মৌটুসী পর্ব ২
ঋতস্বিনী মাহবিশ
বড়োদের মতো করে বলল চড়ুই,
”আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি। তুমি হয়তো তোতলিয়ে কথা বলো। সমস্যা নেই, তুমি তোমার মতো করেই ডেকো।”
তন্মধ্যেই একজন টিচার এসে উপস্থিত হলেন ক্লাসে। কচিকাঁচার দলবল দাঁড়িয়ে সমস্বরে সালাম দিল। দু-একজন ছাড়া বাকি সবাই দাঁড়াল, তবে কেউ কেউ অপ্রস্তুত হয়ে বসেই রইল। চড়ুই উঠে দাঁড়ানোর সময় বীরকেও দাঁড়াতে ইশারা করল। টিচার হাসিমুখে সবাইকে বসতে বললেন। তারপর সুন্দর করে দু-একটি কথা বলে পরিচয় পর্বে চলে গেলেন তিনি। তাঁর কথা মতো একদিক থেকে একে একে শিক্ষার্থীরা তাদের নাম বলছে। এবার চড়ুই আর বীরের পালা এল। প্রথমে বীর দাঁড়িয়ে বলল,
”আমাল নাম, আযান বীল শিকদাল।”
বীরের প্রোনান্সিয়েশন শুনে টিচার একটু ইতস্তত হলেন। পাশ থেকে চড়ুই টুপ করে বলে উঠল, “মিস, ওর নাম আযান বীর শিকদার।”
তখনই পেছন থেকে মোটা গলার একটা ছেলে কটু হেসে উচ্চস্বরে বলে উঠল, “আরে, তোতলা রে, তোতলা!”
তার সাথে তাল মেলাতে পাশ থেকে কয়েকজন হি-হি করে হেসে উঠল। টিচার দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য গম্ভীর মুখে সেই ছেলেটির দিকে তাকালেন। তারপর মৃদু ধমকের সুরে বললেন, “বাচ্চারা, সাইলেন্ট! কেউ কোনো কথা বলবে না। কোনো হাসাহাসি হবে না। নাহলে মিস পানিশ করবে তোমাদের।”
তারপর বীরের দিকে তাকিয়ে নরম করে বললেন, “তুমি বসো বীর।”
বীর বাধ্য ছেলের মতো চুপচাপ বসে পড়ল। হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া ক্লাসের পরিস্থিতির কিছুই তার ছোট্ট মাথায় ঢুকল না। না তো তাকে নিয়ে করা কটূক্তি, না অন্য কিছু। মিসের ধমকে ক্লাসরুম আবার নিস্তব্ধ হয়ে এল। চড়ুই তখনও পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে মোটা ছেলেটার দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মিস তার মাথায় হাত রেখে বললেন, “এই যে মা, তোমার নাম বলো!”
এবার চড়ুই দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল, “আমার নাম চড়ুই।”
চড়ুইকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে মৌটুসী সোজা চলে এল সাহেব বাজারে। শহরের ব্যস্ত এই বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত একটি নামকরা সিঙ্গার কোম্পানির শোরুমেই তার বর্তমান কর্মস্থল।
মার্কেটের পার্কিং লটে স্কুটি পার্ক করে মৌটুসী দ্রুত পায়ে শোরুমে এসে সোজা পেছনের গোডাউনে ঢুকে পড়ল। ঘাড় থেকে ছোট সাইড ব্যাগটা নামিয়ে এক পাশে রাখল, তারপর ড্রয়ার খুলে কোম্পানির লোগোযুক্ত গাঢ় কমলা রঙের একটি টি-শার্ট বের করে নিল। টি-শার্টটা মাথা গলিয়ে গায়ের ওপর নামাতে না নামাতেই তার বয়সীই এক মেয়ে ভেতরে ঢুকল।
এই সময় মৌটুসীকে দেখে রুমু একটু অবাক হলো বোধহয়। হাতের ব্যাগটা রেখে বলল, “আরে মৌ! আজকে এত তাড়াতাড়ি যে!”
মৌটুসী টি-শার্টের ভাঁজ ঠিক করতে করতে বলল, “চড়ুইকে স্কুলে দিয়ে সোজা চলে এসেছি।”
”মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করালে?”
”হ্যাঁ।”
”কোন স্কুলে?”
”বোটানিক্যাল কিন্ডারগার্টেন এন্ড স্কুল।”
রুমু কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, “শুনেছি ওই স্কুলটাতে নাকি অনেক খরচ! প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের বেতন দিতে হয়। তার ওপর বছরে নানা ধরনের ফিয়ের তো শেষ নেই!”
রুমু যে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে তার আর্থিক বহনক্ষমতার ওপর প্রশ্ন তুলতে চাইছে তা বুঝতে বাকি রইল না মৌটুসীর। চড়ুইকে এই স্কুলে ভর্তি করানোর সপক্ষে এখন সে চাইলেই অনেক যুক্তিই দিতে পারবে। তবে এমুহূর্তে মৌটুসী কথা বাড়াতে চাইল না। মলিন হেসে কেবল বলল, “আসলে রুমু, স্কুলটা ভালো লেগেছে আমার কাছে। চড়ুইয়েরও খুব পছন্দ হয়েছে, ও খুব ইন্টারেস্টেড ছিল সেখানে পড়ার জন্য। হ্যাঁ, খরচাটা একটু বেশিই। দেখি, কুলাতে না পারলে সামনের বছর ট্রান্সফার করিয়ে আনব।”
”দেখো, যা ভালো মনে করো। তবে ভুলেও কখনো বিদ্যানিকেতনে ট্রান্সফার করিও না।” পরনের কামিজের ওপরই টি-শার্ট জড়াতে জড়াতে বলল রুমু।
মৌটুসী ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “কেন?”
”ওখানকার পরিবেশ একদম ভালো না। শুনেছি ওই স্কুলে নাকি একটু এদিক-সেদিক করলেই টিচাররা বাচ্চাদের গায়ে হাত তোলে। ছোট বাচ্চা, এর চেয়ে ভয়ের কিছু আছে? এই দিক দিয়ে আবার একটু খরচ বেশি হলেও বাচ্চাদের ভালো স্কুলেই পড়ানো উচিত।”
এমন সময় দরজার বাইরে থেকে ম্যানেজারের ডাক ভেসে এল। কাস্টমার এসেছে।
রুমু বিরক্ত হয়ে দাঁত চিপে বলল, “মানুষজনের খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই? এত সকাল সকাল কেউ মার্কেটে ফ্রিজ-টিভি কিনতে আসে? নিজেরা শান্তিতে থাকবে না, আমাদেরও একটু থাকতে দেবে না!”
রুমুর বিরক্তি দেখে নিঃশব্দে অল্প হাসল মৌটুসী। নিচু স্বরে বলল, “আস্তে বলো রুমু, খলিল ভাইয়ের কানে যদি একবার যায়, ভাববে আমরা এভাবেই তার কাস্টমার ভাগাই।”
দ্রুত হাতে নিজেদের ব্যাগ ও অন্যান্য জিনিসপত্র ড্রয়ারে গুছিয়ে রেখে গোডাউন থেকে শোরুমের সামনের দিকে বেরিয়ে এল তারা। এখন প্রোডাক্টের সত্য-মিথ্যে গুণগান গেয়ে কাস্টমারের মাথা খাওয়ার পালা।
প্রথম ক্লাস শেষে সাফওয়ান ফিডার নিয়ে এসে দরজা থেকে বীরকে দেখল। বীর আর চড়ুই একসাথে মাথা নুইয়ে মন দিয়ে খাতায় কিছু একটা করছে। বীরকে স্বাভাবিক হাস্যোজ্জ্বল দেখে স্বস্তি পেল সাফওয়ান। ওকে চড়ুইয়ের সাথে ব্যস্ত থাকতে দেখে ফিডার নিয়ে আর ভেতরে গেল না। দরজা থেকেই ফিরে গেল সে।
দ্বিতীয় পিরিয়ডের শুরুতে নীতি এল ক্লাসে। এসেই সবার উদ্দেশ্যে বলল, “এখানে আযান বীর শিকদার কে?”
নিজের নাম শুনে খাতা থেকে মুখ তুলে নীতির দিকে তাকাল বীর। কিন্তু কী করবে, তৎক্ষণাৎ বুঝে উঠতে পারল না। ওকে নিশ্চুপ বসে দেখে চড়ুই নিচু স্বরে বলল, “বীর, মিস তোমাকে ডাকছে তো! হাত ওঠাও।” বলেই চড়ুই নিজেই বীরের হাত উঠিয়ে দিল। বীরকে হাত ওঠাতে দেখে নীতি জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম বীর?”
বীর ওপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝাল। নীতি এবার পরনের শাড়ির কুঁচি ধরে বীরের দিকে এগিয়ে এল। ওর গাল টেনে দিয়ে বলল, “হাউ কিউট! লাইক ড্যাড, লাইক সন। বীর বাবা, তোমার কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলবে কেমন? আমি তোমার নীতি মিস, অবশ্য মিসের চেয়েও কিছু বেশি!”
কোনো এক কারণে মনের চাপা উচ্ছ্বাসের আতিশয্যে পাশে বসা চড়ুইকে একটিবারের জন্যও খেয়াল করল না নীতি। বীরকে আদর করে চলে গেল সে। নীতি বেরিয়ে যেতেই দ্বিতীয় পিরিয়ডের টিচার এসে প্রবেশ করলেন ক্লাসে। সালাম জানিয়ে বসে চড়ুই বীরের মুখের কাছে মুখ নিয়ে নিচু স্বরে বলল, “তুমি কি নীতি মিসকে আগে থেকেই চেনো বীর?”
বীর মাথা নেড়ে সহজভাবেই বলল, “না, চিনি না।”
”অহ! কিন্তু আমি চিনি।”
দ্বিতীয় পিরিয়ড চলাকালীন সাফওয়ান একটু প্রাকৃতিক কাজ সারতে ক্যাম্পাসের বাইরে গিয়েছিল। কাজ সেরে ফিরে দেখল, টিফিনের ঘণ্টা আরো আগেই বেজে গেছে। সে দ্রুত বীরের ক্লাসরুমের দিকে ছুটল। ভেতরে ঢুকতেই চোখ গেল, চড়ুইয়ের টিফিন বক্স থেকে নুডলস নিয়ে খাচ্ছে বীর। দেখে বোঝা যাচ্ছে বেশ মজা করেই খাচ্ছে। অথচ এই একই নুডলস বাড়িতে খাওয়াতে বাড়ির তিনজন পরিচারিকাকে হিমশিম খেতে হয়। সাফওয়ান এগিয়ে গিয়ে বীরের পাশে বসল। মৃদু হেসে বলল, “চাচ্চু, বন্ধুর খাবার খাচ্ছ?”
বীর হঠাৎ সাফওয়ানকে দেখে মৃদু চমকিত হলো। নুডলস মুখে নিয়েই অস্ফুট স্বরে বলল, “সাফান চাচ্চু? তুমি কোথায় ছিলে? আমি তোমাকে দেখতে পাইনি।”
সাফওয়ান কালো একটা হ্যান্ডব্যাগ থেকে টিফিন বক্স আর ফিডার বের করতে করতে বীরের কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু স্বরে বলল, “চাচ্চু একটু পিপি করতে গিয়েছিলাম।”
বীর কথাটা শুনেই ফিক করে হেসে দিল। সাফওয়ান স্যান্ডউইচ বের করে বলল, “নাও বীর, তোমার ফ্রেন্ডের সাথে মিলেমিশে খাও।”
বীর চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “চাচ্চু, ওল নাম চুলুই পাখি।”
সাফওয়ান একটা স্যান্ডউইচ চড়ুইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মিষ্টি হেসে বলল, “বীরের চড়ুই পাখি, নাও তুমিও খাও।”
চড়ুই স্যান্ডউইচটা নিল না। বরং হাত গুটিয়ে শক্ত হয়ে বসে রইল। মাম্মা বলেছে অপরিচিত কারো কাছ থেকে কিছু না নিতে। চড়ুইকে নিতে না দেখে বীর বলল, “চুলুই পাখি, নাও। আমাল সাফান চাচ্চু হয়।”
চড়ুই কিছুক্ষণ গভীর পর্যবেক্ষক দৃষ্টিতে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। সাফওয়ান মিষ্টি হেসে ওর দিকে স্যান্ডউইচ বাড়িয়ে রেখেছে। অবশেষে চড়ুই হাত বাড়িয়ে স্যান্ডউইচটা নিল। বীরের মুখে হাসি ফুটে উঠল। বলল, “চুলুই পাখি, খাও!”
মাথা হেলে খাওয়ার এক পর্যায়ে চড়ুই মাথা তুলে দেখল, বীর চুকচুক করে ফিডার থেকে দুধ খাচ্ছে। চড়ুই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “বীর, তুমি এখনো ফিডার খাও?”
বীর মুখ থেকে ফিডার সরিয়ে খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “এগুলো মিল্কি। মিল্কিতে প্লোটিন আছে।বেশি বেশি মিল্কি খেলে আমি অনেক বলো হবো!”
চড়ুই ঘাড় দুলিয়ে তার নিজের স্টাইলে বলল, “আমিও মিল্ক খাই, কিন্তু এভাবে না। আমি বড়দের মতো মগে ঢকঢক করে খাই।”
শোরুমে মোটামুটি ভিড়। এক মধ্য বয়স্ক দম্পতি ফ্রিজ কিনতে এসেছেন, পুরো শোরুম ঘুরে ঘুরে ফ্রিজ দেখছেন তারা। তাদের পেছন পেছন মৌটুসীও হাঁটছে। কোন ফ্রিজের কেমন কার্যকারিতা, ওয়ারেন্টি কতদিনের তা বুঝিয়ে বলছে সে। দম্পতিটিও নিজেদের মতো প্রশ্ন করছেন, মৌটুসীকে সেগুলোর উত্তর দিতে হচ্ছে।
তখনই রুমু পেছন থেকে এসে মৌটুসীর হাত ধরে একটু সাইডে টেনে নিল। নিচু স্বরে বলল, “মৌ, তুমি এখনো এখানে? চড়ুইকে না নিতে যাবে বলেছিলে?”
”কাস্টমার আছে তো, খলিল ভাই বলল পরে যেতে।”
”আহা! তুমি আবার খলিল ভাইয়ের পারমিশন নিতে গিয়েছ? তাহলে জেনে রাখো, আজ আর মেয়েকে পিক করা হবে না তোমার। কাস্টমারের যাওয়া-আসা লেগেই থাকবে এখন।”
”তাহলে কী করব এখন? বারোটা তো বাজতে চলল!”
”যেতে চাইলে এখনই চলে যাও। আর বলে যাওয়ার দরকার নেই।”
”কী বলছ? পরে যদি কিছু বলে?”
”কী আর বলবে? দেরি করো না, তাড়াতাড়ি চলে আসবে।”
”আচ্ছা, তুমি তাহলে একটু সামলে নিও।”
”আচ্ছা যাও। দেরি করবে না কিন্তু।”
মৌটুসী গোডাউনে গিয়ে দ্রুত কম্পানির টি-শার্টটা খুলে গলায় জর্জেট ওড়নাটা জড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল।
বেলা তখন প্রায় বারোটার কোলে। কুয়াশার পর্দা চিরে আকাশে হালকা রোদের ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। স্কুলের চারপাশ জুড়ে ছুটির ঘণ্টার আগমুহূর্তের চিরচেনা কর্মচাঞ্চল্য। প্রধান ফটকের সামনে অভিভাবকদের ভিড় উপচে পড়ছে। রিকশা, প্রাইভেট কার আর বাইকের জটলায় সরগরম হয়ে উঠেছে সামনের পুরো রাস্তাটা।
দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছে স্কুল-অভিমুখী বোরাক শিকদার। একই সাথে জরুরি এক কলে ব্যস্ত সে, বাঁ কানে ব্লুটুথ হেডফোন লাগিয়ে অনর্গল কথা বলে চলেছে ফোনের অপর পাশের ব্যক্তিটির সাথে। এদিকে গাড়ির স্পিডও কিছুটা হাই, হাতে সময় একেবারেই কম, বীরের স্কুল ছুটি হলো বলে! কেবল মাত্র ছেলেকে সারপ্রাইজ করতে, ছেলের মুখের এক চিলতে হাসি দেখতে বহুত ইম্পর্টেন্ট কাজ ছেড়ে-ছুড়ে ছুটে আসছে সে। কিন্তু তার কাজ যেন থামবার নয় কিছুতেই। ড্রাইভারকে আসতে মানা করেও কী যে এক মসিবতে পড়েছে সে!
স্কুলের সামনে লোকসমাগম দেখে একপ্রকার তাড়াহুড়ো করে গাড়িটা রাস্তার একপাশে সাইড করতে গেল বোরাক। ফোনের দিকে মনোযোগ দিতে গিয়ে এদিকে খানিক বেখেয়ালি হয়ে পড়ল সে। লুকিং গ্লাসে পেছনের অবস্থা না দেখেই রিভার্স গিয়ারে গাড়িটা সামান্য ব্যাক করল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই কিছু একটা খটকা লাগল তার। মুহূর্ত খানেক একইভাবেই বসে থেকে কিছু আন্দাজ করার চেষ্টা করল।
“ওহ শিট!”
ইয়ারবাডটা খুলে সিটে ছুড়ে দিয়ে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে পেছনের দিকে ছুটে গেল বোরাক।
যা ভেবেছিল তাই!
স্কুটিসহ একটা মেয়ে হেলে রাস্তায় পড়ে আছে।
বোরাক দ্রুত মেয়েটির দিকে সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে অপরাধী তবে বিনয়ী কণ্ঠে বলল, “আ’ম সো সরি! আপনি ঠিক আছেন?”
এদিকে মৌটুসী চোখমুখ শক্ত করে বোরাকের দিকে তাকিয়ে আছে। নড়ছেও না, চড়ছেও না, উঠছেও না। চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে তার, যেন তাকিয়েই ভস্ম করে দেবে আস্ত বোরাক শিকদারকে। ইতিমধ্যেই আশেপাশের দু-একজন পথচারী এসে স্বভাবমতোই তাদের ঘিরে ধরেছে। মৌটুসীকে অনড় রুদ্রমূর্তি হয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকাল বোরাক। ওর পলকহীন চোখের সামনে হাত নাড়িয়ে বলল, “হ্যালো মিস! আপনি কি খুব বেশি ব্যথা পেয়েছেন? হসপিটাল…”
কথাটা শেষ করতে পারল না বোরাক। তার আগেই মৌটুসী এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল। খুব একটা জোরে চোট লাগেনি,ডান হাঁটুটা সামান্য ছিলে গেছে হয়তো, টনটন করছে জায়গাটা, জ্বলছে খুব। তবে এতটুকুতেই কাহিল হওয়ার পাত্রী সে নয়। দাঁড়িয়েই দাঁতে দাঁত চেপে গজগজ করতে করতে পরনের স্কার্ট ঝাড়তে শুরু করল মৌটুসী।
বোরাক অবাক হয়ে ওর কাণ্ড দেখছে। একটু আগেই যে মেয়ের এমন রণমূর্তির অভিব্যক্তি দেখাচ্ছিল —যে এখনই বুঝি চেঁচিয়ে চারপাশে দশটা মানুষ জড়ো করে তাকে গণধোলাই দেওয়ার ব্যবস্থা করবে—সেই মেয়েই এখন এত শান্ত! ঝাড়ি দেওয়া কিংবা মানুষ ডাকা তো দূরের কথা, মুখ দিয়ে রা কাড়ছে না একটাও! বাক্প্রতিবন্ধী না-কি?
অত কিছু না ভেবে বোরাক স্কুটিটা তোলার জন্য পিঠ কুঁজে হাত বাড়ালে মৌটুসী তার আগেই এক ঝটকায় নিজেই সেটা তুলে নিল। এরপর কোনো দিকে না তাকিয়ে, গজগজ করতে করতে বাইকটা ঠেলে হেঁটে হেঁটে রাস্তার অন্য পাশে চলে যেতে লাগল সে।
বোরাক এখন নিশ্চিত, মেয়েটি সত্যিই হয়তো বাক্প্রতিবন্ধী। পাশের কৌতূহলী পথচারীদের মাথাতেও এই একই ভাবনা এল। এমন একটা দুর্ঘটনার পরেও মৌটুসীকে এমন নির্লিপ্তভাবে চলে যেতে দেখে তারাও ভেবে বসল, হয়তো কথাই বলতে পারে না সে। আর তাই অযথা নিজের এই সীমাবদ্ধতা প্রকাশে না এনে, কোনো ঝামেলা না পাকিয়েই সেখান থেকে চুপচাপ চলে গেল।
একজন তো আক্ষেপ করে বলেই বসল, “আহারে! মাইয়াটা দেখতে-শুনতে তো ভালোই! কিন্তু কথা কইতে পারে না? বোবা মানুষজন বুঝি একটু বেশিই রূপ নিয়ে জন্মায়!”
পাশের জন বলল,”মেয়েটার আচার-ব্যবহারও ভালো, নরম-সরম। হুর-হাঙ্গামা না করেই কি সুন্দর চলে গেল। নাহলে আজ-কাল তো রাস্তায় হাঁটার সময় সামান্য হাতে হাত টাচ লাগলেও, সেই তিলকে তাল বানিয়ে আশেপাশের দশজন মানুষকে ডেকে জড়ো করানো হয়।”
তারপর বোরাকের দিকে তাকিয়ে উপদেশ ছুড়লেন, “ভাইজান, মেয়েটা ভালো বলে এবারের মতো পার পেয়ে গেলেন। এখন থেকে গাড়ি একটু দেখে-শুনে চালাবেন। দামী গাড়ি আছে বলে চোখ-কান বন্ধ করে খালি উইড়েন না।”
বোরাক লোকটার কথার দিকেঅ খুব একটা মন দিল না, তার দৃষ্টি তখন মৌটুসীর দিকে। মেয়েটা ডান পা হালকা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে, কদমে মৃদু ব্যথার ছাপ স্পষ্ট। বোরাক কয়েক পা এগিয়ে গিয়েও থেমে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ির দিকে ফিরে এল সে।
এদিকে মৌটুসী অন্য এক পাশে স্কুটি নিয়ে খাড়া করে রেখে নিজেও তার পাশে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল। ডান হাঁটুটা জ্বলছে খুব। রাগে তার থেকেও বেশি জ্বলছে ভেতরটা। বরাবরই সে একটু বেশিই রগচটা স্বভাবের। রাগটাও চরম লেভেলের। রাগের মাথায় তার জিহ্বার নির্দিষ্ট কোনো স্টেশন থাকে না, একেবারে লাগামছাড়া হয়ে যায়। কী থেকে কী বলে দেয় তার ঠিকঠিকানা নেই। এমন এমন কথা বেরিয়ে আসে যা মাথায় আনলেও লজ্জা লাগে।
তবে সে ম্যাচিউরড একটা মেয়ে, পরিস্থিতি বুঝে চলতে হয় তাকে। সবসময় নিজেকে প্রাধান্য দিয়ে ছেলেমানুষি পরিচয় দেওয়ার মানে হয় না। এটা তার মেয়ের স্কুল। এখানে সিন ক্রিয়েট করলে তার প্রভাব বিরূপ হতে পারে। স্কুলের পরিবেশ, অন্য অভিভাবকদের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে সে কোনোভাবেই কোনো হাসি-বিদ্রূপের খোরাক হতে চায় না। তাই অনেক কষ্টেই নিজেকে সংযত রেখেছে মৌটুসী। সমস্যা থেকে মুখ ঘুরিয়ে দ্রুত পালিয়ে আসাটাও একপ্রকার বুদ্ধিমানের কাজ।
মৌটুসী লম্বা লম্বা কয়েকটা শ্বাস টেনে নিয়ে নিজেকে একটু শান্ত করার চেষ্টা করল। তারপর মাথা ঘুরিয়ে স্কুটিটার দিকে তাকাল একবার। সামনের ডান দিকের প্লাস্টিকের প্যানেলে বেশ বড় একটা জায়গায় স্ক্র্যাচ পড়ে গেছে। দাগটা দেখেই চাপা ক্ষোভটা আবারো মাথা চাড়া দিয়ে উঠল যেন। রাগে ফোসফোস শব্দ করে শ্বাস পড়ছে। ফর্সা নাকের লাল হওয়া পাটাতন নিশ্বাসের সাথে ফুলে-ফেঁপে উঠছে তার। স্কুলের পেছনের জায়গাটা একটু নিরিবিলি। মানুষজনের সমাগম নেই এই দিকটায়। সেই সুযোগেই মনের সবটুকু চাপা রাগ-ক্ষোভ ঝেড়ে বের করে দিতে লাগল মৌটুসী। দাঁতে দাঁত চেপে নিজের মতো বিড়বিড় করে চলল সে,
”খবিশ ব্যাটা কোথাকার! চোখ বাসায় খুলে রেখে রাস্তায় এসে দামী গাড়ির ভাব মারায় শালা! সাত পুরুষের ভাগ্যে একটা গাড়ি কিনতে পারছে না, সেটা মানুষের পিছনে লাগিয়ে দেখাতে হবে, দেখো! আমি বড়লোক! এতই যদি বড়লোকি দেখানোর শখ থাকে, তো রকেট কিনে আকাশে ওড়বি তুই! রাস্তায় ক্যান? ইস! আমার স্কুটি…! দেশে আর কোনো গাড়ি ছিল না? আমার বাইকেই এসে লাগিয়ে দিতে হবে? মানুষ নামের জানোয়ার কোথাকার! আর একবার দেখা হোক খবিশ লোক, তোর পাছায় আগুন লাগিয়ে তোকে যদি মহাকাশ ভ্রমণে না পাঠিয়েছি আমি, তবে আমার নামও মৌ নয়।”
মৌটুসী পর্ব ১
পরক্ষণেই অসহায় মলিন মুখে স্ক্র্যাচের জায়গাটায় তার নরম হাত বুলিয়ে দিল কয়েকবার। স্কুটিটা তার খুব শখের, তার থেকেও বেশি প্রয়োজনের। অনেক কষ্টে জমানো টাকা দিয়ে কেনা। এখন এই স্ক্র্যাচ রিমুভ করতে কত টাকা যায় কে জানে? একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল মৌটুসীর ভেতর থেকে।
এমন সময় ছুটির বেল বেজে উঠল। মৌটুসী নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটা দিল গেটের দিকে।
