যাত্রাপথ পর্ব ৫২
মাশফিত্রা মিমুই
সারা ইউনিয়ন খুঁজেও সোহেলকে কোথাও পাওয়া গেলো না। সারারাত মেয়ে নিয়ে মদের আসরে ডুবে থাকলেও দিন হলে ঘরের ছেলে ঠিকই ঘরে ফিরে আসে। অথচ চারদিন ধরে সেই ছেলে নিখোঁজ। তাও আবার এক অদ্ভুত ঘটনার পর থেকে। মা শায়েলা ছেলের চিন্তায় কেঁদে কেঁদে অস্থির। আশেপাশের কিছু ছেলে ছোকরা নিয়ে ক’দিন ধরে ভাইকে খুঁজছে সাদ্দাম। মাস তিনেক আগেই মেয়ে সন্তানের পিতা হয়েছে সে। যার ফলে ফুফুর বাড়িতে যাতায়াত অনেকটাই কমে গিয়েছে।
উঠোনের একপাশে কেদারায় বসে আছেন হেলেনা। আজ নাজমুলের বউ-ভাতের অনুষ্ঠান। তাই রান্নাঘরে গৃহিণীদের ব্যস্ততা অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ একটু বেশি। মিছরি আগের থেকে এখন কিছুটা সুস্থ। জ্বর সারতেই বিছানা ছেড়ে বাকিদের সাথে কাজে লেগে পড়েছে। বাড়িতে দেবরের নতুন বউ এসেছে, বড়ো বউ হিসেবে ঘরে শুয়ে বসে থাকলে হয়? মনের অবস্থাও এখন স্বাভাবিক, স্বামীর সেবা আর ভরসায় বাস্তবতার সাথে মানিয়ে নিচ্ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কলপাড় থেকে গোসল সেরে বের হয়ে এলো নাজমুল। নানীকে উৎসুক দৃষ্টিতে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভারি লজ্জা পেলো সে। হেলেনা টিটকারী মেরে বললেন,“সাতসকালে আমার নানা ভাইয়ে কীয়ের গোসল করছে? ফরজ গোসল?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
চারিদিকে তাকিয়ে সবাইকে একবার দেখলো নাজমুল। ভেজা লুঙ্গিটা দড়িতে না মেলে ঘরের দিকে হাঁটা ধরলো সে। ফটকের দ্বারে মায়ের সঙ্গে দেখা হতেই মায়ের কাঁধে ঝুলিয়ে দিয়ে বললো,“নানীরে কিছু কও, আম্মা।”
হেলেনা হো হো করে হেসে দিলেন,“পোলায় শরম পায়।”
শাহরিয়ার, পারভেজও নানীর কথায় শব্দ করে হেসে ওঠে। মর্জিনা ছেলের লুঙ্গি দড়িতে মেলে দিতে দিতে মায়ের উদ্দেশ্যে বললেন,“পোলাডারে শরম দিয়েন না তো, আম্মা। পরে আর ঘর থাইক্যা বাহির হইবো না।”
“মাইয়া মাইনষের মতন শরম পাইলে হইবো? নতুন বউ কই?”
“ঘরে, সাজতাছে।”
তাদের গল্পের মধ্যেই হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে ঢুকলেন সিরাজ উল্লাহ। আশেপাশে কোথাও তাকালেন না, ভদ্রতা বজায় রেখে কাউকে সালামও দিলেন না। সোজা হেঁটে চলে গেলেন বড়ো বোনের ঘরে। হেলেনা সেদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“এইডা কেডা গেলো? গৃহস্থ বাড়িতে ঢোকার আগে যে কাশি দিতে হয় তাও জানে না? বেয়াদব।”
“বড়োজনের ভাই। ছ্যাঁচড়ার মতন সারাক্ষণ বাড়িত পইড়া থাহে।”
“এহনো বন্ধ হয় নাই? কিছু কয় না কেউ?”
“কেডায় কী কইবো? আমনের জামাই তো ভাই ভক্ত মানুষ। এর লাইগা কবে জানি আমার হাতে ঝাঁটার বাড়ি খায়।”
“থাক, কিছু কইস না। জামাইয়ের গায়ে হাত তুলতে নাই। পাপ হইবো।”
“এর লাইগাই তো এহনো সুস্থ সবল চলতে পারতাছে। না হইলে!”
“তোর রাগ বেশি। আল্লাহ জানে, তোর পুতের বউ আবার না তোর মতন হয়।”
“আমার মতন হইলেই জামাইরে টাইট দিয়া রাখতে পারবো। না হইলে তিন বেলা শুধু লাত্থি, উষ্ঠা খাইতে হইবো। রক্ত তো ভালা না।” কথা বলতে বলতে পিছু ফিরে তাকালেন তিনি।
কোথা থেকে যেন নাজির এলো বাড়িতে। তবে মূল ফটক দিয়ে নয় বরং পেছনের ফটক দিয়ে। এক হাতে তার লুঙ্গি ধরা, অপর হাতে দড়ি দিয়ে বাঁধা মাটির কলস। পেছনে আরো দুটো কলস হাতে লতিফ এসে দাঁড়িয়েছে। গতকাল লতিফকে দিয়ে খেজুর গাছে কলস বাঁধিয়েছিল সে। আজ ভোরের কুয়াশা মাথায় নিয়ে তাকে দিয়েই গাছ থেকে রস ভর্তি সেই কলসগুলো পারিয়েছে নাজির। যদিও আরো আগেই বাঁধার কথা ছিল, কিন্তু বৃষ্টির কারণে গাছ পিচ্ছিল থাকায় বাঁধা হয়নি। ওখানে দাঁড়িয়েই সে চিৎকার করে ডাকলো,“তাল মিছরি!”
মাথায় ঘোমটা টেনে মেজো চাচীর রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এলো মিছরি। নাজিরের ভ্রু জোড়া কিঞ্চিৎ কুঁচকে গেলো,
“অসুখ ভালা হইছে? চুলার পাড় কী?”
“এখন আমি সুস্থ। সবাই রান্না করছিল তাই একটু দেখছিলাম।”
তার হাতটা নাকের কাছে টেনে নিয়ে শুঁকলো নাজির। পেঁয়াজ, আদা, রসুনের বিদঘুটে গন্ধ লেগে আছে। চোখ রাঙাতেই চোরা চোখে আশেপাশে তাকালো মিছরি। নাজির কিছু বললো না। নিজেই ঘর থেকে গ্লাস এনে ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে রস ঢেলে বললো, “মৌসুমের প্রথম রস। খাইয়া দেহো তো কেমন লাগে।”
“কাঁচা রস! খাবো না, মাথা ধরবে।” নাক মুখ কুঁচকে নিলো সে।
“চুপচাপ খাও, কিছু হইবো না। খালি নাখরা করে।” চাপা ধমক দিলো নাজির।
কথায় না পেরে বারান্দার পিঁড়িতে বসে এক নিঃশ্বাসে গ্লাসের পুরোটা রস খেয়ে নিলো মিছরি। রস পাতলা, তবে খেতে অসম্ভব মিষ্টি। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মাথায় হালকা ঝিম ধরলো তার, চোখ হয়ে উঠলো ঝাপসা, হঠাৎ শীত যেন খানিক বেড়ে গেলো। কাঁপতে কাঁপতে শরীরের শীত চাদরটা আরেকটু টেনে নিতেই নাজির হেসে বললো,“এইটুকু সহ্য করতে না পারলে হইবো, বউ?”
মিছরি তাকে চোখ রাঙালো। হেলেনা ডেকে বললেন, “শুধু কচি বউরে খাওয়াইলেই হইবো, নাজির? একটু আমগো মতন বুড়িগো মিহিও দেখ।”
আবারো গ্লাসে রস ঢাললো নাজির। হেলেনার কাছে যেতে যেতে বললো,“কচি থুইয়া বুড়িগো মিহি দেখতে হুনছেন কহনো?”
“হ, যহন কচি আছিলো না তহন এই বুড়িই আছিলো। কেমন স্বার্থপর ব্যাডা মানুষ!”
নাজির সামান্য হাসলো। হেলেনা দুই ঢোক খেয়েই হার মেনে নিলেন। মেয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “জাল দেওয়া রস দিয়া চিতই পিঠা খামু।”
“জাল দেওয়ার লাইগাও আনছি।”
হাতের রস ভর্তি কলসটা কিছুক্ষণের মধ্যেই খালি হয়ে গেলো। ভাইয়েরা, বাচ্চাকাচ্চারা সবাই এসে কাঁচা রসই খেয়ে নিলো। বাদবাকি কলস নিয়ে লতিফকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলো নাজির। তার মা আবার ভালো রস জাল দিতে পারে। প্রতি বছর তাকে দিয়েই জাল করায় নাজির। মিছরি গেলো রান্নাঘরে, সবাইকে হাতে হাতে সাহায্য করতে। দুপুরে আজ সারা গ্ৰাম এই বাড়িতে আমন্ত্রিত।
শীতের সকালে হাঁটাহাঁটি করে কিছুক্ষণ আগে বাড়ি ফিরেছেন আমিরুল শাহ। ঘর্মাক্ত পোশাক বদলে নাশতা করে কেদারায় হিসাব-নিকাশ নিয়ে বসতেই ভেতরে আগমন ঘটলো শ্যালকের। তবে শ্যালককে দেখে মোটেও তিনি অবাক হলেন না। আব্বাসকে ইশারায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বললেন,“দাওয়াত তো দুপুরে, সিরাজ। তুমি দেহি সকাল সকালই আইয়া পড়ছো?”
মশকরা করার অবস্থায় সিরাজ উল্লাহ নেই। এতটা পথ হেঁটে আসায় হাঁপাচ্ছেন। ঠান্ডার মধ্যেই ঘামে ভিজে গিয়েছে পরিধেয় বস্ত্র। আমিরুল শাহ পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে তাকে বসতে বললেন। সিরাজ উল্লাহ বসে পানি পান করে দম ছেড়ে বললেন,“সেই রাইতের পর থাইক্যা সোহেলরে আর খুঁইজা পাওয়া যাইতাছে না, দুলাভাই। ওয় কোত্থাও নাই।”
“ডরাইছে হয়তো। ডরের চোটে গা ঢাকা দিছে। চিন্তা কইরো না, আইয়া পড়ব।”
“ওয় আমার পোলা। ডরাইলেও আমারে বা সাদ্দামরে কিছু না কইয়া এতদিন পলাইয়া থাকবো না। ওর লগে কিছু একটা হইছে। খুব খারাপ কিছু।”
“কী খারাপ হইবো? কেডায় করবো?”
দাঁতে দাঁত পিষে বললেন,“নাজির।”
গম্ভীর আমিরুল শাহ শব্দ করে হেসে উঠলেন। যেন কোনো কৌতুক শুনেছেন। সিরাজ উল্লাহ চাপা ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন,“আমনে হাসতাছেন? আমার পোলা পাইতাছি না আর আমনের হাসি আইতাছে?”
“হাসতাছি অন্য কারণে। চিন্তায় তোমার বোইনের মাথায় রক্ত উইঠা গেছে। কইতাছে, নাজির সব জাইনা গেছে, ওর বউয়ে ওরে সব কইয়া দিছে। এইডাও বিশ্বাস করা যায়, কিন্তু সোহেলরে নাকি নাজিরে গায়েব কইরা দিছে। এইডা কী বিশ্বাসজনক? একলা এক পোলায় আস্ত একটা মাইনষেরে কেমনে গায়েব করবো? আমরা টের পাইলাম না ক্যান? কেউ দেখলো না ক্যান? তোমার বোইনেই তো ওরে নিজ চোখে মাঝ রাইতে দুয়ারে দেখছে।”
“নাজির একলা না। ওর ভাই আছে না? সারাক্ষণ ওর কথায় উঠে আর বসে। চামচাও তো একটা আছে।”
“সকাল সকাল মেজাজ খারাপ কইরো না, সিরাজ। নওশাদের এত সাহস নাই। জীবনেও আমগো কথার উপরে কথা কয় নাই, চোখ তুইল্যা তাকায় নাই পর্যন্ত। আর চামচা কোনডা? মিল্টন? পোলাপাইন মানুষ। হ, নাজিররে অবশ্য অনেক মান্য কইরা চলে। তাই আমি সন্দেহবশত নিজে গিয়া খোঁজ নিছিলাম। ওয়, লতিফ আর নওশাদ মিল্যা সারা রাইত ওগো মাছের প্রজেক্ট পাহারা দিছে।”
সিরাজ উল্লাহর চৌকস মন সেকথা মানতে নারাজ। সবার চোখের আড়ালে কিছু একটা ঘটেছে, কিন্তু কী ঘটেছে? সোহেল ঠিক আছে তো? এখানে এসেই থেমে যান লোকটা। পিতা মন অস্থির হয়ে ওঠে। আর বসেন না সেখানে। বড়ো বোনের সঙ্গে কথা না বলেই যেভাবে এসেছিলেন ঠিক সেভাবেই বেরিয়ে যান শাহ বাড়ি থেকে।
দুশ্চিন্তায় কোনো কাজে মন বসাতে পারেন না ফরিদা। রান্নায়ও আজ করে বসেন ভুল। কালি পড়া ভাতের পাতিলটা পুকুর পাড়ে মাজতে যেতেই খপ করে তিনি চেপে ধরেন মিছরির ঘাড়। মিছরি অবাক হয়, ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে। ফরিদা চাপা স্বরে বলে ওঠেন,“বে** মাগী, এই বাড়িত আওয়ার পর থাইক্যা একটা না একটা ঘটনা ঘটতাছেই। নাজিররে আমি খাওয়াইয়া পড়াইয়া এত বড়ো করছি, এহন ওয় আমার লগে আগের মতন আর কথা কয় না। আর সোহেল! কই ওয়? ওর লগে কী করছোস তুই?”
মহিলাকে মিছরি আর ভয় পায় না। দেখলেই গা ঘিন ঘিন করে। তাছাড়া গায়ে গতরে শক্তি, উচ্চতাও তাঁর থেকে মিছরির বেশিই। তাই খুব সহজে হিংস্র মহিলার থাবা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো সে। চামড়া কুঁচকে যাওয়া হাতটা আচমকাই মুচড়ে ধরে রহস্যময় হাসলো। আশপাশ সতর্ক দৃষ্টিতে দেখে ফিসফিস করে বললো,“এসব নোংরা গালি তোর মতো চরিত্রহীনার সাথেই যায়। এই বাড়িতে আসার পর থেকে আমার স্বামীর চেয়েও বেশি তোকে আমি সম্মান করেছিলাম, বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু তুই তো ডাইনি। তাই আমার সম্মান আর বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে পারিসনি। সেই নিজের আসল রূপটা দেখিয়েই দিলি, তাই না?”
ফরিদা বিস্ফোরিত নেত্রে হাঁটুর বয়সী মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকেন। ব্যথায় মুখের রং বিবর্ণ হয়ে উঠেছে। এটা কী সেই মেয়ে, যে সবার ভয়ে কুঁকড়ে থাকতো? দশ কথায়ও রা পারতো না? না, এটা হতে পারে না। মিছরি তাকে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দিলো। দেহের ভারসাম্য ধরে রাখতে না পেরে ফরিদা লুটিয়ে পড়ল ধূলোমাখা মাটিতে। কনুই আর হাতের তালুর নরম চামড়া ছিঁলে বেরিয়ে এলো রক্ত। সেসব দেখে অধরে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো মিছরির। হাঁটু গেড়ে সামনে বসে বললো,“অপরাধ করে কেউ কখনো পার পেতে পারে না। উপরে একজন আছেন। তিনি সব দেখেন, শুনেন, জানেন। তোর মতো নিকৃষ্ট মহিলাদের বিচার তিনিই করবেন। সোহেলের যেই অবস্থা হয়েছে তার থেকেও ভয়ংকর অবস্থা তোর হবে। আমিও কাশেম আলীর মেয়ে। সবাই বলে, একেবারে বাবার মতো হয়েছি। তাই কোনো অংশে আমায় কম মনে করিস না। এতকাল চুপ ছিলাম ভয়ে নয়, ভদ্রতায়।”
পাতিল ধুয়ে বাড়ির ভেতরের দিকে হাঁটা ধরে মিছরি। ফরিদা পুনরায় চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করেন,“কী করছোস সোহেলের লগে? কই ওয়?”
হাঁটতে হাঁটতেই একবার পেছন ফিরে তাকায় মিছরি। মুখ বাঁকিয়ে বলে,“কে জানে কই? হয়তো জাহান্নামে, হয়তো বিভৎস দেহখানা কোনো জন্তু জানোয়ারের খাদ্য হয়ে খাদ্যনালীতে বাস করছে, নয়তো বা ফিট ভেবে খেয়ে ফেলেছে নদীর মাছে।”
ফরিদা বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। ধীরে ধীরে হারালেন চেতনা। এভাবে যে কতক্ষণ পড়ে রইলেন কে জানে? দুপুরের দিকে সঙ্গী সাথীদের সঙ্গে খেলতে এসে এই অবস্থায় তাকে পড়ে থাকতে দেখতে পেলো সুমা। সে-ই দৌড়ে গিয়ে বাপ, চাচাদের ডেকে আনলো। সামিউল আর পারভেজ ধরাধরি করে মাকে নিয়ে গেলো ঘরে। শাশুড়ির মাথায় পানি ঢেলে, হাতে-পায়ে তেল মালিশ করে শেষমেশ জ্ঞান ফেরাতে সক্ষম হলো বিথী।
বউ ভাত উপলক্ষে বাড়ি অতিথি দিয়ে ভরে উঠেছে।মর্জিনার বাপের বাড়ির লোক, পুত্রবধূর নানাবাড়ির লোক থেকে শুরু করে দূরদুরান্তের আত্মীয়-স্বজনসহ গ্ৰামবাসী সবাই। কিন্তু তাতেও মর্জিনা শান্তি পাচ্ছেন না। হঠাৎ বাড়ির মানুষগুলোর কী হলো? একে একে সবাই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ফরিদা। বিয়ের এত বছরেও গর্ভাবস্থা ছাড়া ওই মহিলাকে কখনোই তিনি অসুস্থ হতে দেখেননি। অথচ আজ কিনা এভাবে জ্ঞান হারালো? আড়ালে কী ঘটছে যা মর্জিনা জানেন না?
দুপুরের ভোজনের সময় হয়ে গেলো। মুমিনুল শাহ দুই পুত্র আর ভাতিজা নিয়ে ছুটলেন অতিথি আপ্যায়নের উদ্দেশ্যে। নওশাদ, মিল্টন, জাহিদ, শাহরিয়ার মিলে সবাইকে বেড়ে দিচ্ছে খাবার। আমিরুল শাহ ছেলে- মেয়েদের উদ্দেশ্যে বললেন,“তোরা সবাই অনুষ্ঠানের কাছে যা। দেখ, সব ঠিকঠাক আছে কিনা। মাইনষে অনুপস্থিতি দেখলে পিঠপিছে কেচ্ছা রটাইবো।”
মাকে ছেড়ে পারভেজ আর আয়েশার যেতে ইচ্ছে করল না। দুজনেই ভীষণ মা ভক্ত কিনা! ওদিকে সামিউল আবার বাকিদের থেকে ভিন্ন। সে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় বাবাকেই। বাবার প্রত্যেক আদেশ তার কাছে নিজের জীবনের থেকেও যেন অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তারা যেতেই আমিরুল শাহ স্ত্রীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়লেন,“হঠাৎ অচেতন হইয়া পড়ছিলা ক্যান? সকালে তো চাড়ি ভইরা খাইতে দেখছি। দুর্বল হওয়ার মানুষ তো তুমি না। তাইলে? কী দেইখা ডরাইছো?”
ফরিদার চোখ জোড়ায় এখনো আতঙ্ক বিরাজমান। উঠে বসার চেষ্টা করতেই আমিরুল শাহ থামিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফরিদা বললেন,“বাড়িত খাল কাইট্টা কুমিড় ঢুকাইছি, সামিউলের বাপ! আমার এত বছরের সাজানো গোছানো সংসারটা ধ্বংস কইরা দিতাছে।”
সরু দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন আমিরুল শাহ। ফরিদা সেই দৃষ্টি পরখ করে বললেন,“ওরা আমগো সোহেলরে মাইরা ফেলাইছে।”
চোখমুখ কুঁচকে নিলেন আমিরুল শাহ। সকালে এসে ভাইও একই কথা বলে মেজাজ খারাপ করে দিয়েছে, আর এখন ভর দুপুরে মাথা খারাপ করছে রেখে যাওয়া বোন। ভাই-বোন দুটোই পাগল হয়ে গিয়েছে। কটাক্ষ করে বললেন,“লাশ কই?”
“জানি না আমি। সবকিছু হাতের বাহিরে যাওয়ার আগেই আমগো শক্ত হইতে হইবো।”
“তোরা ভাই-বোইনে গিয়া হ, বালপাকনা শমসের। মাথামুণ্ডু খারাপ কইরা দিতাছে। জীবনের বড়ো ভুল তো তোর মতন চুতমা** বিয়া করা।”
আর কোনো কথা না শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন আমিরুল শাহ। যেন তাঁর কোনো চিন্তা নেই, ভাবার সময় নেই। ওইটুকু এক ছোকরা নাকি তাঁর মতো চতুর লোকের নাকের ডগা দিয়ে মানুষ মারবে। এও বিশ্বাসজনক? মানুষ মারার মতো সাহসী নাজির নয়। যা তেজ আর জোর সব মুখে আর কাজে। পরমুহূর্তেই আবার ভাবেন, জানলে ফরিদা আর সিরাজ উল্লাহর আসল রূপ জেনেছে। তাঁরটা তো আর জানেনি। মুমিনুল শাহ নিজে সব প্রমাণ লোপাট করেছে। ফাঁসলে কী একা ফাঁসবেন নাকি? মাথা নাড়িয়ে হাসলেন লোকটা। চলে গেলেন অতিথিদের কাছে।
মাস্টার বাড়ির সবাইকেও অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। আগের মতো সম্মুখ শত্রুতা এখন আর তাদের মধ্যে নেই। যা আছে শুধুই চাপা হিংসা আর ক্ষোভ। এখন দুই বাড়ির যেকোনো অনুষ্ঠানেই একে অপরের নিমন্ত্রণ রক্ষা করে উপস্থিত হতে দেখা যায় তাদের। তবে বাড়ির নারীরা কেউ আসেননি। কাশেম আলী দুদিন আগেই বাড়ি বয়ে এসে মেয়েকে দেখে গিয়েছেন। আজ সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন কপালের ঘা শুকানোর কী একটা ওষুধ। খাওয়া শেষে মেয়ের কাছে এসে দাঁড়ালেন তিনি। চাঁদের মতো সুন্দর মুখে কপালের ওই বিচ্ছিরি দাগটা কলঙ্কের মতো লাগছে। আলগোছে হাতে ওষুধের প্যাকেটটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন,“কেমন আছেন, আম্মাজান?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো, আব্বা। তুমি?”
প্রশ্নের উত্তর দিলেন না তিনি। আদরের মেয়েকে শত্রু ভর্তি বাড়িতে রেখে ভালো থাকবেন কীভাবে? কৃত্রিম হেসে বললেন,“জীবনে কোনোকিছু নিয়া চিন্তা করার প্রয়োজন নাই, আম্মা। তোর আব্বা এহনো বাইচ্চা আছে। এই মলম নিয়ম কইরা দুইবার কাটা জায়গায় লাগাইবা। দাগ দূর হইয়া যাইবো।”
“তুমি চিন্তা করো না তো, আব্বা। আমি ঠিক আছি। তোমাদের জামাই আমার খুব যত্ন করে।”
“যত্ন নিলেই তো শুধু হইবো না, যত্ন করতেও হইবো। বিশ্বাস করা ভালা কিন্তু অন্যের ভরসায় থাকা উচিত না, আম্মা। মনে রাখবা, দুনিয়াডা শক্তের ভক্ত, নরমের যম। তাই সবসময় শক্ত থাকবা, সত্যের পক্ষে থাকবা। মেলা বড়ো হইছো তুমি, তোমার উপরে এহন কত দায়িত্ব! জামিলের লগে যা করতে পারো নাই সোহেলের লগে তা করছো। আমি খুশি হইছি, গর্ব হইতাছে আমার। একেবারে বাপের যোগ্য মাইয়া।”
মিছরি মুচকি হাসলো। ভাইদের তাদের দিকে আসতে দেখে ওখানেই বাবা-মেয়ের কথার ইতি ঘটলো। এসেই তালেব সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়লো,“তোর কপালে কী হইছে?”
যাত্রাপথ পর্ব ৫১
স্বামীর শিখিয়ে দেওয়া মিথ্যে বললো সে,“খাট থেকে পড়ে গিয়ে কেটে গেছে।”
মাসুম বিশ্বাস করল কিনা বুঝা গেলো না। চিন্তিত হলো সে। এগিয়ে এসে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে দেখলো। বকাঝকাও করল। এখনো কী সে ছোটো বাচ্চাটি আছে? খাট থেকে পড়ে কীভাবে? তালেবও শাসন করল, চিন্তিত হলো ভীষণ। নাজির অদূরে দাঁড়িয়ে ভাই-বোনদের কার্যকলাপ চুপচাপ শুধু দেখে গেলো। মাঝখানে আর এলো না।
ওখানেই বউ ভাতের অনুষ্ঠান শেষ হলো। যাওয়ার সময় নতুন বউ শিউলিকে তার পরিবার নিজেদের সঙ্গে নাইওর নিয়ে গেলো। নাজমুল যাবে রাতে।
