যে শ্রাবণে প্রেম আসে সারপ্রাইজ পর্ব
তোনিমা খান
নিস্তব্ধ রজনীর নিরবতায় তখন ধরিত্রী বাসী নিদ্রাচ্ছন্ন। তবে আরণ্যক এক পিতৃত্ব শূন্য অন্তঃস্থলে না আছে প্রশান্তি আর না আছে আরামের নিদ্রা। চোখদুটো চাতক পাখির ন্যায় খোলা শ্রেয়ানের। উদাম বুকের উপর উবু হয়ে শুয়ে আছে সপ্তাহ খানেকের ছোট্ট একটি নবজাতক। সন্তান নিজের বুকে রয়েছে, আরামে শুয়ে আছে; একজন পিতার জন্য এর থেকে অধিক সুখের আর কি প্রয়োজন?
এহেন প্রশ্নটি বড্ডো বেমানান শোনালো শ্রেয়ান নামক ব্যক্তিধারী মানুষটির জন্য। কেননা তার পিতৃত্ব যে বিস্তৃত এই দুনিয়ার নিয়ম ছাড়িয়ে।
নিদ্রাহীন অস্থির অন্তঃস্থল নিয়ে শ্রেয়ান উঠে বসলো। বুকে জড়িয়ে রাখা মেয়েটি তখন একটু নড়েচড়ে উঠলো। শ্রেয়ান ম্লান হেসে তার গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। অতঃপর অতি সাবধানে পাশে শায়িত স্ত্রীর পাশে শুইয়ে দিলো মেয়েকে। টিশার্ট ঝেড়ে বিছানা থেকে নেমে ফোন হাতে সোজা বারান্দায় চলে গেলো। ফোনের স্ক্রিনে তখন জ্বল জ্বল করছে রাত্রির দুইটা বেজে দশ মিনিট। ডায়ালপ্যাড ঘেঁটে ইরফান শেখ নামক নাম্বারটি বের করল। কিয়ৎকাল উদাসীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নাম্বারটিকে। বক্ষস্থল জর্জরিত হয়ে উঠলো দীর্ঘশ্বাসে। মাঝেমধ্যে এই মানুষটাকে অনেক ক্ষমতাধর মনে হয় তার; খুব হিংসে হয় এই মানুষটা যে তার পরীর জনক। তার মেয়েটার উপর এই পৃথিবীতে সবার থেকে বেশি অধিকার রাখে সে।
ইদানীং আফসোস নিষ্ঠুরতার সাথে ইরফানের অন্তঃস্থলকে গ্রাস করে চলেছে। তার আফসোস হয় সুখী ইরাকে দেখে, তার আফসোস হয় শ্রেয়ান নামক বাবা’র জান ইরামকে দেখে। অথচ এই মানুষদুটো একদা একমাত্র তার ছিল। আজ যাদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর অধিকার ও তার নেই। মাঝেমধ্যেই ইরফান উগ্র আচরণ করে বসে নিজের সাথে। ইচ্ছে করে ইরার কাছে ছুটে যেতে আর বলতে, তার সবকিছু তাকে ফিরিয়ে দাও— সে যত্ন করে আগলে রাখবে! কিন্তু সময় আর সুযোগ যে দূর্বার গতিতে তার পিছু ছুটে গিয়েছে।
স্ত্রীর চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে মাসে একবার করে তিন চারদিন এর মতো ইরফানকে ঢাকায় থাকতে হয়। তবে এই মাসে দুই সপ্তাহের জন্য ইরফান ঢাকায় আছে। আজ সকালে ইরফান স্ত্রী সমেত হাজির হয় তার বাসায়। সাথে থাকে নিদারুণ যন্ত্রনাদ্বায়ক এক আবদার! যন্ত্রনাদ্বায়ক ই মনে হয় শ্রেয়ানের কাছে। কেননা ইরামকে সে কোন পর্যায়ে ই হাতছাড়া করতে নারাজ। ঐ প্রাণটির মাঝে যে তার আত্মিক প্রশান্তি রয়েছে। ইরফান আবদার করে, সে আর এক সপ্তাহ ঢাকাতে আছে; ইরামকে দুইদিনের জন্য নিজের কাছে রাখতে চায়। শ্রেয়ান তখন জোরপূর্বক মৃদু হেসেছিল কেননা সে যে অসহায়। না করার অধিকার তার নেই! তাকে রাজি হতে হয় এবং ইরার ও এখানে কোন দ্বিরুক্তি ছিল না। সে নিরবে সায় জানায়। তবে ইরামের ভরপুর নারাজি ছিল এই সিদ্ধান্তে। শ্রেয়ান তাকে বোঝালো ইরফান আর তার স্ত্রীর একাকী জীবনের দুর্দশা। বোঝায় তার উপস্থিতি তাদের একাকী জীবনে একটু আনন্দ দেবে। ইরাম বাবাকে ভালোবাসে তার থেকেও বেশি মান্য করে। তাই তো নিরবে চলে যায় ইরফানের সাথে।
মেয়েটির ছোট ছোট কাজগুলো নিজ দায়িত্বে সম্পন্ন করা শ্রেয়ানের অভ্যাস। আজ যখন এই অভ্যাসে খানিক বিঘ্ন ঘটলো তার অন্তঃস্থল আন্দোলন শুরু করে দিলো। সে ফোনটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এখন নিশ্চয়ই সবাই গভীর ঘুমে রয়েছে। ফোন দেবে কি? যদি বিরক্ত হয়? সকাল থেকে একটাবার দেখেনি! কি করছে? আনন্দেই আছে হয়তো! পাপাকে কি একটুও মিস করছে? করার তো কথা নয় ওখানেও যে একজন পাপা রয়েছে, আসল পাপা! রক্তের টান তো কখনো ফিকে পড়ে না। অজশ্র যন্ত্রনা এসে হানা দিল অন্তরে। চোখের কার্নিশ লাল হয়ে উঠলো শ্রেয়ানের। দিনশেষে এই একটা জায়গা থেকেই নিজেকে অসহায় মনে হয় তার। কেন ঐ মেয়েটির জীবনে দু’জন বাবার উপস্থিতি? যন্ত্রনা দ্বিগুণ হারে বাড়তে লাগলো। তখন জেদ প্রচুর জেদ হলো শ্রেয়ানের। সেও তো বাবা! তার ও অধিকার রয়েছে মেয়ের প্রতি। সেই জেদ ধরেই সে মেয়েকে কল দেয়ার জন্য উদ্বত হলো। কিন্তু তার গতিরোধ হলো সরব ফোনটি বেজে উঠতেই। শ্রেয়ান থমকালো স্ক্রিনে ইরফান শেখ নামটি ভেসে উঠতেই। ঠোঁটের কোনা ঠিকরে স্মিত হাসি ফুটে উঠলো। দ্রুত ফোনটা রিসিভ করে কানে ঠেকালো সে। অপরপাশ থেকে তৎক্ষণাৎ কোন আওয়াজ আসলো না; একদম নিস্তব্ধ, নিস্তেজ। শ্রেয়ান ও নিরব রইলো। কিয়ৎকাল বাদ নাক টানার শব্দ কানে আসতেই সে মৃদু হেসে উঠলো। ছলছল চোখে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে মিহি স্বরে শুধায়,
–“এতো রাতে জেগে আছো কেনো?”
অপরপ্রান্ত থেকে কোন জবাব আসলো না বরং ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠার শব্দ ভেসে আসলো। শ্রেয়ান একই রকম শান্ত স্বরে শুধায়,
–” কাঁদছো কেনো?”
অপরপাশ থেকে ঠিকরে আসলো ফ্যাসফেসে ক্রোধ জর্জরিত কণ্ঠ।
–“তুমি পঁচা, বাজে!”
শ্রেয়ান হাসলো মেয়ের ক্রোধে জর্জরিত কণ্ঠে। শুধায়,
–“আমি আবার কি করেছি?”
–“যে কেউ আসবে, আমায় নিয়ে যেতে চাইবে আর তুমি দিয়ে দেবে আমায়?”
–“দিয়েছি কখনো?”
–“তো কি করেছো? আমায় এখানে পাঠিয়েছো কেনো?”
–“পাপা তোমায় খুব ভালোবাসে মা।”
–“কারোর দু’জন পাপা হয়না।”
–“হয়, যার উপর আল্লাহ তায়ালার অধিক রহমত থাকে তার একাধিক পাপা হয়। তোমার উপর আল্লাহর অনেক রহমত তাই তোমার একাধিক পাপা রয়েছে।”
ইরাম শুনলো তবুও নিজ জেদে অটল থেকে গম্ভীর ফ্যাসফেসে গলায় বলল,
–“আমি এখানে থাকবো না। এখানে কেনো পাঠিয়েছো? নিয়ে যাও।”
–“পাপা তোমায় কতো আদর করে, মা। পাপাদের বাড়িতে তো কোন বেবি নেই। তাই তো তারা তোমায় একটু কাছে পেতে চায়।”
–“আমায় কেনো? এরপর থেকে শ্রবণকে পাঠিয়ে দেবে। ও তো বেবি!”
শ্রেয়ান হেসে মাথা নেড়ে বলল,
–“আচ্ছা।”
অন্ধকারাচ্ছন্ন বারান্দায় চুপটি করে এক কোনায় বসে থাকা ইরাম থমথমে মুখে নাক টানতে টানতে গম্ভীর গলায় বলল,
–“নিতে আসো, আমি থাকবো না এখানে।”
টলটল করা চোখের কার্নিশ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো শ্রেয়ানের। দিনশেষে হারতে হারতেও প্রতিবার এই মেয়েটি তাকে জিতিয়ে দেয়। বুঝিয়ে দেয় সে মেয়েটির একমাত্র কাছের মানুষ, তার একমাত্র পাপা। সে মিহি স্বরে বলল,
–“কাল একদম সকাল সকাল নিতে আসবো, মা। এখন লক্ষ্মী বাচ্চার মতো ঘুমিয়ে পড়ো।”
অপরপ্রান্ত থেকে ঠিকরে আসে একটি রাগি জেদি কণ্ঠ।
–“এখুনি আসবে। আমার ঘুম আসছে না শুধু কান্না পাচ্ছে।”
শ্রেয়ানের অনৈতিক চাওয়ারা যেনো আস্কারা পেলো। পুরো দিনের যন্ত্রনাদ্বায়ক ছটফটানি সে ভোলেনি। দু’টো দিন এই যন্ত্রনা নিয়ে থাকা সম্ভব নয়। সে বোকাসোকা কণ্ঠে শুধায়,
–“এখুনি আসবো? খারাপ দেখায় মা।”
সহসা অপরপ্রান্ত টুট টুট শব্দ করে নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। শ্রেয়ান অবাকপানে ফোনের দিকে তাকায়। মেয়েটা এভাবে মুখের ওপর ফোন কেটে দিলো? প্রচুর বদমেজাজি! সব রাগ শুধু তার সাথে। সে দ্রুত পায়ে ঘরে ঢুকলো। কাবার্ড থেকে শার্ট বের করতে করতে কাঁধে ফোন চাপলো। সাথে সাথে রিসিভ হলো, ভেসে আসলো একটা মিষ্টি হুমকি ,
–“এখুনি নিতে না আসলে আর কখনো ফিরে আসবো না। এখানেই থেকে যাবো।”
শ্রেয়ান হাসিমুখে শার্ট জড়াতে জড়াতে গাড়ির চাবি পকেটে ঢুকিয়ে ছুটে বের হয়। যেতে যেতে হড়বড়িয়ে বলে,
–“রেডি হয়ে থাকো, পনেরো মিনিটের মধ্যে আসছি।”
–“দশ মিনিট।”
–“আরে উড়ে উড়ে আসবো না-কি?”
–“কিভাবে আসবে জানি না কিন্তু দশ মিনিটের মধ্যে আসবে। আমার ঘুম পেয়েছে কিন্তু ঘুমাতে পারছি না।”
–“যথাআজ্ঞা, আমার মা!”, শ্রেয়ান হেসে বলল।
ঠিক দশ মিনিট বায়ান্ন সেকেন্ডের মাঝে হোটেল গেটের সামনে শ্রেয়ানের গাড়িটি থামলো। গাড়ি থেকে বের হতেই ইন্টেরিয়র ডিজাইনার লাইটের আলোয় স্পষ্ট হয় বার্বিডল কাস্টমাইজড স্কুল ব্যাগ কাঁধে হাঁটু সমান মাল্টি কালারের ফ্রক পড়া আদুরে মেয়েটির। শ্রেয়ানের চক্ষু শীতল হয়। বিলম্বহীন ইরফানের হাত ছাড়িয়ে ছোট্ট দেহটি ছুটে এসে আঁছড়ে পড়লো তার বুকে। শ্রেয়ান মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। দৃষ্টি তাক করে অদূরে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ইরফানের দিকে। এই মানুষটাকে কোনকালেই সে বলার মতো কিছু খুঁজে পায় না। কখনো দয়া ও আসে না শুধু মনুষ্যত্ববোধের জায়গা থেকেই সর্বদা একটা সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলে। সে কয়েকপা এগিয়ে যায়। আসার পথেই ইরফানকে ফোন করে জানিয়েছে যে সে ইরামকে নিতে আসছে। ইরফানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ধিমি কণ্ঠে বলল,
–“আসছি, আপনারা চট্টগ্রাম যাওয়ার আগে একবার এসে ঘুরে যাবো।”
ইরফান নিরুত্তর শুধু ঘাড় দুলিয়ে সায় জানায়। চোখমুখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে না বলতে পারা বেদনা। লালচে চোখদুটো টলটল করছে। শ্রেয়ান উপেক্ষা করলো সেই বেদনাভরা চাহনি। সে তো দোষী নয়! তবে কেনো এই বেদনাগুলো কে নিজের উপর ভারী পড়তে দেবে? সে তো ছুঁড়ে ফেলা দুটি মূল্যবান তাজকে তাদের সঠিক স্থানে বসিয়েছে। তার এই সাজানো গোছানো সংসারটি এখন তার ভয়ের কারণ! এই জীবনে ইরফান এবং মাহি নামক এই দুটি মানুষের উপস্থিতি তার মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে।
শ্রেয়ান দ্রুত পা চালিয়ে পিছু হটে যায়। কখন না আবার পিছুটান তার জীবন থেকে সুখ কেড়ে নেয়!
বাবার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে মেয়েটি। যেনো রাজ্যের সুখ এই জায়গাজুড়ে। গাড়ি পর্যন্ত যেতে যেতে শ্রেয়ান মেয়ের চুলের গোছায় চুমু দিয়ে মেয়েকে ক্ষেপাতে বলল,
–“তুমি এখন বুড়ি হয়ে গিয়েছো—অথচ এখনো পাপার কোলে চড়ে বেড়াচ্ছো; লজ্জা করে না?”
তৎক্ষণাৎ ভেসে আসলো গোয়ার কণ্ঠ।
–“নাহ করে না। আমার পাপ্পার কোলে আমি উঠেছি তাতে তোমার কি?”
শ্রেয়ান তৎক্ষণাৎ ভদ্র ছেলের মতো মাথা নেড়ে বলল,
–“না না আমার আবার কি? তোমার পাপ্পার কোলে তুমি উঠেছো আমার কিছুই না।”
–“তাহলে চুপ করে থাকো।”, ইরাম মিটিমিটি হেসে বলল। বাবা তার ধমকে ভদ্র ছেলে হয়ে গিয়েছে কি-না!
এমনি হুমকি ধমকি দিয়ে বাবাকে সে সবসময় ভদ্র ছেলে বানিয়ে রাখে।
গাড়ির সিটে বাবা মেয়ে বসতেই মেয়েটি আরাম করে বাবার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লো। শ্রেয়ান গাড়ি চালাতে চালাতে হাত বুলালো মেয়ের ঘন কালো চুলে। সেই ছোট্ট ইরামের সৌন্দর্য বড়ো হওয়ার সাথে সাথে আরো দ্বিগুণ বেড়েছে। যেমন তার অপার্থিব সৌন্দর্য তেমন লম্বা ঘন তার চুল। শ্রেয়ানের মাঝেমধ্যে মনে হয় সে যদি এই পুতুলটিকে সর্বদা নিজের ঘরে সাজিয়ে রাখতে পারতো!
হোটেল রুমে ঢুকতেই রাগ, বেদনায় কাতর ইরফানের অন্তঃস্থল ফেটে পড়লো। সাজিয়ে রাখা কাঁচের শোপিছটি ছুঁড়ে মারলো মেঝেতে। মাথার চুল আঁকড়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। ঘরে ঘুমিয়ে থাকা নিহার হতচকিত ভয়ার্ত বদনে দৌড়ে আসে। ইরফানকে ওভাবে কাঁদতে দেখে সে চিন্তিত কণ্ঠে শুধায়,
–“কি হয়েছে ইরফান এমন করছো কেনো? আর ইরাম কোথায়?”
ইরফান জবাব দেয় না সে নিজের মতো বিলাপ করছে,
–“আমার মেয়ে…আমার মেয়ে আজ আমার সাথে অপরিচিতদের মতো ব্যবহার করছে নিহার। ও আমার অংশ হয়েও আমি ওর উপর অধিকার দেখাতে পারি না কেনো? ও ঐ শ্রেয়ানের জন্য পাগল! ওর বাবা তো আমি তবে ও কেনো আমায় ভালোবাসে না? কেনো ও ঐ শ্রেয়ানের বুকের সাথে লেগে থাকে? কেনো ওকে আদর করে? আমাকে কেনো করে না? কেনো আমার কাছে কিছু চায় না? কেনো আজ আমার পরীর মতো মেয়েটা আমার নেই?”
ইরফান উন্মাদের মতো কাঁদছে। নিহার দ্রুত তার কাঁধে হাত রেখে শান্ত করার প্রয়াস করে। কিন্তু ইরফান তাকে ছুঁতে দেয় না। নিহারের হাতটা দূরে সরিয়ে দেয়। ঘৃণা ভরা কণ্ঠে বলল,
–“ছুঁবে না আমায় একদম ছুঁবে না। দূরে সরো।”
নিহারের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো ইরফানের ব্যবহারে। বছর সাত আগেও দয়া দেখিয়ে একবার থেকে গিয়েছে এই সংসারে। এমন ব্যবহার সে সহ্য করবে না। সে জ্বলন্ত চোখে তাকালো, বলল,
–“খবরদার ইরফান আমার সাথে এমন ব্যবহার করার দুঃসাহস দেখাবে না। তোমার এই দশার কারণ আমি না তুমি নিজে। আমি তোমার আর ইরার সংসার ভাঙতে যাইনি। তুমি আমায় প্রস্তাব দিয়েছিলে। স্ত্রী সন্তান থাকতেও তুমি আমায় কেনো জড়িয়েছিলে নিজের সাথে? এখন সব আমার দোষ হয়ে গিয়েছে? আমি কি তোমার ঘরে গিয়ে উঠে বসেছিলাম?”
ইরফান কাঁদতে কাঁদতে শান্ত হয়ে পড়ে। আফসোস আর দুঃখভরা কণ্ঠে বলে,
–“নাহ তোমার কোন দোষ নেই।”
–“এটা বুঝলে এরপর থেকে আর আমার সাথে এমন করতে আসবে না। আমায় ইরা ভেবো না যে আমি সব মুখ বুজে সহ্য করবো। আমি তোমায় সাত বছর আগেই ডিভোর্স দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি আমার হাতে পায়ে ধরে রেখেছো। তাই সুন্দর আচরণ করবে আমার সাথে। একমাসের বাচ্চাটাকে যখন তার মায়ের সাথে রাতের বেলায় বাসে উঠিয়ে দিয়েছিলে তখন কোথায় ছিল তোমার এই ভালোবাসা? এখন যেই দেখছো তোমারি স্ত্রী সন্তান নিয়ে কেউ সুখে সংসার করছে ওমনি গায়ে জ্বালা ধরছে, তাই না? কোন কিছু থাকতে কদর করতে জানতে হয়। এখনো বলছি ইরফান আমার বেলায় অন্তত এই ভুল করো না। নিজেকে শুধরে নাও, নয়তো দেখবে একদিন তোমায় একা একা পঁচে মরতে হবে।”
বলেই নিহার গটগট করে ঘরে চলে যায়। ইরফান নিরুত্তর শুনেগেলো শুধু। নিজের উপর নিজের হাসি আসছে তার। সত্যিই তার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে ইরা আর ইরামকে শ্রেয়ানের সাথে সুখী জীবনযাপন করতে দেখে। এটাই তার শাস্তি! এখন এই অভিশপ্ত জীবন নিয়েই তাকে বাকি জীবনটা পার করতে হবে।
সকালে ঘুম থেকে উঠতেই ইরা চমকে উঠলো শ্রেয়ানের বুকে ইরামকে দেখে। সে চকিতে উঠে বসলে শ্রেয়ান ধমকে উঠলো,
–“আস্তে আস্তে, এতো তাড়াহুড়োর কি হয়েছে?”
ইরা মেয়েকে দেখিয়ে অস্ফুট শব্দ করলো,
–“এহ্ এহ্!”
শ্রেয়ান তার দৃষ্টি অনুসরণ করে বোকাসোকা হাসলো। ঘাড় দুলিয়ে বাচ্চাদের মতো করে বলল,
–“মাঝরাতে গিয়ে নিয়ে এসেছি।”
কানে মেশিন না থাকায় ইরাকে ঠোঁটের আঁকার ইঙ্গিত বুঝতে হলো! বুঝতে পেরে সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল শ্রেয়ানের পানে। বিগত এই সাতটি বছরে সে কম পাগলামী দেখেনি এই বাবা মেয়ের একে অপরের জন্য। মাঝেমধ্যে এই বাবা মেয়ে তাকে এটা ভুলতে বাধ্য করে যে তাদের একে অপরের মধ্যে কোন রক্তের সম্পর্ক নেই। তাদের মধ্যে তো আত্মার সম্পর্ক!
বিগত বিরক্তিকর রাতটা দাদুভাইয়ের কাছে গল্প শুনতে শুনতেই কাটিয়ে দিয়েছে শ্রবণ। সকাল আটটা নাগাদ তার ঘুম ভাঙলো। সে দাদুভাইয়ের ঘর থেকে হেলতে দুলতে বাবা মায়ের ঘরে আসলো। উদাসীন দেহে দরজা খুলে ঢুকতেই তার চোখ যায় বিছানার দিকে। ওমনি তার চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেলো বিছানায় ইরামকে শুয়ে থাকতে দেখে। অতি বিস্ময়ে সে পাপা বলে চিৎকার করে উঠলো। সদ্য বাথরুম থেকে বের হওয়া শ্রেয়ান ছেলেকে সাবধান করে বলে উঠলো,
–“শসস! আস্তে আব্বু! আপা ঘুমাচ্ছে। গতকাল রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি একটুও বিরক্ত করবে না।”
শ্রবণ তৎক্ষণাৎ ঠোঁটে আঙুল চাপলো। পা টিপে টিপে বাবার কাছে এসে ফিসফিসিয়ে শুধায়,
–“পাপ, তুমি আপাকে নিয়ে এসেছো?”
শ্রেয়ান একহাতে ছেলের চুলে হাত গলিয়ে দিয়ে আরেকহাতে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল। মিহি স্বরে বলল,
–“হ্যাঁ, আপনার আপাকে রাতে গিয়ে নিয়ে এসেছি।”
–“ওহ্, পাপা। এতোদিনে তুমি একটা কাজের কাজ করলে। থ্যাংক ইউ, পাপা।”, শ্রবণ উল্লাসের সাথে বলল। শ্রেয়ান মুখ বিকৃত করে শুধায়,
–“এমনি সময় কি আমি অকাজ করি, বদ ছেলে? আপা এসেছে আর আপনার শয়তানি করার সুযোগ হয়েছে তাই না?”
শ্রবণ ঘন ঘন মাথা নাড়লো। উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“পাপা, তিনবেলা না খেয়ে থাকা যায় কিন্তু তোমার মেয়েকে না জ্বালিয়ে থাকা যায় না। ইম্পসিবল! আমি তো মরে যাবো। খবরদার আর কখনো ইরফান আঙ্কেলের বাসায় ওকে পাঠিও না। তুমি বরং তোমার ছোট গম্ভীর মেয়েকে পাঠিয়ে দিও তবুও আপাকে পাঠিও না। আমার দম বন্ধ হয়ে যায় মনে হয় অক্সিজেন পাচ্ছি না…”, বলতে না বলতেই শ্রেয়ান তার কন মলে দিলো। শ্রবণ চেঁচিয়ে উঠলো। শ্রেয়ান বলল,
–“পাজি ছেলে! সবসময় এতো দুষ্টুমি পান কোথায়? অক্সিজেন পাচ্ছেন না? তিনবেলা না খেয়ে থাকা যায়? তবে আজ দেখবো আপনি তিন বেলা না খেয়ে কিভাবে থাকেন। এই ইরা, মিলা আর মামনি আজ শ্রবণকে তোমরা কেউ কোন খাবার দেবে না।”, শ্রেয়ান ছেলেকে ছেড়ে ঘর থেকে বের হতে হতে হাঁক ছেড়ে বলল। শ্রবণ চোখ বড়ো বড়ো করে তাকায় বাবার পানে। বিলম্বহীন তার পেছনে ছুটতে ছুটতে বলে,
–“আরে পাপা, তুমি সিরিয়াসলি নিয়ে নিচ্ছো কেনো? আমি তো এমনি কথার কথা বলেছি। তুমি তোমার ছেলেকে না খাইয়ে রাখতে পারবে? এতো পাষাণ তুমি?”
শ্রবণ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল। শ্রেয়ান হেসে উঠলো ছেলের কথায়। হাঁটতে হাঁটতে পিছু ফিরে বলল,
–“আমি পাষাণ। আজ আপনি খাবার পাচ্ছেন না পাজি ছেলে।”
–“নো পাপা ইউ ক্যান্ট ডু দিজ! আমাকে না দিয়ে তুমি খাবার মুখে তুলবে কি করে? মাম্মা! মাম্মা দেখো দেখো পাপা বলছে কি! আমায় নাকি খাবার দেবে না। তুমিই বলো আমি খাবার ছাড়া দুমিনিট থাকতে পারি? তুমি আমায় খাবার ছাড়া রাখতে পারবে?”, শ্রবণ বলতে বলতেই রান্নাঘরে ঢুকলো। ইরা হাসছে বাবা ছেলের বাকবিতন্ডা শুনে। শ্রবণ গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলো। আবদার করে বলল,
–“পাপার কথা শুনো না মাম্মা। খাবার দিও।”
ইরা হেসে হাতের খাবার ভরতি ট্রে’টা বাড়িয়ে দেয় ছেলের কাছে। ছেলের জন্য ই খাবার বানাচ্ছিল সে। শ্রবণ আনন্দে হৈ হৈ করে উঠে ট্রে’টা নিয়ে ছুটে যায় ডাইনিং টেবিলে। শ্রেয়ান চেঁচিয়ে উঠলো,
–“ইরা তোমায় বলেছি না আজ ওকে খাবার দেবে না? বড়ো বড়ো লেকচার শুধু মুখে!”
–“দেখেছো মাম্মা কতো বড়ো পাষাণ, পাপা!”, শ্রবণ ও পাল্টা চেঁচিয়ে উঠলো। শ্রেয়ান কপাল কুঁচকে নিজের খাবার নিতে গেলো ইরার কাছে। ওমনি ইরা খাবার সরিয়ে নিলো। রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে ঝগড়া করার ন্যায় কিছু বলল। শ্রেয়ান কপাল কুঁচকে আধো আধো বুলি বোঝার চেষ্টা করলো। শ্রবণ হেসে উঠলো বাবার বেহাল দশা দেখে। বলল,
–“কি হলো বোঝনি মাম্মা কি বলেছে? মাম্মা বলেছে তার ছেলেকে খেতে না দেওয়ার তুমি কে? আজ তুমিই কোন খাবার পাবে না, হা হা হা…মাই মাম্মা বেস্ট! গুড জব মাম্মা! বেশ হয়েছে। আজ তুমি খাবার পাবে না পাপা।”
শ্রেয়ান ক্রুব্ধ চোখে তাকায় ইরা আর শ্রবণের দিকে। মা ছেলে দূর্বার গতিতে সেই রাগি দৃষ্টিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলো। শ্রেয়ান থমথমে মুখে ছেলের পাশে গিয়ে বসলো। ছেলের প্লেট থেকে আভোক্যাডো’র তৈরি স্যান্ডউইচ টা ছিনিয়ে নিয়ে খাওয়া শুরু করলো। শ্রবণ তেতে উঠলো। চেঁচিয়ে উঠে আ’ত’ঙ্ক জর্জরিত কণ্ঠে বলল,
–“জান নিয়ে নাও পাপা, তবুও খাবার নিও না।”
শ্রেয়ান তোয়াক্কা করে না ছেলের কথা। বলে,
–“আপনার মাম্মাকে আমার খাবার দিতে বলেন নয়তো আজ আর আপনি খেতে পারবেন না।”
বলেই শ্রেয়ান ট্রে টা নিজের দিকে টেনে নিলো। শ্রবণ আ’ত’ঙ্কিত চোখে তাকায় মায়ের দিকে। উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে,
–“মাম্মা, তাড়াতাড়ি তোমার হাজব্যান্ডকে খাবার দাও নয়তো তোমার ছেলেকে আজ না খেয়ে থাকতে হবে।”
সাথে সাথে একটা চাপড় পড়লো শ্রবণের পিঠে। শ্রেয়ান দিয়েছে। ছেলেটার কথার ধরণের ঠিক নেই। দুষ্টুর শিরোমণি। বাপকে বলে মায়ের হাজব্যান্ড! কতো বড়ো ফাজিল! শ্রবণ ছুটে গিয়ে মায়ের থেকে বাবার খাবার আনলো। বলল,
–“এই নাও তোমার খাবার। আমার খাবারের দিকে আর চোখ দিও না।”
ইরা ডানে বামে মাথা নাড়লো বাবা ছেলের কান্ডে।
শ্রেয়া আর শ্রেয়সী ওরফে ইরাম, দুই বোন একই সাথে ঘুম থেকে উঠলো। শ্রেয়া তখন মায়ের দুধ পানে ব্যস্ত আর কক্ষের এক কিনারায় সোফায় বসা দুই ভাই বোন নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করায় ব্যস্ত। তোয়ালেতে মুখ মুছতে থাকা ইরামের পায়ে কারোর পা বেঁধে যেতেই সে কড়া চোখে তাকায় তার পেছনে থাকা শ্রবণের দিকে। বিরক্ত হয়ে শুধায়,
–“কি হলো এভাবে আমার পিছু পিছু ঘুরছো কেনো?”
শ্রবণ নিরুদ্বেগ কাঁধ ঝাঁকিয়ে ত্যাড়া কণ্ঠে বলল,
–“আমার পা, আমার পাপার ঘর, আমার পাপার মেয়ের পিছু পিছু আমি ঘুরছি তাতে তোমার কি?
ইরাম দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে,–“বিরক্তিকর!
–“তোমার বিরক্তিতে ছাই পড়ুক!”, শ্রবণ মুখ বাঁকিয়ে বলল।
ইরাম চেঁচিয়ে উঠলো,–“শ্রবণ!”
–“আই নো মাই নেইম সিস্টার! চেঁচিয়ে বলার প্রয়োজন নেই তো!”
–“অসহ্য!”, ইরামের কথায় ইরা তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো।
–“এহ্ এহ্!”
মায়ের আওয়াজ পেতেই ইরাম মায়ের দিকে তাকালো। ইরা তাকে চোখে শাসালো। মেয়েটি বড্ডো বদমেজাজি একটুতেই ক্ষেপে যায়। ইরাম চোখ মুখ কুঁচকে নিয়ে দৃষ্টি সরালো। রেগে সোফায় গিয়ে পা গুটিয়ে বসলো। আপদ সেখানেও। শ্রবণ ও বোনের পিছু পিছু তার পাশে পা গুটিয়ে বসলো। ইরাম দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
বোনের এক হাত বগলদাবা করে শ্রবণ মায়া মায়া চেহারা বানিয়ে তাকিয়ে আছে বোনের দিকে। ভাইয়ের অবলা এই চেহারা বিগত দশ মিনিট যাবৎ বিরক্তি নিয়ে দেখে চলেছে ইরাম। ঠিক চতুর্থ বারের মতো শান্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করে,
–“কি সমস্যা শ্রবণ?”
শ্রবণ মুখ খুললো। নাটকীয় ভঙ্গিতে বলতে লাগলো,
–“কি সমস্যা? তুমি এটা এখন জিজ্ঞাসা করছো? তুমি এতো পাষাণ কি করে হতে পারো? তুমি কি জানো আমি গতকাল পুরোটা দিন কি কষ্টে পার করেছি? একটাবারের জন্য ও তোমার এই পেঁচা মুখি গম্ভীর বিরক্তিকর মুখটি দেখতে পারিনি। বারবার খাবারের জন্য রান্নাঘর পর্যন্ত যেতে হয়েছে। তোমার রাগের সম্মুখীন হতে পারিনি। তোমায় জ্বালাতন করতে পারিনি। তুমি জানো আমার মনে হয়েছিল এই বুঝি আমি মরে যাচ্ছি। রাতে কি করে যে আমি তোমায় ছাড়া মরার মতো ঘুমালাম আমি বুঝতেই পারছি না। তুমি কেমন বোন বলতো? একটামাত্র ভাইকে এতো যন্ত্রনায় রাখতে তোমার বিবেকে বাঁধেনি? আর কখনো কোথাও যাবে না। গেলে আমায় সাথে করে নিয়ে যাবে।”
ইরাম দাঁতে দাঁত চেপে তাকায় ভাইয়ের দিকে। এমন কিছু’ই আশা করেছিল সে তার বাঁদর ভাইয়ের থেকে।
সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
–“যাবো, একশোবার যাবো”
–“তবে আমিও একশোবার তোমার পিছু নেবো।, শ্রবণের জেদি কণ্ঠ।
হঠাৎ হঠাৎ অন্তঃপুরের সুপ্ত ভয়গুলো যখন বাস্তবে রূপ নেয় তখন ঠিক কেমন অনুভব হয়? শ্রেয়ানের জন্য তার মনের সুপ্ত ভয়গুলো শুধু ভয় ই নয় বরং তার গোটা জীবন ধ্বংস হওয়ার কারণ হতে পারে! ঠিক এমনি এক ভয় বাস্তবিক রূপ নিয়ে ইরফান রূপে তার জীবনে আসে। হুটহাট তাকে নিজের ভীতু পিতৃত্ব সত্ত্বার সাথে পরিচিত করায়। তেমনি আজো তার ভয়কে বাস্তবিক রূপ নিয়ে হাজির হয় মাহি রূপে। বেলা তখন এগারোটা বাজে। হঠাৎ ই শ্রেয়ানের ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠলো। অনাগ্রহে সেদিকে দৃষ্টিপাত করলেও তার পূর্ণ আগ্রহ ছিনিয়ে নিলো সাধারণ ফোনকলটি। আপাতদৃষ্টিতে যেটি সধারণ ফোনকল সেটি আদোতে শ্রেয়ানের জীবনের আন্যতম এক ভয়। মাহি নামটি ভেসে উঠতেই শ্রেয়ানের হাত ঈষৎ কেপে উঠলো। সে ফাঁকা ঢোক গিলে রিসিভ করে কানে ঠেকায়। ভেসে রিনরিনে এক নারী কণ্ঠ,
–“কেমন আছো?’
–“তোমাকে বলার প্রয়োজন বোধ করছি না। কেনো ফোন করেছো?”, শ্রেয়ানের শক্ত কণ্ঠ।
মাহি বুকভরা শ্বাস নিলো। মাঝেমধ্যে প্রচুর সাফোকেশন হয় নিজের অতীত মনে করে। সে সৌজন্যতা ছেড়ে বলল,
–“আমি দেশে এসেছি..”
–“তো কি এখন মিলাদ পড়াবো?”, মাহির পুরো কথা শেষ না করতে দিয়েই শ্রেয়ান রাগ নিয়ন্ত্রণ করে জবাব দিলো। মাহি দাঁতে দাঁত চাপলো বলল,
–“আমি তোমার সাথে কোনোরূপ বাড়তি কথা বলার জন্য ফোন করিনি শ্রেয়ান।”
–“তো কিসের জন্য ফোন করেছো? কোন সাহসে ফোন করেছো?”, শ্রেয়ান চাপা স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো। কোলের মাঝে তখন ছোট্ট মেয়েটি বাবার উষ্ণতায় পরম যত্নে নিদ্রাচ্ছন্ন।
–“শ্রবণের মা আমি শ্রেয়ান। ছেলের জন্য তোমায় ফোন দিতে আমার সাহসের প্রয়োজন পড়ে না।”, মাহি কঠোর গলায় বলল।
পরপরই আবারো বলল,
–“আমি শ্রবণের সাথে দেখা করবো। লোকেশন পাঠাচ্ছি এখানে চলে আসবে শ্রবণকে নিয়ে। না আসলে আমি অন্য কোন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবো শ্রেয়ান।”
বলেই মাহি ফোন কেটে দিলো। দুই মিনিট বাদ শ্রেয়ানের ফোনে একটি মেসেজ ভেসে উঠলো। হারানোর যন্ত্রণা আর রাগে শ্রেয়ান ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো। চিন্তিত লোচনে বিছানায় ধপ করে বসে পড়লো। শ্রবণ নামক ঐ রুগ্ন ছেলেটি আজ পর্যন্ত জানে না, সে যেই মাকে নিজের মাথার তাজ বানিয়ে রেখেছে সে আদোতে তার মা নয়।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেস্তোরাঁর ছোট্ট এক নবজাতক শিশু কোলে বসে আছে এক সুন্দরী, আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেজে থাকা নারী। আপাদমস্তক নারীত্বের ছোঁয়া স্পষ্ট হলেও আদোতে তার মাঝে একজন নারীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব ই নেই। যেই নারীর মাঝে এক উত্তম মাতৃ সত্ত্বা না থাকে সে আদোতে নারী নয় এমনটাই ভাবনা শ্রেয়ানের। সেই ভাবনা থেকেই ঘৃণায় অন্তঃস্থল দুমড়ে মুচড়ে গেলো। ভাবলেও ঘৃণা হয় এই নারীটি তার সন্তানের মা! সে এগিয়ে যায় মাহির টেবিলের দিকে। গিয়েই সোজাসাপ্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
–“কেনো এসেছ আবার আমার জীবনে?”
মাহি চোখ তুলে তাকায় ক্রোধে লাল হয়ে যাওয়া অতিপরিচিত মুখটির দিকে। বলল,
–“তোমার জীবনে নয় আমার ছেলের জীবনে। শ্রবণ কোথায়? আনোনি ওকে?”
–কেনো আনবো?”
–“কেনো আনবে মানে? ওর মায়ের সাথে দেখা করার জন্য শ্রেয়ান।”
শ্রেয়ান গর্জে উঠলো,
–“ডোন্ট ইউজ দিজ ওয়ার্ড, মাহি। দিজ ওয়ার্ড ইজ নট ফর ইউ। সাত বছর…সাত বছর তিন মাস তোমার মনে পড়েছে তোমার একটা ছেলে আছে? আর ইউ কিডিং উইথ মি? সাত বছর পর তুমি এমনভাবে আচরণ করছো যেনো তুমি তোমার সাত দিনের ফেলে যাওয়া ছেলের শ্রেষ্ঠ মা।”
–“শ্রেয়ান, সাত বছরে আমি কম চেষ্টা করিনি শ্রবণের সাথে যোগাযোগ করার। কিন্তু তুমি আমায় ওর সাথে যোগাযোগ তো দূর ওর ধারেকাছেও ঘেঁষতে দাওনি।”
–“বেশ করেছি দেয়নি। তুমি আমার ছেলের মা হওয়ার যোগ্য নও মাহি।”
–“কে যোগ্য কে অযোগ্য সেটা পরের বিবেচ্য বিষয়। আমি আমার ছেলের সাথে দেখা করতে চাই শ্রেয়ান। তার জানার অধিকার আছে তার মাকে।”
–“খবরদার মাহি, আমার ছেলের নাম ও মুখে তুলবে না। আমার সাত দিনের দুধের শিশুটাকে যেদিন থেকে ছেড়ে গিয়েছো সেদিন থেকে কম দুঃখ পেতে হয়নি আমার ছেলেটাকে। দিনের পর দিন এক ফোঁটা মায়ের দুধের জন্য তরপাতে তরপাতে ছেলেটা হাসপাতালে ভর্তি ছিল, জীবন মৃত্যুর মাঝে দিন কাটিয়েছে। যার তার বুকের কাছে ঝুঁকে যেতো একটু দুধের আশায়। কৃত্রিম দুধ খেতে চাইতো না, যখন জেদ করতে করতে শরীর দূর্বল হয়ে পড়তো তখন বাধ্য হয়ে ঐ দুধগুলোই খেতো। আর তুমি তখন নতুন জীবনে ফূর্তি করতে ব্যস্ত ছিলে। এই দিনগুলো আমি ভুলিনি মাহি। ঐ দুঃসহ জীবন থেকে বহু কষ্টে আমি আর আমার ছেলেটা বের হয়েছি। আমি আর আমার ছেলে এখন খুব সুখী! খুব সুখী! বহুকষ্টে পাওয়া এই সুখী জীবনে আর আমি তোমাকে কোনমতেই ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে দেবো না। এবার আমার আর আমার ছেলের জীবনে আসতে চাইলে আমি তোমায় খু/ন করতে দুবার ভাববো না মাহি। আমার ছেলের কাছে মা নামক শব্দটি একটি পবিত্র শব্দ। যার মধ্যে কোন খুঁত নেই। আমার ছেলেটার কাছে মা একজন পবিত্র সত্ত্বা যাকে সে মাথায় চড়িয়ে রাখে। মা নামক শব্দটা তার কাছে স্বস্তি, ভরসা, ভালোবাসা, প্রশান্তির জায়গা। ওর এই পবিত্র দুনিয়াটিকে তোমার মতো চরিত্রহীন নারীকে কলুষিত করতে দেবো না। সে তোমায় চেনে ই না। আমার ছেলের জীবন থেকে চিরদিনের জন্য দূরে সরে যাও। নতুন জীবন হয়েছে, সন্তান হয়েছে তা নিয়ে সুখে থাকো আর আমাকেও সুখে থাকতে দাও। নয়তো এবার আমি ধ্বংসযজ্ঞ চালাবো।”
বলেই শ্রেয়ান পা বাড়ায়। পিছু ফিরতেই এক ভদ্রলোকের সাথে তার চোখাচোখি হলো। যে কি-না সরু চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। শ্রেয়ান চোয়াল শক্ত করে তাকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলল,
–“আপনার স্ত্রীকে সামলান। আমার ছেলের জীবন এলোমেলো করতে আসলে, আমি তাকে ছেড়ে কথা বলবো না।”
ভদ্রলোক টু শব্দটি করলো না শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনলো শ্রেয়ানের কথা। শ্রেয়ান চলে যায় সেখান থেকে। মাহি নিজের স্বামীর দিকে ছলছল নয়নে তাকিয়ে বলল,
–“দেখলে কি আচরণ করছে ও? আমি আইনী পদক্ষেপ নেবো। ও আমায় খু/ন করার হুমকি দিয়েছে। আমার ছেলে জানে পর্যন্ত না যে আমি ওর মা।”
ভদ্রলোক মুখ খুললো। গম্ভীর গলায় বলল,
–“ভুল কিছু তো করেনি বরং একদম ঠিক কাজ করেছে।”
মাহি হতভম্ব হয়ে গেলো। হতবাক হয়ে শুধায়,
–“মানে?”
ভদ্রলোক এক পা এগিয়ে আসে। মাহির কোল থেকে নিজের মেয়েকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে তীক্ষ্ণ নজর ফেলে বলল,
–“আমার তো এখন সন্দেহ হচ্ছে আমার মেয়েটা একটা ভালো মা পাবে তো!”
মাহি বিস্ফোরিত নয়নে তাকায়। স্তব্ধ কণ্ঠে বলে,
–“আমি তোমার কারণেই একদিন আমার ঘর সংসার সন্তান সব ত্যাগ করেছিলাম। তুমিই আমার কাছে ভালোবাসা নিবেদন করেছিলে।”
–“আমি শুধু জানিয়েছিলাম আমি পছন্দ করি তোমায়। কিন্তু একটা বিবাহিত মেয়ে হয়েও আমার অনুভূতিদের সুযোগ তুমি দিয়েছিলে। তোমার কাছে একটাই অনুরোধ মাহি আমার মেয়েটার সাথে এমন কিছু করো না। নাহলে শ্রেয়ান তো শান্ত, নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ বলে তোমায় ছেড়ে দিয়েছে আমি কিন্তু তোমায় জানে মে/রে ফেলবো!”, ভদ্রলোকের শান্ত কণ্ঠেও অন্যকিছু একটা ছিল। যা মাহিকে এটা বুঝতে সাহায্য করায় যে পৃথিবীতে কেউ কারোর জন্য নয়। পাপ বাপকেও ছাড়ে না। যার জন্য সে অপরাধ করলো আজ সে-ই তার দিকে আঙুল তুলছে।
শ্রেয়ান বাড়িতে ফিরলো বিধ্বস্ত বদনে। এসেই পুরো ঘর খুঁজে দুষ্টু ছেলেটিকে খুঁজে বের করলো। খুঁজে পেতেই শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলো শ্রেয়ান। চোখ বেয়ে অজশ্র অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। বিড়বিড় করে বলে,
–“মা শব্দটি নিয়ে কখনো নিজের মনে দ্বিধা, সংশয় সৃষ্টি করবে না আব্বু। মা তোমার কাছে যেনো আজীবন শ্রেষ্ঠ একটি শব্দ হয়ে থাকে।”
শ্রবণ হতবাক হয়ে গেলো বাবার হঠাৎ এমন আচরণে। পরপরই মৃদু হেসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে,
–“হ্যা, মাম্মা তো সবসময়ই আমার কাছে শ্রেষ্ঠ!”
শ্রেয়ান জবাব দেয় না শুধু অশ্রুসিক্ত নয়নে ছেলের দুগাল চেপে ললাটে দীর্ঘ সময় নিয়ে চুমু দেয়।
বেলা গড়ালো। বিকাল তিনটা তখন। শ্রবণ এবং ইরাম দু’জনে’ই ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ছে। তুলনামূলক তাদের পড়ার চাপ অনেক বেশি। শ্রবণ যতোই দুষ্টু, চতুর হোক না কেনো সে একজন তুখোড় মেধাবী ছাত্র। সারাদিনে এক কিংবা দুই ঘন্টা সে বই পড়ে তাতেই সে প্রথম দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় স্থানে থাকে। সেখানে ইরামকে পুরো দিন বইয়ের উপর থাকতে হয় তারপর গিয়ে সে একটা ভালো রেজাল্ট করে।
আগামীকাল ইরাম আর শ্রবণের ক্লাস টেস্ট। ভালো রেজাল্ট না করলে প্যারেন্টস ডাকা হবে। ইরাম বইয়ে মুখ গুঁজে আছে সকাল থেকেই। কিন্তু দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পরে তার প্রচুর ঘুম পায়। এখনো ঘুমে ভারী হয়ে আছে তার চোখ। অন্যদিকে প্রচুর পড়া জমে আছে। ইরাম টেবিলে বসে ঝিমুচ্ছে তখনি বাঁদরের মতো লাফাতে লাফাতে শ্রবণ তার ঘরে ঢুকলো। বাবা মায়ের ঘরের পাশের ঘরটা তাদের দু’জনের। একই ঘরের মধ্যে একটা পার্টিশন করা। যার একপাশে শ্রবণ আরেকপাশে ইরাম থাকে। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা বেড, স্টাডি টেবিল সবকিছু রয়েছে। শ্রবণ বোনকে পর্যবেক্ষণ করে শুধায়,
–“ঘুম পেয়েছে?”
ইরাম ঝিমুতে ঝিমুতে জবাব দেয়,
–“হুঁ।”
–“তাহলে ঘুমাও। শুধু শুধু টেবিলে বসে ঢং করছো কেনো?”
সহসা ইরাম কড়া চোখে তাকালো। বলল,
–“কাল টেস্ট রয়েছে; সেই কথা মনে আছে? কতো পড়া জমে আছে।”
শ্রবণ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
–“আমার তো পড়া নেই। আমার তো সব আগেই হয়ে গিয়েছে।”
ইরাম নিভু নিভু দৃষ্টি বইয়ে তাক করে বলল,
–“গুড।”
–“এভাবে পড়া হয়? যাও গিয়ে ঘুমাও।”
–“পরীক্ষা তোমার শশুর গিয়ে দিয়ে আসবে?”, ইরাম তেতে উঠে বলল। শ্রবণ ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,
–“জামাই থাকতে শশুর কেনো দেবে? নো টেনশন বেহেন, আমি তো আছি। আমি দেখাবো সব, এখন ঘুমাও।”
–“দরকার নেই, থ্যাংক ইউ। আমি নিজে যা পারবো সেটাই আমার অর্জন হবে। তোমার সাহায্যের প্রয়োজন নেই।”
ইরাম আবার পড়তে শুরু করলো। শ্রবণ বেশ চেনে ঘাড়ত্যড়া গম্ভীর বোনকে। তাই কিয়ৎকাল বাদ বলল,
–“তুমি চাইলে আমি তোমার ঘুম ভাঙিয়ে দিতে পারি।”
টেবিলে বসা ইরাম ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ভাইয়ের দিকে। শুধায়,
–“কিভাবে?”
–“সেটা আমার ব্যপার। তোমার ঘুম ভাঙবে এটার গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি।”
ইরাম কিয়ৎকাল ভাবলো। তার ঘুম ভাঙানোর বড্ডো প্রয়োজন। নয়তো পাপাকে অসম্মানিত হতে হবে। সে রাজি হয়ে গেলো। শ্রবণ খুশিমনে লাফাতে লাফাতে ঘর থেকে বের হলো। সোজা গ্রাউন্ড ফ্লোরে গ্যারেজে গিয়ে থামলো। দারোয়ান চাচা আর ড্রাইভারকে ডেকে বলল,
–“চাচা, মঈন খালু তাড়াতাড়ি এদিকে এসো।”
দারোয়ান চাচা আর মঈন আসলো শ্রবণের কাছে। মঈন সম্পর্কে শ্রবণের খালু হয় কেননা সে তার মিলা খালামনির স্বামী। মঈন বহু আগে থেকেই মিলাকে পছন্দ করতো! দু’জনে ই চাল চুলোহীন। দু’জনের একমাত্র আশ্রয়স্থল শ্রেয়ানের পরিবার। এবং এই দু’জন ই শ্রেয়ান আর তার পরিবারের খুব প্রিয়। দু’জনকে হাতছাড়া করতে তারা নারাজ। তাই দু’জনের বিয়ে পড়িয়ে ঘরেই রেখে দিয়েছে শ্রেয়ান। মঈন আর মিলা একনিষ্ঠ ভক্ত শ্রেয়ান আর তার পরিবারের। এই আশ্রয় আর ভালোবাসা ছাড়তে তারা নারাজ। গ্রাউন্ড ফ্লোরে আগে যেই বাসাটিতে ইরার পরিবার থাকতো এখন তারা সেখানে থাকে। ইরার পরিবারকে আলাদা করে দিয়েছে শ্রেয়ান। এ নিয়ে সালমার কটুক্তির শেষ নেই। কুটুমদের সাথে কেউ এমন আচরণ করে? শ্রেয়ান আর তার পরিবার নাকি ছোটলোক! ভদ্রমহিলার মুখ ও দেখতে পারে না শ্রেয়ান। মূলত এর জন্যই তাদের বেরিয়ে যেতে বলা।
শ্রবণ মঈনের হাত টেনে নিয়ে গ্যারেজের এক কিনারায় মাকড়সার জালের কাছে নিয়ে গেলো। মাকড়সার জালের পেছনে দু’টো টিকটিকি সেঁটে আছে। সে সেই দুটিকে দেখিয়ে বলল,
–“খালু, একটা টিকটিকি মেরে দাও প্লিজ।”
মঈন কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“কি করবে?”
–“আরে আমার পেঁচা মুখি বোনের ঘুম ভাঙাবো। তাড়াতাড়ি!”
মঈন বড়ো বড়ো নেত্রে বলল,
–“শ্রেয়সী টিকটিকি ভয় পায় শ্রবণ।”
–“আরে তোমায় যেটা বলছি তুমি সেটা করো। ঐ তো আমায় এটা করতে বললো।”
–“সত্যি?”
–“তিন সত্যিই।”
মঈন টিকটিকি মেরে দিলো। দারোয়ান চাচা গ্লাভস পরে লাঠির মাথায় স্কচ টেপ দিয়ে সেটি পেঁচিয়ে দিলে শ্রবণ হাসিমুখে সেটি নিয়ে ছুটলো উপরে। ছুটতে ছুটতে বোনের ঘরে ঢুকতেই দেখলো ইরাম ঘুম। সে কাঁধে চাপড়ে ডাকলো,
–“আপা, আপা ওঠো দেখো কে এসেছে! তোমার বন্ধু!”
ইরাম ঘুম জড়ানো চোখ খুলে তাকালো। সহসা ভয়ে তার চোখ খুলে পড়ার উপক্রম। লাঠির মাথায় পেট মোটা ঐ টিকটিকিটি দেখে তার গা ঘিনঘিন করে উঠলো। ভয়ে, আ’ত’ঙ্কে সে গগনবিদারী চিৎকার করে উঠলো।
–“পাপ্পাআআআ! পাপ্পাআআআ বাঁচাও!”
ছোট মেয়েকে নিয়ে সিসি ক্যামেরা রুমে বসা শ্রেয়ান মেয়ের হঠাৎ এমন চিৎকারে ছুটে আসলো। ইরামের ঘরে ঢুকতেই কেউ আঁছড়ে পড়লো তার বুকে। ছোট মেয়েকে সামলে শ্রেয়ান একহাতে ইরামকে বুকে জড়িয়ে নিলো। ভয়ার্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে,
–“মা কি হয়েছে? চিৎকার করলে কেনো? কাঁদছো কেনো ইরু? পাপাকে বলো।”
ইরাম ঠাটিয়ে চোখ বন্ধ করে কাঁদছে। সেভাবেই ভাইয়ের দিকে আঙুল তাক করলো। শ্রেয়ান বুঝেগেলো ছেলেটাই কিছু করেছে। সে কড়া চোখে শ্রবণের দিকে তাকালো। জিজ্ঞাসা করে,
–“কি করেছো শ্রবণ?”
শ্রবণ হাসতে হাসতে বলল,
–“পাপা, আপা বলেছিল তার ঘুম ভাঙিয়ে দিতে। তাই তো আমি ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম। আগামী তিনদিনেও তোমার মেয়ে ঘুমাতে পারবে না।”
বলেই সে পিছন থেকে লাঠিটা সামনে বের করে। শ্রেয়ান সেটি দেখতেই ধমকে উঠলো ছেলেকে। টিকটিকিকে মেয়ে যে খুব ভয় পায়। সে কঠোর গলায় বলে উঠলো,
–“শ্রবণ পিটিয়ে পিঠের ছাল তুলে ফেলবো। তুমি অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করো। তুমি জানো না আপা ওটাকে ভয় পায়?”
–“জানি বলেই তো এনেছি।”, বলেই শ্রবণ উল্টোপথে দৌড় লাগালো। শ্রেয়ান মেয়েকে বুকে জড়িয়ে শান্ত করতে লাগলো। তার বুঝে আসে না তার ছেলেটা এতো বাঁদর হলো কি করে? ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত সবাইকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাবে। অতঃপর সত্যিই ইরামের ঘুম ভেঙে গেলো। এমনকি রাত গভীর হলেও সে চোখ বন্ধ করার সাহস পেলো না। চোখ বন্ধ করলেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে টিকটিকির মুখটি।
শ্রেয়ান আর ইরা বাচ্চাদের ঘরের বিছানা ঠিক করে ঘরের বাইরে বের হতে নিলে ইরাম পাণ্ডুর শুকনো মুখে বাবাকে ডেকে উঠলো।
–“পাপ্পা?”
শ্রেয়ান ছোট মেয়েকে ইরার কোলে দিয়ে ফিরে আসে। মেয়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে শুধায়,
–“কি হয়েছে মা? কিছু বলবে?”
ইরাম মিনমিনে স্বরে বলল,
–“পাপ্পা ভয় করছে।”
–“কেনো?”
–“টিকটিকি।”, ইরাম ছোট্ট করে জবাব দেয়। শ্রেয়ান হেসে মেয়ের হাতের উল্টো পিঠে চুমু খেয়ে বলল,
–“বাসায় তো কোন টিকটিকি নেই মা। কিন্তু তবুও আমার মায়ের যখন ভয় করছে তার তো কোন সুরাহা করতেই হবে। চলুন, পাপার সাথে ঘুমাবেন। তারপর কোন টিকটিকি আমার মেয়ের স্বপ্নে এসে ভয় দেখায় তাও আমি দেখবো, আসুন।”
মেয়ের হাত ধরে ঘর থেকে বের হতে নিলেও ইরাম ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। শ্রেয়ান ফিরে তাকায় মেয়ের দিকে। জিজ্ঞাসা করে,
–“কি হলো যাবে না?”
ইরাম ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুমন্ত ভাইয়ের দিকে তাকালো। ভাইকে দেখিয়ে মিনমিনে স্বরে বলল,
–“রাতে উঠে কাউকে না দেখলে ভয় পাবে। ওকেও নিয়ে চলো।”
শ্রেয়ান প্রগাঢ় হাসলো এক দায়িত্বশীল বড়ো বোনের আচরণ দেখে। সারাদিন যতো যা-ই হয়ে যাক না কেনো দু’জনের মাঝে—দিনশেষে একে অপরের স্বস্তি আর সুরক্ষা নিশ্চিত করা তারা দু’জনেই দক্ষ হাতে সামলে নেয়। কেউ কারোর কোন ক্ষতি হতে দিতে নারাজ। সে ঘুমন্ত ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে মেয়ের হাত ধরে বেরিয়ে আসলো। নিজের ঘরে এসে তাকে চিন্তায় পড়তে হলো। তাদের বিছানায় পাঁচ জন মানুষ একসাথে ঘুমানোর জায়গা হবে না। কিন্তু বাচ্চাদের জন্য যে সব সম্ভব! শ্রেয়ান বিশালাকার মেঝেতে বেডের দু’টো ম্যাট্রিস নামিয়ে পাশাপাশি বিছিয়ে দিলো। ফলস্বরূপ তাদের পাঁচ জনের ঘুমানোর পর্যাপ্ত পরিমাণে জায়গা তৈরি হয়ে গেলো। ইরা প্রচুর উচ্ছ্বসিত হয়ে দেখলো শ্রেয়ানের কাজ। বাচ্চাদের সাথে ঘুমানোর জন্য সে কাতর! শ্রেয়ান না থাকলে ইরাম আর শ্রবণ তার কাছেই ঘুমায়।
যে শ্রাবণে প্রেম আসে শেষ পর্ব
পরবর্তী রাতটুকু ভরপুর রহমত আর প্রশান্তিভরা হয়ে ধরা দিলো ইরা আর শ্রেয়ানের কাছে। বারান্দার গ্লাস ভেদ করে চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে মেঝেতে। সেই আলোতে স্পষ্ট বাবা মায়ের মাঝে শুয়ে থাকা তিন ভাগ্যবতী আর ভাগ্যবান সন্তানের নিষ্পাপ মুখশ্রী। ইরামকে বুকে জড়িয়ে শ্রেয়ান স্মিত হাসলো। শ্রবণকে বুকে জড়িয়ে ইরা পিটপিট করে তাকায় একা একা হাসতে থাকা অদ্ভুত সুন্দর ব্যক্তিত্বধারী লোকটির দিকে। দুই ভাই বোনের মাঝে তখন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে ছোট্ট শ্রেয়া। শ্রেয়ান চোখ রাখে স্ত্রীর মুখপানে। যেদিন থেকে তারা একে অপরের বুক থেকে নিজেদের সন্তানদের অদলবদল করেছে, সেদিন থেকে যেনো রক্তের ভালোবাসার মানে বদলে গিয়েছে। ভালোবাসা আর মাতৃত্ব, পিতৃত্বের সঠিক সংজ্ঞা জানলে নিজের রক্ত আর অন্যের রক্তের ফারাক তৈরি হয় না অন্তঃস্থলে। তারা তো শুধু ভালোবাসতে জানে একে অপরের আত্মাকে। যেখানে রক্ত নিতান্তই ভিত্তিহীন এক রঞ্জক পদার্থ!
সমাপ্ত
