Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৬

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৬

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৬
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

সকাল সাড়ে এগারোটার আকাশটা আজ অন্যরকম । সূর্যের আলো আছে, তবুও পুরো আকাশ জুড়ে ধূসর মেঘের পাতলা চাদর বিছিয়ে রয়েছে। মাঝে মাঝে ঠান্ডা বাতাস এসে শেখ বাড়ির বিশাল বাগানের ফুলগাছগুলো দুলিয়ে দিচ্ছে। গোলাপের পাপড়িতে জমে থাকা শিশির এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। দূরে আমগাছের ডাল নড়লেই টুপটাপ করে পানি পড়ছে রাতের বৃষ্টির থেকে জমে থাকা পাতাগুলো থেকে।
‎শেখ বাড়ির বাগানটা এমনিতেই সুন্দর, কিন্তু এই মেঘলা আবহাওয়ায় যেন আরও বেশি জীবন্ত লাগছে। চারপাশে বেলির গন্ধ। কোথাও কোকিল ডেকে উঠছে, কোথাও বাতাসে দুলছে সাদা বেলি ফুল।
‎বাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে স্নিগ্ধা আর ইশতিয়াক।
‎ইশতিয়াক হাতে চায়ের কাপ নিয়ে আরাম করে দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে কালো টি-শার্ট, মুখে চিরচেনা দুষ্টু হাসি। আর স্নিগ্ধা আজ হালকা নীল রঙের সালোয়ার কামিজ পরে এসেছে। খোলা চুলগুলো বাতাসে বারবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, আর সে বিরক্ত মুখে সেগুলো কানের পাশে গুঁজে দিচ্ছে।ইশতিয়াক হঠাৎ বলল,

‎“তুমি একটা জিনিস জানো?”
‎স্নিগ্ধা ভ্রু তুলল।
‎“কি?”
‎“এই মেঘলা আবহাওয়ায় মানুষ দুই ধরনের হয়।”
‎“কেমন?”
‎“একদল প্রেমে পড়ে, আরেকদল খিচুড়ি খেতে চায়।”
‎স্নিগ্ধা হেসে ফেলল।
‎“আপনি নিশ্চয়ই দ্বিতীয় দলে?”
‎“না। আমি তৃতীয় দলে।”
‎“আবার সেটা কি?”
‎ইশতিয়াক নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‎“আমি সেই হতভাগা দল, যারা প্রেমেও পড়তে পারে না, আবার খিচুড়িও পায় না।”

‎স্নিগ্ধাও এবার একটু জোরে হেসে ফেলল। তার হাসিটা খুব উজ্জ্বল নয়, বরং নরম। কিন্তু সেই নরম হাসির মধ্যেই অদ্ভুত মায়া আছে।
‎বাতাসটা হঠাৎ একটু জোরে বইল। স্নিগ্ধার চুল মুখের উপর এসে পড়তেই সে বিরক্ত হয়ে বলল,
‎“উফফ! এই চুলগুলোও না…”
‎ইশতিয়াক সঙ্গে সঙ্গে বলল,
‎“কেটে ফেলো।”
‎স্নিগ্ধা চোখ ছোট করল।
‎“আপনি চুপ করবেন?”
‎“আমি তো সমাধান দিলাম।”
‎“এটা কোনো সমাধান?”
‎“অবশ্যই। চুল নেই,সমস্যা নেই।”
‎ স্নিগ্ধা এবার হালকা গলায় বলল,
‎“আপনার লজিক পৃথিবীর বাইরে।”
‎“ধন্যবাদ। আমি ইউনিক।”
‎ইশতিয়াক এতটাই গম্ভীর মুখে কথাটা বলল যেন সে একটা চিরন্তন সত্য কথা বলেছে। স্নিগ্ধা আবারও হাসল।

‎আকাশের মেঘগুলো ধীরে ধীরে আরও ঘন হয়ে আসছে। রোদের তেজ একদম কমে গেছে। চারপাশে এমন একটা আবহাওয়া তৈরি হয়েছে যেন যে কোনো সময় বৃষ্টি নেমে যাবে।
‎ইশতিয়াক হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
‎“এই আবহাওয়ায় ক্লাস করতে যাওয়া মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়।”
‎স্নিগ্ধা ভ্রু কুঁচকাল।
‎“এত নাটক কেন?”
‎“কারণ দেখো না— এই আবহাওয়া চা, ঘুম আর গান শোনার জন্য বানানো। কেউ যদি এখন আমাকে বই ধরিয়ে দেয়, আমি মামলা করব।”
‎“আপনাকে কেউ সিরিয়াসলি নেয়?”
‎“তুমি নিচ্ছো না?”
‎“একদম না।”
‎“দেখলে খোদা?”
‎ ইশতিয়াক এবার আকাশের দিকে তাকাল,
‎ “মানুষ আমাকে বুঝে না।”
‎ স্নিগ্ধা শান্তভাবে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
‎আপনাকে বুঝতে গেলে আলাদা ডিগ্রি লাগবে।”
‎স্নিগ্ধা কথা বলে এবার এত জোরে হেসে ফেলল যে নিজের হাসি নিজেই থামানোর চেষ্টা করল।
‎ইশতিয়াক আহত ভঙ্গিতে বুক চেপে ধরল।
‎“আমার আত্মসম্মানে আঘাত লাগছে।”
‎“আপনার আবার আত্মসম্মানও আছে?”
‎“অবশ্যই আছে। খুব সেনসিটিভ জিনিস।”
‎ স্নিগ্ধা অমায়িক হাসল। ইশতিয়াক তাকিয়ে রইল। যেন পিপাসা মেটাচ্ছে। কতদিনের চোখের তৃষ্ণা।

‎সকালের ভ্যাবসা আলোয় শহরের রাস্তা যেন ধীরে ধীরে সোনালি হয়ে উঠেছে। সেই ভিড়ের মাঝ দিয়েই বাইক চালিয়ে যাচ্ছে ইখতিয়ার। সামনে তার স্থির দৃষ্টি, অথচ মনটা বারবার আটকে যাচ্ছে পিছনে বসে থাকা মেয়েটার দিকে।
‎মুগ্ধা আজ অদ্ভুত রকম চঞ্চল। হালকা বাতাসে তার খোলা চুলগুলো উড়ে এসে কখনও ইখতিয়ারের কাঁধ ছুঁয়ে যাচ্ছে, কখনও আবার নিজের মুখেই লেপ্টে যাচ্ছে। সে বিরক্ত হয়ে বারবার চুল সরাচ্ছে, আর সেই ছোট্ট ছোট্ট অস্থিরতাগুলোই তাকে আরও সুন্দর করে তুলছে।
‎ কখনও সে বিস্মিত চোখে চারপাশ দেখছে, কখনও হঠাৎ করেই হাসছে— কারণ ছাড়াই। সেই হাসিটা খুব শব্দ করে নয়, বরং টুপ করে ফুটে ওঠা শিউলি ফুলের মতো নরম।
‎ইখতিয়ার মাঝেমধ্যে বাইকের আয়নায় তাকাচ্ছে। প্রতিবারই চোখ আটকে যাচ্ছে মুগ্ধার মুখে। মেয়েটার চোখ দুটো যেন একেকটা জীবন্ত গল্প— চঞ্চল, উজ্জ্বল, দুষ্টুমিতে ভরা। তার ভ্রুর হালকা নড়াচড়া, ঠোঁটের কোণে খেলা করা হাসি, বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুল— সবকিছু মিলিয়ে তাকে অসম্ভব জীবন্ত লাগছে।
‎ইখতিয়ারের মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হয়তো এই মুহূর্তটাই।

‎সকাল ঠিক নয়টায় বাসা থেকে বেরিয়েছিল তারা। ব্যস্ত শহরের সকাল তখন পুরোপুরি জেগে উঠেছে। রাস্তাজুড়ে মানুষের ভিড়, হর্ণের শব্দ, ফুটপাথের দোকানদারদের হাঁকডাক— সব মিলিয়ে শহরটা যেন নিজের চেনা ছন্দে দৌড়াচ্ছে।
‎ইখতিয়ার কালো বাইকটা স্থির ভঙ্গিতে চালাচ্ছিল। তার মুখে সবসময়ের মতো শান্ত ভাব। না অকারণে কথা বলে, না অযথা হাসাহাসি করে। অথচ পাশে বসা মুগ্ধা যেন সম্পূর্ণ উল্টো।
‎কখনও রাস্তার পাশে রঙিন বেলুন দেখে উচ্ছ্বাসে বলে উঠছে,
‎— “ওইটা দেখেন!”
‎কখনও আবার কোনো কফিশপের কাঁচে সাজানো কেক দেখে চোখ বড় বড় করছে।
‎ইখতিয়ার শুধু মাঝে মাঝে আয়নায় তাকিয়ে মুচকি হাসছিল। মেয়েটাকে দেখলে তার ভেতরের স্থির মানুষটার মাঝেও অদ্ভুত এক নরম অনুভূতি জেগে ওঠে। ভেঙে যাচ্ছে পুরানো দেয়াল।

‎ঘণ্টাখানেক পর তারা পৌঁছাল শহরের সবচেয়ে বড় শপিংমলটার সামনে। বিশাল কাঁচের ভবনটা দূর থেকেই চকচক করছিল। শপিংমলের ঠিক অপর পাশেই গাড়ির গ্যারেজ। মাঝখানে প্রশস্ত ব্যস্ত রাস্তা। সারি সারি প্রাইভেট কার, বাস, ট্রাক, বাইক— সব ছুটে যাচ্ছে একটার পর একটা।
‎ইখতিয়ার বাইকটা গ্যারেজে ঢুকিয়ে ধীরে নামল।
‎সাদা শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। হাতে ঘড়ি। চুলগুলো হালকা এলোমেলো। তার হাঁটার ভঙ্গিতে একটা অদ্ভুত স্থির আত্মবিশ্বাস ছিল। আশেপাশের কয়েকজন অনায়াসেই তাকিয়ে রইল তার দিকে।
‎সে হেলমেট খুলে মুগ্ধার দিকে তাকাল।

‎— “চলো।”
‎মুগ্ধা মাথা নাড়ল।
‎ইখতিয়ার কয়েক পা সামনে এগিয়ে গেল। তারপর হঠাৎ খেয়াল হলো, মুগ্ধা পাশে নেই।
‎সে পিছনে ফিরে তাকাল।
‎রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধা। মুখটা কেমন ফ্যাকাশে। বিশাল বাসগুলো গর্জন তুলে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। বড় বড় গাড়ির শব্দে সে স্পষ্ট ভয় পেয়ে গেছে। দুহাত দিয়ে ব্যাগের স্ট্র্যাপ শক্ত করে ধরে আছে।
‎ইখতিয়ার কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে। চঞ্চল মুগ্ধা এই মুহূর্তে একদম ছোট্ট বাচ্চার মতো লাগছে।
‎সে ধীরে ধীরে ফিরে এলো।
‎মুগ্ধার সামনে এসে নরম গলায় বলল,

‎— “ভয় লাগছে?”
‎মুগ্ধা ঠোঁট কামড়ে ছোট্ট করে মাথা নাড়ল। পরের মুহূর্তেই ইখতিয়ার তার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল। এতটাই শক্ত করে, যেন এই ভিড়ের মাঝে কোনোভাবেই মেয়েটা হারিয়ে যেতে না পারে।
‎মুগ্ধা একটু চমকে তাকাল।
‎সবুজ সিগন্যাল জ্বলার সাথে সাথে ইখতিয়ার মুগ্ধাকে নিয়ে রাস্তা পার হতে শুরু করল। চারপাশে গাড়ির শব্দ, মানুষের ভিড়— কিন্তু মুগ্ধার মনোযোগ আটকে রইল নিজের হাতে। ইখতিয়ারের বড় উষ্ণ হাতটা এখনও শক্ত করে তাকে ধরে আছে।
‎কেন জানি বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল তার।
‎শপিংমলের ভেতরে ঢুকতেই ঠান্ডা বাতাস এসে লাগল শরীরে। চারপাশে উজ্জ্বল আলো, কাঁচের দোকান, মানুষের ব্যস্ত হাঁটাহাঁটি।
‎মুগ্ধার চোখ সঙ্গে সঙ্গে চকচক করে উঠল।
‎ভয়টা মুহূর্তেই উধাও।

‎— “এইদিকে যাই!”
‎বলেই সে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ছুটতে লাগল। কখনও শাড়ি দেখছে, কখনও কুর্তি, কখনও আবার অদ্ভুত ডিজাইনের ব্যাগ হাতে নিয়ে হাসছে।
‎ইখতিয়ার ধীর পায়ে তার পেছনে হাঁটছিল। মাঝে মাঝে শুধু তাকাচ্ছিল। মেয়েটা আসলেই অদ্ভুত।
‎এক মুহূর্তে ভয় পেয়ে কেঁপে যায়, পরের মুহূর্তেই পুরো পৃথিবী নিয়ে মেতে ওঠে।
‎একটা বড় ব্র্যান্ডের দোকানে ঢুকতেই মুগ্ধা থেমে গেল। কাঁচের শোকেসে ঝোলানো একটা গাউন তার চোখ আটকে দিল।
‎গাঢ় হলুদ রঙের। খুব বেশি জাঁকজমক নয়, অথচ অসম্ভব সুন্দর। হাতার কাছে সূক্ষ্ম কাজ করা।
‎মুগ্ধা ধীরে ধীরে গাউনটার কাছে গেল।
‎আঙুল দিয়ে কাপড়টা ছুঁয়ে দেখল। তার চোখদুটো মুহূর্তেই নরম হয়ে গেল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, জামাটা ভীষণ পছন্দ হয়েছে।
‎ইখতিয়ার সেটা খেয়াল করল।

‎— “ট্রাই করবে?”
‎মুগ্ধা একটু ইতস্তত করে মাথা নাড়ল।
‎কিছুক্ষণ পর ট্রায়াল রুম থেকে বেরিয়ে এলো সে।
‎ইখতিয়ার তাকিয়ে রইল। মেয়েটাকে মনে হচ্ছিল ঠিক রোদমাখা বিকেল। হলুদ রঙটা তার গায়ে এমনভাবে মিশে গেছে, যেন জামাটা শুধু তার জন্যই বানানো হয়েছে। মুগ্ধা আয়নার সামনে ঘুরে দাঁড়াল। নিজেকেই দেখে নিজের অজান্তে হেসে ফেলল। ইখতিয়ারের বুকের ভেতর অদ্ভুত কিছুর ঢেউ উঠল।
‎সে শান্ত স্বরে বলল,
‎— “এটাই নাও।”
‎মুগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে দাম দেখতে গেল।
‎তারপর মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

‎— “আট হাজার!”
‎সে দ্রুত জামাটা খুলে দিতে লাগল।
‎— “না না, লাগবে না।”
‎ইখতিয়ার ভ্রু কুঁচকাল।
‎— “কেন?”
‎— “একটা জামার দাম আট হাজার কে দেয়!”
‎— “আমি দিচ্ছি।”
‎— “তবুও না।”
‎মুগ্ধা এবার একদম জেদ ধরে ফেলল।
‎— “এত দামি জামা আমি নেব না।”
‎ইখতিয়ার শান্ত গলায় বলল,
‎— “তোমার পছন্দ হয়েছে।”
‎— “হয়েছে তো কী হয়েছে? সব পছন্দের জিনিস কিনতে হয় না।”
‎তার গলায় একধরনের বাস্তবতা ছিল। ইখতিয়ার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
‎— “তুমি এটা পরলে সুন্দর লাগছে।”
‎মুগ্ধা একটু থমকালেও শেষ পর্যন্ত মাথা নাড়ল।
‎— “না। চলেন অন্য দোকানে।”
‎বলেই সে বেরিয়ে গেল।

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৫

‎ইখতিয়ার কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
‎তারপর হালকা নিঃশ্বাস ফেলে সেলসম্যানের দিকে তাকাল।
‎— “প্যাক করে দিন।”
‎সেলসম্যান মুচকি হাসল।
‎ইখতিয়ার ওয়ালেট বের করতে করতে কাঁচের বাইরে তাকাল। দূরে অন্য দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু একটা দেখছে মুগ্ধা।
‎তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত নরম হাসি ফুটে উঠল।
‎খুব নিচু স্বরে সে যেন নিজের মনেই বলল—
‎”সে অপরূপা, স্নিগ্ধতায় প্রকাশিত তার রূপ ,
‎আমি অদ্ভুত-প্রবল, বিভীষিকা স্বরূপ।”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here