Home আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৯

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৯

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৯
সাবিলা সাবি

বাঙ্কারের ভারী দরজাটা পেছনে বন্ধ হয়ে গেল।
র/ক্তা/ক্ত তরুণী আর একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না।
বুকের ডানপাশের জ্বালাপোড়া করা ক্ষতটা প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিল। তবুও মুখে সেই পরিচিত কঠোরতা। যেন শরীরের ব্যথা তার কাছে কিছুই নয়, বুকের ভেতর জমে থাকা আতঙ্কটাই সমস্ত যন্ত্রণার চেয়ে বড়।
বাঙ্কার থেকে বেরিয়ে নির্জন মেডিকেল রুমটায় ঢুকে দ্রুত নিজের ক্ষতটায় ব্যান্ডেজ করে নিল হিয়া। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রইল রূঢ় মানবী।
চোখ দুটো এখনও লাল হয়ে আছে । কিন্তু সেই চোখের ভেতর রাগের চেয়ে বেশি কিছু ছিল।
ছিল হারিয়ে ফেলার ভয়। লিওনকে হারিয়ে ফেলার ভয়।
ব্যান্ডেজটা আরও শক্ত করে বেঁধে নিয়ে কালো জ্যাকেটটা গায়ে চাপিয়ে নিল টানা টানা তীক্ষ্ণ অধিকারিণী।
তারপর আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকল না। বাইরে এসে বাইকের হ্যান্ডেলে হাত রাখল। পরক্ষণেই গর্জে উঠল ইঞ্জিন। রাতের নিস্তব্ধতা ছিন্ন করে ছুটে গেল কালো বাইকটি।

অন্যদিকে—
বাঙ্কারের ভেতর তখনও আগের মতোই নিস্তব্ধতা।
দরজার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন শক্ত মানব। চোখের সামনে বারবার ফিরে আসছে কয়েক মুহূর্ত আগের দৃশ্যটা।
গলায় ঠেকানো ছু*রি। তারপর বুকের ডানপাশে নিজ হাতে গেঁথে দেওয়া সেই ছু*রি।
মানুষটা বহুবার বহুজনের মৃত্যুর সাক্ষী হয়েছে।
নিজ হাতে অন্যের মৃত্যুর আদেশ দিয়েছে সচক্ষে দেখেছে খু*ন। নিজের মৃত্যুর মুখোমুখিও দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু আজকের দৃশ্যটা—কেন যেন মাথা থেকে সরছে না।
বিশেষ করে সেই চোখ দুটো। রাগে জ্বলতে থাকা অথচ ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়া চোখ। দানিয়েল ধীরে সোফায় গিয়ে বসল। আজ প্রথমবার নিজের সমস্ত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নিজেকে কিছুটা অসহায় মনে হচ্ছে তার। হিয়ার চোখে চোখ রাখার ইচ্ছেটুকুও হারিয়ে গেছে তার।
কারণ ওই চোখের সামনে দাঁড়ালেই আজকের দৃশ্যটা আবার মনে পড়বে।
নিজের বুকের ওপর হাত রাখল দানিয়েল। অস্বস্তিটা এখনও আছে।
গভীর তবে অপরিচিত আবার অনেকটা অসহ্য রকমের অস্বস্তিকর। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল অন্ধকার সাম্রাজ্যের অধিপতি।
আজ রাতটা এখানেই কাটাবে না। আগামীকালই দুবাই চলে যাবে। কিছুদিনের জন্য। কাজের অজুহাত থাকবে।
ব্যবসার ব্যস্ততা থাকবে।কিন্তু নিজের কাছেও সত্যিটা পরিষ্কার—এই মুহূর্তে হিয়ার চোখের সামনে দাঁড়ানোর মতো মানসিক শক্তি তার নেই।

এদিকে—
কালো বাইকটা ছুটে এসে থামল সিআইডি হেডকোয়ার্টারের কাছাকাছি। ইঞ্জিন বন্ধ করে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল র,ক্তাক্ত নারী।
তারপর ধীরে ধীরে হেলমেটটা খুলল। দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল বিশাল ভবনটা। এই জায়গাটার সঙ্গে তার সম্পর্কটা অদ্ভুত। এখানে তার বহু শত্রু আছে। আবার এখানেই তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটাও আছে।
অন্ধকারের আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল হিয়া। চোখ খুঁজতে লাগল পরিচিত সেই মুখটা।
কিন্তু—কোথাও নেই।
এক মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।
হয়তো লিওন ভেতরে আছে। হয়তো কোনো কাজে ব্যস্ত। হয়তো এখনো জানেই না—কতটা কাছ থেকে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে তার জন্য কষ্ট পেয়েছে কেউ।
দুর্ধর্ষ মানবী আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না।
বাইকটা আবার স্টার্ট দিল।
এবার গন্তব্য—একটি বাড়ি।
একজন মানুষের বাড়ি। যার জন্য আজ নিজের বুকের র/ক্ত পর্যন্ত তুচ্ছ করে ফেলেছে এক কঠিন পাথরের হৃদয়ের অধিকারিণী।

আর রাতের অন্ধকারের বুক চিরে আবার ছুটে চলল কালো বাইক। পেছনে পড়ে রইল সিআইডি হেডকোয়ার্টার। সামনে অপেক্ষা করছে লিওনের বাড়ি।
হায়াস ম্যানশনের ঠিক সামনের কিছুটা দূরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিল কালো বাইকটি। তার ওপর বসে ছিল বেপরোয়া ক্রিমিনাল নারী।
আজ সেই অপরাধজগতের সম্রাজ্ঞীর মুখে চিরচেনা দাপট নেই। নেই কোনো অস্থির ছটফটানি। শুধু স্থির হয়ে ম্যানশনের দিকে তাকিয়ে থাকা একজোড়া তীক্ষ্ণ কালো চোখ। সেই চোখের গভীরে তীব্র ক্লান্তি জমে আছে।
বারান্দাটা আজ বন্ধ।
যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকলে দূর থেকেও তাকে দেখা যেত, আজ সেই বারান্দার দরজাগুলো নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে আছে। কালো কাচের ওপারে কোনো আলো নেই। কোনো নড়াচড়া নেই। অন্ধকার সাম্রাজ্যের সেই দুর্ধর্ষ অধিপতিনী কিছুক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে রইল।
তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বারবার আটকে যাচ্ছে বন্ধ বারান্দাটার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল।

একটি সিগারেট ঠোঁটের মাঝে আটকে আগুন ধরাল।
ছোট্ট আগুনের শিখাটা এক মুহূর্তের জন্য তার মুখটাকে আলোকিত করে আবার নিভে গেল। ধোঁয়ার ধূসর পর্দা ধীরে ধীরে তার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।
রাত আরও গভীর হলো। শহরের ব্যস্ততা থেমে গেল।
রাস্তার আলো নিস্তব্ধ হয়ে রইল, একসময় আকাশের কালো চাদরও ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করল।
কিন্তু কালো বাইকের ওপর অপেক্ষারত সেই বেপরোয়া ক্রিমিনাল নারী নড়ল না।
সারারাত কেটে গেল।
কখন যে সিগারেটের আগুন নিভে গেছে, কখন যে রাতের শেষ প্রহর পেরিয়ে ভোরের আলো শহরের গায়ে এসে পড়েছে, তার কোনো হিসাব নেই।
অবশেষে ক্লান্ত শরীরটা বাইকের ওপরই একপাশে হেলে পড়ল। চোখ দুটো বন্ধ। তবুও সেই চোখের নিচে জমে থাকা ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।

কালো, গভীর চোখ দুটো বড় বড় ঘন পাপড়িতে ঢাকা।
চোখের আকৃতি সামান্য টানা, আর দৃষ্টিতে ছিল স্বভাবজাত তীক্ষ্ণতা। ঘুমের ভারে চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এলেও সেই তীক্ষ্ণতার ছাপ মুছে যায়নি।
ভোরের ম্লান আলো এসে পড়ল তার মুখে। রাতের দীর্ঘ অপেক্ষার পরও ম্যানশনের বন্ধ বারান্দা আর খুলল না।
আর কালো বাইকের ওপর নিঃশব্দে শুয়ে থাকা সেই অপরাধজগতের সম্রাজ্ঞীও জানল না। এই অপেক্ষার কোনো শেষ আছে কি না।
সকাল হতেই হায়াস ম্যানশনের বিশাল গেট খুলে গেল।
ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো লিওনের গাড়ি।
আজ বাড়ির কেউই চায়নি লিওন সিআইডি হেডকোয়ার্টারে যাক।
আর্থার হায়াস বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, গতকালের ঘটনার পর অন্তত আজ বাড়িতেই থাকা উচিত। মা উৎকণ্ঠিত চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। অ্যামেলিয়াও একই কথা বলেছে। এমনকি মায়াও তাকে বারবার থামানোর চেষ্টা করেছে।

কিন্তু লিওনকে থামানো সহজ নয়।
নিজের পেশার প্রতি তার নিষ্ঠা বরাবরই অন্যরকম। সিআইডির কাজ তার কাছে শুধুমাত্র একটি চাকরি নয়। এই পেশার সঙ্গে তার দায়িত্ব জড়িয়ে আছে, জড়িয়ে আছে নিজের পরিচয় এবং কর্তব্যবোধ।
শেষ পর্যন্ত বাড়ির সবাইকে বুঝিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল লিওন।
সকালের প্রথম আলো তখন ধীরে ধীরে শহরের ওপর ছড়িয়ে পড়ছে। হায়াস ম্যানশনের সামনে রাতভর দাঁড়িয়ে থাকা কালো বাইকের ওপর ঘুমিয়ে থাকা দুর্ধর্ষ ও বেপরোয়া অপরাধিনীর চোখ হঠাৎ খুলে গেল।
একটি পরিচিত শব্দে। গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ।
ঘুমজড়ানো চোখ মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল হিয়া মাথা তুলে তাকাল। ম্যানশনের বিশাল গেট খুলে গেছে। ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে একটি গাড়ি।
পরিচিত গাড়ি।
লিওনের।

হিয়ার চোখ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।
পরক্ষণেই ক্লান্ত শরীরটা সোজা করে বসে পড়ল সে।
লিওন আজ সিআইডি হেডকোয়ার্টারে যাচ্ছে।
গতকালের ঘটনার পরও। হিয়ার চোখে এক মুহূর্তের জন্য উদ্বেগ ফুটে উঠল। পরক্ষণেই সেই দৃষ্টি কঠিন হয়ে গেল।
লিওনের গাড়ি ম্যানশনের সামনে দিয়ে এগিয়ে গেল।
হিয়া আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না।
বাইকটা স্টার্ট দিল। আজ নিজের পরিচিত বাইকটা নিয়ে বের হওয়া যাবে না। লিওন তার বাইক চিনে ফেলতে পারে।
হিয়ার বাইকের কালেকশন অবশ্য কোনো সাধারণ বিষয় নয়। চাইলে সেই কালেকশন দিয়ে অনায়াসে একটা শোরুম সাজিয়ে ফেলা যায়। কোন দিন কোন মডেল নিয়ে বের হবে, সেটা অনেক সময় এই বেপরোয়া অপরাধিনী নিজেও আগে থেকে ঠিক করে রাখে না। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। অন্য একটি বাইক নিয়ে লিওনের গাড়ির পেছনে ছুটে চলল সে।

দূরত্ব বজায় রেখেই। আর সেই সময় লিওনের গাড়ি ছুটে চলেছে শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে সিআইডি হেডকোয়ার্টারের দিকে।
আজ গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে লিওন নেই। ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে। পেছনের সিটে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে লিওন। কিন্তু তার চোখের সামনে শহরের দৃশ্য থাকলেও মাথার ভেতর বারবার ফিরে আসছে গতকালের ঘটনা।
আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড। আর কয়েকটা সেকেন্ড দেরি হলেই পুরো সিআইডি হেডকোয়ার্টার উড়ে যেতে পারত। নিজের জীবনের সাথে সাথে হয়তো অন্যদের জীবনটাও কাল শেষ হয়ে যেতো।
লিওনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
দানিয়েল।

এই কাজটা দানিয়েলই করেছে। এ নিয়ে তার মনে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সন্দেহের সঙ্গে প্রমাণের দূরত্ব অনেক।প্রমাণ নেই। তাই এখনো কিছুই করার নেই।
লিওন ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে ফেলল। কিন্তু পরের চিন্তাটাই তাকে আরও বেশি অস্বস্তিতে ফেলল।
দানিয়েল যদি এটা করে থাকে, তাহলে হিয়া কি জানত? এত বড় একটা পরিকল্পনা তার অজান্তে হওয়ার কথা নয়। তাহলে হিয়া সব জানত?
লিওনের ভ্রু কুঁচকে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই তার মাথায় ভেসে উঠল সেই মেয়েটার অসংখ্য আচরণ।
তার প্রতি অস্বাভাবিক আকর্ষণ। অতিরিক্ত অধিকারবোধ। বারবার তার কাছে আসার চেষ্টা।
তার জীবনে জোর করে ঢুকে পড়া। তার প্রতি সেই তীব্র অবসেশন। এতদিন ধরে সে যেটাকে হিয়ার সত্যিকারের অনুভূতি বলে ভেবেছে, সেটাও কি অভিনয় ছিল?
লিওনের বুকের ভেতরটা অকারণে ভারী হয়ে উঠল।
যদি হিয়া সত্যিই সব জানত, তাহলে এতদিন তার সামনে দেখানো প্রতিটি অনুভূতি কি মিথ্যা?
প্রতিটি দৃষ্টি? প্রতিটি স্পর্শ? প্রতিটি মুহূর্ত?
সবকিছুই কি শুধু তাকে বিশ্বাস করানোর জন্য?

লিওন জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। তার চোখে এবার সন্দেহের সঙ্গে মিশে গেল শূন্যতা।
সে জানে না কোনটা সত্যি। শুধু একটা প্রশ্ন বারবার তার মাথায় ফিরে আসছে। যে নারী এতদিন তার প্রতি এতটা পাগলামি দেখিয়েছে, সেই নারীর ভালোবাসাটাও কি তাহলে অভিনয় ছিল?
সিআইডি হেডকোয়ার্টারের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে একটি সিগন্যালে এসে গাড়িটা থেমে গেল।
লাল বাতিটা জ্বলছে।
চারপাশে সকালবেলার ব্যস্ততা। রাস্তায় অসংখ্য গাড়ি, পথচারীদের ভিড়, আর তার মাঝেই হঠাৎ গাড়ির জানালার পাশে এসে দাঁড়াল এক তরুণী।
তার হাতে ছিল নানা রঙের ফুলের বড় একটি তোড়া।
লিলি, গোলাপসহ আরও বেশ কয়েক ধরনের ফুলে ভরা সেই তোড়াটা দূর থেকেই নজর কেড়ে নেওয়ার মতো। মেয়েটি জানালার পাশে এসে দাঁড়াতেই লিওন কাচটা নামিয়ে দিল।
“ফুল নেবেন স্যার?”
লিওনের দৃষ্টি একবার ফুলগুলোর ওপর গেল।
“একটা ফুল দাও।”

কথাটা শুনেই মেয়েটি মৃদু হাসল। কিন্তু একটি ফুল দেওয়ার পরিবর্তে সে হঠাৎ পুরো তোড়াটাই লিওনের হাতে তুলে দিল। লিওন কিছুটা অবাক হয়ে তাকাল।
“এতগুলো?”
মেয়েটি শুধু মাথা নাড়ল।
লিওন পকেট থেকে টাকা বের করতে গেল।
“কত?”
মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। “লাগবে না স্যার।”
লিওন ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “কেন?”
মেয়েটি এবার নিচু গলায় বলল, “এই ফুলগুলো আপনার জন্য। অন্য একজন টাকা দিয়ে কিনে আপনাকেই দিয়ে যেতে বলেছে।”
কথাটা বলেই মেয়েটি আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না।
ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। লিওন কয়েক সেকেন্ড তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দৃষ্টি নামল হাতে থাকা ফুলের দিকে। লিলির সাদা পাপড়ির আড়ালে কিছু একটা অস্বাভাবিকভাবে চোখে পড়ল।
ফুলের মাঝখানে রাখা ছিল একটি বড় ডার্ক চকোলেট।
লিওনের প্রিয় চকলেট। চোখ সরু হয়ে গেল তার।
চকোলেটটা হাতে তুলে নিতেই পেছনের দিকে কসটেপ দিয়ে আটকানো একটি ছোট কাগজ চোখে পড়ল।
লিওন কাগজটা খুলে পড়তে শুরু করল।

“অ্যাডভান্স হ্যাপি বার্থডে, দিলবার।
“আজ রাত বারোটার মধ্যে তুমি টাওয়ার ব্রিজে আসবে। আমি তোমাকে অনুরোধ করছি না। বরং জানিয়ে দিচ্ছি। তুমি যদি না আসো, তাহলে থেমস নদীর ওপর থাকা টাওয়ার ব্রিজটা ধ্বংস করে দেব।”
“সঙ্গে যাবে অসংখ্য প্রাণ। যদি সেটা না চাও, তাহলে অবশ্যই আসবে।”
শেষ লাইনটা পড়ার পর লিওনের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। আঙুলের মুঠোয় কাগজটা কুঁচকে গেল।
এই মেয়ে তাকে হুমকি দিচ্ছে। আবারও।
কিন্তু এবার শুধু তাকে নয়। হাজার হাজার মানুষের জীবনকে সামনে রেখে। লিওনের রাগ ধীরে ধীরে আরও তীব্র হয়ে উঠল। তারপর কোনো দ্বিধা না করে হাতে থাকা ফুলের তোড়াটা পাশের সিটে ছুড়ে ফেলল।
সঙ্গে ছুড়ে ফেলল ডার্ক চকোলেটটাও। তার চোখে তখন আর কোনো কোমলতা নেই। শুধু জ্বলছে তীব্র ক্ষোভ। গাড়ির জানালার বাইরে সিগন্যালের লাল আলো তখনও জ্বলছে। আর লিওনের মাথায় একটাই কথা ঘুরছে। এই মেয়েটা সীমা অতিক্রম করছে।

রাত তখন দশটা।
সিআইডি হেডকোয়ার্টারের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমে এসেছে। দিনের কোলাহল পেরিয়ে বিশাল ভবনটির চারপাশে নেমে এসেছে গভীর রাতের নীরবতা।
করিডোরগুলোতেও এখন আগের মতো ব্যস্ততা নেই। একে একে অফিসাররা বেরিয়ে যাচ্ছে। কিছু কক্ষে তখনও আলো জ্বলছে, কোথাও চলছে শেষ মুহূর্তের কাজ। অবশেষে নিজের কাজ শেষ করে অফিস থেকে বেরিয়ে এলো লিওন।
দরজা পেরিয়ে করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে লিফটের সামনে এসে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ড পর লিফটের দরজা খুলে গেল। লিওন ভেতরে ঢুকে নিচতলার বোতাম চাপল। কিছুক্ষণ পর লিফটের দরজা খুলতেই সে বেরিয়ে এলো।
হেডকোয়ার্টারের প্রধান দরজা পেরিয়ে বাইরে আসতেই রাতের ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে লাগল। সামনে বিশাল পার্কিং লট। রাতের আলোয় সারি সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে খুব বেশি মানুষ নেই। দূরের রাস্তা থেকে মাঝে মাঝে গাড়ির শব্দ ভেসে আসছে।
লিওন ধীরে ধীরে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই— তার মাথার ওপর দিয়ে হঠাৎ একটি বিশাল ছায়া চলে গেল।
লিওনের পা থেমে গেল। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
আকাশের অন্ধকার থেকে বিশাল ডানা মেলে নিচের দিকে নেমে আসতে লাগলো একটি সোনালী ঈগল।
পরের মুহূর্তেই ভারী ডানার শব্দ তুলে ঈগলটি লিওনের সামনে এসে মাটিতে নামল।
লিওনের চোখ সরু হয়ে গেল। সে ঈগলটিকে চিনতে পেরেছে।

শ্যাডো।
হিয়ার পালিত সোনালী ঈগল।
শ্যাডো কিছুক্ষণ স্থির হয়ে লিওনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর লিওনের দৃষ্টি গিয়ে থামল ঈগলটির পায়ের কাছে। সেখানে বাঁধা রয়েছে ছোট্ট একটি কালো প্যাকেট। লিওন কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলল না।
তারপর ধীরে ধীরে শ্যাডোর কাছে এগিয়ে গেল।
প্যাকেটটি খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটি ছোট কালো পেনড্রাইভ। লিওনের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল। কোনো চিঠি নেই। কোনো নাম নেই।
কোনো বার্তাও নেই। তবু এটা কার পাঠানো, সেটা বুঝতে তার এক মুহূর্তও লাগল না।
হিয়া।
লিওন পেনড্রাইভটা হাতে তুলে নিল।শ্যাডোর দিকে তাকাতেই ঈগলটি ডানা মেলে আকাশে উঠে গেল।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অন্ধকার রাতের মধ্যে মিলিয়ে গেল তার সোনালী অবয়ব। লিওন কিছুক্ষণ সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

বাড়িতে ফিরে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল লিওন। ব্লেজার খুলে রেখে ল্যাপটপটা টেবিলের ওপর রাখল। পেনড্রাইভটি ল্যাপটপে লাগিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। কয়েকটি ফাইল দেখা গেল।
তার মধ্যে থাকা ভিডিওটি চালু করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল টাওয়ার ব্রিজ। রাতের অন্ধকারে আলোয় ঝলমল করছে বিশাল সেতুটি। ক্যামেরা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। তারপর নিচের দিকে নামতে নামতে থেমে গেল একটি বিশাল পিলারের কাছে। লিওনের চোখ স্থির হয়ে গেল। পিলারের নিচে রাখা একটি টাইম বোমা।
ডিজিটাল টাইমারে সময় গুনছে।
এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড।

তারপর আরেকটি সংখ্যা কমে গেল। লিওনের মুখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল। এটা কোনো ফাঁকা হুমকি নয়। হিয়া সত্যিই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।তার মাথায় দ্রুত একের পর এক চিন্তা চলে এলো। এখনই যদি সিআইডির লোকজনকে নিয়ে সেখানে যায়?
হিয়া যদি দূর থেকে তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করে?
যদি সবাই সেখানে পৌঁছানোর আগেই সে বোমাটা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেয়?
তাহলে?
টাওয়ার ব্রিজের আশপাশে থাকা অসংখ্য নিরীহ মানুষের জীবন মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে যেতে পারে।
লিওন ধীরে ধীরে ল্যাপটপের ঢাকনা বন্ধ করল।
কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল সে। হিয়া তাকে টার্গেট করেছে। হুমকিটাও তাকে দিয়েছে।কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবনের কারণে কোনো নিরীহ মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়ুক, সেটা লিওন কখনোই হতে দেবে না।
তাই এবার তাকে একাই যেতে হবে।

বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারের নিচে দাঁড়াল লিওন।
ঠান্ডা পানি মাথার ওপর দিয়ে নেমে আসছে।
কিন্তু তার মাথার ভেতরের চিন্তাগুলো থামছে না।
বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে পিলারের নিচে রাখা সেই টাইম বোমা।
তারপর হিয়ার হুমকি। আজ রাত বারোটার মধ্যে আসবে। লিওন চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল।
কিছুক্ষণ পর শাওয়ার শেষ করে বেরিয়ে এলো সে।
আয়নার সামনে দাঁড়াল। পরিপাটি পোশাক পরল।
চুলগুলো যত্ন করে সেট করল। কবজিতে ঘড়ি পরল।
তারপর গলায় ও শরীরে হালকা পারফিউম ছড়িয়ে নিল। আয়নায় তাকালে তাকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিকই মনে হচ্ছে।
আজ তার জন্মদিন। আর কিছুক্ষণ পরেই সে পরিবারের সঙ্গে বসে কেক কাটার কথা ছিলো। আজকের রাতটাও অন্য সব জন্মদিনের মতোই আনন্দে কেটে যেতো।
কিন্তু লিওন জানে—আজকের রাতটা অন্যরকম হবে।
টাওয়ার ব্রিজে যেতে প্রায় বিশ মিনিট সময় লাগবে।
তাই রাত ১১টা ৪০ মিনিটে বেরিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিল সে।

সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে হঠাৎ থেমে গেল লিওনের পা। ড্রয়িংরুমের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড কিছু বলতে পারল না সে।
পুরো ঘরটা জন্মদিনের সাজে সেজে আছে।
নরম আলোয় ঘরটা অন্যরকম সুন্দর লাগছে।
টেবিলের ওপর রাখা সুন্দর একটি কেক। চারপাশে তার বাবা, মা, বোন আর মায়া। সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছে। লিওনের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। প্রতিবছর নিজের জন্মদিনটা সে পরিবারের সঙ্গেই কাটিয়েছে।পরিবারের হাসি, কেক কাটার মুহূর্ত, প্রিয় মানুষগুলোর শুভেচ্ছা—সবকিছুই তার জন্মদিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কিন্তু আজ? আজ তাকে চলে যেতে হবে।
লিওনকে দেখে তার বোন অ্যামেলিয়া প্রথমে আনন্দে তাকাল। তারপর হঠাৎ চোখ বড় করে বলল,
“লিওন! তুই এখনই নামলি?”

চারপাশে তাকিয়ে সে সঙ্গে সঙ্গে মুখ ভার করে বলল,
“সব নষ্ট করে দিলি! সারপ্রাইজটাই তো শেষ!”
লিওন নিজের মনটা সামলে নিল। ঠোঁটে হালকা একটা হাসি এনে বলল,“সরি।”
তারপর একটু থেমে শান্ত গলায় বলল, “আমাকে এখন বাইরে যেতে হবে।”
মুহূর্তেই ঘরের হাসিটা থেমে গেল। সবার মুখে নেমে এলো হতাশার ছায়া। মায়ার চোখের উজ্জ্বলতাও ধীরে ধীরে নিভে গেল। লিওন সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“খুব ইম্পর্ট্যান্ট একটা কাজ।”
কণ্ঠটা আরও নরম হলো। “কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি, এক ঘণ্টার মধ্যেই বাসায় ফিরে আসব।”
একটু থেমে যোগ করল, “তারপর সবার সঙ্গে কেক কাটব।”
কথাটা বলেই দরজার দিকে এগিয়ে গেল লিওন।
কেউ তাকে আর থামাল না। শুধু মায়া নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার দিকে। তার হাতে তখনও লিওনের জন্য রাখা ছোট্ট উপহারটা।
কত যত্ন করে সে সেটা বেছে রেখেছিল। ভাবছিল, আজ নিজের হাতে লিওনের হাতে তুলে দেবে।
তার মুখের হাসিটা দেখবে। কিন্তু সেই ছোট্ট আনন্দটুকুও যেন জন্মদিনের রাত শুরু হওয়ার আগেই হারিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হলো। আর সাজানো ড্রয়িংরুমের নরম আলোয় বসে রইল মায়া।তার হাতে রয়ে গেল লিওনের জন্য আনা উপহারটা।

অন্যদিকে লিওন গাড়িতে উঠে বসল।
ইঞ্জিন চালু করল। তারপর একবার কবজির ঘড়ির দিকে তাকাল।
রাত ১১টা ৪০ মিনিট। আর ঠিক বিশ মিনিট পর তাকে পৌঁছাতে হবে টাওয়ার ব্রিজে। তার অপেক্ষায় আছে একটি টাইম বোমা। আর সেই বোমার পেছনে আছে হিয়া। একজন দুর্ধর্ষ ও বেপরোয়া অপরাধী।
যে তাকে নিজের কাছে ডেকেছে। লিওন গাড়ি চালিয়ে রাতের রাস্তায় বেরিয়ে গেল।পেছনে রয়ে গেল পরিবারের ভালোবাসায় সাজানো তার জন্মদিনের রাত।রয়ে গেল একটি কেক। রয়ে গেল মায়ার হাতে ধরা ছোট্ট একটি উপহার।আর সামনে এগিয়ে চলল লিওন—এক অজানা রাতের দিকে। যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে হিয়া। আর হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তটাও।
শহরের অন্য প্রান্তে তখন রাত আরও গভীর হয়ে উঠেছে। নির্জন সেই টাউন হাউসের একটি সাজানো কক্ষের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তৈরি হচ্ছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডের ক্রিমিনাল নারী। তার পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল ইভানা। আজকের রাতের জন্য সম্রাজ্ঞীর সাজে ছিল অদ্ভুত একটা পরিবর্তন।
তার পরনে ছিল কালো লেদার প্যান্ট। তার সঙ্গে হোয়াইট রঙের একটি স্টাইলিশ শার্ট, যার গলার চারপাশে চওড়া কাপড়ের ব্যান্ডের মতো নেক-ব্যান্ড পেঁচানো।
প্রতিদিনের সেই চেনা কালো পোশাক নয়।

রক্তের মতো গাঢ় লালও নয়। আজকের সাজে ছিল কালো আর সাদার মিশেল। ইভানা কিছুক্ষণ নিজের মিস্ট্রেসের দিকে তাকিয়ে থেকে অবাক গলায় বলল,
“মিস্ট্রেস, আপনি আজকে সাদা পরেছেন?”
আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়েই মৃদু হাসল অন্ধকারের সম্রাজ্ঞী।
“আমি সবসময় কালো রঙের ড্রেস পরি।”
তার আঙুল ধীরে ধীরে শার্টের হাতার ওপর বুলিয়ে গেল।
“কারণ কালোটা আমার অন্ধকার দিক।”
ইভানা চুপ করে শুনছিল।
হিয়া এবার আয়না থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিজের পোশাকের দিকে তাকাল।
“আর সবসময় ডার্ক রেড পরি।”
কণ্ঠটা একটু নিচু হলো তার।
“ওটা র/ক্তের রং।”

কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল ঘরটা। তারপর সেই দুর্ধর্ষ অপরাধিনীর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক টুকরো কোমল হাসি।
“কিন্তু লিওনকে আমি আমার অন্ধকারের নক্ষত্রের আলো হিসেবে চাই।”
ইভানার চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠল।
হিয়ার চোখ তখনও আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে স্থির।
“তাই ওর সামনে আমার ডার্ক সাইডটা আজ একটু আড়ালে রাখতে চাই।”
কথাটা বলার সময় তার চোখে যে কোমলতা ফুটে উঠল, সেই কোমলতা এই নারীটির সঙ্গে খুব কমই মানায়।যে নারীকে পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড রক্ত, ভয় আর ক্ষমতার নামে চেনে—আজ সেই নারীই একজন মানুষের সামনে নিজের অন্ধকারটুকু লুকিয়ে রাখতে চাইছে।
ইভানা আর কোনো প্রশ্ন করল না। শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে রইল তার পাশে। হিয়া শেষবারের মতো আয়নায় নিজের সাজটা দেখে নিল। চুল ঠিক করল।
তারপর টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা হাতে তুলে নিল।
একটি নম্বরে কল করল। রিং হওয়ার সাথে সাথেই ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো।
দুর্ধর্ষ নারীর কণ্ঠ সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল। আবার ফিরে এলো সেই পরিচিত দৃঢ়তা।

“সব রেডি?”
ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
“রেডি।”
ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটল তার।
“গুড।”
কল কেটে ফোনটা হাতে নিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো হিয়া। বাইরে হেলিপ্যাডে তার জন্য চপার প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে চপারের ব্লেডের ঘূর্ণনের শব্দ।
সম্রাজ্ঞী ধীর পায়ে হেলিপ্যাডের দিকে এগিয়ে গেল।
চপারের দরজা খুলে দেওয়া হলো। সে ভেতরে উঠে বসল। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। পরক্ষণেই ইঞ্জিনের গর্জন রাতের নীরবতা ভেঙে দিল। চপারের ব্লেড দ্রুত ঘুরতে শুরু করল। হেলিপ্যাডের চারপাশের বাতাস তীব্র হয়ে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে মাটি ছেড়ে আকাশের দিকে উঠে গেল চপার। নিচে পড়ে রইল শহরের অসংখ্য আলো। উঁচুতে উঠতে উঠতে জানালার পাশে বসে থাকা সেই দুর্ধর্ষ অপরাধিনী নিচের শহরের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে তখন রয়েছে নিশ্চয়তা।
আজকের রাতটা সে অনেক আগেই নিজের মতো করে সাজিয়ে রেখেছে।আর সেই রাতের কেন্দ্রে রয়েছে একজন মানুষ—লিওন।

অন্যদিকে—
লিওনের গাড়িও তখন টাওয়ার ব্রিজের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। রাস্তার দুই পাশে জ্বলতে থাকা আলো দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছে। স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে আছে তার হাত।চোখ সামনে স্থির। কবজির ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে। সময় ফুরিয়ে আসছে। টাওয়ার ব্রিজ এখন আর খুব বেশি দূরে নয়।
একদিকে রাতের আকাশ চিরে এগিয়ে আসছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্রাজ্ঞীর চপার। অন্যদিকে শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে গন্তব্যের দিকে ছুটে যাচ্ছে সিআইডি অফিসার লিওনের গাড়ি।
দুজনের গন্তব্য একই। একই রাত। একই সেতু।
কিন্তু উদ্দেশ্য আলাদা।আর তারা কেউই তখনও জানে না—টাওয়ার ব্রিজের সেই রাত তাদের দুজনের জীবনকে কোন দিকে নিয়ে যাবে।

অবশেষে রাত বারোটা বাজতে আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি থাকতে টাওয়ার ব্রিজে এসে পৌঁছাল লিওন।
গাড়ির গতি ধীরে ধীরে কমে এলো। ব্রিজের মাঝামাঝি এসে গাড়িটা থামিয়ে দিল সে। কিন্তু ইঞ্জিন বন্ধ করার আগেই লিওনের ভ্রু কুঁচকে গেল।
কিছু একটা ঠিক নেই।
সাধারণত থেমস নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা টাওয়ার ব্রিজ কখনোই এতটা নিস্তব্ধ থাকে না। রাত যত গভীরই হোক, সেতুর ওপর দিয়ে গাড়ি চলে, মানুষ থাকে, দূরের আলোয় শহরের ব্যস্ততার ছাপ দেখা যায়।
কিন্তু আজ—পুরো ব্রিজ যেন হঠাৎ জনশূন্য হয়ে গেছে।
কোথাও কোনো মানুষ নেই। কোনো গাড়ি নেই। দূরে কোনো হেডলাইটও দেখা যাচ্ছে না। লিওন গাড়ি থেকে নেমে এলো। কিছুক্ষণ চারপাশে সতর্ক চোখে তাকিয়ে রইল সে। তারপর ধীরে ধীরে আরও কয়েক পা সামনে এগিয়ে গেল। আর তখনই তার দৃষ্টি থেমে গেল।
ব্রিজের মাঝখানের বিশাল অংশটা যেন অন্য এক জগতে পরিণত হয়েছে। চারপাশটা সাজানো হয়েছে অসংখ্য আলো আর ফুল দিয়ে। এক পাশে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুটি বিলাসবহুল গাড়ি। অন্য পাশে একটি বড় ট্রাক। আর তার একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল লাইটিং সেটআপে ঝলমল করছে দুটি সংখ্যা—

লিওন স্থির চোখে সংখ্যাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে চারপাশে চোখ বুলাল।
কী হচ্ছে এখানে? কে এই আয়োজন করেছে?
আর কেনই বা পুরো ব্রিজটা খালি করে রাখা হয়েছে?
কঠোর সিআইডি অফিসারের প্রশিক্ষিত মন মুহূর্তেই সম্ভাবনাগুলো খুঁজতে শুরু করল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার সব চিন্তা থেমে গেল। আকাশ থেকে হঠাৎ ঝরে পড়ল ফুল। অসংখ্য সাদা আর লাল গোলাপ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে নেমে এলো তার মাথার ওপর।
দুর্ধর্ষ সেই নারী আজ তার শখের পুরুষের ওপর ফুলের বৃষ্টি বর্ষণ করছে। লিওন চমকে মাথা তুলে তাকাল।
অন্ধকার আকাশে ভেসে আছে একটি চপার। তার ঘূর্ণায়মান পাখার বাতাসে আকাশ থেকে ঝরে পড়া ফুলের পাপড়িগুলো উড়ে এসে পড়ছে লিওনের কাঁধে, চুলে, পোশাকে।
একজন মানুষ, যে প্রতিদিন অপরাধীদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত—আজ দাঁড়িয়ে আছে ফুলের বৃষ্টির নিচে।
আর সেই ফুলের প্রতিটি পাপড়ির পেছনে রয়েছে এমন একজন নারী, যার পৃথিবীতে ভালোবাসা আর বিপদ কখনো আলাদা হয়ে আসে না।
চপারটি ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর ব্রিজের ওপর নির্দিষ্ট স্থানে অবতরণ করল হেলিকপ্টারটি।
দরজা খুলে গেল। আর সেখান থেকে নেমে এলো আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্রাজ্ঞী।
হিয়া।

আজকের রাতের জন্য তাকে সামান্য সাজিয়ে দিয়েছে ইভানা। বের হওয়ার আগে এতটা সাজতে তার নিজের কোনো ইচ্ছাই ছিল না, কিন্তু ইভানার জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত রাজি হতে হয়েছে।
কালো লেদার প্যান্টের সঙ্গে হোয়াইট শার্ট। গলার চারপাশে পেঁচানো চওড়া কাপড়ের নেক-ব্যান্ড।
সাজটা খুব বেশি নয়। তবু রাতের আলোয় তাকে দেখে মনে হচ্ছে, অন্ধকারের রাজ্য থেকে উঠে আসা কোনো নারী আজ নিজের হাতে আলো ছুঁতে এসেছে।
হিয়া ধীরে ধীরে লিওনের দিকে এগিয়ে এলো।
লিওন তখনও তার দিকে তাকিয়ে। তার চোখে বিস্ময়।
কথা বলার মতো কোনো শব্দ যেন মুহূর্তের জন্য খুঁজে পাচ্ছে না সে। কবজির ঘড়িতে তখন রাত ১১টা ৫৯ মিনিট। আর মাত্র এক মিনিট।
হিয়া নিজের ঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর আবার তাকাল লিওনের দিকে। সময় যেন সেই মুহূর্তটাকে একটু দীর্ঘ করে দিল।

আর তারপর—বারোটা বাজল।
ঠিক সেই মুহূর্তে থেমস নদীর ওপরের আকাশে একসঙ্গে জ্বলে উঠল অসংখ্য আলো। লিওন আবার আকাশের দিকে তাকাল।
একটি নয়।
দুটি নয়।
প্রায় পাঁচশো ড্রোন একসঙ্গে রাতের আকাশে নিজেদের অবস্থান বদলাতে শুরু করল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অন্ধকার আকাশ জুড়ে ফুটে উঠল বিশাল অক্ষরে—
HAPPY BIRTHDAY DILBAR
লিওন নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। তার কঠোর চোখের গভীরে ধীরে ধীরে বিস্ময়ের সঙ্গে অন্য এক অনুভূতি জমতে শুরু করল। কেউ তার জন্মদিনকে এভাবে মনে রেখেছে। এভাবে সাজিয়েছে। এভাবে অপেক্ষা করেছে।
আর সেই মানুষটি—তার জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক নারী।
হিয়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে লিওনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে তৃপ্তির নরম ছায়া। আজ সে কোনো শহর দখল করতে আসেনি। কোনো শত্রুর রক্ত চাইতে আসেনি। আজ আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্রাজ্ঞীর একমাত্র উদ্দেশ্য—তার শখের পুরুষটির মুখে বিস্ময় দেখতে পাওয়া।লিওনের দৃষ্টি তখনও আকাশে। ঠিক সেই সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি গাড়ির পেছনের অংশ ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে শুরু করল। লিওনের চোখ এবার সেদিকে গেল। প্রথম গাড়ির পেছনের খোলা বুট থেকে ধীরে ধীরে প্রকাশ পেল জন্মদিনের বিশেষ সাজ। আলো, ফুল আর নানা রকম ডেকোরেশনে ভরা পুরো একটি সেটআপ।

আর দ্বিতীয় গাড়ির বিশাল পেছনের কার্গো কম্পার্টমেন্ট খুলতেই দৃশ্যটা আরও বিস্ময়কর হয়ে উঠল। ভেতরে বিশেষভাবে তৈরি স্ট্যান্ডের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বিশাল একটি জন্মদিনের কেক—প্রায় নয় ফুট উঁচু। লিওন কয়েক মুহূর্ত কেকটির দিকে তাকিয়ে রইল।
এত বড় কেক সে তার কোনো জন্মদিনে কখনো দেখেছে কি না, মনে করতে পারল না। তার পাশেই থাকা ট্রাকটির পেছনের দরজাও তখন খুলে গেল।
ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো একটি বিশাল সাদা গোলাপের তোড়া। এত বড় যে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
শত শত সাদা গোলাপ একসঙ্গে সাজানো সেই বিশাল তোড়াটাকে দেখে লিওনের দৃষ্টি আবার থেমে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে সে ফিরে তাকাল হিয়ার দিকে।
দুজনের চোখ এক হলো। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। রাতের আকাশে তখনও জ্বলছে—HAPPY BIRTHDAY DILBAR
থেমসের কালো জলের ওপর ড্রোনের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। চারপাশে ছড়িয়ে আছে গোলাপের পাপড়ি।আর সেই রাতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন কঠোর সিআইডি অফিসার—তার সামনে আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুর্ধষ ক্রিমিনাল।
যে নারী হাজার মানুষের কাছে ভয়ের নাম, সে আজ শুধু একজন মানুষের জন্মদিনকে সুন্দর করে তুলতেই নিজের সমস্ত আড়ম্বর উজাড় করে দিয়েছে ।নিজের অন্ধকার পৃথিবী থেকে একটু আলো চুরি করে এনেছে—তার শখের পুরুষের জন্য।

হিয়া ধীরে ধীরে লিওনের দিকে এগিয়ে এলো। লিওনের দৃষ্টি তখন তার ওপরই স্থির। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই দুর্ধর্ষ নারীকে সে কতবার দেখেছে—অন্ধকার পোশাকে, কালো হুডিতে। হিয়ার সঙ্গে কালো রংটাই যেন সবচেয়ে বেশি মানিয়ে যায়। কিন্তু আজকের হিয়া যেন তার চেনা সেই নারীটির থেকে একটু আলাদা।
কালো লেদার প্যান্টের সঙ্গে হোয়াইট শার্ট। গলার কাছে পেঁচানো চওড়া নেক-ব্যান্ড। শার্টের দুটো বোতাম খোলা।আজ তাকে দেখে লিওনের চোখ কয়েক মুহূর্তের জন্য আটকে গেল।সে নিজেও বুঝতে পারল না কেন এতক্ষণ তাকিয়ে আছে। তারপর হঠাৎই চোখ গিয়ে থামল হিয়ার গলার কাছে। লিওনের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল।
হুডির আড়ালে এতদিন যে লকেটটা প্রায় সবসময়ই ঢাকা থাকত, আজ সেটাই স্পষ্ট হয়ে আছে। একটি বুলেটের লকেট। সেই বুলেট। যেটা একদিন লিওনের বন্দুক থেকে ছুটে গিয়েছিল।
যে গুলির চিহ্ন হিয়ার শরীরে আজও রয়ে গেছে, সেই গুলিটাই সে লকেট বানিয়ে গলায় পরে আছে।লিওনের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন থেমে গেল।কিন্তু বিস্ময় তখনও শেষ হয়নি।লকেটের নিচে, শার্টের খোলা অংশের ফাঁক দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আরেকটি জিনিস।হিয়ার শরীরে থাকা সেই গুলির ক্ষতচিহ্নের কাছেই ট্যাটু করা তার নাম।
LEON
তার নাম।

সেই জায়গায়, যেখানে একদিন তার ছোড়া গুলি আঘাত করেছিল। লিওনের চোখ কয়েক মুহূর্ত সেই ট্যাটুর ওপর স্থির হয়ে রইল। সে জানত না, কীভাবে এতটা অদ্ভুতভাবে একটা মানুষ তার জীবনের সঙ্গে নিজের অন্ধকারকে জড়িয়ে রাখতে পারে।
হিয়া তখনও তার দিকে তাকিয়ে।লিওনের চোখের পরিবর্তনটা তার নজর এড়াল না। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল সেই পরিচিত দুষ্টু হাসি। তারপর একেবারে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“হ্যাপি বার্থডে, বাজপাখি।”
লিওন কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি এখনও হিয়ার গলার কাছে।হিয়া চারপাশে একবার তাকাল।
আকাশে জ্বলছে—HAPPY BIRTHDAY DILBAR
চারপাশে ছড়িয়ে থাকা গোলাপের পাপড়ি।
নয় ফুট উঁচু জন্মদিনের কেক।
আর মানুষের উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে যাওয়া বিশাল সাদা গোলাপের তোড়া। সবকিছুর দিকে ইঙ্গিত করে হিয়া ভ্রু একটু উঁচু করল।

“এই ডেকোরেশন তোমার কেমন লেগেছে?”
একটু থেমে তার মুখের দিকে তাকিয়ে যোগ করল,
“কম হয়ে গেছে?”
লিওন এবার তার চোখের দিকে তাকাল।
হিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে আবার বলল,“ভালো লাগেনি?”
তার কণ্ঠে ছিল অভিমান মেশানো খুনসুটি।
যেন কয়েক মুহূর্ত আগেও যে নারী পুরো শহরকে নিজের ইচ্ছেমতো থামিয়ে দিতে পারে, সে এখন শুধু একজন মানুষের কাছ থেকে নিজের আয়োজনের প্রশংসা শুনতে চাইছে। আর সেই মানুষটি—তার সামনে দাঁড়িয়ে এখনও নীরবে তাকিয়ে আছে।
তার চোখে প্রথমবারের মতো হিয়াকে নিয়ে এমন এক অনুভূতি ফুটে উঠেছে, যার নাম সে নিজেও হয়তো এখনও দিতে পারেনি।

হিয়ার ঠোঁটে তখনও সেই হালকা হাসিটা লেগে ছিল, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লিওনের চোখ কয়েক মুহূর্ত আগের আয়োজনের বিস্ময় থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে স্থির হলো সেই নারীর মুখে। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পড়ে গেল গতকালের ঘটনা—সিআইডি হেডকোয়ার্টারে রাখা সেই বোমা, যেটা দানিয়েল সেখানে ফিট করে রেখে গেছে। দানিয়েল হিয়ারই টিমের একজন; তার মানে এই পরিকল্পনার কথা হিয়ার অজানা থাকার কথা নয়। নিজের ভেতরেই সমস্ত হিসাবটা মিলিয়ে নিতে লিওনের এক মুহূর্তও লাগল না, আর সেই উপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গেই তার চোখের বিস্ময় মুছে গিয়ে সেখানে জমাট বাঁধল কঠিন ঘৃণা।
কয়েক মুহূর্ত আগেও যে চোখ ফুলের বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এই নারীটির দিকে তাকিয়ে ছিল, সেই চোখেই এবার আর কোনো কোমলতা রইল না।
লিওনের কণ্ঠ নেমে এলো ঠান্ডা, কঠিন স্বরে—
“আই হেইট ইউ।”
হিয়ার ঠোঁটের কোণে থাকা হাসিটা থেমে গেল। লিওন আর এক মুহূর্তও নিজেকে সামলে রাখল না।
“তোমার এই ডেকোরেশন দেখে আমার ডিজগাস্টিং লাগছে। তুমি কীভাবে ভেবেছ, সিআইডি হেডকোয়ার্টারে বোমা ফিট করে পুরো হেডকোয়ার্টার উড়িয়ে দেবে?”

তার চোখে তখন শুধু রাগ নয়, নিজের দায়িত্বের প্রতি সেই অটুট দৃঢ়তাও স্পষ্ট।
“তুমি একটা কথা মনে রেখো, হিয়া—সিআইডি অফিসার লিওনার্দো কখনো হারে না। যতক্ষণ আমি জীবিত আছি, তোমার মতো কোনো অপরাধী কিংবা দানিয়েলের মতো অপরাধীর কাছে আমি হারব না।”
কথাগুলো আঘাতের মতো গিয়ে লাগল হিয়ার মনে, কিন্তু আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্রাজ্ঞী নিজের মুখে তার কোনো প্রকাশ হতে দিল না। কয়েক সেকেন্ড লিওনের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে সে যেন ইচ্ছা করেই কথার দিকটা বদলে দিল।
“দেরি হচ্ছে, দিলবার। কেকটা কাটো।”
লিওনের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের ক্ষীণ রেখা ফুটে উঠল।
“সরি, তুমি ভেবেছ আমি তোমার সঙ্গে কেক কাটব?”
এই কথাটুকুই যথেষ্ট ছিল।
হিয়ার চোখের ভেতর মুহূর্তের মধ্যে রাগের আগুন জ্বলে উঠল। কেকের পাশে রাখা কেক কাটার ছুরিটা সে তুলে নিয়ে এক ঝটকায় লিওনের সামনে এসে দাঁড়াল, তারপর ধারালো ছু/রিটার ফলাটা লিওনের বুকের কাছে এমনভাবে চেপে ধরল যেন আর সামান্য চাপ বাড়ালেই সেটা তার শরীর ভেদ করে যাবে।
হিয়ার চোখে তখন রাগ, অভিমান আর জেদের মিশেল। “লাস্ট বার জিজ্ঞেস করছি।”
তার কণ্ঠ নিচু, অথচ প্রতিটি শব্দে হুমকি স্পষ্ট।
“আমি এক কথা দুবার রিপিট করি না। তুমি কেক কাটবে, নাকি না?”
লিওনের চোখ একবার ছুরিটার দিকে গেল, তারপর আবার স্থির হলো হিয়ার চোখে।

“মেরে ফেললেও না।”
উত্তরটা শুনে হিয়ার চোখের আগুন আরও তীব্র হয়ে উঠল। পরের মুহূর্তেই সে ছুরিটা নিজের গলার কাছে তুলে ধরল।
“এবারও কাটবে না?”
লিওনের মুখের কঠোরতা মুহূর্তেই বদলে গেল।
“হিয়া—”
কিন্তু সে থামল না। ছুরির ধার নিজের গলার চামড়ায় সামান্য চেপে ধরতেই সেখানে সরু একটা দাগ ফুটে উঠল, তারপর সেই দাগ বেয়ে বেরিয়ে এলো অল্প একটু রক্ত।লিওন স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। সে এই নারীকে চেনে।
হিয়ার জেদ কতটা গভীর, তার সীমা কোথায়, আর নিজের সিদ্ধান্তে সে কতটা বেপরোয়া হতে পারে—এসব লিওনের অজানা নয়। তাই তার চোখের দিকে তাকিয়ে লিওন বুঝতে পারল, এটা শুধু ভয় দেখানো নয়; হিয়া সত্যিই নিজের গলায় ছু*রি চালিয়ে দিতে পারে।
তার বুকের ভেতর অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল। শেষ পর্যন্ত সে ধীরে ধীরে বলল,

“ওকে।”
হিয়ার চোখ স্থির হলো তার মুখে।
“কাটব।”
এক মুহূর্তেই হিয়া নিজের গলা থেকে ছুরিটা সরিয়ে নিল। তারপর টেবিল থেকে আরেকটি ছুরি তুলে লিওনের হাতে দিয়ে বলল,“তাহলে কাটো।”
লিওন ছু*রিটা হাতে নিল।
তার চোখে তখনও বিরক্তি, রাগ আর অনিচ্ছা স্পষ্ট; তবু হিয়ার পাগলামির সামনে আর কোনো উপায় না দেখে সে ধীরে ধীরে কেকের দিকে এগিয়ে গেল এবং ছুরিটা বিশাল কেকটির ওপর চালিয়ে দিল।
জন্মদিনের কেক কাটা হলো।কিন্তু হিয়ার চোখ তখন কেকের দিকে নেই। সে তাকিয়ে আছে লিওনের মুখের দিকে।আর সেই দৃষ্টি হঠাৎ থেমে গেল। আজকের লিওনের চোখ অন্যরকম। অন্যদিনের চেয়েও বেশি কঠিন, বেশি ঠান্ডা; তার চোখের গভীরে যে ঘৃণা জমে আছে, আজ সেটাও যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
হিয়ার বুকের কোথাও যেন অকারণে একটা চাপ অনুভূত হলো। সে আর অপেক্ষা করল না। কোনো কথা না বলে ঘুরে দাঁড়াল এবং সোজা চপারের দিকে এগিয়ে গেল।
চপারের দরজা বন্ধ হলো, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ইঞ্জিনের গর্জন রাতের নীরবতা কাঁপিয়ে দিল, আর তারপর ধীরে ধীরে মাটি ছেড়ে আকাশের দিকে উঠে গেল হেলিকপ্টারটি।
লিওন দাঁড়িয়ে রইল সেখানেই।চোখের সামনে থেকে চপারটা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে, অথচ অদ্ভুতভাবে তার বুকের ভেতর একটা অস্বস্তি থেকে গেল।
কেন?
সে নিজেও জানে না।

সত্যি বলতে, পৃথিবীর কোনো নারী কখনো কারো জন্মদিনের জন্য এমন কিছু করেছে কি না, সেটাও তার জানা নেই।
তার জন্য পুরো একটা ব্রিজ জনশূন্য করে, আকাশজুড়ে পাঁচশো ড্রোন দিয়ে তার জন্য শুভেচ্ছা লিখে, তার মাথার ওপর ফুলের বৃষ্টি বর্ষণ করে, নয় ফুটের কেক আর মানুষের উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে যাওয়া সাদা গোলাপের তোড়া এনে জন্মদিন পালন করলো এক দুর্ধষ অপরাধী নারী।
আর সেই নারীটি হলো এমন একজন, যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে তার নিজের পেশা, তার দায়িত্ব, তার বিবেক।
তবু হিয়া চলে যাওয়ার পর এই বিশাল ব্রিজটাকেই কেন যেন তার কাছে একটু বেশি ফাঁকা লাগছে।
হঠাৎ আকাশের বুক চিরে আবার একটি সোনালী ছায়া নেমে এলো। লিওন মাথা তুলে তাকাল।
শ্যাডো।
হিয়ার সেই সোনালী ঈগলটি ধীরে ধীরে নিচে নেমে এসে তার সামনে দাঁড়াল। লিওনের দৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গেই চলে গেল তার পায়ের দিকে।সেখানে বাঁধা রয়েছে একটি নীল ফিতে।আর সেই ফিতার সঙ্গে ঝুলছে ছোট্ট একটি বক্স।
লিওন কয়েক মুহূর্ত বক্সটার দিকে তাকিয়ে থেকে সেটা খুলে নিল।ঢাকনা উঠতেই ভেতরে থাকা জিনিসটা দেখে তার চোখ থেমে গেল।
একটি বিলাসবহুল হ্যান্ডওয়াচ।

নিখুঁত কারুকাজে তৈরি ঘড়িটা রাতের আলোয় ঝলমল করছে। নকশাটার মধ্যে এমন একটা আভিজাত্য রয়েছে, যা দেখলেই বোঝা যায়—এটা সাধারণ কোনো দোকান থেকে কিনে আনা উপহার নয়।
লিওন কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ যেন বিরক্ত হয়ে ঘড়িটা নদীর দিকে ছুড়ে ফেলার জন্য হাত বাড়াল।কিন্তু শেষ মুহূর্তে থেমে গেল।
কী কারণে থামল, সে নিজেও জানে না।কয়েক সেকেন্ড ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত সেটাকে নিজের পকেটে রেখে দিল।
লিওন তখনও জানে না, তার পকেটে রাখা সেই ঘড়িটির ডায়ালে বসানো আছে পৃথিবীর অন্যতম বিরল হীরা—ব্লু স্টার ডায়মন্ড।

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৮

সে জানে না, পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ রত্নগুলোর একটি দিয়ে তৈরি সেই ঘড়িটি কোনো সাধারণ উপহার নয়।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই দুর্ধর্ষ সম্রাজ্ঞী নিজের শখের পুরুষটির জন্য এমন একটি ঘড়ি তৈরি করিয়েছে, যার অস্তিত্বই হবে একমাত্র—কারণ পৃথিবীর আর কোনো মানুষের হাতে এমন ঘড়ি উঠবে না।
শুধু একজনের জন্য তৈরি হয়েছে সেটি।
তার শখের পুরুষ—লিওনের জন্য।

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here