রাগে অনুরাগে পর্ব ৫
সুহাসিনি ফাতেহা
“আমার মতলব সুবিধার হোক না হয় অসুবিধার হোক! তাতে আপনার কি ?”
এই প্রশ্নটা ছুড়ে দিতেই ফারাজ তিতলির থেকে দুরুত্ব রেখে দাড়ালো। এই মেয়ে একদম স্বাভাবিক না! ফারাজ খানের মতে অতিরিক্ত বেয়াদব! বড়দের মুখের উপর কথা বলে। ফারাজ খান যদি এই বেয়াদব মেয়েটাকে সোজা করার চান্স পেতো। সোজা হতে হতে একদম তার চিহ্ন পাওয়া যেতো না। ফারাজ ফের গম্ভীর কন্ঠে উত্তর দিল,
“আপনার মতলব যে কী! সেটা আমি ভালোই জানি মিস তিতলি ! আর আপনি জানেন? ফারাজ খান কিভাকে ডিল করে? জানেন না তো? সেটাও খুব শিগগিরই বুঝবেন?”
তিতলি মুখ ভেঙ্গিয়ে বিদ্রুপ কণ্ঠে জানাল,
“আমার এত বুঝার দরকার ও নেই। আপনি কি ডিল করেন নাকি চিল করেন সেসব তিতলি জানতে চাই না।”
ফারাজ তাকালো সামনে দাড়িয়ে থাকা বেয়াদব মেয়েটার মুখপানে। সহসা অধরের প্রান্তে বাঁকা হাসির রেখা টানলো।
তিতলি অবাক হলো! ভরকালো চমকালো !গম্ভীর মুখে বাঁকা হাসি! ভাবা যায়? সহজে তো এই লোককে হাসতে দেখা যায় না। নিশ্চিত তার কোনো গোপন কথা জানতে পেরেছে। লোকটা জেন্টেলম্যান! তারউপর তার পেটে যে চাপ দিচ্ছে সেটার তো কোনো খবর নেই! তার ভাইটা কোথায় গেলো? তার আসলে আসায় উচিত হয়নি, কোথায় মজা করবে ভাবলো। হলো কই? হলুদের দিনই উঁচকা ঝামেলা! তিতলি পেটের চাপ কোনোরকম চেপে রেখেছে!আল্লাহ আল্লাহ যদি কোনোভাবে চলে যায়! সপ্তাদশী হাঁশফাশ করলো।
ফারাজ সরু চোখে দেখলো সব!সে একটু পরিক্ষা করবে নাকি এই মেয়েটাকে? করেই দেখা যাক! সচারচর সে কখনো কারো সাথে যেঁচে কথা বলে না। এটা তার ডিকশনারিতে নেই।এই বেয়াদব মেয়েটাকে যদি উচিত শিক্ষা দিতেই হয় তাহলে তার কিছু করার প্রয়োজন আছে।
তাই ফারাজ ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,
“আপনার নাকি ডাইরিয়া?এখন ভালো হয়েছেন তো? না হলে কিন্তু আমার কাছে ঔষুধ আছে। একবার খেলে আর দশ জনমে ও আপনার ডাইরিয়া হবে না।”
তিতলি অবাক,বিস্ময়,হতবিহ্বল! তার ডাইরিয়া? সে কখন বললো এই লোককে? বাহিরের কাউকে তো বলেনি?এমনকি তার বন্ধুদেরও না যে কলেজে গিয়ে স্যারকে বলবে।এই লোক কি তার সাথে সিসি ক্যামেরা ফিট করে দিলো?যার জন্য করলো কলেজ চুরি! সে বললো চোর! তিতলি কি আর ইচ্ছে করে মিথ্যা ডাইরিয়া বানাইছে? সপ্তাদশীর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো।ডাইরিয়া না হলেও এবার সত্যি ডাইরিয়া হয়ে যাবে মনে হয়!
তিতলি উশঁখোস করে বলল,
“আমি আপনাকে বলছি নাকি আমার ডাইরিয়া? তিতলি থামলো।
অতঃপর স্রেফ বললো,
“আর শুনুন ডাইরিয়া হলেও আপনার ঔষুধ এই তিতলি নিবে না। বেশি মানবদরদী দেখাচ্ছেন নাকি?”
ফারাজ ভ্রু কুঁচকালো!বলল,
“বেশ আমি মানবদরদী? আপনি যদি ভাবেন তবে আমি মানব দরদীই।”
তিতলিও খোঁচা দিয়ে বলল,
“আমি আপনার শার্টে একটু ডাইরিয়া করে দিতে পারি? আপনি তো মানবদরদী। আমার জানামতে মানবদরদী’রা কখনো মানুষের সাথে ব্যাঙের মতো গ্যাং”গ্যাং করে না তাই না? উল্টো মায়া দেখায়!”
একটু থেমে সপ্তাদশী ফারাজ খানের মুখ বরবার চাইলো। তিতলি যেন বেশ মজা ফেলো।
ফিক করে হেসে দিয়ে বলল,
“কি রাগ করলেন?”
ফারাজ বিরক্তিতে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। চোখের কোণে বিরক্তির ছাপ। মুখ থেকে একটা অসম্পূর্ণ ‘চ’ জাতীয় শব্দ বেরিয়ে আসে। অতঃপর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
ইডিয়ট!
‘তিতলি এই তিললি?কোথায় তুই?’
আশেপাশে তুষারের ডাক শুনে তিতলি একদম ধোঁয়া তুলশী পাতা হয়ে গেলো।যেন সে কিছু জানে না।সে এতক্ষণ যাবত কিছু করে নি। ভাবখানা এমন সে ফারাজ খানকে এখন দেখেছে। তার ভাই যদি জানতে পারে সে এখানে স্যারের সাথে ঝামেলা করেছে তাহলে তার আস্ত থাকবে না। আর সে কি ভুল কিছু করেছে। উচিত জবাব দিয়েছে। একদম ঠিক করেছে। তুষারকে না দেখার ভান করেই ফারাজের উদ্দেশ্য বলল,
“আসসালামু আলাইকুম। ভালো আছেন? আপনি এখানে কেন স্যার? ”
ফারাজ এই বেয়াদব মেয়ের হাভবাব বুঝার চেষ্টা করছে না।মন চাচ্ছে একদম থাপড়ে সব দাঁত ফেলে দিতে।ফারাজ তিতলির কথা উপেক্ষা করেই তিতলির সামনে দিয়ে চলে যাবে এমন সময় তিতলি ডাকলো,
“কোথায় যাচ্ছেন স্যার?”
ফারাজ যেতে যেতে চিবিয়ে চিবিয়ে জানালো,
জাহান্নামে।
যেভাবে স্টুডেন্টদের ধমক দেন! নিশ্চিত আপনার জায়গা জাহান্নামেই হবে। তিতলি মুখ ভেঙচি কাটলো।
ততক্ষণে তুষার সেখানে উপস্থিত।ও এসেই তিতলিকে এক ধমক দিলো,
এই তোকে কখন থেকে খুঁজছি ফাজিল মেয়ে। ছাঁদ থেকে নামলি কেন?তোকে আমি নিষেধ করিনি?
সপ্তাদশীর মুখটা নিমিষেই ভয়ে পরিনিত হলো। বারবারই ভাইকে ভয় পায়। সে তো ভাইকেই খুঁজছিলো। তিতলি জানাল,
আমি কি ইচ্ছে করে নেমেছি! আমি তোমাকে খুঁজতে এসেছি ভাইয়া। আমি বাড়ি যাবো।
হঠাৎ এখন বাড়ি যাবি কেন? আসার সময় তো বাঁদরের মতো লাফিয়ে চলে এসেছিস?
আমার দুই নাম্বার ধরেছে ভাইয়া। প্লিজ বাড়ি চলো। আমি এখানে আর থাকবো না।
এই কথা তুই রুমানা আন্টি কে বলতে পারিস নি।
আমি কিভাবে বলবো। আন্টি কত মানুষের সাথে বসে কাজ করছেন?
তুষার চুপ হলো। অতঃপর বলল,
আয়?
কোথায়?
তোর না দুই নাম্বার ধরেছে?
হুমম।
তুষার তিতলি কে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো।
ড্রয়িংরুমে সব বয়স্ক মহিলারা আছেন।কেউ কেউ এদিক থেকে ওদিক ছুঁটছেন। বিয়ের বাড়ির কাজ কি আর কম থাকে? কত কাজ। করতে করতে ফজরের আযান ও দিয়ে দেয়। তাও শেষ হয় না। তুষার অয়নের মা রুমানা বেগম কে ডাকলেন।
আন্টি আর্জেন্ট একটু এদিকে আসেন।
রুমানা বেগম তুষার কে খুব স্নেহ করেন। তিনি কাজ রেখে এগিয়ে এলেন। বললেন,
কিরে তুষার? কিছু লাগবে?
পরপর তিতলির দিকে তাকালেন ভদ্রমহিলা। মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন,
তিতলি এদিকে আসো? কাজের কারণে তোমাকে তো একটু দেখলাম ও না। কিছু খাবে?
না না আন্টি আমি কিছু খাবো না। বলে তিতলি ভাইয়ের দিকে তাকালো।
তুষার বুঝে আস্তে করে বলল,
আসলে আন্টি তিতলি ভাতরুমে যাবে।ওকে একটু..’
রুমানা বেগম তুষারের কথা শেষ হওয়ার আগেই বললেন,
পাগলি মেয়ে।এটা আমাকে এসে বলতে পারতে।
আপনি কাজ করছিলেন তাই ডাকিনি আন্টি।
তখন সেখানে ফারাজ খান ও এলো। বাহিরে তিনি বেশ গরম উপভোগ করছেন তাই একটু এসির নিচে এসে বসেছেন। ফারাজ দেখলো বেয়াদব মেয়েটা তার চাচির সাথে যাচ্ছে। ফারাজ ফের মোবাইলের স্কিনে মনেযোগ দিলেন।
তুষার এসে ফারাজ খানের পাশে বসলো। ভদ্র ভাবে বলল,
কি খবর ভাই?
ফারাজ তাকালেন তুষারের দিকে।গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
এইতো আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি কেমন আছো?
বয়সে তুষার ফারাজের দুইতিন বছরের ছোট হবে। ফারাজ নিজের বয়সের ছোট ছেলেদের তুমি বলেই সমোন্ধন করে।
তুষার বললো,
ভালো আছি। তারপর বেশ ভদ্রতায় বললো,
আমার বোন টা কলেজে পড়ালেখা ঠিকমতো করেতো?
ফারাজ খান নড়েচড়ে উঠলেন। ভ্রু জোড়া কুঁচকে রেখেছেন। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে জানালেন,
খুব ভালো পড়াশোনা করে। অনেক ভালো স্টুডেন্ট তো! কেউ না পারলেও তোমার বোন সবার আগে পড়া পেরে যায়।
পড়ায় একটু্ও ছাড় দিবেন না ভাই। কোনো ভুল করলে আমাকে জানাবেন। বলে তুষার চলে গেলো।
ফারাজ খান ক্রুর হাসলো। বেয়াদব মেয়ে! বিরবির করলেন,
আপনার ভাইও আপনার বিপক্ষে বেয়াদব মেয়ে।
আজ বিয়ের দিন।রাতে তিতলিরা সে বাড়িতে থাকে নি। তিতলি রাতে ঘুম না গিয়ে থাকতে পারে না। ওর সুন্দর ঘুমের জন্যই তুষার তিতলিকে নিয়ে চলে এসেছে।
ঘড়ির কাঁটায় এখন সকাল এগারোটা বাজে ত্রিশ মিনিট। বিয়ে বাড়িতে আজকে তিতলির আর যেতে ইচ্ছে করছে না। কারণ ওখানে ফারাজ খানকে দেখলে সপ্তাদশীর মন চাই খুন করতে। কিভাবে যেন তার শুধু ওই লোকের সাথে ঝগরা লেগে যায়। তিতলি ভাবলো পুরোটা।আসলে দোষটা তার! ঝগরা করার কথা সেই তুলছে ধাক্কাও সে দিয়েছে। পরক্ষনেই ভাবলো,
একদম ভালো করেছি। ওই লোক কে ধাক্কা দিতে পেরে মুখের উপর ঠিক কথা বলতে পেরে চঞ্চল তিতলির আনন্দের শেষ সীমানা নেই।
তারপরও ভাইয়ের এক কথায় তাকে আজকে আবার যেতে হবে ওই বাড়ি।তিতলি বড্ড ভাই পাগল মেয়ে।ভাই বললে উঠে ভাই বললে বসে।
গোসল করে তিতলি বিয়েতে যাওয়ার জন্য সুন্দর একটা গর্জিয়াস গ্রাউন পড়লো।গ্রাউন টা চোখে দেখার মতো। এবার কোরবানি ঈদে কিনেছে। কিন্তু পড়া হয় নি। তাই আজকে পড়েছে। সুন্দর করে সাজলো। রেডি হয়ে কয়েকটা ডং করে পিকও তুললো। তিতলির একটা খোরগশ আছে।ধবধবে সাদা এত সুন্দর! তিতলি তাকে খুব ভালোবাসে। সপ্তাদশী খোরগশ টাকে কোলে নিয়ে পিক নিলো। নিজের রিয়েল আইডিতে ডুকে একটা ক্যাপশন দেখলো। চঞ্চল তিতলির ক্যাপশন টা ভালো লেগে যায়। তাই সে নিজের দুইটা পিক ভালোমতে মুখ দেখা যায় না।সেগুলো দিয়ে ক্যাপশন টা দিয়ে পোস্ট করলো।
ফারাজ খান সদ্য গোসল সেরে ওয়াশরুম থেকে বের হয়েছেন পরনে টাওয়াল পেঁছানো। ভেজা চুল গুলো দু হাত দ্বারা ব্যাকব্রাশ করে পেছনে ঠেলে দিলেন। বিছানায় সাদা-পাঞ্জাবি পাজামা রাখা। চাচাতো বোনের বিয়ে বলে কথা। অনেক দায়িত্ব। তার বোন নেই তাই ওনি নিজের চাচাতো বোনদের বোনের মতো ভালোবাসেন। ওনারা দুই ভাই। অন্যজনের নাম ফরহাদ খান। বিবাহিত। ফারাজ প্যান্টের ভেতরে আন্ডারওয়ার পরতে পরতে মোবাইলের স্কিন জ্বলে উঠলো। তিনি তাকালেন সেদিকে। কি মনে করে মোবাইল হাতে নিলেন। ফেসবুকে নোটিফিকেশন এসেছে। —”তিতলি তেহেরিন শেখ”
ফারাজ চিনে মেয়েটাকে। তার আইডির সাথে এড আছে। তিনি স্ক্রল করে ডুকলেন,দেখলেন মেয়েটা পোস্ট করেছে তিনি ছবি দেখার লোক না। বরং ক্যাপশন দেখলেন,
রাগে অনুরাগে পর্ব ৪
”পুরুষ মানুষদের বিশ্বাস করতে নেই! তারা ঘরে সুন্দুরী কিউট বউ রেখে বাহিরে অন্য নারীদের নিয়ে ফূর্তি করে।”
ফারাজ খান ভ্রু জোড়া কুঁচকাল। তিনি পড়া শেষে বিরবির করে বললেন,
”ক্যারেক্টারলেস!বেয়াদব মেয়ে! আমার সাথে লাগতে এসে আপনি নিজের পায়ে নিজে কু*ড়াল মারছেন না মিস তিতলি! পরে কিন্তু পস্তাবেন। আমি ফারাজ খান ছাড় দিলেও ছেড়ে দেই না।”
