Home মেজর ওয়াসিফ মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩১

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩১

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩১
ঐশী রহমান

রাত বেড়েছে, সেই সাথে বেড়েছে রাতের নিস্তব্ধতা। পেটে খিদে থাকার পরও ভীষণ মন খারাপের ভারে ঘর থেকে বের হয়নি ধারা। রাগে, দুঃখে বুকটা ফেটে যাচ্ছে ওর। এমন কেনো হচ্ছে বুঝতে পারছেনা। ও কি দিনকে দিন মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছে? নাকি পরীক্ষা চাপে পড়ে পিষে যাচ্ছে?
সপ্তাহ খানেক পর টেস্ট পরীক্ষা, অথচ বইগুলোর দিকে ওর কেনো টানই আসছেনা। মন মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে বারবার।
ঘরের মধ্যে অনেক গরম লাগার পরও সাহস করে জানালাগুলো খুলছেনা ধারা। ও আবার বরাবরের ন্যায় ভয়কাতুরে। কারেন্ট গেলো বেশ সময় আগে, এখনো আসেনি। গরমে অধৈর্য্য হয়ে ওড়না দিয়ে মুখ,গলা মুছে নিতে নিতে একদফা বকাঝকা করলো বিদ্যুৎ অফিসের কর্মচারীগুলোকে। হাতপাখা টেনে বাতাস খাওয়ার পরও এই গরম কমছেনা একটুও। বিদ্যুৎ অফিসের লোকগুলোকে ছেড়ে এবার মনে মনে বকলো ওয়াসিফকে। ‘ নিজে তো থাকে আরামে, এদিকে যে ঠাডা পড়া গরমে আমরা সেদ্ধ হয়ে যাই,সেদিকে উনার কোনো হুশ নেই।’
ধারার মেজাজ চটেছে ভীষণ, ও খাট থেকে নেমে ফ্লোরে বালিশ নিয়ে শুলো, মিনিট দুই পর আবার তড়িঘড়ি করে বিছানায় উঠলো, মনে পড়লো পোকামাকড় কিছু এলে ওর আর এঘরে থাকা হবেনা, অভিমান ভুলে সেই আপার কাছেই যেতে হবে, তার চেয়েও ভালো গরম লাগছে লাগুক।

এসব করে সময় কাটে না ধারার, পড়তে ইচ্ছে করছে না, কারেন্ট নেই যে ঘুমিয়ে যাবে। ফোনের ফ্লাশ অন করে কতক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে ব্যাগ থেকে একটা নোটখাতা টেনে বের করলো। ঠিক করলো, মন ভালো নেই, ওর যা যা মন চায়, ছাতারমাথা সব একটা একটা করে লিখবে। ফোনটা হাতে ধরে লেখা সম্ভব না তাই দু’টো বালিশ উঁচু করে আরেকটা বালিশে এলিয়ে রাখলো। কলমটা হাতে তুলে দাঁত চেপে কলমের মুখটা খুলে নিয়ে নোট খাতার মাঝ পৃষ্ঠা থেকে লেখা শুরু করলো। কলম চালালেও ঠিক কি লিখবে মাথায় আসছেনা। কয়েক মুহূর্ত ভেবে ঠিক করলো, যে কথা গুলো তাকে কখনো মুখের উপর স্পষ্ট করে বলা হয়নি,আজ এই মনখারাপের রাতে সেই কথা গুলো কাগজে তুলবে। প্রথমেই হাত চালিয়ে লিখলো।
‘ ধমক দিয়ে কেড়ে নেওয়া ডায়েরি দুটো কবে ফেরত দেবেন মেজর শাহেদ ওয়াসিফ? আপনি জানেন না অন্যের গোপন কিছু কেড়ে নিতে নেই? এতটুকু জ্ঞান আপনার নেই ‘?
পরবর্তী লাইনে লিখলো।

‘ আমাকে বিয়ে করেছেন কেনো? যতবার জিজ্ঞেস করেছি একথার জবাব আপনি আমাকে সুস্পষ্ট করে দেননি। কেনো দেননি? কি সমস্যা আপনার ‘?
এক প্যারা থেকে আরেক প্যারা কিছুটা গ্যাপ দিয়ে লিখলো।
‘ ষোলো বছর বয়সে যাকে তাচ্ছিল্য করে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ঊনিশের চৌকাঠে তাকে কেনো ঘরে তুললেন? ঘরে তুলবেনই যখন ওভাবে অপমান করে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন কেনো? এর কোনো কিছুর জবাবই আপনি কখনো আমাকে দেননি? কেনো? আপনার এতো লুকোচুরি খেলার মানে কি’?
ধারার লেখা একেকটা প্রশ্ন অবহেলায় পড়ে থাকছে সাদা কাগজের পাতায়। ধারা জানে ঐ লোকের কানে এসব যাচ্ছে না। শুধু মনকে হালকা করতে লেখা, লেখা শেষ হয়ে গেলে এই কয়েকটা পেজ টেনে ছিড়ে ফেললে সব শেষ। এর কিছু ই পোঁছাবে না ঐ মানুষটার নিকট।
সব প্রশ্ন লেখা শেষে চুপচাপ বসে রইলো ধারা, পরবর্তী সাদা পেজ উল্টে হাতের কলম উঁচু করে রেখেছে। কয়েক মুহূর্ত পর সেখানে লিখতে শুরু করলো।

‘ সেদিন যে ঐ ডায়েরি দুটো আমার থেকে নিয়ে নিলেন তারপর থেকে আপনাকে নিয়ে আর কখনো কিছু লেখা হয়নি আমার। প্রায় আড়াই বছর পর আবার লিখতে বসলাম আপনাকে, জানি না কেনো? আজ বড্ড আপনাকে লিখতে মন চায়ছে, বহুদিন পর আমার হুট করে মন খারাপের রাতে আপনাকে লিখতে মন চাচ্ছে….
আমার জীবনের প্রথম পুরুষ আপনি, যার চালচলনে, দৃঢ়তা, আর শ্যামলা গম্ভীর চেহারায় মুগ্ধ হয়েছিলাম ষোলো’তে। আপনি সেদিন বলেছিলেন আমার বয়সের দোষ, আমি মানলাম, মেনে নিলাম। প্রায় কুড়িতে এসেও আমার ষোলো’র সেই মুগ্ধতা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আমি পারিনি মেজর শাহেদ ওয়াসিফ।
তবে এখনও কি আপনি বলবেন প্রায় কুড়ি’র বয়সটাও আমার দোষের বয়স?
আপনার ঐ কথাটাতে সেদিন কষ্ট পেয়ে কাদলেও আজ আমার ভীষণ হাসি পাচ্ছে। কিন্তু আমি আপনাকে দেখাতে পারছিনা সেই হাসি, এরজন্য এখন আমার দুঃখ হচ্ছে।
আপনি হয়তো আমার নিয়তিতে ছিলেন তাই তো সেদিন ফিরিয়ে দেওয়ার পরও নিজ ইচ্ছেতে বৌ করেছেন। তবে আমার ভীষণ জানার ইচ্ছে, কেনো করলেন বিয়েটা? কখনো কি আমার জানা হবে একথা?
আমার বিশতম জন্ম দিনে আমার সেরা উপহার আমি পেয়ে গেছি। কেনো জানি আমার মনখুলে বাংলা সিনেমার ঐ দুটো গানের লাইন মনে পড়ছে।

‘ এজীবনে যারে চেয়েছি, আজ আমি তারে পেয়েছি’
আমি সত্যি পেয়েছি, আমার একটা সময় মনে হতো, মানুষ একজীবনে সবকিছু পায়না, কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি সেই লাকি দশজনের একজন, আমি আপনাকে পেয়েছি,যাকে আমি ষোলো বছর বয়সে চেয়েছিলাম। আমার জীবন পূর্ণ, আমি আপনাকে পেয়েছি মানে সবকিছু পেয়েছি। আমার এই জীবনে আর কোনো আফসোস নেই।
আজ বহুদিন পর অনেক কিছু লিখে ফেললাম আপনাকে নিয়ে, অথচ এতোকিছু আমার লেখার কথা নয় আপনাকে নিয়ে কারণ আপনার উপর আমার রাগ, অভিমান সবকিছু। ‘
কারেন্ট এসেছে ইতিমধ্যে, চোখ দুটো না চাইতেও আরামের ঘুমের জন্য বারবার বুঝে আসছে। তবুও ধারা আরেকবার কলম চালালো।
‘ আজ আর কিছু লিখবোনা, আপনি তো এসব কিছু দেখবেন না, আপনাকে আমি দেখাবোইনা। তবে শেষ দুটো লাইন লিখে আজকের মতো শেষ করি’
‘ ষোলো’তে বলেছিলাম, আপনাকে আমার ভালো লাগে, সাড়ে উনিশে এসে বললাম আপনাকে আমি ভালোও বাসি এবং আল্লাহ যদি বাচিয়ে রাখে চল্লিশে গিয়ে বলবো ” আপনাকে আমার ভালো লাগে, আপনাকে আমি ভালোও বাসি”
০৯-০৯-২০১৬
আপনার বৌ, মুমতাহিনা!

বর্তমান ___________ সাল ২০১৮
ডাক্তার আফরোজা ইয়াসমিনের কেবিনে গুমোট হয়ে বসে আছে ওয়াসিফ। আফরোজা ঘন্টা তিনেক সময় ব্যয় করে ঘটনা বিস্তারিত মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। হঠাৎ ওয়াসিফ নিরব হতেই,বললেন।
‘ তারপর? সব বললে কিন্তু তোমার ওয়াইফের এমন সিচুয়েশনের পেছনের রিজনটা বলছোনা কেনো মেজর শাহেদ.. ‘
আফরোজার কথা পুরোপুরি শেষ না হতেই ওয়াসিফ মাথা তুলে তাকায় উনার দিকে। কন্ঠস্বর নরম রেখে স্পষ্ট করে বলে ওয়াসিফ।
‘ সেনাবাহিনীর কর্মজীবন ত্যাগ করেছি আন্টি, আপনার নিকট আমার অনুরোধ থাকবে ঐ শব্দ উচ্চারণ করে আমাকে আর ডাকবেন না। আমার নাম শাহেদ ওয়াসিফ, আপনি শুধু ওয়াসিফ বা শাহেদ নামেই ডাকতে পারেন’
আফরোজা তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ ওয়াসিফের মুখের দিকে, বলে।
‘ দিন দিন তোমার ওয়াইফের মানসিক কন্ডিশন খারাপ হচ্ছে ওয়াসিফ, ও ভালো নেই, কিভাবে ও ভালো হবে একজন ডাক্তার হিসেবে আমিও দিশেহারা’
ওয়াসিফ আশেপাশে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলে।
‘ সিদ্ধান্ত নিয়েছি, খুব তাড়াতাড়ি ওকে নিয়ে আমি দেশের বাইরে যাবো, চোখের সামনে তিলে তিলে ওকে শেষ হতে দেখতে পারবোনা, ভেতরে ভেতরে আমিও শেষ হয়ে যাচ্ছি আন্টি ‘
‘ আমার হাতে যা কিছু ছিলো সব দিয়ে চেষ্টা করেছি, এগারো মাসের চিকিৎসা করিয়েও আমি ওকে ঠিক করতে পারিনি, এখন সিদ্ধান্ত তোমাকে নিতে হবে, তুমি ঠিক করো তুমি কি করবে’
ওয়াসিফ মাথা নুইয়ে রেখে আস্তে করে বলে ‘ ওকে বাচিয়ে রাখতে গিয়ে এখন আমি প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছি, সেদিন যদি আমার জানটা নিতো কোনো আফসোস রইতোনা। কিন্তু ওরা তা করলোনা, ওরা কি করলো? আমার কলিজায় থাবা বসিয়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ফেললো। আমি সব ভুলে গেলেও মুমতাহিনা তা পারছেনা আন্টি। আমিও হয়তো এতোদিন বাঁচতাম না শুধু বেঁচে আছি ঐ মেয়েটার জন্য ‘

আফরোজা একটু নড়েচড়ে বসে বললো।
‘ তারপরের ঘটনাগুলো তো আর বললেনা ওয়াসিফ’?
ওয়াসিফ হাত ঘড়িতে সময় দেখে, ধারাকে ঘুম পাড়ানোর জন্য ঔষুধ দেওয়া হয়েছিলো ঘন্টা চারেক আগে, ওয়াসিফ চেয়ার ছেড়ে উঠতেই বলে।
‘ আমাকে ফিরতে হবে ম্যাম,ওর পাগলামি আমি ছাড়া কেউ সামলাতে পারবেনা, ভীষণ পাগলামি করে, হাতের কাছে যা পায় তাই দিয়ে নিজেকে আঘাত করে। বাকি ঘটনা সময় করে আরেকদিন বলবো, আজ আসি’
ওয়াসিফ কেবিনের নব খুলে বেরিয়ে যেতে গিয়েও কি মনে করে আবার ঘুরে দাঁড়ায়, বললো।
‘ পরবর্তী ঘটনা গুলো যেদিন শুনবেন ঐদিন হয়তো আপনার চোখ দুটো আপনার কথা শুনবে না, আপনি হয়তো সেদিন খুব কাঁদবেন ম্যাম’
কথা টুকু বলেই ওয়াসিফ আর দাঁড়ায় না, চলে যায় কেবিন ছেড়ে। ওয়াসিফ বেরিয়ে যেতেই একজন জুনিয়র সহকর্মী কেবিনে ঢোকে। মুখোমুখি চেয়ার টেনে বসে আফরোজার কাছে জিজ্ঞেস করে।
‘ এই ভদ্রলোক কে দেখি অনেক দিন যাবত আপনার চেম্বারে আসে ম্যাম, উনি কি অসুস্থ? উনি রোজ কেনো আসে ম্যাম’?
আফরোজা একটা গভীর শ্বাস ফেলে বলে।

‘ ভদ্রলোক কে চিনো তুমি ‘?
‘ নো ম্যাম’
‘ উনি একসময় সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন, বছর দুই আগে নিজ ইচ্ছেতে সেই চাকরি ছেড়েছে। এর পেছনের কারণ কি জানো’?
জুনিয়র সহকর্মী শেলি ভীষণ কৌতূহলী হয়ে পড়ে, দুপাশে কেবল মাথা নাড়িয়ে বোঝায় সে কিছুই জানেনা। আফরোজা নিরব দম ফেলে বলে।
‘ মেজর শাহেদ ওয়াসিফ উনার নাম, নামটা ঐ একই কিন্তু মেজর শব্দটা আর যুক্ত নেই। তবুও আমি মেজর পদ উল্লেখ করেই ঘটনা বলি, মেজর শাহেদ ওয়াসিফ তার কর্ম জীবনে একবার নয়,বহুবার ঝুকিপূর্ণ মিশন তার কাঁধে তুলে নিয়েছিলো। কয়েকবার করে বুলেট বিধে মরার ঘর থেকে ও ফিরে এসেছিলো, জান হারাতে হারাতেও তিনি কখনো পিছুপা হন নি, দেশ ও জনগণের কল্যাণে লড়ে গেছে বারবার। কিন্তু একটা কথা কি জানো, আমাদের ডেসটিনি! মানে নিয়তি/ভাগ্য, কখন কোথায় কাকে টেনে খারাপের সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে বোঝার উপায় নেই।’
কিছুক্ষণ থেমে ফের আফরোজা বলে।
‘ সেবার মেজর শাহেদ ওয়াসিফ লম্বা এক মিশনে হাত দিয়েছিলো, ঝড় কাপটা যা কিছু হোক সব তিনি চেয়েছিলো তার উপর দিয়ে যাক, কিন্তু সহকর্মীর চরম বিশ্বাসঘাতকতায় মাঝ নদীতে তরী হারা এক পথিক এই শাহেদ ওয়াসিফ’

‘ শেলি! তোমার গায়ের পশম হয়তো দাড়িয়ে যাবে আরো কয়েকটি বাক্য শুনলে, তুমি কি শুনতে চাও’?
শেলি ভীষণ অস্থির হয়, ‘ জি ম্যাম, শুনতে চাই ‘
‘ জা*নো*য়ারদের সেই সাহস ছিলো না, তারা শাহেদ ওয়াসিফের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ করতে আসেনি, তারা
কি করেছিলো জানো’?
‘ কি করেছিলো ম্যাম’
‘ জা*নো*য়ারগুলো মেজর শাহেদ ওয়াসিফকে চিরতরে মৃত্যু সমান সাজা দিয়ে তার প্রাণপ্রিয় বৌকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো’
এতটুকু বলেই থামে আফরোজা। আফরোজার চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে। শেলি এতটুকু শুনে আরো অস্থির হয়ে পড়ে।

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩০

‘ তারপর কি ম্যাম, তারপর বলুন’
আফরোজা চশমার কাচ ঠেলে চোখ দুটো মুছে নিতে নিতে বলে।
‘ আর কিছু আমি জানিনা। শুধু জানি, ওয়াসিফের ওয়াইফ মুমতাহিনা ধারা মানসিক রোগী, টানা এগারোটা মাস যার চিকিৎসা করেও কূল কিনারা পাচ্ছি না, সুস্থ ই হচ্ছে না মেয়েটা। ওয়াসিফ ব্যতীত ওর ধারেকাছেও কেউ যেতে পারেনা। কাউকে সহ্য করতে পারে না একমাত্র ওয়াসিফ ব্যতীত’

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩২