ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১৪
রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি
অসহ্য গরম।
মনে হচ্ছে পুরো শহরটাকে কেউ বিশাল একটা চুলার উপর বসিয়ে রেখেছে। বাতাস পর্যন্ত যেন গরম হয়ে গেছে। বাইরে রাস্তায় সূর্যের আলো সাদা কংক্রিটের উপর পড়ে চিকচিক করছে। দূরের ভবনগুলোও কেমন ঝাপসা দেখাচ্ছে উত্তপ্ত বাতাসের কারণে।
অথচ গতকালও আকাশভরা মেঘ ছিল। মাঝে মাঝে ঠান্ডা বাতাস বইছিল। আজ যেন প্রকৃতি রাতারাতি সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছে।
শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল কাঁচঘেরা অফিস ভবনের সর্বোচ্চ তলার কর্নার কেবিনে বসে আছে ইখতিয়ার। তার সামনে বিশাল ডেস্ক।
ডেস্কের উপর কয়েকটা ফাইল। একপাশে ল্যাপটপ।
দেয়ালের পুরোটা জুড়ে কাঁচের জানালা। সেখান থেকে নিচের ব্যস্ত শহরটা দেখা যায়।
কিন্তু ইখতিয়ারের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।
সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে।
মুখের বারোটা এমনিতেই সবসময় বাজা থাকে।
অফিসের নতুন কর্মচারীরা তাকে দেখলেই টেনশনে পড়ে যায়। কিন্তু আজকের ব্যাপার আলাদা।
আজ মুখের বারোটার সাথে আরও কিছু যোগ হয়েছে। নিঃশব্দ রাগ। চাপা অস্থিরতা। বিরক্তি ভাব।
এমন এক গম্ভীর ভাব, যা দেখে পুরো অফিসই সাবধানে চলাফেরা করছে। আজ ম্যানেজার হিসেবে তিনদিন হলো অফিসে ফিরেছে সে।
তিনদিন ধরে সবাই একটা বিষয় খেয়াল করেছে।
বস আগের থেকেও কম কথা বলছে।
কাজ ছাড়া একটা শব্দও বের হচ্ছে না মুখ থেকে।
কেউ কোনো প্রশ্ন করলে শুধু মাথা নাড়ে।
কখনো হ্যাঁ। কখনো না। ব্যস।
এই মুহূর্তেও তার চোখ কম্পিউটারের স্ক্রিনে।
কিন্তু মন যে সেখানে নেই, সেটা বোঝা যাচ্ছে।
কারণ একই লাইনে গত তিন মিনিট ধরে তাকিয়ে আছে সে। ঠিক তখনই কেবিনের দরজা খুলে গেল।
নক করার সৌজন্যটুকুও দেখানো হলো না।
ইখতিয়ার চোখ তুলল না। কারণ এই সাহস পুরো অফিসে একজনেরই আছে।
আরহাম। হাতে বিশাল এক গাদা ফাইল। মুখে চরম বিরক্তি। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ-কষ্ট তার কাঁধে এসে পড়েছে।
সে ঢুকেই সোজা ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়াল।
তারপর একটার পর একটা ফাইল ডেস্কের উপর ফেলে দিল। ইচ্ছে করেই শব্দ করছে।
পুরো কেবিন কেঁপে উঠল প্রায়।
কিন্তু ইখতিয়ার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।
শুধু ধীরে ধীরে চোখ তুলল। আরহাম গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
“বা’লের কাজ করি।”
আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বলল,
“জীবন শেষ।”
ইখতিয়ার কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর আবার চোখ নামিয়ে নিল।
আরহাম ভ্রু কুঁচকাল।
সাধারণত এই পর্যায়ে ইখতিয়ার কিছু একটা বলত।
কমপক্ষে একটা বিরক্তিকর মন্তব্য। কিন্তু আজ কিছুই বলল না। আরহাম চেয়ার টেনে বসে পড়ল।
“সকালে আসছি,নাস্তা করতে পারি নাই,মা বলছে বিয়ে কর,আমি বলছি টাকা নাই,মা বলছে তোর টাকা লাগবে না।”
এক নাগারে কথাগুলো বলল আরহাম। ইখতিয়ার তখনও চুপ। আরহাম কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল।
তারপর সন্দেহভরা চোখে তাকাল।
“দোস্ত… তুই বেঁচে আছিস তো?”
ইখতিয়ার ধীরে ধীরে মাথা তুলল। চোখ দুটো কুঁচকে গেল। বলল,
“কাজ শেষ?”
“না।”
“তাহলে বের হও।”
আরহাম হা করে তাকিয়ে রইল।
“ওহহ!”
সে নাটকীয়ভাবে বুক চেপে ধরল।
“আজকে তো রাগের লেভেল ডেঞ্জারাস। আর কিছুদিন পর তোুই আর সূ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকবে না। ছুলেই ছ্যাঁকা। ”
ইখতিয়ার কোনো উত্তর দিল না। আরহাম এবার একটু সিরিয়াস হলো। সে সামনে ঝুঁকে বসল।
“ভাবির খবর কি?”
মুহূর্তেই কেবিনের বাতাস বদলে গেল যেন। ইখতিয়ারের মুখ শক্ত হয়ে উঠল। চোয়ালও।আরহাম সেটা দেখল।
সঙ্গে সঙ্গে বুঝলও—ভুল জায়গায় আঘাত করেছে। কিন্তু সে যে আরহাম। এখানেই থামার মানুষ না।
“ফিরছে?”
ইখতিয়ার চুপ।
“ফোন ধরছে?”
কিছু বলল না।
“ঝাড়ি দিছে?”
চুপচাপ নিজের কাজ করছে ইখতিয়ার। আরহাম মাথা নাড়ল।
“বুঝছি।”
ইখতিয়ার এবার ফাইল খুলে বসেছে। স্পষ্ট ইঙ্গিত—বিষয় শেষ। কিন্তু আরহাম চেয়ারে হেলান দিল।
“শুন।”
কোনো উত্তর নেই।
“আমি যদি তোর জায়গায় থাকতাম—”
“তুই আমার জায়গায় নাই।”
শীতল গলায় বলল ইখতিয়ার। আরহাম থেমে গেল।
তারপর হালকা হেসে ফেলল।
“ঠিক আছে। কিন্তু তুই একটা জিনিস বুঝিস না।”
ইখতিয়ার তাকাল না।
“কি?”
“তোকে দেখলে মনে হয় তোরে দিয়ে কোম্পানি চালানো সহজ,কিন্তু একটা মেয়েরে সামলানো তোর দ্বারা হয় না।”
ইখতিয়ারের হাত থেমে গেল। এক সেকেন্ডের জন্য।
শুধু এক সেকেন্ড। তারপর আবার ফাইল উল্টাতে লাগল। কিন্তু আরহাম সেটা দেখে ফেলেছে।
সে আস্তে করে হেসে মাথা নাড়ল।
“হেড ম্যানেজার সাহেব, হাজার কর্মচারী সামলাও,কিন্তু একটা বউয়ের কাছে পুরো ফেল।”
ইখতিয়ার এবার ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
চোখ দুটো সরু হয়ে এসেছে।
“আরহাম।”
“হুম?”
“তোর কাজ নাই?”
“আছে।”
“তাহলে কর।”
“জি স্যার।”
আরহাম উঠে দাঁড়াল।
কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে আবার থামল।
পেছন ফিরে তাকাল। দেখল ইখতিয়ার আবার ফাইলে চোখ রেখেছে।
তবুও মানুষটা কোথাও নেই। মন অন্য কোথাও।
অনেক দূরে। সম্ভবত একটা মেয়ের কাছে।
আরহাম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারপর আস্তে করে বলল,
“ভাবি ফিরবে।”
ইখতিয়ারের হাত আবার থেমে গেল। আবার বলল আরহাম,
“ইনশাআল্লাহ ফিরবে।”
কোনো উত্তর এলো না। আরহাম আর কিছু বলল না। ধীরে ধীরে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আবার নিস্তব্ধতা।
ইখতিয়ার অনেকক্ষণ একইভাবে বসে রইল।
সামনে খোলা ফাইল। কিন্তু চোখের সামনে ভাসছে অন্য একটা মুখ। একটা রাগী মুখ। একটা অভিমানী মুখ।
এমন একটা মুখ, যেটা এখন এই অফিসের হাজারো কাজের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তার কাছে।
চারিদিকে অসহ্য গরম। ক্যাম্পাসের লাল ইটের ভবনগুলো পর্যন্ত রোদের তাপে চকচক করছে। কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়াতেও যেন স্বস্তি নেই। তবু কলেজের পরিবেশে কোনো ক্লান্তি নেই। কোথাও আড্ডা, কোথাও হাসাহাসি, কোথাও গ্রুপ স্টাডির নামে গল্প।
একাডেমিক ভবনের সামনে কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে গোল হয়ে বসে আছে মুগ্ধা আর তার বন্ধুরা।
অনেকদিন পর মুগ্ধাকে একদম আগের মতো লাগছে। মুখে প্রাণখোলা হাসি।
চোখে দুষ্টুমি। হাত নেড়ে নেড়ে গল্প করছে।
“আমি শপথ করে বলতেছি, ম্যাম আমারে এমনভাবে দেখছে যেন দেশের অর্থনীতি আমি একাই ধ্বংস করছি!”
সাথে সাথে সবাই হেসে উঠল।
নাবিলা বলল,
“তুই ক্লাসে ঘুমাইলে আর কি করবে?”
“আমি ঘুমাই নাই।”
“তাহলে?”
“চোখ বন্ধ করে ভাবতেছিলাম।”
“কি ভাবতেছিলি?”
“পড়ালেখার ভবিষ্যৎ।”
“মিথ্যুক!”
আবারও হাসির রোল পড়ে গেল। মুগ্ধাও হেসে উঠল। তার এই হাসিটা দেখে কেউ বুঝবে না কয়েকদিন আগেও মন খারাপ নিয়ে ঘুরেছে সে।
ঠিক তখনই কলেজ গেটের সামনে একটা কালো বাইকের শব্দ শোনা গেল।
কয়েকজন ছাত্র মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।
তারপর হাসল।
কালো স্পোর্টস বাইকটা এসে থামল ভবনের সামনে। বাইক থেকে নামল ইশতিয়াক।
একই ডিপার্টমেন্টের ছাত্র। কিন্তু কলেজে তার পরিচয় শুধু ছাত্র না।
ডিবেট চ্যাম্পিয়ন। ক্রিকেট টিমের সাবেক ক্যাপ্টেন। বিভিন্ন প্রোগ্রামের প্রাণভোমরা।
আর সবচেয়ে বড় কথা—সবাইকে নিয়ে চলা এক অদ্ভুত প্রাণবন্ত মানুষ। প্রায় ছয় ফুট লম্বা।
চওড়া কাঁধ। বলিষ্ঠ শরীর।
কালো টি-শার্টে বাহুর পেশিগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। মুখে হালকা দাঁড়ি।
কপালের ওপর এলোমেলো চুল।
হেলমেট খুলতেই কয়েকজন জুনিয়র মেয়ে ফিসফিস করে উঠল।
“ইশতিয়াক ভাই!”
“উফ, মানুষ এত হ্যান্ডসাম হয় কিভাবে?”
পাশের একজন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“তোমরা নতুন তাই বলতেছো। পাঁচ মিনিট পর দেখবা উনি কি জিনিস।”
সবাই হেসে ফেলল।
ওদিকে ইশতিয়াক হেলমেট হাতে নিয়ে চারপাশে তাকাল। তারপর চোখ গিয়ে থামল মুগ্ধার ওপর।
মুগ্ধাও তাকিয়েছিল। একবার। শুধু একবার।
তারপর মুখ বাঁকিয়ে অন্যদিকে তাকাল।
নাবিলা হেসে বলল,
“তোর বেস্ট ফ্রেন্ড আসতেছে।”
“দুর্যোগ আসতেছে।”
“মিথ্যা বলিস না।”
“সত্যি।”
“দুইদিন কথা না বললে তোরা দুজনেই অসুস্থ হয়ে যাস।”
মুগ্ধা প্রতিবাদ করতে যাবে ঠিক তখন মাথায় একটা গাট্টা।
“আহহহ!”
মুগ্ধা মাথা চেপে ধরে উঠে দাঁড়াল।
“হারা’মজাদা!”
পেছনে দাঁড়িয়ে ইশতিয়াক। মুখে বিশাল হাসি।
“জ্বি?”
“তুই আমারে মারলি?”
“মারলাম কই? আদর করলাম।”
“এইটারে আদর বলে?”
“তোর মাথায় এত কম বুদ্ধি, একটু ঝাঁকি দিলাম।”
চারপাশে হো হো করে হাসি শুরু হয়ে গেল।
কারণ এই দৃশ্য নতুন না। পুরো ডিপার্টমেন্ট জানে—
মুগ্ধা আর ইশতিয়াক দেখা হওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঝগড়া বাধবেই।
রিফাত চিৎকার করে বলল,
“আজকে রেকর্ড! তিন মিনিটে শুরু হইছে!”
নাবিলা বলল,
“আমার ধারণা ছিল পাঁচ মিনিট লাগবে।”
একজন নতুন ছাত্রী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ওরা কি ভাইবোন?”
পুরোনোরা একসাথে হেসে উঠল।
“না।”
“তাহলে?”
“বেস্ট ফ্রেন্ড।”
“এ কেমন বেস্ট ফ্রেন্ড?”
রিফাত মাথা নাড়ল।
“তুমি এখনো ট্রেলার দেখতেছো।”
এদিকে মুগ্ধা ইতোমধ্যে ব্যাগ তুলে মারার জন্য প্রস্তুত।
“আজকে তোরে মে’রে ফেলব।”
ইশতিয়াক দুই হাত তুলে বলল,
“সাক্ষী থাকিস সবাই।”
“চুপ কর!”
“না।”
“চুপ কর বলছি!”
“না।”
“আমি সিরিয়াস!”
“আমিও।”
“তুই একটা গাধা।”
“তুই দুইটা।”
চারপাশে আবার হাসির রোল। মুগ্ধা এবার সত্যি সত্যি ব্যাগ ছুড়ে মারল। ইশতিয়াক সহজেই সরে গেল।
“এই!”
“ধরতে পারলে মার।”
“দাঁড়া!”
“ধর।”
“আজকে তোর বাইকের টায়ার কেটে দিব।”
“আমার হৃদয় আগে কাটছে।”
“নাটকবাজ।”
“ধন্যবাদ।”
এইবার পাশ থেকে একজন জুনিয়র মেয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এত সুন্দর একটা ছেলে…”
অন্যজন বলল,
“আর সারাক্ষণ ঝগড়া করে!”
কথাটা ইশতিয়াকের কানে গেল।সে মাথা ঘুরিয়ে সেদিকে তাকাল। তারপর সেই বিখ্যাত মিষ্টি হাসিটা দিল।
“আসসালামু আলাইকুম।”
মেয়েগুলো প্রায় গলে গেল।
“ওয়ালাইকুম সালাম ভাইয়া।”
মুগ্ধা দৃশ্যটা দেখে চোখ উল্টে ফেলল।
“দেখছিস? নাটক।”
ইশতিয়াক আবার তার দিকে ফিরল।
“কি বললি?”
“নাটকবাজ।”
“আমি?”
“হ।”
“আমি ভদ্রলোক।”
“তুই?”
“হ।”
“তুই ভদ্রলোক হলে আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।”
সবাই আবার হেসে উঠল। ইশতিয়াকও হেসে ফেলল।
তারপর ধীরে ধীরে মুগ্ধার পাশে বসে পড়ল।
সাই তাকালো। এদের ঝগড়া যতটা জোরে হয়, বন্ধুত্বটা তার চেয়েও অনেক বেশি গভীর।
দুপুর বারোটার রোদটা তখন কলেজ ক্যাম্পাসের ওপর একদম সোজা পড়ছে।
গাছের ছায়াগুলো ছোট হয়ে গেছে, বেঞ্চগুলোর গায়ে গরম লেগে আছে, আর ক্যান্টিনের পাশ থেকে ভেসে আসছে চা আর সিঙ্গাড়ার গন্ধ। চারপাশে ছাত্রছাত্রীদের ভিড়, হাসাহাসি, আড্ডা—সব মিলিয়ে একদম জীবন্ত একটা দুপুর।
একটা বড় গাছের নিচের বেঞ্চে বসে আছে মুগ্ধা।
এক পা ভাঁজ করে বসে, হাতে পানির বোতল। চোখে হালকা বিরক্তি।
তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ইশতিয়াক।
আজকে সে আগের চেয়ে বেশি “ফ্রেন্ডলি মোডে” আছে—মানে, একদম বিপজ্জনকভাবে ফ্রেন্ডলি।
তার সামনে দুজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আরেক পাশে আরও একজন। সবাই তার সাথে কথা বলছে, হাসছে।
ইশতিয়াকও কথা বলছে।
কিন্তু তার কথার ধরনটা এমন—যেন সে সবার সাথে কথা বলছে, কিন্তু কারও কাছেই পুরোপুরি নেই।
“না না, তুমি যেটা বললে সেটা ইন্টারেস্টিং,”
সে আরেক মেয়ের দিকে হালকা হেসে বলল, “তোমার ভাবনাটা বেশ ইউনিক।”
মেয়েটা লজ্জা পেয়ে হাসল।
মুগ্ধা পাশ থেকে চোখ ঘুরিয়ে বলল,
“এই লোকটা কি আজকে সোস্যাল সার্ভিস দিচ্ছে নাকি?”
ইশতিয়াক সাথে সাথে বলল,
“আমি মানুষের সাথে কানেক্ট করি।”
মুগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল,
“তুই মানুষের মাথা খাস।”
ইশতিয়াক হেসে ফেলল।
“একই জিনিস, ডিভারেন্ট এক্টিভিটিস।”
মুগ্ধা বিরক্ত মুখে বোতলটা একটু শক্ত করে ধরল।
“তুই চুপ করবি?”
“না।”
“কেন?”
“কারণ আমি ভালোই মানুষ।”
ঠিক তখনই আরেকটা মেয়ে এসে দাঁড়াল, কিছু জিজ্ঞেস করল।
ইশতিয়াক আবার সোজা হয়ে গেল।
ঠিক তখনই—
দূর থেকে একটা নতুন ছায়া দেখা গেল।
ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।স্নিগ্ধা।
সে হাঁটছে খুব শান্তভাবে।
পরনে হালকা নীল কুর্তি, সাদা ওড়না কাঁধে খুব যত্ন করে রাখা, চুলটা এক পাশে কাঁধে পড়ে আছে। মুখে কোনো অতিরিক্ত ভাব নেই, কিন্তু চোখে একটা অদ্ভুত স্থিরতা আছে—যেন সে জানে কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে।
মুগ্ধা প্রথমে খেয়াল করল।
“এই যে স্নিগ্ধা আসতেছে,” সে হালকা গলায় বলল।
ইশতিয়াক তখনও অন্য মেয়েদের সাথে কথা বলছে। ফ্লার্টিং করছে।
সে থেমে গেল। কারণ একটা ছায়া এসে তার সামনে দাঁড়াল।ইশতিয়াক চোখ তুলল।
এক মুহূর্ত। তারপর থেমে গেল। স্নিগ্ধা।
সে কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল।
ইশতিয়াক হঠাৎ ফোন নামিয়ে ফেলল।
মুখের হাসিটা একটু কমে গেল।
“তুমি কখন এলে?”
স্নিগ্ধা শান্ত গলায় বলল,
“এইমাত্র।”
তার চোখ একটু পাশ ঘুরে মুগ্ধার দিকে গেল, তারপর আবার ইশতিয়াকের দিকে।
ইশতিয়াক হঠাৎ একদম আলাদা হয়ে গেল।
যে ছেলে একটু আগে হাসতে হাসতে মানুষকে কনভিন্স করছিল, মেয়েদের সাথে ফ্লার্টিং করছিল, এখন সে একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে।
হাতটা পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল।
“তুমি এখানে…”
“ক্লাস শেষ,
” স্নিগ্ধা ছোট করে বলল।
তারপর একটু থেমে যোগ করল,
“আপনি ব্যস্ত ছিলে মনে হয়? আমি ডিস্টার্ব করলাম?।”
ইতিয়াক সাথে সাথে উত্তর নিলো,
“আরে না না আমি তোমাদের জন্য অলঅয়েজ ফ্রি”
মুগ্ধা পাশে থেকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“এই লোকটা হঠাৎ এত ভদ্র কেন?”
ইশতিয়াক সাথে সাথে বলল,
“আমি তো সবসময়ই ভদ্র।”
মুগ্ধা হেসে ফেলল।
“নাটক।”
স্নিগ্ধা এবার একটু এগিয়ে এসে মুগ্ধার পাশে দাঁড়াল।
“আপু, তুমি বাড়ি যাবা না?”
মুগ্ধা একটু থেমে গেল।
“কেন?”
“এখানে অনেক গরম,”
স্নিগ্ধা হালকা হাসল
, “আর কিছু মানুষ আছে যারা গরমে আরও বেশি গরম হয়ে যায়।”
ইশতিয়াক এক মুহূর্তে চুপ।
তার চোখ স্নিগ্ধার দিকে গেল। যেন সে ঠিক বুঝতে পারছে না—এই লাইনটা তার জন্য ছিল নাকি কারও জন্য।
মুগ্ধা হেসে ফেলল। এইটা কি ছিল?
ইশতিয়াক মাথা নাড়ল। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে কেন তার? স্নিগ্ধা আবার চুপ।
কিন্তু তার চোখে এক অদ্ভুত সতর্কতা।
সে ইশতিয়াকের দিকে খুব হালকা করে তাকাল—যেন কেউ বাইরে থেকে দেখলে কিছুই বুঝবে না।
কিন্তু ইশতিয়াক বুঝল। সে মুহূর্তে বদলে গেল।
যে ছেলে একটু আগে হালকা ফ্লার্ট করছিল, সে এখন একদম শান্ত।
চোখ নিচু। গলা নরম।
“তুমি কিছু খাবে?”
স্নিগ্ধা একটু থেমে গেল।
“না।”
“ঠিক আছো?”
“হ্যাঁ।”
দুইটা ছোট উত্তর।
কিন্তু তাদের মাঝে একটা অদ্ভুত নীরবতা তৈরি হয়ে গেল।
মুগ্ধা পাশে বসে সেটা দেখে বলল,
ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১৩
“এই সিনে আমি ক্যান্টিনের টেবিলের মতো ব্যবহার হচ্ছি মনে হচ্ছে।”
ইশতিয়াক হেসে ফেলল।
“তুই মূল ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল।”
স্নিগ্ধা এবার খুব হালকা করে হাসল।
কিন্তু তার চোখে হাসিটা পুরো নামল না।
সে ইশতিয়াকের দিকে আরেকবার তাকাল—খুব দ্রুত, খুব চোরা ভাবে। যেটা ধরার মতো না।
কিন্তু ইশতিয়াক ধরল। সে আর কিছু বলল না।
তে তার ভেতরের আত্মা যেন চেঁচিয়ে বলতে চাইছে,
“আল্লাহ এবারের মতো বাঁচিয়ে নাও..”
হয় মানত ও মানছে। কি জানি?
