মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৮ (২)
Tahmina Akhter
আগামীকাল সকালে আলো তার মা’কে নিয়ে সিলেট শহরে ফিরবে। গত একটা দিন সে জামান হাউজের প্রত্যেকটা কোণায় কোণায় গিয়ে ঘুরেছে। হাত দিয়ে একটুখানি ছুঁয়ে দেখেছে। তার শ্বাশুড়ির ঘরটার দরজার কাছে গিয়েও বারবার ফিরে এসেছে। কারণ, আলোর সাহসে কুলোয় না। দরজা খোলার পর ” তার শ্বাশুড়ির সদা হাসোজ্জল মুখটা দেখতে পাবে না” এই ভাবনাটুকু মাথায় আসতেই আলোর দমবন্ধ হয়ে আসে৷
তারপর, হাঁটতে হাঁটতে দোতালায় গিয়ে ডাক্তার সাহেবের ঘরের সামনে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। আলোর অবাধ্য হৃদয়টা বারবার তাকে বলছে, ঘরের দরজা খুলে দেখতে। কিন্তু মস্তিষ্ক বলছে, “যেদিন ডাক্তার সাহেবকে নিয়ে এই বাড়িতে আবারও ফিরে আসবে ঠিক সেদিনই এই ঘরের দরজা খুলবে। তার আগে নয়।”
আলো হাঁটতে হাঁটতে নীচে নেমে আসে। তার মায়ের কাছে গিয়ে দেখল ইতি, কাব্য এবং সিতারা বেগম কি নিয়ে যেন আলাপ করছে? আলোকে দেখে ইতি বলল,
— তুমি কোথায় ছিলে?
— একটু হাঁটছিলাম।
ইতিকে জবাব দিয়ে কাব্যের দিকে ফিরে আলো বলল,
— স্যার, আমি একটু কবরস্থানে যেতে চাই। নিয়ে যাবেন? অনেক বছর হলো আমার অনাগত সন্তানের কবর টুকু ছুঁয়ে দেখেনি!
উপস্থিত সবাই আলোর কথা শুনে স্তব্দ হয়ে গেছে। সিতারা বেগমের চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। কাব্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— তুমি নিজেকে নিয়ে এমন কথা বলছো কেন? সন্তানের মায়ের হৃদয়ে থাকে। মায়েরা তাদের সন্তানদের হাজারবার হৃদয় দিয়ে স্পর্শ করতে পারে।
কাব্যর কথা শুনে আলো মেকি হাসি দিয়ে বলল,
— স্যার আমি কত নিষ্ঠুর মা আপনি জানেন না! নিজের মান-অভিমানকে সব কিছুর উর্ধ্বে রাখার জন্য আমি আমার বুকের মানিকের শেষ ঠিকানা অব্দি একবার দেখতে চাইনি!
আলোর কথার পিঠে আর কেউই কিছু বলতে পারল না। সবাই নিরবতাকে সাদরে গ্রহণ করলো।
কাব্য উঠে দাঁড়ালো। তারপর ইতিকে উদ্দেশ্য করে বলে গেল সবাই যেন তৈরি হয়ে নেয়। কবরস্থানে যাবে।
পৃথিবীর সবচেয়ে নিরব জায়গা হয়ত কবরস্থান। মানুষের দেহ আছে কিন্তু কোলাহল নেই। ভারী অদ্ভুত বিষয়! মৃতদের আত্মীয় স্বজনরা যখন কবরস্থানে প্রিয় মানুষটার সমাধির সামনে এসে দাঁড়ায় তখন নিরবে চোখের অশ্রু ঝরায়। হৃদয় কেমন গুমরে ওঠে! এত সুন্দর পৃথিবীকে তখন পানসে লাগে! জীবনের মানে কিংবা জীবনের শেষ পরিণতি সম্পর্কে সামান্য হলেও অনুধাবন করা যায়। এত চাকচিক্যে ঢেকে রাখা জীবনের শেষ পরিণতি এই সুন্দর ধরণী থেকে বিদায় নেয়া৷
“পৃথিবী, তুমি নিষ্ঠুর বলেই কি তোমাকে এত ভালোবাসি? জানি, একদিন ছেড়ে যেতে হবে—তবু বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা ফুরোয় না। এই অনিবার্য বিচ্ছেদই কি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে এত মূল্যবান করে তোলে?”
আলো, ইতি, তীব্র, সিতারা বেগম এবং কাব্য অবশেষে কবরস্থানে চলে গেলো। একই সাড়িতে তানিয়া, মাহরীন এবং মেঘালয়-আলোর অনাগত সন্তানের কবর৷ কাব্য চুপচাপ তাকিয়ে আছে তার মায়ের কবরের দিকে। আলো তাকিয়ে ছোট কবরের দিকে। ধীরে ধীরে ছোট কবরের কাছে গিয়ে বসল। তারপর কবর ছুঁয়ে আনমনে বলল,
— আসসালামু আলাইকুম, বাবা। আমি তোমার মা। আমাকে চিনতে পারছো? অবশ্য তুমি আমাকে চিনতে পারার কথা না। আমিও তোমাকে দেখিনি। সবাই ভীষণ নিষ্ঠুর বুঝলে! তোমার বাবাও ভীষণ নিষ্ঠুর। তোমার বাবা আমাকে কষ্ট দিতে চায়নি বলে তোমাকে এক নজর দেখতে দেয়নি আমায়। অথচ, আমি একটিবার যদি তোমাকে দেখতে পারতাম। তোমাকে দেখতে না পারার এই আফসোসটুকু আমার রয়ে যাবে। পরকালে হাশরের ময়দানে তোমাকে আমি কি করে চিনব বাবা? কেন সবাই আমাকে একটিবার তোমাকে দেখানোর প্রয়োজনবোধ করল না? সবাই কেন আমার সকল ইচ্ছেকে অপূর্ণ রাখে?
আলোর চোখের বিন্দু জল কবরের ওপরে পড়ছে। সিতারা বেগম আর ইতি আজ আর আলোকে বাধা দিলেন না। কারণ, বহুবছর পর মেয়েটার নিজের বলতে কেউ ছিল সেই মানুষটাকে অনুভব করার কষ্টে সে আজ বেসামাল হয়ে কাঁদছে।
কাব্য এগিয়ে এসে আলোর পাশে বসে কবরের ওপরে হাত রেখে আলোর কান্নারত মুখটার দিকে তাকিয়ে বলল,
— ঠিক তোমার মতই একদিন মেঘালয় ঠিক এভাবেই বেসামাল হয়ে কেঁদেছিল। ছোট কবরের দিকে তাকিয়ে আমার ভাই অনেক অনেক কেঁদেছে। কারণ, জানতে চাইলাম আর কি বলল জানো? বলল, “আজ আমার রাজপুত্র বেঁচে থাকলে তার মা আমাকে কখনো ছেড়ে যেত না। বাচ্চার বাহানায় হলেও সে আমার হয়ে থেকে যেত। আমার বাচ্চাটা কেন রইল না ভাই? সেও কি তার মা মতো অভিমান করেছিল আমার ওপর? করেছিল হয়তো? নয়তো আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কারণ কি? আমি যত্ন করতে পারি না? নাকি আমার ভালোবাসা কম? নাকি আমি ভালোবাসার সঠিক সংজ্ঞা জানি না?
কাব্য চুপ করে রইলো কথাগুলো শেষ করে। আলো চোখের পানি মুছে চুপচাপ উঠে চলে গেল তার শ্বাশুড়ির কবরের সামনে। যাকে মায়ের স্থানে রেখেছিল সেই মানুষটাকে কিনা শেষবারের মতো দেখতে পারল না! শেষবারের মতো একটিবার দেখতে পেলে কেমন হতো? তিনি কি আলোকে বুকে টেনে নিতেন? নাকি দুরছাই করতেন? যেমনটা শেষবারের দেখায় করেছিলেন?
পরদিন সকালে সিতারা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হলো আলো। কয়েকঘন্টার জার্নি শেষ করার পর অবশেষে গন্তব্যস্থলে পৌছাতে সক্ষম হয়েছে। বাসায় ফিরে দরজার তালা খোলার সময় কেউ এসে আলোকে উদ্দেশ্য করে বলল,
মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪৮
“হ্যালো, কালো ভ্রমর! অনেকদিন তোমার দেখা নেই। কী ব্যাপার? অন্য কোথাও কি নতুন আস্তানা খুঁজতে গিয়েছিলে? আমাদের এই ছোট্ট বাসাটা তবে তোমার আর ভালো লাগছে না? নাকি সত্যিই বনজঙ্গলের ডাকে সাড়া দিয়ে উড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছো?”
আলো দরজার তালা খুলে সিতারা বেগমকে ঘরে ঢোকার ইশারা করে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পেছনে ফিরে ছেলেটার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
