রাগে অনুরাগে পর্ব ৪২
সুহাসিনি ফাতেহা
সবাই ভেবেছে এখন একটু ঘুরতে বের হবে। বাড়ির আশেপাশে যেসব জায়গা গুলো আছে সেগুলোতে। পরে ধীরেধীরে দূরের গুলোতে যাবে। তিতলি,ঝিলিক,অয়ন আলভী, ফরহাদ সাথে রোহান, ও ফারাজের মামাতো ভাই শিমুল, অভি, মামাতো বোন ময়না, পলি, সবাই একঝোট হয়েছে। আয়েশা প্রেগন্যান্ট হওয়ায় বিকেল টাইমে কোথায়ও বের হচ্ছে না। একজায়গা থেকে একজায়গায় এসেছে এত ঘুরাঘুরি রিস্ক ও হতে পারে। ফারিন বেগম ছেলের বউকে চিন্তিত স্বরে বললেন,
“তোমার কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই মা। আমাদের সাথে ঘরে থাকো। ফারাজ জানতে পারলে রেগে যাবে।”
তিতলি শাশুড়ির কথা শুনে মুখশ্রী অন্ধকার করে নেয়। ঝিলিক বলল,
“আমি আছি ফুপি। চিন্তা করোনা। তাছাড়া ফরহাদ ভাইয়েরা তো আছেই।”
“তাও ফারাজ তিতলিকে আসতে দিবেনা বলছে আমি জোর করে নিয়ে এসেছি। এখন ঘুরাঘুরির কথা জানলে…”
রোহান ধোয়াতুলসী পাতা হয়ে বলল,
“ফারাজ ভাই কি করে জানবে ভাবি আমাদের সাথে ঘুরতে গেছে।”
ফারিন বেগম রোহানের কথা শুনে কিছু বললেন না। তিনি কারো আশ্বাসে তিতলিকে যেতে দিতে চাচ্ছেন না। মোটকথা তিতলিকে নিয়ে কোনো রিস্ক নিতে চাচ্ছেন না।
সবার জোড়াজোড়িতে তিতলি সহ সবাই ঘুরতে যাবে বলে ঠিক হয়েছে। হুশিয়ার সাহেব তিতলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। সবার সাথে বাইরে অর্ধেক আসতে আসতে সবার উদ্দেশ্য বললেন,
“সাবধানে যাইবা সক্কলে। মাগরিবের আযান দিবের আগেই যেন আইয়া পড়ো। রাতের বেলা বাইরে থাকনের দরকার নাই।”
ফরহাদ নানাকে বলল,
“ঠিকাছে নানাভাই।”
সবাই মেইন গেইটে পেরিয়ে রাস্তায় চলে এলো। তিতলি মনে মনে ভাবছে যদি ফারাজ থাকতো তাহলে আরো বেশি ভালো হতো। সে অনেক ছবি তুলতো ফারাজের সাথে। আশেপাশে কত সুন্দর সুন্দর সবুজ জমিন। এগুলো ঢাকা শহরে তেমন একটা দেখা যায়না। ঝিলিক তিতলিকে বলল,
“তুমি কখনো টাঙ্গাইলে এসেছ তিতলি?”
“না প্রথম এসেছি, কিন্তু সিলেট,সন্দ্বীপ অনেকবার গিয়েছি।”
হুশিয়ার সাহেবদের বাড়ি টাঙ্গাইলের একটু গ্রাম সাইডে। তবে বেশ পরিপাটি গ্রাম। মোটামোটি শহরের মতোই সবকিছু।
ঘুরতে ঘুরতে আলভী তিতলির পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“একটু এদিকে তাকান তো ভাবি একটা পিক তুলি।”
“জ্বি ভাইয়া অবশ্যই।”
তিতলি কোনোকিছু না ভেবেই আলভীর পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসি দিয়ে একটা পিক তুলল।
আলভী বাঁকা হেসে একটা পিক ফারাজের হোয়াটসঅ্যাপ এ সেন্ড করে দিয়ে বলল,
“দেখ তোর বউকে নিয়ে ঘুরতে এসেছি। আসার পথে তোর বউ পড়ে গিয়ে কোমরে ব্যাথা পেয়েছে তাই অর্ধেক কোলে করেই নিয়ে এসেছি।”
মেসেজ টা দিয়ে মোবাইল পকেটে রেখে দিলো।
তিতলিরা তেমন একটা দূরে যেতে পারেনি। বাড়ি থেকে পাশের একটা বিভিন্ন রকমের ফুল গাছ দিয়ে ভরা একটা বাগানে গিয়ে আড্ডা দিয়ে এসেছে।
হুশিয়ার সাহেব বললেও প্রায় মাগরিবের আযানের পরপর ওরা ঘুরাঘুরি শেষ করে এসেছে। বাড়িতে এসে তিতলি গোসল করেছে আবার। একটা সাদা রঙা ছোট ছোট ঝর্ঝেটের কারুকাজ করা গোল ফ্রক পরেছে। জামাগুলো ফারাজই এনেছে তার জন্য। সে বলছিলো,
“আমার কিছু জামাকাপড় প্রয়োজন।”
ফারাজ উত্তরে কিছু না বললেও সেই রাতেই এগুলো নিয়ে এসেছে। দেখতেই বুঝা যায় অনেক দামি।
পেছনের গলাটা বেশ বড়। কি মনে করে এতবড় গলার জামা নিয়ে এসেছে কে জানে। তিতলি আজ প্রথম পরেছে। তাই ওড়না দিয়ে পিঠ ঢেকে নিয়েছে। ড্রয়িংরুমে গিয়ে দ্বিতীয় বারের মতো আড্ডা দিয়ে আবার রুমে এসেছে।
কালকে যেহেতু মেজবান তাই আজকে রাত থেকেই সব আয়োজন শুরু হয়েছে। অনেক আত্মীয়-স্বজনেরা চলে এসেছেন প্রায়। উঠানে পর্দা টাঙিয়ে বড় করে গেইটের মতো সাজানো হয়েছে। ডেকারেশনরা চলে এসেছেন তাদের বড়বড় হাড়ি পাতিল গুলো নিয়ে।
ফারিন বেগম তাদের বাড়ির বাজার-সাজার করা মুখলেস মিয়ার সাথে কথা বলে স্বামীর কাছে এসেছেন। কল কেটে দিয়ে স্বামীকে বললেন,
“শুনছেন একটা কথা?”
আফাজল খান ও আমরুল খান দু ভাই বসে কি নিয়ে যেন কথা বলছেন। এতক্ষণ ফারাজের মামারাও ছিলো এখানে। এখন অন্যদিকে চলে গেছেন। স্ত্রীর কথা শুনে বললেন,
“তুমি নিজেই তো বলতে এসেছো বলো কি কথা?”
“ফারাজ নাকি আসছে। মুখলেস মিয়া বলল, ফারাজ নাকি সকালে কলেজে যাওয়ার আগে মুখলেস মিয়াকে টাঙ্গাইলে যাবে বলছে। বাসার চাবি মুখলেস মিয়ার কাছে দিয়ে এসেছে।”
আফজাল খান কিছুক্ষণ চুপ থেকে সন্দেহের গলায় বললেন,
“কলেজে পরিক্ষার দায় দায়িত্ব শেষ নাকি?”
ছকিনা খাতুন এগিয়ে এলেন লাঠিতে ভর দিয়ে। আজকাল লাঠিতে ভর না দিলে হাঁটতে একটু অসুবিধা হয়। পান চিবুতে চিবুতে বললেন,
“কিয়ের কথা কইতাছো বাপজান। আমার নাতির কথা কইতাছো মনে হইতাছে?”
“হ্যাঁ আম্মা। আন্নের নাতি নাকি টাঙ্গাইলে আসবে।”
“আলহামদুলিল্লাহ্ হুইনা মনডা খুশিতে ভালা হয় গেলো বাপজান।”
তিতলি রুমে বসে আছে অনেকক্ষণ ধরে। মোবাইল হাতে নিয়ে শুধু দেখে কখন ফারাজ কল করবে। কিন্তু দেখে নিধি কল দিয়েছে তিতলি ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে নিধি টানটান গলায় বলে,
“কি খবর বেইবি শুনেছি টাঙ্গাইলে গিয়েছিস?”
তিতলি অবাক হয়ে বলল,
“আমি তোকে জানানোর সময় পায়নি। কিন্তু তুই কার থেকে শুনেছিস?”
নিধি:- “দুলাভাই বলেছে।”
তিতলি: – ‘ কিহহ! তুই কি জিজ্ঞেস করেছিস ওনাকে?’
নিধি:- ‘এমনি তোর কথা জিজ্ঞেস করায় বলছে টাঙ্গাইলে গেছে। একটা সারপ্রাইজ আছে শুনবি?”
তিতলি:- ‘কি সারপ্রাইজ বল?’
নিধি ওপাশ থেকে উত্তেজিত গলায় বলল,
“আমিও কিন্তু টাঙ্গাইলে যাচ্ছি কালকে। ফুপুর বাসায়। দেখা হবে বেইবি।”
তিতলি অনেক খুশি হয়ে যায় নিধি আসবে শুনে।
“তাহলে তো খুব মজা হবে।”
তিতলি নিধির সাথে আরও কয়েকটা কথা বলে মোবাইল টেবিলে রেখে আবার রুম বের হবে হবে ভাব। দরজার কাছাকাছি যেতেই সহসা কারো শক্তপোক্ত বুকের সাথে ধাক্কা লেগে মেঝেতে পড়ে গেলো বেচারি। উপরে না তাকিয়ে নিজের তুলতুলে নরম পৃষ্টদেশের স্পর্শকতার অঙ্গ দুটো হাত দিয়ে ডলছে। এত ব্যথা পেয়েছে। সাথে কোমড়ও ভেঙে গিয়েছে মনে হয়। আর্তনাদ করে বলে ওঠে,
–আহ…আমার কোমড়….” অর্ধেক বলে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
“রুমের মাঝখানে আবার এই লোহার রডের পিলার কোথায় থেকে আসলো। একদম ভাল্লুকের মতো শক্ত ….”
তিতলির কথা পথিমধ্যেই থেমে গেলো। সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তিকে দেখে হকচকিয়ে উঠল। বড়বড় চোখে তাকিয়ে রইলো। বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে সে। অগন্তুকের গোলান্দায মুখশ্রী লাল বর্ণ ধারণ করেছে। সাথে চোখজোড়া ও। চোখের কোণা লালচে দেখাচ্ছে সামান্য। ভ্রু দু’য়ের মাঝখানে সূক্ষ্ম ভাজ পড়েছে। চুলগুলো সামান্য এলোমেলো হয়ে কপালে ঝু লে আছে। কলেজের পোশাকে ফারাজ দাঁড়িয়ে। মনে হয় আজকে কলেজ থেকে সোজা টাঙ্গাইলে এসেছে। কিন্তু এটা তিতলির বিশ্বাস হচ্ছে না। ভয়ে তটস্থ বোকা মানবী তক্ষুনি গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠে,
“ভূ….ভূততত, ভূততত!”
সহসা ধারালো দাঁতের স্পর্শে নিজ নিম্নাংশেরর ঠোঁটখানা পিষ্ট করল যুবক। একহাতে তিতলির মুখ চেপে ধরল। অন্যহাতে তিতলিকে টানতে থাকলো। তিতলি ভয়ে মুখ চেপে ধরে রাখা হাতে শরীরের সবটুকু শক্তি প্রয়োগ করে কামড় বসিয়ে দেয়। পাঁচ থেকে ছয় মিনিটের বেশি এভাবে ধরে রাখলো এতটাই জোড়ে ছিলো যে সে নিজেই নিজের দাঁতে ব্যথা পায় কিন্তু সামনের যুবকের মধ্যে কোনোরকম ভাবান্তর দেখা গেলো না। ফারাজের হাতের তালু রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। যেন রক্ত বের হবে। তিতলি এবার সত্যি ভয় পেয়ে যায়। মানুষ হলে এতক্ষণে তার কামড়ে চিৎকার দেওয়ার কথা। নিশ্চিত ফারাজের রুপ ধরে কোনো ভূতপ্রেত বা এলিয়েন টাইপ কিছু তার সামনে এসেছে। সবার আগে আয়ুতুল কুরসী পড়া শরু করেছে। তার দাদুর কাছে শুনেছে আয়ুতুল কুরসী পড়লে ভূতপ্রেত চলে যায়।অস্পষ্ট গলায় শুরু করেছে,
“আউজুবিল্লাহিমার সয়তানির রাজিম
বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম!”
“আ..আয়ুতুল কুরসী!”
“আল্লাহু লা ই…ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়ুল কাইয়ুম..”
ফারাজ তিতলির মুখ চেপে ধরে। তিতলি ভূত ভেবে আবার চিৎকার করতে গেলে ফারাজ সবটুকু তেজ কন্ঠে ঢেলে বলল,
“চুপ একদম চুপ!”
তিতলি এবার কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। তাও পুরোপুরি না। যেন স্বপ্ন দেখছে সে। জোরজবরদস্তি তে ওড়না খুলে মেঝেতে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ভেজা চুল এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। তিতলি দৌড়ে দরজার খুলে বেরিয়ে যেতে চাইলো ফারাজকে দেখে এখনো দুচোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে হয়তো ভাবছে এটা সত্যি ফারাজ কিনা। দরজার দিকে কয়েক কদম পা বাড়ালো সপ্তদশী, তক্ষুনি হাতের তুলতুলে নরম কব্জি টেনে ধরে ফারাজ। ফারাজের পেশিবহুল হাতের একটানে অপ্রস্তুত তিতলি থুবড়ে পড়েছে ফারাজের বুকে। চিরচেনা সেই সুগন্ধি ঘ্রাণ ভেসে এসেছে নাকে। ফারাজের স্বাস্থ্যসম্মত শরীর গরম। উষ্ণ অনুভব করছে। সেই উষ্ণ অনুভবের নে শা য় স্বেচ্ছায় পড়ে রইলো ফারাজের বাহুতে। উদ্বিগ্নতার সহিত মিশে গেল পুরোপুরি। ঘনিষ্ঠ হয়ে নিজেই দুরু কেঁপে উঠলো। শিহরণ বয়ে গেল সম্পুর্ন শরীর জুড়ে। উপলব্ধি করতে পেল ফারাজের উঠানামা করা বুকের গতি। ধকধকানো শব্দ ও যেন শুনতে পারছে ভেতর হতে। ফারাজ শক্ত গলায় বলল,
“পালাচ্ছো কেন এখন? কার উস্কানি পেয়ে এত সাহস বেড়েছে ? মোবাইল কই?”
ফারাজ তিতলিকে বুকে রাখল না তিতলির তুলোর সাদৃশ দেহটা ছুড়ে বিছানায় ফেলে দিয়ে পেছনে ঘুরে কিছু একটা খুঁজলো দেখল টেবিলে মোবাইল। ফারাজকে মোবাইলের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে তিতলির তো জান যায় যায় অবস্থা। মনে পড়ে গেল সে আসার পর থেকে ফারাজের একটা কল রিসিভ করেনি মেসেজও সিন করে রিপ্লাই করেনি। আল্লাহ এখন কি করবে সে? উঠে বাধা দেওয়ার আগেই ফারাজ রাগে হিতাহিত দিশেহারা হয়ে মোবাইল ঘাটাঘাটি করে মেঝেতে আছাড় দিয়ে ফেলে দিয়েছে। তিতলির কান্না আর কে দেখে। তার শখের আইফোন। চোখের কোণ বেয়ে পানি পড়া শুরু করেছে। কিছুদিন আগে ফারাজ কিনে দিয়েছে আইফোনটা। সে দৌড়ে আইফোনটা হাতে নিলো। উপরের কাঁচ ভেঙে গুরোগুরো হয়ে গিয়েছে। এবার আর অবিশ্বাস করার কারণ নেই। তার মোবাইল ভেঙে দেওয়ার সাহস শুধু ফারাজের আছে।,
“এটা কি করলেন আপনি? আপনার মাথা ঠিক নেই?”
ফারাজ তিতলির কথার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা না দেখিয়ে উল্টো তিতলিকে আবার বিছানায় ফেলে দিয়ে ঈশুর তুলতুলে নরম হাতদুটোকে নিজের বলিষ্ঠ হাতে মুঠোবন্দি করে বিছানার সাথে চেপে ধরে আচানক চেপে ধরে ওর লতানো শীর্ণকায় শরীরটাকে। মায়াজালের ন্যায় বিস্তৃত দম আটকে আসা চোখ দুটোতে দৃষ্টি ফেলে তীক্ষ্ণ চোয়ালের পেশি গুলো আরও খানিকটা শক্ত করে গমগমে আওয়াজে ফারাজ বলে,
“মাথা ঠিক নেই সত্যি মাথা ঠিক নেই। দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করতে আসলে জান বের করে ফেলব।”
“আমি..আমি কি করেছি?”
ফারাজ হাত তুলে তিতলির শরীরের উপর নিজের বলিষ্ঠ রানের ভার ছেড়ে ওর বাম গালে হাত এগিয়ে নিতে গিয়ে পাশের কাঁচের জানালায় ঠাস করে বারি দিলো। তিতলি ভয়ে কেঁপে উঠে শুকনো ঢোক গিলল। জিভ ঠেলে অধর ভিজালো ফারাজ। কপালটা মাত্রাতিরিক্ত কুঁচকে রেখে শক্ত গলায় বলল,
“কিছু করো নি তুমি? ভেবে দেখো কি করেছ তুমি? সেকেন্ড টাইম….”
আরো কিছু বলতে গিয়ে তিতলিকে শূন্য তুলে বিছানায় উপুড় হয়ে শুইয়ে দেয়। তিতলির উন্মুক্ত ফর্সা মসৃণ পিঠে পরপর তিনটা থাপ্পড় দেয়। সামন্য হলেও তিতলি ব্যথা পেয়ে কুকড়ে উঠতেই ফারাজ তিতলির শরীরটায় কঠিন ঝাঁকুনি দিয়ে রেগে বলে উঠলো,
“আমার উনুপুস্থিতিতে এই জামা পরার সাহস কই পেলে? কার কার সামনে গেছো এটা পরে? আন্সার মি?’
তিতলির তো ভয়ে জান যায় যায় অবস্থা। এখন আবার জামা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। জামাগুলো তো ওনি নিজেই কিনে এনেছেন। ফারাজ পেছন থেকে তিতলির জামার ফিতে খুলে দিচ্ছে দেখে তিতলি তখন কান্নামিশ্রিত গলায় বলল,
“শুধু ড্রয়িংরুমে গেছি বিশ্বাস করুন।”
“এক্ষুনি খুলো এটা।”
খুলবো মানে….”
বাক্যটুকু সিক্ত জিভ খসে বেরুনোর ফুরসত অব্দি পেলো না বোধহয়, তার পূর্বেই তিতলির কর্ণকুহরে পৌঁছাল ফারাজের নির্লিপ্ত কণ্ঠ!
“এখন খোলার প্রয়োজন নেই। রুম থেক বেরোবের আগে আমি নিজের হাতে খুলে দেবো।”
“আপনি তো নিজেই সেদিন জামা গুলো কিনে এনেছেন তাহলে আবার পেছনের গলা এত বড় নিয়ে কথা তুলছেন কেন?”
“আমি এনেছি আমার সামনে পরার জন্য। তোমাকে এখানে এসে এই জামা পরার অধিকার আমি দিইনি।”
“মো-মোবাইল ভেঙে দিয়েছেন কেন?”
বলেই তিতলি ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো। সামান্য মোবাইলের জন্য কেঁদে কেঁটে একাকার অবস্থা। কই তার জন্য তো একবারও কাঁদতে দেখল না? উল্টো তার কোনো কল রিসিভ করেনি। মেসেজ সিন করে রিপ্লাই করেনি তখন ফারাজ হাতের জোড় বাড়াল আরো। চিড়বিড়িয়ে আওড়ালো,
“তুমি বলো তোমার মোবাইল কেন ভেঙেছি আমি? কোনো দোষ করো নি তুমি?”
“না!”
“কালকে থেকে আমার কল রিসিভ করেনি কে? ফোন অফ করে রেখেছে কে? জানে ভয় নেই? একবারও মনে হয় নি? এর ফল কি হতে পারে?”
তিতলি এবার বুঝল কল মেসেজ সবকিছুর সুদ নিতে তাকে এখন শায়েস্তা করবে। সে ভেজা চোখে ঘাড় তুলে পিটপিট করে তাকাল। বুঝল কিছু না বললে সবকিছু হজম করতে হবে। কিন্তু কাজের সামিলে পরার চেয়ে মুখ দিয়ে সত্যি কথা বলে দেওয়া দরকার। তাই আর কিছু না ভেবে মিনমিনিয়ে বলল,
“আমি কি করবো বলুন কল রিসিভ করলে তো আপনি আসতেন না? তাই একটু ড্রামা করে নিয়ে এসেছি।”
সহসা নিজ নিম্নাংশের অধর কামড়ে ধরল ফারাজ। সাথে চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। ঘাড়টা সামান্য কাত করে এদিক ওদিক তাকায়। তখন তিতলি ভয়ডর ভুলে গিয়ে বলল,
“আপনি আমার জন্য এসেছেন তাইনা?”
তিতলির প্রশ্নে ফারাজের মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা গেলো না। প্রশ্নের জবাব দিবে তো দূরের বিষয়! কয়েক মিনিটেও ফারাজের থেকে কোনো উত্তর এলো না।
তিতলি পুনরায় বলল,
‘বলেন না!’
“ককখন এসেছেন আপনি?”
ফারাজ বিছানা থেকে নেমে একহাতে পরনের শার্টটা খুলে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিলো। তিতলি ফারাজকে শার্ট খুলে ফেলতে দেখে আবার উঠে দরজার দিকে দৌড় দিতে গেলো। ভাল্লুক হেব্বি রেগে গিয়েছে। তিতলিকে আবার অন্যহাতে টেনেহিঁচরে নিজের সামনে একটা বেতের চেয়ারে এনে বসিয়ে সেও তিতলির মুখোমুখি একটা সোফায় আরাম করে দুদিকে দুপা ছড়িয়ে দিয়ে বসল। তিতলির উপর গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বিরক্তির রেশ ধরে বলল,
“সেটা তোমার জানার প্রয়োজন নেই। চুপচাপ আমার দুচোখের সামনে বসে থাকো! আর একবার উঠার চেষ্টা করলে হাতপা দুটোই চেয়ারের সাথে বেঁধে দেবো। এখনো কিছু করিনি তোমায়, আজকে কি করবো তোমার দেখে যাও শুধু।”
তিতলি উপরে উপরে অভিনয় করলেও মনেমনে ফারাজ এসেছে দেখে চোখদুটো উজ্জল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সে উজ্জলতা বেশিক্ষণ টিকলো না। ফারাজ তিতলির মুখের বড্ড কাছে নিজের মুখটা ঝুঁকিয়ে এনে বড্ড বড়করে গাল দিয়ে নিশ্বাস ছাড়লো। তিতলি কেশে উঠে নাকমুখ কুঁচকে নিলো। গোল মুখশ্রীতে হতবিহ্বল, বিস্মিত ভাব ধরেছে রমণীর। এ অবধি সে কখনো ফারাজের থেকে সিগারেটের গন্ধ পায়নি। ফারাজ আবার একই কাজ করতেই তক্ষুনি তিতলি পুনরায় কেশে উঠে বলল,
রাগে অনুরাগে পর্ব ৪১ (২)
“আপনার থেকে সিগারেটের গন্ধ আসছে নাকে, আপনি..আপনি সিগারেট খেয়েছেন?”
তিললির কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি, সাথেসাথেই ফারাজ তিতলির কথা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে উত্তর দিলো একেবারে নিজের ঢঙে,
“ও তাই? গন্ধ টা শুধু নাকেই সীমাবদ্ধ থাকুক সেটা তুমি চাওনা তাইতো? ওকে ফাইন,আজকে একটু সিগারেটের গন্ধ সহ্য করে নিতে পারবে।”
