Home মৌটুসী মৌটুসী পর্ব ১৮

মৌটুসী পর্ব ১৮

মৌটুসী পর্ব ১৮
ঋতস্বিনী মাহবিশ

কয়েক সেকেন্ড যাবার পরেও শরীরে কোনো স্পর্শ বা আঘাত টের না পেয়ে এবার আস্তে করে চোখ মেলে দিল মৌটুসী। তার সামনে এখন দণ্ডায়মান এক প্রশস্ত বুক, নাকের খুব কাছে বাতাসে ঘুরঘুর করছে কফি-ভ্যানিলার সেই নেশাগ্রস্ত ঘ্রাণ।মৌটুসী হতবিহ্বল হয়ে মাথাটা সামান্য উঁচু করতেই বোরাকের পৌরুষদীপ্ত শক্ত চোয়াল তার দৃষ্টি গোচর হলো, যার দুপাশের সুগঠিত হাড়গুলো যেন চামড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে এক্ষুনি। ভ্রূ যুগলের সন্ধিস্থলে পরপর তিনটি ভাজ সুস্পষ্ট। চেনা বাদামী চোখের এই দৃষ্টি মৌটুসীর একেবারেই অচেনা, তার দেখা বিগত দিনগুলোর চেয়ে একেবারেই অন্যরকম।
বোরাক ডান হাতের দুই আঙুল দ্বারা মৌটুসীর মাথাটা আলতো অল্প ঠেলে ওকে মাঝখান থেকে সরিয়ে দিল। এরপর লোকটাকে উদ্দেশ্য করে হীম শীতল কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়ল, “কি হচ্ছে এখানে? একজন নারীর গায়ে হাত দেওয়ার স্পর্ধা কোত্থেকে থেকে আসে? কলিজা খুব বড় হয়ে গেছে নাকি?”

​লোকটা হাত ঝটকা দিয়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করল একবার, তবে সুবিধা করতে পারল না বিশেষ। বোরাকের শক্তির কাছে রোগা পাতলা লোকটার জোড় নিতান্তই নগন্য। বোরাকের দৃঢ় মুঠোয় তার কব্জির রক্তপ্রবাহ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। বোরাকের সাথে দৈহিক শক্তিতে পেরে না উঠে, এখন আলগা দপট দেখিয়ে বলল “ওই শালা বাই*তের বাচ্চা হাত ছাড়, শালা! আমার এলাকাই আইয়া আমারেই জ্ঞান ঢালে! বাঁইচা ফিরতে চাইলে ভালোই ভালোই হাত ছাড়, মটকা গরম করাস না।”
না, ​বোরাক তবুও ছাড়ল না হাত। তার অতিরিক্ত শান্ত অভিব্যক্তিতেও কোনো রুপ পরিবর্তনও এল না। সামনের এই লোকটার থুতনির হাড় বদলে দেওয়ার প্রবল ইচ্ছাটা তার তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্বের তলে ঢাকা পরেই রইল। এখানে তার বাচ্চারা উপস্থিত। ওদের সামনে কোনোরূপ অপ্রীতিকর দৃশ্য তৈরি করতে চায় না সে। তবে নিজের এই প্রবল ইচ্ছাটাকে বিসর্জন দিলেও চলবে না। বোরাক এবার লোকটার হাতের কব্জি ছেড়ে ওর কলার আঁকড়ে ধরল, ভেতরের দিকে টেনে শক্ত কন্ঠে বলল “এই চল, সাইডে চল, কথা আছে।”

লোকটা হাত ছাড়া পেতেই এবার চট করে একটা ঘুষি বসিয়ে দিল বোরাকের মুখ বরাবর। আকষ্মিক আক্রমণেে বোরাকের মুখটা সাইটে অল্প বেঁকে গেল।
আঁতকে উঠল মৌটুসী, ঠোঁট দুটো আপনাআপনি অল্প ফাঁক হয়ে গেল, বুকটা প্রচন্ড গতীতে ঢিপঢিপ করছে। আসন্ন একটা খুব বড় বিপদ টের পাচ্ছে তার মন।
চড়ুই আর বীর ভয়ে মৌটুসীর কোমড় জড়িয়ে রেখেছিল। এই পর্যায়ে দুজনই আতঙ্কিত হয়ে সমস্বরে ‘পাপা’ বলে চিৎকার করে উঠল।
বীর রিতীমতো কান্না জুড়ে দিয়েছে। মৌটুসী দুই হাতে আগলে নিয়ে আছে দুজনকে।
বোরাক ধীরে ধীরে নিজের মাথাটা সোজা করল। ফাঁক হয়ে থাকা ঠোঁট দুটোর কর্ণার অল্প প্রসারিত হয়ে রহস্যময় তির্যক এক হাসিতে রূপ নিল, নিরেট দৃষ্টিতে তাকাল লোকটার দিলে। চোখের মনি স্থির রেখেই পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মৌটুসীকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর কন্ঠে নির্দেশ ছুড়ে দিল, “মিস মৌটুসী বাচ্চাদের নিয়ে ওইপাশে যান।”

“দরকার নেই। ছেড়ে দিন। চলে আসুন।” প্রবল আকুতি করে বলল মৌটুসী।
বোরাক এবার ঘাড়টা অল্প ঘুরিয়ে কন্ঠে বেশ কাঠিন্যতা ঢেলে বলল,”আপনাকে যেতে বলেছি!
“পাপা…… বীর কান্নাভেজা গলায় ডেকে উঠল।
মৌটুসী বীরকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে আবারো মিনতি করে বলল,” মি. শিকদার! দোহায় লাগে, ঝামেলায় জড়াবেন না। প্লিজ!”
মৌটুসীর এই অবাধ্যতায় এতক্ষন বজায় রাখা বোরাকের ধৈর্যের বাধঁ এবার ভাঙল যেন। মুহূর্তেই শ্বাস প্রশ্বাস ঘন হয়ে এল তার। হাত পেশিগুলো সয়ংক্রিয়ভাবে সংকুচিত হয়ে মুষ্টিবদ্ধ ধারণ করে নিল।
ইতিমধ্যেই পাশ থেকে কয়েকজন উৎসুক পর্যটক এসে ঘিরে ধরেছে জায়গাটা। তবে কেউ এগিয়ে যাবার সাহস করছে না।খালি খালি ঝামেলায় জরাতে কেই বা চায়? আক্রমণকারী লোকটার চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে এলাকার দাপটে চাঁদাবাজ। এদেশে এদের সাথে লাগতে যাওয়া মানে সাক্ষাৎ যমের সাথে লড়া।
বোরাকের নিস্তব্ধতা দেখে লোকটার ভেতরে কয়েকগুণ সাহস সঞ্চিত হলো যেন। আগুনে ঘি ঢালতে পুনরায় দম্ভভরে বোরাকের শক্ত বুকে সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে উঠল, ” এটা আমগো এলাকা, আমগো রাজ চলে এনো। আর তুই শালা কোত্থেকে কোন…..
​কথা শেষ হওয়ার আগেই “ধুম….”

এরপর গুড় মুর করো কাঠ জাতীয় কিছু ভেঙে পড়ার তীব্র আওয়াজ।
মৌটুসী আতঙ্কে বাচ্চাদের মাথা কোলে চেপে ধরে নিজেও চোখদুটো খিঁচে বন্ধ করে নিল।
কয়েক সেকেন্ড পর পরিবেশ পুনরায় নিস্তব্ধ হয়ে এলে ধীরে ধীরে চোখ খুলল সে।চোখের সামনো একেবারেই অপ্রত্যাশিত একটা দৃশ্য দেখে তার মায়াবী চোখের মনিদুটো মার্বেলের আকার ধারণ করে নিল। সামনের কাঠের টেবিলটা দুমড়ে মুচড়ে পরে আছে। আর তার ভাঙা অংশগুলোর উপর সেই লোকটা উপুর হয়ে শুয়ে আছে। চার হাত-পা নিথর, লোকটার কোনো নড়চড় নেই।
কৌতুহলী চড়ুই মৌটুসীর বাঁধন থেকে জোর করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল সেদিকে। দুষ্টু লোকটার নাজেহাল অবস্থা দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠল সে। “ইয়ে! আমার পাপা দুষ্টু লোককে পানিশ করেছে। ঠিক হয়েছে!”
অন্যদিকে, বীরের ভয়ের রেশ তখনও কাটেনি। সে মৌটুসীর কোমর জড়িয়ে পেটে মুখ গুঁজে নিথর হয়ে আছে; ভয়ের চোটে কান্নাকাটিটাও এক নিমেষে থেমে গেছে তার।

​ভাঙচুর আর হট্টগোলের আওয়াজ পেয়ে গেটের দিক থেকে দুইজন দারোয়ানসহ আরও কিছু স্টাফ ছুটে এল। সহকর্মীকে টেবিলের ওপর এভাবে পড়ে থাকতে দেখে তারা তড়িঘড়ি করে এগিয়ে গিয়ে তাকে ওঠানোর চেষ্টা করল। লোকটার ঠোঁট ও মুখের অনেক জায়গায় কেটে গেছে, নাক দিয়ে অঝোরে রক্ত পড়ছে। সহকর্মীর এমন বেগতিক অবস্থা দেখে প্রথম দিকে একজন স্টাফ দাপট দেখিয়ে বেশ দাপাদাপি করল। কিন্তু বোরাকের অগ্নিশর্মা চেহারা আর উপস্থিত জনতার বক্তব্যে চুপসে গেল তার দাপট। অজ্ঞান লোকটাতে ধরাধরি করে দ্রুত হাসপাতালে নিওয়া হলো।
পাশ থেকে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন নারী পর্যটক নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছেন, “একদম ঠিক কাজ করেছেন এই ভাই! লোকটা আসলেই এক নাম্বার লুচ্চা। কিছুক্ষণ আগে ওয়াশরুমে যাওয়ার সময় আমিও সেটা বুঝেছি, কেমন করে তাকিয়ে ছিল! ভাবতেই গা ঘিনঘিন করছে আমার।”
হাঠাৎ ভীড় ঠেলে নীতি এসে দাঁড়াল বোরাকের সামনে। অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল, “বোরাক কি হয়েছে এখানে? ঠিক আছো তুমি?”
“হুম, চিন্তা কিছু না, ঠিক আছি।”

এবার নীতির চোখ গেল বোরাকের ঠোঁটের দিকে। ডান কোণের দিকে অল্প রক্ত দেখা যাচ্ছে। নীতিনীতি উদ্বিগ্ন হয়ে হাত বাড়াল সেদিকে, “একি, তোমার ঠোঁট থেকে তো রক্ত পড়ছে!”
​মাঝপথেই বোরাক আলতো করে নীতির হাতটা ধরে থামিয়ে দিল। “ঠিক আছে নীতি, তেমন কিছু হয়নি।”
চড়ুই এগিয়ে এবার এল বোরাকের কাছে। “পাপা তুমি ঢিসুমঢিসুম করে দুষ্টু লোককে পানিশ করেছ?”
চড়ুইয়ের নিষ্পাপতায় বোরাকের চেহেরা থেকে সকল ক্রোধ কাঠিন্য মুহূর্তেই উবে গেল যেন, মুচকি হেঁসে চড়ুইকে কোলে তুলে নিয়ে সে,” হ্যাঁ, মামনি। ”
বোরাকের ঠোঁটের কোণে রক্ত চড়ুইয়ের নজরে আসতেই করতেই অস্থির হয়ে পরল সে। “পাপা তোমার ঠোঁটে কি হয়েছে? রক্ত কেন?”
“ওই একটু কেটে গেছে মা। হাত দেয় না।”

চড়ুই এবার মলিন মুখে বোরাকের গলা জড়িয়ে ধরল। কাঁধে মুখ ডুবিয়ে ঠোঁট উল্টে বলল,”দুষ্টু লোক! আমার পাপাকে ব্যথা দিয়েছে। আমার পাপাও মেরে দিয়েছে! ভালো করেছে।”
এদিকে চড়ুইয়ের মুখে পাপা ডাক আর তার প্রতি বোরাকের এই পিতৃস্বরুপ আচরন দেখে নীতির ভ্রূ কুঁচকে গেল। এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে খোঁজার চেষ্টা করল তার রহস্যময় চোখদুটো। দৃষ্টি ঘুরতে ঘুরতে এসে থামল কাঙ্ক্ষিত রমনীর উপর। বীরকে কোলে নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে মৌটুসী। তার সুন্দর চেহারায় একরাশ বিস্ময় আর অবিশ্বাসের আস্তরন। একটু আগে ঘটে যাওয়া সেই বিধ্বংসী ঘটনাটা যেন সে এখনো মানতে পারছে না।

মৌটুসীর উপর থেকে নীতির দৃষ্টি সরার আগেই বোরাক এগিয়ে গেল তাদের দিকে। চড়ুইকে আলতো করে নামিয়ে দিয়ে বীরকে কোলে তুলে নিল। কান্নায় বীরের বড় বড় চোখের পাতাগুলো ভিজে জট পাকিয়ে আছে। বোরাকের কোলে উঠতেই সে শান্ত হয়ে তার কাঁধে মাথা এলিয়ে দিল।
​বোরাক আদুরে স্বরে বলল, “আমার বাবা! ভয় পেয়েছে আমার সাহসী ছেলে?”
বীর উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে ‘হ্যাঁ’ বুঝাল।
“ভয় নেই বাবা। চলো, আমরা এখন অনেক মজা করব।”
মৌটুসী বোরাকের হাতের দিকে তাকিয়ে শক্ত একটা ঢোক গিলল। একটু আগেই যে হাতের কেবল এক পাঞ্চই গোটা একটা সুস্থ সবল মানুষকে পুরো অচেতন করে ফেলল, সেটাই এখন কত নমনীয় ভাবে ছেলেকে আগলে ধরে আছে। যাইহোক, মানুষটার প্রতি একটা গভীর শ্রদ্ধাবোধ বেরিয়ে আসছে ভেতর থেকে। তার প্রতি মৌটুসীর অনুগৃহীত ও কৃতজ্ঞতা বোধ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। ঋণি হয়ে উঠছে তার কাছে। এতগুলো ঋণ কিভাবে শোধ করবে সে?
“চলুন, ওই দিকটায় যাওয়া যাক। কিছুই তো দেখা হলো না এখনো পর্যন্ত।”
বোরাকের কথায় ভাবনা থেকে বেরিয়ে এল মৌটুসী। দ্রুত নিজের বহুমুখী জড়তা কাটিয়ে স্বাভাবিক হয়ে উঠার চেষ্টা করল। বোরাকের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “আপনার ঠোঁটের রক্তটা পরিষ্কার করে নিন প্লিজ।”

“ওহ! হ্যাঁ।” বোরাক প্যন্ট ও জ্যাকেটের পকেটগুলোতে হাত ঢুকিয়ে কিছু খুঁজার চেষ্টা চালাল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত জিনিস না পেয়ে বলল,”আপনার কাছে টিস্যু হবে?”
মৌটুসী এবার একটু ইতস্তত করেই বলল,
“টিস্যু তো নেই। তবে নরম কাপরের একটা রুমাল আছে।”
“আচ্ছা ওতেই চলবে।”
মৌটুসী এবার ব্যগ থেকে একটা সাদা ধবধবে রুমাল বের করে বোরাকের হাতে দিল। বোরাক তা ঠোঁটের কাছে নিয়ে যেতেই মিষ্টি-মেয়েলী একটা সুবাস এসে ধাক্কা দিল তার নাকে।এক মুহূর্তের জন্য সেই গন্ধ তার পুরুষ সত্তাকে সম্মোহিত করে তুলল যেন। বোরাক দ্রুত ঠোঁটের রক্ত টুকু মুছে নিয়ে রুমালটা মুখ থেকে নামিয়ে নিল। সাদা কাপড়ে রক্তের দাগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এটা আর ফেরত দেওয়াটা ঠিক হবে না। ভাবল সামনে কোনো ডাস্টবিন দেখলে তাতে ফেলে দিবে। আপাতত সে জ্যাকেটের পকেটেই ঢুকিয়ে রাখল রুমালটা।
হাঁটতে হাঁটতে চড়ুই বলল,”পাপা এখন আমরা ওই সানফ্লাওয়ার গার্ডেনে যাব?
‘না বাবা। আগে বিহারে যাব, ওটাই আসল। তারপর ফেরার সময় গার্ডেন দিয়ে আসব।”

বিহার চত্বরের ফাঁকা মাঠে দৌড়াদৌড়ি করছে বীর-চড়ুই। আর মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের তদারকি করছে বোরাক। এবার ঘাড় ঘুরিয়ে পাশের একটা প্রশস্ত ভাঙা দেয়ালের উপর পা ঝুলিয়ে বসে থাকা মৌটুসীর দিকে তাকাল সে। কেমন ভাবলেশহীন ভাবে শূন্যে চেয়ে আছে রমনী, যেন গভীর তবে তিক্ত কোন ভাবনায় ঢুবে আছে। চেহারাটা মলিন, অথচ আসার সময়ই কত প্রাণোচ্ছল আর উদ্দীপিত ছিল সে!
হঠাৎ একটু আগের অপ্রীতিকর ঘটনাটিই যে রমনীর এই মৌনতার কারন তা বুঝতে বাকী রইল না বোরাকের। সে এবার ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সেদিকে। মৌয়ের থেকে সৌজন্য মূলক দুরত্ব বজায় রেখে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। পায়ের উপর পা তুলে রেখে হাতদুটোও বুকে ভাজ করে রাখল। বোরাকের উপস্থিতি টের পেয়েও বিশেষ কোন ভাবান্তর হলো না মৌটুসীর মাঝে। নীরবতায় কেটে গেল কিছু সময়। অবশেষে বোরাক সময় নিয়ে বলল, “আপনারা মেয়েরা এমন কেন মিস? নিজেরা ভুক্তভোগী হবেন, আমার নীরব সাজাও বরন করবেন নিজেরাই!”

বোরাকের রহস্যজনক কথা শুনে মৌটুসী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল ওর দিকে। কিঞ্চিৎ ভ্রূ কুঁচকে বলল,”মানে?”
“কিছু না।”
“কিছু না মানে কি? আপনি কি আমাকেই মিন করে বলেছেন?”
“কথা শুনে তো বুদ্ধিমতীই মনে হচ্ছে। তাহলে চিন্তা-ভাবনা আর আচরণ বোকাদের মতো কেন? ”
সরাসরি তাকে বোকা বলাতে এবার সামান্য চেতল মৌটুসী। “এবার কিন্তু বেশি হচ্ছে মি. শিকদার!”
“উহু! মি. বোরাক। আমি, আরহাম বোরাক শিকদার।”
রাগের মাঝেও মৌটুসী এবারে একটু হাসল। আসলেই, তাদের তো এখনো অব্দি একে-অপরের সাথে ভালোভাবে পরিচিত হওয়াই হয়নি! সেও এবার স্বাভাবিক ভাবে নিজের পরিচয় বলল,
“আচ্ছা, মি. বোরাক! আর আমি…..”
“মৌটুসী মা পাখি, রাইট?”

মৌটুসী হেঁসে আলতো উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে সায় জানাল
“হুম, তবে শুধু মৌ ডাকলে খুশি হব।”
আর সানবার্ড ডাকলে? বাক্যটা নিশ্বব্দে মৌটুসীর দিকে ছুড়ে দিল বোরাক। তবে সরাসরি স্ব শব্দে জিজ্ঞেস করল না। বিষয়টা খারাপ দেখাবে, তাদের পরিচিতি এখনো ততদুর পৌছায়নি। বরং সে বলল,
“মৌটুসী নাম তো খুব সুন্দর, আপনার কি পছন্দ না?”
না।” সহসা উত্তর মৌটুসীর। এতেই বুঝা গেল এই নামের প্রতি তার চরম বিদ্বেষ।
তার এই অভিব্যক্তি দেখে বোরাক ভ্রূ কুঁচকে বলল “কেন? মৌটুসী পাখি দেখেন নি, নাকি?”
“দেখেছি।”
“তাহলে তো অপছন্দ হবার কথা নয়! ইট’স ওন ওফ দ্য মোস্ট বিউটিফুল বার্ড ওফ দ্য হোল ওয়ার্ল্ড, ইউ ন! ”
মৌটুসী উপর নিচ মাথা নাড়াল। “পাখিটা অতীব সুন্দর।কিন্তু আমি তো আর না! আমি মৌ-তেই ঠিক আছি।”
বোরাক এবার একটু নিচু স্বরে বিড়বিড় করল, “নিজের সম্পর্কে ভূল ভাবনা পুষে রেখেছেন ম্যাডাম! ইউ আর জাস্ট দ্য সেম, ভেরি ডেলিকেট।”

“হুম? কিছু বললেন?”
“না! কিছু না।
” আচ্ছা বাদ দিন। বললেন না আমাকে বোকা কেন মনে হলো আপনার?”
“কেননা আপনার অপরাধী সাজা পেয়েছে, অথচ আপনি খুশিতে উৎফুল্ল হবার বদলে মন খারাপ করে বসে আছেন! এটা কি বোকামি নয়?”
“কই? ঠিকই তো আছি আমি।”
“কিন্তু আমি উল্টোটা দেখছি। না-কি অপরাধীর শাস্তি যথার্থ হয়নি বলে এই মৌনতা? এমন হলে শাস্তিটা এবার আপনিই নির্ধারণ করুন!”
মৌটুসী একটা ফাঁকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,”নির্ধারণ করলেই বা কি? আমার দ্বারা তা কার্যকর হবার হয় ।এখানে আমি অক্ষম।”
বোরাক গভীর চোখে তাকিয়ে বলল,”ধরুন, আপনার এই দায় সক্ষম কেউ নিজের কাঁধে নিয়ে নিল!”
মৌটুসী কিছুক্ষণ চুপ থেকে দূরের দিগন্তে দৃষ্টি মেলে বলল, “আমি চাই, এই আনন্দ ভ্রমণে আসা দ্বিতীয় কোনো নারীকে যেন সেই কলুষিত দৃষ্টির প্রভাবে বিন্দুমাত্র অস্বস্তিতে পড়তে না হয়, তার ব্যবস্থা হোক। আর…….

“আর?”
“আর! আর কিছু না!”
অপ্রস্তুত হয়ে পরল মৌটুসী। সেই অসভ্য লোক যেখানে সেখানে মেশিন স্টার্ট দেওয়ার চিন্তা মাথাতেও আনতে না পারে তাই তার মেশিন অপসারণের এই তীব্র বাসনা সে বোরাকের নিকট মুখে কিভাবে প্রকাশ করবে?
মৌটুসীর এই অস্বস্তি লক্ষ করে বোরাক যা বুঝবার গেল। ঠোঁট টিপে হেঁসে বলল,
“আচ্ছা আচ্ছা। ভালো সিদ্ধান্ত। আপনি সত্যিই বেশ বুদ্ধিমতী।”
লজ্জা পেল মৌটুসী। ইশ! লোকটা কি ভাবছে? লজ্জায় মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল সে।
মৌটুসীর লজ্জিত ভাব বুঝতে পেরে তাকে অস্বস্তিতে ফেলতে চাইল না বোরাক। তাই সেও ঘাড় ঘুরিয়ে সুউচ্চ, বিশাল বিহারটার দিকে তাকাল। পরপরই হুট করে বলে উঠল সে, “বিহারের গায়ে কখনো উঠেছেন?”
​“না। এখানে এবারই প্রথম আসা আমার।”

​“কী বলছেন? তাহলে এখনো এখানে বসে কেন? উঠুন।” বলেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পরল বোরাক।
​মৌটুসী ভড়কে গিয়ে বলল, “কোথায়?”
​“চূড়ায় উঠবেন! পাহাড়পুর থেকে ঘুরে যাবেন অথচ চূড়ায় উঠবেন না? আশ্চর্য!”
মৌটুসী ইতস্তত হয়ে বলল, “না, উঁচুতে উঠতে ভয় পাই। স্কেলিং করতে পারি না।”
​“সমস্যা নেই, ওপাশে সিঁড়ির মতো জায়গা আছে। সবাই ওপাশ দিয়েই ওঠে।”
​“কিন্তু বাচ্চারা?”
“ওরাও যাবে আমাদের সাথে।”
“মানে কি? ওরা কিভাবে?”
“আরে, আপনি এত চাপ নিচ্ছেন কেন? আমি আছি, আসুন।”
তারপর হাত নেড়ে চিৎকার করে ডাকল, “আযান-স্পেরো, পাপা এদিকে এসো!”

বিহারের একপাশে প্রাচীন ইটের গাথুনি ভেঙে সিঁড়ির মতো কিছু অংশ তৈরি করা হয়েছে। এখান দিয়েই মূলত কিছু কিছু সাহসী দর্শনার্থী উপরে ওঠে। বোরাক আর মৌটুসী চড়ুই-বীরের ছোট হাতগুলো নিজেদের হাতের মুঠোয় নিয়ে সতর্কভাবে পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে।
বিশাল এক ধাপের নিচে এসে মৌটুসী কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ল। গাছ বেয়ে ওঠা বা উঁচু জায়গায় স্কেলিং করার মতো সাহস বা পারদর্শিতা—কোনোটাই তার নেই। বোরাক তার লম্বা পায়ের পদচারনে অনায়াসেই লাফ দিয়ে উপরে উঠে চড়ুই ও বীরকেও টেনে তুলে নিয়েছে, কিন্তু মৌটুসী একাই নিচে দাঁড়িয়ে। অবশেষে লম্বা একটা দম নিয়ে মনে সাহস সঞ্চয় করল সে। দুই হাত দিয়ে পরনের স্কার্টটা অল্প উঁচিয়ে ধরে ডান পা-টা মাটি থেকে সরিয়ে উপরের ধাপে রাখতে যাবে, ঠিক তখনই কানে এল সেই পরিচিত স্বর, “মিস মৌ! হোল্ড ইট প্লিজ।”

মৌটুসী চট করে মাথা উঁচিয়ে তাকাল। বোরাক তার দিকে অল্প ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে,ঠোঁটে একটুকরো অমায়িক হাসি। বলিষ্ঠ পুরুষালী হাতটা তার দিকেই বাড়িয়ে রাখা।মৌটুসীর বাড়িয়ে দেওয়া পা-টা ওভাবেই শূন্যে ঝুলে রইল। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেই হাতের দিকে। বোরাকের কবজিতে বাঁধা ঘড়িটির সিলভার ম্যাটাল চেইনের ওপর এক টুকরো রোদ প্রতিফলিত হয়ে তার চোখে এসে ঝিলিক দিচ্ছে।
​উপরে দাঁড়িয়ে থাকা চড়ুই চঞ্চল হয়ে ডেকে উঠল, “মাম্মা, পাপার হাত ধরে উঠে এসো!”
বীরও উৎসুক কণ্ঠে তাল মিলিয়ে বলল, “মাম্মা, এসো তালাতালি!”

মৌটুসী পর্ব ১৭

অথচ মৌটুসীর মস্তিষ্ক দ্বিধান্বিত হয়ে পরেছে । বোরাক শুধু মাত্র একজন পুরুষ মানুষ বলেই এই বিপদের সময় তার বাড়িয়ে দেওয়া সাহায্যের হাতটা আঁকড়ে ধরতে মৌটুসীর চরম আপত্তি, বিষয়টা এমন নয়। সে নিজের সতীত্বের প্রতি যথেষ্ট রক্ষণশীল, কিন্তু অযাচিত কোনো পুরুষ বিদ্বেষী মনোভাবও তার মাঝে নেই।
তবে এই মুহূর্তে তার ভেতরে জেগে ওঠা অজানা কিছু অনুভূতি তাকে অকারণে সংকুচিত করে তুলছে। সেসব সে চেয়েও এড়িয়ে যেতে পারছে না। বুকটা কেমন ধকধক করছে, মাথার সব চিন্তা যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
মৌটুসীকে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বোরাক তার চোখের সামনে আলতো করে হাত নেড়ে বলল, “হ্যালো! হাতটা ধরুন, জায়গাটা বেশ উঁচু। একা উঠতে পারবেন না।”

মৌটুসী পর্ব ১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here