Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৯

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৯

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৯
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎গ্রীষ্মের উষ্ণ রাত। বাইরে বাতাস একদমই নেই বলা যায়। চারপাশ কেমন থমথমে গরমে আটকে আছে। দূরের গাছগুলোর পাতাও নড়ছে না‌। বাগানের একপাশে ঝুলানো হলুদ বাল্বের চারপাশে ছোট ছোট পোকা ঘুরছে অবিরাম। কোথাও দূরে কুকুর ডাকছে মাঝে মাঝে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে গরম ভাত, গরুর মাংস আর ভাজা মরিচের গন্ধ।
‎শেখ বাড়ির বড় ডাইনিং রুমটা আজও সরগরম।
‎লম্বা কাঠের টেবিলের চারপাশে সবাই বসেছে রাতের খাবার নিয়ে।
‎রাফেয়া বেগম আর ইন্তিয়া বেগম দু’জন মিলে খাবার সার্ভ করছেন। একজন ভাত বাড়ছেন তো আরেকজন গ্লাসে পানি ঢালছেন। ঘরের সিলিং ফ্যানটা পুরো গতিতে ঘুরছে, তবুও গরম কেন যেন কাটছে না।
‎মুগ্ধাকে জোর করেই বসানো হয়েছে।
‎সে বলেছিল রাফেয়াদের সাথে খাবে। কিন্তু রাফেয়া বেগম ধমক দিয়ে পাশে বসিয়ে দিয়েছেন।
‎“এই বাড়ির বউ বলে আলাদা খাবে ক্যান? আআদের মেয়ে না তুই!”

‎মুগ্ধা আর কথা বাড়ায়নি।সে বসেছে ইখতিয়ারের পাশে।আজ হালকা হলুদ রঙের একটা থ্রিপিস পরেছে সে। চুলগুলো আলগাভাবে খোঁপা করা। মুখে ক্লান্তি থাকলেও চোখে সেই চেনা চঞ্চলতা এখনো আছে।
‎তার পাশেই বসেছে ইশতিয়াক।
‎আর টেবিলের ঠিক সামনাসামনি রহিমা।
‎ইসরাফিলও আছে আজ। চুপচাপ খাচ্ছে। মাঝে মাঝে ফোন দেখছে।
‎ইখতিয়ার বসে আছে একদম নীরবভাবে। কালো টি-শার্ট পরে আছে। হাতঘড়িটার পাশে শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে আছে। মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে খাচ্ছে।
‎দেখলে মনে হবে আশেপাশের কোনো কথাবার্তার সাথেই তার সম্পর্ক নেই। কিন্তু আসলে আছে।
‎সবই খেয়াল করছে।

‎“এই মুগ্ধা, আরেকটু গোস্ত দে।”
‎ইশতিয়াক মুগ্ধার দিকে প্লেট এগিয়ে দিতেই মুগ্ধা চোখ কুঁচকাল।
‎ “নিজের হাত নাই?”
‎“নাই।”
‎“কাইটা গেছে?”
‎“হুম।”
‎মুগ্ধা বিরক্ত মুখে মাছটা এগিয়ে দিল।
‎“ফাজিল ছেলে।”
‎ইশতিয়াক হেসে ফেলল।
‎“তুই না থাকলে আমি না খাইয়া মারা যাইতাম রে,থাঙ্কু বেস্টি,থুরি ভাবি।”
‎সবাই হাসে। মুগ্ধা চোখ ঘুরিয়ে বলে,
‎“মরে যা।”
‎“এই যে দেখো আম্মু, তোমাদের বউমা কেমনে কথা বলে, এক্সচেঞ্জ কর!”
‎রাফেয়া বেগম হেসে উঠলেন।
‎“তোমরা দুইজন ছোটবেলা থেইকাই একরকম।”
‎মুগ্ধা মুখ বাঁকিয়ে পানি খেল।
‎ইখতিয়ার চুপচাপ খেতে খেতে একবার পাশ ফিরে তাকাল। ইশতিয়াক আর মুগ্ধা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছে। কথায় কথায় খোঁচা দিচ্ছে।
‎মুগ্ধার মুখে অনেকক্ষণ পর প্রাণখোলা হাসি দেখা যাচ্ছে। ইখতিয়ার কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে আবার খাওয়ায় মন দিল।

‎ঠিক তখনই রহিমা গলাটা পরিষ্কার করল।
‎“মুখ বুজে খাবার খাওয়া যায় না, যত্তসব ঢঙ”
‎টেবিলে হালকা নীরবতা নেমে এলো। মুগ্ধার হাত থেমে গেল।
‎ইশতিয়াক ভ্রু তুলল।
‎“তুই খা না বুড়ি,আমাদের দিকে না তাকালেই হয়!?”
‎রহিমা খুব মুখ ঝাঝিয়ে ঠোঁট নাড়িয়ে বলল,
‎ ” এত রঙ্গ তামাশা চোখে দেখা যায় না”
‎কথাটা বলেই সে খুব সূক্ষ্মভাবে তাকাল ইখতিয়ারের দিকে। ইশতিয়াকের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল একটু। মুগ্ধা অস্বস্তিতে পানি খেল।
‎এই ধরনের কথা রহিমা আগেও বলেছে।
‎রাফেয়া বেগম বিরক্ত হলেন।

‎“দাদি বাদ দেন না!?”
‎রহিমা ঠোঁট বাঁকাল।
‎“আমি তো খারাপ কিছু বলি নাই।”
‎“তুমি ভালো কথা কবে বলছো?”
‎ইশতিয়াক বিরক্তি স্বরে বলতেই টেবিলে চাপা হাসি পড়ল।
‎রহিমা চোখ রাঙাল তার দিকে।
‎ “তুই চুপ থাক।”
‎ইশতিয়াক খাবার মাখতে মাখতে বলল,
‎ “আমরা চুপ করি আর তুই একা ভাঙা রেকর্ড চালা!?”
‎ইসরায়েল শেখ ধমকে উঠলেন সবাইকে।
‎”কি হচ্ছে চুপচাপ খাও সবাই”
‎সবাই চুপ হয়ে গেলেন। মুগ্ধা খাবার নাড়ছে। খাচ্ছে না। আড়চোখে তাকালো ইখতিয়ারের দিকে।
‎লোকটা তখনো শান্তভাবে খাচ্ছে। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। মুগ্ধা নিজের থালার দিকে নজর দিল। মুখ ভারী তার।

‎রহিমা আবার সুর তুললো।
‎ইখতিয়ার মাথা তুলে তাকাল রহিমার দিকে। শুধু তাকাল। একদম শান্ত চোখে। তবু সেই দৃষ্টির মধ্যে অদ্ভুত কিছু ছিল। না রাগ। না বিরক্তি। কিন্তু ভীষণ স্থির। ভীষণ ঠান্ডা।
‎রহিমার মুখের কথা আচমকা থেমে গেল।
‎চোখে চোখ পড়তেই তার বুকের ভেতর কেমন ধাক্কা খেল যেন।
‎ইখতিয়ার সাধারণত খুব কম কথা বলে। কারও সাথে ঝগড়া করে না। কিন্তু লোকটার চুপচাপ দৃষ্টিটা মাঝে মাঝে কথার চেয়েও বেশি অস্বস্তিকর।
‎পুরো টেবিল কয়েক সেকেন্ড নীরব।
‎ইখতিয়ার ধীরে বলল,
‎“খাবার টেবিলে শান্তিতে খাওয়াটা ভালো।”
‎গলাটা নিচু। শান্ত। কথাটার পর আর কেউ কিছু বলল না।
‎রহিমা তাড়াতাড়ি মুখ নামিয়ে ফেলল। নাকমুখ কুঁচকে ভাত মাখতে লাগল।
‎স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সে চুপসে গেছে।
‎মুগ্ধা চুপচাপ ইখতিয়ারের দিকে তাকিয়ে রইল।
‎লোকটা আবার আগের মতো খাওয়া শুরু করেছে। যেন কিছুই হয়নি।
‎ইশতিয়াকও কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে হঠাৎ হেসে বলল,

‎“আচ্ছা খাই সবাই। গরমে এমনিতেই জান বের হইয়া যাইতেছে।”
‎পরিবেশটা আবার একটু স্বাভাবিক হলো।
‎রাফেয়া বেগম ভাত বাড়তে বাড়তে বললেন,
‎“মুগ্ধা, আরেকটু গোস্ত নে মা।”
‎“না আম্মু, পারব না।”
‎“এই মাইয়া কিছুই খায় না।”
‎ইন্তিয়া বেগমও মাথা নাড়লেন। মুগ্ধা হালকা হাসল।
‎ইখতিয়ার তাকালো। প্লেটে সব পড়ে আছে মুগ্ধার। কিছুই খায়নি তেমন। ইখতিয়ার মাথাটা একটু সরিয়ে নিয়ে গেল মুগ্ধার দিকে। শান্ত ও মৃদু আওয়াজে বলল,
‎ “চুপচাপ খাওয়া শেষ কর,প্লেটে ভাত থাকে না যেন।”
‎মুগ্ধা তাকাল। ইখতিয়ার পূণরায় নিজের জায়গায় চলে গেছে। তবে মুগ্ধা ঠাঁই তাকিয়ে।

‎সকালটা আজ অদ্ভুত সুন্দর।
‎রাতের গরমটা ভোরের হালকা বাতাসে অনেকটাই কমে গেছে। পূর্ব দিকের জানালা দিয়ে নরম সোনালি রোদ ঢুকছে ঘরের ভেতর। বাইরে গাছে গাছে পাখির ডাক। দূরে কোথাও ভাপা পিঠার বিক্রেতার টানা গলা ভেসে আসছে অস্পষ্টভাবে। উঠোন ধোয়া হয়েছে একটু আগেই— ভেজা মাটির গন্ধে পুরো বাড়িটা কেমন সতেজ লাগছে।
‎শেখ বাড়ির সকাল মানেই আলাদা এক ধরনের ব্যস্ততা।
‎কোথাও বাসন ধোয়ার শব্দ। কোথাও কারও ডাকাডাকি। রান্নাঘর থেকে পেঁয়াজ ভাজার গন্ধ ভেসে আসছে।
‎মুগ্ধা আজ অনেক সকালেই উঠে গেছে।
‎ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই পুরো ঘরটা গুছিয়েছে। বিছানার চাদর টানটান করে পেতেছে। বালিশ ঠিক করেছে। ড্রেসিং টেবিলের উপর ছড়িয়ে থাকা ক্লিপ, চুড়ি, স্কিনকেয়ারের ছোট ছোট বোতল সব সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে।
‎তারপর জানালার পর্দা সরাতেই সকালের আলো এসে পড়েছে ঘরের ভেতর। মুগ্ধা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল জানালার পাশে। চুলগুলো খোলা। মুখে একদম ঘুমভাঙা কোমলতা।
‎পেছনে ইখতিয়ার তখন অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছে।
‎আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে শার্ট বের করছে। আজ হালকা নীল রঙের একটা ফরমাল শার্ট পরবে। বিছানার উপর রাখা ঘড়িটা হাতে নিতে নিতে একবার আয়নায় তাকাল।
‎মুগ্ধা ওর দিকে ঘুরে বলল,

‎ “চা খাইবেন?”
‎“হুম।”
‎সবসময়ের মতো ছোট উত্তর।
‎মুগ্ধা ঠোঁট বাঁকাল।
‎ “আপনি কি অফিসে গিয়ে কথা বলে সব শেষ করে ফেলেন নাকি?”
‎ইখতিয়ার টাই ঠিক করতে করতে তাকাল।
‎ “মানে?”
‎“মানে বাসায় এসে রোবট হয়ে যান কেন?”
‎ইখতিয়ারের ঠোঁটের কোণে খুব হালকা হাসি ফুটে উঠল। এক সেকেন্ডের জন্য।
‎“আমি এমনই।”
‎“মানুষ এত শান্ত কেমনে হয়?”
‎“তুমি বেশি কথা বলো তাই এমন লাগে।”
‎মুগ্ধা নাটকীয়ভাবে হাঁ করে তাকাল।
‎ “আচ্ছা! এখন আমার দোষ?”
‎“আমি কি বললাম?”
‎মুগ্ধা বিরক্ত মুখে বালিশ ছুড়ে মারার ভঙ্গি করল।
‎ইখতিয়ার শান্তভাবে ঘড়ি পড়তে লাগল। তবে চোখের কোণে চাপা হাসিটা এবার একটু স্পষ্ট।
‎মুগ্ধা সেটা খেয়াল করেই আরও কাছে এলো।

‎“আজকে তাড়াতাড়ি আসবেন?”
‎“চেষ্টা করব।”
‎“চেষ্টা না। আসবেন।”
‎ইখতিয়ার এবার সরাসরি তাকাল ওর দিকে। কয়েক সেকেন্ড।
‎তারপর খুব ধীরে মাথা নাড়ল।
‎ “আচ্ছা।”
‎মুগ্ধা ভেতরে ভেতরে খুশি হয়ে গেল। এই মানুষটার কাছ থেকে ছোট ছোট উত্তরও কেমন যেন আলাদা লাগে। নিচতলা থেকে তখন ইশতিয়াকের গলা ভেসে এলো।
‎“খাবার দিবা নাকি ঘুমামু গা?”
‎তারপরই রহিমার বিরক্ত স্বর,
‎ “সকালে সকালেই চিল্লানো শুরু করছো!”
‎মুগ্ধা হেসে ফেলল।
‎ “চলেন নিচে।”

‎ইখতিয়ার ফোন আর ওয়ালেট নিয়ে দরজার দিকে এগোল। দু’জন একসাথে নিচে নামতেই নিচতলার চেনা কোলাহলটা আরও স্পষ্ট হলো।
‎ডাইনিং রুমে সবাই জড়ো হয়েছে।
‎রাফেয়া বেগম একদিকে বসে ভাতের হাঁড়ির ঢাকনা তুলছেন। ইন্তিয়া বেগম চা ঢালছেন কাপে কাপে।
‎ইসরাফিল ফোন হাতে বসে আছে। রহিমা মুখ গোমড়া করে প্লেটে পরোটা ছিঁড়ছে।
‎আর ইশতিয়াক? সে পুরো ঘর মাথায় তুলে রেখেছে।
‎মুগ্ধাকে দেখেই বলে উঠল,
‎“ওই যে রাজকুমারী নামছে!”
‎মুগ্ধা চোখ রাঙাল।
‎“চুপ কর।”
‎“কী ব্যাপার? আজকে তো দেখতেছি সকাল সকাল উঠে ঘরও গুছাইছো!”
‎“তোর সমস্যা?”
‎“না, অবাক হইতেছি।”
‎মুগ্ধা বসতেই ইশতিয়াক ইচ্ছা করে প্লেটটা সরিয়ে নিল।

‎ “এইটা আমার।”
‎“আমি কি তোরটা খাইতেছি?”
‎“তুই সব পারস।”
‎মুগ্ধা এবার ইশতিয়াকের হাতে চাপড় মারল।
‎ইসরাফিল হেসে বলল,
‎ “তোমরা দুইজন সকালে শুরু করছো আবার?”
‎ইশতিয়াক নাটকীয়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‎“এই বাড়িতে আমার সম্মান নাই।”
‎“ছিল কোনোদিন?”
‎মুগ্ধা সাথে সাথে বলে উঠল। পুরো টেবিলে হাসির শব্দ উঠল। ইখতিয়ার চুপচাপ বসে নাস্তা করছে।
‎তবে তার চোখ মাঝেমধ্যে মুগ্ধার দিকেই চলে যাচ্ছে। মেয়েটা হাসছে। কথা বলছে। চোখ-মুখ নড়ছে প্রাণবন্তভাবে।
‎এমন সময় ইশতিয়াক আবার বলল, “চাচিম্মা, মুগ্ধারে সকালে উঠাইতে কয়জন লাগত জানেন?”

‎“মিথ্যা কথা বলবি না।”
‎মুগ্ধা গরম পরোটা তুলে মারার ভঙ্গি করল।
‎ইশতিয়াক নাটকীয়ভাবে বাঁচাও বাঁচাও শুরু করে দিল।
‎পুরো টেবিল আবার হাসিতে ফেটে পড়ল।
‎এমন পারিবারিক হইচই শেখ বাড়িতে নতুন কিছু না। কারও খোঁচা। কারও রাগ। কারও হাসি।
‎সব মিলিয়েই বাড়িটার প্রাণ।
‎এইসব কোলাহলের মাঝখানে ইখতিয়ার বরাবরের মতোই শান্ত।
‎সে খুব কম কথা বলছে। কিন্তু মাঝে মাঝে ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটছে।
‎মুগ্ধা সেটা আড়চোখে খেয়াল করল। লোকটা বাইরে থেকে যতটাই গম্ভীর হোক— এই পারিবারিক বিশৃঙ্খলাটা তারও ভালো লাগে।
‎নাস্তা শেষ হতে হতে সকাল আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

‎ইখতিয়ার উঠে দাঁড়াল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ব্যাগ হাতে নিল।
‎মুগ্ধা পিছন পিছন দরজা পর্যন্ত গেল।
‎“লাঞ্চ ঠিকমতো করবেন।”
‎“হুম।”“রাতে তাড়াতাড়ি আসবেন।”
‎ইখতিয়ার কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ধীরে বলল,
‎ “হুম”
‎মুগ্ধা ঠোঁট টিপে হাসল।
‎ইখতিয়ার কিছু বলল না। শুধু বের হওয়ার আগে খুব হালকা করে একবার মাথা নাড়ল। তারপর যে যার কাজে চলে গেল

‎ইশতিয়াক তখন ডাইনিং টেবিলেই বসে চা খাচ্ছিল।
‎মুগ্ধা এসে বলল,
‎“চল পড়তে বসি।”
‎ইশতিয়াক নাটকীয়ভাবে কেঁদে ওঠার ভান করল। “সকাল সকাল অত্যাচার!”
‎“উঠ।”
‎“আমি মেধাবী ছাত্র। আমার পড়া লাগে না।”
‎“তুই ফেল করবি।”
‎“তুই পাশে থাকলেই পাস।”
‎“চুপ কর।”
‎দু’জন হাসতে হাসতে উপরে উঠে গেল নিজেদের ঘরে।

‎‎দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামার আগের সময়।
‎জানালার বাইরে রোদের তেজ কিছুটা নরম হয়ে এসেছে। গরম এখনো আছে, তবে বাতাসে হালকা অলসতা মিশে গেছে। শেখ বাড়ির নিচতলায় এখন আর সকালের মতো কোলাহল নেই। চারপাশ অনেকটাই শান্ত।
‎মুগ্ধা নিজের ঘরে পড়তে বসেছে।
‎ঘরটা বেশ বড়। একপাশে বড় জানালা। পাতলা সাদা পর্দা বাতাসে ধীরে ধীরে দুলছে। দেয়ালের একপাশে বুকশেলফ। আর পাশাপাশি রাখা দুইটা টেবিল।
‎একটা ইখতিয়ারের। আরেকটা মুগ্ধার।
‎দুই টেবিলের পার্থক্য দেখলেই মানুষ দুটোকে আলাদা করে চেনা যায়।
‎মুগ্ধার টেবিল এলোমেলো। রঙিন কলম, খোলা খাতা, চুলের ক্লিপ, আধখাওয়া চকলেট, ছোট্ট টবের মানিপ্ল্যান্ট— সব ছড়িয়ে আছে।
‎আর ইখতিয়ারের টেবিল? একদম গুছানো।
‎ফাইল একপাশে। কলমগুলো নির্দিষ্ট জায়গায়। ল্যাপটপের পাশে ঘড়ি। একটা কাগজও বেঁকে নেই।
‎লোকটার মতোই। পরিপাটি। শান্ত। নিয়ন্ত্রিত।

‎মুগ্ধা বই খুলে বসেছিল বেশ মন দিয়ে। কিন্তু কিছু লিখতে গিয়েই বিরক্ত মুখে থেমে গেল।
‎কলম শেষ।
‎“ধুর!”
‎খাতার উপর কলম ঠুকল কয়েকবার। কাজ হলো না। সে বিরক্ত মুখে উঠে দাঁড়াল। তারপর সরাসরি গেল ইখতিয়ারের টেবিলের দিকে।
‎“মিস্টার পারফেক্টের কাছে অবশ্যই দশটা কলম থাকবে…”
‎বিড়বিড় করল সে। ড্রয়ার খুলল। না।
‎তারপর টেবিলের পাশে রাখা ছোট্ট কালো বক্সটার দিকে হাত বাড়াল। কলমের বক্স।
‎মুগ্ধা সেটা খুলতেই ভেতরে সুন্দর করে সাজানো কয়েকটা কলম দেখা গেল। সে একটা নিতে গিয়েই অসাবধানতায় পাশে রাখা একটা মোটা বইয়ে হাত লাগিয়ে ফেলল। ধপ।
‎বইটা মেঝেতে পড়ে গেল। মুগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে জিভ কাটল।
‎ “ইস!”
‎যেন ইখতিয়ার সামনে থাকলে এখনই বকা দিত।
‎সে তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে বইটা তুলল। ধুলো ঝাড়তে গিয়েই খেয়াল করল— বইটার নিচে চাপা পড়ে ছিল একটা হলুদ খাম। খামটা একটু পুরোনো। কোণাগুলো হালকা ভাঁজ পড়ে গেছে।
‎মুগ্ধা প্রথমে গুরুত্ব দিল না। কিন্তু পরের মুহূর্তেই চোখ আটকে গেল খামের উপরের লেখায়।
‎“প্রিয়তম ইখতিয়ার” সুন্দর হাতের লেখা।

‎খুব যত্ন করে লেখা হয়তো । মুগ্ধার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। হাতটা অজান্তেই থেমে গেল মাঝপথে। কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়ে রইল সে খামটার দিকে। তারপর খুব ধীরে সেটা হাতে নিল।
‎মাথার ভেতর অদ্ভুত একটা শব্দ হতে লাগল।
‎প্রিয়তম? ইখতিয়ারকে? কার?
‎মুগ্ধা ঠোঁট ভিজিয়ে নিল জিভ দিয়ে।
‎দেখা উচিত না। অন্যের ব্যক্তিগত জিনিস দেখা ঠিক না। বিশেষ করে ইখতিয়ারের। লোকটা এমনিতেই ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে ভীষণ সংরক্ষিত।
‎মুগ্ধা খামটা আবার রেখে দিতে গেল।

‎বুকের ভেতর কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। কৌতূহল হচ্ছে। ভয়ও লাগছে একটু।
‎ইখতিয়ারের জীবনে কি কেউ ছিল? প্রশ্নটা মাথায় আসতেই বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
‎মুগ্ধা ধীরে ধীরে বিছানার পাশে এসে বসল।
‎ঘরের বাইরে বাতাসে পর্দা নড়ছে আস্তে তবু এই মুহূর্তে সবকিছু কেমন স্তব্ধ লাগছে। তার আঙুল ধীরে খামের মুখ খুলল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো সাদা একটা কাগজ।
‎ভাঁজ করা।
‎মুগ্ধার হাত কাঁপছে হালকা। সে খুব আস্তে কাগজটা খুলল। সুন্দর বাঁকা লেখা। স্পষ্ট অক্ষর।

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৮

‎সাদা কাগজের মাঝখানে মাত্র চার লাইন লেখা—
‎“তুমি আমার কাছে অন্ধকার রাত শেষে ভোর,যাকে দেখে বাঁচার ইচ্ছে জাগে। আমার খুব কাছের কেউ। কল্পজগতে আঁকিবুঁকি করার সম্বল। নির্ঘুম রাতে চিন্তামুক্ত হওয়ার কৌশল। ভালোবাসি।”
‎নিচে ছোট করে লেখা—
‎~প্রেমিকা

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ১০