Home প্রেমসুধা সিজন ২ প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৩

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৩

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৩
সাইয়্যারা খান

ফুরফুরে মেজাজে আজ এদিক ওদিক ঘুরেফিরে কাজ করছে পৌষ। আদিত্য ডেকে গিয়েছে একটু আগে। আজ অনেকদিন পর ভার্সিটিতে নিজের পদধূলি দিতে যাবে পৌষ। তৌসিফ বেরিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। অবশ্য বলে গিয়েছে পৌষকে দিতে সে যাবে। শোনা মাত্র মুখের উপর না করেছে পৌষ। আগে তো একাই যেতো বাসে ঝুলে। তৌসিফ বউয়ের সুন্দর মেজাজ দেখে আর টু শব্দ করে নি৷ নতমস্তকে মেনে নিয়েছে। আপাতত সে ‘জরু কা গুলাম’ হয়ে থাকবে। সামনে হানিমুন। নুন থেকে চুন খসলে বউ যদি হানিমুনে না যায়? তৌসিফ তখন কি করবে? তার তো মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে হবে। বাইরে দাপট দেখানো তৌসিফ তালুকদার ঘরে নিতান্তই বিড়াল তাও কিনা মেনি বিড়াল।
ফোন রিং হতেই পৌষ তুললো৷ তৌসিফ ফোন করছে। রিসিভ করে লম্বা সুরে সালাম দিলো পৌষ,

“আসসালামু আলাইকুম শোয়ামি।”
ওপর পাশ থেকে গলা খ্যাঁকানি শোনা গেলো। তৌসিফ তালুকদার হজম করতে পারে নি বউ থেকে পাওয়া অতিরিক্ত সম্মান৷ একটু রয়েসয়ে উত্তর দিলো সে। জিজ্ঞেস করলো,
“বেরিয়ে গিয়েছো হানি?”
“না, বের হব।”
“আমি অপেক্ষা করছি তাহলে।”
“কিসের অপেক্ষা করছেন আপনি? বলেছি না আদির সাথে যাব।”
“হ্যাঁ, আদি আমার সাথেই আছে। তুমি তৈরী হয়ে নেমে আসো।”
“ভালো লাগে না।”

কথাটা বিরবির করে বলে ফোন কাটে পৌষ। পরপর গুনগুনিয়ে গান গাইতে গাইতে চুলগুলো আঁচড়ে নেয়। ভ্যানিটি ভর্তি সরঞ্জাম যা তৌসিফ তার বউয়ের জন্য এনেছে কিন্তু পৌষের বলাই কাটে এসব দেখলে। ঠোঁটে কোনমতে টিন্ট পর্যন্ত লাগাতে রাজি না সে। অভ্যাস একদমই নেই। ওরনাটা গলায় ঝুলিয়ে আজ হঠাৎ তাকালো আয়নায়। চড়া দামের এক পাকিস্তানি স্যুট তার পরণে। ঢোলা জামাটায় পৌষের চিকন দেহ মোটেও বুঝা যাচ্ছে না। তৌসিফ নিজে পছন্দ করে এগুলো কিনেছে। লোকটার পছন্দ সুন্দর। পৌষ মুখ বাঁকা করলো। নিজেকে দেখে বললো,
“পছন্দ সুন্দর না হলে আমাকে পেতো? ব্যাটার কপাল সোনায় গড়া। ঐ কপালে কপাল ঘষা দিতে হবে। হাহ্।”
কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে পৌষ বুয়াকে বলে বেরিয়ে গেলো। নিচে নামতে নামতে হঠাৎ একটা বন্ধ দরজায় খেয়াল করলো। দুই তলার দ্বিতীয় ফ্ল্যাটটা বন্ধ থাকে। আজ অনেক দিন পর বিষয়টা খেয়াল করেছে পৌষ। তৌসিফকে জিজ্ঞেস করবে ভেবে তারাতাড়ি নেমে গেলো ও।

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে রনি। তৌসিফ ফাইল সাইন করে ওকে ফিরিয়ে দিয়েই গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“বাজারের টাকা তুলেছো এই মাসে?”
“আজ দশ তারিখ বস। আট তারিখে কিছু তুলেছিলাম। আজ বাকিগুলো তুলব।”
“একটা ভালো জেলে দেখে রূপচাঁদা আনিও তো। আমার শালীরা পছন্দ করে। দেশের বাইরে যাওয়ার আগে ওদের আনব।”
“জি, বস।”
“রনি?”
বেখেয়ালি রনি কিছুটা হকচকিয়ে গেল। তৌসিফ ওকে পরখ করছে। রনি ঘাবড়ে গেলো কিছুটা কিন্তু নিজেকে সামলে নিলো খুব দ্রুত। তৌসিফ খুব সাধারণ ভাবে বললো,
“কিছু বলবে?”
“আসলে বস।”
“বলো। শুনছি। মা অসুস্থ তোমার? টাকা লাগবে?”
“না বস।”
“ফাস্ট রনি। পৌষরাত আসবে। ওকে ড্রপ করতে যাব।”
“বস সোহার রিলিজ হয়ে যাবে এই সপ্তাহে।”
সরু চোখে তাকালো তৌসিফ। কপালে দুটো ভাজ পড়লো তার। জিজ্ঞেস করে বসলো,

“তো?”
কিছুটা ফেঁসে গিয়ে রনি খেই হারিয়ে ফেললো তবুও বললো,
“আমি সোহাকে বিয়ে করতে চাই বস।”
প্রচুর সাহস নিয়ে কথাটা বললেও চোখ তুলে তাকানোর সাহস রনি পেলো না। তাকালে তৌসিফের অতিরিক্ত কুঁচকে যাওয়া কপাল ঠিক তার নজরে এতো। নিজের কাঁধে তৌসিফের হাতের অস্তিত্ব পেতেই রনি জমে গেলো নিজ স্থানে। তৌসিফ শুধু বললো,
“তোমার বিয়ে খুব ভালো জায়গায় দিব।”
ব্যাস এতটুকুই। পৌষ এসেছে, তৌসিফ দেখেছে। আপাতত এই বিষয়ে কথা বাড়ালো না তৌসিফ। পৌষকে এগিয়ে এনে গাড়িতে বসালো। আদিত্য আগে থেকেই গাড়িতে বসা। মূহুর্তেই গাড়িটা দৃষ্টির আড়াল হলো। গ্যারেজের সামনেই ঠাই দাঁড়িয়ে রইলো রনি। তার দৃষ্টি ঘোলা হলো কি?

“রাফিদের কোন আতাপাতা পেলে না?”
প্রশ্নটা শুনেই আদিত্য চমকেছে। কোনমতে জানালো সে জানে না। পৌষ বিশ্বাস করে না। খুঁচিয়ে বলে,
“খোঁজ নাও। যাবে কই শালা? ওকে এক চরম শিক্ষা দেওয়া বাকি?”
“নিয়েছিলাম পুষি। হি ইজ লস্ট নাও।”
পৌষের মুখ বিরক্তিতে তেঁতো হয়ে আসে। ক্যান্টিনের দিকে যেতে যেতে বলে,
“চা খাবে?”
“তুমি খাওয়াবে?”
“ভাতিজা মানুষ , একটু নাহয় চাই খাবে। আহো ভাতিজা চা খাই।”
লজ্জা পেয়ে গেলো আদিত্য। পৌষকে তার ডন মনে হয়। কিভাবে যে বন্ধুত্ব হয়ে গেলো তা আজও আদিত্য বুঝে উঠতে পারে না তবে চা অফার কারণ কারণ খুঁজে পেলো খুব দ্রুত৷ পৌষ এক চুমুক চা পান করেই সরাসরি জিজ্ঞেস করলো,

“পলক আপুর সাথে ঝামেলা বলতে ঠিক কতটুকু আদি? মানলাম আগের ঝামেলা ছিলো কিন্তু কতটুকু ছিলো? সবাই এখনো কেন তাকে দেখতে পারে না?”
আদিত্যের চা গলায় আটকে গেলো। ঢোক গিলে কোনমতে বললো,
“আমি জানি না পুষি।”
“তোমার পুষিকে বাম পা দিয়ে দু’টো শট মারব আদি। সত্যি বলো।”
আদিত্য ফেঁসে গেলো তবুও বলতে লাগলো,
“আগে এমন ছিলো না পুষি। আগে যখন দাদু ছিলো তখন সবাই একসাথে ছিলো তো। এরপর ঝামেলা হয়েছিলো। মেঝ চাচ্চু তোমাকে বলেছে নিশ্চিত। এরপর থেকেই তো এমন।”
“আর কিছু?”
আদিত্য মাথা নাড়লো। সে আর জানে না। পৌষ হতাশ হলো। পলকের অদ্ভুত অদ্ভুত ব্যাবহার তাকে ভাবিয়ে তুলে বারবার তবে পৌষ আর মাথা মারলো না সেদিকে।

রাতটা আজ হালকা ঠান্ডা ঠান্ডা। বৃষ্টি হয়েছে বেশ। ফেরার পথে ভিজতে চেয়েছিলো পৌষ। তৌসিফ সরাসরি না করেছে। সেই থেকে রেগে আছে পৌষ। কথাবার্তার ধারেকাছেও যাওয়া যাচ্ছে না। কি সুন্দর বাহানা দিলো। ভিজলে নাকি পৌষের ঠান্ডা লাগবে তখন তাদের হানিমুনের মুড নষ্ট হবে। পৌষ লাত্থি মারে ঐ হানিমুনে। বাসি মুখেও হাসি আসে না তার ঐ হানিমুনের জন্য। মনে মনে হাজারও লাঞ্ছনাবাণী শুনিয়েছে ও। এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাপড় ভাজ করে রাখছে। মহাশয় বাবুসাব সেজে কাউচে শুয়ে ফোন টিপছে।
“হানি, হোয়াট উইল উই ডু ইন আওয়ার হানিমুন?”
পৌষ বিরক্ত। সে মহাবিরক্ত মুখ বানিয়ে উত্তর করলো,
“করার মতো কিছু আছে?”
তৌসিফ তরতরিয়ে বউয়ের কাছে এলো। চোখ মুখে চরম বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করলো,
“নেই বলছো?”
পৌষের মুখ তেঁতো হয়ে এলো। হাতে থাকা কাপড় আলমারিতে তুলে রাখতে রাখতে বললো,

“পুরাতন জামাই আমার। এই পুরাতন জামাই নিয়ে অত রঙঢঙ আমার আসে না। আজাইরা ঢং।”
তৌসিফের চোয়াল ফাঁকা হলো। কি বললো তার বউ? তৌসিফ পুরাতন? তার কি তবে আগের জৌলুশ নেই? ঘড়িতে কয়টা বাজে তৌসিফ দেখলো না। সে চলে গেলো বাথরুমে। আয়নায় নিজেকে দেখলো। শক্ত জ এড়িয়া তার। চোখের জ্বলজ্বল ভাব মোটেও কমে নি৷ একটা সামান্যতম ফাইনলাইন নেই। তার বউ তাহলে অনিহা কেন দেখালো? একে একে বিভিন্ন প্রডাক্ট তৌসিফের হাতে উঠছে। বাইরে থেকে পৌষ চেঁচাচ্ছে। কেন তৌসিফ রাত বারোটায় ওমন বাথরুমে ডেরা গেড়েছে। তৌসিফ শোনে না। সে তার বউয়ের চোখে সবসময় নতুন থাকতে তখন মরিয়া হয়ে উঠেছে অথচ বেচারা বেমালুম ভুলে গিয়েছে তার বউ পৌষরাত যাকে সে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে পারে না।
পাক্কা ঘন্টা খানিক পর গ্লোয়িং চেহারা নিয়ে বেরিয়ে এসেছে তৌসিফ। এতে সামান্য প্রশংসাটুকু তার কপালে জুটে নি৷ এসে দেখলো গলা পর্যন্ত ঢেকে শুয়ে আছে পৌষ। তৌসিফ সময় অপচয় করলো না। নিজেও বউয়ের পাশে চলে এলো। নিচ থেকে হাত বাড়িয়ে টেনে নিলো কাছে। পৌষের গাল দুটো দুই হাতে আঁকড়ে নিজ বরাবর করে শুধালো,

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭২

“এখন লাগে নতুন নতুন?”
ঋণাত্মক মাথা নাড়ে পৌষ। তৌসিফের মুখটায় তখন চরম মাত্রায় হতাশা। পৌষ ওর বুকে লেগে গেলো। তৌসিফ যেন এতেই সব ভুলে গেলো। বউয়ের কপালে চুমু খেয়ে বললো,
“আমরা খুব আনন্দ করব।”
“আপনি সোহার বিয়ে দিতে চান না কেন?”
তৌসিফ নিজের অশান্তি ভুলে হানিমুনের পরিকল্পনা করছে অথচ তার বউ? তার বউ শুধু নজরদারি করছে। তৌসিফের নাকে দম করতেই সে পছন্দ করে।

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭৪