মৌটুসী পর্ব ১২
ঋতস্বিনী মাহবিশ
তরুনীদ্বয় চলে গেলে বীর সাফওয়ানকে জিজ্ঞেস করল, “ওলা কে চাচ্চু?”
সাফওয়ান তীর্যক হেঁসে বলল,
”ওরা তোমার বড় বোন বাবা। আর আমার সুন্দরী দুইটা রাজকন্যা।”
এখানে এসে বসেছে পর্যন্ত নিজের প্রতি তরুণীদের দৃষ্টি সাফওয়ানের নজর এড়ায়নি। এখানে যে তারা বীরের অছিলা দিয়ে এসেছে কেবল তার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট নেওয়ার জন্য, তাও তার বুঝতে বাকি নেই। এরপর ধাপে ধাপে কী হতে পারে—সে সম্পর্কেও সে বেশ ওয়াকিবহাল। কিন্তু সাফওয়ান এই ফাঁদে পা দেওয়ার মতো পাত্র নয়! কলেজ জীবনে দুটি প্রেম করেই তার এই জিন্দেগীতে প্রেম করার শখ মিটে গেছে। এখন মেয়েমানুষ মানেই তার কাছে যেন একরকম খসখসে খোসপাঁচড়া, যা চুলকালে কেবল অস্বস্তিই বাড়ে!
ডাক্তার দ্রুত হাতে প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে সামনে বসে থাকা বোরাককে বললেন, “বাচ্চা কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়বে। ওষুধ আর ইনজেকশনের প্রভাবে ঘুম থেকে উঠলেই ব্যথা একেবারে সেরে যাবে আশা করছি। আর ওষুধ লিখে দিচ্ছি নিয়ম অনুযায়ী খাওয়াবেন সেগুলো।”
প্রেসক্রিপশনের কাগজটা বোরাকের দিকে এগিয়ে দিলে বোরাক তা হাতে নিল। ডাক্তারকে ধন্যবাদ জানিয়ে কেবিনে ফিরে এল সে। মৌটুসীর কোলে ঘুমে ঢুলুঢুলু করছে চড়ুই। বোরাক এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে বলল, “ওকে আমাকে দিন।”
মৌটুসী কোনো আপত্তি করল না। চড়ুইকে বোরাকের কোলে এগিয়ে দিল।
বোরাক তার পরনের জ্যাকেটটার জিপারের মাঝে চড়ুইকে নিয়ে তার দুই প্রান্ত দিয়ে আলতো করে ওর ছোট্ট শরীরটা ঢেকে দিল। চড়ুই বোরাকের প্রশস্ত কাঁধে মাথা এলিয়ে চোখ বুজে নিল। ওষুধের প্রভাবে এখন সে ঘুমিয়ে যাবে নিশ্চিত।
মৌটুসী এতক্ষণে খেয়াল করল, মানুষটা একটু বেশিই লম্বা আর বলিষ্ঠ। এক কথায় বিশাল দেহীর মানুষ। সে একটা মেয়ে হিসেবে স্বাভাবিক লম্বা হয়েও লোকটার কাঁধ বরাবর। হাঁটতে হাঁটতে মৌটুসী জিজ্ঞেস করল,
“ডক্টর তখন ডেকে নিয়ে কী বললেন?”
”তেমন কিছু না, প্রেসক্রিপশন লিখলেন আর বললেন এখন চড়ুই পাখি ঘুমাবে, ঘুম থেকে উঠলেই ব্যথা সম্পূর্ণ সেরে যাবে।”
বোরাকের পেছন পেছন চেম্বার থেকে বেরিয়ে এল মৌটুসী। ওদের বেরিয়ে আসতে দেখে বীর আর সাফওয়ান উঠে এগিয়ে এল।
কাছাকাছি আসতেই তাড়াতাড়ি করে বীর চঞ্চল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “পাপা চুলুই পাখিল কষ্ট কমেছে?”
”হ্যাঁ বাবা, কমেছে। কথা বলো না। চড়ুই পাখি এখন ঘুমাচ্ছে।”
”আচ্ছা।” বীর ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে চুপ হয়ে গেল। মৌটুসী মুচকি হেসে বীরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ওর হাত ধরে লিফটের দিকে হাঁটতে লাগল।
পিছু পিছু হাঁটতে থাকা সাফওয়ানের মস্তিষ্ক তার সামনের সুন্দরতম দৃশ্যটাকে কিছু মুহূর্তের জন্য নিজের মতো করে কল্পনা করতে লাগল – বোরাকের কোলে ঘুমন্ত চড়ুই, মৌটুসীর হাতে বীরের হাত, খুব শক্ত করে ছোট্ট হাতটা ধরে বোরাকের পিছু পিছু এগিয়ে যাচ্ছে সে। সাফওয়ানের দৃষ্টির এঙ্গেল থেকে এই দৃশ্যটা ফ্রেমে বন্দী করলে তা নির্দ্বিধায় একটা ছোট সুখী পরিবারের ইঙ্গিত দিবে।
লিফটের ভেতর পা রাখতেই ঘোর কেটে গেল সাফওয়ানের। সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভাবনাকে সংযত করে কয়বার মনে মনে আসতাগফিরুল্লাহ জপে নিল সে। বীরের মা তার জীবনে উপস্থিত না থাকলেও, চড়ুইয়ের বাবা তো আছে! এমন কল্পনা মনে আনাও পাপ।
নিচে এসে হাসপাতালের ফার্মেসি থেকেই প্রেসক্রিপটেড ওষুধগুলো কিনে নিল মৌটুসী। ইতিমধ্যেই বোরাক বুঝে গিয়েছে মৌটুসীর সাথে বাইক কিংবা গাড়ি কিছুই নেই। তাই সে জিজ্ঞেস করল, আপনি এখন কোথায় যাবেন? মানে বাসা কোনদিকে?
মৌটুসী ওষুধগুলো ব্যাগে ঢুকাতে ঢুকাতে বলল,”জাদুঘরের মোড়, সবজি পাড়া।”
সাফওয়ান বলল, “তাহলে তো ভালোই আমরাও ওদিক যাব এখন। আমাদের সাথেই যেতে পারবেন আপু।”
মৌটুসী বিনয়ের সাথে মাথা নাড়ল,”না না। এমনিতেই অনেক করেছেন ভাইয়া। অনেক কৃতজ্ঞ। আর ভেজালে ফেলাতে চাই না আপনাদের। আমি একটা রিকশা নিয়েই চলে যাব।”
বোরাক বলল, “ঘুমন্ত বাচ্চাটাকে নিয়ে রিকশায় একা কিভাবে যাবেন? আমাদের সাথেই চলুন।”
মৌটুসীর অনিচ্ছা থাকলেও ‘না’ করার সুযোগ রইল না। এতক্ষণ মানুষগুলো অনেক সাহায্য করেছে। শেষ দিকে এসে এভাবে “না” করলে বিষয়টা খারাপ দেখাবে, অহংকারী ভাবতে পারে।
সাফওয়ান ড্রাইভ করছে। পাশে ঘুমন্ত চড়ুইকে নিয়ে বসেছে বোরাক। ব্যাকসিটে বীরকে নিয়ে মৌটুসী। বীর দুই হাতে মৌটুসীর চিকন কোমর জড়িয়ে ধরে বুকের কাছটায় মাথা ঠেকিয়ে আরামসে বসে আছে। মৌটুসী ওর গায়ের চাদরটার এক প্রান্ত দিয়ে বীরকে ঢেকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে আছে। কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে মাঝে মাঝে ওর মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়েও দিচ্ছে।
বোরাকের বাম হাতের ভাঁজে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে চড়ুই। ওর নাজুক মুখাবয়বে কি এক অপার্থিব মায়া—যে মায়া কোনো শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। একজন বাবা ছাড়া অন্য কেউ হয়তো এই অনুভবের গভীরতা পুরোপুরি বুঝতেও পারবে না। কিছু অনুভব কেবল পিতৃত্বের কাছেই সীমাবদ্ধ থাকে। বোরাক চড়ুইয়ের শান্ত মুখটা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সামনে রাস্তার দিকে তাকাল।
গাড়ি চলন্ত, গাড়ির ভেতরের পরিবেশ গুমোট শান্ত-স্থির, কিন্তু বোরাকের মনের স্থিরতা যেন টলে গেল মুহূর্তেই। কোনরূপ পূর্বপরিকল্পনা কিংবা উদ্দেশ্য ছাড়া একেবারে হঠাৎই তার চোখ চলে গেল রিয়ার-ভিউ মিররের দিকে।
ভিউ মিররে মৌটুসীর স্পষ্ট মুখচ্ছবি ভেসে উঠছে। বোরাক ইচ্ছে করেই চোখ সরাল না, বরং সুনির্দিষ্ট কোন কারণ ছাড়াই প্রতিচ্ছবিটার মাঝে কিছু একটা মিলিয়ে দেখার প্রচেষ্টা চালাল।
হুম! সেই দিন রাস্তার সেই পথচারীদের করা মন্তব্যটা যে এতটুকুও অতিরঞ্জিত ছিল না, সেটা বোরাক এই মর্মে ভালোই উপলব্ধি করছে। মেয়েটা সুন্দরী—তাতে সন্দেহ নেই। তবে ঠিক কোন কোন কারণে মন তাকে এই তকমাটি সেঁটে দিচ্ছে, তা সুনির্দিষ্ট করে বলা দুষ্কর। কেননা সৌন্দর্যের সংজ্ঞা তো কোন নির্দিষ্ট কাঠামোতেই সীমাবদ্ধ নয়। এই মুহূর্তে সন্তানের দুশ্চিন্তায় রমনীর সুন্দর মুখখানা কিছুটা মলিন, অশ্রু শুকিয়ে ঘন পাপড়িগুলো একে অপরের সাথে লেগে গোটা গোটা হয়ে আছে, চোখের নিচে ক্লান্তির অল্প কালচে আভা, দৃষ্টি ভাবলেশহীন। অথচ, মাতৃত্বের নিবিড় উদ্বেগের এই ছোট ছোট চিহ্নগুলোই তার চেহারায় এক অনন্য লাবণ্য ঢেলে দিয়েছে যেন।
তবে বোরাকের একটু বিশেষ ভাবে বিশ্লেষণ করার মতো একটা জিনিস মনে হলো, মেয়েটার উপরের ঠোঁটটা অদ্ভুত সুন্দরভাবে গোটানো। তার ফিলট্রাম অর্থাৎ নাক এবং উপরের ঠোঁটের মাঝের খাজটা একটু বেশিই শৈল্পিক।
পরক্ষণেই একেবারে হুট করে দৃষ্টির ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে এল বোরাকের। নিজেই নিজের কাছে লজ্জিত হয়ে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল সে। এমন না যে তার দৃষ্টি কলুষিত ছিল। তবে এভাবে একটা মেয়েকে তার অগোচরে খুঁটিয়ে দেখা চরম অভদ্রতা, তা উপলব্ধি করতেই নিজের করা কাণ্ডের প্রতি অসন্তোষ হলো বোরাক। মোট কথা এমন আচরণ তার সাথে যায় না। তার ওপর সেই রমনী একজন মা, কারো স্ত্রী। ভেতরে একটা অপ্রস্তুতবোধ হতে লাগল বোরাকের। নিজেকে স্বাভাবিক করতে ফের মাথা নামিয়ে কোলের শিশুটির নিষ্পাপ মুখের স্নেহে নিজেকে সঁপে দিল সে।
এতক্ষণ যাবৎ মৌটুসী কোমল বুকে বেশ চুপচাপই ছিল বীর। কিন্তু হুট করে কী মনে হতেই সে মাথা তুলে মৌটুসীর দিকে তাকাল। নিষ্পাপ চোখে প্রশ্ন করল, “চুলুই পাখিল মাম্মা আন্টি, ডক্টল আঙ্কেল চুলুই পাখিকে সুই ফু্টিয়ে দিয়েছিল?”
জানালার বাইরের নির্জনতায় ডুবে থাকা মৌটুসী বীরের কণ্ঠস্বরে সম্বিত ফিরে পেল। সে মাথা ঘুরিয়ে বীরের দিকে তাকাল, তারপর মুচকি হেসে ওর মাথার চুলগুলো আলতো করে এলোমেলো করে দিয়ে বলল, “হ্যাঁ বীর সোনা, ডক্টর আঙ্কেল চড়ুইকেও সুই দিয়েছিল।”
”চুলুই পাখি ব্যথা পায় নি? আমাল তো অনেক ব্যথা লাগে।”
”পেয়েছিল। চড়ুই পাখিও খুব ব্যথা পেয়েছিল।”
”কান্না কলেছিল?”
”হুম, কান্নাও করেছিল। বীর সোনা কান্না করে না সুই দিলে?”
”কলে তো! সুই দিলে আমাল অনেক কান্না পায়।”
ইস! নিষ্পাপ মনের কি সরল সরল কথা! মৌটুসী আবারও মিষ্টি হেসে ঠোঁট নামিয়ে ওর নরম গালে একটা চুমু এঁকে দিল। বীরের যেন তাতে মন ভরল না; সে মাথাটা বাঁকা করে অপর গালটাও এগিয়ে দিল মৌটুসীর দিকে। মৌটুসী সেই গালটা আলতো করে টেনে নিয়ে সেখানেও আরেকটি চুমু খেল।
সাফওয়ান গাড়ির গতি কিছুটা কমিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপু, ডানের রাস্তায় নিব নাকি বায়ে?”
মৌটুসী বলল, “বায়ে, বায়ে মোড় নিয়ে দুই নাম্বার গলির সামনে দাঁড়াবেন।”
সাফওয়ান গাড়ি ঘুরিয়ে নিল। দুই নাম্বার গলির সামনে গাড়ি এসে দাঁড়ালে মৌটুসী বীরকে আলতো করে সোজা করে বসিয়ে দিয়ে কপালে একটা চুমু খেল।
বীর পিটপিট করে চেয়ে বিষণ্ণ মুখে জিজ্ঞেস করল, “চুলুই পাখিকে নিয়ে তুমি এখন চলে যাবে চুলুই পাখির মাম্মা আন্টি?”
মৌটুসী হাসল, “হ্যাঁ বাবা। এখন চলে যেতে হবে। আবার পরে দেখা হবে।”
“পলে আবাল কখন?”
“চড়ুই পাখি যদি সুস্থ হয়ে কালকে স্কুলে যেতে পারে, তাহলে কালকেই দেখা হবে।”
”চুলুই পাখি সুস্থ হয়ে যাবে।”
মৌটুসী প্রশান্তিময় হেঁসে আবারো একবার বুকে টেনে নিল ওকে,”ইনশাআল্লাহ বাবা।”
বাচ্চারা এত নিষ্পাপ হয় কেন?
মৌটুসী গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে বোরাকের কোল থেকে ঘুমন্ত চড়ুইকে নিজের কোলে নিয়ে নিল। সাথে সাথেই চড়ুইয়ের শরীর থেকে ব্ল্যাক কফির মতো পোড়া পোড়া খুবই তীক্ষ্ণ একটা ঘ্রাণ এসে লাগল মৌটুসীর নাকে। এটা হয়তো লোকটার শরীরের পারফিউমের ফ্লেভার। বীরের শরীর থেকেও মৃদু পাওয়া যাচ্ছিল। তবে ঘ্রাণটা বেশ, সাথে অদ্ভুত রকমের নেশালো; মৌটুসী অবচেতনভাবেই নিঃশ্বাসের সাথে ঘ্রাণটা টেনে নিল। বাইরে ভালোই ঠান্ডা পরেছে, গায়ের চাদরটা দিয়ে চড়ুইকে ভালোভাবে ঢেকে ঢুকে নিয়ে এবার বোরাকের দিকে তাকাল সে। বিনয়ী কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলল,
“ভাইয়া আপনাদের যে কিভাবে ধন্যবাদ জানাব সত্যিই আমার জানা নেই।”
বোরাক মুচকি হাসল। বলল, “ইটস ওকে। আমারও সমবয়সের একটা বাচ্চা আছে। তাই আপনার পেরেশানি বুঝতে পেরেছি। তবে, এবার থেকে এমন পরিস্থিতি একা হ্যান্ডেল করতে না যাওয়ার পরামর্শ থাকবে আমার তরফ থেকে।”
মৌটুসী একটুকরো মলিন হাসল। বীর গাড়ির জানালায় হাত রেখে তার ওপর থুতনি ঠেকিয়ে এদিকে তাকিয়ে আছে। ছোট মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে।
”আচ্ছা ঠিক আছে। মেয়ের খেয়াল রাখবেন।” বলেই এবার বোরাক হাত বাড়িয়ে ঘুমন্ত চড়ুইয়ের মাথা ছুঁইয়ে দিল, “খুব তাড়াতাড়িই সুস্থ হয়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।”
মৌটুসী পেছন ফিরে যেতে নিচ্ছিল, তখনই সাফওয়ান তাড়াহুড়ো করে গাড়ি থেকে নেমে ডাকল, “আপু!”
মৌটুসী ঘুরে দাঁড়াল, “জ্বি ভাইয়া?”
সাফওয়ান ইতস্তত করে বলল, “আপনার নাম্বারটা দেওয়া যাবে? চড়ুইয়ের খোঁজ নিতে পারতাম।”
”জি। উঠিয়ে নিন।” তবে মৌটুসী কিছু একটা ভেবে ওর ব্যাকআপ সিমের নাম্বারটা দিল।
”ধন্যবাদ আপু।”
দিনের আলো ম্লান হয়ে আসছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই মাগরিবের আযান শোনা যাবে। চড়ুইকে কোলে নিয়ে গলির ভেতর দিয়ে হাঁটছিল মৌ। হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে এল—‘এই যে মৌটুসী!’
মৌটুসী হাঁটা থামিয়ে বিরক্তিতে ভ্রূ কুঁচকাল। তার বিরক্ত হওয়ার কারণ হলো তাকে মৌটুসী বলে ডাকা হয়েছে। কেবল কটূক্তি করতেই তাকে এই নামে ডাকা হয়। বুঝ হওয়ার পর থেকেই মৌটুসী নামটা তার ভীষণ অপছন্দের। নামের শেষে ‘টুসী-টুসী’ একটা আড়ষ্টতা আছে, যা তার একদমই সহ্য হয় না। বাড়ি এবং বাহিরে সব জায়গাতেই সকলেই মৌ বলেই ডাকে, মৌ নামেই সে পরিচিত এবং অভ্যস্ত। কেবল সরকারি নথিপত্র আর কাগজ-কলমেই মৌটুসী নামটা আটকে আছে। তবে সাধ্য থাকলে সে কবেই কেটেকুটে তা শুধু ‘মৌ’ করে নিত।
মৌটুসী একরাশ বিরক্তি নিয়ে পেছনে তাকাল। রাস্তার ধারের দোতলা বাড়িটির গেট দিয়ে হাই হিল পরে হেলেদুলে বেরিয়ে আসছে নীতি। পরনে ঝকমকে জর্জেট শাড়ি, ভারী মেকআপে মুখটা দেখতে ভালোই লাগছে। কাছে এসে বাঁকা হেসে সে বলল, ‘কী খবর, মৌটুসী?’
মৌটুসী জোরপূর্বক মুচকি হাসল, সামান্য ভ্রূ উঁচিয়ে বলল, “খুববই ভালো, কিছু বলবে দু… নীতি আপু?”
নীতি শ্লেষের সুরে বলল,”হুম, বলতে তো অনেক কিছুই মন চায়। মেয়েকে বোটানিক্যাল কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করিয়েছিস মনে হয়!”
”কনফিউশন নিয়ে প্রশ্ন করছ কেন? তোমার তো শিওরলি জানার কথা। ওই স্কুলেই পড়াও না তুমি?”
”হুম, তাই স্কুলের খরচ সম্পর্কেও বেশ ভালোই জানি। আর তাই তো চিন্তা হচ্ছে তোর জন্য। দেখিস, পরের বছরই যেন ট্রান্সফার করাতে না হয়।”
মৌ এবার মৃদু হাসল, ‘কেন করাতে হবে? তুমি আছো না? যদি দেখি কুলাতে পারছি না, তখন তোমার রেফারেন্সেই পড়াব। স্কুলের টিচার হয়ে নিজের ভাগ্নীর জন্য এটুকু তো করতেই পারবে। ভ্যালুলেস তো আর নও, নাকি পার্টটাইম কিছু করো সেখানে?’
হঠাতই নীতির চোখমুখ শক্ত হয়ে উঠল। কিছুটা ঝাঁঝালো গলায় বলল, ‘কী… কিসের রেফারেন্স? ওটাকে দুই টাকার সস্তা স্কুল পেয়েছিস নাকি? ওখানে কোনো রেফারেন্স চলে না। নিজের আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে ভর্তি করালি কেন? অন্যের ভরসায়?’
”ভর্তি তো করেছি নিজের ভরসাতেই। কিন্তু ছোট বোন কুলাতে না পারলে তো তার অপূর্ণ দায়িত্বটা কাঁধে নেওয়া বড় বোন হিসেবে তোমার কর্তব্য নীতি আপুউউউ।”
”ডিজগাস্টিং।” রাগে গজগজ করতে করতে নীতি এক ঝটকায় ঘুরে হাঁটা দিল। ছেড়ে রাখা চুলগুলো ঝটকা খেয়ে অল্পের জন্য মৌটুসীর চোখ মুখ স্পর্শ করল না।
মৌটুসী ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে চোখ উল্টে বিড়বিড় করল, “হাহ্ ডিজগাস্টিং! সত্যি কথা শুনলে গায়ে ফোসকা পড়েই! এক বছর পর তুই নিজেই ওই স্কুলে টিকে থাকতে পারবি কিনা আগে সেই চিন্তা কর, দুর্নীতি!”
তারপর উল্টো ঘুরে সেও হাঁটা দিল।
শিকদার ম্যানশনের ড্রয়িং রুম জমজমাট। সোফার সিটগুলো কানায় কানায় পূর্ণ। সেন্টার টেবিল জুড়ে চা, কফি আর বাহারি সব স্ন্যাকসের সমাহার—যার যা মন চাচ্ছে, তা-ই নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি পড়ে গেছে। বোরাকের দুই ফুফু এবং তাদের সন্তানদের আগমনে নির্জন বাড়িটা আর লোকসমাগমে ভরপুর।
সোফায় সরিয়ালে বসেছে, নেহা, স্নেহা, শুভ, আসাদ, নীলিমা, সাথী ও জুয়েল। জুয়েল বাদে এরা সকলেই বোরাকের ফুপাতো কাজিন। বড় ফুপু রেজিনা বেগমের দুই ছেলে আসাদ আর শুভ। অন্যদিকে ছোট ফুপু লামিয়া বেগমের দুই মেয়ে নেহা, স্নেহা। আসাদ বোরাকের কাজিন হলেও তার সমবয়সী ও বন্ধু। তাদের বন্ধু মহলের আরো একজন মুখ – জুয়েল। আসাদ জুয়েল দুজনেই বিবাহিত। আর অন্য কাজিনগুলো তাদের জুনিয়র, আনম্যারিড। তবে বলা বাহুল্য এই এখানকার সবকটাই একেকটা বিচ্ছু। এদের আবার একখান খাস নামও আছে ‘গোল্লাছুটের দলবল’।
বোরাক বীরকে কোলে নিয়ে ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই আসাদ বলে উঠল, “ওই যে আমগোর চ্যাম্পিয়ন উইথ চাম্প ইয হাজির!”
আসাদের কথায় উপস্থিত সকলেই দরজার দিকে লক্ষ্যপাত করল।
ড্রয়িং রুমে বসা এতগুলো প্রিয় আর পরিচিত মানুষ দেখে বীরের ফ্যাকাশে মুখটা মুহূর্তেই চকচক করে উঠল। বোরাকের কোল থেকেই দুই হাত বাড়িয়ে লাফাতে লাগল সে।
শুভ সোফা থেকে বীরকে দেখেই তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল। বীরের দিকে আসার সময় স্নেহার হাত থেকে আধখাওয়া কুকিজটা কেড়ে নিয়ে মুখে ঢুকিয়ে দিল। তারপর শিনা টান টান করে বিজয়ী বেশে বোরাকের কাছে এসে বীরকে কাঁধে তুলে নিল, “আমার শূরবীর চাচ্চুটা কেমন আছে?”
বোরাক সোফার দিকে এগিয়ে এসে ফুফুদের সালাম দিল। তারপর সবার সাথেই টুকটাক ভালো মন্দ কথা বলে বীরকে নিয়ে উপরের ঘরে চলে এল। হাসপাতাল থেকে এসেছে তারা, জামাকাপড় ছেড়ে আগে ফ্রেশ হওয়া দরকার।
বিকেলেই যেই বাড়ি নিস্তব্ধতায় ডুবে ছিল, এখন তা একেবারে হৈ-হুল্লোড়ে মেতে আছে। আশা রান্না বান্নার তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে। তার সাথে হাত লাগিয়েছেন নীলিমা ও সাথী। রেজিয়া বেগম আর লামিয়া বেগম দুইবোন ড্রয়িং রুমে খোশ গল্পে মেতে উঠেছেন। তাদের সাথে বসে গল্পের জোগাড় দিচ্ছেন সাফওয়ানের জননী মধ্যবয়স্ক বৃদ্ধা খোদেজা বেগম। এই পরিবারের সাথে ভদ্রমহিলার রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই। নেই কোনো সামাজিক সম্পর্ক। বরং তার স্বামী এককালে এই বাড়ির কর্তার বিশ্বস্ত এক কর্মচারী ছিলেন। যিনি আজ প্রায় এক যুগ পূর্বে মালিকের জীবন রক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর ভদ্রমহিলা এই বাড়ির সেবায় নিযুক্ত থেকেছেন বেশ কিছু বছর। স্বামীর এবং নিজের এত এত আনুগত্য থেকে আজ খোদেজা বেগম এই বাড়িরই একজন হয়ে উঠেছেন। বাড়ির সকলেই তাকে যথাযথ সম্মান দিয়ে থাকেন। তবে বর্তমানে ভদ্রমহিলার শরীরে বেশ কিছু মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে। তাই না চাইতেও সকল দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে স্বামীর কবরের পাশে গড়ে ওঠা ছোট্ট একটা বাড়িতেই দিনরাত অসুস্থতার সাথে লড়াই করে কাটাতে হচ্ছে তাকে।
আরোয়া, নেহা, স্নেহা আর শুভ আরোয়ার ঘরের মেঝেতে গোল হয়ে বসে আড্ডা পেতেছে, আর তাদের মাঝখানে কিছু খেলনা নিয়ে বসে নিজের মতো করে খেলছে বীর। মাঝে মাঝে শুভকে এটা ওটা বলছে।
আসাদ বিছানায় আধশোয়া, জুয়েল কাউচে। আর বোরাক সোফায় বসা, উরুর ওপর একটা ল্যাপটপ। তাতে বেশ কিছু সিসিটিভি রেকর্ড ভেসে আছে। আজ বাড়িতে কয়েকটা সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। পূর্বে বাড়ির বাইরে ক্যামেরা থাকলেও ভেতরে দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি কখনো। তবে পরশু আশার বলা নানা সন্দেহভাজন কথা শুনে বোরাক ভেতরেও কয়েকটা ক্যামেরা লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবং গতকাল সব অ্যারেঞ্জমেন্টও করে রেখেছিল। আজকে দুপুরে মিস্ত্রি এসে সেগুলো সেট করে দিয়ে গিয়েছে। এখন সেগুলোর কার্যক্রমই বসে বসে ল্যাপটপে চেক করছে বোরাক।
চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকতে বিরক্ত হয়ে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল আসাদ। আঙ্গুল ঠেলে তিনটে সিগারেট টেনে নিতে নিতে বোরাককে উদ্দেশ্য করে বলল, “লাইটার কোথায় রে মামা?”
”নেই।” বোরাকের এককথায় উত্তর।
জুয়েল নিজের প্যান্টের পকেট থেকে লাইটার বের করতে করতে বলল, “সাধুর কাছে রমনীর খোঁজ করছিস তুই?”
তারপর লাইটারটা আসাদের দিকে শূন্যে ছুঁড়ে দিল। আসাদ তা ক্যাচ করে নিয়ে তিনটে সিগারেট ধরিয়ে একটা জুয়েলকে দিয়ে আরেকটা বোরাকের দিকে বাড়িয়ে ধরল। বোরাক ফিরিয়ে দিল না। হাতে নিল জ্বলন্ত সিগারেটটা।
তিন তিনটে জ্বলন্ত সিগারেটের প্রভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরটা মৃদু ধোঁয়াটে হয়ে উঠল। আসাদ দীর্ঘ সময় নিয়ে একনিষ্ঠ বোরাককে দেখে ভাবুক ভঙ্গিতে বলল, “বুঝলি জুয়েল, আমার এখনও কেন জানি বিশ্বাস হইতেছে না বোরাক মামায় বিয়ার পিড়িতে বসতে নিজ মুখে রাজি হইছে।”
জুয়েল মুখের ধোঁয়াটুকু ছেড়ে বলল, “আরে হইছে হইছে। মামার এখন কি প্রয়োজন, বুঝি বুঝি! মধুর ক্রেভিংস ভাই!”
আসাদ দুইদিন মাথা নাড়াল, “নাহ্! তুই যাই ক। আমার মন সায় দিতাছে না। বোরাক, ঝেড়ে কাশ তো ভাই। আশার কথা সত্যিই সত্যি? বিয়া টিয়া করার একটুকরো ইচ্ছা জন্মাইছে তোর ভেতরে? নাকি হুদাই আমরা ঘোড়া দৌড় দৌড়াইতেছি?”
এই পর্যায়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্য হাসল বোরাক, “ইচ্ছা? জেনে বুঝে নতুন করে এক আপদ বরণ করবার ইচ্ছা নিজ থেকেই কার জন্মায় ভাই?”
আসাদ আর জুয়েল একবার চোখাচোখি করে চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
বোরাক আবার বলল, “সব আশার জোড়াজুড়ি। মেয়েটাকে বুঝাতেই পারি না। এখন দেখে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায়ই নাই। দেখি কতদূর কি গড়ায়!”
কিছুক্ষণ নীরবতা…..
জুয়েল এবার বেশ চিন্তিত হওয়ার ভান করে বাম হাতে দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে বোরাককে উদ্দেশ্য করে বলল,
“বুঝলাম! কিন্তু মামা, তোর বিয়া করার ইচ্ছাটা নাই কেন বলত? না মানে, বিয়া তো হলো মধুর ব্যাপার সেপার। আর কোনো পুরুষ মানুষের মধুর প্রতি অভক্তি মানেই বুঝতে হবে তার সিস্টেমে গন্ডগোল। তোরও কি তেমন কোনো ইস্যু আছে নাকি মামা? ফ্রি মাইন্ডে বলে ফেল তো ভাই। আমরা তো আছিই!”
আসাদ একটা বালিশ ছুঁড়ে মারল জুয়েলের দিকে, “ধুর বেটা! শুরু করলি কি?”
জুয়েল বালিশটা খপ করে ক্যাচ ধরে বলল,
“কি শুরু করলাম? লজিক্যাল প্রশ্ন! তাহলে জিগা তারে ক্যান মধু খাওয়ার প্রতি তার এত বিতৃষ্ণা!”
আসাদ এবার একটু খেকিয়ে উঠল, “তোর ঘেলুলেস লজিক তোর মাথায়তেই রাখ, বাল। সিস্টেমে গন্ডগোল থাকলে বীরের মতন আস্ত একটা চমচম কি তুই ডাউনলোড করে দিয়েছিলি ব্যাটা? সিস্টেমে গন্ডগোল নাই আমি শিওর, তবে…. একটু থামল আসাদ।
বোরাক এবার নিজেই প্রশ্ন করল, “তবে?”
”তবে, সিস্টেমে জং ধরতে পারে, এর চান্স আছে। ব্যবহার করা হয়নি অনেকদিন তো! আচ্ছা কতদিন হবে? আশিয়ানা চলে যাওয়ার কতদিন হচ্ছে রে জুয়েল?”
জুয়েল সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, “বীরের যখন চার মাস। হিসেব কর তাইলেই পেয়ে যাবি।”
আসাদ ভ্রূ কুঁচকে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে হাতের পোর গুনতে লাগল। পরক্ষণেই মাথায় হাত দিয়ে হায় হায় করে বলল,
“বাপ্রে?? ভাই প্রায় সাড়ে চার বছর? আমার বউ দুইদিন বাপের বাড়ি গিয়ে থাকলে তিনদিনের মাথায় আমিও মধুর টানে মধুর হাড়ির উঠানে হাজির হয়ে যাই। আর তুই মামা? আচ্ছা তোর কোনো রাতে বিছানাটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে নি? ক্রেভিংস হয়নি কিছু-মিছুর? নাকি মেশিনের সাথে সাথে মাথার তারগুলোতেও জং ধরে গেছে?”
এতক্ষণ সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে খুব মনোযোগ সহকারে বন্ধুদের কথা শুনছিল বোরাক। এবার নিজেও বেশ সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল, “সবকিছুতেই জং, এখন সলিউশন?”
জুয়েল আর আসাদ মুহূর্তের দেরি না করে সমস্বরে বলে উঠল,
“সকল প্রকার গোপন সমস্যার একটাই সমাধান, জাদুকরী ফর্মুলায় তৈরি ‘কলিকাতা হারবাল’। মাত্র এক ডোজেই ফিরে পান আপনার হারানো রাজস্ব!”
তারপর তিনজনই হো হো করে হাসতে লাগল। পুরো ঘরটা মুহূর্তেই তাদের অট্টহাসিতে মুখরিত হয়ে উঠল।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় ছোট ছোট পায়ের শব্দ শোনা গেল। দরজার কপাট ঠেলে ঘরে ঢুকল বীর। “পাপা তোমলা কি কলছ?”
তাকে ঘরে প্রবেশ করতে দেখেই তিন বন্ধুর হাসাহাসি মুহূর্তের মধ্যে থমকে গেল। সচেতন হয়ে উঠলেন তারা; আসাদ আর জুয়েল দ্রুত হাতের জ্বলন্ত সিগারেটগুলো মেঝের ওপর ফেলে পা দিয়ে পিষে নিভিয়ে ফেলল। বোরাকও তার হাতেরটা নিভিয়ে দ্রুত সবগুলো কুড়িয়ে নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিল।
ঘরের ভেতর তখনো হালকা ধোঁয়া ভাসছে। বীর ভেতরে দুই ধাপ আসতেই ধোঁয়ার গন্ধে তার নাকে সুড়সুড়ি শুরু হলো, খুকখুক করে কাশতে শুরু করল সে। “পাপা!”
বোরাকের কপালে ভাঁজ পড়ল। বন্ধুদের একবার চোখ রাঙানি দিয়ে সে দ্রুত ঘরের জানালাগুলো খুলে দিল, বারান্দার দরজাটাও খুলে দিল যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে। এরপর ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে রুম ফ্রেশনার নিয়ে পুরো রুমে স্প্রে করে দিল।
জুয়েল ততক্ষণে এগিয়ে গিয়ে বীরকে কোলে তুলে নিল। বীরের পিঠে আলতো করে চাপড় দিয়ে একগাল হেসে বলল, “আমাদের চ্যাম্প, এতক্ষণ কোথায় ছিল?”
বীর তার ছোট ছোট হাত দিয়ে জুয়েলের ঘাড় জড়িয়ে ধরে বলল, “আমি তো শুভ চাচ্চুল সাথে খেলা কলছিলাম।”
আসাদ আর জুয়েল এবার বীরের সাথে মেতে উঠল। ওর অবুঝ অবুঝ কথাগুলো তারা বেশ এনজয় করে। মনে হয় সারাদিন এই বাচ্চাটার সাথে কথা বললেও তাদের কথা ফুরাবে না।
বোরাক একধ্যানে ওদের খুনসুটির দিকে তাকিয়ে আছে। এবার কিছুটা নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল, “নাও আই ব্যাডলি উইশ আসাদ, আমি আমার বাচ্চাটাকে একটা মায়ের মতো মা উপহার দিতে পারতাম!”
বোরাকের আক্ষেপ ঝরানো কণ্ঠ শুনে আসাদ আর জুয়েল মুহূর্তেই থমকে গেল। তবে সেই আক্ষেপটুকুর মাঝে কিছুটা আশার আলোও খুঁজে পেল তারা।
মৌটুসী বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে। আর তার বুকে উপুর হয়ে শুয়ে আছে চড়ুই। হাত দিয়ে মৌটুসীর জামার জিপারটা অল্প খুলছে আবার লাগাচ্ছে। এটাই ওর এখন খেলা, খুব মজা পাচ্ছে যেন। ঘুম থেকে ওঠার পর ব্যথা আর তেমন নেই। ফলে আবারও তার সহজাত প্রাণবন্ত হয়ে উঠে মেয়েটা।
এদিকে মৌটুসীর মাথায় এখন হাজারো কথা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। সব হিসেব এক জায়গাতে এসে জট পাকিয়ে যাচ্ছে। বোরাককে সে পূর্বে কোথায় দেখেছিল তা এবার মনে করতে পেরেছে। তবে সেদিনের অভিজ্ঞতায় মানুষটাকে যতটা নির্দয় খাটাশ ভেবেছিল, মানুষটা ততটাই ভালো আর দয়ালু, সাচ আ জেন্টাল ম্যান। সেটা চিন্তার ব্যাপার নয়। চিন্তার ব্যাপার হলো মানুষটার কণ্ঠস্বর। মনের এই বিরাট কনফিউশান ক্লিয়ার না হওয়া পর্যন্ত ওর শান্তি নেই।
হুট করেই মৌটুসীর মাথায় এর একটা সমাধান বের হলো যেন, বুকে থাকা চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “চড়ুই পাখি, তোমার বীর বন্ধুর পুরো নাম তুমি জানো?”
চড়ুই কিছুক্ষণ চুপ থেকে মনে করার চেষ্টা করল। কিন্তু অতবড় নাম একবার শুনেই মনে রাখা সম্ভব নয় ওর ছোট মস্তিষ্কের। শেষমেষ ঠোঁট উল্টে বলল, “বীর বন্ধু বলেছিল, কিন্তু আমি ভুলে গেছি মাম্মা।”
”আচ্ছা থাক, সমস্যা নেই।”
কিছুক্ষণ পরেই চড়ুই ধড়ফড় করে বিছানা থেকে নেমে গেল। মৌটুসী অবাক হয়ে ডাকল, “কোথায় যাচ্ছ মাম্মা?”
চড়ুই কোনো কথা না বলে দৌড়ে গিয়ে টেবিলের ওপর থেকে তার স্কুল ব্যাগটা নিয়ে এল। ব্যাগের চেইন খুলে ছোট একটা খাতা বের করে একটা একটা করে পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগল। এরপর কাঙ্ক্ষিত পৃষ্ঠায় এসে মৌটুসীর দিকে বাড়িয়ে দিল খাতাটা। “এটা আমার বীর বন্ধুর নাম।”
খাতায় মাঝখানে বড় অক্ষরের খুবই কাঁচা হাতের লেখা, Azan Bir Shikder.
মৌটুসী চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে আছে লেখাটার দিকে। কয়বার চোখ ঝাপটা দিয়ে আবার দেখল। না, ঠিকই আছে। তার মানে তার মনের অসম্ভব ভাবনাই সত্য প্রমাণিত হয়ে গেল! বীর শিকদার বংশের ছেলে। আজ তাদের বাড়িতেই কেক নিয়ে গিয়েছিল সে। সব থেকে বড় কথা তার পাপা মানে মি. জেন্টলম্যানের কণ্ঠের ওপর এক দফা ক্রাশও খেয়ে এসেছে। মৌটুসী দুই হাতে মুখ ঢেকে নিল,
মৌটুসী পর্ব ১১
“ইশ কী লজ্জা লজ্জা! বীরের মা কোনোভাবে এই খবর জেনে গেলে মৌ তোর মাথার সবকটা চুল টেনে ছিঁড়বেন ওই ভদ্রমহিলা। তার সুদর্শন হাসবেন্ডের কণ্ঠের ওপর খাওয়া ক্রাশ তোর পেট কেটে বের করে আনবেন। সাবধান মৌ! সাবধান!”
