Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৮

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৮

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৮
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎বিকেল ঠিক চারটা।
‎কলেজ ক্যাম্পাস তখন বিকেলের ব্যস্ততায় জমে উঠেছে। একাডেমিক ভবনের সামনে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছাত্রছাত্রীরা। কোথাও হাসাহাসি, কোথাও ক্লাসের নোট নিয়ে তর্ক, কোথাও আবার চুপচাপ বেঞ্চে বসে গল্প। পশ্চিম আকাশে নরম কমলা রোদ পড়েছে। সেই আলো গাছের পাতার ফাঁক গলে এসে পড়ছে ক্যাম্পাসের হাঁটার পথজুড়ে।
‎দূরে ক্যান্টিনের সামনে ভাজা সিঙ্গারার গন্ধ ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে রিকশার ঘণ্টা, কারও উচ্ছ্বসিত হাসি, আবার কোথাও মাইকের ভাঙা আওয়াজ— সব মিলিয়ে চেনা এক বিকেল।
‎ইশতিয়াক আজ মুগ্ধাকে না নিয়েই আগেভাগে চলে এসেছে। বিকেলের গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসটা মিস দেওয়ার উপায় নেই। মুগ্ধাকে আনতে যায়নি সে। ইচ্ছে করেই যায়নি।

‎ঠিক তখনই ক্যাম্পাসের সামনে এসে থামল একটা কালো বাইক। বাইক থামতেই দু’একজন কৌতূহলী চোখ ঘুরে এলো সেদিকে। বাইকের উপর বসে থাকা সামনের মানুষটার মধ্যে আলাদা একটা ভারী ব্যক্তিত্ব আছে। খুব বেশি কিছু না করেও নজরে পড়ে যায় এমন ধরনের।
‎ইখতিয়ার হেলমেট পরে আছে। সাদা ঢিলাঢালা গেঞ্জিটা বাতাসে হালকা উড়ছে। কালো ট্রাউজারের সাথে সাদা স্নিকার্স। হাতঘড়িটা কালো স্ট্র্যাপের। কনুইয়ের কাছ পর্যন্ত গেঞ্জির হাতা । আঙুলগুলো শক্তভাবে ধরা বাইকের হ্যান্ডেলে। পুরো মানুষটার মধ্যে অদ্ভুত রকমের শান্ত, চাপা একটা রুক্ষতা আছে।
‎তার পাশ থেকে ধীরে নামল মুগ্ধা।
‎আজ ওর পরণে ফিরোজা রঙের থ্রিপিস। জামার হাতা আর ওড়নার কিনারায় সাদা সূচিকর্ম। মাথায় গোলাপি স্কার্ফটা খুব সুন্দর করে জড়ানো। কানের পাশে কয়েকটা চুল বের হয়ে এসে গাল ছুঁয়ে আছে। চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা গোলাপি আভা।
‎একদম সাজগোজ করা নয়। তবুও তাকালে চোখ আটকে যায়।
‎মুগ্ধা নামতেই ইখতিয়ার স্বভাবমতো একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাকিয়ে নিল। যেন নিশ্চিত হচ্ছে সব ঠিক আছে কিনা।

‎“ক্লাস শেষ হলে ফোন দিবা।”
‎গম্ভীর স্বরে বলল সে।
‎মুগ্ধা মাথা নাড়ল।
‎“হুম।”
‎“একলা বের হইবা না।”
‎“আচ্ছা বাবা।”
‎মুগ্ধার মুখের দুষ্টু উত্তর শুনে ইখতিয়ারের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেলেও চোখের কোণে খুব ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিটা এতটাই ছোট ছিল যে অন্য কেউ খেয়াল না করলেও মুগ্ধা ঠিকই ধরল।
‎“যান এখন।”
‎“হুম।”
‎ইখতিয়ার বাইক স্টার্ট দিলেও পুরোপুরি ঘোরায়নি এখনো। মুগ্ধা কয়েক কদম সামনে এগোতেই তার চোখ অজান্তেই মেয়েটার পেছনেই আটকে রইল।
‎ঠিক তখনই ডান পাশ থেকে একজন ছেলে এগিয়ে এলো।
‎লম্বা গড়ন। কালো শার্ট, জিন্স। চুলগুলো সুন্দর করে সেট করা। মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি।
‎আরিয়ান মির্জা। মুগ্ধার সিনিয়র।
‎মেয়েটাকে দেখলেই তার চোখে আলাদা একরকম উজ্জ্বলতা চলে আসে। সেটা সে মুখে স্বীকার না করলেও আচরণে স্পষ্ট।

‎“এই মুগ্ধা!”
‎ডাক শুনে মুগ্ধা ঘুরে তাকাল। চেনা মুখ দেখে হাসল সে। বলল,
‎“আরে ভাইয়া! আপনি?”
‎আরিয়ান সামনে এসে দাঁড়াল। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গি, কিন্তু চোখদুটো একটু বেশিই চমকালো হয়ে আছে।
‎“কোথায় ছিলে এতদিন? দুইদিন ক্লাসে দেখলাম না।”
‎“শরীর একটু খারাপ ছিল।”
‎“এখন ঠিক আছো?”
‎“জি ভাইয়া।”
‎আরিয়ান হাসল।
‎ “গুড। আজকের ক্লাসটা কিন্তু মিস করা যাবে না।”

‎কথা বলতে বলতে সে আরও একটু কাছে এগিয়ে এলো। খুব সূক্ষ্ম দূরত্ব। বাইরে থেকে দেখলে স্বাভাবিক, কিন্তু একটা পুরুষের চোখ এড়ানোর মতো নয়। আর সেই পুরুষটা তখনও বাইকের উপর বসে আছে।
‎ইখতিয়ার। হেলমেটের কালো কাঁচের আড়ালে তার চোখদুটো ধীরে ধীরে সরু হয়ে এলো।
‎সে প্রথমে শুধু দেখছিল। এখন পর্যবেক্ষণ করছে।
‎ছেলেটার দাঁড়ানোর ভঙ্গি। কথা বলার সময় চোখের ভাষা। মুগ্ধার দিকে সামান্য ঝুঁকে আসা। হাসিটা।
‎সব। একজন ছেলে আরেকজন ছেলের দৃষ্টি খুব সহজেই বুঝতে পারে।

‎আরিয়ানের চোখে আগ্রহ আছে। অতিরিক্ত আগ্রহ।
‎ইখতিয়ারের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
‎মুগ্ধা কিছু একটা বলছে। হয়তো ক্লাস নিয়ে। আরিয়ান মন দিয়ে শুনছে, মাঝে মাঝে হাসছে।
‎হঠাৎ ছেলেটা বলল,
‎“আজকে তোমাকে একটু বেশিই সুন্দর লাগছে।”
‎মুগ্ধা একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
‎ “জি?”
‎“মানে… এই কালারটা তোমার উপর ভালো লাগে।”
‎মুগ্ধা হালকা অস্বস্তিতে স্কার্ফটা ঠিক করল।
‎“থ্যাংক ইউ ভাইয়া।”

‎দূর থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল ইখতিয়ার।
‎তার ভেতরে কেমন ঠান্ডা, চাপা একটা বিরক্তি জমতে শুরু করল। রাগ না। কিন্তু রাগের আগের স্তর। মেয়েটা তার বউ।
‎এই সত্যিটা সে খুব জোরে প্রকাশ করে না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ভীষণভাবে অনুভব করে।
‎আর এখন একটা অচেনা ছেলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার বউয়ের দিকে ওই চোখে তাকাচ্ছে।
‎ইখতিয়ার ধীরে ধীরে বাইকের ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল। শব্দ থেমে যেতেই মুগ্ধা অবাক হয়ে পেছনে তাকাল। ও ভেবেছিল ইখতিয়ার চলে গেছে।
‎কিন্তু লোকটা এখনো সেখানেই।
‎কালো হেলমেটের আড়াল থেকেও বোঝা যাচ্ছে তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে আরিয়ানের উপর।
‎আরিয়ান এবার খেয়াল করল বাইকের দিকে।

‎“ওহ… আপনার ভাই নাকি?”
‎মুগ্ধা থমকাল।এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড।
‎তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
‎“না।”
‎“তাহলে?”
‎মুগ্ধার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটল। চোখে হালকা লজ্জা।
‎“আমার হাজবেন্ড।”
‎শব্দটা শোনার পর আরিয়ানের মুখের হাসিটা কেমন থেমে গেল।
‎চোখের ভেতর স্পষ্ট বিস্ময়।
‎“ওহ…”
‎সে আবার ইখতিয়ারের দিকে তাকাল।
‎এই প্রথম সে লোকটাকে ঠিকভাবে দেখল।
‎সাদা সাধারণ গেঞ্জি পরা মানুষটা হঠাৎ আর সাধারণ লাগছে না। বাইকের উপর বসেও কেমন ভারী, দমচাপা একটা উপস্থিতি তৈরি করে রেখেছে।
‎ইখতিয়ার ধীরে ধীরে হেলমেট খুলল। চোখদুটো শান্ত নয়। খুব স্থির। খুব ঠান্ডা।
‎আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড।
‎একটা কথাও বলল না। তবুও সেই চাহনির মধ্যে পরিষ্কার একটা বার্তা ছিল—

‎“দূরত্ব বুঝে চলুন।”
‎মুগ্ধা মুহূর্তেই টেনশন বুঝতে পারল। সে তাড়াতাড়ি বলল,
‎ “আচ্ছা ভাইয়া, আমি যাই। ক্লাসে দেরি হয়ে যাবে।”
‎আরিয়ান জোর করে হালকা হাসল।
‎“জি… অবশ্যই।”
‎মুগ্ধা দ্রুত ইখতিয়ারের কাছে চলে এলো।
‎ইখতিয়ার হেলমেট হাতে নিয়ে ধীর স্বরে বলল, “সিনিয়র?”
‎“হুম।”
‎“অনেক কেয়ার করে দেখলাম।”
‎মুগ্ধা ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপল।
‎“তা করে, অনেক ভালো।”
‎“আচ্ছা?”
‎“হুম।”
‎ইখতিয়ার এবার সরাসরি তাকাল তার দিকে। চোখে অদ্ভুত চাপা কিছু।

‎“ছেলেটা তোমারে পছন্দ করে।”
‎মুগ্ধা থমকে গেল। আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
‎ “হুম জানি তো”
‎“আচ্ছা।”
‎মুগ্ধার বুকের ভেতর কেমন ধক করে উঠল।
‎লোকটার গলায় রাগ নেই। চিৎকার নেই। কিন্তু শান্ত স্বরের নিচে চাপা অধিকারবোধটা এত তীব্র যে সেটা শুনলেই শরীর কেঁপে ওঠে।
‎”ওর সাথে আর কথা বলবা না”
‎”কেন? ছলেটা ভালো তো!”
‎ইখতিয়ার তাকাতেই মুগ্ধা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো। সে ঐ ছেলের থেকে দূরে দূরে থাকবে।
‎ইখতিয়ার আবার হেলমেট পরে নিল।
‎“গুড,ক্লাস শেষ হলে ফোন দিবা।”
‎একই কথা। একই গম্ভীর স্বর। কিন্তু এবার যেন তার ভেতরে অন্যরকম অর্থ লুকিয়ে আছে।
‎মুগ্ধা চুপচাপ মাথা নাড়ল। আর ইখতিয়ার বাইক ঘুরিয়ে চলে গেল। তবে যাওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্তও তার চোখে সেই ঠান্ডা, সতর্ক দৃষ্টি রয়ে গেল।

‎সন্ধ্যা নামার পর থেকেই আকাশটা কেমন মেঘলা হয়ে আছে। বারান্দার বাইরে হালকা বাতাসে গাছের পাতাগুলো দুলছে ধীরে ধীরে। দূরের রাস্তায় গাড়ির শব্দ ভেসে আসছে অস্পষ্টভাবে। মাঝে মাঝে কোথাও কুকুর ডাকছে। ঘরের ভেতর নরম হলুদ আলো জ্বলছে, তবু পরিবেশে কেমন একটা চুপচাপ ভার জমে আছে।
‎মুগ্ধা বাড়ি ফিরেছে অনেকক্ষণ।
‎ইখতিয়ার নিজেই নিয়ে এসেছে কলেজ থেকে। পুরো পথটায় লোকটা খুব কম কথা বলেছে। আগে হলেও অন্তত
‎“ক্লান্ত লাগছে?”,
‎“খাইছো কিছু?”
‎এই ধরনের ছোট ছোট প্রশ্ন করত। আজ সেগুলোও না। শুধু বাইক চালিয়েছে। চুপচাপ।

‎ইশতিয়াক একটু আগেই বের হয়েছে স্নিগ্ধাকে পৌঁছে দিতে। মেয়েটার কয়দিন পর পরীক্ষা, তাই বেশিদিন থাকল না।
‎মুগ্ধা অবশ্য এসব নিয়ে খুব বেশি ভাবছে না। সে এখন আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে জামাকাপড় গুছাচ্ছে। ফিরোজা রঙের থ্রিপিসটা এখনো পরা। মাথার গোলাপি স্কার্ফ খুলে বিছানার উপর রেখেছে। খোলা চুল কাঁধ ছুঁয়ে নেমে আছে।
‎মুখে আস্তে আস্তে গান গুনগুন করছে।
‎কখনো ড্রয়ারের ভেতর কিছু রাখছে, কখনো টেবিলের উপর ছড়িয়ে থাকা ক্লিপগুলো একসাথে করছে। ছোট ছোট কাজে ব্যস্ত।
‎বিছানার একপাশে বসে আছে ইখতিয়ার।
‎কালো ট্রাউজারের সাথে সাদা গেঞ্জিটাই এখনো পরা। দুই হাত হাঁটুর উপর রাখা। মাথা সামান্য নিচু।
‎দেখলে মনে হবে সে হয়তো কিছুই খেয়াল করছে না। কিন্তু করছে। খুব খেয়াল করছে।
‎মুগ্ধা যখন গুনগুন করে গান গায়, তখন তার ঠোঁটের কোণ একটু নড়ে। চুল কানের পাশে সরানোর সময় আঙুলে নরম ভঙ্গি আসে। কথা না বললেও ওর ভেতরের হালকা আনন্দটা বোঝা যায়। আর আজ সেই আনন্দটাই ইখতিয়ারের ভালো লাগছে না।

‎ইখতিয়ার ধীরে শ্বাস ফেলল।
‎তার স্বভাব এমন না যে এসব নিয়ে জিজ্ঞেস করবে। আরও না যে রাগ দেখাবে।
‎সে শুধু চুপ হয়ে যায়।
‎মুগ্ধা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধতে বাঁধতে বলল,
‎“আপনি চা খাবেন?”
‎“না।”
‎ছোট্ট উত্তর।
‎মুগ্ধা ঠোঁট ফুলিয়ে তাকাল।
‎ “একটা মানুষ এত কম কথা কিভাবে বলে আল্লাহ জানে।”
‎ইখতিয়ার তাকাল না। শুধু শান্ত গলায় বলল,
‎ “কথা না বললেও চলে।”
‎“আমার চলে না।”
‎মুগ্ধা আবার নিজের মতো হাসল।
‎ইখতিয়ারের চোখ এবার ধীরে ধীরে উঠল ওর দিকে। মেয়েটা সত্যিই কিছু বুঝছে না নাকি বুঝেও বুঝছে না— সেটা বোঝা কঠিন।
‎কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে হঠাৎ বলল,

‎ “আজ খুব খুশি মনে হচ্ছে তোমারে।”
‎মুগ্ধা অবাক হয়ে তাকাল।
‎“হুম? না তো।”
‎“তাই?”
‎“হ্যাঁ।”
‎ইখতিয়ার মাথা নাড়ল ধীরে। তারপর আবার চুপ।
‎ঘড়ির টিকটিক শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে ঘরে।
‎মুগ্ধা কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে আবার আলমারি গুছাতে লাগল। সে ভেবেছে কথাবার্তা এখানেই শেষ।
‎হঠাৎ ইখতিয়ারের শান্ত গলা আবার শোনা গেল।
‎“সিনিয়র ভাইয়াদের সাথে ভালো সম্পর্ক না তোমার?।”
‎কথাটা প্রশ্ন না। সাধারণ একটা মন্তব্যের মতো।
‎মুগ্ধা ঘুরে তাকাল।
‎ “ওহ, আরিয়ান ভাইয়া?”
‎“হুম।”
‎“ জিজ্ঞেস করছিল আজকে দুইদিন পর আসছে কলেজে কেন!।”
‎ইখতিয়ারের চোখ স্থির হয়ে গেল। দুই সেকেন্ড। তিন সেকেন্ড।
‎তারপর খুব ধীরে বলল, “ভালোই খেয়াল রাখে দেখতেছি।”
‎মুগ্ধা এবার পুরো থেমে গেল।

‎“মানে?”
‎“কিছু না।”
‎আবার সেই চুপচাপ স্বর।
‎কিন্তু এবার শব্দগুলোর নিচে চাপা কিছু আছে।
‎মুগ্ধা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল।
‎ “আপনি কি কিছু বলতে চাচ্ছেন?”
‎ইখতিয়ার এবার তাকাল তার দিকে। চোখদুটো শান্ত। অস্বাভাবিক শান্ত।
‎“না।”
‎“তাহলে এমন কথা বলছেন কেন?”
‎সে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
‎তারপর ধীরে বলল,
‎“ছেলেটা তোমারে পছন্দ করে।”
‎মুগ্ধা হতভম্ব। ইখতিয়ারের অলক্ষ্যে হাসে সে।
‎“তো?”
‎“কিছু না।”
‎“তাহলে?”
‎ইখতিয়ার উত্তর দিল না সঙ্গে সঙ্গে।
‎সে শুধু কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল মুগ্ধার দিকে।তারপর খুব আস্তে বলল,

‎“ঐ ছেলের সাথে আর কথা বলতে দেখিনা যেন।”
‎গলায় রাগ নেই। উচ্চস্বরে ধমকও না। শুধু ঠান্ডা, চাপা একটা দৃঢ়তা। মুগ্ধা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটা তো তাকে খুব একটা পাত্তাই দেয় না। নিজের মতো থাকে। কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে।
‎তাহলে এখন কেন এমন বলছে?
‎সে কিছু বুঝতে না পেরে শুধু ধীরে মাথা নাড়ল। “আচ্ছা…”
‎ইখতিয়ার আর কিছু বলল না।
‎শুধু উঠে দাঁড়াল। মুখে আগের মতোই শান্ত ভাব।
‎কিন্তু ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে তার চোয়ালটা শক্ত হয়ে ছিল।
‎মুগ্ধা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ঘরের মাঝখানে।
‎তার এখনো ঠিক বুঝতে পারছে না— সে আসলে কি করেছে। তার ভুলটা কি? আর কি বা ইখতিয়ার চায়!

‎রাত পুরোপুরি নামেনি এখনো। আকাশে গাঢ় নীলচে আলো ছড়িয়ে আছে। চারপাশে হালকা বাতাস বইছে। দূরের কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ শোনা যাচ্ছে টানা।
‎স্নিগ্ধাদের বাড়িটা দুইতলা। পুরোনো দিনের ছোঁয়া আছে পুরো বাড়িজুড়ে। সামনে ছোট্ট সুন্দর একটা বাগান। সাদা, গোলাপি, হলুদ— নানা রঙের ফুল ফুটে আছে সেখানে। গোলাপ, জবা, ডালিয়া, বেলি… সারি সারি টবে সাজানো। এই বাগানটা মুগ্ধা আর স্নিগ্ধা দুই বোন মিলে বানিয়েছে।
‎ ছোটবেলা থেকেই এই বাড়িতে তার অবাধ যাতায়াত। এই উঠোন। এই বারান্দা। এই ফুলের গন্ধ। সব তার চেনা।
‎কত বিকেল এখানে কাটিয়েছে। কতবার রেজোওয়ান তালুকদারের বকুনি খেয়েছে গাছে উঠে আম পাড়তে গিয়ে। কতবার আয়েশা বেগম নিজের হাতে খাইয়ে দিয়েছেন।
‎এই বাড়িটা তার কাছে কখনো পর মনে হয়নি।
‎তবু আজকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছে।
‎অদ্ভুত নরম একটা অনুভূতি হচ্ছে বুকের ভেতর।
‎হয়তো কারণ— আজ সে শুধু “মুগ্ধার বন্ধু” হয়ে আসেনি।
‎আজ স্নিগ্ধাকে নামিয়ে দিতে এসেছে।
‎বাইক থামাতেই স্নিগ্ধা নেমে গেল আস্তে করে। “ভেতরে আসবেন?”
‎ইশতিয়াক ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,

‎“এত ভদ্রতা দিচ্ছ আমারে?”
‎স্নিগ্ধা মুচকি হেসে মাথা নিচু করল।
‎“আসেন।”
‎ভেতরে ঢুকতেই পরিচিত গন্ধটা নাকে এলো। ঘরের ভেতর আতর আর রান্নার মিশ্র গন্ধ।
‎আয়েশা বেগম ড্রয়িংরুমে বসেছিলেন। ইশতিয়াককে দেখেই মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
‎“আরে ইশতিয়াক আব্বু আইছো?”
‎ইশতিয়াক হেসে এগিয়ে গেল।
‎“খালাম্মা, কেমন আছেন?”
‎“আলহামদুলিল্লাহ। তুমি?”
‎“ভালো।”
‎আয়েশা বেগম স্নেহভরা চোখে তাকালেন ছেলেটার দিকে। নিজের ছেলের মতোই মনে করেন তিনি ইশতিয়াককে।

‎“নাস্তা করে যাও”
‎“না খালাম্মা, পরে খাব।”
‎“পরে মানে? বসো।”
‎ধমকের সুরে বলেই তিনি রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। ইশতিয়াক হেসে সোফায় বসল।
‎স্নিগ্ধা ততক্ষণে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেছে জামাকাপড় বদলাতে।
‎ইশতিয়াকের চোখ অকারণে একবার উপরের দিকে উঠল। তারপর আবার সরিয়ে নিল।
‎কিছুক্ষণ পর আয়েশা বেগম নাস্তা এনে সামনে রাখলেন। সিঙ্গারা, চপ, সাথে ধোঁয়া ওঠা চা।
‎“এই কয়দিন তো তোমারে দেখিই না। তোমার বান্ধবীরে নিয়ে গেছো বলে কি আমাদের আর খোঁজ নিবা না?”
‎ইশতিয়াক চায়ের কাপ হাতে নিয়ে হাসল।
‎ “আরে না খালাম্মা, পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম একটু।”
‎“তোমরা সবাই বড় হইয়া গেছো। আগের মতো আর আড্ডা নাই, মুগ্ধা ও কল দেয়না।”
‎“এই তো আসলাম আমি।”
‎“মুগ্ধা কেমন আছে?”
‎“ভালো আছে।”
‎আয়েশা বেগম মাথা নাড়লেন সন্তুষ্ট হয়ে। মুগ্ধার জন্য মন খারাপ করলেও সন্তুষ্ট সে। জানে তার মেয়ে খুশিতেই থাকবে।
‎ইশতিয়াক খুব মন দিয়ে কথা বলছিল। বড়দের সাথে কথা বলার সময় ছেলেটার মধ্যে আলাদা ভদ্রতা চলে আসে। শান্ত, গুছানো। নাস্তা শেষ করে সে উঠে দাঁড়াল।

‎“আচ্ছা খালাম্মা, যাই তাহলে।”
‎“এত তাড়াতাড়ি?”
‎“কাল সকালে কলেজ আছে।”
‎আয়েশা বেগম দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। “সাবধানে যাইও বাবা।”
‎“জ্বী।”
‎বাইরে বেরিয়ে এলো ইশতিয়াক। রাতের বাতাসটা একটু ঠান্ডা হয়ে গেছে এখন। বাগানের ফুলগুলো হালকা দুলছে বাতাসে। কোথাও বেলি ফুলের গন্ধ ভাসছে। সে একবার স্বভাববশত উপরের বারান্দার দিকে তাকাল। না। কাঙ্ক্ষিত মানুষটার দেখা নেই।
‎কেন যেন বুকের ভেতর হালকা খালি খালি লাগল।
‎নিজেই নিজের উপর হেসে উঠল ইশতিয়াক।
‎তারপর বাইকে উঠে বসল। হেলমেট হাতে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে স্টার্ট দিল।
‎ অমনি স্নিগ্ধা দৌড়ে বেরিয়ে এসেছে। পায়ের শব্দে তাকাল ইশতিয়াক
‎মাথায় হালকা ঘোমটা টানা। পরণে বাড়ির সাধারণ থ্রিপিস। মনে হচ্ছে তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমেছে। শ্বাসও একটু দ্রুত চলছে। ইশতিয়াক কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে।
‎একদম সাজগোজ ছাড়া। তবু নরম। শান্ত।
‎স্নিগ্ধা এসে দাঁড়াল বাইকের পাশে।
‎তারপর খুব আস্তে মাথা নাড়িয়ে বলল,

‎ “বেশি জোরে চালাবেন না… সাবধানে যাবেন।”
‎কথাটা খুব সাধারণ।
‎তবু ইশতিয়াকের বুকের ভেতর কেমন যেন ধাক্কা লাগল।
‎কারণ এই প্রথম স্নিগ্ধা তাকে এভাবে বলল।
‎মেয়েটার চোখে সত্যিকারের চিন্তা ছিল।
‎ইশতিয়াক ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি টেনে বলল, “আচ্ছা।”
‎স্নিগ্ধা আবার বলল,

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৭

‎“গাড়ি চালাতে চালাতে ফোন দেখবেন না।”
‎ইশতিয়াক হাসল। ঝুকল কিছুটা স্নিগ্ধার দিকে। চোখে চোখ রেখে বলল,
‎“জি ম্যাডাম।”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here