মেজর কারদার পর্ব ৫
ফিনারা ঝুমুর
সন্ধ্যায় বিরাট এক চায়ের আসর বসেছে কারদার বাড়ির সুবিশাল ছাদে। লালচে আকাশের নিচে মাদুর পেতে গোল হয়ে বসেছে সবাই। সামনেই রাখা বড় বড় ডিশে ধোঁয়া ওঠা সিঙ্গারা, মচমচে চিকেন পকোড়া আর মাটির ভাঁড়ে সুগন্ধি এলাচি চা। কারদার বাড়ির ছোটরা আর সমবয়সী কাজিনরা মিলে এখানে আড্ডায় মেতেছে, আর মুরুব্বিরা নিচে ড্রয়িংরুমে নিজেদের গল্পে মগ্ন।
ছাদের এই আসরে রয়েছে রাহাত, আদর, মিথিলা, কিঞ্জা, অভ্র আর আমাদের দশ্যি মেয়ে মেঘ। আজ নতুন করে এই দলে যুক্ত হয়েছে কিঞ্জার দুই মামাতো বোন সূচি, মিরা আর এক ভাই তৃষ। সিঙ্গারা মুখে পুরে আদর হঠাৎ লাফিয়ে উঠে বলল,
“এই, চল সবাই মিলে ট্রুথ অর ডেয়ার খেলি!”
আদরের এই প্রস্তাব শুনে তার মামাতো বোন সূচি মুখটা কেমন জানি বাঁকিয়ে বলল,
“ধুর! এই গেমটা বড্ড সেকেলের আর আনস্মার্ট। কেমন অদ্ভুত লাগে খেলতে!”
সূচির এমন নাক সিঁটকানো ভাব দেখে আদর মনে মনে চরম বিরক্ত হলো। সে সূচির অলক্ষ্যে এক হাত দিয়ে মুখ ভেঙচে বিড়বিড় করে বলল,
“যেই না চেহারা, নাম রাখছে পেয়ারা! ভাব কত!”
সূচির এমন নাক-উঁচু মন্তব্য শুনে কিঞ্জা মিষ্টি করে হেসে বেশ কড়া টোনে বলল,
“গেমটা সেকেলে নাকি অদ্ভুত, তা জানি না সূচি। তবে আমরা এটাই খেলি। তুই যদি খেলতে না চাস, তবে ওই যে দেখ কোণায় দোলনাটা খালি আছে, ওখানে গিয়ে শান্তিতে বসে বসে মোবাইল টিপতে পারিস। কেউ বারণ করবে না।”
দোলনা দেখিয়ে সূচিকে এক হাত দিয়ে বিদায় করার ভঙ্গি করে কিঞ্জা আদরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই আদর ভাইয়া , আর দেরি করিস না, খেলা শুরু কর।”
সূচির গায়ের রঙ অত্যাধিক ফর্সা হওয়ায় সে যে কিঞ্জার এমন অপমানে রাগে লাল হয়ে গেছে, তা দূর থেকে বসেই বেশ বুঝতে পারল মেঘ। সে গুটি গুটি পায়ে কিঞ্জার একদম গা ঘেঁষে বসল। তারপর কিঞ্জার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আপু, তোমার মামাতো বোন মনে হয় অনেক রেগে গেছে। চোখ দিয়ে তো আগুন বের হচ্ছে!”
“ও রাগলে আমার বয়েই গেছে! তুই বেশি না বকে চুপ করে বসে থাক।”
কিঞ্জার এই চাপা ধমক খেয়ে মেঘও ঠোঁটে আঙুল দিয়ে একদম লক্ষ্মী মেয়ের মতো চুপটি করে বসে রইল।সবাই আবারও হৈহৈ করে উঠল। রাহাত কোত্থেকে একটা অর্ধেক জল ভরা প্লাস্টিকের বোতল এনে মাদুরের মাঝখানে সজোরে ঘুরিয়ে দিল। বনবন করে ঘুরে বোতলের মুখটা এসে থামল অভ্রর দিকে।
রাহাত এক চোখ টিপে বাঁকা হেসে জিজ্ঞেস করল,
“তা অভ্র বাবু, ট্রুথ অর ডেয়ার?”
অভ্র একটু ভেবে বলল,
“ট্রুথ।”
রাহাত এবার মোক্ষম সুযোগ পেয়ে চোখ নাচিয়ে বলল,
“এই অবধি কয়টা মেয়ের সাথে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করেছিস, সত্যি করে বল?”
রাহাতের এমন হাটে হাঁড়ি ভাঙা প্রশ্ন শুনে অভ্রর মুখের সিঙ্গারা গলায় আটকে যাওয়ার জোগাড়! সে থতমত খেয়ে, আমতা-আমতা করে আশেপাশে তাকিয়ে বলল,
“ইয়ে– মানে–পাঁচটা!”
“তা বেশ! তা বেশ! বড়ই গুণী ছেলে!”
রাহাত আর আদর হাততালি দিয়ে উঠল।এবার মিথিলা বোতলটা ঘুরাতেই তা সটান গিয়ে থামল সেই নাক-উঁচু সূচির সামনে। আদর সঙ্গে সঙ্গে মুখ চেপে মিথিলার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“কাম সারছে রে মিথু! এবার বাঘিনীকে খাঁচায় পোরো।”
কিন্তু মিথিলা কোনো প্রশ্ন করার আগেই সূচি বেশ দেমাক নিয়ে বুক ফুলিয়ে বলে উঠল,
“ডেয়ার, ডেয়ার! আমি ডেয়ার নেব।”
সূচির উত্তর শুনে কিঞ্জা এবার সোজা হয়ে নড়েচড়ে বসল। ঠোঁটের কোণে এক শয়তানি হাসি ফুটিয়ে সে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। ডেয়ার যখন নিয়েছিস, তখন আমাদের সবাইকে একটা সুন্দর গান গেয়ে শোনা, সূচি।”
গানের কথা শোনামাত্রই সূচির এতক্ষণের হাস্যোজ্জ্বল আর অহঙ্কারী মুখটা এক নিমেষে চুপসে এইটুকুনি হয়ে গেল! সে তো ভেবেছিল কোনো কঠিন কাজ দেবে, কিন্তু গান গাইতে হবে সে ভাবেনি। তবুও নিজের মান-সম্মান রক্ষা করতে সে কিছুটা আড়ষ্ট গলায় গান ধরল,
“ভালোবাসবো, বাসবো রে বন্ধু তোমায় যতনে
আমার মনের ঘরে চাঁদের আলো চুইয়া চুইয়া পড়ে
পুষে রাখবো রাখবো রে বন্ধু তোমায় যতনে”
সবাই ভেবেছিল সূচি বুঝি গান গেয়ে কান ফাটল করে দেবে, কিন্তু দেখা গেল সূচির গানের গলাটা ওতটাও খারাপ নয়। বেশ মিষ্টি সুরেই গাইল সে। গান শেষ হতেই সবাই ভদ্রতা খাতিরে করতালি দিয়ে ওর গানের প্রশংসা করল।আদরের হাতের ধাক্কায় আবারও বোতল ঘোরানো হলো। প্লাস্টিকের বোতলটা কয়েকবার পাক খেয়ে এবার তার মুখটা স্থির করল একদম মেঘের দিকে।
সূচি প্রথম থেকেই মেঘকে একদম সহ্য করতে পারছিল না। তার একমাত্র কারণ হলো মেঘের গায়ের রঙ। ছাদের আড্ডার বাকি সবাই বেশ ফর্সা, কিন্তু মেঘের গায়ের রঙ মায়াবী শ্যামলা। আর এই শ্যামলা রঙের কারণেই সূচির মনে হচ্ছিল মেঘ এই আড্ডায় বড্ড বেমানান আর কালো। তাই বোতলটা মেঘের দিকে থামতেই সূচি যেন প্রতিশোধ নেওয়ার মোক্ষম সুযোগ পেয়ে গেল। সে সবার আগে চিৎকার করে মেঘকে জিজ্ঞেস করল,
“ট্রুথ অর ডেয়ার, মেঘ?”
মেঘ নিজের আনারকলি জামার ওড়নাটা ঠিক করতে করতে শান্ত গলায় বলল,
“ট্রুথ!”
সূচি এবার তার বিষাক্ত চাতুর্য মাখানো চোখ দুটো মেঘের ওপর স্থির করল। সবাইকে শুনিয়ে, একটু চড়া আর উপহাসের সুরে মেঘকে প্রশ্ন করল,
“তা ট্রুথ যখন নিয়েছিস, তবে সত্যি করে বল তো– তুই কি কাউকে ভালোবাসিস? তোর এই শ্যামলা রূপ দেখে কেউ কি আদৌ তোকে ভালোবাসতে রাজি হয়েছে?”
সূচির এমন বর্ণবাদী আর সরাসরি খোঁচা মারা প্রশ্নে পুরো ছাদের হাসিখুশি পরিবেশটা এক পলকে থমকে গেল। মেঘের মুখের মিষ্টি হাসিটাও যেন এক ধাক্কায় মিলিয়ে গেল। কিন্তু, সূচির এমন বর্ণবাদী আর অহঙ্কারী প্রশ্নের জবাবে মেঘ একটুও রেগে গেল না। সে অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর চোখে সূচির দিকে তাকাল। তার মায়াবী শ্যামলা মুখে এক অদ্ভুত উদাসীনতা ভর করল। নিজের ভেতরের সবটুকু অনুভূতি চেপে রেখে মেঘ অত্যন্ত ধীর স্থির কণ্ঠে উত্তর দিল,
“ভালোবাসা বলতে কিছুই হয় না। যাকে আমরা ভালোবাসা বলে দাবী করি, তা মোহ, মায়া, ইন্দ্রজালে ফেলে পথভ্রষ্ট করে জীবনকে ধ্বংসের মুখে ফেলা। জীবন’নষ্টকারী ভালোবাসা’কে আমি ঘৃণা করি, সাথে এই পুরুষজাতির মিথ্যে ভালোবাসাকেও।”
মেঘের মুখ থেকে এমন শক্ত, পরিণত আর পুরুষ-বিদ্বেষী কথা শুনে মাদুরে বসা প্রতিটি মানুষ বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সতেরো-আঠারো বছরের একটা চঞ্চল মেয়ের মুখে এমন জীবনমুখী কিন্তু চরম নেতিবাচক দর্শন ওরা কিছুতেই মেলাতে পারল না। কেন মেঘের মনে পুরুষজাতির প্রতি এত ঘৃণা, তার কারণ বাকিরা ভেবেও পেল না।
এদিকে, ছাদের দরজার কাছে আসতেই শীর্ষও মেঘের এই প্রতিটা কথা খুব স্পষ্ট করে শুনতে পেল। মেঘের অবলীলায় বলে যাওয়া সেই বাক্যগুলো যেন শীর্ষর শক্ত পুরুষের বুকে বিষাক্ত তীরের মতো এসে বিঁধল। তার হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা আঙুলের ফাঁকেই স্থবির হয়ে রইল। শীর্ষর মনে এক মস্ত বড় প্রশ্ন উঁকি দিল ঠিক কী এমন ঘটেছিল মেঘের অতীত জীবনে? যার জন্য সে প্রেম, ভালোবাসা আর পুরুষের ভালোবাসাকে এত ঘৃণা করে? এর পেছনের আসল রহস্যটা কী?
শীর্ষ দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে মেঘের সেই ম্লান মুখের দিকে তাকাল। তার ভেতরের জেদ আর মেঘকে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবার আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। সে নিজের চিবুক শক্ত করে মনে মনে এক ভীষণ প্রতিজ্ঞা আউড়ে বলল,
“যে ভালোবাসা ও পুরুষজাতিকে আজ তুমি ঘৃণা করছো, তার জন্যই দিওয়ানী হবে তুমি। অবশ্যই, সে পুরুষ ও ভালোবাসাটি হবো এই আমি। নিজের কাছেই নিজে প্রতিজ্ঞা করছি। তোমাকে আমাতে বিভোর করে তোমার ভুলধারণা ভেঙে দেবো, সুইটহার্ট!”
মেঘের মনে পুরুষদের নিয়ে তৈরি হওয়া এই ভুল ধারণাগুলো সে যেকোনো মূল্যে ভুল প্রমাণ করবেই। মুছে দেবে মেঘের মনে জমে থাকা সব কষ্ট, ব্যথা আর পুরনো বেদনা। শীর্ষ আর ছাদে গেল না, ধীর পায়ে সেখান থেকে নিজের ঘরের দিকে ফিরে গেল।
এদিকে ছাদে সূচি মেঘের উত্তর শুনে দমে যাওয়ার পাত্রী ছিল না। সে মেঘের দিকে তাকিয়ে আবার কুৎসিত চাতুর্য নিয়ে বলল,
“তা তোমার এমন অদ্ভুত আর পুরুষ-বিদ্বেষী ধারণার আসল কারণটা কী, শুনি?”
সূচির এই দ্বিতীয় প্রশ্নটা শুনে মেঘ নিজের কপাল কুঁচকে ফেলল। সে এক জোড়া ভ্রু নাচিয়ে অত্যন্ত কড়া আর সটান গলায় বলল,
“খেলার নিয়ম অনুযায়ী একটি মাত্র প্রশ্ন করার কথা ছিল আপনার। আপনি প্রশ্ন করেছেন, আমি নিয়ম মেনে তার উত্তরও দিয়েছি। এর বাইরে আর কোনো ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই, পারবও না।”
মেঘের এমন মুখের ওপর দেওয়া জবাবে সূচি সবার সামনে আবারও চরম অপমান বোধ করে মুখ কালো করে ফেলল।এদিকে ওদের এই কথাকাটাকাটির মাঝে দলের কেউই খেয়াল করেনি যে, মেঘের ওই কথাগুলো শোনার পর থেকে অভ্রর পুরো মুখে এক গাঢ় অন্ধকার নেমে এসেছে। ছাদের বাকি কেউ না জানলেও অভ্র খুব ভালো করেই জানে মেঘের এই মানসিকতার পেছনের আসল কারণটা কী। কারণ অভ্র যে মেঘের ভাই, আপন ভাই! নোমান, অভ্র আর মেঘ—ওরা তিন ভাই-বোন। আর মেঘ হচ্ছে ওদের দুজনের কলিজার টুকরো, অনেক আদরের ছোট বোন। বোনের জীবনের সেই পুরনো ঝড় আর তার ভেতরের ভাঙচুর অভ্র নিজের চোখে দেখেছে।অভ্র আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে দুই হাত জোড় করে আল্লাহর কাছে আকুল প্রার্থনা জানিয়ে মনে মনে বলল,
“হে আল্লাহ! কেউ কি নেই আমার এই অবুঝ বোনুর মনের ভেতরের এই ভুল ধারণাটাকে ভাঙার? সব পুরুষ যে এক নয়, সব ভালোবাসাই যে মিথ্যে নয় এই সত্যটা ওকে বোঝার তৌফিক দাও আল্লাহ! ওর জীবনে এমন কাউকে এনে দাও, যে ওর সব ক্ষত সারিয়ে দেবে।”
অভ্রর এই নীরব প্রার্থনার মাঝেই শেষমেশ ট্রুথ অর ডেয়ার খেলার আসরটা শেষ হলো। একে একে সবার দিকেই বোতল ঘুরেছিল, সবাই কমবেশি বেশ মজাও করল। কিন্তু সূচির ওই একটি প্রশ্নের পর থেকে মেঘের মনটা যেমন পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেল, তেমনি মেঘের ভাই অভ্রর বুকেও এক নীরব কষ্টের ঝড় বইতে লাগল।
রাত তখন বেশ গভীর। কারদার বাড়ির সবাই রাতের খাবার শেষ করে যে যার ঘরে শুতে চলে গেছে। চারদিক একদম নিঝুম, থমথমে। কিন্তু পুরো বাড়ি ঘুমালেও মেঘের চোখে আজ এক ফোঁটা ঘুম ছিল না। এসি ফুল স্পিডে চললেও তার কপাল বেয়ে ঠান্ডা ঘাম ঝড়ছে। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতেই তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠতে লাগল অতীতে ঘটে যাওয়া কিছু বিভীষিকাময়, ছেঁড়া ছেঁড়া দৃশ্য, আর কানের পর্দায় এসে তীব্রভাবে বাজতে লাগল কিছু চেনা কণ্ঠের আর্তনাদ,
“ওরা আমার সব কেড়ে নিয়েছে রে মেঘ! আমি ধর্ষিতা–ধর্ষিতা আমি!”
“ভালোবাসা বলে আসলে কিছু হয় না রে, কিছু না! পুরুষ জাতিটাই এমন, ওরা সবাই স্বার্থপর, সবাই প্রতারক!”
এই ভয়ঙ্কর স্মৃতিগুলোর মাঝে হঠাৎ করেই মেঘের চোখের সামনে ভেসে উঠল একটা সম্পূর্ণ ফাঁকা, ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘর আর সেই ঘরের সিলিং ফ্যানে ঝুলতে থাকা একটা মোটা রশি! কেউ একজন নিঃঝুম হয়ে ঝুলছে ওটাতে–চেনা সেই মুখটা নিথর!
মস্তিষ্কের ভেতর এই ভয়ঙ্কর দৃশ্যটা ভেসে উঠতেই মেঘ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে বিছানা থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে দুই কানে হাত চেপে তীব্র এক চিৎকার করে উঠল,
“না! না! সব ভ্রম! সব মিথ্যা!”
মেঘের এই বুক ফাটানো চিৎকার শুনে ওদিকের এটাচড ওয়াশরুম থেকে ওজু করে হন্তদন্ত হয়ে দ্রুত বেরিয়ে এলেন তার মা আলেয়া বানু। ঘরের আলো আাঁধারিতে এসে তিনি দেখলেন, মেঘ দুই কানে পাগলের মতো হাত চেপে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ছটফট করছে, তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। মেয়ের এই চেনা কিন্তু ভয়ঙ্কর অবস্থা দেখে আলেয়া বানুর কলিজা শুকিয়ে গেল, তিনি চরম ঘাবড়ে গেলেন।
“মেঘ! আম্মা তোমার কী অইছে? এমন করতাসো কেন তুমি?”
আলেয়া বানু দ্রুত এগিয়ে এসে মেঘের হাত দুটো ধরার চেষ্টা করলেন। কিন্তু মেঘ তখন এক ঘোরের মধ্যে। সে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ রেখেই অবিরল ধারায় কাঁদতে কাঁদতে আর্তনাদ করে বলল,
“মা! মা! ওই দেখো ঝিলি–ঝিলি ঝুলছে! ওই দেখো ফ্যানের সাথে ও কেমন করে ঝুলছে মা! ওরে নামাও — ওকে বাঁচাও মা, ও মরে যাবে!”
মেয়ের এই করুণ আর্তনাদ আর ‘ঝিলি’র নামটা শোনামাত্রই আলেয়া বানুর বুকটা যেন এক মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। পুরনো সেই একরাশ তীব্র কষ্ট আর ভয় আবার তার বুকে এসে আছড়ে পড়ল। তিনি আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরলেন নিজের অবুঝ মেয়েকে, শক্ত করে চেপে ধরলেন নিজের বুকের সাথে। মেঘের চুলে আর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে নিজের কান্না চেপে ধমকের সুরে কিন্তু নরম গলায় বললেন,
“ও কিছু না মা! ওসব কিচ্ছু না, সব তোমার মনের ভ্রম! কোথায় ঝিলি? ঝিলি তো এখানে নেই মা! ও তো অনেক দূরে চলে গেছে। শান্ত হও আম্মা, শান্ত হও!”
মায়ের বুকের ওম আর চেনা হাতের স্পর্শে ধীরে ধীরে মেঘের ভেতরের সেই কাল্পনিক ঝড়টা কিছুটা শান্ত হয়ে এল। তবে তখনও তার পুরো শরীরটা কাঁপছিল, চোখ দিয়ে অজোরে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। সে মায়ের বুকে মাথা রেখেই একদম দুর্বল, ভাঙা গলায় বলল,
“মা– পানি খাবো!”
আলেয়া বানু চটজলদি টেবিলের ওপর থেকে পানির জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে মেঘের মুখের সামনে ধরলেন। মেঘ যেন এক মরুর তৃষ্ণা নিয়ে গ্লাসটা ধরে ঢকঢক করে পুরোটা পানি এক নিঃশ্বাসে পান করে নিল। পানি খাওয়া শেষ হলে আলেয়া বানু আলতো করে মেঘকে বিছানায় শুইয়ে দিলেন, তারপর নিজেও মেয়ের পাশে শুয়ে তার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে গুনগুন করে ঘুম পাড়াতে লাগলেন।
বেশ কিছু সময় পর, মেঘের দীর্ঘ ও শান্ত নিশ্বাসের শব্দ শুনে আলেয়া বানু বুঝলেন মেয়েটা অবশেষে ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেছে। তিনি আলগা আলোয় মেঘের সেই মায়াবী, চোখের জলে ভেজা শ্যামলা ফেসটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
মেজর কারদার পর্ব ৪
এই মেঘকে নিয়ে ওনার চিন্তার কোনো শেষ নেই। চোখের সামনে নিজের আরেকটা মেয়ের মতো আদরের ঝিলিকে যেভাবে হারিয়ে যেতে দেখেছেন, যেভাবে একটা নরপশু আর মিথ্যে ভালোবাসার জালে পড়ে একটা ফুটফুটে প্রাণ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে তাতে আলেয়া বানুর মাতৃত্ব চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। আর সেই ভয়টাই আজ ওনার বুকে স্থায়ী বাসা বেঁধেছে। তাই তো তিনি মেঘকে এত কড়া শাসনে রাখেন, কারণে-অকারণে সবার সামনে গালমন্দ করেন। একটাই তো ভয় তার এই একমাত্র চঞ্চল মেয়েটাও যদি কোনোদিন ওই ঝিলির মতো সমাজ আর পুরুষের মিথ্যে ভালোবাসার শিকার হয়ে চিরতরে হারিয়ে যায়! মা তো, সন্তানের সুরক্ষার জন্য বুকের ভেতর এইটুকু ভয় আর শাসন জমিয়ে রাখাই যে ওনার স্বভাব!
