Home মৌটুসী মৌটুসী পর্ব ৪১

মৌটুসী পর্ব ৪১

মৌটুসী পর্ব ৪১
ঋতস্বিনী মাহবিশ

অফিসের বিকেল মানেই একটু ব্যস্ত ব্যস্ত আমেজ। ছটার আগেই দিনের নির্ধারিত কাজ শেষ করার তাড়া থাকে সবার মধ্যে। কেউ ব্যস্ত হাতে ফাইল গুছিয়ে নিচ্ছে, কেউ কম্পিউটারের সামনে ঝুঁকে মাউস বা কিবোর্ডের সাহায্যে কাজ সারছে। মৌটুসীও নিজের ডেস্কে বসে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিল। কিবোর্ডের ওপর তার আঙুলগুলো খুব দ্রুত না হলেও একটানা ছুটে চলেছে। তন্মধ্যেই দরজার পাশে এসে দাঁড়াল অফিসের পিয়ন আলম। হাতে ছোট একটা ট্রে।
​— “মৌ ম্যাডাম, আপনার নাস্তা আর কফি।”
​মৌটুসী মাথা তুলে মৃদু হেসে বলল—
​— “রেখে যান, আলামিন ভাই।”

​আলামিন ট্রেটা ডেস্কের একপাশে রেখে চলে গেল।
​মৌটুসীও কয়েক মিনিটের জন্য কাজ থামাল। কম্পিউটারের স্ক্রিনটা মিনিমাইজ করে নাস্তার প্লেটটা নিজের দিকে টেনে নিল। প্লেটে কয়েক পদের ফল আর এক টুকরো কেক। পাশে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ কফি। ভিআইপি অফিসের একটা সুবিধা অবশ্য বেশ ভালোই—সকাল-বিকেলের নাস্তা, আর যখন খুশি কফি; সবই ফ্রি।
​মৌটুসী কাঁটাচামচ দিয়ে আপেলের ছোট একটা টুকরো মুখে তুলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ডেস্কের ওপর রাখা ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। আলিফ! এতদিন পর হঠাৎ আলিফের ফোন? কৌতূহল নিয়েই কলটা রিসিভ করে ফোন কানে ধরল মৌটুসী।

​— “হ্যালো?”
​ওপাশ থেকে ভেসে এল বহু পরিচিত কণ্ঠ—
​— “মৌ, কেমন আছিস?”
​মৌটুসী কফির কাপে চুমুক দিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল—
​— “ভালো। তুই?”
​— “হুম, আমিও ভালো।”
​দুজনের মাঝখানে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। তারপর আলিফের কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা মিশে ভেসে এল—
​— “মৌ, আজকে আমার মার্কেন্টাইল ব্যাংকের রেজাল্টটা দিয়েছে।”
​মৌটুসীর মুখ সঙ্গে সঙ্গেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
​— “তাই নাকি? কনগ্র্যাচুলেশন, দোস্ত! পোস্টিং কোথায়?”
​আলিফ খানিকটা বিস্মিত গলায় বলল—

​— “তুই কীভাবে জানলি?”
​— “কীভাবে জানলাম মানে?”
​— “আমি তো শুধু বললাম রেজাল্ট দিয়েছে। চাকরি হয়েছে—এটা কীভাবে বুঝলি?”
​মৌটুসী ভ্রু কুঁচকে কাঁটাচামচটা প্লেটের পাশে রেখে দিল।
​— “সিম্পল! রেজাল্ট দেওয়ার দিন তুই নিজে থেকে আমাকে ফোন করেছিস মানে নিশ্চিতভাবে চাকরি কনফার্ম।”
​ওপাশ থেকে আলিফ শব্দ করে হেসে উঠল।
​— “কে বলেছে রে, সুন্দরীরা বোকা হয়? আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দরী নারীটিই সবচেয়ে বুদ্ধিমতী।”
​মৌটুসী বিরক্ত মুখে বলল—

​— “সস্তা পাম মারা বন্ধ কর। এসব জিনিস বুঝতে এক্সট্রা ট্যালেন্টের দরকার হয় না।”
​— “আচ্ছা আচ্ছা, মানলাম।”
​— “এবার বল, পোস্টিং কোথায়?”
​— “রংপুর সদরে দিয়েছে।”
​মৌটুসী সন্তুষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল।
​— “ভালো তো! ট্রিট পাচ্ছি তাহলে?”
​— “অবশ্যই। আজকে দেখা করতে পারবি?”
​— “আরে না! আজকেই না। বেতনটা তো আগে পেয়ে নে, তারপর বড়সড় ট্রিট দিস।”
​ট্রিটের কথা মুখ দিয়ে বের করেও যেন একপ্রকার বিপদে পড়ে গেল মৌ।
​আলিফ বলল—
​— “সমস্যা নেই। আব্বা-আম্মা তো এখন কাছে নেই। তাই আনন্দটা না-হয় তোর সঙ্গেই ভাগাভাগি করে নিলাম।”
​মৌটুসী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। না করতে চেয়েও কেন যেন পারল না। যতই হোক, পুরোনো বন্ধু তো! আলিফের মনে তার জন্য অন্য অনুভূতি থাকলেও তার নিজের দিক থেকে বন্ধুত্বটা সবসময়ই স্বচ্ছ ছিল। এতদিনের বন্ধুত্বের একটা আলাদা জায়গা আছে তার কাছে। তাই শেষ পর্যন্ত বলল—

​— “আচ্ছা। ঠিক আছে।”
​ওপাশ থেকে আলিফের চাপা খুশি গলা ভেসে এল—
​— “ডিউটি শেষ হবে কখন তোর?”
​— “ছয়টায়। তোর আসার দরকার নেই, আমি নিজেই চলে যাব।”
​— “আচ্ছা, তাহলে অরোরা টু-তে চলে আসিস। আমি ওখানেই থাকব।”
​মৌটুসী সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল—
​— “আচ্ছা।”
​কলটা কেটে ফোনটা ডেস্কের ওপর নামিয়ে রাখতেই মৌটুসীর ভেতরটা হঠাৎ একরাশ আফসোসে ভরে উঠল। সে যে কেন চাকরিটার আবেদনই করেনি! আলিফের মতো তারও তো আজকে চাকরিটা হয়ে যেতে পারত। তখন বেসরকারি চাকরি বলে বিষয়টাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি সে। ভেবেছিল, সরকারি চাকরির প্রস্তুতিই আগে নেবে। আর বেসরকারি ব্যাংকের চাকরি—এমন আর কী! আর এটাই হলো বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের সমস্যা। সরকারি চাকরির পেছনে ছুটতে ছুটতে অর্ধেক জীবন তারা খেয়ে নেয়। পরে একুল-ওকুল সব হারিয়ে বেকারত্বের বোঝা নিয়ে বাঁচতে হয়।
​মৌটুসী দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার কম্পিউটারের স্ক্রিনটা ওপেন করতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ফোনটা আবার বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে আছে—আম্মা। লাল বানু বেগমের কল। মৌটুসী কলটা কেটে নিজেই ব্যাক করল। রিসিভ হতেই সে বলে উঠল—

​— “হ্যালো আম্মা?”
​কিন্তু ওপাশ থেকে লাল বানু বেগমের কণ্ঠের বদলে ভেসে এল চড়ুইয়ের মিনমিনে গলা—
​— “মাম্মা…”
​মেয়ের এমন কণ্ঠ শুনে মৌটুসীর ভ্রু কুঁচকে গেল। চড়ুই সাধারণত ফোন পেলে উচ্ছ্বাসে গলা ফাটিয়ে কথা বলে। অথচ আজ তার কণ্ঠটা কেমন যেন নিস্তেজ, আদুরে অথচ মনখারাপের। মৌটুসী সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসল।
​— “কী হয়েছে মা আমার চড়ুই পাখির?”
​ওপাশ থেকে ছোট্ট করে উত্তর এল—
​— “মাম্মা, এসো।”
​— “কেন মা? কী হয়েছে? খারাপ লাগছে? পেট ব্যথা করছে?”
​চড়ুই কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মিনমিনে স্বরে বলল—
​— “চড়ুই পাখির ভালো লাগছে না। তুমি পাপাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি এসো।”
​মেয়ের কথাটা শুনে এবার মৌটুসী সত্যিই চিন্তিত হয়ে পড়ল।
​— “আচ্ছা, আচ্ছা মাম্মা আসছি। নানিমণিকে দাও তো।”
​কিছুক্ষণের মধ্যেই ফোনের ওপাশে লাল বানু বেগমের কণ্ঠ ভেসে এল।
​— “মৌ?”
​মৌটুসী উদ্বিগ্ন গলায় বলল—
​— “আম্মা, চড়ুই পাখির কী হয়েছে?”
​লাল বানু বেগম শান্ত স্বরে বললেন—
​— “কইতারি না। ঘুম থেইকা উঠেই কইতাছে, ভালো লাগতাছে না। আমারে কিছু কয় না, তোর কথা জিগায় খালি।”
​— “জ্বর আসছে নাকি?”
​— “না, শরীর তো গরম নয়। তুই পারলে আইয়া পড়।”
​— “আচ্ছা আম্মা, আমি আসতেছি।”
​কল কেটে দিয়ে ম্যানেজারকে ইমার্জেন্সি বলে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো মৌটুসী।
​বাড়িতে পৌঁছেই প্রায় দৌড়ে ঘরে ঢুকল সে। চড়ুই বিছানায় দেওয়ালে হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে আছে। সামনে টিভিতে কার্টুন চলছে, কিন্তু সেদিকে তার মনোযোগ নেই। মাকে দেখা মাত্রই সে এবার তড়াক করে সোজা হয়ে বসল।

​— “মাম্মা!”
​মৌটুসী ব্যস্ত হয়ে বিছানার কাছে গিয়ে বসে পড়ল। হাত দিয়ে মেয়ের কপাল-গলা ছুঁয়ে শরীরের তাপমাত্রা বোঝার চেষ্টা করল।
​— “কী হয়েছে মা আমার? কোথাও ব্যথা করছে পাখি?”
​চড়ুই মায়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ছোট করে জিজ্ঞেস করল—
​— “পাপা এসেছে?”
​মৌটুসী একটু থমকে গেল।
​— “না মা। পাপা তো আসেনি।”।”
​চড়ুইয়ের মুখটা সঙ্গে সঙ্গেই কেমন মলিন হয়ে গেল।
​— “কেন? পাপাকে নিয়ে আসোনি কেন?”
​— “পাপা তো অফিসে আছে মা। কাজ করছে। মাম্মাকে বলো, ঘুরতে যাবে? বীর বন্ধুকে আসতে বলব?”
​হঠাৎ চড়ুই ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল—

​— “না। চড়ুই পাখি পাপাকে নিয়ে আসতে বলেছিল! পাপাকে মনে পড়ছে।”
​ছোট্ট চড়ুইয়ের টুকটুকে ঠোঁটদুটো কেঁপে উঠল। কথাটা শেষ করেই চোখ দুটো কুঁচকে ফেলল সে। পরমুহূর্তেই চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল ছোট্ট গাল বেয়ে। মৌটুসীর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে দ্রুত মেয়েকে বুকে টেনে নিল।
​— “আহা, আমার চড়ুই পাখি কাঁদে না মা? পাপাকে ফোন দিই, হুম? এখনই ফোন দেব?”
​কিন্তু চড়ুই মাথা নাড়ল। তারপর মায়ের বুকে মুখ গুঁজে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল—
​— “ফোন না… পাপাকে চাই। পাপা আসবে।”
​চড়ুইকে জড়িয়ে রেখে বোরাককে কল করার উদ্দেশ্যে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করল মৌটুসী। তবে কল করতে কিছুটা অস্বস্তি হচ্ছে তার। কে জানে লোকটা খুব ব্যস্ত আছে কিনা? কাল বলেছিল ব্যস্ততার মধ্যেই যাচ্ছে। চাপা অস্বস্তি নিয়েই কল করল মৌ। রিং হলো কিন্তু রিসিভ হলো না। সে আর কলটা কেটে দ্বিতীয়বার চেষ্টা করল না। ফোনটা নামিয়ে রাখতেই চড়ুই বলল—

​— “পাপা আসছে?”
​মৌটুসী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বলল—
​— “হ্যাঁ মা, আসবে।”
​কথাটা বলার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মৌটুসীর ফোনটা আবার বেজে উঠল। বোরাক ব্যাক করেছে—দ্রুত কলটা রিসিভ করে ফোন কানে ধরল।
​— “হ্যালো?”
​ওপাশ থেকে বোরাকের পরিচিত ভারী কণ্ঠ ভেসে এল—
​— “হ্যাঁ বলো।”
​— “আপনি কি খুব বেশি ব্যস্ত?”
​— “না, তেমন না। কেন?”
​— “চড়ুই আপনার কথা বলছিল। আপনাকে নাকি খুব মনে পড়ছে।”
​একটু থেমে বোরাক বলল—
​— “উমম… আচ্ছা, তুমি ওকে রেডি করিয়ে বের করে আনো। আমি আসছি। দেরি করো না, হ্যাঁ? আমি অফিস থেকে বের হচ্ছি।”

​বলেই কল কাটল বোরাক। কথা শুনেই মৌটুসী নিশ্চিত মানুষটা সত্যিই কোনো জরুরি কাজের মধ্যে আছে। তাছাড়া এত শর্টকাট ও তাড়াহুড়ো করে কখনো কথা বলে না। এভাবে ব্যস্ততার মধ্যে তাকে বিরক্ত করার জন্য ভেতরে ভেতরে একটু খারাপ লাগল মৌটুসীর। তবুও মেয়ের মন খারাপের কথা ভেবে সেই অস্বস্তিটুকু ঝেড়ে ফেলল। চড়ুইকে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ করিয়ে রেডি করে দিল সে। তারপর মেয়ের হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। হাঁটতে হাঁটতে দুজনে মোড়ের দিকে এগোতে লাগল।
​চড়ুই আজ অস্বাভাবিক রকম চুপচাপ। সাধারণত রাস্তায় বেরোলেই এদিক-ওদিক তাকিয়ে তার কত কথা, কত প্রশ্ন—মুখ ননস্টপ চলতেই থাকে! অথচ আজ সে চুপচাপ মায়ের হাত ধরে হাঁটছে। বরং মৌটুসীই উল্টো এটা-ওটা বলে মেয়ের মন ভালো করার চেষ্টা করছে। একসময় মা-মেয়ে জাদুঘরের দেয়ালসংলগ্ন ফাঁকা একটা পাবলিক বেঞ্চে গিয়ে বসল। অপেক্ষা করতে করতে ছোট্ট চড়ুই রাস্তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে বলল—

​— “মাম্মা, পাপা এখনো আসছে না কেন?”
​মৌটুসী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
​— “আসবে মাম্মা। এখনই এসে পড়বে।”
​চড়ুই কিছুক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার বলল—
​— “আরেকবার ফোন দাও পাপাকে। তাড়াতাড়ি আসতে বলো।”
​অগত্যা মৌটুসী ফোনটা বের করল। তবে এবার সত্যিই কল করার সাহস হলো না তার। মিছেমিছি স্ক্রিনে দু-একবার আঙুল বুলিয়ে ফোনটা হাতে রেখেই অপেক্ষা করতে লাগল।
​কিন্তু অপেক্ষাটা বেশিক্ষণ দীর্ঘ হলো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই বোরাকের গাড়িটা তাদের সামনে এসে থামল। দরজা খুলে বেরিয়ে দ্রুত এগিয়ে এল সে। এরপর কোনো কথা না বলেই আগে চড়ুইকে কোলে তুলে নিল।
​— “কী হয়েছে আমার মায়ের? পাপাকে মিস করেছে?”
​চড়ুই দুহাতে পাপার গলাটা জড়িয়ে নিয়ে গালে গাল ঠেকিয়ে বলল—
​— “হুম। খুব মিস করেছে।”
​বোরাকের মুখের কোমলতা আরও গভীর হলো। ধীরে ধীরে সে মেয়ের মুখটা হাতের মাঝে নিয়ে ভালো করে দেখতে লাগল। মুখটা কেমন মলিন হয়ে আছে। সবসময়কার সেই শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস নেই। চেহারাটাও কেমন যেন ভারী ভাব। বোরাকের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল।

​— “আমার মা কি কান্না করেছে?”
​চড়ুই ছোট্ট করে মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিল। বোরাকের ভ্রু এবার আরও কুঁচকে গেল।
​— “কেন, মামণি? আমার মা কেন কাঁদবে? মাম্মা কিছু বলেছে?”
​চড়ুই সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। তারপর বাবার গলার কাছে মুখ লুকিয়ে আলতো স্বরে বলল—
​— “না। চড়ুই পাখির ভালো লাগছিল না।”
​বোরাক একটু থমকে গেল।
​— “ভালো লাগছিল না?”
​বোরাক চিন্তিত চোখে মৌটুসীর দিকে তাকাল।
​মৌটুসী অসহায় ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল।
​— “আমিও কিছু জানি না। ঘুম থেকে উঠেই মন খারাপ করেছিল। পরে আমি অফিস থেকে চলে আসি। তারপর থেকে শুধু আপনার কথাই বলছিল।”
​বোরাক আবার মেয়ের দিকে তাকাল।
​চড়ুই এবার আরেকটু গুটিশুটি হয়ে বাবার প্রশস্ত কাঁধে মাথা এলিয়ে দিল। তারপর শান্ত, তৃপ্ত গলায় বলল—
​— “এখন ভালো লাগছে, পাপা।”
​বোরাকের চোখের কোণে হাসি ফুটে উঠল। এক হাত দিয়ে মেয়েটার পিঠে হাত বুলিয়ে তাদের নৈকট্য বাড়াল।

​— “আমার লক্ষ্মী মামণি, আমার চঞ্চল পাখি। পাপা এসে গেছি বাবা।”
​পাশে দাঁড়িয়ে মৌটুসী নিঃশব্দে সামনের অপূর্ব দৃশ্যটা দেখে যাচ্ছে। তার বুকের ভেতরটা অসম্ভব ভালোলাগায় ছেয়ে গেল। এই অনুভূতিটা একজন মায়ের কাছে কতটা মূল্যবান, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
​বোরাক আর চড়ুইয়ের সম্পর্কটা ঠিক কবে এত গভীর হয়ে উঠল, সে নিজেও বুঝে উঠতে পারেনি। রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই, জন্মের কোনো দাবি নেই—তবু এই মানুষটার বুকেই তার মেয়েটা এমন নির্ভার আশ্রয় খুঁজে পায়, যেন সেই জায়গাটা বহুদিন ধরেই কেবল তার জন্যই বরাদ্দ ছিল।
​তবু সেই ভালো লাগার আড়ালেই হঠাৎ এক চিলতে ভয় এসে বাসা বাঁধল মৌটুসীর মনে। লোকটা তাদের মা-মেয়ের জীবনের সঙ্গে একেবারে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। তাদের নির্ভরতার আরেক নাম বোরাক শিকদার। কিন্তু ভবিষ্যতে একদিন যদি হঠাৎ এই মানুষটা দূরে সরে যায়? যদি এই অভ্যাস, এই নির্ভরতা একসময় ভেঙে যায়? তখন তারা কীভাবে থাকবে? কীভাবে বাঁচবে?
​মৌয়ের ভাবনার মাঝেই চড়ুই পাপার কাঁধ থেকে মাথা তুলে বলল—

​— “চলো পাপা, এখন বীর বন্ধুর কাছে যাব।”
​— “হ্যাঁ মামণি, যাব।” তারপর মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে বলল— “মৌটুসী, তুমি বাড়িতে চলে যাও। চড়ুই আমার সাথে থাকুক। সন্ধ্যার পর রেখে যাব।”
​মৌটুসী একটু দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করল—
​— “আপনি কি এখন বাসায় যাবেন?”
​— “না, আগে অফিসে যাব, তারপর বাসায়।”
​— “চড়ুইকে নিলে সমস্যা হবে না?”
​— “না, হবে না।”
​মৌটুসী আর কিছু বলল না, কেবল ছোট করে বলল—
​— “আচ্ছা।”
​মৌটুসীকে বিদায় দিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসল বোরাক। চড়ুইকে সিটে বসাল না, কোলের ওপর রেখেই গাড়ি স্টার্ট দিল। চড়ুইও শান্ত হয়ে পাপার বুকে পিঠ ঠেকিয়ে আরামসে বসে রইল, দৃষ্টি সামনের ব্যস্ত রাস্তায় চলাচল করা নানা প্রকার যানবাহনের দিকে। বোরাক এক হাত স্টিয়ারিংয়ে রেখে অন্য হাত দিয়ে মেয়েকে আগলে রেখেই ধীরগতিতে ড্রাইভ করছে। বেশ কিছুক্ষণ চড়ুইয়ের সাড়াশব্দ না পেয়ে এবার সে ডাকল—

​— “স্প্যারো?”
​— “হুম পাপা?” ঘাড় কাত করে বোরাকের দিকে তাকাল চড়ুই।
​বোরাক মিষ্টি হেসে বলল—
​— “ঘুম আসছে আমার মায়ের?”
​— “নাহ।” দুদিকে মাথা নাড়ল চড়ুই।
​— “তাহলে এত চুপচাপ কেন?”
​— “গল্প করব?”
​— “হুম মামণি। পাপাকে গল্প শোনাও। কয়দিন কী করলে সব শোনাও।”
​মৌটুসীর কল করার সময় বোরাক অফিসের কয়েকজন স্টাফকে নিয়ে বর্তমান প্রজেক্টটা নিয়ে ছোটখাটো একটা মিটিংয়ে বসেছিল। মৌটুসীর ফোন পেয়ে সেই আলোচনার মাঝপথেই বেরিয়ে গিয়েছিল সে। তাই অফিসে পৌঁছেই চড়ুইকে নিয়ে সরাসরি মিটিং রুমের দিকে চলে গেল।
​ভেতরে কয়েকজন স্টাফ আগে থেকেই বসে ছিল।
​বোরাক প্রবেশ করতেই সবাই স্বাভাবিকভাবেই তার দিকে তাকাল। তবে তার সঙ্গে ছোট্ট চড়ুইকে দেখে কয়েকজনের চোখে কৌতূহলের ঝিলিক ফুটে উঠল।
​বোরাক নির্বিকার ভঙ্গিতে চড়ুইকে নিজের পাশের একটি চেয়ারে বসিয়ে দিল। তারপর ঝুঁকে মেয়ের কপালে আলতো করে চুমু এঁকে বলল—

​— “এখানে বসো, মামণি। পাপার কাজ দেখো।”
​চড়ুই জিজ্ঞেস করল—
​— “পাপা, বীর বন্ধুর কাছে কখন যাব?”
​বোরাক মেয়ের বেবি হেয়ারগুলো ঠিক করে দিতে দিতে বলল—
​— “পাপার কাজ শেষ হলেই যাব মা।”
​চড়ুই মাথা কাত করে সায় দিল।
​— “ঠিক আছে, তাহলে এখন বসে থাকি।”

​তারপর ছোট্ট দুই হাত গুছিয়ে কোলের ওপর রেখে একেবারে ভদ্র মেয়ের মতো চুপচাপ বসে রইল সে।
​এদিকে মিটিংয়ে উপস্থিত সবাই কাজের ফাঁকে ফাঁকে বিশেষ কৌতূহল নিয়ে চড়ুইকে পর্যবেক্ষণ না করে পারছে না। ​বোরাকের সাড়ে চার বছরের একটি ছেলে আছে—সে কথা অফিসের কারও অজানা নয়। বীরের সঙ্গে তারা ভালোভাবে পরিচিত। বোরাক মাঝেমধ্যেই ছেলেকে অফিসে নিয়ে আসে।
​কিন্তু চড়ুই তাদের কাছে একেবারেই নতুন। তবে কৌতূহলের বিষয়টা সেটা নয়; বরং চড়ুইয়ের মুখে বোরাককে বারবার “পাপা” বলে সম্বোধন করাটাই সবার কৌতূহলের মূল কারণ।
​তবে তাদের সেই অদম্য কৌতূহল দমানোর উপায় নেই। অফিস ওনারের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সরাসরি কোনো প্রশ্ন করা একেবারেই অসম্ভব। তাদের কৌতূহল আপাতত গুঞ্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
​আলোচনা আবার শুরু হলো। বোরাক মনোযোগ দিয়ে এক স্টাফের কথা শুনছে, প্রয়োজনমতো প্রশ্ন করছে, কোথাও কোথাও নিজের মতামত দিচ্ছে। কথা বলার মাঝেই একবার তাকাল পাশে বসে থাকা চড়ুইয়ের দিকে।
​মেয়েটা একেবারে চুপটি করে বসে আছে। গোল গোল চোখে বিশাল মিটিং রুমটার এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখছে। বোরাক এক মুহূর্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে একজন পিয়নকে ডেকে নিচের মার্কেট থেকে কিছু চকলেট-চিপস নিয়ে আসতে বলল।
​কিছুক্ষণের মধ্যেই পিয়নটি বিশাল এক প্যাকেটে নানা রকম খাবার নিয়ে হাজির হলো। চড়ুই এখন সেগুলো একটা একটা করে মন দিয়ে খাচ্ছে আর মাঝে মাঝে বাবার দিকে তাকিয়ে দেখছে।

​মৌটুসী গলির মাঝামাঝি আসতেই পাশের বাড়ির এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক তাকে ডাক দিলেন—
​— “মৌ মা, শোনো।”
​মৌটুসী থেমে ভদ্রলোকের দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি টেনে বলল—
​— “জি, চাচা?”
​ভদ্রলোক এবার কণ্ঠটা নিচু করে বললেন—
​— “সেইদিন দেখলাম, সুন্দর করে এক জোয়ান ছ্যাড়ার দামি গাড়ি থেকে নামলা। আবার তোমার ভাবিও তো পুরা পাড়া লুটে বেড়াইতাছে—লোকটার ছোট বয়সী পোলা নাকি তোমারে ‘আম্মা’ ডাকে! কথা খান কি সত্যি মা?”
​মৌটুসীর মুখের হাসিটুকু ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। কিন্তু চোখের স্থিরতা কমল না।
​ভদ্রলোক এবার কিছুটা ইতস্তত করে বললেন—

​— “মানে কইতে চাইতেছি… পোলার লগে তোমার…”
​তিনি বাকিটা শেষ করার আগেই মৌটুসী অতি শান্ত গলায় বলে উঠল—
​— “চাচা, সেদিন রুমিয়াকে পদ্মা পার্কে দেখলাম, বুঝেছেন?”
​ভদ্রলোকের মুখটা মুহূর্তেই ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেল যেন। বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—
​— “কারে, আমগো রুমিয়ারে?”
​— “হ্যাঁ, আপনার মেজো মেয়েটা। একটা তরুণ ছেলের হাত ধরে ঘুরছিল। কী মাখামাখি করে একে অপরকে ফুচকা খাওয়াচ্ছিল! তবে ছেলেটা রুমিয়ার স্বামী না, অন্য কোনো ছেলে। আমার তো পরিচিত নয়।”
​ভদ্রলোক মনে মনে নিজের ওপর চরম বিরক্ত হলেন। কী দরকার ছিল যেচে পড়ে মেয়েটার সাথে লাগতে যাওয়া? মৌটুসী যে আর দশটা সাধারণ মেয়ে নয়, সেটা কি তাঁর অজানা? পাড়ার কত ঘরের কত গোপন খবর যে তার নখদর্পণে, তার হিসাব নেই। এই দিক দিয়ে বলতে গেলে সে যেন অলৌকিক কোনো ক্ষমতার অধিকারী। নিজের মুখে তালা এঁটেই সবার গোপন তালা খোলে।
​কিছুক্ষণ মৌটুসীর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে কাচুমাচু ভঙ্গিতে হাসার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন তিনি। আমতা আমতা করে বললেন—

​— “কী কও মা! আমি… আমি দেখতাছি। রুমিরে বুঝাই কইমু। তুমি আবার এই কথা বাইরের কাউরে কইতে যাইও না যেন! তোমারই তো বোন।”
​মৌটুসী এবার মৃদু হাসল। অভিজ্ঞদের মতো মাথা নেড়ে বলল—
​— “হ্যাঁ, চাচা। আপনি একটু ভালো করে দেখবেন। মেয়ের বয়স অল্প, আর দিয়েছেন তো একটা আধবুড়ো জামাই গলায় ঝুলিয়ে—তাই মেয়ে তো সুযোগ পেলে কচি পাতে মুখ দেবেই!”
​মৌয়ের কথার বিপরীতে ভদ্রলোক মৃদু হাসলেও তাঁর শক্ত চোয়াল বলে দিল মেয়ের প্রতি তিনি বেজায় চটে গেছেন। মনে মনে ভেবে নিলেন, বাড়িতে ফিরেই মেয়ের সাথে হিসাব চুকাবেন। মেয়েটা বড্ড বাড় বেড়েছে। এর আগেও তাঁর কানে অতি গোপনে খবর এসেছে, মেয়ে নাকি বড়লোক স্বামী শ্বশুরবাড়ি রেখে টোকাই পোলাপানের সাথে ইটিসপিটিস করে বেড়াচ্ছে। এতদিন সেই খবর আমলে না নিলেও এবার আর হালকাভাবে নেওয়া যাচ্ছে না। তিনি যত দ্রুত সম্ভব মায়ের সামনে থেকে কেটে পড়ার লক্ষ্যে হাত উঁচিয়ে বললেন—

​— “আইচ্ছা আম্মা, থাকো তাইলে। তোমার মাইয়াডা ভালাই আছে, না?”
​— “হুম চাচা, ভালোই আছে।”
​ভদ্রলোক আর দাঁড়ালেন না। দ্রুত সেখান থেকে সরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। তখনই মৌটুসী আবার ডাকল—
​— “চাচা?”
​ভদ্রলোক থেমে ফিরে তাকালেন।
​— “হাঁ মা?”
​মৌটুসী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর শান্ত অথচ গভীর কণ্ঠে বলল—
​— “চাচা, আমি তো আপনাদেরই মেয়ে। আপনাদের চোখের সামনেই বড় হয়েছি। আমাকে ছোটবেলা থেকে দেখে আসছেন আপনারা। কখনো কি এমন কোনো কাজ করেছি, যাতে সমাজের দুর্নাম হয়?”
​ভদ্রলোক এবার একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। মৌটুসী উত্তর পাওয়ার অপেক্ষা না করেই আবার বলল—

​— “আমার বিরুদ্ধে কখনো কোনো অভিযোগ শুনেছেন?”
​ভদ্রলোক এবার ধীরে মাথা নাড়লেন।
​— “না মা।”
​— “গত পঁচিশটা বছরে আমাদের জীবনে অনেক দুঃসময় গেছে, চাচা। কত রকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তখনও আমি এমন কিছু করিনি, যাতে সমাজের সামনে মাথা নিচু করতে হয়। সামনেও করব না, ইনশাআল্লাহ। আমার ওপর অন্তত এইটুকু বিশ্বাস রাখতে পারেন।”
​তারপর সামান্য থেমে কিছুটা নরম স্বরে বলল—

​— “আমি যে আমার মাতৃত্বটুকু অনেক আগেই উন্মুক্ত করে দিয়েছি, হয়তো সেই কারণেই মা-হারা এতিম বাচ্চাটা আমাকে ‘মা’ ডেকে আপন করে নিয়েছে। এটাকে কুৎসিত চোখে দেখবেন না, চাচা। ওর বাবার সঙ্গেও আমার কোনো কুৎসিত সম্পর্ক নেই। তবে কোনোদিন যদি আমাদের মাঝে কোনো পবিত্র সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সেটা লুকিয়ে নয়; আপনাদের অবিভাবদের উপস্থিতিতেই হবে।”
​ভদ্রলোকের মুখটা কেমন নরম হয়ে এল। সম্ভবত এই প্রথম তিনি মৌটুসীকে কারো সামনে এতটা কৈফিয়ত দিতে দেখলেন, গুজবের বিপরীতে নিজের একটু সাফাই গাইতে দেখলেন। এতদিন তো তিনিও অন্য সবার মতোই কাঠখোট্টা, উড়নচণ্ডী স্বভাবেরই ভেবে এসেছেন। কিন্তু আজ এটুকু শুনতেই মনে হলো, সব মেয়েরই মতো তারও একটা নরম মন আছে, যেখানে সামান্য আঘাতেও ব্যথা হয়। ভদ্রলোক অনুতপ্ত গলায় বললেন—

​— “আম্মা, আমার কথায় মন খারাপ করছ?”
​মৌটুসী হাসল।
​— “না, চাচা। একদম না।”
​— “তবে পাড়ায় প্রতিদিনই তোমার নামে নতুন নতুন গুজব ছড়াইতাছে—এটুকু তো জানোই?”
​মৌটুসী আবারও মৃদু হাসল।
​— “জানি চাচা। তবে তাদের মুখ বন্ধ করার ক্ষমতা আমার নেই। আমার সামনে যারা বলতে আসবে, তাদের হয়তো কিছু জিনিস বুঝিয়ে দিতে পারব। আর যারা আড়ালেই চর্চা করবে, তাদের ধরে ধরে বোঝানো আমার সাধ্যের বাইরে। তাই চোখ-কান বন্ধ করেই চলি। আমি আমার কাছে স্বচ্ছ। এটাই আমার অহংকার, আমার প্রেরণা।”
​ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর স্বাভাবিক চাচাসুলভ স্নেহে বললেন—

​— “তাও চাচা হিসেবে একখান উপদেশ দেই, মা। একটু চোখ-কান খোলা রাইখা চলবা। দেখলাই তো, তোমার বোনডার লগে কী হইল! এই যুগের ছ্যাড়াগুলা খুব একটা ভালো হয় না। আর বড়লোক ছ্যাড়া হলে তো কথাই নাই। পারলে দেইখা শুইনা একটা বিয়া কইরা নাও। বয়স তো কম হইলো না। তোমার বোনের লগে বিয়া হইলে তোমার এতদিনে নিজের স্বামী-পোলাপান লইয়া ভরা সংসার হইত।”
​ভদ্রলোকের শেষের কথাগুলোতে মৌটুসীর মুখের মৃদু হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। তাদের মা-মেয়ের অতীতকে আবারও কেউ টেনে সামনে আনায় চোখের দৃষ্টিটা মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল ওর। শক্ত কণ্ঠে বলল—
​— “আপনাদের কতবার বলব, আমার মেয়েই আমার নিজের সন্তান! আমার নিজের রক্ত, নাড়ি ছেড়া ধন। অতীত তুলে আমাদের সম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না!”

মৌটুসী পর্ব ৪০

​ভদ্রলোক মৌটুসীর রাগ দেখে মৃদু হাসলেন। বোঝানোর সুরে বললেন—
​— “তিক্ত হইলেও অস্বীকার করবার জো নাই, মা। অতীত কহনো চিরতরে মোছা যায় না, খালি কিছু সময়ের লাইগা রংবেরঙের কাপড় দিয়া ঢাইকা রাখন যায়। একদিন না একদিন কারো না কারো হাতে সেই কাপড় সরবই।”

মৌটুসী পর্ব ৪২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here