাতদুটো দিয়ে আলতো করে চেপে ধরল পৌঢ়ার কঙ্কালপ্রায় হাত খানা। ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসির রেশ টেনে শুধালো,
“ আমি ঠাকুমা! নিরুপমা।”
মুহুর্তেই পৌঢ়ার চোখেমুখে লেপ্টে গেল এক আকাশসম খুশির রেশ। দূর্বল কম্পিত কণ্ঠে কোনমতে আওড়াল,
“ এতগুলা দিন পর? কি মনে কইরা?”
রমণী এবার চোখ তুলে তাকালো অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মাহি’র পানে। চোখের ইশারায় বোঝালো কাছে এসে বসতে! অথচ বোকা মানবীর কি হলো কে জানে। সে কেমন শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইলো ঠায়। এহেন কান্ডে ফোঁস করে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো নিরু। খানিকবাদে মেয়েটার ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনে পৌঢ়াকে জিজ্ঞেস করল,
“ আমাকে ঐ ঘটনাগুলো আরেকবার বলবে ঠাকুমা? ভীষণ ইচ্ছে করছে শুনতে।”
কথাটা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই সর্বাঙ্গ ঝাঁকিয়ে উঠে পৌঢ়ার। নড়ে ওঠে তার কালসিটে অধরযুগল। মাথাটা দু’ধারে নাড়িয়ে ‘ না ’ বোঝাতেই নিরু কেমন গো ধরলো। একপ্রকার নাছোড়বান্দার ন্যায় বলে উঠল,
“ বলো না ঠাকুমা। প্লিজ বলো!”
মেয়েটার এহেন নাছোড়বান্দা স্বভাবে বরাবরই হার মানেন পৌঢ়া। আজও হলো তাই! তিনি কিয়তক্ষন চুপ থেকে বলতে শুরু করলেন। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মাহিও শুনতে লাগলো মনোযোগ দিয়ে!
“ ২৪ বছর আগের কথা! আমি তহন এই জমিদার বাড়িত কাইম-কাইজ করি। শ্যামা যহন মা-রা গেলো তহন….
★ অতীত ★

শ্মশানজুড়ে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। চারপাশের বাতাসে ধূপ-ধুনোর গন্ধের সঙ্গে চন্দনকাঠ আর দাহমান কাঠের ধোঁয়া মিলেমিশে একাকার যেন। একপাশে দর্শক পুরুষ লোকেরা দাঁড়িয়ে আছে, করছে কানাঘুঁষা! কেউ কেউ শেষকৃত্যের আয়োজনে ব্যস্ত! পুরোহিত মশাই মন্ত্রোচ্চারণ করছেন। খানিকটা দূরে, আড়ালে কয়েকজন নারী অশ্রুসিক্ত নয়নে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ভীড়ের সম্মুখে আঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদছেন ইন্দুমতী! জমিদার বাড়ির গৃহকর্মী। তার একহাতের বাঁধনে ঝাপটে ধরে রাখা ছ’বছরের একটি নাদুসনুদুস বাচ্চা। বাচ্চাটা কাঁদছে! বারংবার বলে যাচ্ছে,
“ ছাড়ো আমায় দিদা। আমি আমার আম্মার কাছে যাবো।”
ইন্দুমতী ছাড়লেন না। উল্টো কাঁদতে লাগলেন অঝোরে। ভাঙা গলায় একটুখানি বললেন,
“ অধীর দাভাই! আমনের আম্মা নাই আর। আমনের আম্মা নাই।”
শুনলো না বাচ্চা অধীর! ঐটুকুন নাদুসনুদুস গায়ের অসামান্য জোরে বারংবার ছুটে পালাতে চাইছে মধ্যবয়সীর হাত থেকে। এরইমধ্যে শ্মশানঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোহিত মশাই আওয়াজ তুললেন। গমগমে গলায় উচ্চারণ করলেন,
“ শবদেহ চিতায় চড়াও।”

আদেশ পাওয়া মাত্রই পাশে থাকা নিচু খাঁটিয়ার সম্মুখে ছুটলেন চারজন পুরুষ। ধীরলয়ে মৃ তদে হটিকে শ্মশানের সাজানো কাঠের চিতার ওপর তুলে শুইয়ে দিলেন তারা। আলগোছে মুখ হতে সরিয়ে দিলেন কাপড়টুকু! ওমনি ভীড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট অধীরের স্তম্ভিত চোখদুটো সহসা আঁটকে গেল মায়ের ফ্যাকাশে মুখপানে। মুহুর্তেই কান্না ভুলে বেভুলার ন্যায় তাকিয়ে রইলো বাচ্চাটা। তার চোখের সামনেই কেউ একজন আগুন নিয়ে এগিয়ে গেল মায়ের শবদেহের সম্মুখে। কেউ একজন বোধহয় ভীড় হতে বলে উঠল,
“ আরে আরে! কি করছিস হাবা? মুখাগ্নি তো ছেলে দেবে। তুই দিচ্ছিস কেনো লা?”
আগুন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চ্যাংড়া ছোকড়াটা কথাটা শোনামাত্রই মুখভর্তি করে থুতু ফেললো সম্মুখে। অত্যন্ত বিতৃষ্ণা ভরা কন্ঠে বলে উঠল,

“ খু নি র হাতে মুখাগ্নি? তাহলে তো নরকেও ঠাঁই হবে না এর।”
সহসা চুপ করে গেলেন ভীড়ের একপাশ। চ্যাংড়া ছোকড়াটা থোড়াই আর ধার ধরলো কারো! সে কেমন বিরক্ত মুখে দু’হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে থেকেই শবদেহের গায়ে একপ্রকার ছুঁড়ে ফেলল আগুনটুকু। মুহুর্তেই দাউদাউ করে উঠল চিতার চারপাশ। জ্বলতে লাগল অপ্সরার নি থ র দেহ! তা দেখে বুক কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে অধীর। নাদুসনুদুস দেহটা এবার অসামান্য জোরে সকল বাঁধন ছিন্ন করে ছুটলো মায়ের জ্বলন্ত চি তা র পানে। ইন্দুমতী ভড়কালেন। অধীরের পিছুপিছু ছুটতে গেলেই পেছন থেকে কেউ একজন টেনে ধরলেন তার হাত। শোনালেন সর্তক বার্তা! ওদিকে অধীর ততক্ষণে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এসেছে বড্ড কাছে। বোধহীনের ন্যায় বাচ্চা ছেলেটা মায়ের জ্বলন্ত চি তা য় ঝাপ দিতে গেলেই পাশ থেকে পুরোহিত মশাই টেনে ধরেন তার হাত। তবুও অধীর বাঁধহীন! মাকে ওমন জ্বলতে দেখে কাতরাতে কাতরাতে আওড়ায়,

“ আম্মা! আম্মা আমায় সাথে নেও আম্মা। আম্মা, আমিও যাবো আম্মা। আম্মা!”
সম্পূর্ণ শ্মশান যেন একমুহূর্তের জন্য থমকে গেল এহেন দৃশ্যে। কেউ কেউ বাচ্চা ছেলেটার দিকে তাকাচ্ছে এক আকাশসম ঘৃণার দৃষ্টে, তো আবার কেউ কেউ তাকাচ্ছে অদ্ভুত এক মায়ায়। কিয়তক্ষন পার হতে না হতেই শ্মশানের ভীড় ঠেলে এগিয়ে এলেন কিছু নাম না জানা পুরোহিত! তাদের চোখেমুখে সে-কি উপচে পড়া রাগ। চোয়ালের পেশি বড্ড শক্ত। তারা এসেই কেমন গর্জন তুললেন রাগে,
“ হায় হায়! ওর মতো বে’শ্যা নাচঁনেওয়ালির অপবিত্র দেহটা এখানে পোড়াচ্ছে কারা? কার অনুমতি নিয়ে পো**ড়ানো হচ্ছে ওকে?”
তক্ষুনি ঘাবড়ে ওঠেন সকলে। অধীর স্তব্ধ হলো এরূপ হুংকারে। শেষকৃত্যের কাজে নিয়োজিত পুরোহিত মশাই খানিক দোনোমোনো করে এগিয়ে এলেন সম্মুখে। নতমুখে আওড়ালেন,

“ আসলে…”
“ চুপ! একদম চুপ! হয় এই বে *** শ্যাকে এখান থেকে তুলবি, নয়তো আজকের পর থেকে এই গ্রামের কারোর শেষকৃত্যে আমরা উপস্থিত থাকবো না। এবার সিদ্ধান্ত তোদের! তোরা ভেবে দেখ তোরা কি করবি।”
মুহুর্তেই আঁতকে ওঠেন ধর্মপ্রাণ সকলে। একযোগে নিক্ষিপ্ত করলেন বেশ ক’টা ভীতবাক্য! কেউ কেউ সুযোগ পেয়ে আওড়ালেন,
“ ইশশ্! এ কেমন অলক্ষুনে কান্ড লা! এই কালমুখীর জন্য আমাদের ভোগ করতে হবে এখন? এই, এই! কে কোথায় আছিস? কলসি ভরে পানি ল। এই কালমুখী, কলঙ্কিনীরে উঠা! ছিহঃ ছিহঃ অপবিত্র করে দিলো শ্মশানটা।”
শ্মশান ভীড়ের মাঝে দাড়িয়ে থাকা ছোটো বাচ্চাটা কেমন অবোধের ন্যায় শুনে যাচ্ছে সকলের কটুবাক্য! ইতোমধ্যেই কয়েকজন ছুটেছে শ্মশানঘাট সংলগ্ন পুকুরধারে। কলসি ভর্তি করে পানি তুলছে তারা। ছোট্ট অধীর কি বুঝলো কে জানে! তক্ষুনি ঝড়ের বেগে ছুটে গিয়ে আছড়ে পড়ল পুরোহিতদের পায়ের কাছে। নরম তুলতুলে হাতদুটো দিয়ে তাদের পাদু’টো আঁকড়ে ধরতে চাইলেই সম্মুখ থেকে অতর্কিত লাথির আক্রমণ বসলো বেচারার বুক বরাবর! মুহুর্তেই একহাত দুরত্বে ছিটকে পড়ল অধীর। বুকের ব্যথায় মুখ কুঁচকে এলেও বাচ্চা ছেলেটা পরপরই কাশতে কাশতে শুধালো,
“ আমার আম্মা! আমার আম্মাকে আর কষ্ট দেবেন না। উনি…উনি নির্দোষ। আমার আম্মা খারাপ না। আমি খারাপ না। আমি… আমি মা’রিনি আমার মা’কে! বিশ্বাস করুন। আমি না, আমার মা’কে ওরা…. ”

কথাটা শেষ করবার ফুরসত পেলো না অধীর। তার আগেই একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে আচমকা খামচে ধরল বাচ্চাটার ঘাড়ের নরম মাং সল ত্বক! তৎক্ষনাৎ গগনবিদারী চিৎকারে ফেটে পড়ল ছোট্ট ছেলেটা। তার ঘাড়ের ত্বকে নখ দাবাচ্ছে কেউ! ঘাড়ের তুলতুলে হাড়টা বোধহয় এক্ষুণি ভেঙে দিবে তারা। অসহায় অধীর চোখ উল্টে তাকালো পেছনে। ওমনি মুখের ওপর ঝুঁকে থাকতে দেখল অপরিচিত পুলিশ কর্মকর্তাকে। দাঁত খিঁচে আওড়ালেন তিনি!
“ কি বললি তুই? তুই তোর মা’কে মা’রিস নি? তাহলে কে মে’রেছে তোর বে* শ্যা মা’কে? কে মেরেছে বল?”
উত্তর করতে পারলোনা অধীর! ঘাড়ের ব্যথা ক্রমশ বাড়ছে তার। আমতা আমতা স্বরে যেই না কিছু আওড়াবে, ওমনি পুলিশ কর্মকর্তার পেছন থেকে ধেয়ে এলো ক্ষনিকের পরিচিত এক কন্ঠস্বর!
“ মিস্টার চ্যাটাজ্জী? কি করছেন আপনি?”

সহসা অধীরের ঘাড় ছেড়ে দিলেন চ্যাটাজ্জী বাবু। শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়ালেন পরক্ষণে। চার হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে আছেন বাংলাদেশী ভারপ্রাপ্ত পুলি কর্মকর্তা — তায়েফ এহসান! জৌলুশ ভরা মুখে, দীপ্তিবহুল চাহনি তার। তিনি গম্ভীর মুখে সেথায় দাঁড়িয়ে থাকতেই ছোট্ট অধীর একপ্রকার হামাগুড়ি দিয়ে ছুটলো সেথায়। একহাত তাঁর তখনো চেপে রেখেছে বুক! কাদঁতে কাদঁতে এগিয়ে এসে তুলতুলে হাতদুটো দিয়ে ইস্পাত-দৃঢ় মানবের পা স্পর্শ করতেই কদম পেছালেন তায়েফ এহসান। ছোট্ট অধীর এপর্যায়ে মুখ তুললো। অশ্রুসিক্ত চোখদুটো একত্রে তাক করল গম্ভীর মুখো তায়েফ এহসানের দিকে। কন্ঠে একরাশ অসহায়ত্ব ঢেলে আওড়াল,
“ কি করলেন আঙ্কেল? কেনো করলেন? আপনি তো জানতেন আমার আম্মা নির্দোষ! আপনি বলেছিলেন আমার আম্মার কিচ্ছু হবে না। আপনি ছিলেন সেখানে। আপনি ছিলেন ঐ ঘরে! আঙ্কেল… আঙ্কেল, কি করেছেন আপনারা আমার আম্মার সাথে? আমি দেখেছি আপনারা সবাই আমার আম্মার ওপরে ছিলেন। আমি দেখেছি, আপনি আমার আম্মার বুকে গু…..”

তক্ষুনি ঝড়ের বেগে তায়েফ এহসানের শক্ত হাতের জোরালো থাবা এসে আক্রমণ বসালো অধীরের নরম চোয়ালে। মুহুর্তেই আঁতকে উঠে অধীর! চোয়ালের ব্যথায় ডুকরে উঠতেই কর্নধার হলো তায়েফ এহসানের কটমট কন্ঠ!
“ তুই মে’রেছিস তোর মা’কে!”
বিস্ময়ে চোখদুটো গোল গোল হয়ে গেল অধীরের। ছলছলে কার্নিশ বেয়ে টুপ করে গড়িয়ে পড়লো একফোঁটা নোনাজল! তা বোধহয় নরম করতে সক্ষম হলো না তায়েফ এহসান নামক রূঢ় মানবকে। তিনি বরং ঝাঁঝিয়ে বললেন,
“ কিচ্ছু দেখিসনি তুই। মনে থাকবে? কিচ্ছু দেখিসনি। খু নের দায়ে তোকে যখন কোর্টে তোলা হবে, তখন বলবি — তোর মায়ের চরিত্র ভালো ছিলো না। অনেকের সঙ্গে অগাধ মেলামেশা ছিলো। তাই তুই এসব সহ্য করতে না পেরে তোর মা’কে মে’রে দিয়েছিস। তুই বাচ্চা মানুষ। তুই এসব স্বেচ্ছায় স্বীকার করে নিলে তোর শাস্তি খুব বেশিদিনের হবে না।”
ছোট্ট হৃদয়টা একপ্রকার মুষড়ে গেল অধীরের। দেহের ব্যথা যেন বেমালুম ভুলে গেল বাচ্চাটা। সম্মুখের লোকটার পৈ শা চি ক রূপখানা গেঁথে গেল তার অন্তরে। সে কেমন অনুভুতিশূন্য নেত্রে তাকিয়ে রইলো কিয়তক্ষন। তন্মধ্যে পেছন থেকে শোনা গেল স্থানীয়দের হইচই! তায়েফ এহসান সুযোগ বুঝে ছেড়ে দিলেন অধীরের চোয়াল। মেরুদণ্ড সোজা করে বাচ্চাটাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো বোধহয় খানিক, ওমনি পেছন থেকে ছোট্ট অধীর গমগমে গলায় ডাকলো,

“ তায়েফ এহসান!”
থমকে দাঁড়ালো তায়েফ এহসান। বলিষ্ঠ ঘাড়খানি সামান্য বাঁকিয়ে পেছনে ফিরতেই অধীরের ছোঁড়া একখানা ইট এসে সজোরে আঘাত হানলো তার কপালে। মুহূর্তেই চিরে গেল কপালের চামড়া, ক্ষতস্থান বেয়ে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এলো উষ্ণ র ক্ত। আহত কপালটি এক হাতে চেপে ধরল তায়েফ এহসান। তাঁর আঙুলের ফাঁক গলিয়ে টুপটুপ করে ঝরতে লাগল র ক্তে র ধারা। ব্যথায় তক্ষুনি কুঁচকে নিলেন মুখ। ধীরলয়ে সম্মুখে তাকাতেই দেখলেন — ছোট্ট অধীর দাঁড়িয়ে আছে সটানভাবে। দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ তার। গোলগাল মুখশ্রীর চোয়াল শক্ত! ত্বরিত ছুড়ঁল শান্ত অথচ নিরেট কিছু বাক্যবান,
“ আজকের দিনটা মনে রাখবেন তায়েফ এহসান। আপনার সাথে আবারও দেখা হবে আমার। কথা দিচ্ছি, আবারও দেখা করব আমি।”
বলেই হুট করে বাঁকা হাসলো অধীর। তায়েফ এহসান কেবল নিরব হয়ে দেখে গেলেন ছেলেটাকে। এরইমধ্যে শ্মশানের চারপাশ থেকে একযোগে ছিটানো হলো পানির ঝাপটা। অধীর থমকায় এবার। সন্ধানী চোখে অদূরে তাকাতেই বুক কেঁপে ওঠে তার। ঐ যে! চোখের সামনে তোলা হচ্ছে আধপুড়োঁ মায়ের লা’শ। দেহখানার অস্তিত্বের ঠিক নেই আর। কাপড়ের পরিশিষ্টাংশ ঝলসে গিয়েছে বহু আগে। নগ্ন খ সে পড়া শরীরের প্রতিটি অংশ উম্মুক্ত। ইশশ্! সে-কি বিভৎস দৃশ্য। বাচ্চাটা বুঝি ভয়ে জ্ঞান হারাবে হারাবে ভাব। তবুও সে নিজেকে সামলালো। চিৎকার দিয়ে ওঠে বলল,
“ আম্মা! আমার আম্মারে ঢাকো। ঢাকো আমার আম্মাকে।”

শুনলো না কেউ! ধার ধরলো না বিবস্ত্র শবের। পুরুষ মানুষ এগিয়ে এসে যাচ্ছেতাই ভাবে ধরলো ন গ্ন অপ্সরাকে। সে দৃশ্য আর সইতে পারলোনা অধীর। তক্ষুনি ছুটলো সেদিকে। তবে পথিমধ্যে ফের একখানা শক্তপোক্ত পা এসে আচমকা লাথি বসালো বাচ্চাটার বুক বরাবর। এরূপ অতর্কিত আক্রমণের প্রবাহে সহসা ভীড় ঠেলে পেছনে ছিটকে পড়ল অধীর। দু’হাতে চাপড়ে ধরল বুক। বুকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যথায় ছটফটাচ্ছে নিষ্পাপ শিশু। এবার তার মুখগহ্বর থেকে অঝোরে ঝরতে লাগল লহু! সে কাশছে ভীষণ!
সম্মুখের নির্দয় মানব তখন গটগটিয়ে এগিয়ে এসে আচমকা পা তুললো নাদুসনুদুস বাচ্চাটার গায়ে। নিজের ব্যুট জুতোর মোটা পাটাতনে বাচ্চাটার পেট বরাবর পিষতে পিষতে কটমটিয়ে বলে,

“ বে’শ্যার ছেলে আর কতটুকু ভালো হবে? মা নিজেরটা বেচে খেয়েছে, ছেলেও বড় হয়ে তাই করবে। শত হলেও কলকাতার বিখ্যাত নাচনেওয়ালীর ছেলে বলে কথা! তোর মা’কে একনজর দেখার জন্য পুরো কলকাতা মুখিয়ে থাকতো জানিস? আজ নাহয় তারা মনভরে তোর মা’কে দেখুক। হোক না সে বি বস্ত্র! তাতে কী? সুন্দরী তো!”
কাতরাচ্ছে অধীর! নিঃশ্বাস আঁটকে যাবার যোগাড় তাঁর। তন্মধ্যে সম্মুখের নির্দয় কলকাতার ডিসি সাহেব, ফের জোরালো লাথি বসালেন ছেলেটার তলপেটে। মুহুর্তেই এক বিকট চিৎকারে জ্ঞান হারাবে হারাবে দশা হলো অধীরের। চোখদুটো বুঁজে আসতে চাইলো তার। তবে শেষবার তার ছলছলে চোখদুটো কেবল দেখে গেল — একহাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরসম মানব, তায়েফ এহসানকে!

★ বর্তমান ★
মলিন আঁচলের তলায় সিক্ত চোখদুটো মুছে যাচ্ছেন পৌঢ়া ইন্দুমতী। যতবার অতীতের ঘটনাগুলো মনে করেন ঠিক ততবার নিজেকে সামলাতে বেগ পোহাতে হয় তার। সম্মুখে বসে থাকা নিরু কাঁদছে! কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলছে বেশ। এরইমধ্যে দুয়ারপ্রান্ত হতে ভেসে এলো, কারো ধপ করে জমিনে বসে পড়ার শব্দ! মুহুর্তেই আঁতকে ওঠেন পৌঢ়া। হকচকায় নিরুও। ত্বরিত সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে ঘাড় বাকিয়ে তাকাতেই দেখল — মাহি কেমন বিধ্বস্তের ন্যায় বসে পড়েছে জমিনে। কাঁপছে তার ক্ষুদ্র বদন। ভড়কায় নিরু! সহসা ছুটে এসে দু’হাতে আগলে নেয় কম্পিত রমণীকে। ধীর কন্ঠে শুধায়,

“ কি হয়েছে আপনার?”
মাহি কাঁপছে কেবল! ঠোঁটের ডগা বাকশূন্য তার। নিরু বোধহীনের ন্যায় চেয়ে আছে কেবল। দু’হাতে ধরে রাখা সপ্তদশীর ক্ষুদ্র বদন সামান্য ঝাঁকিয়ে ফের বলে,
“ আপনি ঠিক আছেন? কাঁপছেন কেনো এভাবে? শুনবেন না বাকি কথা?”
ত্বরিত দু’ধারে মাথা নাড়ায় মাহি। ভয়ার্ত কন্ঠে অস্ফুটে আওড়ায়,
“ নাহ! আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে। আমি আর শুনতে পারবো না!”
এবারে চোখদুটো কুঁচকে নেয় নিরু। আত্মসম্মানে নিগূঢ় থেকে, শক্তমুখে বলে ওঠে,
“ কেনো শুনবেন না? আপনি তখন বলেছিলেন না, আমার বাবা এসবের জন্য দায়ী? অথচ আমার বাবা না থাকলে অধীর দা আজ বেঁচে থাকতো না। অধীর রায়ের রাক্ষস হবার পেছনে একমাত্র দায়ী ঐ জা*নোয়ার লোকগুলো। যার মধ্যে সবার প্রথমে নাম আসে — তায়েফ এহসান নামক জা*নোয়ারটার।”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৯

“ না না! উনাকে গা*লি দিবেন না। বকবেন না উনাকে। আমার…”
রমণীর এরূপ দিশাহীন বাক্যে কপাল গোছালো নিরু। সন্দিষ্ট কন্ঠে বলে,
“ একটা রে**পিস্ট বকবো না? সে তো একটা জা*নো….”
“ দয়া করে চুপ করুন! আমার সহ্য হচ্ছে না এসব।”
“ কেনো সহ্য হচ্ছে না? তার মতো একটা…. ”
“ কারণ তায়েফ এহসান আমার বাবা!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬০