Home যেই তুমি এলে যেই তুমি এলে পর্ব ১৫ (২)

যেই তুমি এলে পর্ব ১৫ (২)

যেই তুমি এলে পর্ব ১৫ (২)
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

সূর্য তখন পশ্চিম দিগন্তের দিকে বেশ খানিকটা হেলে পড়েছে। তার মৃদু সোনালি আলোর ফালি ছড়িয়ে রয়েছে চারপাশে। দিনের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে প্রকৃতি যেন বিকেলের দিকে ঢলে পড়ছে।
কাইফা বাড়ি ফেরার সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে রুমে বসে আছে। খালামনি এসে কেবল বেরোতে বললেই রওনা করবে। কিন্তু অর্না বেগম সেই যে গেলেন এখনো আসার নাম নেই। মেয়েটা এবার খানেক অধৈর্য হয়ে রুমের বাইরে পা রাখল। করিডোরে যেতেই নিচ থেকে ভেসে আসলো অর্না বেগম ও রিক্তের কথোপকথন।
“ একটু কষ্ট করে কাইফাকে বাড়ি অব্দি পৌঁছে দিয়ে এসো না রিক্ত? তোমার কাবুল( ড্রাইভার) আংকেল নাকি আগামীকাল আসবে। কিন্তু ওকে আজকেই বাড়ি পাঠাতে হবে। নয়তো ওর আম্মু আমার সাথে আর কথাই বলবেনা। ”

“ আমি আজ পারব না আন্টি! ”
অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় নাকচ করে দিল মানব। অর্না বেগম ব্যর্থ দৃষ্টিতে তাকালেন। রিক্তর পুরো মনযোগ তখন খাবারে। সারাদিন ঘুমিয়েই কাটিয়েছে সে। মাত্রই অর্না বেগমের ডাকে ফ্রেশ হয়ে খেতে বসেছে। চোখে মুখে এখন আর নেশাতুর ভাব নেই। বেশ সাবলিল ভঙ্গিতেই খাচ্ছে। তবে কপালের ব্যান্ডেজটা তখনো অক্ষত। যেটা নিয়ে অর্না বেগম শ খানেক প্রশ্ন করলেও পরিষ্কার কোনো জবাব মেলেনি।
“ তুমি তো সবই জানো! ওর যাওয়াটা জরুরি। নয়তো এই অবস্থায় আমি তোমাকে কখনো বলতাম না! ”
একটু থেমে,
“ প্লিজ বাবা, আন্টির জন্য আজ এটুকু কষ্ট করো। ”
“ আমার ভালো লাগছে না আন্টি। নয়তো এভাবে রিকোয়েস্ট করা লাগত না আপনার! ”
ভদ্রমহিলা আরো কিছু বলতে নেন। তখনি উপর থেকে ভেসে কাইফার কণ্ঠ,
“ খালামনি সমস্যা নেই। আমি আব্বুকে ফোন করছি। আব্বুই এসে নিয়ে যেতে পারবে আমায়। ”
অর্না বেগম তড়িৎ বোনঝির পানে তাকালেন।
“ তোর আব্বু তো বোধ হয় কাজে? আসতে পারবে? ”
“ হুম, আমি বললেই এসে যাবে। তুমি চিন্তা করো না। ”
বলেই রুমের ভিতর ঢুকে গেল রমণী। অর্না বেগম আর কিছু বললেন না। শুধু রিক্তর দিকে একবার তাকিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলেন। তবে মানবের মাঝে কোনো হেলদোল দেখা গেল না। পুরোটা সময়েই নিজের মতো খাবার চিবাল সে।

সবার থেকে বিদায় নিয়ে অবশেষে বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল কাইফা। কৃশান ফোন করে জানিয়েছেন, তিনি প্রায় পৌঁছে গেছেন। অর্না বেগম তাকে অনেক করে বাড়ি পর্যন্ত আসতে বলেছিলেন। তবে তিনি রাজি হননি। বরং মেয়েকে বাড়ির খানিকটা অদূরের রাস্তায় এসে দাঁড়াতে বলেছেন। সেখান থেকেই তিনি কাইফাকে নিয়ে যাবেন।
কাইফাও বাবার কথাই শুনল। সে জানে, তার বাবা কখনো কারও বাড়িতে আসেন না। তাই নিজেই রওনা হলো।
অর্না বেগম অবশ্য তার সঙ্গে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কাইফার নিষেধে আর আসেননি। পাঁচ মিনিটের পথ একা যেতে তার কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া রাস্তাটাও এখন তার চেনা। মার্কেটে যাতায়াত করার সময় আশেপাশের প্রায় সবকিছুই মুখস্থ হয়ে গেছে।
নির্ভার পায়ে এগিয়ে চলছিল কাইফা। হঠাৎ বিকট শব্দে, ধুলো উড়িয়ে তার গা ঘেঁষে এসে থামল একটি কার। মেয়েটা চমকে উঠল। হালকা ভড়কানো চোখে চাইল সেদিকে। আবিষ্কার করল অপ্রত্যাশিত কিন্তু সুপরিচিত কালো গাড়িটা।
মুহূর্তের জন্য খানিকটা থমকে গেল সে। পরক্ষণেই মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল কাইফা। যেন গাড়িটা তার চোখেই পড়েনি। তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটতে শুরু করল।
কিন্তু দু’পা এগোতেই পেছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠ,

“ কাইফা! ”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও কদম স্থির করল রমণী। পরমুহূর্তেই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ফিরে চাইল।
“ জ্বি…? ”
“ গাড়িতে উঠো। ”
শব্দদ্বয় কর্ণপাত হতেই চোখ ছোট হয়ে এলো কাইফার। মসৃণ ললাট কুঞ্চিত করে জবাব দিল,
“ মানে? ”
“ গাড়িতে উঠতে বলেছি। ”
“ আপনার গাড়িতে কেন উঠতে যাব আমি? ”
“ আমি বলেছি তাই। ”
“ আমার বাবা-ই আসছেন গাড়ি নিয়ে। আমি সেটাতেই যাব। আপনার গাড়ির কোনো প্রয়োজন নেই। ”
বলেই ফের পা চালাল সে। রিক্ত এতক্ষণ গাড়ির ভিতরে থেকে কথা বললেও এবার নেমে গেল। ধুপধাপ পায়ে এসে দাঁড়াল ওর পথ আটকে।
“ কি হয়েছে? ”
বিস্মিত কণ্ঠে জানতে চাইল কাইফা। পৃষ্ঠে ভেসে এলো যুবকের অনুভূতিহীন গম্ভীর স্বর,

“ গাড়িতে উঠবে তুমি? ”
“ না! ”
কাটকাট গলায় জানান দিল সে। রিক্ত কিয়ৎক্ষণ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। পরমুহূর্তেই আরেকটু এগিয়ে এসে হিমশীতল গলায় বলল,
“ উঠবে না? ”
কাইফা সাথে সাথেই অস্বস্তিতে কদম পিছিয়ে নেয়। বেশ বিরক্ত হয়ে বলে,
“ দেখুন, এভাবে হুট হাট আমার কাছে আসবেন না। অস্বস্তি হয়! ”
ওর এলোমেলো দৃষ্টি দেখে রিক্তর ঠোঁটের কোণে ফিচেল হাসি ফুটল। সে খানেক ঝুঁকে এসে অদ্ভুত গলায় বলে উঠল,
“ তো এখন কি তোমার অস্বস্তি দূর করতে নিয়ম করে কাছে আসতে হবে আমায়? ”
অপ্রত্যাশিত বাক্য খানা কানে পৌঁছাতেই হতবিহ্বল হয়ে গেল রমণী। মুহূর্তের জন্য তব্দা খেয়ে রইল সে। চোখের পাতাও যেন ফেলতে ভুলে গেল।
রিক্ত আর দাঁড়াল না। গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল সে। যেতে যেতেই বলল,
“ ডিভোর্স নিয়ে কথা আছে তোমার সাথে। গাড়িতে এসে বসো। ”
কাইফা কিছুক্ষণ নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে রইল। পরক্ষণেই হুশ ফেরার মতো শ্বাস টেনে বিড়বিড় করল,
“ কি অসভ্য লোক রে বাবা! ”
শেষমেশ সকল দ্বিরুক্তি ভাব সাইডে রেখে গাড়ির উদ্দেশ্যে এগোলো সে। যেহেতু ব্যাপারটা ডিভোর্স নিয়ে সুতরাং উপেক্ষা করা যাবে না। সেও এই ব্যাপারে কথা বলতে চাইছে গত কদিন ধরে। তবে সুযোগ পেয়ে উঠেনি।

“ যা বলার তাড়াতাড়ি বলতে হবে, বাবা এসে যাবে এক্ষুণি। ”
কোনোমতে ফ্রন্ট সিটে বসেই বাক্যটুকু ছুঁড়ে দিল কাইফা। তবে রিক্তর মাঝে কোনো তাড়াহুড়ো দেখা গেল না। সে অত্যন্ত দৃঢ়স্থির গলায় বলল,
“ আগে ঠিক করে বসো। ”
রমণী কথা বাড়াল না। বোরকা টা গুছিয়ে ঠিকঠাক হয়ে বসল।
“ হুম বলুন এবার। ”
কথা শেষ হতেই রিক্ত হঠাৎ ওর দিকে ঝুঁকে এলো। মেয়েটা কিছু বুঝে উঠার আগেই গাড়ির দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে ফের সোজা হয়ে বসল সে। এতে করে কাইফা যেই না একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাবে তখনি হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে চোখের পলকেই গাড়িটা সামনের দিক ছুটতে লাগল।

“ এই এই, কোথায় যাচ্ছেন আপনি? ”
মৃদু আর্তনাদী কণ্ঠে বলে উঠল সে। তবে উত্তর স্বরূপ নির্বাক রইল রিক্ত।
“ ইয়া আল্লাহ…! গাড়ি থামান বলছি। আব্বু এসে আমায় না পেলে চিন্তিত হবেন। পরে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে! ”
“ তোমার আব্বুকে কল করে বলো ব্যাক যেতে, তুমি তোমার খালামনিদের গাড়ি দিয়ে আসছ। ”
“ আব্বুর সাথে মিথ্যে বলিনা আমি। ”
“ তাহলে বলে দাও যে, তুমি তোমার হাজবেন্ডের সাথে করে যাচ্ছ। ”
“ তাহলে বলে দাও যে, তুমি তোমার হাজবেন্ডের সাথে করে যাচ্ছ। ”
কথাটা শুনে কাইফা যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রিক্তের দিকে। তারপর রাগী কণ্ঠ খানিকটা চড়িয়ে বলল,
“ আপনি মজা করছেন আমার সাথে? ”
“ না। ”
একেবারে নির্বিকার উত্তর।
“ তাহলে গাড়ি থামান! ”
“ নো! ”
“ আপনি দেখছি বেশ অসভ্য! ”
রাগের মাথায় কাইফার মুখ ফসকে বেখেয়ালিই কথাটা বেরিয়ে এলো। অথচ রিক্ত যেন আমলেই নিল না। সে রাস্তার দিক তাকিয়ে থেকেই বেপরোয়া ভঙ্গিতে স্বীকারোক্তি দিল,
“ হুম। ”
রমণীর মেজাজ এবার বেশ চড়ল। মুখ খুলতে যাবে তখনি সহসা এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে রেখে অপর হাতে তার পাশের গ্লাসটা নামিয়ে দিল রিক্ত। কাজটা করার সময় স্বভাবতই মানবের বলিষ্ঠ দেহ অনেকটা হেলে গেল কাইফার দিকে। অনাকাঙ্ক্ষিত নৈকট্যে বেমালুম শিউরে উঠল তরুণী। পরমুহূর্তেই সেই শিহরণ রূপান্তরিত হলো স্তব্ধতায়!
গ্লাসটা নামিয়ে সরে আসার সময় চোখ তুলে একবার কাইফার দিক তাকাল রিক্ত। মেয়েটার অপ্রস্তুত চাহনি আর অস্বস্তিতে শক্ত হয়ে আসা মুখশ্রী দেখে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল মৃদু বাঁকা হাসি।
“ অসভ্যতামো তো এখনো শুরুই করলাম না। তার আগেই ট্যাগ দিয়ে দিলে? ”
কথাটা বলেই রিক্ত ধীরে ধীরে নিজের আসনে ফিরে এলো। অভিব্যক্তি বেশ স্বাভাবিক। অথচ জমে রইল কাইফা। ওর জবান যেন পুরো বন্ধ হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত অনড় হয়ে রইল সে।
আজ সকাল থেকে এগুলো কী ঘটছে তার সাথে? কিসব কথাবার্তা-ই বা শুনছে? এ কেমন চেনা ব্যক্তির এহেন অচেনা আচরণের মুখোমুখী হতে হচ্ছে তাকে?
মেয়েটা আর মুখ খুলতে গেল না। কিছুক্ষণ পর নিজের ব্যাগ থেকে ফোন বের করে বাবার নাম্বারে কল লাগাল সে। উদ্দেশ্য- বাবাকে কোনোভাবে ব্যাক পাঠানো। কেননা এই লোক যে আর গাড়ি থামাবে না এটুকু নিশ্চিত।
কাইফা ফোন বের করতেই দেখল ফোনের স্ক্রিনে কৃশানের কল ভাসছে। সে তৎক্ষনাৎ কল রিসিভ করল,

“ আসসালামু আলাইকুম বাবা? ”
“ মনে মনে সালামের জবাব নিয়ে) জ্বি বাবা বলো? আসলে আব্বু এদিকে একটু জ্যামে আটকে পড়েছি। ”
“ সমস্যা নেই বাবা, তুমি এক কাজ করো জ্যাম শেষ হলে ব্যাক চলে যাও। আমি খালামনি দের গাড়ি করে চলে আসছি। ”
“ দরকার নেই, বাবা চলে এসেছি প্রায়। ”
“ আসলে বাবা আমরা বেরিয়ে পড়েছি আগেই। খালামনি হুট করেই সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলেছে। তোমাকে কল করে জানাতাম এক্ষুণি। ”
ওপাশ থেকে উত্তর আসতে সময় লাগল কিছুটা,
“ আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে। তোমার সাথে বাড়ির লোক এসেছে তো? ”
রিক্তর দিক একপল তাকাল সে। পরপর ঢোক গিলে জবাব দিল,
“ হুম এসেছে। ”
উত্তরটা দিয়ে ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে রইল রমণী। মনে মনে দোয়া করল- তার বাবা যেন এখন জিজ্ঞেস না করেন, কে এসেছে!
সৌভাগ্যক্রমে তেমন কিছুই হলো না। কাইফার দোয়াটা কবুল হলো। ওপাশ থেকে কৃশান আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। শুধু কল রাখার আগে বললেন,

“ আচ্ছা তাড়াতাড়ি এসো তাহলে। বাবা চলে যাচ্ছি।”
“ হুম, সাবধানে যেও। ”
কল কেটে কিছুক্ষণ পাথর হয়ে রইল কাইফা। বাবাকে এভাবে ফিরিয়ে দিয়ে তার উপর এমন ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে মিথ্যে বলে বেশ খারাপ লাগছে তার। রিক্ত আড়চোখে বার কয়েক দেখল ওর মলিন মুখশ্রী। তবে কিছুই বলল না। গাড়ির ভিতরে নেমে এলো অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
এভাবেই কাটল কিছুটা সময়। এক পর্যায়ে নীরবতা ভাঙল কাইফা। নিজেকে স্বাভাবিক করে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“ আপনি না কি বলবেন? বলছেন না কেন? ” আর ডিভোর্সের কাজ কতটুকু এগিয়েছে? ”
রিক্ত তৎক্ষণাৎ কোনো জবাব দিল না।

যেই তুমি এলে পর্ব ১৫

“ কিছু বলছেন না যে? ”
“ এতো তাড়া কিসের? ”
দৃষ্টি রাস্তার ওপর স্থির রেখেই বড্ড শান্ত গলায় জবাব দিল মানব। অথচ তার কণ্ঠটা কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকল কাইফার নিকট। মেয়েটা তৎক্ষণাৎ ভ্রূ কুঁচকে ফেলল।

যেই তুমি এলে পর্ব ১৬