রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১০
ইয়ুশরা রিমু
বেলার চোখের কোণে জমে থাকা শেষ অশ্রুবিন্দুটাও সে দ্রুত আঙুলের ডগায় মুছে ফেললো। বুকভর্তি দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস নিয়ে নিজের ভেতরের তীব্র অস্থিরতাটাকে জোর করে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে না থাকলেও সে জানে, কান্নার সামান্য ছাপও যদি কারও চোখে পড়ে যায়, তাহলে একের পর এক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। আর আজ, এই আনন্দমুখর রাতটাকে নিজের কষ্টের ছায়ায় ঢেকে দিতে সে একদমই চায় না। তাই সমস্ত ভাঙাচোরা অনুভূতিকে বুকের গভীরে লুকিয়ে রেখে ঠোঁটের কোণে কৃত্রিম একটুকরো হাসি ফুটিয়ে তুললো। নিজের হৃদয়ের আর্তনাদটাকে নীরবতার আড়ালে বন্দি করে ধীরে ধীরে আবার সবার দিকে এগিয়ে গেলো, যেন কিছুই ঘটেনি, যেন কয়েক মুহূর্ত আগেও তার বুকের ভেতর এত বড় একটা ঝড় বয়ে যায়নি।
ছাদের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ইরা দূর থেকেই বেলার প্রতিটি পরিবর্তন গভীরভাবে লক্ষ করছিলো। কয়েক মিনিট আগেও যে মেয়েটা সবার সঙ্গে প্রাণখোলা হাসিতে মেতে ছিল, মুহূর্তের ব্যবধানে তার চোখের ভেতর কীভাবে এমন অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো, সেটা ইরার দৃষ্টি এড়ায়নি। মানুষের মুখের ভাষার চেয়েও চোখের ভাষা পড়তে সে অনেক বেশি অভ্যস্ত। তাই বেলা যতই স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করুক না কেন, তার হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা চাপা কষ্টটা ইরার কাছে ধরা পড়ে গেলো।তবুও ইরা কিছুই বুঝতে পেরেছে এমন কোনো ইঙ্গিত দিল না। বেলা কাছে আসতেই সে আগের মতোই দুষ্টুমি মেশানো ভঙ্গিতে কাঁধে হালকা একটা ধাক্কা দিয়ে হেসে বলল,
— কোথায় গিয়েছিলি এতক্ষণ? আমরা তো ভাবছিলাম, ছাদ থেকে উধাও হয়ে গেলি নাকি!
কথাটা বলেই সে ইচ্ছে করে বেলার হাতটা আলতো করে জড়িয়ে ধরলো। মুখে স্বাভাবিক হাসি বজায় রাখলেও তার দৃষ্টি নিঃশব্দে একবার বেলার লালচে চোখের ওপর গিয়ে থেমে রইলো। তারপর আর কোনো প্রশ্ন না করে অন্যদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠলো, কারণ সে বুঝে গিয়েছিলো এই মুহূর্তে প্রশ্নের চেয়ে স্বাভাবিক আচরণটাই বেলার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আর যদি সত্যিই কোনো কষ্ট থেকে থাকে, তবে বেলা নিজে থেকে বলতে চাইলে একদিন নিশ্চয়ই বলবে। আজ অন্তত তার মুখে জোর করে ফুটিয়ে তোলা সেই হাসিটুকু ভেঙে দিতে ইরার মন সায় দিলো না। বেলা জোর করে হেসে উওর দেয়,
—কোথাও না তো।
—মিথ্যা বলবি না। আমি পাঁচ মিনিট ধরে তোকে খুঁজছি।
—আরে, ওইদিকে দাঁড়িয়ে একটু বাতাস খাচ্ছিলাম।
ইরা চোখ ছোট ছোট করে অনেকক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।তারপর আচমকাই হাত বাড়িয়ে বেলার কপালে হাত দিয়ে বললো,
— জ্বর এসেছে নাকি?
বেলা অবাক হয়ে বললো,
—ধুর! না তো।
—তাহলে এমন মুখ কেন? পাঁচ মিনিট আগেও মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ তুই। এখন মনে হচ্ছে কেউ তোকে ছ্যাঁ’কা দিয়েছে।
বেলা হেসে ফেলল।খুব অল্প।কিন্তু সেই হাসিটাও চোখ পর্যন্ত পৌঁছালো না।ইরা এবার আরও কাছে এসে নিচু গলায় বললো,
—সত্যি করে বল।কী হয়েছে?
— কিছু হয়নি।
— তুই আমাকে চিনিস না নাকি? তোর মুখ দেখেই বুঝতে পারছি, কিছু একটা হয়েছে।
বেলা অন্যদিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো,
— আরে বললাম তো কিছু না।
ইরা ইচ্ছে করেই পরিবেশটা হালকা করার জন্য বললো,
— আচ্ছা ঠিক আছে। মুখ গোমড়া করে রাখবি না।
বেলা হাসিমুখে বললো,
— আচ্ছা।
ইরা মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।অন্তত কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও বেলার মুখে আবার হাসি ফিরেছে।ঠিক সেই সময় পিছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত এক গভীর কণ্ঠস্বর।
— ইরা?
দুজনেই একসঙ্গে পেছন ফিরে তাকালো।সায়র দাঁড়িয়ে আছে। সাদা পাঞ্জাবিতে তাকে আগের মতোই গম্ভীর, পরিপাটি আর স্থির লাগছিলো। হাতে এখনও সাজসজ্জার কাজের দাগ লেগে আছে। বোঝাই যাচ্ছে, এতক্ষণ ব্যস্ত ছিলো।ইরাকে দেখে সে ভদ্রভাবে মুচকি হেসে এগিয়ে এলো।
— কেমন আছেন ?
ইরাও হাসিমুখে উত্তর দিল,
—আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি স্যার। আপনি?
— ভালো। কখন এলে?
বিকেলের দিকে। আসলে আপনি তখন নিচে ব্যস্ত ছিলেন, তাই আর দেখা হয়নি।
সায়র মাথা নাড়িয়ে বলে,
—হ্যাঁ, একটু কাজ ছিলো । তাই আর সময় বের করতে পারিনি।
— সমস্যা নেই। বাড়িটা খুব সুন্দর সাজিয়েছেন।
— ধন্যবাদ। সবাই মিলে সাজিয়েছি।
কথা বলতে বলতেই সায়রের চোখ একবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বেলার দিকে গেলো।অদ্ভুত ব্যাপার।বেলা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।একবারও তার দিকে তাকাচ্ছে না।সকালের সেই চঞ্চল মেয়েটার সঙ্গে এই নীরব মেয়েটার যেন কোনো মিলই নেই।সায়র কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে স্বাভাবিক গলায় বললো,
—কী রে ইডিয়েট এতো চুপচাপ কেন?
বেলা কোনো উত্তর দিলো না।মনে হলো, সে শুনতেই পায়নি।ইরা অবাক হয়ে একবার বেলার দিকে তাকালো।সায়রও আবার বললো,
—কী হলো? শরীর খারাপ নাকি?
বেলা এবার খুব আস্তে, চোখ না তুলেই শুধু বললো,
— না।
একটা মাত্র শব্দ।তারপর আবার নীরবতা।সায়র ভ্রু কুঁচকে ফেললো।এত ছোট উত্তর বেলার মুখে সে জীবনে শোনেনি।সাধারণত একটা প্রশ্ন করলে অন্তত পাঁচটা বাড়তি কথা বলে এই মেয়েটা। আজ যেন কথাগুলো কোথাও হারিয়ে গেছে।সে আবার জিজ্ঞেস করলো,
—নিশ্চিত?
বেলা এবারও তার দিকে না তাকিয়েই বললো,
— হ্যাঁ। আমি ঠিক আছি।
এরপর আর একটা শব্দও বললো না।পরিবেশটা মুহূর্তেই কেমন অস্বস্তিকর নীরব হয়ে গেলো।ইরা বুঝতে পারছিলো, কিছু একটা ঠিক নেই।আর সায়রের ভেতরেও ধীরে ধীরে এক ধরনের অদ্ভুত প্রশ্ন জন্ম নিতে লাগলো।সে কিছুক্ষণ স্থির চোখে বেলার দিকে তাকিয়ে রইলো।মনে মনে বললো,
—সকালে তো সব ঠিকই ছিলো। এত হাসছিলো, এত কথা বলছিলো।কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এমন বদলে গেল কেন? রুপসা আসার পর থেকেই কি ওর মুখটা এমন হয়ে আছে? নাকি অন্য কোনো কারণে মন খারাপ? কিন্তু যদি মন খারাপই হয় তাহলে সেটা লুকানোর চেষ্টা করছে কেন?
কোনো উত্তর খুঁজে পেল না সে।শুধু অদ্ভুত এক অস্বস্তি নিঃশব্দে তার বুকের ভেতরেও জায়গা করে নিলো।আর ঠিক সেই মুহূর্তে, বেলা নিজের দুই হাত শক্ত করে মুঠো বানিয়ে মনে মনে শুধু একটাই কথা বললো,
—না।আর কখনো না। আজ থেকে আমি আপনার সঙ্গে শুধু প্রয়োজন ছাড়া কোনো কথাই বলবো না, সায়র ভাই। আমার অনুভূতিগুলো আমার কাছেই থাকবে।
ঠিক সেই মুহূর্তে বিহানের জোরালো গলা ভেসে এলো,
— এই যে সবাই! এত আড্ডা পরে দিও। আগে একটু এদিকে আসো তো! একটা গ্রুপ ছবি তুলবো। ফটোগ্রাফার এসে পড়েছে।
বিহানের ডাক শুনে চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই ধীরে ধীরে ওদিকে তাকায়।ইরাও বেলার হাত ধরে টান দিলো,
— চল চল! ছবি তুলবে। পরে আবার বলবি, আমাকে কেউ ডাকেনি।
বেলা জোর করে ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে মাথা নাড়লো।
গ্রুপ ছবির জন্য সবাই যখন একে একে নিজেদের জায়গা ঠিক করে দাঁড়াচ্ছিল, তখন পুরো ছাদজুড়ে এক আনন্দময় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কেউ কারও কাঁধে হাত রেখে দাঁড়াচ্ছে, কেউ আবার হাসতে হাসতে সামনে-পেছনে জায়গা বদল করছে। বিহান পুরো আয়োজনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে একেবারে পরিচালকের মতো সবাইকে নির্দেশ দিতে লাগলো,
— আব্বু, আপনি মাঝখানে দাঁড়াও। আম্মু, তুমি একটু এদিকে আসো । চাচ্চু, আপনি ওখানে না, এই পাশে দাঁড়াও। একটু হাসো ! এমন মুখ করলে মনে হবে কেউ জোর করে ছবি তুলছে!
চারপাশে আবারও হাসির রোল পড়ে গেলো।ঠিক তখনই বিহানের চোখ পড়লো বেলার দিকে। একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে সে।
—এই বেলা! এত দূরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? এদিকে আয়।
বেলা মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বললো,
— আমি এখানেই ঠিক আছি ভাইয়া।
— কোনো ঠিক নেই। তুই এদিকে আয় ইরাকে নিয়ে।
বলেই বিহান নিজেই এগিয়ে গিয়ে বেলার হাত ধরে মাঝখানে নিয়ে এলো।তারপর সায়রের দিকে তাকিয়ে বললো,
—আর তুই সায়র, একদম পাশে দাঁড়া। ফ্রেমটা ব্যালেন্স হবে।
সায়র কোনো কথা না বলে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে এসে দাঁড়িয়ে গেলো।এক মুহূর্তের মধ্যেই বেলা আর সায়র পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পড়লো।বেলার বুকটা কেঁপে উঠলো।সে অস্বস্তিতে খুব আস্তে এক পা সরে যেতে চাইলো, কিন্তু পেছনে এত মানুষ দাঁড়িয়ে যে আর নড়ার সুযোগ নেই। বাধ্য হয়েই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
অন্যদিকে সায়র এক ঝলক বেলার দিকে তাকিয়ে আবার সামনে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো।কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার মনটা বারবার পাশের মানুষটার দিকেই ফিরে যাচ্ছিলো।এমন নীরব, এমন গুটিয়ে যাওয়া বেলাকে সে আগে কখনো দেখেনি।
তাদের দিকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু নীরবে লক্ষ্য করছিল রুপসা।প্রথমে সে ভেবেছিল, সুযোগ বুঝে সায়রের পাশে গিয়ে দাঁড়াবে। বহুদিনের পরিচয়, পরিবারের সবার কাছেও সে আপন মানুষ। স্বাভাবিকভাবেই তার মনে হয়েছিলো, সেই জায়গাটা হয়তো তারই হবে।কিন্তু বিহান এক মুহূর্তে সবকিছু বদলে দিলো।সায়রের পাশে গিয়ে দাঁড়াল বেলা।আর তাকে দাঁড়াতে হলো একটু দূরে।রুপসার ঠোঁটের হাসিটা মুহূর্তের জন্য ফিকে হয়ে গেলো।তার ভেতরে হালকা একটা বিরক্তি জন্ম নিলো। বিড়বিড় করে শক্ত মুখে বলে,
–সবসময়ই এই মেয়েটা চলে আসে কেন ওদের মাঝখানে?
নিজেকে সামলে নিয়ে আবার স্বাভাবিক মুখ করলো। সে কিন্তু পরের কয়েকটা মুহূর্ত তার চোখ এড়ালো না।ক্যামেরাম্যান বললো,
— সবাই একটু হাসুন তিন,দুই,এক।
ফ্ল্যাশ জ্ব’লে উঠলো।সবাই ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছে।শুধু একজন ছাড়া।বেলা জোর করে হাসলেও তার চোখের গভীরে জমে থাকা বিষণ্নতা স্পষ্ট।আর ঠিক সেই সময়। সায়রের চোখ এক মুহূর্তের জন্য পাশ ফিরে বেলার মুখে গিয়ে থামলো।খুব অল্প সময়ের জন্য।তারপর আবার সামনে।কয়েক সেকেন্ড পর আবারও একই ঘটনা।আবারও অজান্তে বেলার দিকেই তাকালো সে।রুপসার চোখ দুটো সরু হয়ে এলো।সে এবার খুব মনোযোগ দিয়ে সায়রকে লক্ষ্য করতে লাগলো।
তৃতীয়বারও যখন সায়রের দৃষ্টি অন্যমনস্কভাবে বেলার মুখে গিয়ে থামলো, তখন রুপসার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। তার মুখের হাসিটা এবার সত্যিই মিলিয়ে গেলো।মনে মনে চাপা বিরক্তিতে বললো,
—কী আছে ওই মেয়েটার মধ্যে? সারাক্ষণ বাচ্চাদের মতো লাফালাফি করে, অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে। অসহ্য মেয়ে একটা।
অজান্তেই তার দুই হাত শক্ত হয়ে মুঠো বেঁধে গেলো।চোখের গভীরে ঈর্ষার ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠলো।পরের মুহূর্তেই সে আবার ঠোঁটে ভদ্র একটা হাসি ফুটিয়ে তুললো, যেন কিছুই হয়নি।কিন্তু তার চোখের গভীরে যে হিং’সার আ’গুনটা ধীরে ধীরে জ্ব’লে উঠতে শুরু করেছে, সেটা হয়তো এখনও কেউ বুঝতে পারেনি। শুধু সে নিজেই জানে। আজকের এই কয়েকটা ছোট ছোট মুহূর্ত তার মনে একটা নতুন প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়ে গেলো।
রাত আরও খানিকটা নেমে এসেছে। ছাদের চারপাশে ঝুলে থাকা নীল-সাদা ফেয়ারি লাইটগুলো অন্ধকারের বুক চিরে মায়াবী এক আবহ তৈরি করেছে। হালকা বাতাসে বেলুনগুলো দুলছে, দূরে কোথাও ভেসে আসছে আতশবাজির শব্দ, আর ছাদের এক কোণে বড় পর্দায় ইতোমধ্যেই খেলার সম্প্রচারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যদিও ম্যাচ শুরু হতে এখনও কিছুটা সময় বাকি, তবুও সবার উ’ত্তেজনা দেখে মনে হচ্ছে খেলা যেন শুরু হয়েই গেছে।সারোয়ার খান হাতঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে বললেন,
—খেলা শুরু হতে এখনও সময় আছে। আগে সবাই খাওয়া-দাওয়া করে নাও। পরে আর কেউ নিজের জায়গা ছেড়ে উঠতে চাইবে না।
সঙ্গে সঙ্গে নাজনীন সুলতানাও সায় দিলেন।
—একদম ঠিক কথা। আগে সবাই খেয়ে নাও। না হলে পরে শুধু খেলা নিয়েই ব্যস্ত থাকবে।
বিহান দুই হাত তুলে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
— ঘোষণা করা হচ্ছে! আর্জেন্টিনার সমর্থকদের জন্য খাবার আগে, উদযাপন পরে। আর ব্রাজিল সমর্থকরা চাইলে না খেয়ে মন খারাপ করে বসে থাকতে পারেন! আর্জেন্টিনা হারলে না হয় আনন্দ করে খাবেন।
তার কথা শেষ হতেই চারপাশে আবারও হাসির রোল পড়ে গেল।
বাশার খান হেসে বললেন,
–সায়রকে না প’চালে তোর শান্তি মিলে না দুষ্টু ছেলে?
— না।
সবাই হাসতে হাসতেই খাবারের টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলো।ছাদের একপাশে লম্বা করে কয়েকটি টেবিল সাজানো হয়েছে। সাদা টেবিলক্লথের ওপর একের পর এক ধোঁয়া ওঠা বিরিয়ানি, রোস্ট, চিকেন বারবিকিউ, সালাদ, বোরহানি আর নানা রকম সফট ড্রিংকস সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সুগন্ধে পুরো ছাদ যেন আরও মুখর হয়ে উঠেছে।
বড়রা আগে বসে পড়লেন।তারপর ধীরে ধীরে বাকিরাও নিজেদের জায়গা নিতে লাগলো।মেয়েরা এক পাশে, ছেলেরা ঠিক বিপরীত পাশে বসেছে। মাঝখানে শুধু টেবিলের ব্যবধান।ইরা বেলার হাত ধরে পাশে বসিয়ে দিলো,
—এখানে বস।
বেলা কোনো আপত্তি করলো না।চুপচাপ এসে বসে পড়লো।ঠিক বিপরীত পাশের চেয়ারটা তখনও খালি।পরের মুহূর্তেই সায়র এসে সেই চেয়ারেই বসে পড়লো।বেলার বুকটা অকারণেই ধক করে উঠলো।সে একবারও মাথা তুলে তাকালো না।শুধু নিঃশব্দে নিজের প্লেটের দিকে চোখ রেখে বসে রইলো।অন্যদিকে সায়রও বসতে বসতেই এক ঝলক বেলার দিকে তাকিয়েছিলো।আবারও সেই একই দৃশ্য।মেয়েটা আজ অস্বাভাবিক রকমের চুপ।কোনো দুষ্টুমি নেই।কোনো অকারণ কথা নেই।এমনকি ইরার সঙ্গেও আগের মতো হেসে কথা বলছে না।বিষয়টা যতই উপেক্ষা করতে চাইছে, ততই যেন তার চোখে পড়ে যাচ্ছে।এদিকে ইরা খুব স্বাভাবিকভাবেই গল্প করতে শুরু করলো,
— আন্টি, বিরিয়ানিটার দারুণ ঘ্রান এসেছে!
নাজনীন সুলতানা মুচকি হেসে বললেন,
—আগে খেয়ে দেখো, তারপর বলো।
ইরা এক চামচ মুখে দিয়েই চোখ বড় বড় করে বললো,
—ওয়াও! সত্যিই অসাধারণ!
বিহান সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো,
— সাবধান! বেশি প্রশংসা করো না। আম্মু পরে আমাকে রান্নাঘরে ঢুকিয়ে দেবে। কারন বিরিয়ানি আমি রান্না করেছি।
আবারও হাসির ঢেউ বয়ে গেলো।সবাই গল্প করছে, হাসছে, খেতে খেতে খুনসুটিতে মেতে উঠেছে।শুধু বেলা চুপচাপ।প্লেটে খাবার নাড়াচাড়া করছে, কিন্তু ঠিকমতো খাচ্ছে না।সায়রের চোখে বিষয়টা এবার স্পষ্ট ধরা পড়লো।সে ভ্রু কুঁচকে বললো,
— খাচ্ছিস না কেন।
বেলা কোনো সাড়া দিলো না।মনে হলো, শুনতেই পায়নি।সায়র আবার ডাকলো,
–বেলা।
এবারও ধীরে ধীরে মাথা তুললো সে,
—জি?
— খাচ্ছিস না কেন?
বেলা খুব ছোট্ট করে উত্তর দিল,
— খাচ্ছি।
—এটাকে খাওয়া বলে?
—ধীরে ধীরে খাচ্ছি তো।
এই কয়েকটা শব্দ বলেই আবার নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো।সায়র আর কিছু বললো না।কিন্তু অদ্ভুত এক অস্বস্তি তার বুকের ভেতর নীরবে জমে উঠতে লাগলো।
—সত্যিই কি শরীর খারাপ? নাকি অন্য কিছু?
ওদিকে মমতাজ বেগম পুরো ঘটনাটা নীরবে লক্ষ্য করছিলো।বেলা কথা বলছে না।আর সায়র বারবার তার খোঁজ নিচ্ছে।এই দৃশ্যটা তার মোটেও ভালো লাগলো না।মুখে অবশ্য আগের মতোই হাসি ধরে রাখলো।
খাওয়া শেষ হতে হতে রাত আরও খানিকটা গভীর হয়ে গেলো।প্লেট-গ্লাস সরিয়ে সবাই আবার ছাদের মাঝখানে চলে এলো।বড় প্রজেক্টরের সামনে সারি করে চেয়ার সাজানো হয়েছে। কেউ হাতে ঠান্ডা পানীয় নিয়েছে, কেউ চিপসের প্যাকেট খুলেছে, আবার কেউ খেলা শুরুর আগেই আর্জেন্টিনার পতাকা কাঁধে জড়িয়ে ফেলেছে।বিহান কোথা থেকে একটা বড় আর্জেন্টিনার পতাকা এনে কাঁধে জড়িয়ে চিৎকার করে উঠলো,
— আজকে কিন্তু কেউ বসে বসে খেলা দেখবে না! গোল হলেই পুরো ছাদ কাঁপিয়ে ফেলবো!
চারপাশ থেকে একসঙ্গে সবাই বলে উঠলো,
— অবশ্যই!
কয়েক মিনিট পর ম্যাচ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো ছাদের পরিবেশ বদলে গেলো।প্রতিটি পাস, প্রতিটি আক্রমণ, প্রতিটি কর্নারে সবাই একসঙ্গে চিৎকার করছে।
বিহান তো উত্তেজনায় কখনো দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, কখনো আবার মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ছে।খেলার দ্বিতীয়ার্ধে অবশেষে আর্জেন্টিনা গোল করতেই পুরো ছাদ যেন বিস্ফোরিত হয়ে উঠলো
— গোওওল!!
রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৯
বিহান লাফিয়ে উঠে পতাকা নাড়াতে লাগলো। বলেছিলাম! আজকে জিতবোই!সারোয়ার খান পর্যন্ত হেসে হাততালি দিলেন।আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত হতেই। মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে উল্লাস শুরু হয়ে গেলো।এই আনন্দের ভিড়ের মাঝেও বেলা ঠোঁটে মৃদু হাসি রাখার চেষ্টা করছিলো।কিন্তু তার হাসিটা এখনও চোখ পর্যন্ত পৌঁছায়নি।আর ভিড়ের ওপাশে দাঁড়িয়ে সায়র আবারও একবার অজান্তেই তাকিয়ে রইলো বেলার দিকে। তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো,
— সবাই এত আনন্দ করছে।অথচ যার সবচেয়ে বেশি উল্লাসে মেতে উঠার কথা ।সেই মেয়েটার চোখে আজ বিষণ্নতা কেন?
