প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭২
সাইয়্যারা খান
বৃষ্টিমুখোর পরিবেশ। সকালটা বেশ আলসেমিতে কাটতে চাইছে যেন। উবুড় হয়ে নরম গদির বিছানায় ঘুমাচ্ছে তৌসিফ। খালি গায়ে শোয়ার দরুন তার ধবধবে ফর্সা পিঠটা দেখা যাচ্ছে। পিঠের দিকে কালো হয়ে উঠেছে সেই কলঙ্কের দাগ। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো পৌষের। রাফিদের করা কাজটার খোঁটা ইদানীং তুহিন খুব দিচ্ছে। পৌষের তখন মনে হয় সেগুলো শুধু ফাঁকা বুলি না, শব্দগুলো পৌষের বুকের মাঝে ঢুকে খামচে ধরে হৃদপিণ্ড। মনে হয় গলায় কাটা বিঁধে তখন। যেই পৌষ কোনদিন প্রেম ভালোবাসায় জড়ায় নি সেই পৌষের স্বামী গু’লি খেয়েছে তাকে পছন্দ করা ছেলের হাতে। বিষয়টা খুব বিশ্রীভাবে দেখে পৌষ। বিয়ের আগে প্রেম ভালোবাসা এসব খুব ছোট নজরে দেখে ও। এধরণের সম্পর্ককে নোংরা বলতেও দ্বিতীয়বার ভাবতে হয় না ওকে অথচ বিষয়টা ঘটে গেলো পৌষের নিজের সাথে।
আধ শোয়া হয়ে চাদর টেনে বসে আছে পৌষ। তৌসিফের কোমড় পছন্দ সিল্কের চাদর টানা। পৌষ একটু ঝুঁকে কাছে এলো। ওর কোমড়টা তৌসিফের বাম বাহুতে আটকানো। পিঠের কালো দাগটায় ঠোঁট ছুঁয়ে চুমু খেলো পৌষ। আদুরে চুম্বনে শুষে নিতে চাইলো সবটুকু বিষাক্ত কালো রঙ। তার সুন্দর বরের পিঠে এহেন দাগ একেবারেই মানানসই না। চুমু খেয়েই সরে গেলো না বরং ঠোঁটটা ওখানেই ঠেকিয়ে রাখলো। পরপর বেশ কতগুলো চুমু খেলো দাগটায়৷ হাত বাড়িয়ে নরম ভাবে বুলিয়ে দিলো সেখানটায়। সিল্কের চাদরটা টেনে পিঠটাও ঠেকে দিলো পৌষ। তৌসিফের থেকে সরে নিচে নামার প্রস্তুতি নিতেই আধ ঘুমে থাকা ভাঙাচোরা এক পুরুষ কণ্ঠ কানে এলো ওর। শরীরে কাঁপন ধরানো সেই ডাক। অন্য যেকোনো নারী সেখানেই হিম হয়ে যেতো কিন্তু সম্মুখে থাকা নারী পৌষ বলে এমন ঘটলো না৷ হাসিমুখে তাকালো বরং ঘুমন্ত তৌসিফের দিকে যে কিনা মাত্রই ‘হানি’ বলে ডেকেছে।
“যদি জানতাম এক দাগে আমার পৌষরাত আমাকে এভাবে আদর দিবে তাহলে তো আমি নিজের সারা অঙ্গে দাগ বয়ে বেড়াতাম।”
কথাটা তৌসিফ বন্ধ চোখেই বললো অথচ খেঁকিয়ে উঠেছে তার বউ,
“ফালতু কথা… বারবার ফালতু কথা বলবেন না৷”
তৌসিফের ঘুমন্ত চোখও যেন হাসে তখন। তার তোতাপাখি শুনতে পারে না এমন কথা। তুহিন যখন উল্টোপাল্টা বলে ক্ষেপায় তখনই তো পারলে কাঁচা চিবিয়ে নেয় তুহিনকে।
পৌষ উঠে চলে যেতে চায় কিন্তু তৌসিফ হাত বাড়িয়ে ওর কোমড়টা জড়িয়ে ধরে টানে নিজের দিকে। এগিয়ে এনে এক টানে ফেলে দেয় নিজের উন্মুক্ত বুকে। লোমশ বুকের স্পর্শ নিজের গায়ে পেতেই পৌষ শান্ত হয়৷ লেপ্টে যায় মূহুর্তে তৌসিফের সেই বুকে। দু’জন তখন সিল্কের সেই চাদরের নিচে। পৌষের মাথায় চুমু খেলো তৌসিফ। বিনিময়ে পৌষ কোনদিন খালি হাতে ফেরায় না তৌসিফকে। আজও ফেরালো না। তৌসিফের লোমশ বুকে মুখ গুঁজে ঘষলো আদুরে বিড়ালের ন্যায়। সেখানটায়ই চুমু খেলো দুটো। তৌসিফের ঠোঁটে হাসি ফুটলো। সে তার বউ থেকে এভাবেই দ্বিগুণ আদর পেতে অভ্যস্ত। তবে সেটা অবশ্যই তার বউয়ের মন মেজাজের উপর নির্ভর করে৷ আজ নিশ্চিত মন ভালো নাহয় এত সুন্দর সকাল তার কপালে জুটে কই?
তৌসিফ গলায় বেশ আদর ঢেলে ডাকলো,
“হানি?”
“জি।”
“আজ মনে হচ্ছে তোমার মন মেজাজ ভালো।”
“কেন?”
“না মানে, যদি আরেকটু আদর পেতাম।”
কথাটা বেশ সতর্কতার সাথে বললো তৌসিফ তবে তাকে অবাক করে দিয়ে পৌষ বুক থেকে মুখ তুললো। তৌসিফের দাঁড়িতে আঙুল ঢুকিয়ে চুলকে দিতে দিতে উপর গালে চুমু দিলো। পরপর তৌসিফ লাই পেয়ে পৌষের নাকে চুমু খেলো। এই সাত সকালে ঝুমঝুম করে বৃষ্টি শুরু হলো আবার। বাইরের ঠান্ডায় জবুথবু হয়ে গেলো পৌষ। লালচে হয়ে আসা পৌষের গলায় হাত বুলিয়ে তৌসিফ দরদ মিশ্রিত গলায় বললো,
“ইজ ইট হার্ট মাচ, হানি?”
“অল্প।”
তৌসিফ বুকের সাথে মিশিয়ে রাখলো পৌষকে। তার বুকে থাকা এই তোতাপাখি তার ভীষণ আদরের। অতি পছন্দের, চরম মাত্রায় যাকে তুলুতুলু করে রাখে তৌসিফ যা তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। তাই তো তুহিন সহ পরিচিত সকলে অবাক হয়। কারণ একটাই, এই তৌসিফ তালুকদারই কোন এক কালে প্রেম করেছিলো। প্রেমিকা তার তখনও ছিলো। একটা নয় বরং বেশ কয়েকটা প্রেম সে করে এসেছে সেই দশম শ্রেণি থেকে। টিকেনি একটাও তবে শেষটা? শেষটা কোন ছেলেখেলা ছিলো না। সেটা ছিলো তৌসিফের জীবনে সবচাইতে দীর্ঘতম প্রেম। পা’গল করা প্রেমিক ছিলো তৌসিফ তবে নিজের পৌরষসত্তার উপর কোনদিন আঁচড় লাগতে দেয় নি। নিজ গাম্ভীর্যের সঙ্গে সে প্রেম করেছে। প্রেমিকা রেখেছে। আসা যাওয়া পর্যন্ত ছিলো এই তালুকদার বাড়ীতে। কার সাহস ছিলো তখন মুখ তুলে টু শব্দ করার? কারো না। সেই প্রেম ছুটার পর থেকে তৌসিফ সব ভুলেছিলো। অবশ্য কোনদিন বলে নি বিয়ে-শাদি করবে না। করলেও যে সে নিজের সর্বস্ব এভাবে এক নারীর কদমে রেখে দিবে সেটা অন্যকেউ তো দূর স্বয়ং তৌসিফ তালুকদারও বুঝে নি। এই এক পৌষরাতের প্রেমের সুধা পান করে তৌসিফ টলেছে, গলেছে, উন্মাদ হয়েছে এবং এতে তার বিন্দুমাত্র আফসোস নেই।
“আমরা হানিমুনে যাচ্ছি হানি।”
তৌসিফের প্লেটে ভাত দিয়ে কপাল কুঁচকে তাকালো পৌষ। ভাবখানা এমন যেন শুনতেই পায় নি। আজও টেবিলে তারা একা না। আদিত্য আর অদিতি আছে সাথে। দুই ভাই-বোনকে পৌষ ডাকিয়ে এনেছে। চিংড়ি মালাই করলেই অদিতির অঘোষিত দাওয়াত থাকে মেঝ চাচ্চুর ফ্ল্যাটে। আদিত্য এসেছে চামের উপর। পৌষ সবার প্লেটে খাবার দিতেই মিনু যেভাবে গিয়েছিলো ঠিক সেভাবেই ফিরে আসতে দেখলো পৌষ। মিনুকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো সহসা,
“বাসায় নেই ছোট ভাইয়া?”
আড়ালে এত সুন্দর ডাক আর সম্মান যে পৌষ তুহিনকে দেয় তা জানে না তুহিন। জানলে জ্বরে ভুগতো, ভুগতে ভুগতে পৌষকে জ্বালাতে গা জ্বালানো কথাবার্তা বলতো। মিনু হাতে থাকা ডিশটা টেবিলে রাখতেই পৌষ খুললো। যেমন দিয়েছিলো ঠিক তেমন ফেরত এসেছে। কষ্টটষ্ট আবার পৌষ পায় না কিন্তু অবাক হয়েই বললো,
“রাখে নি?”
মিনু মাথা নাড়লো। মানে রাখে নি। গটগট করে বলতে লাগলো হুবুহু সেই সব বাক্য যা পলক তাকে দরজায় দাঁড় করিয়ে শুনিয়েছে,
“ছোট মামী বলেছে, এসব জিনিস যাতে আর না পাঠান। এসব খেয়ে কাল পেট খারাপ হয়েছে ছোট মামার। অবস্থা খুব খারাপ। এখন এসব খেলে আরো খারাপ হবে। আর সাথে এটাও বলেছে আর যাতে কখনো কিছু না পাঠান।”
“এখানে যা আছে সবই খাওয়ার যোগ্য। আমি তো আর ভাজাপোড়া পাঠাই নি।”
“জানি না৷ উনি খুলে দেখেছে। এরপর ফেরত দিয়েছে।”
পৌষ বিশেষ পাত্তা দিলো না ওসবে। তৌসিফের দিকে তাকিয়ে বললো,
“দুটো পেট খারাপের ঔষধ আর স্যালাইন নিয়ে দেখতে যাবেন আপনার বিচ্ছু ভাইকে। আজ-কাল বাদরও অসুস্থ হয়৷ না জানি কোন ডোবায় মুখ ডুবিয়েছিলো।”
অদিতি খেতে খেতে হাসছে। মুখেরটুকু গিলে বললো,
“মেঝ চাচি বদর তো গাছে ঝুলে। ডোবায় থাকে না।”
“এটা তালুকদার বাড়ীর বিশেষ বাদর অদি। এটা ডোবায় থাকে।”
“ডোবার পানি এনেছি তোমার জন্য ফুপাতো বোন। খাবে নাকি? টেস্ট করে দেখো। চমৎকার স্বাদ।”
দরজায় দাঁড়িয়ে আছে তুহিন। বিড়াল যেমন মাছের ঘ্রাণে ছোট ছোট পায়ে হেঁটে আসে তেমনই তুহিনও এখানে চলে এসেছে। সে দেখেছে পলক ঝাঁঝালো গলায় ধমকে পাঠিয়ে দিয়েছে মিনুকে। খাবারের লোভে আর পৌষকে জ্বালাতে তুহিনও পলকের চোখের সামনে দিয়ে এখানে এসেছে। পৌষ বিরসমুখে তাকিয়ে দেখলো। ঢিলাঢালা এক টিশার্টের সাথে ব্যাগী পরণে তুহিনের। মুখের দিকে তাকালেই বলা যাচ্ছে সে অসুস্থ। গতরাতেও সুস্থ ছিলো। পৌষ চাপা হাসলো। আদিত্য পানি গিললো ঢকঢক করে। পৌষ যে গতকাল তুহিনের ফিরনীতে জামালগোটা মিশিয়েছে এই খবর আদিত্য জানে তবে ছোট চাচ্চুকে বাঁচাতে পারে নি সে। চাচ্চুকে বাঁচাতে হলে তার বন্ধুত্ব বিপাকে পড়তো যা আদিত্য করতে পারবে না। পৌষ নামক বন্ধু তার অনেক প্রিয়। তৌসিফ ডাকলো ছোট ভাইকে। হাতে ভাত মাখাতে মাখাতে বললো,
“ওখানে কি? তারাতাড়ি আয়।”
বাধ্য এবং এক অবুঝ ছেলের মতো তুহিন এগিয়ে এলো। একদম ভাইয়ের সাথে লেগে বসলো চেয়ারে। এখানে পৌষ বসতো বুঝাই যাচ্ছে। তৌসিফ চোখ দুটো নরম করলো। এরা দু’জন সতীনের মতো ব্যবহার করে কেন তা বুঝে আসে না ওর। তুহিনের মুখে ভাতের লোকমা তুলে দিয়ে তৌসিফ জিজ্ঞেস করলো,
“পেট খারাপ হলো কিভাবে? উল্টাপাল্টা খেয়েছিস কিছু?”
“তোমার ঘরে খেয়ে গিয়েছিলাম।”
কপালে চিন্তার ভাজ পড়ে তৌসিফের। পৌষ মাঝে বাম হাত ঢুকালো,
“উল্টাপাল্টা বলতে অন্য কিছু মিন করছে ছোট মামাতো ভাই।”
সরাসরি খোঁচা দিলো পৌষ যা গায়ে লাগলো তুহিনের। সামনেই তার ভাতিজা, ভাতিজি বসা৷ বংশের দুই মাত্র জ্বলজ্বল করা বাতি এরা। তুহিন খেতে খেতে উত্তরে বললো,
“বিষ দিয়েছিলো তোমার বউ।”
গরম চোখে তাকালো তৌসিফ। তুহিন খাচ্ছে চুপচাপ। পৌষ কোথাও গেলো আবার ফিরে এলো। তৌসিফের প্লেটে আরো ভাত দিয়ে নিজেও বসলো। মুখে খাবার তুলতে তুলতে বললো,
“যে যেমন তার সাথে তেমনই হয়।”
“একদম৷ আমিও সহমত।”
তুহিন কথাটা বলে হাসলো। পৌষ মুখ ভেঙালো। তুহিন কটুক্তি মূলক হাসি দিয়ে বললো,
“আমিও আবার ঋণ রাখি না।”
“আমিও দান করা কিছু ফেরত নেই না।”
“চুপ!”
তৌসিফ ধমক দিতেই দু’জন বাকবিতন্ডা থামালো। আদিত্য আর অদিতি মজা নিয়ে দেখছিলো ঝগড়া যা আপাতত থেমে আছে।
ডাবের পানি গ্লাস ভরে তুহিনের দিকে এগিয়ে দিলো পৌষ। তখন খাওয়ার মাঝে এটা আনাতেই পাঠিয়েছিলো। পানি দিতে দিতে একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো,
“বাথরুমের ট্যুর কেমন লাগলো পঁচা ডোবার চামচিকা, স্যরি ছোট মামাতো ভাই।”
“ট্যুর কিন্তু বেশ লেগেছে। পেট একদম পরিষ্কার লাগছে।”
“বউ রেগে আপনার।”
“ওটা পুরাতন অভ্যাস।”
তৌসিফ ওদের কথার মাঝে থামালো। গা এলিয়ে বসে শুধালো,
“আপার সাথে কথা হয়েছে। আমি পৌষরাতকে নিয়ে যাচ্ছি কিছুদিনের জন্য।”
“বাহ্। হানিমুন এতদিন পর?”
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৭১
হালকা হাসলো তৌসিফ। দরজায় তখন পলক দাঁড়িয়ে আছে তবে ও ভেতরে ঢুকলো না। বিড়াল পায়ে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে। নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকেই ডায়াল করলো বিদেশি এক নাম্বারে। বিরবির করতে করতে বললো,
“তোমার হানিমুনেই যদি তোমাকে আমি না ভেঙেছি পৌষ তবে আমিও চৌধুরী বাড়ীর মেয়ে না।”
