Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১৩

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১৩

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১৩
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎সন্ধ্যা পুরোপুরি নেমে এসেছে।
‎আকাশের শেষ নীলচে আলোটুকুও মিলিয়ে গিয়ে চারপাশে ধূসর এক আবছায়া ছড়িয়ে পড়েছে। দূরের মসজিদ থেকে মাগরিবের আজানের শেষ ধ্বনি ভেসে এসে মিলিয়ে গেল বাতাসে। বাড়ির নিচতলায় মানুষের হালকা শব্দ আছে—কেউ রান্নাঘরে হাঁটছে, কেউ থালা রাখছে, কেউ টিভির আওয়াজ বাড়াচ্ছে। কিন্তু উপরের এই ঘরটা…

‎এখানে নিস্তব্ধতা জমে আছে।
‎ভারী।
‎দমবন্ধ করা।
‎ইখতিয়ার নিজের বিছানার পাশে বসে আছে। এলোমেলো ঘরটা অনেকটা গুছিয়ে ফেলা হয়েছে, কিন্তু ভাঙচুরের চিহ্ন এখনও রয়ে গেছে। টেবিলটা কাত হয়ে আছে সামান্য। মেঝেতে পড়ে থাকা একটা বই এখনও কেউ তুলে রাখেনি।
‎তার হাতে ইশতিয়াকের ফোন।
‎ফোনটা এমনভাবে ধরে আছে যেন এই ছোট্ট যন্ত্রটার মধ্যেই তার শেষ ভরসা লুকিয়ে আছে।
‎তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ হচ্ছে দ্রুত। গলা শুকিয়ে গেছে। অথচ বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই। মুখটা আগের মতোই শান্ত। স্থির।
‎শুধু চোখদুটো দেখে তাক ধরে ফেলা সম্ভব।
‎সেখানে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক।
‎যদি মুগ্ধা ফোন না তোলে? আর যদি তোলে…
‎তাহলে কি কথা বলবে সে?
‎ইখতিয়ার চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত।
‎তারপর খুব আস্তে বলল,

‎ “বিসমিল্লাহ…”
‎শব্দটা যেন নিজের বুককে শক্ত করার চেষ্টা।
‎তারপর কল দিল। রিং হচ্ছে। প্রথম রিং।
‎ইখতিয়ারের আঙুল ফোনের গায়ে আরও শক্ত হয়ে বসে গেল। দ্বিতীয় রিং।
‎তার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে আটকে এলো। তারপর—
‎কল রিসিভ।
‎ওপাশে কয়েক সেকেন্ড শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ।
‎মুগ্ধা ভেবেছে এটা ইশতিয়াক।
‎তাই কোনো সাবধানতা নেই গলায়।
‎বিরক্ত, অলস স্বরে বলে উঠল,
‎“এই হারা’মজাদা, আবার কি চাই তোর? কি বা’লের দরকার?”
‎তারপর এমন একটা বিচ্ছিরি গালি দিল, যেটা শুনে ইখতিয়ার পুরো থ হয়ে গেল।
‎এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর সে অবচেতনভাবেই বলে উঠল,
‎ “আস্তাগফিরুল্লাহ… তওবা তওবা…”

‎ওপাশে সঙ্গে সঙ্গে নীরবতা। পুরোপুরি। মুগ্ধার নিঃশ্বাসও যেন থেমে গেছে। সে বুঝে গেছে। এটা ইশতিয়াক না। ইখতিয়ার।
‎মুগ্ধা বিছানার উপর সোজা হয়ে বসে পড়ল। বুকের ভেতর ধক করে উঠেছে। তার গলা শুকিয়ে গেছে হঠাৎ।
‎ওপাশ থেকে ইখতিয়ারের ভারী গলা ভেসে এলো, “মুগ্ধা…”
‎শুধু একটা শব্দ।
‎কিন্তু সেই শব্দে এত ক্লান্তি, এত চাপা রাগ, এত না বলা কথা মিশে ছিল যে মুগ্ধার বুকটা কেঁপে উঠল অজান্তেই। সে কিছু বলল না। ইখতিয়ারও কিছুক্ষণ চুপ।
‎মনে হচ্ছিল দুজনেই বুঝে উঠতে পারছে না কোথা থেকে শুরু করবে। শেষ পর্যন্ত ইখতিয়ারই বলল, “কেমন আছো?”
‎খুব সাধারণ প্রশ্ন। কিন্তু গলাটা অস্বাভাবিক নিচু।
‎মুগ্ধা ঠোঁট শক্ত করল।

‎“ভালো।”
‎“হুম।”
‎আবার চুপ।
‎ঘড়ির টিকটিক শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে দুই প্রান্তে।
‎তারপর ইখতিয়ার ধীরে বলল,
‎ “বাড়ি চলে আসো।”
‎সরাসরি। কোনো ঘুরিয়ে কথা না। মুগ্ধার চোখ নিচু হয়ে গেল।
‎সে এই কথাটা আশা করেছিল কি না, নিজেও জানে না। কিন্তু শুনে বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ভারী হয়ে উঠল। তবু সে নিজেকে শক্ত করল।
‎“না।”
‎শব্দটা ছোট।
‎কিন্তু খুব পরিষ্কার। ইখতিয়ার থেমে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল ধীরে ধীরে।
‎“না মানে?”
‎“মানে আমি আসব না।”
‎“কেন?”
‎মুগ্ধা হেসে ফেলল হালকা। সেই হাসিতে কষ্ট ছিল।
‎“কেন আবার? একজনকে স্পেস এন্ড পিস দিতে।”

‎ইখতিয়ার চোখ বন্ধ করল।
‎“ফাজলামো কোরো না।”
‎“আমি সিরিয়াস।”
‎“মুগ্ধা।”
‎এইবার গলাটা একটু শক্ত। মুগ্ধা চুপ।
‎ইখতিয়ার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল সে। বাইরে অন্ধকার।
‎তারপর নিচু স্বরে বলল,
‎ “রাগ করেছো?”
‎মুগ্ধা কয়েক সেকেন্ড কিছু বলল না।
‎তারপর খুব আস্তে বলল,
‎ “সে অধিকার কি আমার আছে?না কখনো ছিল?”
‎ইখতিয়ারের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

‎“আমি…”
‎সে থেমে গেল। কথা খুঁজে পেল না।
‎কারণ সত্যি বলতে—সে জানেই না কিভাবে নিজের অনুভূতি বলতে হয়।
‎মুগ্ধা এবার ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল, “আপনি আমার জীবনে আসলেন, নিরবে থাকলেন, নিজের ছাপ হিসেবে মায়ায় জড়ালেন,অথচ আপনি আমাকে দেখলেন ই না?”
‎ইখতিয়ার চোখ নামিয়ে ফেলল।
‎“মুগ্ধা.. শুনো আমাকে।”
‎“হুম বলেন ?”
‎“আসলে আমি তখন রেগে ছিলাম।”
‎“আর এখন?”
‎প্রশ্নটা সরাসরি এসে আঘাত করল তাকে।ইখতিয়ার কিছু বলল না। মুগ্ধা হেসে উঠল চাপা স্বরে।
‎“দেখলেন? এটাই সমস্যা। আপনি কিছু বলেন না। কিছু বুঝান না। শুধু চুপ থাকেন।”
‎“সব কথা বলতে হয় না।”
‎“হয়।”
‎এইবার মুগ্ধার গলাটা কেঁপে উঠল।

‎“সব কথা বলতে হয়। অন্তত সম্পর্কের মানুষকে বলতে হয়।”
‎ইখতিয়ার চুপ। তার হাতের আঙুলগুলো জানালার গ্রিল শক্ত করে ধরে আছে।
‎মুগ্ধা আবার বলল,
‎ “আমি ক্লান্ত, ইখতিয়ার। সবসময় আন্দাজ করতে করতে ক্লান্ত।”
‎ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা। ইখতিয়ার ধীরে বলল, “আমি তোমাকে আনতে আসব।”
‎মুগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
‎ “আসবেন না।”
‎“কেন?”
‎“কারণ আমি যাব না।”
‎“তুমি জেদ করছো।”
‎“আর আপনি?”
‎ইখতিয়ার থেমে গেল।
‎মুগ্ধা এবার বিছানা থেকে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে রাত নেমেছে।
‎তার গলা অনেক নরম হয়ে গেল এবার।

‎“আপনি জানেন, আমি যাওয়ার আগে একবারও চাননি আমি থাকি।”
‎ইখতিয়ারের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে বলতে চাইল—চেয়েছিল।
‎খুব চেয়েছিল। কিন্তু মুখে আনতে পারেনি।
‎তার বদলে শুধু বলল,
‎“এখন চাইছি।”
‎মুগ্ধা চোখ বন্ধ করল। এই একটা কথাই তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
‎তবু সে নিজেকে সামলাল। কারণ এত সহজে ফিরে গেলে নিজের কষ্টটাকে ছোট করা হবে।
‎সে ধীরে বলল,
‎“অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে যে।”
‎“মুগ্ধা—”
‎“না।”
‎এইবার তার গলা দৃঢ়।

‎“আমি এখন ফিরব না। আমার পরীক্ষা আছে। আমি এখানেই থাকব।”
‎ইখতিয়ারের ধৈর্য ভাঙতে শুরু করল।
‎“আমি বলছি বাড়ি আসো।”
‎“আপনি বললেই সব হবে?”
‎“আমি তোমার স্বামী।”
‎“আর আমি স্বামী অবহেলিত মুগ্ধা।”
‎নিঃশব্দ। তবু ভারী।
‎দুজনেই হাঁপাচ্ছে প্রায়। শেষ পর্যন্ত মুগ্ধাই ফোনটা কানের থেকে একটু সরিয়ে নিল।
‎তার চোখ ভিজে উঠেছে অজান্তেই।
‎সে খুব আস্তে বলল,
‎“ফোন রাখি।”
‎ইখতিয়ার দ্রুত বলল,
‎“মুগ্ধা, কেটে দিও না—”
‎কিন্তু তার আগেই—
‎“টুট।”

‎কল কেটে গেল। ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
‎ইখতিয়ার কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
‎ফোন এখনও কানের পাশে। স্ক্রিন নিভে গেছে।
‎কল শেষ।
‎ধীরে ধীরে সে ফোনটা নামাল। তার বুকের ভেতরটা ফাঁকা লাগছে। অদ্ভুতভাবে ফাঁকা।
‎আর অন্যদিকে, মুগ্ধা ফোনটা বিছানায় রেখে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে।
‎তার নিঃশ্বাস কাঁপছে। কারণ সে জানে—
‎ফোন কেটে দিলেও, ইখতিয়ারের গলাটা এখনও বাজছে। তার বুকের ভেতরের রন্ধ্রে বইয়ে চলছে।

‎ফোন কেটে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল ইখতিয়ার। জানালার পাশে।
‎অন্ধকারে ঢাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে।
‎তার হাতের মুঠোয় এখনও ইশতিয়াকের ফোন। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ভারী অনুভূতি জমে আছে।
‎ইখতিয়ার ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। তার নিঃশ্বাস ভারী।
‎মনে হচ্ছে পুরো ঘরটা আরও ছোট হয়ে গেছে।ঠিক তখনই—
‎“ধাম ধাম ধাম!”
‎দরজায় জোরে ধাক্কার শব্দ। ইখতিয়ার বিরক্তিতে চোখ খুলল। আরও একবার—
‎“ভাইইইইয়া! দরজা খোলো!”
‎ইশতিয়াক ডাকে।
‎ইখতিয়ারের কপালের রগ হালকা ফুলে উঠল।
‎“ভাই! আমি মারা যাইতেছি!”
‎আবার ধাক্কা দিলো।
‎“দরজা খোল!”

‎ইখতিয়ার গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
‎দরজা খুলতেই ইশতিয়াক প্রায় হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল। চুল এলোমেলো। মুখে অতিরঞ্জিত আতঙ্ক।
‎বুক চেপে ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
‎ “আমার ফোন!”
‎ইখতিয়ার কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। সম্পূর্ণ নিরাবেগ দৃষ্টিতে।
‎“কি?”
‎“আমার ফোন কোথায়?”
‎“এখানে।”
‎ইখতিয়ার ফোনটা দেখাতেই ইশতিয়াক এমন মুখ করল যেন হারানো সন্তান ফিরে পেয়েছে।
‎“আলহামদুলিল্লাহ!”
‎সে নাটকীয়ভাবে বুকের উপর হাত রাখল।
‎“আমি তো ভাবছিলাম আর কোনোদিন দেখতেই পারব না!”
‎ইখতিয়ারের বিরক্তি আরও বাড়ল।
‎“ড্রামা বন্ধ কর।”
‎কিন্তু ইশতিয়াক থামার ছেলে না।
‎সে ফোনটা বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,

‎ “তুই বুঝবি না ভাই… এই ফোন আর আমি—আত্মার সম্পর্ক।”
‎তারপর হঠাৎ সন্দেহভরা চোখে তাকাল।
‎“এক মিনিট।”
‎সে ফোনটা উল্টেপাল্টে দেখতে শুরু করল।
‎“তুই আমার ফোন নিয়া কাঁদছিলি নাকি?”
‎ইখতিয়ার চোয়াল শক্ত করল।
‎“ইশতিয়াক।”
‎“না মানে স্ক্রিনটা একটু গরম লাগতেছে তো—”
‎“চুপ কর।”
‎ইশতিয়াক ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখল।
‎ঘরের ভেতর একবার চারপাশে তাকাল সে।এলোমেলো ঘর। ভাঙা অবস্থা।
‎আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ইখতিয়ার।
‎চোখের নিচে ক্লান্তি, মুখে চাপা রাগ।
‎সব মিলিয়ে দৃশ্যটা এত নাটকীয় যে তার হাসি আরও পেয়ে গেল।
‎ সে ধীরে ধীরে বলল, “ভাবি কি খুব ঝাড়ছে?”
‎ইখতিয়ার এবার সরাসরি তাকাল তার দিকে।
‎সেই দৃষ্টিতে এমন বিরক্তি ছিল যে স্বাভাবিক মানুষ হলে চুপ হয়ে যেত।
‎কিন্তু ইশতিয়াক স্বাভাবিক মানুষ না।
‎সে বিছানায় গিয়ে আরাম করে বসে পড়ল।
‎“কি বলছে? ‘আমি আর ফিরব না ইখতিয়ার! কংবা আমি তোমার জন্য সতিন খুঁজে পাইছি—এই টাইপ কিছু?”

‎ইখতিয়ারের ধৈর্যের শেষ সীমানায় পৌঁছে যাচ্ছিল।
‎“বের হ।”
‎“আরে ভাই, আমি তো শুধু ভাইসুলভ সাপোর্ট দিতে আসছি।”
‎“তোর সাপোর্ট লাগবে না।”
‎“লাগবে লাগবে।”
‎ ইশতিয়াক মাথা নাড়ল গুরুত্ব দিয়ে। তারপর জ্ঞানী মানুষের মতো মাথা নেড়ে টবল“এই সময় মানুষকে একা রাখা উচিত না। বিশেষ করে প্রেমে আহত মানুষকে।”
‎ইখতিয়ার এবার এক পা এগিয়ে এল।
‎“ইশতিয়াক।”
‎“হুম?”
‎“চুপচাপ বের হয়ে যা।”
‎ইশতিয়াক দীর্ঘশ্বাস ফেলল নাটকীয়ভাবে।
‎“প্রেম মানুষকে বদলাইয়া দেয় রে ভাই…”
‎তারপর চোখ ছোট করে তাকাল।
‎“তবে একটা কথা—ভাবি কিন্তু তোরে ভালোই কষ্ট দিতেছে। আমি হইলে এতক্ষণে গিয়ে পায়ে ধরে—”
‎“বের হ।”
‎এইবার গলাটা ঠান্ডা। ভয়ংকর ঠান্ডা।
‎ইশতিয়াক দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করল।
‎“আচ্ছা আচ্ছা, যাইতেছি। মাইরমুখী হইস না।”
‎কিন্তু ওঠার সময়ও সে থামল না। দরজার কাছে গিয়ে আবার বলল,

‎ “তবে ভাই, একটা কথা বলি?”
‎ইখতিয়ার চোখ বন্ধ করল বিরক্তিতে।
‎“কি?”
‎ইশতিয়াক শয়তানি হাসল।
‎“ভাবি যদি আরেকটা জামাই পাইয়া যায়, আমারে কিন্তু দাওয়াত দিবি।”
‎পরের মুহূর্তেই ইখতিয়ার তার কাঁধে হাত রেখে সোজা দরজার বাইরে ঠেলে দিল।
‎“ঐ ঐ ঐ!”
‎ইশতিয়াক নাটকীয়ভাবে ভারসাম্য হারানোর অভিনয় করল।
‎“নিজের ভাইরে মারতেছিস!”
‎ইখতিয়ার কোনো উত্তর দিল না। সরাসরি দরজা বন্ধ করে দিল।
‎“ধাম!”
‎দরজাটা বন্ধ হওয়ার পরও বাইরে থেকে ইশতিয়াকের গলা শোনা গেল।
‎“আমি কিন্তু অপমানিত!”
‎কিছুক্ষণ থেমে আবার—
‎“তাও লাভ ইউ ভাই!”
‎ইখতিয়ার দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করল। আর বাইরে দাঁড়িয়ে ইশতিয়াক নিজের ফোন বুকে জড়িয়ে হেসে উঠল আস্তে। সে তো আরাম করে মজা নিচ্ছে। কারো পৌষ মাস তো কারো সর্বনাশ।

‎জানালার বাইরে অন্ধকার আকাশ। দূরের রাস্তার লাইটের হলদেটে আলো এসে ঘরের দেয়ালে মলিন ছায়া ফেলছে। চারপাশ শান্ত। শুধু সিলিং ফ্যানের ঘুরঘুর শব্দ আর মাঝে মাঝে দূরে কুকুরের ডাক ভেসে আসছে।
‎মুগ্ধা নিজের বিছানার কোণে চুপচাপ বসে আছে।
‎হাঁটু গুটিয়ে। মুখটা একটু নিচু।
‎তার পাশে খোলা ফোনটা উল্টো করে রাখা। যেন ওটার দিকে তাকালেই আবার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠবে। ইখতিয়ারের গলাটা এখনও বলছে।
‎“বাড়ি চলে আসো।”
‎ছোট্ট একটা বাক্য। কিন্তু সেই কথাটার ওজন যেন পুরো ঘরের বাতাসে মিশে গেছে। যাকে ভালোবাসা যায় তাকে উপেক্ষা করা সহজ নয়। কাঁটা ঘায়ে নুন ছিটানো স্বরুপ যন্ত্রণা তাতে মিশে।

‎মুগ্ধা ঠোঁট কামড়ে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত।
‎না। সে ঠিক করেছে, এত সহজে ফিরবে না।
‎কিন্তু মনটা কথা শুনছে না।
‎ঠিক তখনই করিডোরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল। মুগ্ধা চমকে উঠল।
‎মুহূর্তেই ফোনটা পাশে সরিয়ে রেখে দ্রুত একটা বই তুলে নিল সামনে থেকে। তারপর এমনভাবে বই খুলে বসে পড়ল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মনোযোগী স্টুডেন্ট সে। মুখ গম্ভীর। চোখ বইয়ে।
‎যদিও বইটা উল্টো ধরা।
‎দরজার সামনে এসে দাঁড়াল স্নিগ্ধা। হাতে বড় একটা আচারের কৌটা।
‎সে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখল।
‎তারপর ধীরে ধীরে ভ্রু তুলল।

‎“মুগ্ধা আপু।”
‎মুগ্ধা কৃত্রিম গাম্ভীর্যে বলল,
‎ “হুম?”
‎“বইটা সোজা কর আগে।”
‎মুগ্ধা থমকে গেল।
‎তারপর নিচে তাকিয়ে দেখে সত্যিই বইটা উল্টো।
‎সঙ্গে সঙ্গে মুখ কুঁচকে বইটা সোজা করল।
‎স্নিগ্ধা হো হো করে হেসে উঠল।

‎স্নিগ্ধা ভেতরে ঢুকে বিছানায় বসে পড়ল। তারপর আচারের কৌটাটা সামনে ধরল।
‎“নেও। তোমার জন্য চুরি করে আনছি।”
‎মুগ্ধার চোখ চকচক করে উঠল।
‎“আমের আচার?”
‎“হুম।”
‎মুহূর্তেই তার মুখের মন খারাপ ভাবটা একটু নরম হয়ে গেল। দ্রুত কৌটাটা নিয়ে ঢাকনা খুলতেই টক-মিষ্টি আচারের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
‎মুগ্ধা চোখ বন্ধ করে বলল,
‎“আহহ… এই জিনিসের জন্য মানুষ খু’নও করতে পারে।”
‎স্নিগ্ধা হেসে বলল, “বিশেষ করে তুমি।”
‎মুগ্ধা আঙুল দিয়ে আচার তুলে মুখে দিল।
‎পরক্ষণেই চোখ ছোট ছোট হয়ে গেল আনন্দে।
‎“উফফ! এইটা সেই স্বাদ!”
‎স্নিগ্ধা তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
‎কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ আচার খেতে লাগল।
‎তারপর স্নিগ্ধা ধীরে বলল,
‎“ইখতিয়ার ভাই ফোন দিছিল?”
‎মুগ্ধার হাত থেমে গেল।
‎তারপর আবার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আচার মুখে দিয়ে বলল,

‎ “হুম।”
‎“কি বলছে?”
‎মুগ্ধা গম্ভীর মুখে বলল,
‎“কান্নাকাটি করছে। বলছে, ‘মুগ্ধা প্লিজ ফিরে আসো, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না।’”
‎স্নিগ্ধা হেসে ফেলল।
‎“মিথ্যুক।”
‎মুগ্ধাও হেসে উঠল এবার। অনেকক্ষণ পর তার হাসিটা সত্যিকারের লাগছিল।
‎স্নিগ্ধা ধীরে তার পাশে বসল। দুষ্টু হেসে বলল,
‎“মন খারাপ করছে বুঝি?”
‎মুগ্ধা উত্তর দিল না। শুধু আচারের কৌটায় আঙুল ঘুরাতে লাগল চুপচাপ।
‎সেই নীরবতাই যেন উত্তর হয়ে রইল।

‎রাত তখন ঠিক এগারোটা।
‎পুরো বাড়িটা ঘুমের দিকে ঢলে পড়েছে ধীরে ধীরে। নিচতলার লাইটগুলোর বেশিরভাগই নিভে গেছে। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে মাঝে মাঝে। বাইরে রাস্তার বাতির হলদেটে আলো জানালার গ্রিল পেরিয়ে ঘরের মেঝেতে ছায়ার দাগ ফেলেছে।
‎ইখতিয়ারের ঘরটা আধো অন্ধকার। টেবিল ল্যাম্পের ম্লান আলোয় তার মুখের একপাশ আলোকিত, আরেকপাশ ছায়ায় ঢাকা। এলোমেলো ঘরটা অনেকটা গুছানো হলেও ভেতরের অস্থিরতা এখনো দেয়ালে দেয়ালে আটকে আছে।
‎ইখতিয়ার বিছানার কিনারায় বসে আছে চুপচাপ।
‎দুই কনুই হাঁটুর ওপর রাখা। মাথা নিচু। হাতে নিজের ফোন। অনেকক্ষণ ধরেই স্ক্রিন অফ হয়ে আছে, কিন্তু সে ফোনটা নামায়নি।
‎ হঠাৎ ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে একটা নাম ভেসে উঠল।

‎“আরহাম।”
‎ইখতিয়ার কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে কল রিসিভ করল।
‎“হ্যালো।”
‎ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উচ্চস্বরে ভেসে এলো, “বেঁচে আছিস?”
‎ইখতিয়ার চোখ বন্ধ করল বিরক্তিতে।
‎“কি চাই?”
‎“শুনলাম ভাবি বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে?”
‎ইখতিয়ারের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
‎“ইশতিয়াক বলছে?”
‎“আরে ওই হারামজাদা তো পুরো লাইভ টেলিকাস্ট দিছে!”
‎ইখতিয়ার বিরক্ত গলায় বলল,
‎ “চুপ থাক।”

‎ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো কয়েক সেকেন্ড।
‎আরহাম এবার একটু শান্ত স্বরে বলল,
‎ “কি হইছে খুলে বল।”
‎ইখতিয়ার ধীরে ধীরে সব বলতে শুরু করল। মুগ্ধার চলে যাওয়া। সকালের ফাঁকা ঘর। ব্লক করে দেওয়া। ফোনে কথা। তার না ফেরা। সব।
‎প্রতিটা কথার সাথে তার গলা আরও ভারী হয়ে উঠছিল।
‎শেষে চুপ হয়ে গেল সে।
‎ওপাশ থেকেও কিছুক্ষণ কোনো শব্দ নেই।
‎তারপর আরহামের গলা ভেসে এলো,
‎ “বৌ পাশে রেখে দেবদাস হয়ে থাকবা… আর আশা করবা বৌ থাকবে?”
‎ইখতিয়ারের কপালের রগ ফুলে উঠল।
‎“চুপ কর।”
‎“না সিরিয়াসলি বলতেছি। তুই তো একদম কাঠখোট্টা মানুষ। ভাবি না পালাইয়া আর কি করবে?”
‎“আরহাম।”
‎“কি? ভুল কইতেছি?”
‎ইখতিয়ার দাঁত চেপে বলল, “ ফালতু কথা বলবি না।”
‎আরহাম হেসে উঠল।

‎“আচ্ছা ঠিক আছে। তবে একটা জিনিস বুঝলাম।”
‎“কি?”
‎“ভাবি তোরে ভালোই ভালোবাসে।”ইখতিয়ার চুপ করে গেল।
‎কথাটা তার বুকের কোথাও গিয়ে লাগল।
‎কিন্তু পরের মুহূর্তেই আরহাম আবার শুরু করল। আরহাম আবার যেন সিরিয়াস হয়ে গেল। গম্ভীর হয়ে বলল,
‎“অনেকদিন তো হলো, এবার বর্তমানে ফিরে আয়, তোর তো কোন দোষ ছিল না, ফিরে আয় ভাই।”
‎“হু”
‎ইখতিয়ারের দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। মনে পড়ল সব। আরহাম আবার বলল,
‎“একটা অসহ্য অতীতের জন্য একটা সুন্দর বর্তমানের কষ্ট দেওয়া বোকামি ভাই”
‎“ বুঝতেছি ভাই, আমার জানটা প্রতিনিয়ত কষ্ট পাচ্ছ,বাট আমি কিছু করতে পারি না। এত এত ওষুধ, ইনজেকশন, ড্রা’গস, তারপরেও কিছু না,আমি আর পারছি না ভাই,পারছি না ”
‎ইখতিয়ার হাত মুঠো করে ফেলল। ইখতিয়ারের সাথে সাথে আরহামের মুখেও অসহায়ত্ব ফুটে উঠল। সে চিনে ইখতিয়ারকে। তার জিগরি কে। কথা ঘুরালো আরহাম। বলল,
‎“তবে একটা কথা…”
‎“হুম?”
‎“ভাবির কাছে শুনিস তো—যদি তোরে ডিভোর্স দিয়ে আবার বিয়ে করতে চায়, আমি কিন্তু রাজি আছি।”
‎ইখতিয়ার স্থির হয়ে গেল। ওপাশে আরহাম নির্লজ্জের মতো বলে যাচ্ছে,
‎“বাড়ি থেকে মেয়ে খুঁজতেছে যাইহোক। ভাবির মতো সুন্দরী, রান্না পারে, আবার গালিও দিতে পারে—কম্বো প্যাক!”
‎এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর—
‎“সাট দ্যা ফা’ক আপ,আরহাম”

‎ইখতিয়ারের গলাটা এত পাগলেটে শোনাল যে ওপাশেও কিছুক্ষণ চুপ পড়ে গেল। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
‎চোখদুটো অন্ধকার হয়ে গেছে ইখতিয়ারের। আবার বলল,
‎“সি ইজ মাই ওয়াইফ।”
‎প্রতিটা শব্দ দাঁত চেপে বের হলো।
‎“তাকায়া দেখারও চেষ্টা করবি না।”

‎আরহাম এবার হেসে বলল,
‎ “ওহহ! পজেসিভ হাজব্যান্ড!”
‎“আই এম সিরিয়াস.”
‎ইখতিয়ারের গলা নিচু। ভয়ংকর নিচু। যেন দাঁতে দাঁত পিষে কথা বলছে।
‎“তাকালে চোখ তুলে নিবো হারামি।”
‎ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপ। তারপর আরহাম হালকা কাশি দিয়ে বলল,
‎ “আচ্ছা বাবা, এত রেগে যাচ্ছিস কেন?”
‎ইখতিয়ারের বুক উঠানামা করছে দ্রুত।
‎“আর তুই আমার বাড়িতে আসবি না কোনোদিন।”
‎“এইটা আবার কেমন কথা!”
‎“আমি বলছি।”
‎“আরে দোস্ত—”
‎“গুড নাইট.”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১২

‎বলেই কল কেটে দিল ইখতিয়ার। ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ফোনটা ধীরে ধীরে নিচে নামাল সে।
‎তার বুকের ভেতর রাগ এখনও জ্বলছে।
‎কিন্তু সেই রাগের মাঝেও একটা জিনিস খুব পরিষ্কার হয়ে গেছে তার কাছে। মুগ্ধাকে নিয়ে মজা সহ্য করতে পারে সে। ঝগড়া সহ্য করতে পারে।
‎রাগ সহ্য করতে পারে । কিন্তু অন্য কারও নাম তার পাশে? না।
‎একদম না।

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here