Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৫

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৫

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৫
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

বিশাল কলেজ ভবনের সামনে সকাল থেকেই যেন মানুষের ঢল নেমেছে। দূর থেকে তাকালে মনে হচ্ছে, ধূসর-সাদা রঙের বিশাল ভবনটা আজ কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপনা নয়—আজ সে শত শত স্বপ্ন, দুশ্চিন্তা আর ভবিষ্যতের হিসাব-নিকাশের সাক্ষী। কলেজের লম্বা করিডোরজুড়ে পরীক্ষার্থীদের আনাগোনা। কারও হাতে শেষ মুহূর্তের নোট, কেউ বইয়ের পাতায় চোখ রেখে বিড়বিড় করে পড়ছে, কেউ আবার বন্ধুর কাছে দাঁড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মিলিয়ে নিচ্ছে। কোথাও ফিসফাস, কোথাও উৎকণ্ঠার নিঃশ্বাস।
তিনতলার বিশাল পরীক্ষার হলটাও ততক্ষণে প্রায় পূর্ণ। সারি সারি কাঠের বেঞ্চ। প্রতিটি বেঞ্চে নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে বসানো হয়েছে পরীক্ষার্থীদের। জানালার ফাঁক দিয়ে সকালের আলো এসে মেঝের ওপর লম্বা লম্বা রেখা এঁকে দিয়েছে।

মুগ্ধার সিট পড়েছে একেবারে সামনের বেঞ্চে।
ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মুগ্ধার মুখটা এমন হয়ে গেল, যেন জীবনের সবচেয়ে বড় অন্যায়টা এইমাত্র তার সঙ্গে ঘটে গেছে। মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে সে। চোখের সামনে বিশাল একটা সাদা বোর্ড। বোর্ডের ঠিক সামনে শিক্ষকদের টেবিল। আর তার ঠিক কয়েক হাত দূরেই তার নিজের বেঞ্চ।
মুগ্ধা নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সবাই পেছনে বসবে, আর তার কপালে জুটল সামনের বেঞ্চ!

মনের ভেতর আফসোসটা এমনভাবে গজগজ করছে, যেন কেউ তার পরীক্ষার আগেই তাকে শাস্তি দিয়ে ফেলেছে। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকাল সে। তারপর আবার সামনে।
শেষমেশ নিজের কপালেই হাত ঠেকিয়ে বসে রইল।
ইশ! পেছনে বসলে অন্তত একটু আরাম করে বসা যেত। মুখ বাঁকিয়ে মনে মনে কথাটা বলেই আবার দরজার দিকে তাকাল। আর সেই তাকানোতেই যেন তার আসল অপেক্ষাটা ধরা পড়ে গেল।

পরীক্ষা শুরু হতে এখনো পুরো পনেরো মিনিট বাকি। স্যাররা ইতোমধ্যেই এসে গেছেন। একজন স্যার প্রশ্নপত্র গুছিয়ে রাখছেন, আরেকজন খাতাগুলো একে একে বেঞ্চে দিয়ে যাচ্ছেন। মুগ্ধার বেঞ্চেও খাতা এসে গেছে। সে খাতার দিকে তাকাল, তারপর আবার দরজার দিকে।
কিন্তু যার জন্য তাকানো—সে নেই। ইশতিয়াক এখনো আসেনি।
মুগ্ধার ঠিক তিন বেঞ্চ পরে ইশতিয়াকের সিট।
অর্থাৎ পেছনে চোখ সামান্য ঘুরে তাকালেই তাকে দেখা যাবে।
এ ছেলেটা এত দায়িত্বজ্ঞানহীন!ভেবেই মুগ্ধার রাগ তড়তড় করে বাড়ছে।
মুগ্ধা আবার ঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর দরজার দিকে। মুখটা ধীরে ধীরে গম্ভীর হয়ে উঠল।
“শয়তান টা এত দেরি করছে কেন?”
মনে মনে বিরক্ত হলো সে। আবার বিরবির করল
“পরীক্ষা দিতে আসবে, নাকি মন্ত্রীসভায় মিটিং করতে আসবে?”

তখনই পাশের বেঞ্চের একটা মেয়ে ফিসফিস করে তার বন্ধুকে বলল—
“আপু, আর কতক্ষণ বাকি?”
মুগ্ধা শুনেও না শোনার ভান করল। সে আছে নিজের জ্বালায়। একেতো তার সব পড়া গুলিয়ে যাচ্ছে, তাতে এই হতচ্ছাড়ার টেনশন। তার সমস্ত মনোযোগ এখন দরজায়।
মুগ্ধার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। যাক গাধাটা এসেছে। পরিচিত কণ্ঠস্বর—
“স্যার, ভেতরে আসতে পারি?”

মুগ্ধার চোখ এক ঝটকায় দরজার দিকে উঠল।
সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, কাঁধে ব্যাগ। চেহারায় সেই চিরচেনা শান্ত ভাব, যেন পাঁচ মিনিট দেরি করে আসা তার জীবনের একেবারেই স্বাভাবিক কোনো ঘটনা।মুগ্ধার চোখ সরু হয়ে গেল। দাঁত কিটমিট করে তাকিয়ে রইল সে। মুখে কোনো কথা নেই।
ইশতিয়াক দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল।
একজন স্যার চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন,
“এখন আসছেন?”
ইশতিয়াক একটু মাথা নিচু করে বলল,
“জি, স্যার। একটু দেরি হয়ে গেছে।”
“একটু?”
স্যারের কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি।
“পরীক্ষা শুরু হতে আর কয়েক মিনিট। সময়ের ব্যাপারে একটু সচেতন হওয়া উচিত ছিল।”
“জি, স্যার।”
“আচ্ছা, যান। ভেতরে গিয়ে বসুন। আর যেন এমন না হয়।”
“জি, স্যার। ধন্যবাদ।”

ইশতিয়াক ভেতরে ঢুকতেই মুগ্ধা আরও একবার চোখ সরু করল। তারপর খুব ধীরে মাথা ঘুরিয়ে নিজের খাতার দিকে তাকাল। যেন ইশতিয়াকের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই। সে ইশতিয়াককে কোনদিন দেখেই নি । চিনেই না ।
মুগ্ধার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে একবার চোখের কোণ দিয়ে তাকাল। মুগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল।
ইশতিয়াকের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।
ইশতিয়াক নিজের সিটে গিয়ে বসতেই মুগ্ধা আবার তাকাল। আর তখনই তার চোখ আটকে গেল।
ইশতিয়াকের পাশের সিটে একটা মেয়ে বসে আছে।
মুগ্ধার ভ্রু কুঁচকে গেল।
মেয়েটা শান্তভাবে নিজের খাতা গুছিয়ে রাখছে।
মুগ্ধা কিছু বলল না। শুধু একবার ইশতিয়াকের দিকে তাকাল। তারপর মেয়েটার দিকে।
ইশতিয়াক সেটা টের পেয়েও নির্বিকার মুখে কলম বের করল। মুগ্ধা ঠোঁট চেপে ধরল।
মাথায় হাত দিয়ে আবার বসে পড়ল।
আর ইশতিয়াক? তার মনে যেন লাড্ডু ফুটছে এমন ভাব। তার এই ছাত্রজীবনের প্রথম তার পাশে মেয়ে বসেছে। আনন্দের কি শেষ আছে!

ইখতিয়ারের অফিসটা দিনের শুরু থেকেই যেন ব্যস্ততার সমুদ্রে ভাসছে। কাঁচঘেরা বিশাল কক্ষের একপাশে সারি সারি ফাইল, টেবিলের ওপর ল্যাপটপ, পাশে ঠান্ডা হয়ে আসা কফির কাপ। বাইরে কর্মীদের পায়ের শব্দ, ফোনের রিং আর মিটিংয়ের ব্যস্ততা মিলেমিশে এমন এক আবহ তৈরি করেছে, যেন পুরো অফিসটাই এক মুহূর্তের জন্যও নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় পাচ্ছে না।
ইখতিয়ার নিজের ডেস্কে বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে একের পর এক রিপোর্ট দেখছিল। কপালে হালকা ভাঁজ। আঙুলের ফাঁকে কলমটা ঘুরছে আপনমনে।ঠিক তখনই দরজায় টোকা না দিয়েই আব্রাহাম ঢুকে পড়ল।
“ভাই, কাজের চাপে মানুষ না হয়ে রোবট হয়ে যাচ্ছিস নাকি বে?”
ইখতিয়ার চোখ না তুলেই বলল,
“নক না করে তুই ঢুকেছিস কেন?”
আব্রাহাম হেসে চেয়ার টেনে বসল। এসব গায়ে মাখে নাকি সে।
“দেখতে এসেছি, আমার প্রিয় বস আদেও বেঁচে আছে কি না।”

ইখতিয়ার এবার তাকাল। কলম রেখে সরু চোখে তাকাল আব্রাহামের দিকে তাকালো।
“তোর যদি কাজ না থাকে, দরজাটা ওই দিকেই।”
“কাজ আছে তো।”
“কী কাজ?”
“তোকে বিরক্ত করা।”
ইখতিয়ারের ঠোঁটের কোণে বিরক্তির ছায়া ফুটল।
“খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ?”
“অবশ্যই। কোম্পানির স্বার্থে।”
আব্রাহাম এমনভাবে বলল যে ইখতিয়ার আর কিছু বলল না। বরং সামনে থাকা ফাইলটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“এই রিপোর্টটা দেখেছিস?”

আব্রাহাম ফাইল খুলে দু-এক পাতা উল্টে আবার ভুরু নাচাল।
“রিপোর্ট তো দেখছি। কিন্তু তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে রিপোর্টের চেয়ে অন্য কিছু নিয়ে বেশি চিন্তিত। ভাবি মারতেছে নাকি?”

ইখতিয়ারের হাত থেমে গেল।
“মানে?”
“মানে, মুগ্ধা ভাবী।”
এক মুহূর্তের জন্য ইখতিয়ারের চোখের কঠোরতা নরম হয়ে গেল। খুব সামান্য। এতটাই সামান্য যে অন্য কেউ হয়তো টেরই পেত না।
আব্রাহাম অবশ্য পেয়ে গেল।
“ওহ্! দেখেছো? নাম শুনতেই সাহেবের চোখে বসন্ত নেমেছে! হয় হয় এমনই হয়, আজ সিঙ্গেল বলে”
ইখতিয়ার ভ্রু কুঁচকে বলল,
“বেশি কথা বলিস না।”
“কেন? সত্যি কথায় রাগ?”
ইখতিয়ার কলমটা টেবিলে রাখল।
“তোর নিজের কোনো কাজ নেই?”
“আছে। কিন্তু তোর সংসারের খবর নেওয়া বেশি জরুরি। বন্ধুগত দায়িত্ব”

আব্রাহামের হাসিতে ঘরটা খানিকটা হালকা হয়ে গেল। ইখতিয়ার আবার কাজে মন দিলেও মনের ভেতরটা আর আগের মতো স্থির রইল না। মুগ্ধার মুখটা হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল। সকালে বের হওয়ার সময় তার অভিমানী চোখ, কথার মাঝখানে লুকিয়ে থাকা অভিমান—সবকিছু যেন ব্যস্ত অফিসের মাঝেও তাকে টেনে ধরল।
দৃষ্টি স্থির রইল কংক্রিটের ছাদে।
আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তারাগুলো যেন কালো মখমলের ওপর কেউ একমুঠো রুপোর গুঁড়ো ছিটিয়ে দিয়েছে। জানালার কাঁচে চাঁদের আলো এসে পড়ে ঘরের মেঝেতে নরম সাদা রেখা এঁকে দিয়েছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, মাঝেমধ্যে বাতাসে পাতার মৃদু নড়াচড়া—সব মিলিয়ে বাড়িটা যেন গভীর শান্তির চাদরে ঢাকা।

শেখ বাড়ির করিডোরেও নেমে এসেছে রাতের নিস্তব্ধতা। ইখতিয়ার আর মুগ্ধা তাদের নিজেদের ঘরে। ইখতিয়ার বিছানার পাশে বসে কিছু একটা দেখছিল, আর মুগ্ধা তার পাশে বসে বইয়ের পাতায় চোখ রেখেছে। দুজনের মাঝখানে নরম আলো জ্বলছে। ঘরের পরিবেশটাও শান্ত।
কিন্তু দরজার ঠিক বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার মনে শান্তির ছিটেফোঁটাও নেই। ইশতিয়াক।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি। হাসিটা এতটাই রহস্যময়, যেন তার মাথার ভেতর কোনো গোপন সভা বসেছে—আর সেই সভার সব সিদ্ধান্তই মুগ্ধাকে না জানিয়ে নেওয়া হয়েছে।
চোখে কুটিল দুষ্টুমি। মনে একটা পরিকল্পনা।
সে একবার দরজার দিকে তাকাল, তারপর নিজের ঠোঁট চেপে হাসিটা সামলানোর চেষ্টা করল।
দরজায় দুটো মৃদু নক করল ইশতিয়াক। ভেতর থেকে ইখতিয়ারের গলা ভেসে এলো,
“কে?”
“ভাইয়া, আসবো?”

ইখতিয়ার একটু অবাক হয়ে দরজার দিকে তাকাল।
“আয়।”
দরজা খুলে ইশতিয়াক ঢুকল। হাতে একটা বই। মুখে এমন ভাব, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় ছাত্র এই মুহূর্তে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
“ভাইয়া, একটা পড়া বুঝতেছি না।”
ইখতিয়ার বইটা হাতে নিল।
“কোনটা?”
ইশতিয়াক পাতাটা খুলে দেখিয়ে দিল।
“এইটা।”

ইখতিয়ার মন দিয়ে দু-এক লাইন পড়ল। তারপর বুঝিয়ে দিতে শুরু করল। ইশতিয়াক খুব মনোযোগী ছাত্রের মতো মাথা নাড়ছে।
“বুঝছিস?”
“একটু।”
“কোনটা বুঝিসনি?”
“সবটাই।”

মুগ্ধা এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। এবার ভ্রু কুঁচকে ইশতিয়াকের দিকে তাকাল। ছেলেটার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, পড়াশোনার সঙ্গে তার জন্মগত শত্রুতা।
ইখতিয়ার আবার ধৈর্য ধরে বোঝাতে লাগল।
কিন্তু ইশতিয়াক এমনভাবে প্রশ্ন করতে লাগল যে একটা সহজ বিষয়ও ধীরে ধীরে জটিল হয়ে উঠল।
মুগ্ধা বুঝে গেল।
এই ছেলে পড়া বুঝতে আসেনি। অন্য কোনো ধান্দা আছে। কিছুক্ষণ পর ইশতিয়াক হঠাৎ বলে উঠল,
“ভাইয়া, আমার ঘরে গেলে ভালোভাবে বুঝতে পারব। বইটাও ওখানে আছে।”
ইখতিয়ার কিছুটা বিরক্ত হয়েও উঠে দাঁড়াল।
“চল।”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৪

ইশতিয়াক যেন ভেতরে ভেতরে বিজয়ী সৈনিক।
বেরিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ থেমে মুগ্ধার দিকে তাকাল। মুগ্ধা তার দিকে এমন বিরক্ত চোখে তাকিয়ে আছে, যেন এইমাত্র সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধটা করে ফেলেছে।
ইশতিয়াকের ঠোঁটের কোণে হাসি আরও চওড়া হলো। এক গাল হেসে সে চোখ টিপ দিল।
মুগ্ধার চোখ আরও বড় হয়ে গেল।
ইশতিয়াক সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে ইখতিয়ারের পেছনে হাঁটা দিল। আর মুগ্ধা বসে রইল স্থির হয়ে। চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি। ইশতিয়াক ইখতিয়ারের পায়ের সাথে তালে তাল মেলাল। হাসতে হাসতে মনে মনে আওড়ালো,
” মাফ করিস বইন, তোর স্বনামধন্য বর আমার পাকা ধানে মই দিছে, আমি তোর মইটাই কেড়ে নিয়ে গেলাম, টিট ভর ট্যাট,হু”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩৬