মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬১ (২)
jannatul firdaus mithila
মৃদুমন্দ বাতাসের ঝাপটায় সর্বাঙ্গ শিউরে উঠছে রমণীর! ক্ষন প্রবাহের কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে আশ্রয়স্থল হিসেবে খুঁজে পেয়েছে এক পুরুষালী রুক্ষ বক্ষভাঁজ! দিনদুনিয়ার সকল বাঁধ ভুলে গিয়ে বলিষ্ঠের দৃঢ় বাহুবন্ধনে আষ্টেপৃষ্ঠে লেপ্টে থেকে, মায়াবিনী মুখ গুঁজেছে লোকটার রুক্ষ বক্ষভাঁজে। তার গা থেকে ভেসে আসা মাদকীয় পারফিউম এবং দৈহিক পুরুষালী ঘ্রাণের সংমিশ্রণে আবেশিত বোকা মানবী। প্রাণভরে টানছে নিশ্বাস! তার ক্ষুদ্র বদনখানায় লেপ্টে থাকা শক্তপোক্ত হাতদুটো বড্ড শক্ত যেন। পারছেনা ক্ষুদ্র রমণীকে এক্ষুণি নিজ বক্ষপিঞ্জরে ঢুকিয়ে ফেলতে! বিনাবাক্যে সদ্য মিলন ঘটা হৃদয়দুটোর ভারে দু’জনেই কেমন মোহাচ্ছন্ন। মস্তিষ্ক বোধহয় থামিয়ে দিয়েছে কয়েকপল! এরইমধ্যে লাজুক রমণীর বোধহয় হুঁশ ফিরলো। ত্বরিত বিস্ফোরিত রূপে চোখদুটো খুলে নিলো আলগোছে। পরমুহুর্তেই নিজেকে ওমন আষ্টেপৃষ্ঠে রূঢ় মানবের রুক্ষ বক্ষভাঁজে লেপ্টে থাকতে দেখে লজ্জায় হাসফাস করে উঠল বোকা মানবী। সহসা মাখনরঙা গালদুটোয় স্পষ্ট হলো লাজুকলতার লালিমা! গভীর আলিঙ্গনের স্থায়িত্ব আর বাড়ালেন না মায়াবিনী। ত্রস্ত শিথিল করলেন নিজ তুলতুলে বাহুবন্ধন। মাহি’র নরম আঙুলের মুঠো আলগা হতেই সুদর্শনের বদ্ধ চোখের পাতা কুঁচকে গেল বড্ড। খানিক বিরক্তিতে বাদামী চোখদুটো সরালো নিজেদের পর্দা। পরক্ষনেই বলিষ্ঠ ঘাড়টা সামান্য ঝুঁকিয়ে মুখ নামালো মাহি’র কানের লতির ডগায়। হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ এনি প্রবলেম?”
লাজুকলতার সে-কি লজ্জা! সুদর্শনের সম্মুখে আর এক মুহুর্তও দাঁড়িয়ে থাকবার সাধ্যি হচ্ছে না তার। পলক ঝুঁকেছে ঝুঁকেছেই। অথচ বেলাজা পুরুষের ওতোকিছুতে তোয়াক্কা নেই। সে বরং দৃঢ় করলো নিজ বাহুবন্ধন। রমণীর তুলতুলে পাদু’টো শূন্যে আবর্তিত রেখে আচমকা সন্দিগ্ধ কন্ঠে বলে উঠল,
“ এভাবে ভালো লাগছে না? অন্যভাবে ধরবো?”
ত্বরিত লজ্জায় কানদুটো ঝা ঝা করে উঠল মাহি’র! নত হলো অবনত পেলব মুখখানা। লজ্জিত কন্ঠে মিনমিনিয়ে আওড়াল,
“ নিচে নামান আমায়।”
মুগ্ধের গুটিয়ে রাখা ললাটের চামড়া কুঁচকে গেল আরও। গম্ভীর মুখাবয়বে ছাপ ফুটলো সন্দিগ্ধতার।
“ বাট হোয়াই? মাত্রই তো ধরলাম! একটা চুমু-টুমু না খেয়ে কিভাবে ছাড়বো? সো, কাম অন বেইবি, গিভ আ কিস!”
লাজে নিঃশ্বাস আঁটকে যাবার যোগাড় মানবীর! তৎক্ষনাৎ রূঢ় মানবের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ থেকে মুচড়ে উঠল সাপের ন্যায়। হাসফাস করে আওড়াল,
“ পুট মি ডাউন, বিস্ট! প্লিজ।”
রমণীর কম্পিত অনুরোধ! তা কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই সুদর্শনের সুশ্রী মুখমণ্ডল শক্ত হলো যেন। চাইলো একবার দাঁত খিঁচে আওড়ে দিবে দু’টো কটুবাক্য। তবে পরমুহূর্তেই দৃষ্টিপটের সম্মুখে দৃশ্যমান হলো মায়াবিনীর আহত মুখখানা। পেলব মুখাবয়বের বেশ ক’জায়গায় কালসিটে দাগ বসেছে অনেক। ক্ষুদ্র বদনেও বোধহয় ব্যথা হচ্ছে তার। এহেন ভাবাবেগে তাড়িত রূঢ় মানব, তক্ষুনি আলতো করে নামিয়ে দিলো দূর্বল মাহি’কে। বলিষ্ঠের দৃঢ় বাহুবন্ধনের খাঁচা হতে মুক্ত হতেই চড়ুই উড়াল দিলো যেন। ফুড়ুৎ করে পাদু’টো ছোটালো উল্টোপথে। কিন্তু বালাইষাট! রমণীর ওমন আপেক্ষিক উদ্যোগে এক বালতি জল ঢেলে দিলো গম্ভীর মুগ্ধ। তৎক্ষনাৎ শক্ত হাতে পেছন থেকে আকঁড়ে ধরল মাহি’র নরম কব্জিসন্ধি। মুহুর্তেই থেমে গেল চঞ্চলা চড়ুইয়ের ছুটন্ত পদযুগল। গতি বেড়ে গেল হৃৎস্পন্দনের। বাইরে থেকে কান পাতলেই যেন শোনা যাবে সে-ই আওয়াজ। অস্থিরতা বেড়ে গিয়ে আকাশ ছুঁই ছুঁই! তন্মধ্যে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা গম্ভীর মানব আলতো করে ঘাড় বাঁকালেন। দৃষ্টিজোড়া তীক্ষ্ণ করে নিয়ে ভরাট কন্ঠে শুধালেন,
“ আমার চড়ুই পালাতে চাচ্ছে?”
শুকনো ঢোক গিললো মাহি। অজানা বোধবুদ্ধিতে চোখদুটো বুঁজে নিয়ে অস্থির কন্ঠে প্রতুত্তর করল,
“ চড়ুইয়ের পায়ে মায়াজালের শিকল জড়িয়ে দেবার পর, পালানোর প্রশ্ন ছোঁড়া নেহাৎ তাচ্ছিল্য বৈকি!”
তক্ষুনি নিম্নাংশের অধরে দাঁত বসায় মুগ্ধ! হাসলোও বোধহয় নিরবে। খানিকবাদে কোনরূপ আগাম সতর্কসংকেত ছাড়াই রমণীর তুলতুলে কব্জিসন্ধিতে দিলো এক হেঁচকা টান। মুহুর্তেই ওমন জোরালো টানের অভিঘাতে ক্ষুদ্র রমণী ফের একপ্রকার আছড়ে পড়ল রূঢ় মানবের ইস্পাত-দৃঢ় বক্ষে। তার ধনুকের ন্যায় বাঁকানো পিঠটা গিয়ে ঠেকলো সেথায়। নিজেকে সামলে নেবার পূর্বেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো,
“ তা…শেকলটা কি একপাক্ষিক ছিলো? না-কি দ্বিপাক্ষিক?”
রূঢ় মানবের মোটা বাক্য! তা বোধগম্য করতে মগজ খাটাতে হবে বেশ। চঞ্চলা চড়ুইয়ের আবার অতো ধৈর্য নেই আজ। শুধু চাচ্ছে লোকটার গভীর দৃষ্টিযুগলের সম্মুখ থেকে আড়াল হতে। তাইতো কেমন অনুনয় জুড়ে শুধালো —
“ ছেড়ে দিন, প্লিজ!”
মুগ্ধের চোয়াল দৃঢ়! বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিজোড়ায় তৎক্ষনাৎ নেমে এলো এক অদ্ভুত অধিকারবোধ। ডানহাতের জোরালো শক্তিতে হাসফাসরত রমণীর ক্ষুদ্র বদনখানা বেশ কায়দা করে আগলে নিয়ে, রুক্ষ আঙুল দ্বারা খামচে ধরল রমণীর উদরের চামড়া! ত্বরিত মৃদু ব্যথায় মুখ কুঁচকে নেয় মাহি। তার অধরের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে ব্যথাতুর ধ্বনি বেরুনোর পূর্বেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের দৃঢ় অথচ ভয়ানক কন্ঠ!
“ ওহ ফা’ক অফ মা’ই লেডিবাগ! আমার হওয়ার আগে এই কথাটা মাথায় আনা উচিৎ ছিল তোর। ইউ নো নাহ? ওসব ছাড়াছাড়ি নামক বুলশিট আমার ব্যক্তিত্বে অনুপস্থিত! যা একবার চোখে ধরে — তা আমৃত্যু নিজ অধীনে রাখাটাই আমার ক্রাইটেরিয়া।”
মুহুর্তেই শীরঁদাড়া সটান হয়ে গেল মাহি’র। অন্তঃকোণে মোচড় দিয়ে উঠল অজানা কারণেই। সে ধীরলয়ে চোখ খুললো। ঘাড়ের মাংসল পেশী কুঁচকে আলগোছে চোখ তুলে তাকালো রূঢ় মানবের শক্ত মুখপানে। নিষ্পলক চোখে চেয়ে থেকে আচানক ভারিক্কি গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ যা চোখে ধরে তা-ই নিজ অধীনে নিয়ে আসেন আপনি?”
অপলক মুগ্ধ! শক্ত চোয়ালটা নাড়িয়ে গমগমে কন্ঠে কেবল প্রতুত্তর করল —
“ এনি ডাউট?”
রমণী নিস্পৃহ! একমুহূর্তও ব্যয় না করে তক্ষুনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ঁল —
“ তারমানে….আমিও কি তবে মাফিয়া বিস্টের চোখে ধরেছিলাম বলেই আজ এখানে? না-কি তার পেছনে রয়েছে কেবল প্রতিশোধ?”
“ যদি হতো প্রতিশোধের স্পৃহায় তুলে আনার সংজ্ঞা! তবে বহু আগেই তুই আঙ্গার হয়ে যেতিস মেয়ে!”
যুবকের নির্লিপ্ত প্রতুত্তর। যার চোখের ভাষা বুঝতে নতুন করে কলম ধরা শিখতে হবে মনে হচ্ছে মাহি’র। গভীর আলিঙ্গনের পর এমুহূর্তে কেমন হুট করেই লোকটাকে বড্ড অচেনা অচেনা লাগছে তার নিকট। মনে বাড়ল আরেক সন্দিগ্ধতা। সে-ই সন্দিগ্ধতার জের যেন আপনা-আপনি নেমে এলো কন্ঠায়!
“ আই ডোন্ট নো হোয়াই এম আই আস্কিং দিস, বাট — আপনি কি আমায় আগে থেকে চিনতেন বিস্ট?”
এপর্যায়ে ঠোঁটের কোণে হঠাৎ একপ্রকার ভিন্ন ধরনের হাসি ফুটলো মুগ্ধের। চোখেমুখে নেমে এলো লুকনো ভাবস্রোত! রমণী হতবাক চেয়ে রইল কেবল। তন্মধ্যে রমণীর ক্ষুদ্র মুখের ওপর ঘাড় ঝোঁকায় মুগ্ধ। ভরাট কন্ঠে প্রতুত্তরে বলল,
“ শত্রুর মেয়েকে আগে থেকে চেনাটা — ইজ নট আ বিগ ডিল, রাইট?”
নিজ উত্থাপিত প্রশ্নের গেরাকলে তৎক্ষনাৎ জড়িয়ে গেল মাহি। উঁচু করে রাখা ঘাড়টা ঝোঁকালো ত্রস্ত। শঙ্কিত বিজড়িত কন্ঠে ফের মিনমিনিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ নট আ বিগ ডিল? মাফিয়া বিস্টের চোখে ধরা-টা কি যেন-তেন ব্যাপার?”
“ তোকে কে বলল, তুই আমার চোখে ধরেছিস?”
ত্বরিত ঘাড় উঁচিয়ে পেছনে তাকায় মাহি। হতভম্ব কন্ঠে আওড়ায়,
“ ধরিনি?”
“ একদম নাহ!”
বলেই মুখাবয়বে অনিহার ছাপ টানলো মুগ্ধ। তা দেখে রমণীর অন্তঃকোণে সদ্য ফুটে ওঠা স্নিগ্ধ অনুভূতিতে কেউ যেন আগুন ধরালো! চোখদুটো অজান্তেই ভরে ওঠার যোগাড় মায়াবিনীর। কন্ঠ হলো ভারী! অস্ফুটে আওড়াল,
“ কেনো?”
সহসা চোখদুটো স্থির হলো রূঢ় মানবের। মুখাবয়ব জুড়ে নামালো খানিক শ্লেষাত্মক ভাবভঙ্গি। ত্রস্ত ঝুঁকে এসে এক ঝটকায় রমণীকে কাঁধে তুলে নিয়ে পা বাড়ালো সম্মুখে। বোকা মানবীর বড্ড রাগ হলো এতে। রাগান্বিত ভাবস্রোতে দু’হাতে ঠেলতে লাগল পাহাড়সম বলিষ্ঠকে। ঝাঁঝ দেখিয়ে যে-ইনা কিছু বলবে তার পূর্বেই শোনা গেল — নির্দয়ের কপটতাহীন স্বীকারোক্তি!
“ কারণ… বেয়াদবটা চোখে ধরার বদলে মনে ধরে বসে আছে! শুধু শুধু তো আর গালি দিই না তোকে। বেয়াদব মেয়েছেলে একটা!”
মাহি’র মাথাভর্তি অদৃশ্য আগুনে এক পশলা বৃষ্টি নামলো এতক্ষণে। স্বস্তিতে ছেয়ে গেল অন্তর। অভ্যন্তরে হাজারটা প্রজাপতি ডানা ঝাপ্টালেও বাইরে থেকে ভীষণ গম্ভীর মায়াবিনী। তবুও মাঝেমধ্যে নিরব হাসিতে অধর নড়তে লাগলো তার।
আকাশের বুকে কঠিন বজ্রপাত! ক্ষনে ক্ষনে আলোকছটার অভিঘাতে দৃশ্যমান হচ্ছে অন্ধকার চারপাশ। মেঘেদের গর্জন তখনো চলমান! মেইনরোড হতে দু-মাইল দুরত্বে একখানা ছোট পাহাড় কাটা রাস্তা। এ পথ দিয়ে জন-সাধারণের পথচলা হুট করেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে ঘন্টা খানেক আগে। তার কারণ যে এখনো জন-সাধারণের নিকট অজানা!
আঁকাবাঁকা পাহাড়কাটা রাস্তার একপাশে ছোট্ট এক বালুময় সমতল স্থান। যেথায় দু’হাটুঁতে ভর দিয়ে বসে আছেন তামিল বৃদ্ধ। একহাতে তার জ্বলন্ত সিগার, অন্যহাতে বিদেশি এলকোহলের চকচকে বোতল! গায়ে কুর্তা থাকলেও বৃদ্ধের পরনে কেবলমাত্র আন্ডারওয়্যার ছাড়া আর কিছুই নেই। একহাত দুরত্বেই বৃদ্ধের দুপাশে ঢল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার সাগরেদরা। কয়েকজনের হাতে সদ্য কিনে আনা চকচকে লুঙ্গি (ভেস্তি)। একটারও ভাঁজ খোলা হয়নি এখন পর্যন্ত। সে-ই কখন থেকে ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সকলে। অথচ বৃদ্ধকে দেখো! নিজ ক্ষমতাবলে পুরো রাস্তায় লকডাউন বসিয়ে দিব্যি মদ গিলছে।
রাত ১২টা ছুঁই ছুঁই! সাগরেদদের মধ্য হতে ভয়ে ভয়ে একজন এগিয়ে এলেন বৃদ্ধের সম্মুখে। বেভুলার ন্যায় দাঁড়িয়ে থেকে সামান্য ঝুঁকে এসে হাতে রাখা লুঙ্গিটা এগিয়ে ধরলেন। ইতস্তত কন্ঠে আওড়ালেন,
“ বস! লুঙ্গিটা পরে নিন।”
তৎক্ষনাৎ সিগারে টান বসানো বন্ধ করলেন বৃদ্ধ। আগুনের তীব্র লেলিহানে জ্বলতে থাকা চোখদুটো এক ঝটকায় খুলে তাকালেন সম্মুখের লোকটার পানে। ওমনি ভয়ের চোটে দু-কদম ছিটকে সরে গেলেন বাধ্য সাগরেদ। ওদিকে বৃদ্ধ ততক্ষণে উঠে দাঁড়ালেন। আঙুলের ফাঁকে আঁটকে রাখা সিগারটা বড্ড রূঢ়তায় কনক্রিটের জমিনে ছুড়ে দিয়ে পা পিষলেন সেথায়। পরক্ষণে এগোলেন সাগরেদ নামক লোকটার পানে। ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলছেন সাগরেদ। পেছাতে পেছাতে একপর্যায়ে আচানক তার পিঠ গিয়ে ঠেকলো পাহাড়ের গায়ে। মুহুর্তেই উপায়হীন ভীতু লোক, এদিক ওদিক তাকালেন সাহায্যের জন্য। কিন্তু ওমাহ! বাদবাকি লোকগুলো কেমন সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিয়ে নিয়েছেন নিজেদের ঘাড়। এমতাবস্থায় না চাইতেও কাঁপতে লাগলেন কৃষ্ণবরণ সাগরেদ। ভয়ার্ত দৃষ্টে তাকালেন সম্মুখে। অভিজাতের চাদরে মুড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ ধীরলয়ে এগোচ্ছেন তার দিকে। মধ্যকার দুরত্ব আর একহাত! ঠিক তখনি ভয়ে নাকমুখ কুঁচকে নিলেন সাগরেদ। তবে তার এহেন আকাশসম ভয়কে মুহুর্তেই উড়িয়ে দিয়ে বৃদ্ধ এসে দাঁড়ালেন সাগরেদের একদম গা ঘেঁষে। তৎক্ষনাৎ সর্বাঙ্গে ঝংকার বয়ে গেল ভীত লোকটার। ত্বরিত বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে চোখ মেলে তাকালেন পাশে। গম্ভীর মুখো বৃদ্ধ আরেকখানা সিগার চেপেছেন ঠোঁটের ফাঁকে। বড্ড মনোযোগে ধরাচ্ছেন লাইটার। কাজ শেষে সিগারের শেষভাগে লম্বা এক টান বসিয়ে আলগোছে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল ভীত লোকটার ঘাড়! মুখভর্তি সিগারের কলুষিত ধোঁয়া নির্গত করতে করতে আনমনে আওড়াল,
“ আমার নামটা কী বলতো?”
ভয়ার্ত ঢোক গিললো সাগরেদ! ত্বরিত দু’হাত বুকের কাছে ভাঁজ করে নিয়ে কম্পিত কণ্ঠে প্রতুত্তর করলেন,
“ আইয়াপ্পান! শ্রী-রামকৃষ্ণা আইয়াপ্পান।”
সহসা ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ টানলেন আইয়াপ্পান। সিগারে আরেকবার টান বসিয়ে ক্ষীণ কন্ঠে শুধালেন,
“ আমার ভেস্তি ( লুঙ্গি) আমার অহংকার! আর কেউ যদি তোর অহংকারকে সবার সামনে দুমড়েমুচড়ে উচ্ছন্নে তুলে, তখন তুই কি করবি?”
“ পাল্টা আঘাত করব। ঐ লোকের অহংকারকেও জনসমক্ষে দুমড়েমুচড়ে ভেঙে ফেলব।”
সাগরেদের পাল্টা উত্তর! যা শুনে কেবল তাচ্ছিল্যের সহিত হাসলেন আইয়াপ্পান। আচমকা সাগরেদের ঘাড় বরাবর জড়িয়ে রাখা হাতটা বড্ড শক্ত করে নিয়ে ফাঁস বসালেন লোকের কন্ঠায়! মুহুর্তেই নিশ্বাস নিতে না পারার কষ্টে ছটফটাতে লাগলেন ভীত লোকটি। চোখমুখ লাল হয়ে এসেছে তার, ছাড়াতে চাইছেন নিজেকে। তবে বৃদ্ধ যে তাকে দু’হাতে আঁকড়ে ধরেছেন। পালাবার পথ নেই তার। এদিকে, লোকটার ওমন ছটফটানো দেখে বৃদ্ধ কেমন বাঁকা হেসে বলে ওঠেন,
“ ভুল বললি! যে তোর অহংকারের দিকে হাত বাড়ানোর দুঃসাহস দেখাবে, তার বংশকে নির্বংশ করতে না পারলে তুই কেমন ব্যাটাছেলে, হ্যাঁ? কেউ তোকে ইট মারলে, তুই ছুঁড়ে দিবি পাহাড়! এটাই নিয়ম।”
ধীরে ধীরে ছটফটানো কমে আসলো ভীত লোকের। একটা সময় দেহ খাঁচা থেকে প্রাণ পাখি উড়ে গেল তার। নিথর হলো দেহ! বৃদ্ধ এবার ছেড়ে দিলেন নিথরকে। মুহুর্তেই নিথরের প্রা নহী ন দেহটা কেমন পাতার ন্যায় লুটিয়ে পড়ল কনক্রিটের জমিনে। বৃদ্ধ ঘাড় বাঁকালো। তক্ষুনি একজন এগিয়ে এসে বৃদ্ধের হাতে তুলে দিলেন একখানা গোল্ডেন কুড়াল! হিং স্র বৃদ্ধ তা নিয়েই হাঁটু ভেঙে বসলেন জমিনে। মুখাবয়বে এক আকাশসম উপচে পড়া রাগ নিয়ে পরক্ষণেই একের পর এক আঘাত বসাতে লাগলেন নি থ রে র গায়ে। সহসা তাজা লহুর উষ্ণতায় ভরে গেল বৃদ্ধের সফেদ রঙা দাঁড়ি -গোফ, চুল! লেপ্টে গেল তার সর্বাঙ্গে! তবুও থামছে না আইয়াপ্পান। নিজের সবটুকু রাগ নি থ রে র ওপর ঝারতে ঝারতে হিং স্র কন্ঠে গর্জন তুলে আওড়াচ্ছেন,
“ রুশদী! তোর ওপরে যাওয়ার টিকেট কনফার্ম! মনে রাখিস, তোর মরণের ঘন্টা বেজে গেছে। ইউর টাইম স্টার্টস নাউ।”
বৃদ্ধের কথার মাঝেই আকাশ চিঁড়ে নেমে এলো বারিধারা! ঝপঝপিয়ে পানির ঝাপটা এসে ভিজিয়ে দিলো আইয়াপ্পানের সর্বাঙ্গ! ধুয়েমুছে দিতে লাগল লহুর ছিটেফোঁটা। বৃদ্ধের হিং স্রতার সাথে তালে তাল মেলাতে তক্ষুনি একখানা বজ্রপাত এসে হামলে পড়ল অদূরের পাতাশূন্য গাছের ডগায়। মুহুর্তেই এক বিকট শব্দে গাছটা কেমন চিঁড়ে গেল মাঝখান থেকে। এ যেন প্রকৃতির নিরব ভুমিকা! যারা একযোগে সায় দিচ্ছে আইয়াপ্পানের হিং স্র সিদ্ধান্তে।
“ উমমম!”
চমকে উঠে মুগ্ধ! তক্ষুনি থেমে গেল তার কর্মরত হাত। আঙুলের ডগায় সাদা ক্রিমটুকু অনড় রেখে ত্বরিত চোখ তুলে তাকালো মাহি’র পানে। অস্থির কন্ঠে শুধালো,
“ ব্যথা লাগছে?”
পেঁজা তুলোর ন্যায় রূঢ় মানবের প্রশস্ত উরুর ওপর আয়েশে বসে আছে বোকা মানবী। চোখদুটো খিঁচে রেখেছে বহুক্ষণ ধরে। ক্ষতস্থানে ক্রিমের লেপন পড়তেই জায়গাগুলো কেমন জ্বলে উঠছে তার। ক’বার চেয়েছে ঔষধ না লাগিয়ে উঠে যেতে, তবে লোকটা কি আর অতো কথা শোনে? ঠিক কোলে বসিয়ে লাগিয়ে যাচ্ছে ঔষধ! রমণী ধীরলয়ে মুখ খুললো। নতদৃষ্টে আওড়াল,
“ লাগলেই-বা কি? আমার ব্যথা ক’জনেরই-বা চোখে পড়ে?”
ভ্রু গোটায় মুগ্ধ! চোয়ালের পেশি টানটান করে, শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ কি বলতে চাচ্ছিস?”
চোখ তুলে মাহি! দৃষ্টিজোড়ায় নিরব ব্যথা ফুটিয়ে, ঠোঁটে ফোটালো আহত হাসির রেশ। ক্ষীণ স্বরে প্রতুত্তর করল,
“ বলতে চাচ্ছি, দেহের ব্যথা তো অনায়াসেই চোখে পড়ে, তবে হৃদয়ের ব্যথা ক’জনেই-বা দেখে? একটা কথা কি জানেন? আমার বোধ হবার পর থেকে আমি কোনোদিন নিজের গায়ে সামান্য একটা ফুলের টোকা অব্ধি পড়তে দেখিনি। অথচ, গত চারটা মাসে আপনার সংস্পর্শে এসে আমার কপাল থেকে মা’রধর যেন সরছেই না! মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমার হয়তো কৈ মাছের প্রাণ। নাহলে এতো মা’র খেয়েও দিব্যি কথা বলছি কি করে বলুন তো? তাছাড়া একটা বিষয় আমায় সবসময় ভাবায়। তা হলো, আপনি আমায় এতো মা’রতেন, যখন ইচ্ছে তখনই মা’রতেন, তবে এতো মা’র খাওয়ার পরও আমার গায়ে ব্যথা থাকতো না কেনো? উল্টো রোজ রাতে একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমার এতো ঘুম পেতো! আমি না চাইতেও ঘুমিয়ে যেতাম। অথচ ঘুম থেকে উঠার পর আমার মনে হতো আমি একদম সুস্থ। একদম বলতে একদম! গায়ে একফোঁটাও ব্যথা থাকতো না। এছাড়া, ছোট থেকে আমার লো সুগার। ক্ষনে ক্ষনে সুগার ফল হতো, বাট রাশিয়া যাওয়ার পর এসব হলো না কেনো? এগুলো কি কোনো ম্যাজিক ছিলো? সত্যি করে বলুন, আর ইউ আ ম্যাজিশিয়ান?”
নিস্প্রভ চোখে তাকিয়ে আছে মুগ্ধ। খানিকবাদে হুট করেই ঠোঁট পিষে হাসলো সে। আঙুলের ডগায় ক্রিমটুকু নিয়ে ফের উদ্যোত হলো রমণীর ক্ষত সারাতে। আনমনে রাশিয়ান ভাষায় বলে উঠল,
“ কাক বি এতো বোলেলা, ইয়েসলি বি ইয়া চুভস্তভোভাল তভইউ বোল না সাবস্তভেন্নই কোঝে!”
(কি করে লাগতো? যেখানে তোর ব্যথাগুলো তোর বদলে আমি নিজ গায়ে অনুভব করতাম!”)
তৎক্ষনাৎ কপাল গোছালো মাহি। অবোধের ন্যায় পরপর জিজ্ঞেস করল,
“ কি বললেন? গালি দিলেন না-কি?”
কর্মরত রূঢ় মানব! মানবীর ক্ষততে সযত্নে ঔষধ লাগিয়ে আওড়াল,
“ তা কেনো মনে হলো? আমি কি শুধু গালি দিই? আর কিছু করিনা?”
থমকায় মাহি! একমুহূর্ত নিরব দৃষ্টে তাকিয়ে রইলো সুদর্শনের পানে। হুট করেই ভারী কন্ঠে শুধালো,
“ এতোটা বদলে গেলেন কেনো আপনি?”
থামলো মুগ্ধ! ঘাড় কাত করে তাকালো পরপরই। একজোড়া গভীর দৃষ্টিতে রমণীকে আঁটকে রেখে, আচানক রুক্ষ হাতের তালু ঠেকালো মানবীর তুলতুলে গাল বরাবর। অতঃপর কোনরূপ ভনিতা ছাড়াই ভরাট কন্ঠে বলে উঠল,
“ একবার যেই ভুলের হিং স্রতায় তোকে জরাজীর্ণ করেছি, দ্বিতীয়বার সে-ই ভুল আমি করছি না সিগনোরা। যেদিন থেকে কাগজে-কলমে তুই আমার হয়েছিস, সেদিন থেকে তোর গা হতে ঐ সকল বিষয়গুলো মুছে গিয়েছে যা তোকে আমার চোখে ঘৃণিত বানিয়ে রেখেছিল। তুই এখন আর খু নি তায়েফ এহসানের মেয়ে না, তুই এখন আমার স্ত্রী — মিসেস অধীর রায়। আর এটাই তোর বাদবাকি জীবনের একমাত্র পরিচয়! তোর পরিবার, পরিজন ওদের কারোর সঙ্গে তোর আর কোনো সম্পৃক্ততা নেই, নেই কোনো যোগসূত্র। তুই এখন শুধু আমার, তোর ওপর সকল কর্তৃত্বের অধিকারী কেবল আমি। মনে থাকবে?”
মাহি’র পেলব মুখখানা মুহুর্তেই স্থির হলো কেমন। চোখেমুখে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত নিস্পৃহতা! রূঢ় মানব তক্ষুনি শক্তমুখে দাঁত পিষলেন। রমণীর ক্ষুদ্র মাথাটা একহাতে আলগোছে নিজ বুকের সনে টেনে এনে কটমট কন্ঠে বলে উঠেন,
“ তুই শুধু আমার থাক সিগনোরা! তোর মস্তিষ্কজুড়ে কেবল আমাকেই রাখ। বাদবাকি সবকিছু ভুলে যে এখন থেকে। ভুলে যা সবাইকে। তোর গায়ে আমার প্রতিশোধের ছোঁয়া না লাগলেও, তোর পরিবার কিন্তু এর বাইরে নয়। যে যার উপযুক্ত শাস্তি ঠিক পাবে! এতে একদম মন খারাপ করবি না। দুনিয়ার যত সুখ আছে সব তোর পায়ের কাছে নিয়ে আসবো আমি! কথা দিচ্ছি।”
নিস্পৃহ মাহি এবার আলতো করে মুখ তুললো রূঢ় মানবের রুক্ষ বক্ষভাঁজ হতে। দৃষ্টিতে গভীরতা ঢেলে আলগোছে হাত উঠিয়ে রাখলো মুগ্ধের রুক্ষ গালের ত্বকে। মানবীর এহেন কর্মকাণ্ড দেখে খানিক ভ্রু গোটায় মুগ্ধ। সন্দিষ্ট দৃষ্টে তাকিয়ে থাকতেই মাহি কেমন আলতো হেসে বলে ওঠে,
“ আপনার যা ভালো মনে হয় তাই করুন বিস্ট! আমি আপনাকে বিশ্বাস করি। আমি জানি, আপনি মাথা গরম করে ভুল কিছু করবেন না।”
একটি বাক্য! মাত্র একটিবাক্যে অন্তঃকোণে তোলপাড় ছেয়ে গেল মুগ্ধের। পাথরসম হৃদয়ে মুহুর্তেই বয়ে গেল প্রশান্তির বাতাস। নির্দয়ের প্রলেপে জড়িয়ে থাকা মাফিয়া বিস্ট, মায়াবিনীর এহেন বাক্যে দিনদুনিয়া ভুলে গেলেন যেন। হাতে চাঁদ পাওয়ার ন্যায় আত্মতুষ্টিতে প্রশস্ত করলেন বাদামী ওষ্ঠপুট। পরমুহূর্তেই রমণীর ঘাড়ের ত্বক আকঁড়ে ধরে, মুখটা এগিয়ে আনলেন বড্ড। আলগোছে রমণীর তুলতুলে অধরযুগলের সনে মিলন ঘটালেন নিজ রুক্ষ ওষ্ঠপুটের। মানবী আজ বাঁধ সাধল না। পুরোপুরি সম্মত নাহলেও কম্পিত হাতদুটো আলতো করে উঠিয়ে আনলো সুদর্শনের রুক্ষ বক্ষ বরাবর। এতেই যেন আশকারা পেয়ে মাথায় চড়লেন বেহায়া লোক। নিজ উন্মত্ততার বেগ বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়ে তক্ষুনি মানবীর ক্ষুদ্র দেহখানা একটানে তুলে আনলো নিজ কোলে। দু’হাতের বেহায়া বিচরণে কুপোকাত করতে লাগলেন দূর্বল মানবীকে। মাহি’র যেন এটুকুতেই নিঃশেষ হবার যোগাড়! এতক্ষণ দম খিঁচে চুপচাপ বসে থাকলেও এবার কেমন ছটফট করে উঠল চঞ্চলা চড়ুই। নিশ্বাস নিতে না পারার কষ্টে ডানা ঝাপ্টালো বারকয়েক। দু’হাতে ঠেলতে লাগল রূঢ় মানবের বুক! সহসা উন্মত্ততায় বেগ টানলো মুগ্ধ। অতি সন্তর্পণে বাঁধনমুক্ত করল মানবীর সিক্ত অধরজোড়া। খানিক ঢোক গিলে গমগমে গলায় শুধালো,
“ হোয়াট হেপেন্ড সিগনোরা? ডোন্ট ইউ লাইক দ্যাট?”
বেপরোয়া ছন্দে নিঃশ্বাস টানছে মাহি। দু’হাত বুকের কাছে আঁটকে রেখে চোখবুঁজেছে সে। এদিকে তার এহেন বেগতিক দশা দেখে অস্থির মুগ্ধ। ব্যাকুল কন্ঠে তখন থেকে শুধচ্ছে,
“ পানি খাবি সিগনোরা? নিশ্বাস টানতে খুব কষ্ট হচ্ছে? অক্সিজেন আনবো? হসপিটাল… হসপিটাল যাবি? না ডাক্তার নিয়ে আসবো?”
যুবকের ফের পাগলামি! তা দেখে এবার অস্থির হবার বদলে বড্ড শান্ত রইল মেয়েটা। তড়িঘড়ি করে দু’হাতে আগলে ধরল মুগ্ধের রুক্ষ দু’গাল। সহসা অস্থিরতা বেশ কমে এলো বেপরোয়া যুবকের। অস্থির আঁখিদ্বয় একত্রে তাক হলো মাহি’র পানে। সপ্তদশী ধীরলয়ে মাথা নাড়লো। বড্ড অমায়িক কন্ঠে আওড়াল,
“ এতটা অস্থির হবেন না বিস্ট! আ’ম ওকে। একচুয়েলি, আমি আজ ভীষণ ক্লান্ত! তাই একটু রেস্ট নিতে চাচ্ছি। আপনি যদি….”
মুহুর্তেই টনক নড়ল মুগ্ধের। ত্বরিত মেয়েটাকে আগলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় বসা ছেড়ে। তুলোর সাদৃশ মায়াবিনীকে বিছানা অব্ধি নিয়ে যেতে যেতে ব্যাকুল কন্ঠে শুধালো,
“ ভুলে গিয়েছিলাম! আয়, আয়। তোকে ঘুম পারিয়ে দিই।”
হুট করেই নড়েচড়ে উঠল মাহি। ত্বরিত মুগ্ধের গলা জড়িয়ে ধরে আমতা আমতা স্বরে বলে,
“ বিস্ট! আ’ই নিড টু ফ্রেশেন আপ। সো প্লিজ, পুট মি ডাউন।”
থামলো মুগ্ধ! ঘাড় ঝুঁকিয়ে তাকায় পরক্ষণে। সন্দিহান গলায় বলে ওঠে,
“ ওয়াশরুম যাবি? ওকে ফাইন, চল।”
বলেই পা ঘোরালো মুগ্ধ। গন্তব্য হলো ওয়াশরুমের দুয়ার! তক্ষুনি মাহি কেমন ইতস্তত কন্ঠে আওড়াল,
“ হেই! নামান আমায়, আমি একা যেতে পারবো।”
শুনলো না মুগ্ধ! বরং মেয়েটাকে কোলে নিয়ে এগোতে এগোতে ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে শুধালো,
“ কেনো? আমি আছি না। আমি নিয়ে গেলে কি সমস্যা?”
দাঁত খিঁচে মাহি! চিড়বিড়িয়ে বলে,
“ আমি ওয়াশরুমে যাবো বিস্ট। নাচতে না, যে আপনাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।”
তৎক্ষনাৎ থেমে গেল মুগ্ধ! শক্ত মুখে গমগমে গলায় প্রতুত্তরে বলল,
“ ওয়াশরুমে গেলে দু’জন যাওয়া যায় না? কোথায় লেখা আছে এসব?”
অতিষ্ঠ মাহি! এপর্যায়ে ভীষণ বিরক্ত সে। তেঁতো কন্ঠে বলে উঠল,
“ এ্যাই আপনি আমায় নামাবেন?”
মায়াবিনীর রাগান্বিত কন্ঠ কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই সটান রূঢ় মানব। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আলতো করে নামিয়ে দিলো মেয়েটাকে। ছাড়া পেতেই উড়াল দিতে প্রস্তুত মাহি। দু’টো কদম সম্মুখে বাড়াতেই আচানক পেছন থেকে হাতে টান পড়ল তার। মাহি ঘুরলো না। উল্টো দাঁত খিঁচে বলে ওঠে,
“ আবার কী?”
রূঢ় মানবের চোখদুটো কাতর বড্ড! যেন মাহি’র একটুখানি বিচ্ছেদও এমুহূর্তে বড্ড পোড়াচ্ছে তাকে। কেমন কাতর গলায় শুধালো,
“ তাড়াতাড়ি চলে আসিস কেমন?”
শক্ত ঢোক গিললো মাহি। জোরপূর্বক কব্জি ছাড়ালো রূঢ় মানবের রুক্ষ হাতের মুঠো হতে। ধীর কন্ঠে আওড়াল,
“ ঠিক আছে।”
বলেই আর দাঁড়াল না মাহি। একছুটে চলে গেল ওয়াশরুমে। তড়িঘড়ি করে দুয়ার আঁটকে পিঠ ঠেকালো দরজার সনে। বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস টেনে নিজেকে ধাতস্থ করবার চেষ্টায় মত্ত মাহি। ক্রমশ শক্ত হচ্ছে তার চোয়াল। চোখদুটোতে জ্বলছে আগুন! চোখের কার্নিশ ভরে উঠছে কেন যেন। মায়াবিনী হুট করেই ঢোক গিলতে লাগল বারংবার। কদম বাড়িয়ে এগিয়ে এলো বেসিনের সম্মুখে। আয়নার অভিমুখে দাঁড়িয়ে নিজ প্রতিচ্ছবির দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে বলতে লাগলো,
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৬১
“ সরি বিস্ট! পুরো পৃথিবী মানুষ জড়ো হয়ে আমার আব্বুকে দোষী সাব্যস্ত করলেও, আমি কোনোদিন তা বিশ্বাস করব না। আমার আব্বু কেমন তা আমি জানি! আমি আপনাকে বিশ্বাস করতে চাই বিস্ট, তবে আমার বাবাকে অবিশ্বাস করে নয়। আমি একজন ভালো প্রেমিকা হতে গিয়ে, কুসন্তান হতে পারব না। আমি যাবো আমার আব্বুর কাছে। অবশ্যই উত্তর লাগবে আমার! আমি প্রমাণ করে ছাড়বো — আমার আব্বু, তায়েফ এহসান নির্দোষ।”
বলেই রমণী বেসিনের ফুটোয় আঙুল ঢোকালো। মুহুর্তেই সেখান থেকে বেরিয়ে এলো একখানা ধারালো ব্লেড। তা হাতে নিয়ে খানিক চেয়ে রইল মাহি। ধীরলয়ে তাকালো নিজ বা হাতের কব্জিসন্ধির পানে। অতঃপর … ব্লেডের ধারালো অংশ বাড়ালো সেদিকে।
