Home যেই তুমি এলে যেই তুমি এলে পর্ব ১৫

যেই তুমি এলে পর্ব ১৫

যেই তুমি এলে পর্ব ১৫
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

স্নিগ্ধ ভোর, হালকা আলো-আঁধারের সংমিশ্রণে ঘিরে আছে ধরণী। রাতের শেষ আঁধারটুকু তখনও আকাশের বুকে মিশে আছে, তারই ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে ভোরের কোমল আলো। পূর্ব দিগন্তে সূর্যোদয়ের আভাসে আকাশটা তখন ধীরে ধীরে রাঙা হয়ে উঠছে।
ভোরের এই শান্ত পরিবেশের মাঝেই ফজরের নামাজ আদায় করে করিডোরে এসে দাঁড়িয়ে আছে কাইফা। দু’হাত রেলিংয়ের ওপর রেখে নীরবে তাকিয়ে আছে ঘুম ভাঙা প্রকৃতির দিকে। কখনো বা শীতল বাতাসের পরশে নেত্র যুগল বুঁজে নিচ্ছে প্রশান্তিতে।
এমন সময়েই হঠাৎ বিকট গর্জন তুলে বাড়ির মেইন গেইট পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল সুপরিচিত একটা কালো কার। রমণীর নজর তৎক্ষনাৎ গিয়ে থামল সেথায়। কয়েক মুহূর্ত গাড়ির দরজা ঠেলে বেরিয়ে এল এক লম্বাটে যুবক। যাকে দেখা মাত্রই মানবীর বুক সুদ্ধ ধ্বক করে উঠল। ছলাৎ করে উঠল চোখের মণি। কণ্ঠনালী চিরে আপনাতেই বেরিয়ে এল মৃদু আর্তনাদ,

“ ইয়া আল্লাহ! ”
সে ত্রস্ত পা চালাল। বাড়ির মূল ফটক পেরিয়ে বাইরে আসতেই মুখোমুখি হলো রিক্তর। ছেলেটার কপাল রক্তাক্ত, সেখানে অগুছালো হয়ে লেপ্টে আছে তার জেল করা চুল। পরণের শার্ট বড্ডো এলেমেলো, হাতে থাকা ব্র্যান্ডের ঘড়িতেও লেগে আছে রক্তের ছোপ!
“ কি হয়েছে আপনার? কপালে রক্ত কেন? ”
কাঁপা কণ্ঠে জানতে চাইল কাইফা। চলন্ত পা স্থির করে থেমে দাঁড়াল মানব। নজর তাক করল রমণীর ভীতসন্ত্রস্ত মুখপানে। পরপরই ভ্রূ কুঁচকে ফেলল। কাইফা ওসব খেয়াল করে না। সে খানিকটা এগোয়। তখনি ভেসে আসে মানবের কড়া নিষেধাজ্ঞা,
“ এইত ঝামেলা, দূরে থাক আমার থেকে! ”
কণ্ঠটা কেমন অস্বাভাবিক শোনাল। অনেকটা নির্ঘুম নেশাগ্রস্তের ন্যায়। কাইফার ভ্রূ যুগল কুঁচকে গেল। নিশ্চিত হতে শুধাল,

“ আপনি নেশা করে এসেছেন? ”
“ হ্যাঁ তাতে তোর কি? ”
পরিচিত মুখে অপরিচিত সম্বোধন শুনে কিয়ৎক্ষণ তব্দা খেয়ে রইল কাইফা। পরমুহূর্তেই সকল উৎকণ্ঠা ভাব উবে গিয়ে– ঘৃণা, ক্ষোভ আর গভীর হতাশায় বুকটা ভারী হয়ে উঠল তার। ঠোঁটের কোণে জমল তাচ্ছিল্যের রেখা। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে পাল্টা জবাব দিল,
“ সবার অগোচরে তাহলে এসবই করে বেড়ান আপনি? আর বাড়ির সকলকে দেখান নিজের সাধু রূপ! আর কত রূপ আছে আপনার; যেটা এ বাড়ির মানুষ জানেনা? ”
“ অগণিত রূপ আমার, অগণিত! ”
এহেন অকপট স্বীকারোক্তিতে রমণী হতবিহ্বল হয়ে যায়। বলার মতো ভাষা খুঁজে পায় না। কেবল বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রয় সামনের পুরুষটির পানে। এর মাঝেই হঠাৎ অভিব্যক্তি পাল্টে যায় পুরুষের। সে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে জড়ানো গলায় বলে উঠে,

“ কেন এলি তুই এখানে? ”
বাক্যটুকু শেষ হতে না হতেই তার এলোমেলো কদম এগোতে লাগল কাইফার দিকে। আকস্মিক ঘটনায় মেয়েটা খানেক ভড়কায়। পরমুহূর্তেই চট করে এক কদম পিছিয়ে যায়।
“ বল কেন এলি? ”
রিক্ত থামে না। বরং ক্রমশ এগোতে থাকে টালমাতাল দেহে। রমণী অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে । ওভাবেই কদম পেছাতে পেছাতে বলে,
“ মানে…? ”
“ এতদিন পর ফের কেন এলি আমার সামনে? ”
“ আপনার কথার কিছুই বুঝতে পারছি না আমি। আমিতো এখানে কেবল বেড়াতে এসেছি! ”
“ সেটাই! কেন এলি? ”

কাইফার টানা ভ্রু যুগল বেঁকে আসে এবেলায়। পৃষ্ঠে বলার জন্য শব্দ গুছাতে নিবে তখনি পিঠ ঠেকে যায় গাড়ির সাথে। মেয়েটা খানেক হকচকিয়ে উঠে। রিক্ত ততক্ষণে ওর একেবারে সন্নিকটে এসে দাঁড়াল। দুজনের মধ্যবর্তী দূরত্ব এতটাই ঘুচে গেল যে ওর শরীরের মদ আর পারফিউমের মিশ্র ঘ্রাণ তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়ল কাইফার নাসিকারন্ধ্রে। সাথে নারী দেহের প্রতিটা শিরায় শিরায় সৃষ্টি হলো এক মিশ্র অনুভূতি। যার কবলে পড়ে রমণীর বাক্য গুলিয়ে এল।
রিক্তর লালিত আঁখি খুব গভীর দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করল ওর অপ্রস্তুত সত্তাকে। পরক্ষণেই দু’হাত গাড়ির দু’পাশে রেখে নিজের অস্পর্শ বাহু সীমার মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলল তাকে। খানিকটা ঝুঁকে এলো হিজাবের মধ্যে স্থান পাওয়া দুধে-আলতা মুখশ্রীর উদ্দেশ্যে।
“ কেন এলি? ”
কাইফার বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল। অজানা শিহরণে কেঁপে উঠল বক্ষস্থল।
অস্বস্তিতে আঙুলগুলো মুঠো হয়ে এলো।
“ আপনি… সরে দাঁড়ান। ”
কণ্ঠে ভয় মিশে গেলেও এবার দৃঢ়তা স্পষ্ট। কিন্তু মানুষটা যেন শুনতেই পেল না। তার নেশাগ্রস্ত দৃষ্টি তখনও স্থির কাইফার মুখে। মেয়েটা এবার শুষ্ক ঢোক গিলল। পরপরই দু’হাত তুলে রিক্তর বুকে ধাক্কা দিল।

“ বলেছি সরে দাঁড়ান! ”
রিক্ত সামান্য টলে পেছনে সরে গেল। সুযোগ পেয়ে রমণী দ্রুত দূরে সরে দাঁড়াল। বুকের ভেতর দ্রুত ওঠানামা করতে থাকা শ্বাসটাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে করতে ভীত অথচ ক্ষুব্ধ চোখে তাকাল রিক্তর দিকে।
“ দেখুন আপনি স্বাভাবিক অবস্থায় নেই আমি খালামনি কে ডেকে দিচ্ছি। ”
“ হোপ, দাঁড়া বলছি। কাউকে ডাকবি না। ডাকলে তোর খবর আছে। ”
কাইফা সামনের দিক পা বাড়াতেই পেছন থেকে খসখসে গলায় বলে উঠল রিক্ত। রমণী থেমে যায়। ফিরে তাকায় কুঁচকানো ভ্রু নিয়ে।

“ না ডাকলে কীভাবে হবে? আপনার কপাল থেকে তো এখনো রক্ত পড়ছে! ”
“ সেটা তুই দেখবি। ”
“ আমি…? ”
“ হ্যাঁ, সব দোষ তোর! ”
“ আমার….! আমি কী করলাম? মাথা ঠিক আছে আপনার? ”
“ না ঠিক নেই, তুই নষ্ট করেছিস! ”
মাতাল মানবের এহেন প্রলাপ শুনে হতভম্ভ হয়ে গেল কাইফা। কিয়ৎক্ষণ সরু চোখে নীরব নিরীক্ষণ চালাল সে। এর মাঝেই রিক্ত এলোমেলো পায়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকতে শুরু করল। যাওযার আগে কাইফার উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করে বলে গেল,
“ এসব দুফোঁটা রক্ত ক্ষরণে আমার কিছুই হবে না। সর, দূরে থাক আমার থেকে! ”

রুমে এসেই ধপাস করে বিছানায় গা এলিয়ে দিল রিক্ত। বাইরে কাইফা ব্যতীত কারোই নজরে পড়েনি সে। বাড়ির সবাই তখনো ঘুমে বিভোর। অর্না বেগম উঠবেন কিছু সময়ের অন্তরেই। তবে বাকিদের ঘুম ভাঙতে আরো অনেক দেরি। কেবল কাইফাই অভ্যাস মোতাবেক সবার আগে উঠে যায়।
কাইফা বেশ কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠতে লাগল রিক্তের রক্তাক্ত কপালটা। মানুষটা তাকে যতই অস্বস্তিতে ফেলুক, যতই অদ্ভুত আর অসংলগ্ন আচরণ করুক– তার কপাল থেকে রক্ত পড়ার দৃশ্যটা কিছুতেই মন থেকে সরাতে পারছে না সে। একবার ভাবল, অর্না বেগমকে ডেকে দেবে। পরক্ষণেই রিক্তের কড়া নিষেধাজ্ঞার কথা মনে পড়ল। ওমনিই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। কিছুক্ষণ পর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু দু’কদম যেতেই আবার থেমে গেল।

না, এভাবে চলে যাওয়া ঠিক হবে না। অন্তত ক্ষতটা পরিষ্কার করে দেওয়া দরকার।
শেষ পর্যন্ত রিক্তের ঘরের দিকে ফিরে গেল রমণী। আশপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিশ্চিত হলো, বাড়ির কেউ জেগে ওঠেনি। তারপর ধীর পায়ে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আস্তে করে দু’বার কড়া নাড়ল। ভেতর থেকে কোনো সাড়া এলো না। সে আরও একটু জোরে ডাকল। তবে এবারও একই নিস্তব্ধতা।
মেয়েটার ভ্রূ কুঁচকে গেল। লোকটা কি ঘুমিয়ে পড়ল নাকি?
দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। সামান্য ফাঁক গলে ভেতরের আবছা আলো বাইরে এসে পড়ছে। কাইফা কিছুক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে দরজাটা সামান্য ঠেলে ভেতরে উঁকি দিল।
বিছানার ওপর এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে রিক্ত। এক হাত কপালের ওপর, অন্য হাতটা বিছানার কিনার ঘেঁষে ঝুলে আছে। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ। মুখের আগের সেই কঠোরতা নেই; ঘুমের মধ্যে মানুষটাকে বরং ভীষণ ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত লাগছে।
না চাইতেও কাইফার ভেতরকার কোমল সত্তাটা কেমন যেন মুচড় দিয়ে উঠল। সে নিঃশব্দে পা টিপে ভেতরে প্রবেশ করল। এগিয়ে এসে দাঁড়াল মানবের শিয়রের কাছটায়। পরমুহূর্তেই অবাক হয়ে বিড়বিড়াল,

“ এত রক্ত নিয়ে এভাবে ঘুমিয়ে পড়েছেন! ”
রমণী কিছুক্ষণ ওভাবেই তাকিয়ে রইল। তারপর ভেবে চিন্তে কক্ষের চারদিকে ফার্স্ট-এইড বক্স খুঁজতে লাগল। সৌভাগ্যক্রমে ঘরেই একটা ছোট বাক্স পাওয়া গেল। সেটা হাতে নিয়ে আবার রিক্তের কাছে ফিরে এলো সে।
প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করল। তারপর খুব সাবধানে দুরত্ব রেখে বসল মানুষটার পাশে। এরপর বক্স হতে তুলো নিয়ে কপালের জমে থাকা রক্ত পরিষ্কার করতে শুরু করল।
রিক্ত অচেতন অবস্থাতেই সামান্য নড়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গেই কাইফার হাত থেমে গেল। মেয়েটা ভয় পেল খানেক। এরপর মানবের আর নড় চড় দেখা গেল না।
কাইফা নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অতঃপর আরও সতর্ক হয়ে ক্ষতস্থানটা পরিষ্কার করল। ক্ষতটা খুব গভীর নয় বুঝতে পেরে তার বুকের ভেতর জমে থাকা দুশ্চিন্তাটা খানিকটা কমল।
এরপর ছোট্ট একটা ব্যান্ডেজ বের করে কপালের ক্ষতস্থানটা ঢেকে দিল। কাজ শেষ করে হাত সরিয়ে নিল কাইফা। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
অদ্ভুত ব্যাপার– একটু আগেও এই মানুষটার ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছিল তার। অথচ এখন ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে সেই রাগটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

“ আপনি এত অদ্ভুত কেন? ”
খুব আস্তে কথাটা বলল কাইফা। ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না।
কেবল ঘুমন্ত ব্যক্তির কপালে নতুন করে লাগানো সাদা ব্যান্ডেজটা ভোরের মৃদু আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠল।
কাইফা ফার্স্ট-এইড বক্সটা গুছিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে আর একবার তাকাল মানুষটার দিকে।
তারপর নিঃশব্দে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছাতেই পেছন থেকে খুব ক্ষীণ, অস্পষ্ট একটা শব্দ ভেসে এলো—
“ মাই স্যুইটফেইরি! ”
কাইফার পা থেমে গেল। তৎক্ষণাৎ ঘুরে তাকাল সে।
বিছানায় আগের মতোই নিশ্চুপ হয়ে পড়ে আছে রিক্ত। চোখ দুটো বন্ধ। মুখের অভিব্যক্তিতেও কোনো পরিবর্তন নেই। দেখে মনে হলো, ঘুমের ঘোরেই হয়তো কিছু একটা বলে উঠেছে।
রমণী কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে।

“ মাই সুইটফেইরি…”
শব্দ দুটো আবারও কানে বাজল। কেমন যেন চেনা লাগল সম্বোধনটা।
খুব চেনা। মনে হলো, আগেও কোথাও শুনেছে সে! কিন্তু কোথায়? কিছুতেই মনে করতে পারল না। মুহূর্তেই কপালে ভাঁজ পড়ল তার। মস্তিষ্কে চাপ প্রয়োগ করে পুরোনো স্মৃতি স্মরণে আনার চেষ্টা করল। তবে ব্যর্থ হলো। কিছুতেই মনে পড়ল না। এক পর্যায়ে ব্যার্থ গলায় বিরক্তি নিয়ে উচ্চারণ করল,

যেই তুমি এলে পর্ব ১৪

“ ধুর! কে জানি কোথায় শুনেছিলাম! ”
আর দাঁড়াল না সে। উল্টো ঘুরে হাঁটা দিল ফের। কিন্তু ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও অদ্ভুতভাবে সেই সম্বোধনটা তার কানে বারংবার বাজতে থাকল।
মাই সুইটফেইরি।
কেন যেন মনে হলো– এই নামটা সে আজ প্রথম শুনল না।

যেই তুমি এলে পর্ব ১৫ (২)