মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৪০
ঐশী রহমান
মেডিকেল ক্যাম্পের এয়ারকন্ডিশনারের মৃদু গুঞ্জন ছাড়া ঘরটায় আর কোনো শব্দ নেই। বাইরে তখনো বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ। ডাক্তার আফরোজা চুপচাপ বসে আছেন তার টেবিলের ওপাশে। তার সামনে বসা মানুষটার দিকে তাকালে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কী মারাত্মক ঝড় বয়ে যাচ্ছে। শক্ত চোয়াল, চওড়া কাঁধ আর নিখুঁত মিলিটারি ডিসিপ্লিনের পেছনে লুকিয়ে আছে এক চূর্ণ-বিচূর্ণ হৃদয়।
মেজর শাহেদ ওয়াসিফ। দেশের অন্যতম সেরা কমান্ডো, যিনি বহু অসম্ভব মিশনকে বাস্তবে সফল করেছেন। কিন্তু আজ তার চোখের কোণে জমে থাকা ক্লান্তি আর অপরাধবোধ লুকাতে পারছেন না।
আফরোজা আলতো করে পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, ” ওয়াসিফ, নিজেকে সামলাতে তুমি খুব তুখোড়। তবুও বলি, যদি মনে করো এখন বলা কঠিন, আমরা পরে কথা বলতে পারি। পরে কোনো একদিন নাহয় শুনবো’!
ওয়াসিফ গ্লাসটা ছুঁলো না। শূন্য দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলেন—
‘ আজই বলি ম্যাম, আর হয়তো সেভাবে সময় হবেনা।’ আমরা যখন একাডেমিতে থাকি, আমাদের শেখানো হয় দেশের জন্য জীবন দিতে। কিন্তু কেউ শেখায় না যে, আমাদের ভুলের খেসারত আমাদের ভালোবাসার মানুষকে দিতে হতে পারে।
সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা। বর্ডার ক্রাইম আর একটা আন্তর্জাতিক স্মাগলিং চক্রের মূল উপড়ে ফেলার একটা হাই-প্রোফাইল মিশন দেওয়া হয় আমাকে। মিশনটা ছিল অত্যন্ত গোপনীয় এবং বিপজ্জনক। দিন-রাত এক করে আমি আর আমার টিম ওদের পুরো নেটওয়ার্কটা ধ্বংস করে দিই। অপারেশনের শেষ রাতে ওদের হেডকোয়ার্টার থেকে আমি কিছু অত্যন্ত সংবেদনশীল ডকুমেন্টস এবং একটা এনক্রিপ্টেড ড্রাইভ উদ্ধার করি। ওটাই ছিল ওদের ডেথ ওয়ারেন্ট। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ওগুলো আমার পার্সোনাল সেফ-কাস্টডিতে রাখা হয়েছিল। এবং তার কিছু অংশ আমার কাছে, আমার বাড়িতে ই এনে রেখেছিলাম। আমার ধারণা ছিলো ওরা আমাকে অব্ধি ছুঁতে পারবে, এর বেশি নয়’
ওয়াসিফ থামলো। তার হাত দুটো শক্ত মুঠো হয়ে গেল, রগগুলো ফুলে উঠল রাগে আর ক্ষোভে।
“আমি জানতাম ওরা শান্ত হয়ে বসে থাকবে না। কিন্তু ওরা যে এতটা নিচে নামবে, সেটা আমি ভাবিনি।”
“সেদিন শুক্রবার ছিল। ডিউটি শেষে বাড়ি ফেরার কথা ছিল আমার। মুমতাহিনার উচ্চ মাধ্যমিকের টেস্ট পরীক্ষা চলছিলো তখন,আমি রওনা দেব, ঠিক তখনই একটা জরুরি কল আসে। হেডকোয়ার্টারে আটকা পড়ে যাই আমি। সেদিনের বাড়ি ফেরার তাড়া থেমে যায় ব্যস্ততায় ।”
ওয়াসিফ চোখ দুটো বন্ধ করলেন। যেন চোখের সামনে এখনো সেই দৃশ্যটা দেখতে পাচ্ছেন।
“ওরা ভালো করেই জানত, আমাকে টর্চার করে বা ভয় দেখিয়ে ওই ডকুমেন্টস বের করা অসম্ভব। মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের অফিসারকে ভাঙা যায় না। তাই ওরা পুরোনো প্রবাদটাই বেছে নিল—’কান টানলে মাথা আসে’। আমি যদি মাথা হই, মুমতাহিনা ছিল আমার কান, আমার দুর্বলতা। ওরাই জানত, মুমতাহিনা কে ছুঁলে আমি নিজে গিয়ে ওদের পায়ে ওগুলো সঁপে দিয়ে আসব সবকিছু। হয়তো ওদের এই পরিকল্পনা আরো অনেক আগে থেকে ই করা ছিলো, সময় বুঝে মিশনে নেমেছিলো। ওরা একে একে আমার বিষয় সকল পারসোনাল তথ্য বের করে ছক কষলো। মূল গুটি হিসেবে টার্গেট করলো মুমতাহিনা কে। যা আমার কল্পনার বাইরে ছিলো। ‘
বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ চারজন সশস্ত্র লোক কলেজের আশেপাশে ছদ্ম বেশে থেকে মুমতাহিনা কে চোখে চোখে রাখে। ওর পরীক্ষার সময় ছিলো ৩-৫:৩০ টা। পরবর্তী তে আমি জানতে পেরেছি ওরা নাকি সপ্তাহ খানেকেরও বেশি ওর কলেজের আশেপাশে থেকে ওর উপর নজর রাখতো। সেদিন ছিলো মুমতাহিনার টেস্ট পরীক্ষার একদম শেষ পরীক্ষাটা। হল থেকে বেরিয়ে কতক্ষণ কলেজ এরিয়ার ঘুরেছে, বান্ধবীদের সঙ্গে হেঁসে খেলে ঠিক বাড়ি আসার পথে ও ছিলো একা সেদিন, সময়টা মাগরিবের আজান দিবে দিবে, আমাদের গ্রামের সরু রাস্তা তখন ফাঁকা, বিপদ যেদিন আসে সেদিন চারিদিক থেকে আসে, ও সেদিন অটোরিকশা, ভ্যান কিচ্ছু না পেয়ে হাটছিলো, মাগরিবের ঐ সময়টা রাস্তা ছিলো নিরিবিলি। ওরা কোনো কথা বলার সুযোগ দেয়নি ওকে। মুমতাহিনা চিৎকার করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ওরা ওর মুখে ক্লোরোফর্মের রুমাল চেপে ধরে।” তারপরের কাহিনি আমাকে আর বলতে পারেনি ও।’
এতটুকু বলে ওয়াসিফ থামে, গ্লাস তুলে পানি খায়, নিরব দম ফেলে আবার বলতে শুরু করে।
“আমি যখন রাত এগারোটায় কটেজে পৌঁছালাম, আমার আর বাড়ি ফেরা হলোনা সেদিন।পুরো ঘর নিস্তব্ধ। ভেতরে ঢুকেই আমার বুকটা ধক করে ওঠে। ভেতর থেকে খারাপ লাগা কাজ করে। আগে পরে কখনো এমন হয়না আমার সঙ্গে। মন চায় সবকিছু ফেলে এখন বাড়িতে ছুটে যাই। কিন্তু উপায় নেই পরেরদিন আরো বহু কাজ বাকি। ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে পানির গ্লাসটা তুলতেই আচমকা হাত ফস্কে কাঁচের গ্লাসটা ভেঙে চুরমার হলো। কতক্ষণ চেয়ে রইলাম ভাঙা কাচের টুকরো গুলোর দিকে। এর পানিও আমার খাওয়া হলোনা….
ঠিক সেই মুহূর্তে আরিয়ান তাড়াহুড়ো করে আমার কটেজে ঢুকে হাত পাতিয়ে বলে ‘ স্যার আপনার ফোনটা চেক করুন, আপনার বাড়ি থেকে অজস্র কল, ভাবী…’ ওর কথা শেষ না হতেই আমি পকেট থেকে সারাদিন সাইলেন্ট মুডে রাখা ফোনটা টেনে বের করতেই বাড়ির লোকেদের কল ছাপিয়ে আমার চোখ আঁটকে গেলো একটা আননোন নাম্বার থেকে আসা ম্যাসেজের উপর।
‘মেজর ওয়াসিফ, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যদি ওই ব্লু-প্রিন্ট আর ড্রাইভ আমাদের হাতে না পৌঁছায়, তবে আপনার স্ত্রীর লাশটা বর্ডারের ওপারে কোনো ড্রেনে খুঁজে পাবেন। ডোন্ট স্মার্ট প্লে উইথ আস।'”
ওয়াসিফের গলাটা ধরে এলো। ডাক্তার আফরোজার দিকে তাকিয়ে বললেন, ” ম্যাম, আমি দেশের জন্য কত বুলেট বুক পেতে নিয়েছি। কিন্তু সেদিন ওই ফাঁকা ঘরটায় দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছিল, কেউ আমার বুকটা জীবন্ত চিরে কলিজাটা বের করে নিয়েছে। আমার করা মিশন, আমার সততা, আমার দেশপ্রেম—সব এক মুহূর্তে মুমতাহিনার জীবনের সামনে তুচ্ছ হয়ে গেল। ওরা ডকুমেন্টসগুলো নেওয়ার জন্য আমার কলিজাটা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল…”
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো। ডাক্তার আফরোজা স্তব্ধ হয়ে শুনছিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এই মেজরের বাইরের শক্ত খোলসটার নিচে এখন কেবলই একজন রক্তাক্ত স্বামী বসে আছেন, যিনি তার জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়ার গল্প তাকে শোনাচ্ছে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ওয়াসিফ বলে।
‘ আমি আবার ফিরছি আমার কর্ম জীবনে ম্যাম, যে সেক্টর আমি একসময় ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সেই সেক্টরে আমি আবারও যুক্ত হচ্ছি। এবং এখনের এই সময়টাও আমার লাইফের গুরুত্বপূর্ণ একটা পার্ট, একদিকে আমার কর্ম, বিপরীত দিকে মুমতাহিনার মাতৃত্বের অসুস্থতা। আমার কাছে দুটোই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কোনোটা হেলাফেলা করার চান্স নেই ‘
‘ তারপর বলো, মুমতাহিনার শারিরীক অবস্থা কেমন এখন’?
‘ আলহামদুলিল্লাহ, অনেক ভালো ম্যাম, আশা করি আরো বেটার হবে’
‘ অবশ্যই হবে’
কথার এই পর্যায়ে ওয়াসিফ যখন বিদায় নিয়ে কেবিনের চেয়ার ছেড়ে উঠছিলো তখন আফরোজা বললেন।
‘ সেদিনের ঘটনা কি আজও পুরোটা শেষ করবে না’?
ওয়াসিফ সামান্য হেঁসে বলে ‘ এখানে ই তো শেষ ম্যাম, এরপরের বিষাদ আমাদের লাইফে কোনো ভূমিকাই রাখবে না। ছোট করে যদি বলি তবে বলবো ‘ একজন সেনাকর্মকর্তার সহধর্মিণী সেই তিনদিনের মানসিক চাপ আর হতাশা গিলে এখন একটু একটু করে তার বাস্তবিক জীবনে ফিরছে। আমার আর মুমতাহিনার, আমাদের জীবন থেকে ঐ তিন দিনের হিসাব কাটা, ঐদিনগুলো আমাদের জীবনে কখনো আসেনি। পরিশেষে আমরা ভালো আছি, মহান আল্লাহ আমাদের ভালো রেখেছেন।
আমি পরশু চলে যাবো, চেষ্টা করবো আগামীকাল ই ওকে একবার চেকাপ করিয়ে রেখে যাওয়ার। আজ আসি। আল্লাহ হাফেজ ম্যাম’
ওয়াসিফ কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো। আফরোজা ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে লম্বা দম ফেলে মনে মনে আওড়ায়, ‘ ভিন্ন ভিন্ন মানুষ, তাদের জীবনের প্রতিটা গল্প ও ভিন্ন ভিন্ন ‘
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ হতে হতে প্রায় বিকেল গড়িয়ে এলো। মেহমানদের বিদায় জানানো আর বাড়ির টুকটাক গোছগাছ শেষ করে ধারা যখন নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল, তখন ওর পা দুটো যেন আর চলছিল না। ভারী সুতির শাড়িটা সামলাতে সামলাতে ও ক্লান্ত। তবে ক্লান্তির চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে এক অদ্ভুত কৌতূহল। ওয়াসিফ কিছু সময় আগে যে ফিসফিস করে সারপ্রাইজের কথা বলেছিল, সেটা কী হতে পারে?
ঘরের দরজার সামনে এসে ধারা একটু ইতস্তত করল। দরজার কড়াটা আলতো করে নেড়ে ও ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখল, ঘরটা একদম শান্ত। দুপুরের চড়া রোদ এখন মরে গিয়ে জানালার পাশে একটা হালকা সোনালী আলো এসে পড়েছে।
ওয়াসিফ বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে বসে ল্যাপটপে কিছু একটা দেখছিল। ধারাকে ঢুকতে দেখে ও ল্যাপটপটা বন্ধ করে একপাশে রেখে দিল। ওর সেই তীক্ষ্ণ, গম্ভীর চোখ দুটো ধারার ওপর থিতু হলো।
“আসতে এত দেরি হলো?” ওয়াসিফের কণ্ঠে সেই পরিচিত মেজাজি সুর, তবে তার ভেতর লুকিয়ে আছে এক চিলতে অভিমান।
ধারা ঘরের দরজাটা ভিজিয়ে দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ও একটু নিচু স্বরে বলল, “নিচে লুইপা আপা আর মা একা ছিলেন। এত বড় বাড়ির সব কাজ একা সামলানো কষ্ট, তাই একটু হাত লাগালাম। তাছাড়া… আপনার সেই সারপ্রাইজটা কী?”
ওয়াসিফ একটু হাসল। মেয়ে সাংঘাতিক, উপহারের কথা ভোলেনি। বিছানা থেকে নেমে ও ধারার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। ধারার ক্লান্ত মুখখানার দিকে তাকিয়ে ওর খুব মায়া হলো। ও হাত বাড়িয়ে ধারার কপালের অবিন্যস্ত চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিল। তারপর পকেট থেকে একটা ছোট্ট ভেলভেটের বক্স বের করে ধারার হাতের তালুর ওপর রাখল।
“খুলে দেখ,” ওয়াসিফ বলল।
ধারা ধুকপুক করতে থাকা বুকে বক্সটা খুলল। ভেতরে মখমলের কাপড়ের ওপর জ্বলজ্বল করছে একটা সোনার চেইন, যার লকেটে খুব নিখুঁতভাবে খোদাই করে লেখা—’W’.
ধারা অবাক হয়ে লকেটটার দিকে তাকিয়ে রইল। ও ভাবেনি এই পাথরের মতো শক্ত পুরুষটা এত সুক্ষ্মভাবে হঠাৎ ই কারো মন ভালো করে ফেলতে পারে। ধারা চোখ তুলে তাকাতেই ওয়াসিফ ওর হাত থেকে চেইনটা নিয়ে বলল, “পছন্দ না হলেও পরবি, পরতে হবে। ওদিকে ঘোর, পরিয়ে দি”
লোকটার মুখে এমন কথায় ভ্রু কুঁচকে ফেলে ধারা, ও কি একবারও বলেছে এই উপহার ওর পছন্দ হয়নি? ওর তো খুব পছন্দ হয়েছে, স্বামীর নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে সোনা পরার মতো সৌভাগ্য ওর হয়েছে। ধারা মুখে আপাতত কোনো জবাব না দিয়ে চুপচাপ ঘুরে দাঁড়ায়। ওয়াসিফ অপটু হাতে বৌকে চেইনটা পরিয়ে দিয়ে ঘুরিয়ে দাঁড় করায় নিজের মুখোমুখি।
ধারা আলতো করে হাসল, ওর চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল। ওয়াসিফ ধারাকে ঘুরিয়ে দিয়ে ওর পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো একপাশে সরিয়ে দিল। তারপর খুব যত্ন করে চেইনটা লেগে থাকা ফর্সা গলার কাছে ঠোঁট ছুঁইয়ে চুমু খেলো। ওয়াসিফের আঙুলের তপ্ত ছোঁয়া ধারার ঘাড়ে লাগতেই ও চোখ দুটো বুজে ফেলল।
চুমুর পালা শেষ হলে ওয়াসিফ পেছন থেকেই ধারাকে নিজের শক্ত দুই বাহুর মাঝে জড়িয়ে ধরল। ধারার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, “এই ‘W’ মানে শুধু ওয়াসিফ নয়। এই ‘W’ মানে হলো ‘Wife’—আজ থেকে বছর দুই আগে তুই অফিশিয়ালি আমার অর্ধাঙ্গিনী হয়ে ছিলি।
ধারা ওয়াসিফের হাতের ওপর নিজের হাত দুটো রাখল। আয়নায় নিজেদের এই যুগলবন্দী রূপ দেখে ওর মনে হলো, জীবনের সব পাওয়া যেন আজ এই একটা ঘরের ভেতর এসে থমকে গেছে। ও ঘুরে দাঁড়িয়ে ওয়াসিফের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ধন্যবাদ, সাহেব। এই উপহারটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।”
বিকেলের দিকে সামির আর লুইপা ড্রয়িংরুমে বসে গল্প করছিল। ঠিক তখনই সামিরের ফোনে একটা কল এলো। ফোনটা কানে নিতেই সামিরের মুখের হাসি উধাও হয়ে গেল। ও বেশ গুরুত্বের সাথে ওপাশ থেকে আসা কথাগুলো শুনল এবং গম্ভীর গলায় বলল, “জি স্যার, আমি আর মেজর ওয়াসিফ কাল সকালের মধ্যেই জয়েন করছি।”
ফোনটা রাখতেই লুইপা উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকাল, “কী হয়েছে? ভাইজানের তো আরও দুদিনের ছুটি আছে।”
সামির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লুইপার হাতটা ধরল, এবাড়িতে আর কেউ ওয়াসিফের বিষয়টি না জানলেও লুইপা জানে, পরে জেনেছে সামিরের থেকে। “ব্যারাকে একটু জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমাদের দুজনকে কাল ভোরেই রওনা দিতে হবে। ডিফেন্সের চাকরি তো বুঝতেই পারো, দেশের ডাক এলে ছুটির কোনো মূল্য থাকে না।”
লুইপার মনটা খারাপ হয়ে গেল। সবেমাত্র মানুষটা এলো, বাড়িতে একটা বিয়ে হলো, বাড়িটায় আনন্দের আমেজ, এর মধ্যেই আবার তাদের ফিরে যাওয়ার তাড়া। ও মন খারাপ করে বলল, “ধারাকে এই কথাটা কে বলবে? ও তো কষ্ট পাবে।”
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে কথাগুলো শুনে ফেলল স্বয়ং ওয়াসিফ। ওর পেছনেই আসছিল ধারা। ওয়াসিফ তখন খেয়াল করেনি ধারা কে? ধারাকে দেখেনি সে।
ওয়াসিফ সামিরের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলল, “কাউকে কিছু বলতে হবে না লুইপা। দেশের দায়িত্ব আগে। সামির, প্যাকিং শুরু করো। আমরা কাল ভোর পাঁচটায় বের হচ্ছি।”
মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩৯
ধারা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ওয়াসিফের এই হঠাৎ বদলে যাওয়া রূপটা দেখল। একটু আগেও যে পুরুষটা ওর গলায় ভালোবেসে চেইন পরিয়ে দিচ্ছিল, সে এখন দেশের এক অতন্দ্র প্রহরী, যার চোখে কোনো আবেগের স্থান নেই। ধারার বুকটা একবার কেঁপে উঠল। ওয়াসিফ তাকে মিথ্যে বলেছিলো তবে? চাকরি ছাড়েনি সে? কেনো বললো এই মিথ্যে?
ওয়াসিফের কথায় সামির লুইপা কেউই কোনো জবাব দেয় না। ওদের দুজনের চেহারায় ইতিমধ্যে ভর করেছে আতংকের ঝলক। ওয়াসিফ ওদের চাহনি লক্ষ্য করে পেছনে তাকাতেই দেখে ধারা মুর্তির ন্যায় চোখ মুখ শক্ত করে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।
