রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৫
সুহাসিনি ফাতেহা
ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সকলের চোখ এইমুহূর্তে আসা মানুষগুলোর উপর আবদ্ধ হয়েছে ইতিমধ্যেই। শুধু বউ সেজে সবার সামনে পুতুলের ন্যায় বসে থাকা রমণী কোনো ভাবেই চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। কিন্তু একজন তাকে রাগী চোখে তাকিয়ে দেখছে। এমন সেজেগুজে এখানে বসার মানে কি? খুব বিয়ে করার শখ? কই তার জন্য তো কখনো এভাবে সাজগোজ করেনি। তুষার চোখ ফিরিয়ে নিলো? ঝিলিকের পানে তাকাল না। মনে মনে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
“সেজে যেহেতু অন্যের জন্য বসেছেন এই সাজাতেই আপনাকে বিয়ে আমি। আপনার সবকিছু শুধু আমার নামে হোক! এই সাজগোজও আমি তুষার অন্য কারো জন্য হতে দিব না।”
আবার ঝিলিকের মুখোমুখি বসা পাঞ্জাবি গায়ে দেওয়া নাঈমকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। দেখল বলা যায়না চোখ রাঙিয়ে দেখল। মাথা থেকে পা অবধি দেখেছে। ঠিক কোথায় সাহস সঞ্চয় করে তার রমণীকে বিয়ে করতে আসছে সেটাই মূলত দেখতে চাচ্ছে। কিন্তু নাঈমের সেদিকে কোনো খেয়াল-ই নেই সে ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে আছে রোমান্টিক চোখে।
পাত্রপক্ষরা এদিক হতে চোখ ফিরিয়ে আবার নিজেদের মতো কথা বলা শুরু করেছেন। হয়তো কোনো মেহমান ভেবে।
তৌসিফ শেখ রয়েসয়ে ছেলের পাশে বসেছেন। শুধুমাত্র ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মান-সম্মানের কথা ভুলে তিনি এসেছেন। কথা বলতেও কেমন জানি বোধ করছেন তিনি। তুষার বাবাকে এটা ওটা ইঙ্গিত দিচ্ছে কথা বলার জন্য। তৌসিফ শেখ ছেলেকে আস্তে করে বললেন,
“যা বলার আমিই বলবো তুই কিছু বলতে গেলে কথা বাড়বে।”
জিসা বেগম, রুমানা বেগম,আফজাল খানও আমজাদ খান ওনারা তুষার আর তৌসিফ শেখকে দেখেই অবাক হয়ে গেলেন। জিসা বেগম মেয়েকে পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে এখন সেখান থেকে উঠেও আসতে পারছেন না। আমজাদ খান পাত্রের বাবার সাথে কথা বলছেন, বিয়ের পাকাপোক্ত বিষয়ে নিয়ে।
অয়নের মা রুমানা বেগম আর আফজাল খান বসা থেকে উঠে এলেন। রুমানা বেগম বললেন,
“কী রে তুষার তুই?
আফজাল খান এসে ইতিমধ্যেই বেয়াইর পাশে বসে কৌশল বিনিময় করলেন। বোনের মেয়েকে পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে বোনের স্বামী নেই ছেলেও নেই সে হিসাবে সব দায় দায়িত্ব বহন করেন বড় ভাইয়েরা।
তুষার নামটা কানে আসতেই ঝিলিক হঠাৎ ছটফট করে উঠে। কোথায় তুষার? চোখ তুলে তাকাতেই দেখলো অচেনা এক যুবক তার একদম মুখোমুখি বসে। নাঈমের চোখমুখ উজ্জল। সে অনেকক্ষণ ধরে উতলা চোখে ঝিলিককে দেখছে। সবাই অন্যদিকে ব্যস্ত কথাবার্তায়।
নাঈম মনে মনে ঝিলিকের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,
“কিউটিফুল!”
সুযোগ বুঝে মুখেও আস্তে করে বললো,
“তুমি অনেক সুন্দর।”
ঝিলিক চোখ নামিয়ে নেয়। আবার চোখ তুলে যে অন্যদিকে তাকিয়ে দেখবে সে সুযোগও নেই। সে অনেক অস্বস্তি ফিল করে। মনে হয় লোকটা তার দিকে কেমন করে তাকাচ্ছে। ছেলেটা আবার বলে,
“আমাকে পছন্দ করেছো তো? তুমি চাইলে দুজনে ছাদে গিয়ে মনের কথাগুলো শেয়ার করে এখন থেকেই ভবিষ্যৎ প্ল্যান শুরু করতে পারি।”
লোকটার কথার ভেতরেই তৌসিফ শেখ বললেন,
“আমরা মেয়ে দেখতে এসেছি বেয়াই।”
মান-ইজ্জতের শেষ দফায় এসে তৌসিফ শেখ অনেক ভেবেচিন্তে কথাটা বলেছেন। কোন পরিস্থিতি কিভাবে মোকাবেলা করতে হয় সব ওনার মাথায় ঘুরপাক খায় সবসময়। ওনার কথাটা শুনে উপস্থিত সবাই ঘুরে তাকান। রুমানা বেগম হতভম্ব হয়ে গেলেন। আফজাল খান হাসিমুখে বললেন,
“কোন মেয়ে দেখতে এসেছেন বেয়াই? বৌমা তো এখানে আসে নি।”
তৌসিফ শেখ ঝিলিকের নামটা মনে করতে পারছেন না। ছেলের দিকে তাকালেন আড়চোখে। তুষার সেদৃষ্টি দেখেই সরাসরি আওয়াজ করে গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
“ঝিলিককে।”
কথাটা শুনেই ঝিলিক থরথর করে কেঁপে উঠে। হতবাক, হতবিহ্বল অবাক, বিস্মিত সব মিলিয়ে সে জড়সড় হয়ে গেলো রীতিমত। হাত পা সব বরফ হয়ে আসছে। তুষার ভাই এ জন্য কি তার ফোন রিসিভ করেন নি। এখন কি হবে? ভালোই টের পাচ্ছে এখন বড়সড় ঝামেলা বেধে যাবে।
ড্রয়িংরুমের পরিবেশ থমথমে। তৌসিফ শেখ যেন ঝিলিককে পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে এমন কিছুই জানেন না তেমন ভাব-ভঙ্গিমা ধরে রেখে বললেন,
“হ্যাঁ বেয়াই আমরা ঝিলিককে-ই দেখতে এসেছি।”
পাত্রের মা বাবা সহ সবাই একে অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করলেন এ কথা শুনে। জিসা বেগমও উঠে দাঁড়ালেন। পাত্রের মা ঝিলিকের মায়ের উদ্দেশ্য বললেন,
“এসব কি হচ্ছে আপা? আমাদের ছেলের সাথে ঝিলিকের বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেছে এখন। আপনি ওনাদের কিছু বলছেন না কেন?”
তুষার শান্ত থাকতে পারছে না এ কথা শুনে। দিশেহারা হয়ে সেও উঠে দাঁড়িয়ে রেগে বলল,
“বিয়ে পাকা হয়েছে কিন্তু এখনো বিয়ে হয়নি। আপনার ছেলের জন্য অন্য মেয়ে দেখুন আমার ঝিলিককের সাথে বিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন।”
ঝিলিকের মা ভদ্রতা দেখিয়ে বললেন,
“তুষার তুমি এসব কি বলছো?”
তুষারের মুখশ্রী এবার আরো গম্ভীর। সে সবাইকে আশ্চর্যের সীমানায় পৌঁছে দিতে সহজ স্বীকারোক্তি তে বলল,
“যা বলছি সব ভেবেচিন্তে বলেছি। আপনার মেয়েকে আমার সাথে বিয়ে দিন। আমরা একে অপরকে ভালোবাসি।”
পাত্রের মা উঠে দাঁড়িয়ে এবার ছিঃ ছিঃ শুরু করলেন। মুখ বাঁকিয়ে বললেন,
“যা বুঝার বুঝে গেছি আমরা আপা। আগেই বলতে পারতেন মেয়ের বাইরের ছেলের সাথে সম্পর্ক।আপনার মেয়ে নষ্টা….”
“খবরদার! আমার ঝিলিকের নামে আর একটা বাজে কথা বলবেন না।”
তুষার কথাটা বলতে না বলতেই পাত্র নাঈম আচমকা উঠে এসে তুষারের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“এই কে আপনি? আসার পর থেকে শুধু আমার ঝিলিক আমার ঝিলিক বলে যাচ্ছেন। আমাদের বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেছে ভালোর ভালোই চলে যান।”
তুষারের রাগে ইচ্ছে করছে টি-টেবিল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে। তৌসিফ শেখ ছেলেকে শান্ত করাতে চেয়েও পারছেন না। তিনি আসার সময় ছেলেকে কি বুঝিয়ে এসেছেন ছেলে তার এখন কি করছে?
পাত্রের মা বাবা ছেলেকে টেনে নিয়ে বললেন,
“চল এখান থেকে। এই মেয়ের সাথে তোকে কিছুতেই বিয়ে দিবো না আমরা।”
বলে পাত্রের মা জিসা বেগমকে কটুকথা শুনাতেও ভুলেন নি।
নাঈম ঝিলিকের দিকে তাকায়। সেদিন দেশে ফিরে আসার সময় হঠাৎ গাড়ি থেকে রাস্তায় দেখেছিল মেয়েটাকে। তখন থেকেই মেয়েটাকে আড়ালে ফলো করে এসেছে। কিন্তু কারো সাথে সম্পর্কে জড়িত এমন কিছুতো চোখে পড়েনি। সে জেদ ধরে রেখে বলল,
“আমি বিয়ে করলে এই মেয়েকেই করবো ওকেই আমার পছন্দ হয়ছে আম্মু। তোমরা বসো।
“তোকে আমরা আরো ভালো সুন্দর মেয়ে এনে দিবো। চল এখান থেকে প্রয়োজনে এখন অন্য পাত্রী দেখতে যাবো।”
নাঈম যেতে চাইনা। কিন্তু তা বাবা মা তাকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। সে বারবার পেছন ফিরে ঝিলিকের দিকে তাকায়।
ঝিলিক কেঁদে চোখের পানি দিয়ে বন্যা করে ফেলছে ভয়ে। এই মেয়ে নষ্টা এই মেয়ে নষ্টা কথাটা বারবার তার কানে বাজছে। তক্ষুনি তুষার এসে ঝিলিকের সামনে দাঁড়িয়ে এক ঝটকায় নরম কব্জিটা নিজের মুঠোয় বন্দি করে।
গভীর কণ্ঠে বলে,
—-” চলুন আমার সাথে।”
আতঙ্কে চোখ বড় বড় হয়ে যায় ঝিলিকের। সে ভয় পায়। এমন তুষারকে সে আজ প্রথম দেখছে। কাঁপতে থেকে কোনোমতে বলল,
“কো–কোথায় যাবো?”
তুষার সে কথার জবাব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা মনে না করে তাকে নিয়ে যেতে থাকে। মাত্র কয়েক কদম পা বাড়াল তুষার, তক্ষুনি জিসা বেগম বলে উঠলেন,
“যেভাবে এসেছো সেভাবেই ফিরে যাও তুষার। তোমার জন্যই আজ আমাদের ওনাদের কাছে ছোট হতে হয়েছে। তুমি যা করেছো ভুল করেছো।”
“আমি ঝিলিককে ভালোবাসি। সেই অধিকারে-ই বিয়ে করতে নিয়ে যাচ্ছি। চাইলে আপনারা সবাই আসতে পারেন।”
তৌসিফ শেখ ছেলেকে থামিয়েছেন পথিমধ্যে। তিনি কিছুতেই চান না ছেলের বিয়ে এভাবে হোক। এর মাঝেই জিসা বেগমের হঠাৎ প্রেসার বেড়ে গেলো। ভদ্রমহিলা এসব সহ্য করতে না পেরে কেমন মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যেতে নিলেন। সবাই ধরাধরি করে সোফার দিকে নিয়ে গেলেন। ঝিলিক তুষারের থেকে হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে মায়ের কাছে চলে এলো। পানি এনে জ্ঞান ফিরানোর চেষ্টা করেন সবাই। আফজাল খান তৌসিফ শেখকে বললেন,
“বিষয়টা বোনের মন শান্ত হলে আমরা সবাই ভেবে দেখবো বেয়াই। অন্য একদিন আবার এক হয়ে না হয় কথা পাকাপোক্ত করে নিবো।”
তৌসিফ শেখ সে কথায় সম্মতি জানালেন। জিসা বেগমের জ্ঞান ফিরে এলো কিছুক্ষণ পর। তিনি পুরোটা সময় চুপ ছিলেন। কোনো মতামত দেননি। তবে আফজাল খান তৌসিফ শেখকে আশ্বাস দিলেন। পরে সবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসলেন।
ঘড়িতে রাত নয়টা পঁয়তাল্লিশ।
প্রতিমাসের নির্দিষ্ট সময়ের মতো পেটের ব্যাথায় শুয়া থেকে উঠতে পারছে না তিতলি। যন্ত্রণায় পেটের নিচে বালিশ চেপে ফু্পিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে চলছে। এ সময়ে আলেয়া শেখ মেয়ের পাশ থেকেই সরেন না তিতলি এ ব্যাথা সহ্য করতে পারে না একটুও। তখন ঔষুধ হটব্যাগ দিয়ে কোনমতে কমাতো। কিন্তু এখন? ব্যাথা নিয়ে মরা মুরগীর মতো ছটফট করছে পুরো বিছানার উপর।
ফারাজ মাগরিবের পর কোথাও বেরিয়ে গিয়েছে। তার পরপরই এ অবস্থা। ফারিন বেগম কয়বার ডেকে গেছেন। পুত্রবধুর সাড়াশব্দ না পেয়ে নিচে গিয়ে ছেলেকে ফোন করেছেন এখন। সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ হলো,
ফারিন বেগম চিন্তিত কন্ঠে বললেন,
“ফারাজ তুই কোথায়? তিতলি রুমের দরজা খুলছে না। কি হয়ছে কে জানে মেয়েটার। তুই যাওয়ার পরেই দেখলাম নিচ থেকে গেছে যে আর নামে নি।”
ফারাজ বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলো। যদিও এসব আড্ডাতে সে খুব কমই জয়েন করে। তবে বন্ধুদের জোরাজোরিতে এসেছে আজ। মায়ের ফোন পেয়ে রিসিভ করতেই এটা শুনে সে একটু সাইডে এসেছে। গম্ভীর স্বরে বলল,
“দরজা খুলছে না কেন? কি করছে ভেতরে?”
ফারিন বেগম: “সেটাই তো তোকে জানাতে ফোন করেছি। কিছুক্ষণ পরপর ফুপানোর শব্দ আসছে। আমি ডাকলেও সাড়া দেয় না।”
থমকায় ফারাজ। তীক্ষ্ণ চোয়ালখানা কেমন ঝুলে পড়েছে তার। কেমন চিন্তিত হয়ে মাকে তড়গড়ি করে বলল,
“আমি আসছি এক্ষুনি। তুমি আবার গিয়ে দেখে আসো আম্মু।”
মায়ের ফোন কেটে দিয়ে তিতলির নাম্বারে ফোন দিলো ফারাজ। দুবার, তিনবার, চারবার,প্রায় সাতবার ফোন দেওয়ার পর অবশেষে রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে শুধু রমণীর ফোঁপানোর শব্দ ভেসে আসছে। মেয়েটার কান্নার শব্দে খানিক বিচলিত হলো ফারাজ। এভাবে কাঁদছে কেন?
কিছু করে ফেলল না তো? যেমন দৌড়কোটে স্বভাব রুমের ভেতরেই কোনো অঘটন করে ফেলেছে নিশ্চিত। ফারাজের কণ্ঠ আশ্চর্যভাবে খুবই নরম হল,
“রুমের দরজা লাগিয়ে ভেতরে কি করছো? সব বলো আমাকে? আ’ম ওয়েটিং!”
তিতলি কিছু বলে না। পরনের সফেদ রঙা পাজামা টায় ইতিমধ্যেই ছোপছোপ রক্তের দাগ বসেছে। বিছানার চাদরে কয়েকফোঁটা লেগে গিয়েছে। কি করবে তার কাছে এখন কিছুই নেই। বিয়ের পর প্রথম হয়েছে। এ বিষয়ে ফারাজকে বলতেও তার কিশোরী মনে লজ্জা, অস্বস্তি লাগছে ভীষণ।
অপর পাশের ফারাজকে খুবই ধৈর্যবান দেখাচ্ছে। সে তখনো একনাগাড়ে অস্থির হয়ে বলে যাচ্ছে,
“কিছু জিজ্ঞেস করছি আমি। কথা বলছো না কেন? আমি আসলে তখন যদি দেখছি দরজা খুলছো না। আমি আসছি এক্ষুনি!” কল কাটবে না!”
ফারাজের কথার মাঝেই পথিমধ্যে কল কেটে দেয় সপ্তদশী। ফারাজ রেগে মোবাইল আছাড় মারতে গিয়েও আবার পকেটে ঢুকিয়ে বন্ধুদের থেকে বিদায় নিতে যায়। শাওন মেকি হেসে বলল,
“ভাবি কল করেছে নাকি ব্রো? সমস্যা নেই তোর বউ মানে আমাদের ও অর্ধেক বউ কথাগুলো আমাদের সামনে বললে মাইন্ড করতাম না।”
ফারাজের অভিব্যক্তি কঠিন। সে কিছু না বলেই বড়বড় কদম ফেলে বেরিয়ে যেতে থাকে। যুবকের বাদামী ঠোঁটজোড়া হুট করেই বিড়বিড়ালো,
“আমার কল কাটার জন্য তোমার কি যে হাল করবো।”
ফারাজ ড্রয়িংরুমে ঢুকেই কোনোদিকে না তাকিয়ে ধুপধাপ শব্দে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকে। তার গম্ভীর সুদর্শন মুখখানা ওমন ফ্যাকাসে হয়ছে কেন?
সে দরজা খোলার প্রয়োজনীয়তা না করে সোজা করিডোরর বেলকনির দরজা দিয়ে পা টপকে রুমের ভেতরে ঢুকলো। রুমে ঢুকেই সম্পূর্ণ রুমে নজর বুলালো। তিতলি কোলবালিশ জড়িয়ে অন্যদিক মুখ করে শুয়ে আছে। শব্দ ছাড়া কাঁদছে। ফারাজ ভাবে তিতলি শুধুশুধু কাঁদছে রুমের দরজা লাগিয়ে দিয়ে তাই সোজা গিয়ে তিতলির পিঠের নিচে হাত ঢুকিয়ে আচমকা তিতলিকে শুন্যে তুলে এনে হেঁচকা টানে শুয়া থেকে উঠালো। কেঁদে চোখ মুখ ফুলে কলাগাছ। ধমক দেওয়ার জন্য ফারাজের পাতলা ঠোঁটজোড়া কাঁপছে। গলায় ধমক আটকে রাখে সে। খসখসে দুহাত তিতলির নরম গালে রেখে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করে,
“কি হয়ছে?”
“আ…আমার…”
“আমি কি তোতলা বউ বিয়ে করেছি? সবসময় কথা বলার সময় আমমমআমি তুতততুমি করো কেন? যা বলবে ক্লিয়ার করে বলবে।”
তিতলি কেঁদে উঠলো এবার। নাক টানতে টানতে বলে বসে,
“কিছু না, কিছু হয়নি।”
ফারাজের কপারে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়েছে। বিদ্বিষ্ট চাউনী গভীরতা পেল। রক্ষণশীল গলায় ধমকের সুরে বলল,
“কি হয়েছে বলবে নাকি বলবে না? কেউ কিছু বলেছে খালামনি কিছু বলেছে?”
বলতে না বলতেই ফারাজের চোখজোড়া আচমকা করেই তিতলির সফেদ রঙা পাজামার উপর পড়ে। যুবক কেমন ভ্রুদ্বয় কুঁচকে তিতলিকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত নজর দেয়।
“হোয়াট হ্যাপেন্ড! এই কথা আমাকে বলতে এত কাহিনী করছো কেন? পিরিয়ড মনে হয় তোমার প্রথম হচ্ছে? আমাকে….” অর্ধেক বলতে গিয়ে থেমে গেল যুবক।
রমণী লজ্জায় খাটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে। তার পরনে লেডিস টি-শার্ট থাকায় সফেদ রঙা পাজামায় রক্তের ছোপছোপ দাগ গুলো স্পষ্ট হয়ে আছে। ঠোঁট চেপে সহ্য করছে পেটের ব্যাথা। কোনোমতে রয়েসয়ে বলল,
“আমার লজ্জা, লজ্জা লাগছে।”
ফারাজ সে কথার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা না করে জিভ ঠেলে অধর ভেজালো। অতি নরম কন্ঠে শুধালো,
“পেটে বেশি ব্যাথা করছে? এটা আমাকে আগে বললে কি আমি তোমাকে খেয়ে ফেলতাম বেয়াদব!”
তিতলি লজ্জায় মরিমরি। উপর নিচ মাথা দুলিয়ে নিচু সুরে বলল,
“হুমম!”
“একটু সহ্য করো আমি আসছি এখন ফিরে আসবো আবার!”
ফারাজ তিতলিকে আরো কিছু বলে বাইরে গিয়ে হট ব্যাগ সহ ওষুধ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে। তিতলি পরিস্কার হয়েছে আবার। ফারাজ বিছানার চাদর চেঞ্জ করে দিয়েছে। এতক্ষণে পেটের ব্যাথার ছটফটানি খানিক কমেছে তিতলির।
ফারাজ তিতলির পাশে বসে ছিলো এতক্ষণ। মেয়েটা কেঁদেকেটে চোখমুখের বেহাল অবস্থা করেছে। এই অবস্থায় সে না চাইতেও বউয়ের পাশে ছিলো। অনেকক্ষণ পর বলে,
“এখন কেমন লাগছে? ব্যাথা কমেছে?”
তিতলি নাক টানতে টানতে নাকের সর্দি ফারাজের বুকে ঘষে, মেঝে ঠোঁট উল্টে ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজে বলল,
“একটু কমেছে।”
ফারাজ হতভম্ব হয় তিতলির কাজে। কি সুন্দর করে বউ তার টি-র্শাটে সর্দি লাগিয়ে দিচ্ছে। ভ্রু নাচিয়ে শুধায়,
“টিস্যু এনে দিবো!”
একটু তো মুছেচি। এমন করেন কেন? হুহ!
ফারাজ ভ্রু কুঁচকে হিসহিসিয়ে আওড়ালো,
“তো? কেমন করবো?”
“কিছু না সরুন আমি ঘুমাবো।”
ফারাজ অনেক সময় ধরে ম্যাকবুকে জরুরী কাজ মগ্ন। সম্পূর্ণ মনেযোগ তখন ম্যাকবুকে। পুরো রুমে শুধু ডিমলাইটের হালকা আলো। সহসা যুবক কিছু একটা মনে করে ঘাড় ঘুরিয়ে বিছানার দিকে নজর দিলো। তাতেই বুক কাঁপছে ফারাজের। ম্যাকবুকের বোটনের উপর রাখা হাতদুটো তার, মুষ্টিবদ্ধ হয়েছে আনমনে। কন্ঠায় নেমেছে শুষ্কতা। যুবক কেমন আলগোছে জিভ ঠেলে অধর ভেজালো। ফের ম্যাকবুকে নজর আনতে চাই। কিন্তু অবাধ্য দুচোখ তার বারবার বিছানায় ঘুমন্ত এলোমেলো নারীর দিকে চলে যাচ্ছে।
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৪
সে তৎক্ষণাৎ উঠে কয়েক কদমে এগায় বিছানার দিকে। চোখদুটো বন্ধ করে সুদর্শন পুরুষ তার পেশিবহুল কাঁপা হাতের সাহায্য রমণীর বুকের ভাঁজের উপর উঠে থাকা লেডিস টি-র্শাট আলগোছে নামাতে যায়। তুলতুলে বুকে সহসা আঙুল ছোঁয়া লাগতেই সর্বাঙ্গ জুড়ে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল ফারাজের। নাম না জানা শিহরণ, যা মুহুর্তেই খরা নামিয়েছে যুবকের কন্ঠনালিতে। ফের জামাটা নামিয়ে দিয়ে আবারও ঘুমন্ত মেয়েটাকে গভীর অবলোকনে মত্ত হয়ে বিড়বিড় করে বলে,
“উমমম কন্ট্রোল! এখনো এসবের সময় আসেনি!
