Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎”বইন তুই নিশ্চিত বড়সড় কোনো পাপ করেছিল,নয়তো আমার ভাইয়ের মতো বর তোর কপালে কেমনে জুটে?”
‎হতাশ গলায় বলল ইশতিয়াক। মুগ্ধাও মুখ বেজার করল,
‎”তুই তো আগে থেকে একটু সতর্ক করতে পারতিস”
‎”আহা! কি কথা! নাচতে নাচতে বিয়ে করতে চলে গেলি, আমার কাছে শুনেছিলি একবারও?”
‎”তখন তোর ভাইয়ের চেহারা দেখে আমার আবেগ কাজ করছিল, বিবেক ঘুমাই গেছিল রে”
‎ইশতিয়াক বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টালো। ওভাবেই বলল,
‎” এখন ঐ আবেগ আর ভাইয়ের চেহারা বেঁচে মুড়ি খা বেড়ি , আমার আর চাচু ডাক শোনা হলো না”
‎শেষের কথাটা ইশতিয়াক এত আফসোসে বলল যেন তার জীবনে একটাই লক্ষ্য চাচু ডাক শোনা।
‎মুগ্ধা কিঞ্চিত রেগে উঠল। কনুই দিয়ে চুপিসারে গুতো মারল ইশতিয়াক এর ঘাড়ে। মুখে বলল,
‎”ছাগলের বাচ্চা ভালো হয়ে যা ”
‎”হু বড় আইছে ভালো হ বলতে ”

‎পড়তে বসে ওদের এমন গুজুর গুজুর সহ্য হলো না রহিমা খাতুনের। সম্পর্কে ইশতিয়াক এর পো-দাদি অর্থাৎ দাদির শাশুড়ি। তিনি ধাপে ধাপে পা ফেলে এগিয়ে এলো ওদের দিকে। মুগ্ধাকে কুচুটি স্বরে বললেন,
‎”স্বামীর ভাইয়ের সাথে এত গুজুর গুজুর করিস কেন?”
‎খারাপ ইঙ্গিত টের পেয়ে মুগ্ধার মুখ মুহুর্তেই অন্ধকার হয়ে গেল। মাথা নিচু করে ফেলল সে। তবে দমল না ইশতিয়াক। সে পাল্টা স্বরে বলল,
‎”তাতে তোর এত জ্বলে কেন বুড়ি?”

‎রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন ইশতিয়াকের মা ইন্তিয়া পারভীন। বললেন,
‎”ভদ্র ভাবে কথা বল ইশতিয়াক, তোর দাদি হয়”
‎”তোমার দাদিশাশুড়িকেও বলবা আমার সাথে ঠিক ভাবে কথা বলতে..”
‎একটু ভেবে বলল,
‎”আমার সাথে ওনাকে কথা বলতেই মানা করবা,কুচুটে বুড়ি একটা”
‎রহিমা খাতুন তেতে উঠলেন। একটা চেয়ারে বসতে বসতে বললেন,
‎”হ উচিত কথার ভাত নাই, কোনদিন শুনব এরা দুজন পরকীয়া করে ভেগে গেছে, তুমি তখন কাইন্দো বসে ইন্তিয়া”
‎ইন্তিয়া শুনলেন। বড্ড বিচ্ছিরি এই লোকের ভাষা। ইন্তিয়া জীভ কেটে তওবা পড়েন। রহিমার কথা খারাপ লাগলেও ইন্তিয়া কিছু বলতে পারেন না ‌ দাদিশাশুড়ি তার উপর বৃদ্ধা‌। কিছু বলতে গিয়েও পারেন না। তবে ইশতিয়াক কি এসবের ধার ধারে?
‎সে আঙুল উঁচিয়ে বলল,
‎”ভদ্র ভাবে কথা বল বুড়ি, এক পা একালে আরেক পা সেকালে,এখনো এই কুচুটিপানা, তাইলে আমার দাদিটারে কি পরিমান জ্বালায়ছিলি তুই!”

‎বৃদ্ধা রহিমা ও দমলেন না। পাল্টা বললেন,
‎”তোরা পরকীয়া করতে পার আমি বলতে পারুম না, আসুক আজ বড় নাতি,আমি বলব ওরে ”
‎মুগ্ধা মাথা নিচু করে বসে আছে। চোখ দিয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। ইশতিয়াক তা দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। রহিমা যদি ওর সমবয়সী হতো চুলটুল ছিঁড়ে দিতো বোধ হয়। এমন তার দৃষ্টি। চোখে মুখে রাগের তাপ বাড়ছে। বলল,
‎”তোরে আগেও বলেছি এখন আবার বলছি, তোর নাতবউ হওয়ার আগে থেকে ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল, আমার বোন হয় সে, তার আমার বিষয়ে একটা বাজে কথা বললে চুল টেনে ছিঁড়ে নিব”

‎ইন্তিয়া এগিয়ে আসলেন। রহিমা কিছু বলতে গেলে উনি বললেন,
‎”দাদি আপনি একটু বাগান থেকে হেঁটে আসুন, ডাক্তার আপনাকে হাঁটাহাঁটি করতে বলেছে”
‎”হ্যাঁ তা তো এখন বলবা, তোমার ছেলের বৌয়ের নামে বলেছি না? তোমার তো জ্বলবেই”
‎ইন্তিয়া থেমে গেলেন। এইজন্যই তিনি কিছু বলতে চান না।
‎উপায় না পেয়ে তিনি মুগ্ধাকে বললেন,
‎”মুগ্ধা আম্মু তুমি ঘরে গিয়ে পড়, ইখতিয়ার আসলে ওর সাথে নিচে এসো,ইশতিয়াক তুই ও তোর ঘরে যা”
‎মুগ্ধা ইন্তিয়ার কথা শোনামাত্র সবকিছু গুছিয়ে দৌড় দিল। কিন্তু ইশতিয়াক যাওয়ার আগে রহিমাকে শাসিয়ে গেল,
‎”তোর বুড়ি জাহান্নামেও জায়গা হবে না, দেখে নিস”

‎মুগ্ধা সিঁড়ি ভেঙে দৌড়ে নিজের ঘরে এলো। নিজের? উহু ইখতিয়ার এর ঘরে। দরজা লাগিয়ে বসল বিছানায়। বিছানার সোজা সামনে বরাবর আয়না রাখা। পুরো বিছানাটাই তার মধ্যে দেখা যায়। মুগ্ধা আয়নায় নিজেকে দেখল। লাল সাদা একটা গাউন তার শরীরে। মাথায় ওড়না দেওয়া। চুলগুলো ছাড়া। চোখের কোণে পানির ঝিলিক। এ বাড়িতে দুটো মানুষ বাদে আর প্রত্যেকে মুগ্ধাকে ভালোবাসে। ভীষণ রকম ভালোবাসে। এইতো ইন্তিয়া মানে তার শাশুড়িমা তাকে একটাও কাজ করতে দেন না। পরিক্ষার সময় খুব যত্ন করে নিজহাতে খাইয়ে দেন। ইসরায়েল শেখ মানে তার শশুর নিজের মতো ভালোবাসে। কোথাও গেলে মুগ্ধার জন্য খাবার আনেন। শুক্রবারে মসজিদের জিলাপি ও বাদ যায় না।
‎তার ছোট চাচাশ্বশুর ইসরাফিল শেখ ও প্রচুর যত্ন করেন। আম্মা ছাড়া ডাকেন। চাচিশাশুড়ি রাফেয়া ও ভালোবাসেন। শুধু দুটো মানুষ ই পছন্দ করে না। এক রহিমা খাতুন আরেকজন তার অতি আপন মানুষ,যার জন্য এখানে এসেছে। শেখ ইখতিয়ার আহমেদ।

‎বেলা চারটা। অপরাহ্ন। সূর্যের ঈষৎ লাল আভায় মুখোরিত চারিপাশ। সূর্য তখন পশ্চিমাকাশের শেষপ্রান্তে। আবহাওয়া বেজায় গরম। কারেন্ট আসে আর যায়। মুগ্ধা অতিরিক্ত বিরক্ত। বেলকনিতে এসে দাঁড়ালো সে। চুলগুলো উঁচু করে মাথার উপরে ক্লিপ দিয়ে আটকানো। মুখ ঘেমে তেলতেলে অবস্থা। বেলকনিতে রাখা বেঞ্চে বসল সে। ফুলের টবগুলো কেমন নেতিয়ে পড়েছে। মায়া হলো মুগ্ধার । দৌড়াল রুম আ্যটার্চড ওয়াসরুমে। আগে মুখে একটু ফ্রেশওয়াস করল। মুগ্ধার স্কীন ঘামলে এলার্জি মতো হয়। চুলকায় । মুখ ধুয়ে বালতিতে পানি ভরে আবার বেলকনিতে গেল। আধো মরা গাছগুলোতে পানি ঢালল। গাছগুলো পুলকিত হলো যেন। শীতল বাতাসে নড়ে উঠলো।
‎মুগ্ধাও কিছুটা নড়েচড়ে উঠলো। মুখে পানি দেওয়ার দরুন বাতাস লাগলে শিরশির করে উঠছে মুখে।
‎মুগ্ধা বালতি রেখে এলো। বই নিলো। বেলকনিতে পায়চারি করতে করতে পড়ল। সামনে রিটেক আছে। আগের পরিক্ষায় ডাব্বা দিছে। এবার ভালো করতে হবে। মানসম্মানের কথা। ফোন বেজে উঠল মুগ্ধার। “ব্যাঙের বাচ্চা” লেখা। বিরক্ত হয়ে ফোন কানে ধরল মুগ্ধা। ইশতিয়াক চেঁচিয়ে উঠলো,
‎”বা* এতো সময় লাগে ফোন ধরতে”
‎মুগ্ধা বিরক্ত গলায় বলে,

‎”একই বাড়িতে, পাশাপাশি রুমে ফোন কে দেয়!”
‎ইশতিয়াক সোজা হয়ে শুলো। বলল,
‎”আমি দিই, সমস্যা?”
‎”তুই তো তারকাটা পাবলিক”
‎” এখন তো তারকাটা পাবলিক, এখন তোর লগে কথা বলতে তোর রুমে যাই,আর ঐ বুড়ি লিক লিক করুক”
‎মুগ্ধা সামনে বই ধরা অবস্থায় এক হাতে ফোন কানে চাপল। বেঞ্চে বসল ‌। বলল,
‎”এত কি কথা কইতে হইব তোর?”
‎”তোর বোনের নাম্বার দে, তাইলে আর তোরে জ্বালাব না”
‎”ছাগলের বাচ্চা, মুখ বন্ধ রাখ, নয়ত রুমে গিয়ে খু’ন করে দিয়ে আসব”
‎”মুখেই যতো বড় কথা!”

‎দরজা খোলার শব্দে সামনে তাকালো মুগ্ধা। সাদা শার্ট পরিহিত ইখতিয়ার রুমে ঢুকেছে। হাতা গোটানো। বুকের দিকের তিনটা বোতাম খোলা। বুকের লোমগুলো দৃশ্যমান। মাথার চুলগুলো এলোমেলো। ঘেমে নেয়ে গেছে ইখতিয়ার। মুগ্ধা দ্রুত ফোনে বলল,
‎”ফোন রাখ, আমার সোয়ামী আইছে”
‎ইশতিয়াক গায়ে মাখল না। উল্টো বলল,
‎”তাতে তোর কি ছেমড়ি, তোরে তো পাত্তা দেয়না ”
‎মুগ্ধা রেগে গেল। মৃদু চেঁচিয়ে বলল,
‎”ফোন রাখ ছাগলের বাচ্চা”
‎ইশতিয়াকের অপেক্ষা না করে দ্রুত ফোন কেটে দিল মুগ্ধা।
‎মুগ্ধা মাথায় ঘোমটা টেনে এগিয়ে গেল ইখতিয়ারের দিকে। কোমল কন্ঠে বলল,
‎”আসসালামুয়ালাইকুম ”
‎ইখতিয়ার থেমে থেমে উত্তর দিলো।,

‎”ওলায়কুম আসসালাম ”
‎মুগ্ধা উপযে বলল,
‎”পানি খাবেন দিব?”
‎ইখতিয়ার আলমারির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
‎”না,গোছল দিব”

‎মুগ্ধা কিছু বলল না। মুখ নিচু করে বিছানায় গিয়ে বসল। এটা নিত্যদিনের ঘটনা। তিনমাসের বিয়েতে এমন অবহেলা সে পেয়ে অভ্যাস্ত। অথচ প্রতিদিনই উপযে কথা বলে। চেষ্টা করে চুপচাপ, ইন্ট্রোভার্ট ছেলেটার বন্ধু হতে। কিন্তু ইখতিয়ার খুব যত্নে এড়িয়ে যায়। সুযোগ দেয় না মুগ্ধাকে।
‎ইখতিয়ার জামাকাপড় নিয়ে ওয়াসরুমে ঢুকতে যাবে, তৎক্ষণাৎ থেমে গেল সে। চোখ ফেলল মুগ্ধার দিকে। নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
‎”ঝিমার সাথে ঝামেলা হয়েছিল আজ?”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here