যেই তুমি এলে পর্ব ৮
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
রাইয়ান আহমেদ রিক্ত অর্থাৎ রিয়াজুল আহমেদের একমাত্র ডান হাত। আহমেদ ইন্ডাস্ট্রিয়ালের অন্দরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে যার উপস্থিতি অবিচ্ছেদ্য। ব্যবসায়িক জগত থেকে শুরু করে প্রভাবশালী মহল– সর্বত্রই তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় রিয়াজুল আহমেদের বড় ছেলে হিসেবে। অথচ সেই সম্পর্কের ভিত রক্ত নয়, অটুট বিশ্বাস আর বছরের পর বছর ধরে অর্জিত নির্ভরতা।
অল্প বয়সেই নিজের অসাধারণ বিচক্ষণতা, ঠান্ডা মাথার সিদ্ধান্ত আর দুর্দান্ত নেতৃত্বগুণ দিয়ে রিয়াজুল আহমেদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মানুষে পরিণত হয়েছে সে। প্রতিষ্ঠানের হাজারো কর্মচারী থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও তাকে সমীহ করে চলে। কারণ রিয়াজুল আহমেদের অনুপস্থিতিতে পুরো আহমেদ ইন্ডাস্ট্রিয়ালের দায়িত্ব একাই সামলায় রাইয়ান আহমেদ রিক্ত।
শহরের মানুষ জানে– রিয়াজুল আহমেদের সিদ্ধান্তের পরেই যদি কারও কথার মূল্য থাকে, তবে সেটি রিক্তের। তার একটি নির্দেশেই থেমে যায় বহু কাজ, আবার একটি সিদ্ধান্তেই বদলে যায় বহু মানুষের গুছানো হিসাব। তাই রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও, পরিচয়ের জগতে সে বহু আগেই অর্জন করেছে ‘আহমেদ পরিবারের বড় ছেলে’ নামের মর্যাদা।
তবে এই পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ অতীত, কিছু অপূর্ণ হিসাব আর এমন কিছু অজানা সত্য– যার সম্পর্কে শহরের কেউই অবগত নয়। রিক্ত নিজেও যেন সেই অতীতকে কবর দিয়ে বেঁচে থাকতে শিখেছে। বাইরে থেকে সে যতটা দৃঢ়, নির্দয় আর অটল– ভেতরে ঠিক ততটাই নিঃসঙ্গ, নীরব আর রহস্যে মোড়া একজন মানুষ।
আহমেদ নিবাসের সবাই জানে, রিক্ত রিয়াজুল আহমেদের রক্তের সন্তান নয়। বহু বছর আগে বিশেষ এক কারণে রিয়াজুল আহমেদ নিজেই তাকে নিজের আশ্রয়ে নিয়ে এসেছিলেন। এরপর থেকেই বাড়ির একজন সদস্যের মতোই বেড়ে উঠেছে সে। তবে তার প্রকৃত পরিচয়, পরিবার কিংবা অতীত সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না। সেই অজানা ইতিহাসের সাক্ষী কেবল একজন মানুষ– রিয়াজুল আহমেদ। আর রিক্তও নিজের অতীত নিয়ে কখনো একটি শব্দ উচ্চারণ করেনি। যেন জন্মপরিচয় নামক অধ্যায়টি সে নিজের হাতেই চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে।
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে আছে কাইফা।
মেয়েটার চোখ বিস্ফারিত। এতক্ষণ যা শুনল, তার প্রতিটি শব্দ যেন মাথার ভেতর ঝড় তুলেছে। কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে অর্শীর দিকে তাকিয়ে রইল সে। অতঃপর অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলল,
“ এর মানে… তোমাদের সঙ্গে উনার রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই? ”
অর্শী শান্ত গলায় জবাব দিল,
“ না। রিক্ত ভাইয়া আমাদের রক্তের কেউ নন। তবে আমাদের সঙ্গে উনার সম্পর্কটা রক্তের চেয়েও গভীর। ছোটবেলা থেকে উনি এই বাড়িতেই আছেন। আব্বু উনাকে সবসময় নিজের সন্তানের মতোই দেখেছেন, আমরাও ভাইয়া বলেই ডাকি। কখনো মনে হয়নি উনি আমাদের পরিবারের বাইরের কেউ। ”
কাইফা আর কোনো কথা বলতে পারল না।
নীরবে বসে রইল সে। দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল সামনের মেঝেতে, অথচ মনটা ছুটে বেড়াতে লাগল একের পর এক অমীমাংসিত প্রশ্নের পিছু।
এই রিক্তটা আসলে কে?
মানুষটা যেন প্রতিটি মুহূর্তে আরও বেশি দুর্বোধ্য হয়ে উঠছে।
বাইরের পৃথিবী তাকে চেনে একজন সফল ব্যবসায়ী, রিয়াজুল আহমেদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ডান হাত হিসেবে। অথচ কাইফা নিজের চোখে দেখেছে তার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ। সেই রাতের নিষ্ঠুর, কঠিন, নির্দয় মানুষটাকে ভুলে যাওয়া আজও সম্ভব হয়নি।
তাহলে কোনটা সত্যি?
আহমেদ নিবাসের মানুষগুলোকে দেখে তো একবারের জন্যও মনে হয় না, তারা রিক্ত সম্পর্কে এমন কোনো সত্য জানে। প্রত্যেকের চোখে তার জন্য রয়েছে অদ্ভুত এক শ্রদ্ধা, এক গভীর বিশ্বাস। রিয়াজুল আহমেদ কি আদৌ জানেন তার এই অন্ধকার জগতের কথা? নাকি তারও অগোচরে চলছে সবকিছু? কে-ই বা এই ভয়ংকর চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন– সেই নেতৃত্বকারীর বিরুদ্ধে গিয়ে সেদিন রাতে কেনই বা কাইফা বাঁচিয়েছিল রিক্ত?
তখন সে ভেবেছিল, হয়তো সেটুকু ছিল নিছক মানবিকতা।
কিন্তু আজ…
আজ মনে হচ্ছে, সেই ঘটনার আড়ালেও হয়তো লুকিয়ে ছিল এমন কোনো সত্য, যার উত্তর এখনো তার অজানা।
মেয়েটা চোখ বন্ধ করল। অদ্ভুত এক কৌতূহল ধীরে ধীরে গ্রাস করল তাকে। ঘোলাটে হয়ে আসলো সবকিছু। অজান্তেই মনে হলো– রাইয়ান আহমেদ রিক্তকে সে যতটা ভেবেছিল, মানুষটা তার চেয়ে অনেক বেশি রহস্যময়।
সকালের নাস্তা শেষ করে ড্রয়িং রুমের বড় সোফাটায় পাশাপাশি বসে আছে কাইফা, অর্শী আর রোহান। অর্শী আর কাইফা নিজেদের মতো গল্পে মশগুল। কখনো মাদ্রাসার কথা, কখনো ছোটবেলার দুষ্টুমি-হাসি-আড্ডায় জমে উঠেছে পরিবেশ।
হঠাৎ রোহান তার রিমোট কন্ট্রোলের খেলনা গাড়িটা হাতে নিয়ে দৌড়ে এলো কাইফার সামনে।
মুখ ফুলিয়ে বায়না ধরল,
“ আপি, চলো না আমরা খেলি! ”
কাইফা স্বভাবসুলভ মুচকি হাসলো। আদুরে কণ্ঠে শুধাল,
“ কি খেলবে বলো তো? ”
রোহান উৎসাহ নিয়ে খেলনা গাড়িটা সামনে ধরল।
“ আমার গাড়িটা তোমাকে তাড়া করবে, আর তুমি দৌড়াবে। গাড়িটা যদি তোমার গায়ে লেগে যায়, তাহলে তুমি ফেইল! ”
কথাটা শেষ করেই নিজেই খিলখিল করে হেসে উঠল। পাশ থেকে অর্শী বিরক্ত গলায় বলে উঠল,
“এই তুই যাবি এখান থেকে? তোর না নুন্টু কাটা? এখন আবার দৌড়াদৌড়ি খেলবি? ”
রোহান সঙ্গে সঙ্গেই মুখ বাঁকাল।
“ তোমার সমস্যা কী? আমি কি তোমাকে বলেছি খেলতে? ”
“ আবার মুখে মুখে তর্ক করে! কানে একটা লাগাব কিন্তু! ”
“ আমাকে মারলে আমিও আম্মুর কাছে নালিশ করব! ”
দু’ভাইবোনের খুনসুটি দেখে কাইফা হেসে ফেলল। মৃদু স্বরে বলল,
“ আহ্ অর্শী, থামো তো তুমি। আর রোহান, এখানে দৌড়াতে গিয়ে যদি আপি পড়ে যাই? ”
রোহান দ্রুত মাথা নাড়ল।
“ না না, পড়বে না! দেখো না কত বড় ড্রয়িং রুম। তুমি শুধু দৌড়াও, আমি গাড়ি চালাব। প্লিজ আপি… একবার খেলো না! ”
শেষ কথাটা এমন আকুতি মিশিয়ে বলল যে কাইফার আর না করতে মন সায় দিল না।
হালকা হেসে উঠে দাঁড়াল সে।
“ আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু বেশি জোরে চালাবে না। ”
“ ইয়েস! ”
আনন্দে লাফিয়ে উঠল শিশুটি।
পরক্ষণেই রিমোটের বোতামে চাপ দিতেই ছোট্ট লাল গাড়িটা ভ্রূঁ… ভ্রূঁ… শব্দ তুলে ছুটে গেল কাইফার দিকে।
“ এই! এত জোরে না! ”
হেসে উঠল কাইফা। গাড়িটাকে এড়িয়ে একপাশে সরে গেল।
রোহানও কম যায় না। ওদিক-সেদিক ঘুরিয়ে আবার গাড়িটা ছুটিয়ে দিল।
“ ধরেছি… ধরেছি! ”
“ উহু! এখনও ধরতে পারোনি। ”
হাসতে হাসতেই পুরো ড্রয়িং রুম জুড়ে ছোটাছুটি শুরু করে দিল কাইফা। তার হাসির শব্দে যেন মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পেল নিস্তব্ধ আহমেদ নিবাস।
ঠিক সেই সময়—
দোতলার সিঁড়ি বেয়ে ধীর পায়ে নিচে নামছিল রিক্ত। কালো টি-শার্ট আর ধূসর ট্রাউজারে স্বভাবসুলভ গম্ভীর মুখে নিচে নামছিল সে। হাতে মোবাইল, দৃষ্টি স্ক্রিনে নিবদ্ধ।
কাইফা তখনও রোহানের খেলনা গাড়ি থেকে বাঁচতে দৌড়াচ্ছে।
হঠাৎ গাড়িটা তার পায়ের ঠিক সামনে চলে আসতেই চমকে উঠে না তাকিয়েই দ্রুত পেছনের দিকে সরে গেল।
পরের মুহূর্তেই—
ধপ!
শক্ত, প্রশস্ত এক বুকের সঙ্গে গিয়ে ধাক্কা খেল কাইফা।
হকচকিয়ে গেল সে।
রোহানের খেলনা গাড়িটাও এসে থামল ঠিক দু’জনের পায়ের কাছে।
ড্রয়িং রুমে মুহূর্তের জন্য নেমে এলো নিস্তব্ধতা।
অর্শী বিস্মিত চোখে সিঁড়ির দিক তাকিয়ে রইল।
রোহানও রিমোট হাতে স্থির।
রমণীর নিঃশ্বাস যেন আটকে গেল।
ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতেই পরিচিত এক মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠল।
রাইয়ান আহমেদ রিক্ত।
এক মুহূর্তের জন্য চার চোখ এক হয়ে রইল।
রিক্ত নির্বিকার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আর কাইফা… যেন কথা বলার ভাষাটুকুও হারিয়ে ফেলেছে।
কয়েক সেকেন্ড– কারও মুখেই কোনো শব্দ নেই। ড্রয়িংরুমের হাসি-ঠাট্টাও যেন আচমকা স্তব্ধ হয়ে গেল।
প্রথমে রিক্তই নীরবতা ভাঙল। গম্ভীর অথচ শীতল কণ্ঠে বলল,
“ কি হচ্ছে এখানে? ”
কাইফা তড়িঘড়ি করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। এক পা পিছিয়ে গিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“ স্যরি… আমি খেয়াল করিনি। ”
রিক্ত ধীরে ধীরে নিজের হাত সরিয়ে নিল।
একবারও আর কিছু না বলে সোজা ডাইনিং টেবিলের দিকে হাঁটা দিল। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শুধু এতটুকুই বলল,
“ এটা কোনো দৌড়ানোর জায়গা নয়। পরের বার থেকে যেন আর এসব না দেখি! ”
কথাটা শুনে কাইফা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। লোকটার চলে যাওয়া পিঠের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল সে। কথাগুলো খুব জোরে বলা নয়। তবু তার কণ্ঠের দৃঢ়তা এমন ছিল যে পুরো ঘরে আর কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। রিক্ত ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে বসে পড়ল। অর্না বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই তার সামনে আগে থেকে ঢেকে রাখা নাস্তার প্লেটটা এগিয়ে দিলেন।
এদিকে কাইফা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
লজ্জায় তার গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে।
রোহান মুখ চেপে ফিক করে হেসে ফেলল।
অর্শী রাগী গলায় ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলল,
“ এই জন্যই বলছিলাম খেলাধুলা বন্ধ করতে। ”
কাইফা কিছু বলল না।
শুধু একবার আড়চোখে ডাইনিং টেবিলের দিকে তাকাল।
রিক্তর ভাব এমন যেন কিছুই ঘটেনি–ওভাবেই ভাবেই নিশ্চুপ বসে নাস্তা করতে শুরু করেছে।
আর সেই স্বাভাবিক আচরণটাই কাইফাকে আরও বেশি অস্বস্তিতে ফেলে দিল। সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। তৎক্ষণাৎ পা চালিয়ে ছুটল নিজের রুমে।
টেবিলে নাস্তা শেষ করেই কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল রিক্ত।
নিজ কক্ষে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিল। আলমারি খুলে অভ্যস্ত হাতে বের করল ইস্ত্রি করা কালো রঙের থ্রি-পিস স্যুট। কয়েক মিনিটের মধ্যেই টি-শার্ট আর ট্রাউজারের জায়গা নিল পরিপাটি ফরমাল পোশাক। কব্জিতে রোলেক্স ঘড়ি, হাতে গাড়ির চাবি, আর প্রয়োজনীয় ফাইলগুলো ব্রিফকেসে গুছিয়ে নিল সে।
আয়নার সামনে একবার টাই ঠিক করে নির্বিকার দৃষ্টিতে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল।
মুহূর্তের জন্য চোখের সামনে ভেসে উঠল ড্রয়িং রুমে ঘটে যাওয়া দৃশ্যটা।
হালকা ধাক্কা…
বিস্ময়ে বড় হয়ে যাওয়া দুটি চোখ…
আর সেই পরিচিত কণ্ঠ–
“ সরি… আমি খেয়াল করিনি। ”
রিক্ত পরক্ষণেই দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
বড্ডো বিরক্তি নিয়ে বলল,
“ মেয়েটা আছড়ে পড়ার জন্য কি আর জায়গা পায়না? হুট হাট আমার বুকেই এসে আছড়ে পড়তে হয়? ঝামেলা যত্তসব! ”
অতঃপর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল সে। দীর্ঘ পদক্ষেপে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে সরাসরি ডাইনিংয়ের দিকে গেল। তারপর টেবিল থেকে গাড়ির চাবিটা তুলে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
পেছন থেকে অর্না বেগম বলে উঠলেন,
“ দুপুরে বাসায় খাবে? ”
জুতোর ফিতা বাঁধতে বাঁধতেই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল রিক্ত,
“ মিটিং আছে। ফিরতে দেরি হবে। ”
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে এলো রোশনী।
আজ তার ভার্সিটির ক্লাস। পরনে হালকা নীল কুর্তি, সাদা ওড়না, কাঁধে ব্যাগ। তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে কিছুটা ইতস্তত করল। তারপর সাহস সঞ্চয় করে রিক্তর সামনে এসে দাঁড়াল।
“রিক্ত ভাইয়া…”
দরজার হাতলে হাত রেখেই থামল রিক্ত।
মুখ ঘুরিয়ে তাকাল না। শুধু অপেক্ষা করল, কী বলবে শুনতে। রোশনী ঠোঁট কামড়ে আস্তে বলল,
“ আপনি তো অফিসেই যাচ্ছেন… আমাকে একটু ভার্সিটিতে নামিয়ে দেবেন? ”
এক মুহূর্ত নীরবতা। রিক্ত কোনো উত্তর দিল না।
সে যেন প্রশ্নটাই শোনেনি। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
রোশনী হতভম্ব হয়ে কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর আবার একটু জোরে ডাকল,
“ রিক্ত ভাইয়া… শুনছেন? ”
রিক্ত এবার থামল ঠিকই, তবে পেছনে ফিরল না।
গাড়ির দরজা খুলতে খুলতেই শীতল কণ্ঠে বলল,
“ আমার সময় নেই ড্রাইভার আছে। ”
ব্যস।আর একটি শব্দও নয়।
পরক্ষণেই গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কালো গাড়িটা আহমেদ নিবাসের গেট পেরিয়ে চোখের আড়াল হয়ে গেল। রোশনী নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখে-মুখে স্পষ্ট হতাশা।
অর্না বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ কি হলো? চলে গেল? ”
রোশনী কষ্টটুকু আড়াল করে কৃত্রিম হাসল।
“ হুম… অফিসে নাকি তাড়া ছিল। ”
অর্না আর কিছু বললেন না। তিনি জানেন, রিক্ত এমনই। কারও সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় কথা বলে না।
কিন্তু রোশনী জানে—
এটা শুধু স্বভাবের গাম্ভীর্য নয়।
গত কয়েক বছর ধরে যতবার সে রিক্তর কাছাকাছি যেতে চেয়েছে, মানুষটা ঠিক ততবারই অদৃশ্য এক দূরত্ব তৈরি করেছে। কখনো কঠিন কথা বলে নয়,কখনো অপমান করে নয়, শুধু নির্লিপ্ত থেকে।
যেই তুমি এলে পর্ব ৭
আর সেই নির্লিপ্ততাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় রোশনীকে।
কারণ মানুষটাকে সে অনেক আগেই নিঃশব্দে নিজের হৃদয়ে জায়গা দিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু সেই হৃদয়ের খবর রিক্ত জানে না।
হয়তো জানতে চায়ও না।
