মেজর কারদার পর্ব ২
ফিনারা ঝুমুর
খালাতো ভাইয়ের বাসর ঘর সাজানোর গুরুদায়িত্ব পড়েছে মেঘালয়া, মিথিলা আর কিঞ্জাসহ আরও বেশ কয়েকজনের ওপর। শুধু মেয়েরাই নয়, এই দলে হাত বাড়াতে এসেছে আদর আর রাহাত নামের দুই ছেলেও। সবাই মিলে হাসিমুখে রজনীগন্ধা আর গোলাপের মালায় পুরো ঘরটাকে এক টুকরো স্বর্গ বানিয়ে তুলল।
চারিদিকে সুগন্ধি ফুলের মেলা, কিন্তু পুরো ঘরের কোথাও মশারির কোনো চিহ্ন দেখতে পেল না মেঘ। তার সরল আর কৌতুহলী মন এই খটকাটা কিছুতেই মেনে নিতে পারল না। সে হাত কোমরে রেখে ফট করে প্রশ্ন করে বসল,
“আচ্ছা, বাসর রাতে মশারি টাঙায় না কেন রে? হেগোরে কি মশায় কামড়ায় না?”
মেঘের এমন চরম বোকা বোকা আর নিষ্পাপ প্রশ্ন শুনে ঘরের সবাই এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল, তারপরই পুরো ঘর জুড়ে হো হো করে হাসির রোল উঠল। কিঞ্জা নিজের হাসি চেপে মেঘের নাকের ডগায় আলতো করে একটা টোকা দিয়ে বলল,
“ধুর পাগলী! ওই রাতে নিজেরা মারামারিতে মেলা ব্যস্ত থাহে। মশায় কামড়াইলেও ওটুকু ব্যথায় হেগো কিচ্ছু যায় আসে না।”
মেঘের চোখ দুটো এবার আরও বড় বড় হয়ে গেল। সে অবুঝের মতো আবার জিজ্ঞেস করল,
“কিন্তু — কী নিয়া মারামারি করে?”
এতক্ষণ ফুলের মালা গাঁথতে থাকা রাহাত সুযোগ বুঝে কথার মাঝে ফোড়ন কেটে উঠল। সে বাঁকা হেসে বলল,
“হেইডা আফনের বিয়া হইলেই নিজে চোখে জানবার পারবেন। ওহোন তো আফনে ছুডু মানুষ, আগে বড় হন, বিয়া করেন। তারপরে দেহেন এইয়া কিয়া হেইয়া মারামারি কিনা!”
রাহাতের এমন রসাত্মক আর দ্ব্যর্থবোধক কথায় মেঘালয়া মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় লাল হয়ে গেল। এই শ্যামবর্ণের মায়াবী মেয়েটা আজ একটা ল্যাভেন্ডার রঙের শাড়ি পরেছে, সাথে একদম হালকা ছোঁয়াচে সাজ। এই অল্প সাজেই তাকে ডালিম ফুলের মতো স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। রাহাত যখন মেঘের সেই লাজুক, মিষ্টি হাসির দিকে পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই পুরো ঘরের বাতাস ভারী করে বাজের মতো আছড়ে পড়ল এক গম্ভীর, ধারালো কণ্ঠস্বর।
“কোন মারামারির কথা বলা হচ্ছে এখানে?”
হঠাৎ দরজায় মেজর শীর্ষ কারদার অঙ্কনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঘরের সবার হাসিমুখের রক্ত যেন এক পলকে চুষে নিল কেউ। ব্লেজারহীন শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো, চোখে তার চিরাচরিত রাশভারী আর তীক্ষ্ণ চাউনি।
আদর পরিস্থিতি হালকা করতে গিয়ে আমতা-আমতা করে গ্রামীণ টোনে বলেই ফেলল,
“ইয়ে — ফোর টুয়েন্টির কথা বলা হচ্ছে ভাইয়া। ওই যে বাসর রাইতে যেম্বায় মারামারি ওয় আরকি–”
আদরের মুখ থেকে এমন সস্তা ও অশোভন কথা শুনতেই মেজর শীর্ষর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। কপালে রাগের রগগুলো ভেসে উঠল তার। সে বাঘের মতো গর্জে উঠে ধমক দিয়ে বলল,
“শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারিস না? আর ছোটদের সামনে এসব কেমন নোংরা কথাবার্তা? যা, বের হয়ে যা ঘর থেকে!”
মেজর কারদারের সেই বজ্রকণ্ঠের ধমক আর চোখের আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস কারোর ছিল না। আদর আর রাহাত আর একটা শব্দও না বাড়িয়ে, মাথা নিচু করে চোরের মতো চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আদর আর রাহাত চলে গেলেও ঘরের ভেতর যেন বাতাস জমে বরফ হয়ে গেল। মিথিলা, কিঞ্জা আর মেঘালয়া পাথরের মূর্তির মতো যে যেখানে ছিল, সে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। নড়ার মতো শক্তিটুকুও যেন তাদের শরীর থেকে উধাও হয়ে গেছে। ভয়ের চোটে মিথিলা আর কিঞ্জা মনে মনে তওবা আস্তাগফিরুল্লাহ পড়তে পড়তে বিড়বিড় করতে লাগল,
“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন!”
বিপদ যখন একদম শিয়রে, তখন মানুষ যেভাবে শেষ মুহূর্তের দোয়া-দুরূদ পড়ে, ওরা ঠিক সেভাবেই মনে মনে সব আউড়ে যাচ্ছে। আর ওদিকে মেঘালয়া ঠাঁই দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে মনে মনে রোনাজারি করছে,
“লা হাওলা ওয়া লা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম!”
যমদূতের সামনে পড়লে মানুষের যে দশা হয়, মেঘের এখন ঠিক সেই দশা।ওরা যখন মনে মনে ইষ্টনাম জপতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই শীর্ষ চ্যাঁত করে ওঠে। সিংহের গর্জনে পুরো ঘর কাঁপিয়ে সে কড়া গলায় বলল,
“কী হলো? তোদের কি এখানে থাকার জন্য আলাদা করে নেমতন্ন করতে হবে? বেরিয়ে যা এখান থেকে। ফুট!”
শীর্ষর ধমক খেয়ে মিথিলা আর কিঞ্জার সাথে মেঘও মাথা নিচু করে বিড়ালের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। কিন্তু মেঘ দরজার চৌকাঠ পার হওয়ার আগেই ঘরের ভেতর আবার আছড়ে পড়ল সেই গমগমে কণ্ঠস্বর,
“হেই ল্যাভেন্ডার গার্ল, স্টে হেয়ার! বাকিরা বের হয়ে যা।”
কথাটা শোনামাত্রই মেঘের পায়ের জুতো যেন মেঝের সাথে আঠা দিয়ে লেগে গেল। মিথিলা আর কিঞ্জা দরজার কাছে থমকে দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে তাকাল। ভয়ে ওদের গলা শুকিয়ে কাঠ। মিথিলা কোনোমতে সাহস সঞ্চয় করে আমতা-আমতা করে বলল,
“ই-য়ে– মানে ভাই-য়ায়ায়া–ও-কেও–”
“তোদের জাস্ট যেতে বলেছি না? নিজের চরকায় তেল দে!”
শীর্ষর চোখ রাঙানি দেখে ওরা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ানোর সাহস পেল না।ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই দরজার আড়ালে লুকিয়ে থাকা রাহাত আর আদর ওদের হাত ইশারায় ডাকল। চারজন মিলে দরজার একদম চিপায়, দেওয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে কান খাড়া করে দাঁড়াল। সবার মনেই এক কৌতূহল এই রাগী মেজর হঠাৎ মেঘালয়াকে একা ঘরে কেন আটকে রাখল? ভেতর থেকে কোনো আওয়াজ আসছে কি না, তা দেখার জন্য ওরা যেই না দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারতে যাবে, অমনি ভেতর থেকে শীর্ষর তীক্ষ্ণ আওয়াজ ভেসে এল,
“দরজার চিপায় উঁকি দেওয়া ওই চারটা মাথাকে যদি আমি ধরতে পারি, তবে পিঠের ওপর অর্জুন গাছের ডালের একটা বাড়িও মাটিতে পড়বে না!”
শীর্ষর মুখের কথা শেষ হতে দেরি, কিন্তু রাহাত আর আদরের চোখের সামনে নিজের পিঠের চামড়া ওঠার দৃশ্য ভেসে উঠতে দেরি হলো না। শীর্ষ ওদের পেছনে চ্যালা নিয়ে দৌড়াচ্ছে আর বলছে,
“শুয়োরের দল! তোদের বেরিয়ে যেতে বলার পরও এখানে লুকিয়ে চোরের মতো আড়ি পাতছিলি? দাঁড়া, দেখাচ্ছি মজা!”
তা দেখেই রাহাত আর আদর শুকনো এক ঢোগ গিলে পালালো দরজার চিপা থেকে। এদিকে, কিঞ্জা আর মিথিলাও যেন একই স্বপ্ন দেখলো।
উঠোনের আম গাছের ডালে ওদের দুই হাত রশি দিয়ে বেঁধে লটকিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর মেজর শীর্ষ কারদার দুই হাতে দুটো অর্জুন গাছের মোটা চ্যালা কাঠ নিয়ে ধাম ধাম করে ওদের পিঠে পিটাচ্ছে! পিঠের চামড়া ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে আর ওরা বাতাসে ঝুলে লাফাচ্ছে!
বাস্তবে শীর্ষ ঘর থেকে বের হওয়ার আগেই ওরা আর এক সেকেন্ডও সেখানে না দাঁড়িয়ে লেজ গুটিয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড় লাগাল। ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’—এই নীতি মেনে ওরাও দ্রুত পায়ে কেটে পড়ার সিদ্ধান্ত নিল। যাওয়ার আগে মিথিলা দরজার দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত ফিসফিসানি স্বরে মেঘের উদ্দেশ্যে বলল,
“তোর আত্মার মাগফিরাত কামনা করতাছি রে মেঘ! আল্লাহ তোরে জ্যান্ত কবর হওয়া থেকে বাঁচাক!”
খট করে ছিটকিনি লাগার শব্দটা মেঘের কানে যেন যমদূতের পরোয়ানা হয়ে বাজল। দরজাটা লক করেই শীর্ষ ধীরপায়ে মেঘের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন বাঘের শিকারের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মতো ধীর, মাপা আর ভয়ঙ্কর।
শীর্ষকে এভাবে এগিয়ে আসতে দেখে মেঘের বুকের ভেতরটা দড়ফড় করে উঠল। সে ভয়ে ভয়ে এক পা এক পা করে পেছাতে লাগল। কিন্তু পেছাতে পেছাতে আর কতদূর যাওয়া যায়? মাত্র কয়েক গজ পেরোতেই তার পিঠ গিয়ে ঠেকল বাসর ঘরের সেই সুসজ্জিত খাটের শক্ত কাঠের পায়ার সাথে। পালানোর আর কোনো পথ নেই!লাভের লাভ কিছুই হলো না। মেঘালয়াকে একদম কোণঠাসা করে ফেলে শীর্ষ এক ঝটকায়, হেঁচকা টান দিয়ে তাকে নিজের একদম বুকের কাছে টেনে আনল।
মেঘ পুরো স্তম্ভিত হয়ে গেল! তার নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার জোগাড়। কিন্তু তার চেয়েও বড় ধাক্কাটা সে খেল ঠিক তার পরের মুহূর্তেই। ল্যাভেন্ডার শাড়ির আলগা আঁচলের ফাঁক গলে শীর্ষর সেই বড়, শক্ত আর উষ্ণ হাতটা সরাসরি গিয়ে থামল মেঘের উন্মুক্ত, ফর্সা পেটের ওপর ঠিক সেই কুচকুচে কালো তিলটার ওপর!শরীরের সংবেদনশীল জায়গায় এমন আচমকা ও কড়া পুরুষের স্পর্শ পেয়ে মেঘের পুরো শরীর কেঁপে উঠল। সে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“কি–কি করছেন আপনি? আমার পেটে হাত দিচ্ছেন কেন?”
শীর্ষ একটুও সরল না, বরং মেঘের কানের একদম কাছে নিজের মুখটা নামিয়ে আনল। তার তপ্ত নিশ্বাস মেঘের গলায় আছড়ে পড়ছে। পেটের ওপর হাতের চাপটা সামান্য বাড়িয়ে সে একদম ফিসফিস করে, ধারালো গলায় বলল,
“বিকজ আই লাভ ইওর নেভেল। এন্ড আই ওয়ান্না প্লে ইন আ ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপ উইথ ইউ। ক্যান ইউ এঞ্জয় দিস গেম?”
শীর্ষর মুখের সেই পরিচিত শব্দগুলো শোনামাত্রই মেঘের মাথার ভেতর যেন একশোটা সাইরেন একসাথে বেজে উঠল! দুনিয়ার সব আলো যেন এক পলকে দপ করে নিভে গেল। সে এবার একশো ভাগ নিশ্চিত হয়ে গেল যে, সে আর মেঘালয়া নেই, মেজর কারদারের খাঁচায় বন্দি এক চিলতে শিকার মাত্র।
সে কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“আ-আপ-নি– আপনি বুঝে গেছেন সবকিছু?”
শীর্ষর ঠোঁটের কোণে এক শয়তানি ও তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে মেঘের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বলল,
“তোমার কী মনে হয় মেঘালয়া, আমি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি? বাংলাদেশ আর্মির একজন মেজর আমি। তুমি আমায় ওমন হট এন্ড বোল্ড পিকচার পাঠাবে, টেক্সট করবে আর আমি আমার এই হবু ‘প্লে-মেট’কে চিনতে পারব না, সুইটহার্ট?”
‘সুইটহার্ট’ শব্দটা মেঘের কানের পর্দা ভেদ করে মগজে পৌঁছানো মাত্রই তার চোখের সামনে বাসর ঘরটা বনবন করে ঘুরতে লাগল। ভয়ের পারদ যখন সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়, মেঘের মস্তিষ্ক তখন একটাই শর্টকাট চেনে। কোনো কথা নেই, বার্তা নেই সে সত্যি সত্যি শীর্ষর শক্ত বাহুবন্ধনের মাঝেই চোখ উল্টে ঢলে পড়ল।
হুট করে মেঘের শরীরটা এভাবে নিথর হয়ে যাওয়া দেখে শীর্ষর কপাল কুঁচকে একাকার হয়ে গেল। সে বিরক্তিতে নিজের চিবুক শক্ত করে মেঘের দিকে তাকাল।
“এ কী মেয়েরে খোদা! এ খালি ধপাস, থপাস আর কপাস করে অজ্ঞান হওয়া ছাড়া দুনিয়ার আর কিছুই বোঝে না! ন্যাকা একটা! ইচ্ছে তো করছে এখনই কেটে-কুটে পদ্মার পানিতে ভাসিয়ে দিতে!”
শীর্ষ আর মেঘের ওই ভারী শরীরটা ধরে রাখার কোনো চেষ্টা করল না। সে এক প্রকার ‘ঠাস’ করে মেঘকে বাসর ঘরের ফ্লোরের ওপর ফেলে দিল। মেঝেতে নিথর হয়ে পড়ে থাকা মেঘের দিকে তাকিয়ে সে নিজের মেজাজ আর ধরে রাখতে পারল না। চ্যাঁত করে উঠে শার্টের হাতাটা আরও ওপরে গুটিয়ে বলল,
“থাক তুই এখানে! মইরা পইড়া থাক! অচেনা আইডিতে ওমন হ*ট ছবি আর মেসেজ পাঠাবার পারিস, আর এখন সত্যটা সামনাসামনি মানবার পারিস না? উফফফ, এ কোন আজব মেয়ের চক্করে পড়লাম রে বাবা!”
নতুন বর-বউ এসে বাসর ঘরে ঢুকবে কী, উল্টো সেখানে মেঝের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা মেঘালয়াকে নিয়ে সবাই তুমুল হুলস্থুল আর টানাহেঁচড়ায় ব্যস্ত! কেউ মাথায় পানি ঢালছে, কেউ হাত-পায়ের তালু ডলে দিচ্ছে, আর কেউ বাতাস করতে করতে অস্থির।
মেয়ের এমন কাণ্ডকারখানা দেখে মেঘের মা আলেয়া বানুর মেজাজ একেবারে সপ্তম আকাশে চড়ে গেল। তিনি কপালে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ নিজের কপাল চাপড়ালেন, তারপর রাগে গজগজ করতে করতে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা তার নিরীহ গোছের স্বামী, অর্থাৎ মেঘের বাবাকে লক্ষ্য করে একেবারে খেঁকিয়ে উঠলেন,
“শুনো মাস্টার, তোমার এই হাবাইত্তা আর মাইয়ারে নিয়ে আমি আর পারমু না! দিন দিন মাথায় চড়ে বসতাছে। বেদ্দপ বেয়াল্লিশ একটা! কোনো কাম নাই, কাজ নাই এখন কোন আকাজ করতে যাইয়া ঘরের মধ্যে এমনে অজ্ঞেন অইছে শুনি? তোমার আদরের মাইয়া, এখন তুমিই সামলাও বাপু! আমারে আর এই আপদের মধ্যে টানিও না।”
আলেয়া বানুর এমন ঝাঁঝালো চিল্লানিতে ঘরের বাতাস আরও গরম হয়ে উঠল। বেচারি মাস্টার মশাই বউয়ের ধমক খেয়ে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করতে করতে অপরাধীর মতো মেঘের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি কেবল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। চশমার কাঁচটা আঙুল দিয়ে সামান্য ঠিক করে তিনি মেঘের ফ্যাকাশে মুখের দিকে চেয়ে রইলেন।
আলেয়া বানুর এই রণচণ্ডী রূপ দেখে তার ছোট বোন পিংকু এগিয়ে এলেন। তিনি আলেয়া বানুর হাতটা ধরে একটু শান্ত করার সুরে নরম গলায় বললেন,
“আহা, বড় আপা! তুমি শুধু শুধু এই আনন্দের দিনে ওরে এভাবে বইকো না তো। ও তো এখনও ছোট মানুষ, বোঝে না কিছু।”
পিংকুর কথা শুনে আলেয়া বানুর মেজাজ যেন আরও এক কাঠি চড়ে গেল। তিনি হাত নেড়ে ঝ ঝাঁলো গলায় বলে উঠলেন,
“কিসের ছোট মানুষ, শুনি? আজ যদি ওরে ধইরা বিয়া দিয়া দেই, তবে কাইল ও এক বাচ্চার মা হইবো! ওয় বুঝি এখনও ছুডু? এই বয়সে আমি ঘরসংসার সামলাইছি, আর উনি বাসর ঘরে আইসা থপাস করে অজ্ঞেন হয়া পইড়া আছে! ঢং কত!”
আলেয়া বানুর এই কড়া কথার জবাবে এবার শিউলি বেগম— শীর্ষর মা—মাথা নেড়ে না বোধক উত্তর দিলেন। তিনি মেঘের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বললেন,
“আলেয়া আপা, আপনি এই পরিস্থিতিতে শুধু শুধু মেঘ মাকে এভাবে বকছেন। আমার তো মনে হয় মেয়েটা কোনো কিছু দেখে খুব ভয় পেয়েছে। বকাঝকা পরে কইরেন, আগে ওরে সুস্থ করে তুলুন তো।”
শীর্ষর মা শিউলি বেগমের মতো একজন সম্মানিত আর শান্ত মানুষের মুখে এমন কথা শুনে আলেয়া বানু এবার আর কথা বাড়াতে পারলেন না। তিনি মুখটা কালো করে চুপ করে গেলেন। এদিকে মেঘের বড় ভাই নোমান আর অভ্র এই দুই যুবকের কাউকেই আপাতত এই হুলস্থুলের মধ্যে ঘরে দেখা যাচ্ছে না। বিয়েবাড়ির কোন এক জরুরি কাজের তদারকি করতে দুই ভাই মিলে একটু আগেই গেটের বাইরে গেছে।
এদিকে, ঘরের এক কোণে থাকা সোফাটায় নতুন বর-বউ নিরব আর তিথি এতক্ষণ ধরে একদম চুপচাপ আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে। বাসর রাতের রোমাঞ্চ তো দূরে থাক, মেঘালয়ার এই নাটকীয় কাণ্ডকারখানা আর মেজর শীর্ষর রাগী রূপ দেখে বেচারাদের নিজেদেরই জান যাওয়ার জোগাড়! বর-বউয়ের সাজে বসে থাকলেও দুজনেই যেন ভয়ে কাঁচুমাচু হয়ে আছে।ওদের এই করুণ অবস্থার দিকে তাকিয়ে শীর্ষ এবার তার গম্ভীর কণ্ঠস্বরটা একটু নরম করল। ঘরে থাকা বাকি আত্মীয়স্বজনদের দিকে তাকিয়ে সে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
মেজর কারদার পর্ব ১
“আপনারা তিথি আর নিরবকে নিয়ে ওদের বাসর ঘরে দিয়ে আসুন। বেচারাদের আজ নতুন জীবন শুরু, শুধু শুধু এই ঝামেলার মধ্যে আটকে রাখার কোনো মানে হয় না। আর ওই পিচ্চি মেয়েকে আমি সামলে নিচ্ছি।”
