প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৪
সাইয়্যারা খান
“কি? মুখে কথা নেই কেন? তোতার জামাই এমন ভোঁতা মুখ করে আছে কেন?”
এই এত রাতে তালুকদার বাড়ীর তিন তলার বাম পাশের ফ্ল্যাটে ধুমাধুম ঝগড়া বেঁধেছে তাও কিনা এক তরফা। তৌসিফ যেখানে বউয়ের মন ঠিক করতে মরিয়া সেখানে তার বউ কোন জায়গার কথা টেনে এনে সংসারে অশান্তি করছে। এসব মানা যায়? যত্তসব অশান্তির কারবার।
সটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পরলো তৌসিফ। কণ্ঠে গাম্ভীর্য এনে বললো,
“আমার ফুট মাসাজারটা দাও।”
বলতে না বলতেই কোথা থেকে উড়ে এলো কাঙ্খিত বস্তু। এটা একটা খুব সাধারণ ইঙ্গিত, কেন উত্তর দেওয়া হচ্ছে না। তৌসিফ মহা মুশকিলে পড়লো। এখন ঐসব কথাবার্তা টানতে মন চাইছে না তার। কিছুটা দ্রুততার সাথে পৌষ বিছানায় এলো। তৌসিফের হাত থেকে ছোঁ মেরে ম্যাসাজার নিলো। মানুষ নিজেকে ভালোবাসে তাই বলে এতটা? পৌষ তৌসিফকে না দেখলে বুঝতোই না৷ আসাম করে বসে কোলের উপর তৌসিফের পা টেনে নিলো ও। পায়ের তালুতে আরাম বোধ করতেই চোখ বুজলো তৌসিফ। রুমে তখন অনুজ্জ্বল হলদেটে আলো যা পৌষের খুব অপছন্দের। তৌসিফ আবার এস্থেটিক মাইন্ডের মানুষ। পৌষের অতশত পছন্দ না৷ ভালোও লাগে না। আরামে তৌসিফ ঘুম ঘুম ধরেই যাচ্ছিলো তখন পায়ের ক্ষুদ্র আঙুলে টান অনুভব করলো। একে একে সবগুলো আঙুল টেনে দিচ্ছে পৌষ। ধীরে ধীরে হাঁটু পর্যন্ত টিপে দিলো। তৌসিফের গাম্ভীর্যের ভার তখন কমছে। মোমের মতো গলছে সে। গলতে গলতে অবশিষ্ট কিছুই যখন নেই তৌসিফ তার অতি চলাক বউ কিছুটা হামাগুড়ি দিয়েই তৌসিফের বুকে চলে এলো। ঠেলে কাত করে তৌসিফের কাঁধ টিপতে টিপতে বললো,
“মাথাটা বানিয়ে দেই?”
“দুপুরে আজ হেয়ার স্পা করেছি হানি।”
“বাহ্ বাহ্ খুবই ভালো। শুনে খুশি হলাম। আসুন উঁকুন মেরে দি।”
তৌসিফ ঢোক গিললো। তার গলার পানি শুকিয়ে আসছে। পরিস্থিতি যতটা প্রেমময় মনে হচ্ছে ততটাও প্রেমময় না বরং বেশ ভয়ংকর। জটিল। তার বউ এমন আদর বিনাকারণে করে না। তৌসিফ শ্বাসটাও গুনে গুনে ছাড়ছে। বুকে ডান হাত দিয়ে ঠোঁট ফাঁক করে কোনমতে বললো,
“আমার মাথায় তো উঁকুন নেই তোতাপাখি।”
“লিক আছে তাহলে।”
“না। সেটাও নেই।”
“পুঞ্জিল আছে নিশ্চিত।”
“পুঞ্জি? এটা আবার কি?”
“এটা উঁকুনের শশুর বাড়ীর লোক। আসুন। কাছে আসুন। আমি খুঁজে দেখি।”
তৌসিফের মনে হচ্ছে ওর চুল আজ মাথায় থাকবে না। সব খাবলে তুলবে পৌষ। ভয় হচ্ছে আবার বউয়ের আদর পেতে মনটা লোভীও হচ্ছে। কোনমতে পৌষের কোলে মাথা দিলো ও। খুশিতে গদগদকণ্ঠ হয়ে এলো পৌষের। তৌসিফের কপালের দিকে ঝুঁকে প্রসস্থ কপালে চুমু খেলো একটা। আদুরে কণ্ঠে বললো,
“লক্ষী সোনা বর আমার।”
চুমুতেই আধকাঁত হয়ে গেছে তৌসিফ। তার চোখে এখন হলুদ সর্ষে ফুল নীল লাগছে। মাতাল মাতাল অনুভূতি হচ্ছে। বুকে লাব ডাব শব্দ হচ্ছে সাথে প্রচুর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। পৌষের এই আদর ও হজম করতে পারে না সহজে। এই মাঝরাতে এমন এক পরিবেশে তৌসিফ গা ছেড়ে শুয়ে আছে বউয়ের কোলে। তার চুলের ভাজে চিকন হাতের আঙুল গুলো খুব সুন্দর মতো চলছে। তৌসিফ আরামে গুঙিয়ে উঠলো। পৌষ তখনও তৌসিফের সিল্কি চুলের মাঝে আঙুল বুলাচ্ছে। মাঝেমধ্যে টেনে টেনে দিচ্ছে। হাতটা ধীরে ধীরে দাঁড়িতে এলো। চাপ দাঁড়িতে তৌসিফকে মারাত্মক লাগে, পৌষ জানে কিন্তু স্বীকার করা মানা। মুখে সে কিছুতেই স্বীকার করবে না৷
এদিকে মাত্রই চোখ লেগে ঘুমিয়ে যাওয়া তৌসিফ টের পেলো তার গলায় হাত বুলাচ্ছে। ফট করে চোখ খুলতেই পৌষের মুখটা নজরে এলো। হলুদ আলোয় তার চোখ দুটো চিলিক দিচ্ছে। পৌষ ওর দুই কাঁধে হাত দিয়ে হাত দিয়ে চাপতে চাপতে বললো,
“ল্যাটকার মতো পড়ে আছেন কেন? দেখি মুখটা দেখান।”
তৌসিফ বেয়াক্কেলের মতো তাকিয়ে রইলো। পৌষ ওকে ঠেলতেই কোল থেকে মাথা নামিয়ে বালিশে এলো তৌসিফ। পৌষ সেকেন্ডের ব্যাবধানে ওর বুকে চলে এলো। তৌসিফ সময় ব্যায় করে না৷ দুই হাতে জড়িয়ে ধরে ওকে। কিছুক্ষণ বিড়ালের মতো ঘেঁষাঘেঁষি করে পৌষ প্রচুর আদর নিলো অতঃপর ওভাবেই জিজ্ঞেস করলো,
“রনি ভাইয়া তো ভালো ছেলে। তাকে না করলেন কেন?”
তৌসিফ তখন আকাশে ভাসছে। জমিনে তার পা নেই। কোনমতে বললো,
“কি না করলাম?”
“বিয়ের বিষয়ে?”
তৌসিফ জানে, তার বউ অত ভালো না যে খামাখা তাকে আদর দিবে তবুও আজ বউয়ের প্রশংসা না করে পারলো না। এক প্রশ্নের উত্তর জানতে কতটা সময় মেহনত করলো। তৌসিফ ওকে আরেকটু জড়িয়ে ধরলো। কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো,
“রনি ভালো কিন্তু সোহা না।”
“তাতে কি? বিয়ে দিয়ে দিন।”
“রনি আরো ভালো মেয়ে ডিজার্ভ করে পৌষরাত। সোহার মতো ধূর্ত মেয়েকে ও সামালাতে পারবে না।”
“উনি পছন্দ করে যতটুকু মনে হলো।”
“সেটাই। পছন্দ করে। সোহা হসপিটালে আছে কয়েকমাস যাবত। রনিকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম সোহার। হয়তো এতটা দিন ধরে দেখছে তাই মনে ধরেছে। এরমানে এই না আমি ওর বোকা আবদার মেনে নিব।”
“আপনার সৎ বোন এমন করার কারণ কি? আর তাহমিনা আপা…. ”
শাহাদাত আঙুল ঠেকিয়ে পৌষের ঠোঁট বন্ধ করলো। বললো
“এই পুরো তালুকদার বাড়ী এক রহস্য পৌষরাত। তুমি একমাত্র যে এত অল্প সময়ে সম্রাট ভাইজানের বাগান বাড়ী ঘুরে এসেছো। অনেক কিছু জেনেছো। শাহরিয়ার ভাইজানকে দেখেছো। আর কারো সাহস হয়নি এতদূর যাওয়ার।”
“আপনাদের পরিবার অদ্ভুত।”
“জানি।”
“কপাল কি আমার? একদম ঝামা দিয়ে ঘষা। শশুর বাড়ীতে জ্বালানোর মতো কেউ নেই। না শাশুড়ী, না ননদ, না কুটনি ননাস।”
“তিনজন আছে। ভুলে গেলে?”
“তায়েফা আপা তো খুব ভালো। তবে ঠিক বলেছেন আপনার ছোট বোন একটা…”
“থাক, বদনাম করতে হবে না।”
পৌষ মুখ ভেঙালো। তৌসিফ ওর মাথাটা নিজের বুকেই রাখলো। গায়ে ব্লাংকেট টানতে টানতে বললো,
“কিছু মানুষ আছে যাদের মানুষ নিজের কুঁড়ে ঘরে ডাকতেও ভয় পায় অথচ তারা থাকে প্রাসাদে। এর কারণ কি জানো? এর কারণ হলো তার নজর। নজর খুব ভয়ংকর। তাদের প্রাসাদে শান্তি থাকে না বলে তারা অন্যের কুঁড়েঘরেও নজর দেয়। তুমি এমন এক নজরকারীকে ভালো নজরে দেখো পৌষরাত৷ তার থেকে দূরে থাকো। সবাইকে কাছে টানতে নেই। তুমি যেমন সবাই তো তেমন না৷”
“কার কথা বলছেন?”
“পলক।”
“আপনি তো ছোট ভাইয়াকে কত আদর করেন।”
“ও আমার র ক্ত পৌষরাত।”
“হুঁউম।”
পৌষ ঘুমিয়েছে তৌসিফ বুঝতে পারছে। ক্ষুদ্র শ্বাস ফেলে নিজেও চোখ বুজলো ও। পলকের হাবভাবপূর্ণ মুখরা দেখে তৌসিফ অনেকিছুই আন্দাজ করতে পারে। তুহিনের সাথে পৌষের এখন ভালো সম্পর্ক। দু’জন সাপ নেউটের মতো ঝগড়া করে অথচ মায়া মহব্বত দুই তরফ থেকেই আছে। পৌষ নতুন সম্পর্ক গুলোকে খুব করে যত্ন নিচ্ছে। তুরাগের গম্ভীরতা প্রচুর তাই হয়তো একটু দূরত্ব। বুকের পাশটায় লেগে থাকা মুখটা দেখলো তৌসিফ। ওর মাঝেমধ্যে মনে হয় পৌষ ওকে ঠিক ওর আম্মুর মতো যত্ন নেয় যেভাবে আজ পর্যন্ত কেউ নিতে পারে নি। তুহিনও এমনটাই মনে করে তাই তো হাজার ঝগড়া ঝামেলা করে এখন ছুটে আসে মেঝ ভাইয়ের ফ্ল্যাটে।
পিঠ জুড়ে বিরাজমান করছে ভিজা চুলগুলো। বাইরে সুন্দর বাতাস বইছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচে নজর দিলো পলক। সূর্য এখনও উঠে নি। উঠলেও তার কিরণ এসে পৌঁছায়নি তালুকদার বাড়ীর আঙিনায়। সাদা একগাদা রাজহাঁস নিয়ে হাঁটছে তুহিন। অনেক শখের এগুলো তার। রিহ্যাবে থাকাকালীন তৌসিফ লোক লাগিয়ে দায়িত্ব দিয়েছিলো। মাঝেমধ্যে ভাইয়ের শখ গুলো নিজে এসে দেখে যেতো। পলক সেসব জানে। তুহিন দৌড়ে এসেছে। এসেই হাঁস ছাড়িয়েছে লোক দিয়ে। এখন ওগুলো তরতরিয়ে ঘাটের পানিতে নামছে। তুহিন অবশ্য একা না। দুই চারজন আছে সাথে। মাঝেমধ্যে কথাবার্তা বলছে। পলকের চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে তুহিনকে দেখে। নিতান্তই সুন্দর সে। তবে সবাই স্বীকার করতে বাধ্য এদের ভাইদের মধ্যে সবচাইতে সুন্দর তৌসিফ। তুহিন ছোট সেটা দেখলেও বুঝা যায়। হালকা গেলাপি রঙের একটা টাউজারের সাথে সাদা ঠোলা টিশার্ট পরে আছে। চুলগুলো অবিন্যস্ত। পলক দেখলো তৌসিফও দৌড়ে এসেছে। হাঁপাচ্ছে কিছুটা। তৌসিফের রূপচর্চার চর্চা হয় পরিবার জুড়ে। পলক চোখ উল্টে ভেতরে চলে এলো। আদিত্যও ততক্ষণে এসেছে ওখানে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চাচ্চুদের উদ্দেশ্যে বললো,
“তোমরা আব্বুকে কেন টানো না এসবে? আব্বুর পেট বেড়ে যাচ্ছে। আম্মু রোজ চেঁচায়।”
তুহিন ভাতিজাকে টেনে কাঁধে তুলে ফেললো। ছোট থেকে এভাবে কাঁধে চড়িয়ে ঘুরতো ওকে নিয়ে। আজ অনেকদিন পর এভাবে তুলায় আদিত্য চমকেছে তবে ছাড়ে নি। শক্ত করে ধরে উল্টো বলছে,
“ছোট চাচ্চু একরান হবে।”
“অবশ্যই আব্বা।”
তুহিন ছুটছে। পেছনে তৌসিফও দৌড়াচ্ছে তবে ধীরে ধীরে। তুহিন ক্লান্ত হলো শিঘ্রই। ধপ করে ঘাসে বসতেই আদিত্য বলে উঠলো,
“আজ তোমার তালই, বিয়ান সব আসছে ছোট চাচ্চু।”
তুহিন অবাক হয়ে তাকালো তৌসিফের দিকে। তাকে জানানো হয় নি। তৌসিফ আদিত্যকে চোখ রাঙালো। তুহিন দাঁত বের করে হাসলো। মাথার নিচে হাত ভাজ করে বললো,
“কি ভেবেছো তোমার জোড়া শালিক আমি এত সহজে ছাড়ব? ঐ বেসাইজটাকেই তো ছাড়ব না।”
“কোন ঝামেলা করবি না তুহিন।”
“জরু কা গুলাম।”
আদিত্য চোখ বড় বড় করলো। মেঝ চাচ্চুকে এই উপাধি দিয়েছে এখন রেগে গেলে সে মোটেও অবাক হবে না কিন্তু বেচারা আদিত্য তো জানে তার মেঝ চাচ্চু বহু আগেই নিজেকে এই উপাধিতে ভূষিত করেছে। তৌসিফ মোটেও রাগ দেখালো না। তুহিন উঠে গা ঝাড়তে ঝাড়তে বললো,
“নাস্তা আজ তোমার ফ্ল্যাটে খাব। তোমার বউকে বলবে তোমাকে যেভাবে মুচমুচে করে ঘি দিয়ে পারাটা ভেজে দেয় আমাকে যাতে ওভাবেই দেয়।”
তৌসিফ চোখে হাসলো। আদিত্য মাথা চুলকে বললো,
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৩
“দাওয়াত তো দুপুরে আর রাতে।”
“তোদের আবার দাওয়াতও দিয়েছে? নিশ্চিত ঐ ঝগরুটে পৌষ আমার ভাইকে ফুসলেছে নাহয় আমাকে কেন বললো না।”
“কোন ঝামেলা করবি না তুহিন।”
“তুমি তো জরু কা গুলাম। আসছি আমি নাস্তা খেতে। অ্যঁই আদি চল ব্যাটা। একসাথে খাব।”
