যেই তুমি এলে পর্ব ১৬
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
কাইফা বাড়িতে পৌঁছায় প্রায় সন্ধ্যার দিকে। রিক্ত তাকে বাড়ির খানিকটা অদূরে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে। মানুষটার প্রতি কাইফার মেজাজ তখন বেশ চড়ে আছে। তার কারণ রিক্তের অদ্ভুত আচরণ। পুরোটা রাস্তা সে নির্বাক ছিল। ডিভোর্সের ব্যাপারে নিজ থেকে তো কিছু বলেইনি, তার ওপর কাইফা প্রশ্ন করলেও ঠিকঠাক কোনো জবাব দেয়নি। শুধু বাড়ির রাস্তার কাছে এসে সামান্য কথোপকথন হয়েছিল তাদের।
রিক্ত রাস্তার দিকে চোখ রেখেই গম্ভীর গলায় বলেছিল,
“ কিছুদিনের মধ্যেই ডিভোর্স পেপার তৈরি হয়ে যাবে। কাজ শেষ হলেই আমি তোমাকে ইনফর্ম করব। ”
“ কীভাবে ইনফর্ম করবেন? আপনার কাছে তো আমার আইডি বা নাম্বার কিছুই নেই। ”
রিক্ত তৎক্ষণাৎ নিজের ফোন হাতে নিল। এরপর লক খুলে ডায়ালে গিয়ে ফোনটা অবলীলায় কাইফার দিকে বাড়িয়ে দিল। রমণী প্রথমে কিছুটা অবাক হলো। পরক্ষণেই ফোন হাতে নিয়ে বিনাবাক্যে নিজের কন্ট্যাক্ট নাম্বারটা সেখানে ডায়াল করল। নিশ্চিত হতে একবার কলও করে নিল। তারপর ডিভাইসটি ফিরিয়ে দিল তার মালিকের কাছে।
ব্যস, এটুকুই! এরপর আর কোনো কথা হয়নি দুজনের মধ্যে।
কাইফা ভাবে– এটুকু বলার জন্য তাকে এভাবে গাড়ি করে আনার কী প্রয়োজন ছিল? তখন রাস্তায় দাঁড়িয়েই তো এই কথাগুলো বলা যেত!
ভাবনার মাঝেই গাড়িটা তাদের বাড়ির এদিকে এসে থেমে গেল। রমণী এবার মনের ভেতর ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নটা সরাসরিই করে বসল,
“ আমার মনে হয়, এই কথাগুলো আপনি তখন রাস্তায় দাঁড়িয়েই বলতে পারতেন? শুধু শুধু…”
“ কারো ভাবনা মোতাবেক কাজ করি না আমি। নিজের ভাবনায় যা আসে, সেটাকেই কেবল প্রাধান্য দিই। ”
কাইফার বাক্যখানা অর্ধসম্পূর্ণ থাকতেই বলে উঠল মানব। মেয়েটার ভ্রূযুগল কুঁচকে গেল। সিটবেল্ট খুলতে খুলতে সরু চোখে মানুষটাকে পর্যবেক্ষণ করল সে। তবে বলল না কিছুই। নিঃশব্দে বিরক্তি নিয়ে নেমে পড়ল গাড়ি থেকে।
রিক্ত গাড়ি স্টার্ট করল। মুহূর্তেই ইঞ্জিনের গর্জন উঠল। ঠিক পরমুহূর্তেই সেই শব্দ ছাপিয়ে ভেসে এলো একটা গমগমে, ভরাট স্বর,
“ ডিভোর্সের কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগে অন্য সবকিছু থেকে দূরে থাকাই তোমার জন্য শ্রেয় হবে! ”
কাইফা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ঘুরে তাকাল। কিন্তু ততক্ষণে ধুলো উড়িয়ে চলে গেছে গাড়িটা। রমণী ভ্রূ কুঞ্চিত করে তাকিয়ে রইল সেদিকে। কথাটার মর্মার্থ ঠিকঠাক বুঝে উঠতে সক্ষম হলো না।
অন্য সবকিছু বলতে কী বুঝালেন লোকটা?
একটু গভীরভাবে ভেবে মনে মনে বলল,
“ কোনোভাবে কী বিয়ের কথা বুঝালেন? ”
বাড়িতে ঢুকে কাইফা বরাবরের মতোই প্রথমে মাকে জড়িয়ে ধরল। এরপর সবার সাথে হালকা আলাপ সম্পন্ন করে চলে আসলো নিজের রুমে। সেখানে পা রাখা মাত্রই এক অদ্ভুত শান্তি খেলে গেল মন জুড়ে। রমণী এবার সময় ব্যয় না করে ফ্রেশ হয়ে নিল। তারপর গা এলিয়ে দিল বিছানায়। বেশ দুর্বল লাগছে শরীরটা।
কিছুক্ষণ পর খাবার হাতে রুমে এলেন হুমায়রা। অর্না ফোন করে জানিয়েছিলেন– বমির ভয়ে ওবাড়ি থেকে আসার সময় খেয়ে আসেনি কাইফা। না খেয়ে এতটা জার্নি করে নিশ্চয়ই এতক্ষণে দুর্বল হয়ে পড়েছে মেয়েটা! হুমায়রা নিঃশব্দে এসে মেয়ের নিকট বসলেন। মোলায়েম কণ্ঠে ডাকলেন,
“ আম্মু…? ”
জননীর আদুরে গলায় উবর হওয়া দেহটা সোজা করল রমণী। জবাব দিল ক্লান্তময় কণ্ঠে,
“ হুম? ”
“ খাবার টা খেয়ে নাও। তারপর ঘুমিও ”
“ খেতে ইচ্ছে করছে না আম্মু। মাথা ধরে আছে খুব। ”
“ খাবার না খেলে কী মাথা ধরা কমে যাবে? কষ্ট করে খেয়ে একটা নাপা নিয়ে নে তাহলেই ঠিক হয়ে যাবে। ”
একটু থেমে,
“ আম্মু খাইয়ে দিচ্ছি উঠ…”
আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে কাইফা। হুমায়রা ভাত মাখেন। অতঃপর লোকমা ধরেন মেয়ের মুখের সামনে। কাইফা দ্বিরুক্তি করে না। লোকমা মুখে পুরে ধীরে ধীরে খাবার চিবোয়।
“ আম্মু আংকেল যে আরেকটা বিয়ে করেছিল তুমি জানতে? ”
খাওয়ার মাঝেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল কাইফা। পৃষ্ঠে ভেসে এল জননীর স্বাভাবিক স্বর,
“ হুম জানতাম। আর এজন্যই তোমার খালামনির বিয়েতে যাইনি। ”
একটু থেমে,
“ তোমার নানুকে নিষেধ করেছিলাম বিয়েটা দিতে কিন্তু তিনি আমার কথা শুনেননি। ”
“ নানু আগে খারাপ ছিলেন? ”
“ উহু, তেমন কিছু না। ”
মৃদু হেসে বললেন হুমায়রা। কাইফার আর কথা বাড়ায় না। জননীর হাসিমাখা মুখের দিক তাকিয়ে থাকে কেবল। কী আশ্চর্যরকম সুন্দর তার মায়ের হাসি!
খাওয়ানো শেষ করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন হুমায়রা। পরপরই ফের ওষুধ আর পানি হাতে ফিরে এলেন। মেয়েকে ঔষধ খাইয়ে তার মাথায় তিন কুল পড়ে ফুঁ দিয়ে গেলেন। জননীর কর্মে কাইফা তৃপ্তিময় হাসল। পরপর চোখ দুটো বন্ধ করে পাড়ি জমালো ঘুমের রাজ্যে।
ঘণ্টা তিনেকের মাথাতেই কাইফার ভেঙে গেল। রাত তখন প্রায় দশটার কাছাকাছি। ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই এশার নামাজ আদায় করে নিল কাইফা। শরীরটা এতক্ষণে একটু সতেজ লাগছে। সে রুমে এসে মোবাইল টা একটু হাতে নিল। ওমনিই স্ক্রিনে ভেসে উঠল তার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী তাসনিয়ার মেসেজ। মাদ্রাসা বন্ধের দুদিন পর থেকেই হুট করে নিখোঁজ হতে গিয়েছে মেয়েটা। কাইফা কত গুলো মেসেজ দিয়েছে হিসেব নেই! অথচ এই মেয়ে কিনা আজকে রিপ্লাই করেছে?
ও তৎক্ষনাৎ ভালো করে ধুলাই দেওয়ার জন্য কল লাগাল তাসনিয়ার নাম্বারে। রিং হতে না হতেই ওপাশ থেকে কল ধরা হলো।
“ কিরে এততিন দিন কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিলি তুই? ”
“ আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে! ”
অপ্রত্যাশিত উত্তর খানা শুনে যেন মাথায় বাজ পড়ল কাইফার। বিস্মিত কণ্ঠে লাগাতার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
“ কিহ…..! কবে কখন? আর করা সাথে? ”
“ ঐ যে তোকে বলেছিলাম না একজন আজহারি লোকের পরিবার দেখতে আসবে আমায়? উনার সাথেই দেখতে এসে বিয়ে হয়ে গেছে। ”
“ ও আচ্ছা। ”
কিয়ৎক্ষণ নীরব থেকে ছোট্ট করে উত্তর দিল কাইফা।
“ হুম। ”
“ এখন কী তোদের বাড়িতে আছিস তুই? ”
“ হুম, দুদিনের জন্য এসেছি। ”
“ তো ও বাড়িতে সবকিছু কেমন লাগল? ”
“ এখন বাড়িতে এসেছে দুদিনের জন্য। আর ওখানে সবকিছু আলহামদুলিল্লাহ। শুধু….”
বলতে গিয়েও থেমে গেল রমণী। কাইফা উদগ্রীব হয়ে শুধাল,
“ শুধু? ”
“ আসলে উনার না এর আগেও একটা বিয়ে হয়েছিল। ”
দ্বিতীয় বার বাজ পড়ল কাইফার মাথায়!
“ মানে….? সবকিছু খুলে বল আমায়!”
তাসনিয়া কিয়ৎক্ষণ নীরব রয়। অতঃপর ডুব দেয় অতীতে।
শ্বশুর বাড়িতে এসে স্বামীর প্রথম স্ত্রীর কথা শুনতেই চমকে উঠল #তাসনিয়া_তাসনিম। ঘুমটার আড়াল হতে চকিত দৃষ্টি তুলে পাশে বসা রমণীদের দিকে চাইল সে। তার চারিপাশ ঘিরে বসে আছে পাঁচ ছয়েকের মতো কিছু পূর্ণ বয়স্ক মেয়ে। দুজন এ বাড়ির মেয়ে। আর অন্যরা কাজিন হবে হয়তো। সবাই তার স্বামীর প্রথম স্ত্রী নিয়ে আলোচনা করছে। তাসনিয়া হতবাক হয়ে সকলের কথা শুনে যাচ্ছে। তার পাওয়া তথ্য মতে, তার স্বামী সিদ্দিক পরিবারের একমাত্র ছেলে। সিদ্দিক পরিবারে মোট পাঁচ জন সদস্য। তার শ্বশুর শাশুড়ি: আবু বকর সিদ্দিক ও মারিয়াম বেগম। তাদের এক ছেলে দুই মেয়ে। ছেলে- #সুবহান_সিদ্দিক অর্থাৎ তার স্বামী। একজন আজহারি। মিশর থেকে আজহারের পড়াশুনা শেষ করে এসেছে সে। আর দুই মেয়ে: ফারিহা সিদ্দিক ও আরিফা সিদ্দিক। ফারিফা বিবাহিত। আর আরিফা তার মতোই কওমি মাদ্রাসার ছাত্রী।
কিছুদিন আগে মাদ্রাসা থেকে ছুটিতে বাসায় এসেছিল তাসনিয়া। সে জানত দুয়েকদিনের ভিতরে তাকে দেখতে আসবে। ছেলে সম্পর্কে সবকিছু অবগত হয়ে এতে অমত করেনি সে। কিন্তু দেখতে এসে হুট করেই বিয়ে হয়ে গেল ওর। অতঃপর একজন অপরিচিত পুরুষের নামে তিন কবুল পড়ে সিদ্দিক পরিবারের একমাত্র পুত্রবধূ হয়ে এলো সে। কিন্তু এখানে এসে স্বামীর সম্পর্কে এতবড় একটা কথা জানতে পেরে রীতিমতো আহাম্মক হয়ে গেছে রমণী! নতুন বউ হওয়ায় মুখ খুলে কোনোকিছু জিজ্ঞেস করার সাহসও পাচ্ছে না। এর মাঝেই তার বড় ননদ ফারিহা বাকিদের উদ্দেশ্যে বলল,
“ ঐ মেয়ের নাম যেন আরেকবার নিতে না শুনি! আমাদের নতুন ভাবির ধারে কাছেও নেই সে। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। ”
সকলে ফারিহার কথা শুনে চুপ হয়ে যায়। কিন্তু তাসনিয়া শান্ত থাকতে পারেনা। মেয়েটার মন ছটফটায়। হৃদয় গহীনে উঁকি দেয় হাজারো প্রশ্ন,
“ এর মানে আমি আমার স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী! তিনি এর আগেও কাউকে বিয়ে করেছিলেন? কিন্তু এই বিষয়টা আমাকে আগে জানানো হয়নি কেন? উপস্থিত সবার সরাসরি কথা মোতাবেক তো মনে হচ্ছে বিষয়টা এ বাড়ি থেকে লোকানো হয়নি। তার মানে তার নিজের পরিবার তার থেকে কথাটা লুকিয়েছে? ”
মুহূর্তেই তাসনিয়ার মন বিষিয়ে উঠে। মা বাবার প্রতি থাকা অগাধ বিশ্বাসটা রূপ নেয় ঘৃণায়। ইচ্ছে করে এখনি বাড়ি গিয়ে তাদেরকে প্রশ্ন ছুঁড়তে, যে কেন তারা এমনটা করল? মেয়েটার এবার কান্না পায়। কিছুক্ষণ আগে থেমে যাওয়া অশ্রু কণারা আবারও চোখের কার্নিশে ভিড় জমায়। ঘুমটার আড়ালে থাকায় সেই নিঃশব্দ কান্না কারো দৃষ্টিগোচর হয়না। হঠাৎ পাশ থেকে তার ছোট ননদ আরিফা বলে উঠে,
“ ভাবি আপাতত ঘুমটা টা তুলে নিন? অস্বস্তি লাগছে না এভাবে? ”
“ সমস্যা নেই। আমি এভাবেই ঠিক আছি। ”
শ্বাস টেনে কণ্ঠ স্বাভাবিক করে জবাব দিল তাসনিয়া। তার মিহি স্বরের পৃষ্ঠে আর কথা বাড়ায় না আরিফা। সে ভেবেছিল হিজাবের উপরে আবার বিয়ের দুপাট্টা দিয়ে ঘুমটা টেনে রাখায় হয়তো আন ইজি লাগছে তাসনিয়ার। এজন্যই জিজ্ঞেস করেছিল।
“ ভাবি আপনি কোন শ্রেণিতে পড়তেন? ”
তাসনিয়া জবাব দেয়ার আগেই শোনা যায় আরিফার কণ্ঠ। সে নিজের খালাতো বোনের প্রশ্নের বিপরীতে বলে,
“ এবার দাওরায়ে হাদিসের ফাইনাল পরীক্ষা দিবে। ”
“ খলামনি পড়াশোনা করতে দিবে? ”
“ হুম, অবশ্যই! সুবহান ভাইয়া থাকতে ভাবির পড়াশোনা আটকানোর সাধ্য কার? ”
“ না মানে আগেরবার তো পড়াশোনা করতে গিয়েই ঐ ভাবি…..”
“ তোদের না বলেছি এ টপিক নিয়ে কোনো কথা না বলতে! ”
ধমকে উঠে ফারিহা। নিজে বিছানা ছেড়ে উঠতে উঠতে বাকিদের উদ্দেশ্যে বলে,
“ এখন চল সবাই এখান থেকে। ভাবিকে বিশ্রাম করতে দে। ”
“ সমস্যা নেই, আপনারা থাকুন। আমার বিশ্রাম নিতে হবে না। ”
“ পরে আবার আসব নাহয়। এখন নিচে যেতে হবে ভাবি। আপনি রেস্ট করুন। ”
তাসনিয়া আর কথা বাড়ায় না। অতঃপর সুবিশাল কক্ষে তাকে একা রেখে চলে যায় সকলে।
রাত যত বাড়তে থাকে তাসনিয়ার মন ততই অশান্ত হয়। ভয়, সংকুচ ও অস্বস্তিরা চতুর্দিক থেকে ঝাপটে ধরে তাকে। সাথে মস্তিষ্ক জুড়ে ঘুরতে থাকে নানান প্রশ্ন। সহসা খট করে দরজা খোলার শব্দে খানেক কেঁপে ওঠে মেয়েটার তনু দেহ। সংকীর্ণ বদন আস্তে ধীরে তুলে সামনে তাকায় সে। দৃশ্যমান হয় কুর্তার উপরে এমব্রয়ডারি কাজের ওয়াস্কট পরিহিত এক সাহেবি পুরুষ। রুমে ঢুকেই কুর্তার কাফ করা হাতাগুলো গুটিয়ে নেয় সে। উমুক্ত হয় এক জোড়া ফর্সা গড়নের বলিষ্ঠ হাত। বাঁ হাতে স্থান পাওয়া ব্ল্যাক কালারের রিস্টওয়াচ টা খুলতে খুলতে পুরুষটি পাশের টেবিলের দিক এগিয়ে যায়। পরপর সেটিকে টেবিলে রেখে সরাসরি তাসনিয়ার নিকট এগিয়ে আসে সে। মেয়েটা খানেক হকচকিত হয়ে পিছিয়ে যায়। তখনি শুনতে পায় একটা দৃঢ় স্বর,
“ রিল্যাক্স! ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমি জাস্ট একটা দোয়া পড়ব। ”
তাসনিয়া বোধ হয় একটু ধাতস্থ হলো। নড়চড় হীন বসে রইল সে। এর মাঝেই তার মাথা থেকে ঘুমটা সরানো হলো। পরপর কপালে একটা ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেয়ে কিঞ্চিৎ শিউরে উঠল রমণী। সুবহানের সেদিকে ধ্যান নেই। সে চোখ বন্দ করে আওড়াল,
“ আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা জাবালতাহা আলাইহি, ওয়া আঊযুবিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি মা জাবালতাহা আলাইহি।” (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে তার কল্যাণ এবং আপনি তার মধ্যে যে স্বভাবগত কল্যাণ রেখেছেন তা প্রার্থনা করছি। আর তার অমঙ্গল এবং আপনি তার মধ্যে যে স্বভাবগত অমঙ্গল রেখেছেন, তা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।)
কাজ শেষ হতেই দুরত্বে চলে এলো সুবহান। ফের ধ্বনিত হয় তার ভরাট স্বর,
“ ওযু করে আসুন। ”
তাসনিয়া খানেক নড়েচড়ে ওঠে। দ্বিধান্বিত বদনে সময় নিয়ে বিছানা ছাড়ে। পরপর পা টিপে টিপে চলে যায় ওয়াশরুমে। মিনিট পাঁচেকের অন্তরেই ফ্রেশ হয়ে ওযু করে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো সে। সুবহান জায়নামাজ বিছিয়ে বসে আছে। পাশে আরেকটা জায়নামাজ ভাঁজ করে রাখা। তাসনিয়া এসে সেটার ভাঁজ খুলে মেঝেতে বিছিয়ে নিল। অতঃপর কোনোরূপ কথা বার্তা হীন নফল নামাজ আদায় শুরু করল দুজন।
সুবহানের বিপরীত মুখী হয়ে বিছানার এক পাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে তাসনিয়া। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর বৃথা চেষ্টা চালাচ্ছে সে। চোখের মধ্যে এক ফোঁটা ঘুম নেই, আর নাতো মনের মধ্যে শান্তি আছে। পাশেই একটা জলজ্যান্ত মানুষ কি অবলিলায় ঘুমিয়ে আছে। কোনোরূপ নড়চড় বা সাড়াশব্দ নেই তার। আর নাতো কারো পরোয়া আছে। সহসা তার ভাবনাকে ভুল প্রমাণিত করে পাশ থেকে ভেসে আসলো একটা অতিশয় শান্ত স্বর,
“ আপনি তো আমার সম্পর্কে সবই জানেন? ”
অকস্মাৎ পুরুষালী কণ্ঠে থতমত খায় তাসনিয়া। তড়িৎ চোখ মেলে তাকায়। কিয়ৎক্ষণ নীরব থেকে ক্ষীণ স্বরে জবাব দেয়,
“ জ্বি, তবে কিছুটা জানি আবার কিছুটা জানিনা এখনো। ”
“ কি জানেন না? ”
“ আপনার প্রথম স্ত্রী সম্পর্কে এখনো সবকিছু অবগত নই আমি। আপনার থেকে সবটুকু জানতে পারলে ভালো হতো। ”
পৃষ্ঠে কিছুক্ষণ নীরব রয় পরিবেশ। সময় নিয়ে ভেসে আসে মানুষটার শীতল কণ্ঠ। প্রথম থেকে সবকিছু বলা শুরু করে সুবহান,
“ আমি যখন আজহারের পড়াশুনা করতে মিশর গিয়েছিলাম। তার এক বছরের মাথায় পরিবারের পছন্দ মোতাবেক ও আমার সহমতে একটা মেয়ের সাথে আমার মোবাইলে বিয়ে সম্পন্ন হয়। অতঃপর আমি আবদ্ধ হই একটা পবিত্র বন্ধনে। বিয়ের সময় তিনি শরহে জামে এর ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছেন মাত্র। আমার কথায় আম্মু আব্বু তাকে বাকি পড়া সম্পন্ন করার সুযোগ করে দেন। তিনি তার পড়ালেখা চালিয়ে যান আমিও আমার পড়ালেখা চালিয়ে যেতে থাকি। এভাবেই বছর পেরিয়ে যায়। আমাদের মাঝে একটা সুন্দর বন্ধন সৃষ্টি হয়। তবে হুট করেই তার কিশোরী মন শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে বদলে যায়। পড়ালেখার উসিলা দিয়ে তিনি নিত্যদিন আমাকে এড়িয়ে থাকতেন। ঠিকমতো কথা বলতেন না। আমি বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছিলাম। তবে হঠাৎ করেই একদিন তিনি মাদ্রাসায় না গিয়ে এক ছেলের সাথে পালিয়ে যান। বাড়িতে রেখে যান ডিভোর্স পেপার। এ খবর বাড়িতে পৌঁছালে সকলে খুবই ক্ষুব্ধ হন। মেয়ের বাবা মা বলেছিলেন মেয়েকে জোর করে হলেও ফিরিয়ে আনবেন। তবে আমি সম্পুর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করি এ ব্যাপারে। অতঃপর সে তার পথে আর আমি আমার পথে। তবে আমার মন এখনো সে পথ থেকে পুরোপুরি ফিরে আসতে পারেনি। জানেনই তো মানব মন-
“ কাউকে জায়গা দেয়ার সময় কোনো কারণ খুঁজে না। অথচ বের করার সময় অগণিত কারণ থাকতেও তার নানান বাহানা…! ”
এর মাঝেই পড়া শেষ করে বাংলাদেশে আসার মাস কয়েকের মধ্যেই আম্মু আব্বু আবারও আমার বিয়ে দিতে লেগে পড়ে। সেই থেকেই আপনার খুঁজ। তারপর বিয়ে…..! ”
শেষের দিকে কণ্ঠটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগল মানুষটার। তাসনিয়া এবার পাশ ফিরে সরাসরি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মানুষটার পানে। ডিম লাইটের রঙিন আলোয় দেখতে পায় সুবহানের ফর্সা মুখশ্রী। এক হাত চোখের উপরে রেখে সটান দেহে শুয়ে আছে সে। ধারাল নাক আর ফর্সা গালে হালকা ট্রিম করা দাড়িগুলোই শুধু দৃষ্টিগোচর হলো তাসনিয়ার।
“ তবে চিন্তা করবেন না। আমার একটু সময় লাগবে সবকিছুর সাথে নিজেকে আবারও নতুন করে মানিয়ে নিতে। কিন্তু আমি সর্বচ্চো চেষ্টা করব। আর সেক্ষেত্রে আপনার অবদানই সবচেয়ে জরুরি! ”
সুবহান নিজের মতো কথা বলতে থাকে। আর এইদিকে তাসনিয়া অন্য ভাবনায় ডুবে যায়। সে হুট করেই একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসে,
“ আপনার কথা মোতাবেক যা বুঝলাম- বিয়ের পর আপনি একবারও বাসায় আসেন নি তাই তো? এর মানে আপনাদের মাঝে কিছুই হয়নি? ”
তৎক্ষনাৎ চোখ থেকে হাত সরিয়ে তাসনিয়া কে সরু চোখে পরখ করে সুবহান। তার ঐ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভরকে যায় মেয়েটা। চোখ মুখ খিচে তড়িৎ উল্টো ঘুরে শুয়ে পড়ে সে। লজ্জায় মাথা কাটা যাবার উপক্রম! মনের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নটা কখন যে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে নিজেই বুঝতে পারেনি সে। ওর কান্ড দেখে সুবহানের কুঞ্চিত ভ্রূ শিথিল হয়। ঠোঁট জোড়া অজান্তেই খানেক প্রসারিত হয়। অতঃপর আবারও চোখের হাত দিয়ে শুয়ে পড়ে সে।অপ্রত্যাশিত হলেও কিছুক্ষণ পর অকস্মাৎ তার থেকে নিজের অদ্ভুত প্রশ্নের জবাব পায় তাসনিয়া। সুবহান ছোট শব্দে জানায়,
“ না! ”
বান্ধবীর থেকে সব ঘটনা শুনে ক্ষণকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইল কাইফা। রিয়েকশন দিতেও যেন ভুলে গেল রমণী। বেশ সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করল। পরক্ষণেই উত্তর করল,
“এখানে তোর স্বামীর তো কোনো দোষ নেই, যা বুঝলাম। তিনি নিজের জায়গা থেকে সবসময় ঠিকই ছিলেন।”
একটু থেমে কোমল কণ্ঠে বলল,
“সবকিছু আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছেতেই হয়েছে। হয়তো তোদের দুজনের ক্ষেত্রেই বিষয়টা মেনে নিতে একটু সময় লাগবে। তবে ইনশাআল্লাহ, সব ঠিক হয়ে যাবে। তাই এখন এসব নিয়ে বেশি চিন্তা করিস না।”
ওপাশ থেকে তাসনিয়া কিছু বলল না। কেবল নীরবে বান্ধবীর কথাগুলো শুনে গেল।
কাইফা আবারও বলল,
“আর শুন? মাদ্রাসায় আসবি তো?”
“ঠিক জানি না, তবে আশা রাখছি আসতে পারব।”
“হুম, তোর সাথে গরজিয়াস গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”
“কী এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা? তোর উধাও হওয়া স্বামীকে খুঁজে পেয়েছিস নাকি?”
তাসনিয়া কথাটা মজার ছলেও কাইফা পুরো সিরিয়াস হয়ে উত্তর করল,
যেই তুমি এলে পর্ব ১৫
“হুম।”
“সত্যিই…!”
অবিশ্বাস্য কণ্ঠ ভেসে এলো ওপাশ থেকে।
“হুম, সত্যি। দেখা হলে তোকে সব বলব।”
“এখন বল।”
“না না, অনেক কথা! ফোনে বলা যাবে না। আর এখন ঘুমাতে হবে।”
“আচ্ছা, তাহলে ঘুমা। আল্লাহ হাফেজ। আমিও ঘুমাই।”
“হুম, আল্লাহ হাফেজ।”
