Home মৌটুসী মৌটুসী পর্ব ২৭

মৌটুসী পর্ব ২৭

মৌটুসী পর্ব ২৭
ঋতস্বিনী মাহবিশ

বাড়ির দরজা পেরোতেই সামনের দৃশ্য দেখে মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে গেল মৌটুসী। উঠানের মাঝখানে পা মেলে বসে আছে ছোট্ট চড়ুই। তার পাশে হাঁসছানা দুটো দাপাদাপি করছে; ছানাগুলো আগের থেকে অনেকটা বড় হয়েছে, সেই সাথে চড়ুইয়ের সাথে তাদের খাতিরও জমেছে বেশ। উঠানের ছোট্ট খানাখন্দটাও খুঁড়ে আরেকটু বড় করা হয়েছে, আর সেখান থেকে পানি তুলে পুরো জায়গাটা কাদা করে একাকার করে ফেলেছে চড়ুই। তিনজনের কাদার মহোৎসব চলছে পুরোদমে! চড়ুইয়ের পরনের ফ্রকটা থেকে শুরু করে হাত-পা—সবই কাদা-পানিতে মাখামাখি।
​মৌটুসী দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে চড়ুইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কোমরে হাত দিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল, “চড়ুই পাখি! এসব কী হচ্ছে এখানে?”

​খেলায় দারুণ নিবিষ্ট ছিল চড়ুই। মায়ের গলার আওয়াজ পেয়ে মাথা তুলে তাকাল সে। তারপর অবুঝ সেই নিষ্পাপ মুখে এক গাল হেসে বলল, “মাম্মা, দেখো! আমার হাস বন্ধুদের আমি গোসল করিয়ে দিয়েছি।”
​এই তো! এই ইনোসেন্টনেসের কাছেই মৌ বরাবরই হেরে যায়, আর তার চড়ুই পাখি বিশাল বিশাল দোষ করেও জিতে যায়। এই যে এখন সে রেগেমেগে তেড়ে এসেছিল মেয়েকে ইচ্ছে মতো ঝাড়বে বলে, কিন্তু চড়ুইয়ের নিষ্পাপ চেহারা দেখে মুহূর্তেই ওর প্রতি ক্রোধটা ফিকে হয়ে গল। এবার নিজেকে অসহায় মনে হতে লাগল মৌয়ের। না জানি কতক্ষণ ধরে এভাবে পানি আর কাদার সাথে ল্যাটকাল্যাটকি করছে মেয়েটা! শরীর আর জামার যা দশা, তাতে এখন গোসল দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু এই শীত-শীত বিকেলে কাদা মাখা শরীরে গোসল দিলে কি আর জান থাকবে? নির্ঘাত সন্ধ্যার মধ্যেই জ্বর-ঠান্ডা দই মিষ্টির হাড়ি সমেত তার দরজায় এসে কড়া নাড়বে।
​মৌ কপট রাগ দেখিয়ে বলল, “হাঁসের ছানাদের গোসল করতে গিয়ে নিজের কী অবস্থা করেছ, সেই খেয়াল আছে? তোমার নানি-মনি কোথায়?”

​চড়ুই এবার দুই হাত ছড়িয়ে নিজের শরীরের দিকে তাকাল। জামার এমন বেহাল দশা দেখে কিছুটা ভয়ে ঠোঁট উল্টাল সে। খেলার তালে নিজের দিকে দেখার ফুরসতই তো পায়নি! এবার মাথা উঁচু করে পিটপিট চোখে মৌয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওওও একটু কাদা লেগে গেছে, মাম্মা! গোসল দিতে হবে, তাহলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।”
​বলেই বড় ভদ্র মেয়ের মতো হাঁসের ছানা দুটোকে ধরে খাঁচায় পুরে দিল সে। ছানা দুটো যেন চড়ুইয়ের এই আচরণে বেজায় মন খারাপ করল, কিচিরমিচির করে প্রতিবাদ জানাল কয়েকবার। মৌটুসী চুপচাপ দাঁড়িয়ে সরু চোখে মেয়ের কাণ্ডকারখানা দেখছে।
​ছড়িয়ে থাকা খেলনাগুলোও নির্ধারিত জায়গায় গুছিয়ে রেখে এল চড়ুই। এরপর মৌয়ের হাত ধরে টেনে বলল, “মাম্মা, চলো, গোসল দিয়ে পরিষ্কার হতে হবে।”

​তার এই মেয়েটাকে নিয়ে মৌটুসীর অবাক হওয়ার শেষ নেই। এই বয়সের বাচ্চারা সাধারণত ঠাণ্ডা পানিতে ভয় পায়, শীতে গোসলের নাম শুনলেই দৌড়ে পালায়, মেরে ধরে গোসল করাতে হয়। অথচ এই মেয়েকে দেখো, শীত-গ্রীষ্ম, সকাল-সন্ধ্যা কোনকিছুর বালাই নেই, পানি আর গোসলের কথা শুনলেই সে মহাখুশি। মৌটুসী আর সময় নষ্ট করল না। চুলায় গরম পানি বসিয়ে দিয়ে পরনের কাপড় চেঞ্জ করে নিল। লালবানু বেগম বাড়িতে ছিলেন না, বিশেষ এক কাজে পাশের বাড়িতে গিয়েছিলেন কিছুক্ষণের জন্য। সেখান থেকে ফিরে এসে মৌকে এই সময় বাড়িতে দেখে অবাক হলেন খানেক। জিজ্ঞেস করলেন, “মৌ তুই এহন? ছুটি হইয়া গেল?”
​মৌটুসী যাবতীয় সকল ঘটনা আপাতত আড়ালে রেখেই বলল, “হুম, ছুটি। কিন্তু তুমি চড়ুইকে একা রেখে কোথায় গিয়েছিলে আম্মা?”
​”তোর রাসেদা চাচিগো বাড়ি। পাখি তো খেলতাছিল। জিগাইলাম, কইলো যাইবা না।”
​”কিসের খেলা? কাদা পানি মেখে কি অবস্থা করেছে দেখো একবার। এখন আবার গোসল না করালে হবেই না।”

​বিকেলের মরা রোদ জানলা দিয়ে ড্রয়িং রুমে এসে পড়েছে। বাড়ির ভেতরটা বরাবরের মতোই বেশ শান্ত, শুধু ড্রয়িং রুমের টিভির ভলিয়মটা একটু বেশি। বাড়ির দুই পরিচারিকা সুমনা আর রিয়া বেশ আয়েশ করে সোফার উপর হাত পা তুলে বসেছে। চোখেমুখে নিদারুণ তৃপ্তি আর উত্তেজনার ছাপ, তার কারণ এখন তাদের প্রিয় অনুষ্ঠান ‘দিদি নাম্বার ওয়ান’ চলছে সামনের বিশাল পর্দায়। তবে রাবেয়াটা আবার বসেছে মেঝের উপরই, মালিকের এত দামী সোফার উপর বসতে কোথাও বাঁধে তার। কার্পেট বিছানো মেঝেতে বসে সোফার পায়ের দিকটায় হেলান দিয়ে সেও তাকিয়ে আছে টিভির পর্দায়।
​এদিকে ছোট্ট পায়ে দুতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে বীর। হাতে তার বিশাল একটা প্লাস্টিকের স্পাইডার টয়। সেটাকে এক হাতে জড়িয়ে অন্য হাতে সিঁড়ির রেলিং ধরে, অতি সাবধানে একপা একপা করে সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে নেমে আসছে সে। নেমে এবার গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল সোফার দিকে।

​অথচ ড্রয়িং রুমে উপস্থিত সবাই টিভির টান টান উত্তেজনা পর্বে এতই ব্যস্ত যে ছোট্ট বীরের অস্তিত্ব কেউ লক্ষ্যই করল না। বীর সরাসরি রাবেয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “লাবেয়া খালামনি আমাল সাথে খেলবে?”
​সোফা আর টিভির মাঝখানে দাঁড়িয়েছে বীর। ওর এই অবস্থানের জন্য পিছন থেকে রিয়ার টিভি দেখায় অসুবিধে সৃষ্টি হলো। সে বিরক্ত হয়ে তড়িঘড়ি করে বলে উঠল, “ওরে বীর আব্বা, একটু সইরা খাড়াও আব্বা! তোমার মাথার লাগি টিভিটা দেখতে পারতাছি না। একটুখানি সইরা খাড়াও!”
​হঠাৎ এমন চিৎকারে বীর কিছুটা হকচকিয়ে গেল। আমতা আমতা করে তাড়াতাড়ি এক পা ডানে সরে দাঁড়াল সে। রাবেয়া এবার ওর বাহুতে হাত রেখে বলল, “আমি আপনার লগে খেলতাম না বীর আব্বাজান। আপনে দুপুরে একটুও ভাত খান নাই, সব নষ্ট কইরা রাইখা দিছেন।”
​এই কথা শুনে বীরের ছোট্ট মুখটা অভিমানে ভরে গেল। ঠোঁট ফুলিয়ে আবদারের স্বরে বলল, “ভাত আবাল পলে খাব, এখন একটু খেলো।”
​”না, আগে ভাত খাইতে হইব, হের পরে খেলমু। একটু ভাত খাইয়া লন আগে। দিমু?”
​”অহ! একটু আস্তে কথা ক ছেমড়ি। টিভির কথাডি হুনতে দে ভালোমতোন।” পেছনের সুমনা ধমকে উঠল রাবেয়াকে।
​প্রতিউত্তরে রাবেয়া কিছুই বলল না। বরং বীরের দিকে মনোযোগ দিয়ে বলল, “বীর আব্বা এহন এক মুঠো ভাত খাইয়া দিই?”

​বীর ভাত খাওয়ার নির্দেশ শুনতেই মুখটা আবার ছোট করে ফেলল। ভাত খেতে তার মোটেও ভালো লাগে না! তবুও কেবল মাত্র খেলার লোভে জিজ্ঞেস করল, “ভাত খেলে এখনই খেলবে?”
​রাবেয়া এবার মুচকি হেসে আলতো করে বীরের গাল ছুঁয়ে বলল, “হ, ভাত খাইলে এহনই খেলমু।”
​বীর এবার বড় কোনো এক চুক্তিতে সই করে ফেলার মতো করে ওপর-নিচ মাথা নেড়ে বলল, “তাহলে ভাত খাব।”
​রাবেয়া উঠে বীরকে নিয়ে ডাইনিং স্পেসে চলে গেল। তখনই দুতলার করিডোর থেকে আরোয়া চেঁচিয়ে বলে উঠল, “সুমনা আপা, এক কাপ কফি দিয়ে যাও আমার রুমে।”
​আরোয়ার নির্দেশ কানে যেতেই সুমনার তৃপ্ত উজ্জ্বল মুখটা একরাশ বিরক্তিতে কুঁচকে উঠল। দাঁত খিঁচিয়ে বিড়বিড় করে উঠল, “জনমের কফি খাওনের আর সময় পাইল না বেডি! দুই পয়সার কাম নাই হারাদিন, বইয়া বইয়া খালি হুকুম করবার হইলে পারে।”
​সুমনার এমন নীরব রাগ প্রকাশ দেখে পাশ থেকে ঠোঁটে হাত চেপে হেসে উঠল রিয়া। খিলখিলিয়ে বলল, “যা যা, ম্যাডাম সাহেবের কফি খাইতে মন চাইছে, তাড়াতাড়ি নিয়া যা।”
​”মনডা চায় খাবারের মধ্যে কিছু একটা মিলাইয়া সারাজীবনের লাগি মুখটা বন্ধ কইরা দিতাম! পরের বার যেন আর হুকুম করবার না পায়!”—বলতে বলতে উঠে গজগজ করে কিচেনের দিকে হাঁটা দিল সুমনা।
​পেছন থেকে রিয়া চোখ বড় বড় করে বলল, “দেখিস সুমনা, রাগের মাথায় আবার সত্যি সত্যি বিষ-টিষ কিছু মাখাস না! জেলে যাওনের ইচ্ছা নাই কোনো। জেলের থেক্যানে ঢের সুখ আছে এনো।”

​বিকেলের মরা রোদটা বারান্দার দোলনায় এসে আছড়ে পড়েছে। হাতে এক মগ ধোঁয়া ওঠা কফি নিয়ে আরোয়া দোলনায় শরীর এলিয়ে দিল। বিকেলের এই নিস্তব্ধ, মায়াবী পরিবেশটা প্রশান্তি ছড়িয়ে দিতে লাগল ওর মনে। কিন্তু সেই প্রশান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। নিচের বাগানের দিকে চোখ যেতেই সোজা হয়ে বসল সে।
​বাগানের দিক থেকে একটা ছোট্ট চারা গাছ হাতে নিয়ে গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সাফওয়ান। আরোয়া তৎক্ষণাৎ দোলনা থেকে উঠে রেলিংয়ের কাছে গিয়ে গলা উঁচিয়ে ডাক ছাড়ল, “সাফওয়ান!”
​আরওয়ার ডাক শুনে সাফওয়ানের হাঁটা থামল। ডাক অনুসরণ করে ঘাড় ঘুরিয়ে দোতলার বারান্দার দিকে তাকাল সে। আরোয়া হাত উঁচিয়ে ইশারা করে নির্দেশ দিল, “ওখানেই দাঁড়াও। আমি আসছি।”
​বলেই আরোয়া কফির মগটা টেবিলের ওপর রেখে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে এল। ড্রয়িংরুম পেরিয়ে সদর দরজা দিয়ে বাগানের পথে পা বাড়াল সে। সাফওয়ানের সামনে গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়াল, বুকে হাত গুঁজে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করতে লাগল আরোয়া।
​আরোয়াকে নীরব দেখে সাফওয়ান মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কিছু বলবে?”

​”হুম। আমার জীবনে হস্তক্ষেপ করার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে, সাফওয়ান?” আরওয়ার কণ্ঠ শান্ত অথচ তীব্র ধারালো এক আবেশ মাখা।
​”যে অধিকার আমার কখনোই ছিল না, তা কে দিল—সে প্রশ্ন আসছে কেন?”
​সাফওয়ানের এমন শান্ত নির্বিকার ভঙ্গির উত্তরে আরওয়ার ভেতরে আগুন জ্বলে উঠল যেন। খেপাটে স্বরে বলে উঠল সে, “তাহলে তুমি কোন দুঃসাহসে আমার বিষয়ে নাক গলাচ্ছ? আমার নিষেধ অমান্য করে সেদিন ক্লাবে যাওয়ার কথাটা আশা আপুকে বলেছ, তবুও আমি কিছু বলিনি। কিন্তু সেই সুযোগে তুমি ভাইয়াকেও সব জানিয়ে দিয়েছ! আমার কথা অমান্য করার সাহস তুমি কোথায় পাও সাফওয়ান? নিজের অবস্থান ভুলে যাচ্ছ?”
সাফওয়ান বরাবারের মতোই শান্ত স্বরে বলল,
​”না, আমরা কখনোই নিজেদের অবস্থান ভুলি না। আর হ্যাঁ, আমি আশা আপুকে এ ব্যাপারে জানালেও, বোরাক ভাইকে আমি কিছুই বলিনি।”
​”আমার কাছে নির্দোষ সাজার চেষ্টা করো না, সাফওয়ান! তুমি না বললে ভাইয়া জানল কী করে? আশা আপু তো কখনো তাকে কিছু বলবে না। তুমিই বলেছ!”

​নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার মতো কোনো আগ্রহই যেন সাফওয়ানের নেই। নিজের হয়ে কোনো সাফাই না গেয়েই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সে।
​আরোয়া নিজেই হুশিয়ারি স্বরে বলল, “সাফওয়ান! আমার লাইফে ইন্টারফেয়ার করার চেষ্টা করো না। নাক গলাতে যেওনা আমার কোনো বিষয়ে! বুঝা গেল?”
​সাফওয়ান শেষবারের মতো বলল, “আমি তোমার জীবনে প্রবেশ করি নি আরোয়া। বরং তোমার জীবনের কিছু জিনিস নিজ থেকেই আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। আমি কেবল একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবেই আপুর কাছে তা ব্যক্ত করেছি।”
​আরোয়া সরাসরি সাফওয়ানের চোখের দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে শীতল গলায় বলল, “সেটাও করবে না। আমার কোনো বিষয় যদি তোমার সামনে এসেও পড়ে, তখন তুমি কানা-বোবা হয়ে থাকবে—ব্যস! এইটুকুই তোমার কাজ।”

​বর্তমানের এই কলুষিত সমাজের বেশির ভাগ পুরুষই যেখানে একটু সুযোগ পেলেই হাত বাড়িয়ে মেয়েদের শরীরের স্পর্শকাতর ত্বক ছুঁয়ে দেওয়ার চেষ্টায় উতালা হয়ে ওঠে, সেখানে কয়জনই বা পারে সেই হাতটাই বাড়িয়ে একজন নারীর মাথায় স্নেহ আর ভরসার পরশ রাখতে? আর যারা পারে, তাদেরই এককথায় বলে মহাপুরুষ। এই কিছু সংখ্যক মহাপুরুষদের উপস্থিতিতেই তো পৃথিবীটা আজও বাসযোগ্য। তাদের জন্যই এখনো নারীত্বের সম্মান-মর্যাদা নামক শব্দগুলো বেঁচে আছে।
​বোরাক শিকদার—তাদের দ্বিতীয় সাক্ষাতের পর থেকেই মানুষটার প্রতি মৌটুসীর মনে সম্মানের কমতি ছিল না। তবে দিনকে দিন এই সম্মান উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পাচ্ছে বৈকি। মাত্র এক মাসের পরিচয়ে একটা মানুষ অপর পক্ষের মানুষটার জীবনে কয়টা ভূমিকা রাখতে পারে? হ্যাঁ, হতে পারে অনেকগুলো। অথচ পরিচয়ের শুরু থেকেই বোরাক নামক ভদ্রলোকটি তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই এমনভাবে জড়িয়ে আছে যেন সে মৌয়ের এক অবিচ্ছেদ্য ছায়া। দিন দিন তার প্রতি মৌয়ের ঋণের পাল্লা ভারীই হচ্ছে, অথচ বোরাক শিকদার যেন সেই ভারটুকুও অনুভব করতে দিচ্ছে না তাকে।

​”মাম্মা! মাম্মা, কেক তো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে! থামো, থামো!”
​চড়ুইয়ের দিশেহারা উত্তেজিত কণ্ঠস্বরে মৌটুসীর ভাবনার সুতোয় টান পড়ল। এক ছটকায় ঘোর থেকে বেরিয়ে এলো যেন সে। এবার হাতের দিকে তাকাতেই চক্ষু চড়কগাছ। ডেকোরেশনের পাইপিং ব্যাগ হাতে সে এতক্ষণ কী করে চলেছে! কেকের ওপর সাদা হুইপ ক্রিমের বিশাল স্তূপ জমা হয়ে আছে।
​যে নকশাটি ফুটিয়ে তোলার কথা ছিল, তা এখন আর নেই। আনমনে ভাবতে গিয়ে কখন যে সে হাত আর মনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, তা টেরই পায়নি। কেকের ওপরের অংশটা এখন এবড়োখেবড়ো ক্রিমের পাহাড়ের মতো হয়ে আছে। বসেছিল কেক ডেকোরেশন করতে, অথচ কখন যে অবচেতন মনে ভাবনায় ডুব দিয়েছে টেরই পায় নি। বিকেলের সেই বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে বোরাকের আচরণ নিয়ে ভাববার তেমন সময়-সুযোগ হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এখন একটু একা হতেই সময় যে তাকে লোকটার গুরুত্ব বুঝিয়ে দিতে লেগেছিল। এদিকে হাতও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কেকের ওপর এবড়োখেবড়ো ক্রিমের পাহাড় সৃষ্টি করে নিয়েছে।
​চড়ুই করুণ দৃষ্টিতে কেকের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে বলল, “কেক তো নষ্ট হয়ে গেল মাম্মা! এখন কী হবে?”
​এই সুযোগে মৌটুসী মেয়ের সাথে একটু মজা নিতে ছাড়ল না। কেকের ওপর থেকে ক্রিমগুলো একটা বাটিতে উঠিয়ে নিতে নিতে মুচকি হেসে বলল সে, “তাই তো! এখন কী হবে? কাস্টমার তো আমাকে ধরে পিটুনি দিবে এখন! ইয়ে বাবা!”

​”উমমম! দিবে না।” কপালে চার খানা ভাজ ফেলে বলল চড়ুই।
​”দিবে না? কেন দিবে না? আমি যে তাদের কেক নষ্ট করেছি!”
​এবার বুদ্ধিমতী চড়ুই বুদ্ধি খাটিয়ে টুপ করে বলে উঠল, “তোমাকে পিটুনি দিলে আমিও পাপাকে বলে তাদের পিটুনি খাইয়ে নেব! পিকনিকের দিনের মতো ঢিসুম ঢিসুম করে পিটুনি দিবে পাপা।”
​মেয়ের কথা শুনে মৌটুসীর হাত থেমে গেল, শক্ত করে চোখ বুজে নিল সে।
অহ! এখানেও মি. জেন্টালম্যান? তাদের মা-মেয়ের জীবনে লোকটা কবে এতটা নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠল? তাদের একটা একক মুহূর্তও মানুষটাকে ছাড়া রচিত কিংবা কল্পিত হচ্ছে না!

​পরের দিন সকাল। চড়ুইকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে মৌটুসী সরাসরি বোরাকের পাঠানো লোকেশনে রওনা হলো। এই কোম্পানির নাম—’সানসাইন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি’। সমাজ সেবামূলক একটা সংগঠনও বলা চলে একে। যদিও এর আগে মৌ এই নাম শোনে নি। তবে তার জানার বিস্তারই বা কতদূর?
​অবশেষে আলুপট্টির বিশালাকার একটা বিল্ডিংয়ের সামনে এসে থামল মৌ। ভেতরে একটুআধটু নার্ভাস লাগছে। বোরাককে বলেছিল তার সাথে আসার জন্য, কিন্তু জেন্টালম্যানের জরুরি কাজ থাকায় তিনি নাকি আসতে পারবেন না। তবে আশ্বস্ত করে বলেছেন, কোনো সমস্যা হবে না, কথা বলা আছে। এছাড়া মৌয়ের করণীয় সব কিছুই বলে দিয়েছে ফোনেই।
​স্কুটিটা পার্কিংয়ে রেখে লিফটের বাটন টিপল মৌ। পাঁচতলায় পৌঁছাতেই চোখ ধাঁধানো আধুনিক এক অফিস স্পেস। ভেতরটা চোখ ঘুরিয়ে দেখতে দেখতেই দরজার কাছে চলে এল মৌ। তখনই দারোয়ানের খসখসে গলার আওয়াজে ভেসে এল, “কাকে চাই ম্যাডাম?”
​মৌটুসী নিজের দৃষ্টি সামলে নিয়ে দারোয়ানের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল, “জ্বি, ইন্টারভিউ দিতে এসেছি। মকবুল স্যার……”

​”আচ্ছা আচ্ছা, যান।”
কথা শেষ করার আগেই দরজা খুলে প্রবেশের অনুমতি দিলেন দারোয়ান।
​মৌটুসী ভেতরে প্রবেশ করে বোরাকের কথামতো করিডোরে পাতানো একটা চেয়ারে বসে অপেক্ষা করতে লাগল। একেবারে ছবির মতো চকচকে ঝকঝকে অফিস। এয়ারকন্ডিশনের এই হলরুমে কেবল কম্পিউটার কিবোর্ডের খটখটে আওয়াজ ব্যতীত বাড়তি কোনো আওয়াজ নেই বললেই চলে। প্রতিটি অফিস কর্মচারীর সামনেই একটি করে ল্যাপটপ, ডেস্কও আলাদা প্রত্যেকের। এমন একটা পরিবেশে কাজ করাটাও এক প্রকার স্বপ্ন। নিজেকে সিনেমা বা নাটকের চরিত্রের মতো ফিল পাওয়া যাবে। ভেতর ভেতর সুখময় উত্তেজনার টের পেল মৌটুসী।
​”মিস মৌ?”
নিজের নাম শুনে মৌটুসী চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তার সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন স্যুট-বুট পরা এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক। মৌটুসী কিছুটা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। মুচকি হেসে বলল, “জ্বি, আমিই মৌ।”

​”আসুন আমার সাথে।” ইশারা করেই ভদ্রলোক হাঁটা দিলেন।
​তাঁকে অনুসরণ করে মৌও এগিয়ে চলল। অতীব সুন্দর একটা ক্যাবিনে নিয়ে আসা হলো তাকে। ভদ্রলোক তাঁর নির্ধারিত চেয়ারে বসে মৌকেও মুখোমুখি চেয়ারে বসতে ইশারা করলেন। মৌ খেয়াল করে দেখল, টেবিলের ওপর কাঠের নেমপ্লেটে লেখা—’মকবুল ইসলাম’। অর্থাৎ, বোরাকের বলা কাঙ্ক্ষিত সেই ব্যক্তি।
​”সাথে কোনো ডকুমেন্টস আনা হয়েছে, মিস মৌ?”
​”হ্যাঁ।” মৌ ফাইল থেকে তার জন্মসনদসহ শিক্ষাজীবনের সকল সনদপত্র বের করে সেগুলো বাড়িয়ে দিল। ভদ্রলোক হাতে নিয়ে একবার সবগুলো উলটেপালটে দেখলেন। এরপর একটা কাগজ নিয়ে তাতে সাইন করে মৌয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে হাসিমুখে বললেন, “অভিনন্দন মিস মৌ। আপনার জয়েনিং লেটার, আপনি চাইলে আজ থেকেই কাজে জয়েন দিতে পারেন।”
​সবকিছু এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল যে মৌটুসী তৎক্ষণাৎ কিছু বুঝে উঠতেই পারল না যেন। কাগজটার দিকে তাকিয়ে থম মেরে বসে রইল সে।

​”চাকরি কি পছন্দ হয়নি?”
অবশেষে ম্যানেজারের কথাতেই হুঁশ ফিরল তার।
​”হ্যাঁ? হ্যাঁ, অবশ্যই স্যার।” ​মৌটুসী খানেক কম্পিত হাতে কাগজটা নিয়ে তার ওপর চোখ বুলাতে লাগল। কালো অক্ষরে হিজিবিজি কিছু ইংরেজি লেখা, তার মাঝে—
​Post: Accounts Assistant
Salary: 45,000 BDT
​সাথে সাথেই মৌটুসীর চোখ দুটো মার্বেল আকার ধারণ করে নিল, যেন এক্ষুনি কোটর থেকে বেরিয়ে হাতের কাগজটার ওপর গড়াগড়ি করবে। কোথায় তার ১৫ হাজার টাকার স্যালারি আর কোথায় ৪৫ হাজার! হুট করেই জীবন কোথায় গিয়ে দাঁড়াল তার?
​একের পর এক অবিশ্বাস্য ঝটকা খেয়ে মৌয়ের মাথা টাল হয়ে গেছে। তার সামনে যে একটা মানুষ বসে আছে তা তার খেয়ালেই নেই। মুহূর্তখানিক পর সকল বিস্ময় কাটিয়ে নিজেকে সামলে নিল মৌটুসী।
সৌজন্যমূলক হেসে বলল, “অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার। আমি আজ থেকেই জয়েন হতে চাই।”

​”ওকে।”
এবার ভদ্রলোক বেল বাজালে একটু পর একজন ছেলে এল। তাকে বললেন, “ম্যাডামকে আপনার ডেক্স দেখিয়ে দিন। আর সাথী ম্যাডামকে বলবেন উনার কাজটা বুঝিয়ে দিতে।”
​ছেলেটি মাথা নাড়াল।
“ওকে স্যার। ম্যাডাম, আসুন প্লিজ।”
​মৌটুসীকে তার ডেস্কে নিয়ে আসা হলো। তবে এটা আলাদা কোনো ক্যাবিন নয়, ছোট একটা গ্লাস দিয়ে জায়গা ঘিরে সারি সারি কিছু ডেস্ক সাজানো হয়েছে, এর মাঝে তারও একটা নিজস্ব জায়গা। সামনের টেবিলে একটা কম্পিউটার রাখা আছে। পেছনের ক্যাবিনেটে কাগজপত্রের স্তূপ।
​ছেলেটা মৌটুসীকে রেখেই চলে গেল। এই সুযোগে মৌ ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে বোরাককে একটা কল দিল। রিসিভ হলো না। মৌ দ্বিতীয়বার করল না, হয়তো ব্যস্ত আছেন। দুই মিনিট পর বোরাকের কলব্যাক এল। মৌটুসী রিসিভ করেই চরম উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে বলে উঠল, “হ্যালো মি. বোরাক! আমার চাকরিটা হয়ে গেছে। আজকেই জয়েন দিচ্ছি।”

​মৌয়ের এই খুশি দেখে ফোনের ওপারে বোরাক তৃপ্তিময় মুচকি হাসল। বলল, “কনগ্রাচুলেশন মিস, মেনি মেনি কনগ্রাচুলেশন। তবে তো আপনার কাছে বড় ট্রিটের পাওনাদার হয়ে গেলাম, কী বলেন?”
​”উমমম… হুম। অবশ্যই। আর অসংখ্য ধন্যবাদ মি. বোরাক। আপনার সুপারিশ ছাড়া এই চাকরি আমার জন্য স্রেফ দুষ্প্রাপ্য একটা বস্তুই থাকত।”
​”ইটস ওকে, বেস্ট অব লাক ফর ইওর নিউ জার্নি। মন দিয়ে কাজ করুন, ছয় মাসের মধ্যে প্রমোশন দেখতে চাই। এবার কিন্তু সুপারিশ করতে পারব না। নিজ প্রচেষ্টায় পদোন্নতি আদায় করতে হবে।”
​মৌটুসী মুচকি হেসে বলল, “জয়েন না করতেই প্রমোশনের চিন্তা? না না! আমি এখানেই ঠিক আছি। প্রয়োজনের চেয়েও বেশি স্যালারি। এর চাইতেও বেশি কিছু আমার সাথে স্যুট করবে না মি. বোরাক।”

দেখতে দেখতে গোটা সপ্তাহটাই পার হয়ে গেল। নতুন অফিসের কাজের সাথেও ধীরে ধীরে মানিয়ে নিয়েছে মৌটুসী। আজ শুক্রবার হওয়ায় একটু নিশ্চিন্তে ঘুমানোর পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু কিসের কী! কারো একজনের মৌয়ের এই শান্তির ঘুমটুকু সহ্য হলো না যেন।
​সকাল সকাল বালিশের পাশে রাখা ফোনটা তীব্র শব্দে বেজে উঠল। মৌ ঘুমের ঘরে বিরক্তের ‘চ’ সূচক শব্দ করে স্ক্রিনে না তাকিয়েই ফোনটা রিসিভ করল। তারপর জড়ানো কণ্ঠে একরাশ বিরতি মিশিয়ে বলল, “হ্যালো, কেইই?”
​”ম্যাডামের কি এখনো ঘুম ভাঙেনি?”
​ওপাশ থেকে ভেসে আসা পুরুষালী ভারী কণ্ঠটি শোনা মাত্রই মৌয়ের ঘুমঘুম চোখ দুটো বড় বড় করে সিলিংয়ের ওপর উঠে গেল। সে কি ভুল শুনছে নাকি? এত সকালে মি. জেন্টালম্যান! মৌ ফোনটা কান থেকে সরিয়ে চোখের সামনে নিয়ে এল। স্ক্রিনও তো তাই বলছে। মৌটুসী বাসি মুখেই ঢোক গিলে বলল, “মি. বোরাক?”

​”হুম। এখন উঠে পড়ুন ম্যাডাম। তারপর আমার মেয়েকেও উঠিয়ে রেডি করিয়ে আপনাদের বাসার গলির মাথায় নিয়ে আসুন।”
​মৌটুসী হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এখন? কিন্তু কেন?”
​”আসুন, এরপর বলছি। জলদি করুন, আই অ্যাম অলরেডি হেয়ার অ্যান্ড ওয়েটিং।”
​বলেই কল কাটল বোরাক। মৌটুসীও কথামতো ফোন রেখে চড়ুইকে ডেকে তুলল। এরপর মা-মেয়ে একসাথে ফ্রেশ হয়ে এসে চড়ুইকে রেডি করিয়ে দিতে লাগল। মাকে তার পরনের পোশাক খুলে দিতে দেখে ছোট্ট চড়ুই কপালে হাত চাপড়ে বলল, “মাম্মা ভুলে গেছ, আজকে শুক্রবার? স্কুল নেই তো!”
​”হ্যাঁ মাম্মা স্কুল নেই। স্কুলে যাচ্ছি না আমরা।”
​”তাহলে রেডি হচ্ছি কেন? কোথায় যাব?”

মৌটুসী পর্ব ২৬ (২)

​মৌটুসী ওয়ারড্রব থেকে চড়ুইয়ের হালকা গোলাপি রঙের একটা ফ্রক বের করে নিয়ে এসে বলল, “কোথায় যাচ্ছ তা আমি নিজেও জানি না মাম্মা। কেবল তোমার হুকুমদাতা পিতার হুকুম পালন করছি আমি।”
চড়ুইকে রেডি করিয়ে দিয়ে মৌ তার পরনের টি-শার্টের নিচে একটা সুতি স্কার্ট পরে নিল। আলুথালু চুলগুলো আড়াল করতে লালবানু বেগমের একটা সুতির উড়না দিয়ে মাথায় আলতো ঘুমটা টেনে নিল সে। এরপর চড়ুইকে নিয়ে বেরিয়ে এল।

মৌটুসী পর্ব ২৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here