Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬১

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬১

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬১
jannatul firdaus mithila

বোকা রমণী চোখ বুঁজল। ক্ষুদ্র বদনখানায় নামালো এক অদ্ভুত অসারতা! হাতদুটো উড়ন্ত চড়ুইয়ের ন্যায় আলগোছে ছড়িয়ে দিলো দুপাশে। রমণীর এহেন কার্যকলাপ দেখে মুহুর্তেই স্তম্ভিত হলেন কয়েক হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা রূঢ় মানব। দৃঢ় মুখাবয়বে তাঁর হুট করেই নেমে এলো এক অদ্ভুত স্থবিরতা। দৃষ্টি সম্মুখে বোকা সপ্তদশী দাঁড়িয়ে রইলেও, তাঁর থমকানো দৃষ্টিযুগলে মুহুর্তেই ভেসে উঠল — বিষাক্ত অতীতের একটুকরো বিস্মৃত দৃশ্য!
— ব্যগ্র পায়ে ছুটছে ছোট্ট নাবালক অধীর রায়! তাঁর সিক্ত সন্ধানী চোখদুটো বারংবার ছুটে যাচ্ছে এদিক-ওদিক। কম্পিত রক্তিম ওষ্ঠপুটে কেবল জপে যাচ্ছে গুটিকয়েক শব্দ!
“ আম্মা! ও আম্মা? কোথায় আপনি আম্মা?”

কাঁটাযুক্ত নীরবতায় মোড়ানো অন্দরমহলের প্রতিটি দেয়ালজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ছোট্ট অধীরের কম্পিত কণ্ঠস্বর। অথচ নাবালকের প্রতিটি আকুল ডাকের বিপরীতে কেবল ফিরে আসছে এক আকাশসম নিঃসাড় নীরবতা! এতেই যেন ছোট্ট অধীরের বুকের ভেতর জমে থাকা উৎকণ্ঠা ক্রমশ হাঁসফাঁস করে উঠল। বেচারা গতি বাড়ালো পায়ের। বারান্দা পেরিয়ে কোমল পদযুগল তৎক্ষণাৎ ছোটালো অন্দরমহলের প্রশস্ত অঙ্গনে। গুনে গুনে মাত্র কয়েক কদম এগিয়েছে অধীর, ওমনি মাথার ওপর থেকে একখানা স্বর্ণের বালা কেমন ঝনঝন শব্দ তুলে আছড়ে পড়ল ধুলোমাখা মেঝেতে। সহসাই থমকে দাঁড়াল নাবালক। কিংকর্তব্যবিমূঢ় সত্তায় একমুহূর্ত পার করে, পরক্ষণেই সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে খানিক ঝুঁকে এসে বালাটি তুলে নিলো হাতে। মুহুর্তেই তার সিক্ত চোখদুটো বিস্ফারিত রূপ ধরল যেন। মস্তিষ্কে টনক নড়ল — এ যে তার মায়ের বালা! কিন্তু বালাটি ওপর থেকে পড়ল কীভাবে? কে ফেললো তার মায়ের হাতার বালাটা?

সন্দিগ্ধতায় তক্ষুনি বুকের ভেতরটা খানিক কেঁপে উঠল নাবালকের। বালাটা মুঠোবন্দি করে নিয়ে, ধীরলয়ে উঁচালো ঘাড়। তক্ষুনি তার দৃষ্টিপটের সম্মুখে একখানা বিধ্বস্ত দে-হ ওপরের ছাদ থেকে ছিটকে পড়ে গেল নিচে। ধুম করে এক শব্দ হলো বিকট! ঘটনার আকস্মিকতায় ভড়কে গেল নাবালক অধীর। আতঙ্কে অজান্তেই কয়েক পা পিছিয়ে গেল সে। মাটিতে আছড়ে পড়া দেহের অভিঘাতে চারপাশে উড়ে ওঠা ধূলিকণা থেকে নিজেকে আড়াল করতে বাঁ-হাতের বাহু দিয়ে তৎক্ষনাৎ শক্ত করে চোখ-মুখ ঢেকে ফেলল বাচ্চাটা। কয়েকপল নিস্তব্ধতায় কাটতেই হঠাৎ ধীরলয়ে মুখবায়ব হতে বাহু সরায় সে। ধোঁয়াটে দৃষ্টিতে তাকায় সম্মুখে। ধুলোপড়া মেঝের ওপর পড়ে আছে এক বিধ্বস্ত রম ণী দে হ। মুখখানি তাঁর অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখা। গায়ে বস্ত্রের ঠিক নেই! ছিঁড়েফাঁটা জামদানির অর্ধেকটা বেগতিক দশায় দলা পাকিয়ে আছে। পদযুগলের একটির হাড় ভেঙে অস্বাভাবিকভাবে বেঁকে গিয়ে আটকে আছে বিধ্বস্ত দে হে র নিচে। নিম্নতল হতে অবলীলায় গড়াচ্ছে তাজা লহুর বন্যা! এরূপ দৃশ্যে কেঁপে ওঠে অধীর! কম্পিত পদযুগলে গুনে গুনে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো রমণীর মুখাবয়বের সন্নিকটে। আধো আধো দৃষ্টে ঘাড়টা সামান্য ঝোঁকাতেই সর্বাঙ্গে ঝংকার বয়ে গেল নাবালকের। কম্পিত বদনের অভিসারে মুহুর্তেই ছিটকে সরে গেল দু-কদম দুরত্বে। বিভ্রান্তিতে আঁটকে গিয়ে কম্পিত কণ্ঠে এক-আধবার আওড়াল,

“ আম-আম্মা! আম্- আম্মা।”
বলতে বলতেই ঘাড়টা ফের উঁচিয়ে তাকায় অধীর। নেত্র তাক করে অদূরের ছাঁদের পানে। যেথায় শক্তমুখে দাঁড়িয়ে আছে — তায়েফ এহসান। তবে ছোট্ট অধীরের সনে চোখাচোখি হতেই দৃষ্টিযুগল সরিয়ে, ত্রস্ত ত্যাগ করলেন সেই স্থান। অধীরের সিক্ত চোখদুটো ঠায় তাকিয়ে রইলো লোকটার পানে। কন্ঠরুদ্ধ তার! চোখদুটো ধীরে ধীরে ঝাপসা হচ্ছে শুধু।
—— কয়েক মুহুর্তের বিষাক্ত অতীতের জঞ্জালে আঁটকা পড়েছে রূঢ় মানব! বোকা মানবীকে আজ আবারও ঐ একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বাকরুদ্ধ সে। দু’হাত ভর্তি অসামান্য ক্ষমতা থাকা স্বত্বেও, এই একটি মুহুর্তে এসে নিজেকে বড্ড পাগল পাগল ঠেকছে মানবের নিকট! বলিষ্ঠ হাতে-পায়ে ভর করেছে এক অদ্ভুত অসারতা। চোখদুটোতে নেমে এলো ঝাপসা ভাব। দৃষ্টিপটের সম্মুখে আবারও পুরনো ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কায় সে কেমন ঝরঝরে বাতাসের ন্যায় কাঁপতে লাগলো! বুকের মধ্যিখানে লুকায়িত অঙ্গটার বেপরোয়া লাফালাফিতে অতিষ্ঠ হয়ে তক্ষুনি একহাতে খামচে ধরল নিজ বুক। বড্ড কষ্টে মুখ হা করে নিঃশ্বাস টানতে গিয়ে আচমকা দৃষ্টি ঠেকালো বাঁ-দিকে। মুহুর্তেই থমকায় মুগ্ধ! থমকায় তার মুখ অভিব্যক্তি। কয়েকহাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে আছেন — বিধ্বস্ত শ্যামৌপ্তী দেবী রায়। ঠিক সে রূপে, যে রূপে সেদিন ছাঁদ থেকে ফেলে দেয়া হয়েছিল তাকে। বিধ্বস্ত অপ্সরা ধীরলয়ে হাত বাড়াচ্ছেন ছেলের পানে। অত্যন্ত ভঙ্গুর কন্ঠে শুধাচ্ছেন!

“ এবার অন্তত আমার কাছে আয় বাবা!”
পুরাতন অভিশাপ স্বরুপ প্যানিক অ্যাটাক এবং হ্যালুসিনেশনের অভিঘাতে কন্ঠা শুকিয়ে কাঠ রূঢ় মানবের। চোখদুটোতে বিভ্রম লেপ্টে তাকিয়ে আছে মায়ের কল্পিত অবয়বের পানে। মা তার কাঁদছে! ডুকরে উঠে ডাকছে ছেলেকে নিজের কাছে। অন্য সময় বেপরোয়া যুবক হয়তো এতক্ষণে ঠিক ছুটে যেত মায়ের কল্পিত অবয়বের কাছে, তবে আজ যে তার কি হলো কে জানে! সে কেমন দিশাহীন কায়দায় ঘনঘন ঢোক গিলে মাথা নাড়ালো দুপাশে। মুহুর্তব্যয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো মাহি’র পানে। বোকা মানবীর সর্বাঙ্গ কাঁপছে ভয়ে। বোধহয় সে ভয়েই এখন অব্দি ঝাপ দেবার সাহস হয়নি তার। বেপরোয়া যুবক দিশাহীন উম্মাদ এমুহূর্তে! মানবীকে থামানোর চেষ্টায় মুহুর্তেই উদ্যেগ নিলো এক ভিন্ন পাগলামির। ত্বরিত হাত ঘুরিয়ে নিজ কোমরের পিঠ হতে বের করে আনলো একখানা রিভলবার। তার সরু ধাতব নলখানা আকাশপটে তাক করে সহসা ফায়ার করলো মুগ্ধ! এহেন বিকট শব্দে মুহুর্তেই পিলে চমকে উঠে মাহি’র। কেঁপে ওঠে ক্ষুদ্র বদন। কম্পিত দেহখানার তাল কোনমতে ধরে রেখে, ত্রস্ত ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকাতেই অভ্যন্তরে হোঁচট খেল রমণী। বিস্ময়ে চোখদুটো তার ছুঁয়ে দিলো ললাট। কন্ঠে ভারী হতবাকতা ঢেলে চিৎকার দিয়ে ওঠে আওড়াল,

“ হোয়াট দা হেল আর ইউ ডুয়িং বিস্ট? মাথায় বন্দুক ঠেকিয়েছেন কেনো আপনি? এটা কি ধরনের পাগলামো?”
সপ্তদশীর বাক্যবাণ শেষ হতে না হতেই সম্মুখের পাগলাটে যুবক কেমন চোয়াল ফোঁটালো। চাপ বাড়ালো মাথার ঠিক বাঁপাশে চেপে রাখা ব**ন্দুকটার! ট্রিগার পয়েন্টে আঙুল ঢুকিয়ে, মুখাবয়ব করলো শক্ত। চোখদুটোতে সে-কি উন্মত্ততা তার! রমণীর পেলব মুখখানার পানে নিষ্পলক ভঙ্গিতে তাকিয়ে থেকে দৃঢ় কন্ঠে শুধালো,
“ চাশমিস! ডোন্ট ডু দ্যাট। আই সয়্যার — ইফ ইউ ডেয়ার টু জাম্প, আ’ল শ্যুট মাইসেল্ফ। আই রিপিট, আই উইল শ্যুট মাইসেল্ফ।”
রূঢ় মানবের দৃঢ় কন্ঠে ভীত রমণী ঢোক গিলছে পরপর। শূন্যে বাড়িয়ে রাখা পা-টা আগের ন্যায় অটল রেখে, অন্যপায়ে ভর ছাড়লো সম্পূর্ণ দেহের ভর! সিক্ত চোখদুটোর ঘোলাটে দৃষ্টি সম্মুখে নিবদ্ধ তার। কন্ঠে ভারী অতিষ্ঠ ভাবস্রোত ঢেলে আওড়াল,

“ শুধু শুধু পাগলামি করছেন বিস্ট!”
এপর্যায়ে চোয়ালের পেশি টানটান হলো মুগ্ধের। দৃষ্টিতে আগুন লেপ্টে, দাঁত কিড়মিড়িয়ে আওড়াল,
“ পাগলামির এখনো দেখলি কী জানো***বাচ্চা! এক্ষুণি সরে আয় ওখান থেকে, নয়তো আমি নিজেকে শ্যুট করে দিবো।”
বোকা মানবী হতভম্ব! হতবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল খানিক। হতবুদ্ধির ন্যায় আচমকা প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ হেভ ইউ লস্ট ইউর মাইন্ড? সেন্স ঠিক আছে আপনার? তাই বলে… শত্রুর মেয়ের জন্য নিজেকে শেষ করবেন আপনি?”
মাফিয়া বিস্টের শক্ত মুখাবয়বে পরিবর্তনের লেশমাত্রও নেই! সেথায় আছে কেবল একরাশ অব্যক্ত কাতরতা। নিষ্পলক চোখে অদূরের বোকা মানবীর পানে তাকিয়ে থেকে ভরাট কন্ঠে শুধালো,
“ দরকার পড়লে তা-ই করব!”
দাঁত খিঁচে অতিষ্ঠ মানবী। একপ্রকার অতিষ্ঠ গলায় বলে ওঠে —
“ ইট’স জাস্ট আ ননসেন্স, বিস্ট!”
বাঁকা হাসলো মুগ্ধ! দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত প্রগাঢ়তা নামিয়ে, অত্যন্ত শান্ত অথচ ভয়ংকর কন্ঠে শুধালো,
“ এন্ড আ’ম জাস্ট অবসেসড উইদ দিস ফা’কিং ননসেন্স সিগনোরা! কাম ডাউন, আদারওয়াইজ — আ’ল শ্যুট মাইসেল্ফ।”

বলতে বলতেই মাথার বাঁপাশে ঠেকিয়ে রাখা বন্দুকের সরু নলটা আরেকটু চেপে ধরে বেপরোয়া পুরুষ। তা দেখে আঁতকে উঠে মাহি! অজান্তেই কদম বাড়িয়ে এগিয়ে এসে থামাতে চাইলো উম্মাদটাকে। তবে একটুখানি এগোতেই হঠাৎ তার কানদুটোতে ঝাঁঝিয়ে উঠল — তখনকার বলা সকলের তিক্ত বাক্যগুলো! মুহুর্তেই ফের থমকায় মাহি। ধীরলয়ে থমকানো দৃষ্টি উঁচিয়ে তাকায় লোকটার পানে। তক্ষুনি তার মনে পড়ে গেল — অন্দরমহলে দেওয়া রূঢ় মানবের দৃঢ় স্বীকারোক্তিগুলো। যেখানে পুরো অন্দরমহলভর্তি মানুষজন তার বিপক্ষে ছিলো, চেয়েছিল আজ তাকে একেবারে পায়ের তলায় পিষে ফেলতে — সেখানে তার সম্মুখে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে রূঢ় মানব। সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে বাঁচিয়েছে তাকে। কিন্তু কেনো? কেন করলো সে এমন?

বিচক্ষণে মস্তিষ্কে উত্থাপিত এরূপ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আজ কেন যেন খুব একটা বেগ পোহাতে হলো না বোকা সপ্তদশীর! সে ঠিক বিচক্ষণতার সঙ্গে টের পেয়ে গেল নির্দয়ের অব্যক্ত অনুরক্তিদের নাগাল। বুঝে গেল নির্দয়ের কনক্রিটের আস্তরণে বন্দী হৃদয়খানার গা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে! ভাঙছে কনক্রিটের দেয়াল! এহেন উপলব্ধিতে কেঁপে ওঠে মাহি। কেঁপে ওঠে তার ক্ষুদ্র সত্তা। না না, এ কি করে হয়? নির্দয় তার প্রতি কেনো দূর্বল হচ্ছে? সে-কি জানে না? নির্দয়দের দূর্বলতাই যে তাদের সবচেয়ে বড়ো শত্রু! তারমানে… তারমানে সে যদি হয় রূঢ় মানবের নতুন দূর্বলতা, তাহলে এমুহূর্তে রূঢ় মানবের শত্রু খোদ বোকা সপ্তদশী?
তৎক্ষনাৎ মাথার ওপর অদৃশ্য বজ্রপাত ঘটল মায়াবিনীর। বিভ্রমে লেপ্টে থাকা দৃষ্টিযুগল তাক করলো অন্যত্র। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে অধর ভেজাঁলো সিক্ত জিভ ঠেলে। ওদিকে, মুগ্ধ এবার ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়লো স্বস্তির। রমণীকে ছাঁদের কার্নিশ হতে খানিকটা সরে আসতে দেখে, ধীরলয়ে বন্দুক নামালো মাথার পাশ থেকে। অস্থির ভঙ্গিতে পাদু’টো আগাতে চাইলেই তৎক্ষনাৎ সম্মুখ হতে হাত উঁচিয়ে বাঁধ সাধল মাহি। ত্রস্ত থেমে গেল বলিষ্ঠের ব্যস্ত পা-জোড়া। সন্দিগ্ধতায় কুঁচকে গেল কপালের চামড়া! সন্দিষ্ট দৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে তাকাতেই মাহি কেমন ঢোক গিলে অনুভুতিশূন্য কন্ঠে বলে উঠে,

“ থামুন! আর এগোবেন না।”
সহসা কপালের ভাঁজ গাঢ় হলো মুগ্ধের। চোয়াল হলো শক্ত! এতক্ষণ ঠান্ডা মেজাজে থাকলেও, বদমেজাজি মানব মুহূর্তেই রং পাল্টালেন নিজের। পাদু’টোয় গতি টেনে কটমট কন্ঠে আচমকা বলে উঠল,
“ তোর থামাথামির কপালে চল্লিশটা ঝাঁটার বারি বেয়াদব। ভালো করে কথা বলছি বিধায় গায়ে ধরছে না, তাই না? এ্যাই, তুই দাঁড়া! দাঁড়া বলছি।”
মাহি দাঁড়াল না। উল্টো একবুক নিরব যন্ত্রণা নিয়ে তক্ষুনি পা ছুটিয়ে এগিয়ে এসে দাঁড়াল কার্নিশের একদম দ্বারপ্রান্তে! এহেন কান্ডে বুকটা কেমন ধ্বক করে উঠল মুগ্ধের। বেচারা ফের অস্থির কন্ঠে বলে উঠল,
“ হেই! দাঁড়া, দাঁড়া। চাশমিস! এ্যাই চাশমিস।”
শুনলো না মাহি। শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ডুকরে উঠে ফের। মুগ্ধ ছুটলো এবার। হাতে রিভলবারটা নিয়ে ভরাট কন্ঠে শুধালো,
“ খবরদার চাশমিস! ভুলেও এ কাজ করিস না। নয়তো আমি কিন্তু শ্যুট করে দিবো নিজেকে।”
বলতে বলতেই হুট করে রমণীর পেছন থেকে ভেসে এলো একখানা বিকট শব্দ!
“ ঠাস!”

মুহুর্তেই ফায়ারের তীক্ষ্ণ এবং জোরালো শব্দে কম্পিত হলো চারপাশের গুমোট বাতাস! কম্পিত রমণী ব্যথাতুর ভঙ্গিতে নিস্তব্ধ হয়ে গেল একপ্রকার। পারলোনা ঘাড় বাকিয়ে একটাবার পেছনে তাকাতে। সাহস করলো না — রূঢ় মানবের ওমন করুণ পরিস্থিতিটুকু নিজ চোখে অবলোকন করতে। রমণী দম খিচঁল এবার। মন-মস্তিষ্কের দোলাচালে আঁটকে অবশেষে পাদু’টো করলো বাঁধনহারা। তক্ষুনি দু’হাত ছড়িয়ে দিলো দুপাশে। চোখদুটো বুঁজে নিয়ে কল্পনার মানসপটে প্রিয়জনদের মুখগুলো শেষবারের ন্যায় স্মরণ করতে গেল বোকা মানবী। তবে পরমুহূর্তেই থমকায় সে। যখন দেখল — তার কল্পনার মানসপটে প্রিয়জনদের মুখের বদলে কেবল দৃশ্যমান হচ্ছে একটিমাত্র মুখ। যে-ই মুখ তার ভাষ্যমতে ভীষণ অপ্রিয়! বেঈমান মস্তিষ্কের সম্পূর্ণটা জুড়ে উচ্চারিত হচ্ছে কেবলমাত্র একটি নাম ~
“ মির্জা সায়ান মুগ্ধ! দ্য মাফিয়া বিস্ট!”

হতভম্ব রমণীর হতভম্বতার রেশ কাটতে না কাটতেই সে টের পেলো — তার পায়ের নিচ থেকে ঠাঁই সরে গিয়েছে। ক্ষুদ্র শরীরটা শূন্যে ভাসতে লাগলেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল তীব্র আতঙ্কে। বাতাসের তীব্র ঝাপটার অভিঘাতে চুলগুলো হলো এলোমেলো! মৃ ত্যু ভয়ে এতক্ষণে নিশ্বাস আঁটকে যাবার যোগাড় মানবীর। ভয়ে কন্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো আত্মচিৎকার। তার ক্ষুদ্র বদনখানি বেশ খানিকটা নিচে গড়িয়ে পড়তেই আচানক একখানা বলিষ্ঠ হাত ঝড়ের বেগে ছুটে এসে আঁকড়ে ধরল মাহি’র ডানহাতের নরম কব্জিসন্ধি! যার প্রকাণ্ড জোরে মুহুর্তেই ঝুলে পড়ল সপ্তদশী। দোদুল্যমান হলো তার ক্ষুদ্র বদন! কুঁচকে রাখা চোখদুটো ধীরলয়ে নিজেদের পর্দা সরাতেই অক্ষিপটের সামনে দৃশ্যমান হলো — সুদর্শন মাফিয়া মনস্টারের শক্ত মুখাবয়ব। যার বুকের অর্ধেকটা ঝুঁকে আছে মেয়েটাকে বাঁচানোর প্রয়াসে। মাহি হতবিহ্বল! চকচক করছে তার চোখদুটোর কার্নিশ। ভগ্ন কন্ঠে থেমে থেমে আওড়াল,

“ ছেড়ে দিন বিস্ট!”
সহসা মুখাবয়বে অদৃশ্য আগুন লেপ্টে গেল মুগ্ধের! কন্ঠে নামলো ভারী গর্জন।
“ ইউ বিচ! আমি ম’রেছি এখনো ? যেখানে আমার শ্বাস-প্রশ্বাস এখনো চলমান, সেখানে তুই ম’রতে আসিস কোন সাহসে? কান খুলে শুনে রাখ বান্দীর মেয়ে! আমার নিশ্বাস বন্ধ হবার আগ অবধি তোর কোনো নিস্তার নেই।”
ডুকরে উঠে মাহি! মোচড়ায় হাতের কব্জিসন্ধি। রূঢ় মানব জোরালো হাতে টেনে তুলছে তাকে। মাহি উঠবে না! প্রয়াস চালাচ্ছে ভীষণ। শেষমেশ আর টিকতে না পেরে আচমকা সবগুলো ধারালো দাঁতের কামড় বসিয়ে দিলো মুগ্ধের শক্তপোক্ত হাতের মুঠোয়। কিন্তু বালাইষাট! মেয়েটার ওমন জোকের মতো কামড়ে ধরে রাখাতেও বিন্দুমাত্র টলেনি মুগ্ধ! না আওড়াল এক চিলতে ব্যথাতুর শব্দ। বরং শক্তমুখে ধীরলয়ে টেনে উঠিয়ে আনলো মেয়েটাকে।
রমণীর কম্পিত পদযুগল ছাঁদের ভূমি স্পর্শ করতেই আচানক রমণীকে ছেড়ে দিয়ে একহাত দুরত্বে পিছিয়ে গেল মুগ্ধ। এক আকাশসম রাগের তোড়ে তক্ষুনি বাহাতের রিভলবারের ধাতব নলটা তাক করল সপ্তদশীর ললাটের ঠিক মাঝখানে। আশ্চর্য! এরূপ অতর্কিত কান্ডে বিলকুল ভড়কায়নি মাহি। উল্টো চেয়ে আছে একদৃষ্টে। নির্দয় মানব এবার দাঁত খিঁচল। হিং স্র কন্ঠে হুংকার ছুঁড়ে আওড়াল,

“ ম’রার খুব শখ তোর, তাই না? আমায় ছেড়ে ম*রতে যাবার খুব শখ তোর? এ্যাই বেয়াদব, এ্যাই! তুই জানিস না? তুই ছাড়া ‘ আমার ’ বলতে আমার কেউ নেই। এ্যাই তুই জানতি না এটা? জানতি না বল?”
কেঁপে ওঠে মাহি! সহসা চিবুক ঠেকায় কন্ঠার কাছে। ধীরলয়ে নাক টানছে সে। তার এহেন নিরবতায় উন্মত্ততা বাড়লো বোধহয় মুগ্ধের। তক্ষুনি রমণীর কপাল হতে বন্দুকের নলটা সরিয়ে এনে তাক করলো ভূমিপৃষ্ঠে। অতঃপর রাগে গজগজ করতে করতে ফায়ার করলো বারকয়েক। মুহুর্তেই কেঁপে উঠল চারপাশ! ভয়ে তটস্থ হলো বোকা মানবী। বিশালাকৃতির ছাঁদজুড়ে কেবল তারা দু’টো মানুষ। আশেপাশে একটা কাকপক্ষীও নেই যেন। না রয়েছে মাফিয়া বিস্টের সৈন্যদল। ভীতসন্ত্রস্ত রমণী ঢোক গিলছে বারংবার। বলিষ্ঠের রাগকে বড্ড ভয় পায় সে। ভয়ের চোটে পেছাচ্ছে কদম! ঠিক তখনি ফায়ার থামালো মুগ্ধ। বলিষ্ঠ ঘাড়টা বাঁকিয়ে, বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়া তাক করল ভীত রমণীর পানে। খানিকক্ষণ কটমট ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকতেই আচানক তটস্থ রমণী কম্পিত কণ্ঠে শুধালো,

“ কেনো বাঁচালেন আমাকে?”
ত্রস্ত ঘাড় সোজা হলো মুগ্ধের। তাকালো অন্যত্র!মুখাবয়বে নামালো শক্তভাব। কন্ঠে দৃঢ়তা ঢেলে শুধালো —
“ নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল তাই।”
এহেন ভনিতাবিহীন প্রতুত্তরে ভেজা চোখেই আহত হাসলো মাহি। সামান্য নাক টেনে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল নিজ হাতের নখর। একহাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা অটল রূঢ় মানব কেমন আড়দৃষ্টে পরোখ করছে রমণীকে। আহত রমণীর পেলব মুখখানার সে-কি বেহাল দশা! নিশ্চয়ই ব্যথা হচ্ছে তার। মুগ্ধ তৎক্ষনাৎ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো। গটগটিয়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো মাহি’র একদম অভিমুখে। বোকা মাহি মুখ তুললো না এবার। কোনো এক অদৃশ্য শক্তির কবলে পড়ে আঁটকে গিয়েছে তার ঘাড়। নির্দয়ের বুঝি তা সহ্য হলো না। মেয়ের চোখে চোখ রাখার লোভ হলো তার। সে-ই উদ্দেশ্যে ত্বরিত রুক্ষ দু’হাতের আঁজলায় আলগোছে তুলে ধরল সপ্তদশীর পেলব মুখখানা। মুহুর্তেই মিলন ঘটলো দু’জোড়া কাতর নয়নের। থমকালো দু’জনার চারপাশ! অধর নাড়িয়ে দু’টো বাক্য আওড়ানো ছাড়াই চোখ দিয়ে কতকিছুই না বলে যাচ্ছে তারা! রমণী হুট করেই হারালো নিজেকে। রক্তিম ওষ্ঠপুট তিরতির করে নাড়িয়ে শুধালো,

“ আপনি কি জানেন? আপনি একজন উম্মাদ?”
মুগ্ধের মুখ অভিব্যক্তিতে পরিবর্তন নেই। চোখেমুখে বিমুগ্ধতার ভারী ছাপ। দৃঢ় কন্ঠে শুধালো,
“ জানি! তবে তুই কি জানিস? আমার সকল উন্মত্ততা কেবল কার জন্য?”
দুলে উঠে মাহি! উত্তর জানে সে। তবুও কোথাও যেন কিছু একটা আঁটকে রেখেছে তাকে। আওড়াতে দিচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত উত্তরগুলো। কাঁদো কাঁদো গলায় রমণী উল্টো প্রসঙ্গে আওড়াল,
“ আমি আপনার শত্রুর মেয়ে বিস্ট! আমার জন্য এভাবে…!”
“ আই ডোন্ট কেয়ার।”
মুগ্ধের অনড় বাক্যে থমকায় মাহি। হা করে তাকিয়ে রইলো লোকটার পানে। হতভম্ব কন্ঠে অস্ফুটে আওড়াল,
“ আমি… ভীষণ দূর্বল একটা মেয়ে।”
যুবকের একইরকম ঠান্ডা প্রতুত্তর!

“ আই ডোন্ট কেয়ার।”
“ আপনার সাথে আমার কিচ্ছু মিল নেই বিস্ট।”
“ আই ডোন্ট কেয়ার!”
এবারে চোখদুটোতে প্রগাঢ়তা নামলো মাহি’র! মুগ্ধের পানে তাকিয়ে বিভ্রমে প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ কিচ্ছু কেয়ার করেন না আপনি?”
ঘাড়টা সামান্য ঝুঁকিয়ে আনলো মুগ্ধ। গমগমে গলায় প্রতুত্তর করল,
“ উঁহু!”
“ আমায় কেয়ার করেন?”
হুট করেই দৃষ্টিতে গভীরতা নামলো রূঢ় মানবের। চোখদুটো বুলালো মেয়েটার সম্পূর্ণ মুখাবয়ব জুড়ে। আলতো করে জবাব দিলো —

“ আই ডু!”
এহেন প্রতুত্তরে অন্তঃকোণের ব্যথাগুলো ক্রমশ কমে আসলো রমণীর। মুখাবয়বে ছড়িয়ে গেল এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা। ধীরলয়ে ফের প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ সবসময় করবেন?”
সুদর্শন সময় নিলো না। তৎক্ষনাৎ রমণীর মসৃণ ললাটে অধর ছুঁইয়ে দৃঢ় কন্ঠে আওড়াল,
“ আ’ই উইল — টিল মা’ই লাস্ট ব্রেথ।”
আবেশে চোখদুটো বুঁজে এলো মাহি’র। আজ আর রূঢ় মানবকে দু’হাতে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দেবার বৃথা প্রয়াস করল না সে। উল্টো সময় নিয়ে হুট করেই বলে বসল,
“ ভালোবাসেন আমায়?”

এরূপ প্রশ্নে রমণীর ললাট বরাবর চেপে রাখা ওষ্ঠপুট সহসাই নড়ে উঠল মুগ্ধের। ধীরলয়ে সরালো মুখ! রমণীর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিযুগল নিজ পানে নিবদ্ধ দেখে, খানিক গম্ভীর হলো রূঢ় মানব। প্রতুত্তর দেবার বদলে গম্ভীর মুখে চোয়াল শক্ত করে মধ্যকার দুরত্ব বাড়ালো নিজেদের। উদ্বিগ্ন মাহি তক্ষুনি একহাতে খামচে ধরল মুগ্ধের গায়ের টি-শার্ট। সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়ায় মুগ্ধ। ভ্রু গুটিয়ে মেয়েটার পানে তাকাতেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো,
“ আজ অন্তত উত্তরটা দিয়ে যান, বিস্ট!”

কিয়তপল চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো মুগ্ধ! মাহি’র পেলব মুখ! যেথায় একরাশ নিরব আকুতি। মুগ্ধ একবার চাইলো নজর ঘুরিয়ে চলে যেতে। কিন্তু তার পাদু’টো যেন আজ এক অদৃশ্য শক্তির মায়াজালে আঁটকে পড়েছে গভীরভাবে। চাইলেও পারছেনা সরে যেতে। পারছেনা নিজ চিরচেনা খোলস ছেড়ে দিয়ে মনের কোণে লুকিয়ে থাকা সবটা আওড়ে দিতে। অভ্যন্তরের দোলাচালে পেঁচিয়ে আছে রূঢ় মানব! দৃষ্টিযুগল ধীরলয়ে নিজ গায়ে, যেথায় রমণীর তুলতুলে হাতদুটো নিবদ্ধ, সেথায় পড়তেই স্থবির হয় সে। একমুহূর্ত স্থির থেকে পরক্ষণেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিযুগল উঁচিয়ে তাকালো মেয়েটার মুখপানে। অতঃপর, অতঃপর রমণীর উত্থাপিত কোনরূপ প্রশ্নোত্তর না দিয়ে, উল্টো ঝড়ের বেগে দু’হাতে ঝাপটে ধরল মেয়েটাকে। এহেন অতর্কিত আক্রমণে হকচকায় মাহি! স্পষ্ট টের পাচ্ছে — মুগ্ধের বলিষ্ঠ গায়ের অনিয়ন্ত্রিত কম্পন। ডুবন্ত পথিকের ন্যায় বাঁচার শেষ আশ্রয়টুকু খুঁজে পেয়ে মেয়েটার সনে নিবিড়ভাবে আলিঙ্গন ঘটালেন রূঢ় মানব। দু’হাতের বলিষ্ঠ জোরে পাদু’টো শূন্যে তুলে দিলেন রমণীর। নাকের সরু ডগাটা আলতো করে ডুবিয়ে দিলেন সপ্তদশীর উম্মুক্ত কাঁধে। সহসা সর্বাঙ্গ শিরশির করে ওঠে মাহি’র। আজ এক নতুন শিহরণে কেঁপে ওঠে তার অন্তঃকোণ! ওদিকে, রূঢ় মানব মেয়েটার কাঁধে নাক ডুবিয়ে আচ্ছন্ন কন্ঠে আওড়াল,

“ না!”
মুহুর্তেই সম্পূর্ণ মুখাবয়ব জুড়ে আমাবস্যা নামলো মাহি’র। কুঁচকে গেল কপালের চামড়া! তিরিক্ষি মেজাজে ফের জিজ্ঞেস করল,
“ সত্যি?”
বাঁকা হাসলো না-কি মুগ্ধ? মেয়েটাতে ডুবে থেকে কেমন ভনিতাহীন প্রতুত্তর করল,
“ নাহ!”
বিস্ময়ে জমে গেল মাহি। বিস্ময়াবহে ফাঁকা হলো নরম চোয়ালের পেশি। মুগ্ধ বোধহয় বেশ টের পেলো মাহি’র ওমন স্থবিরতা। ধীরলয়ে মুখ উঠালো ঘাড় হতে। আলগোছে নয়ন তাক করল স্তম্ভিত বোকা মানবীর পানে। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুতভাবে এক চিলতে বাঁকা হাসির রেশ টেনে, সরু নাকের ডগাটা এগিয়ে আনে আরেকটু। আলতো করে মাহি’র নাকের সনে নাক ঘষে বারংবার আওড়ায়,
“ নাহ! নাহ! নাহ!”
হুটহাট ধাক্কায় থমকায় মুখো অভিব্যক্তি। বোকা মানবীর হলোও তাই। সে যে থমকে গিয়েছে ভীষণ। মাফিয়া বিস্টের কথার গভীরতা বুঝতে আজ আর বেগ পোহাতে হলো না তার। ঠিক বুঝলো সবটা! পরিপূর্ণ রূপে প্রতিটি বাক্য বোধগম্য হতেই লাজুক হাসলো রমণী। তক্ষুনি দিনদুনিয়ার সকল বেড়াজাল ভুলে গিয়ে নিজ অজান্তেই ঝাপটে ধরল মুগ্ধকে। বড্ড নিবিড় আলিঙ্গনে বলিষ্ঠকে আলতো করে পিষে ফেলার প্রয়াসে মত্ত মানবী। ক্ষীণ কন্ঠে অস্ফুটে আওড়াল,
“ আপনি একটা পা গ ল!”
ফিচেল হাসলো মুগ্ধ! রমণীর মতো করে তাকে বড্ড নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে একইভাবে প্রতুত্তর ছুড়ঁল —
“ আচ্ছা!”

“ এডউইন? ও এডউইন? হেলো এডউইন? শুনতে পাচ্ছেন?”
হুটহাট ডাকাডাকিতে ওতো সাধের কাঁচা ঘুমটায় খানিক ভাঁটা পড়ল গম্ভীরমুখো এডউইনের। নড়েচড়ে উঠল সোফার নরম গদিতে আয়েশ করে শুয়ে থাকা বলিষ্ঠ শরীরটা। সারাদিনের ক্লান্তিতে হঠাৎ করেই চোখদুটো মুদে এসেছিল তার। তন্মধ্যে শুরু হলো ওমন হাঁকাহাঁকি! ঘুম জড়ানো চোখদুটো হালকা খুলে তাকায় এডউইন। ঘাড় উঁচিয়ে তাকায় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডের পানে। কাঁচা ঘুম ভাঙার অপরাধে অভিযুক্ত গার্ডের রুক্ষ গালে মুহুর্তেই বসালো এক চড়! যে চড়ের অভিঘাতে বেচারা গার্ডের গালটা কেমন বেঁকে গেল। এডউইন তখন দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ কি সমস্যা? কে ম’রেছে?”
গার্ড মহাশয় গালে হাত বুলাচ্ছেন। ঠোঁটদুটো উল্টে আওড়াচ্ছেন,

“ আপনি বলেছিলেন ট্র্যাম্পোলিন নিয়ে রেডি থাকতে। ওপর থেকে যেকোনো সময় সিগনোরা পড়ে গেলে যেন ব্যথা না পায়। কিন্তু ঘন্টা খানেক হয়ে গেল, সিগনোরা তো পড়ল না। আমরা কি একবার ওপরে দেখবো?”
তক্ষুনি বেচারার অপর গালে বসল আরেক চড়! কর্ণকুহরে ভেসে এলো গম্ভীর মানবের চিড়বিড় কন্ঠ!

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬০

“ গিয়ে কি দেখবি? রুশদীর বাসর? বলদ কোথাকার, রুশদী থাকতে তার সিগনোরা পড়ে যাবে এমন চিন্তা করাটাও তো বিলাসিতা! এখনো যেহেতু ওপর থেকে পড়েনি, তারমানে নিশ্চিত উনারা কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করছে। সো, ডোন্ট ডিস্টার্ব দেম! যা যা, কাজ কর। আমি একটু ঘুমাই!”
বলেই এক লম্বা হামি টানলো এডউইন! নরম গদিতে ফের শরীরটা ডুবিয়ে দিয়ে বিড়বিড় করল,
“ হেপি বাসর রুশদী! অগ্রিম হেপি বার্থডে মুনবার্ড। ওপস সরি, রুশদী’স সিগনোরা!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬১ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here