Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৬

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৬

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৬
সিমরান মিমি

শামসুল সরদারের বড় মেয়ে স্পর্শীয়া সরদার কিছুক্ষণ পূর্বেই গুরুতর ভাবে এক্সিডেন্ট করেছেন। একটা কালো রঙের প্রাইভেট কার চাপা দিয়েছে তাকে। নিস্তব্ধ নিথর হয়ে পড়ে ছিলো রাস্তায়। তবুও দলের কেউ তাকে হস্পিটালে নিয়ে যেতে পারে নি। কারন বাঁধা হিসেবে ছিলেন পরশ শিকদার। সে জ্ঞানহীন স্পর্শীয়াকে হস্পিটালে নিয়ে যায় নি। বরং তাকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে অন্যকোথাও চলে গেছে।
খবরটা ঠিক এইভাবেই পৌঁছেছে শামসুল সরদারের নিকট। তিনি অবস্থান করছিলেন উপজেলাতে। ঘটনা শোনা মাত্র’ই বজ্রকন্ঠে গর্জে উঠলেন। কখনো মেয়ের এক্সিডেন্টের দৃশ্য চোখে ভাসতেই শরীর ছেড়ে দিচ্ছেন। আবার যখন মনে পড়লো অসুস্থ স্পর্শীয়াকে পরশ জোর করে তুলে নিয়ে গেছে, তখন রাগে আহত বাঘের ন্যায় গর্জে উঠছেন। ছাড়বেন না পরশ শিকদারকে। বুক ঝাঝরা করে দেবেন বুলেটের আঘাতে।
সন্ধ্যা পরবর্তী সময়। আশপাশ তখন অন্ধাকারাচ্ছন্ন। শীতের কুয়াশায় সিক্ত হয়ে চাঁদ ও লুকিয়েছে মেঘেদের আড়ালে। যেনো কুয়াশা তাকে ছুঁতে না পারে। বাড়ির পুরুষদের অনুপস্থিতিতে সরদার বাড়ি সবসময় নিরব, নিস্তব্ধ হয়ে থাকে। কোনোরকম ঝই-ঝামেলাহীন পরিবেশে সোনালী, রিহানের স্ত্রী এবং বাড়ির সাহায্যকারী মধ্যবয়স্ক মহিলা বসে থাকে ড্রয়িংরুমে। কখনো টিভিতে সিরিয়াল দেখতে মগ্ন থাকে, তো কখনো ফোনের মধ্যে। আজও তার ব্যতিক্রম নয়।
এমনই সন্ধ্যার পরবর্তী নিস্তব্ধ মুহুর্তটা গাড়ির হর্ণের আওয়াজে নড়বড়ে হয়ে উঠলো। সোনালী সোফা থেকে উঠে জানালার দিকে যেতে লাগলেন। বললেন,

—এতো তাড়াতাড়ি এসে গেলো ভাইজানেরা?
বলতে বলতে উঁকি দিলেন। দূর থেকে গাড়ির রঙ টা স্পষ্ট দেখা গেলো না। হেডলাইটের আলোয় সম্মুখের জায়গাটুকু একদম স্পষ্ট। দেখা গেলো দারোয়ানকে। বাহাদুর ব্যস্ত পায়ে গেট খুলছে। তার পরপর’ই এগিয়ে এলো লম্বা-চওড়া এক পুরুষ । তার কোলে ভারসাম্যহীন শুয়ে আছে একটা মেয়ে। গায়ের পোশাক দেখে আঁতকে উঠলো সোনালী। এই ড্রেস দুপুরে বের হওয়ার সময় স্পর্শীয়া পড়েছিলো। তিনি আতংকিত হয়ে সদর দরজার দিকে ছুটে গেলেন। অস্ফুটস্বরে আর্তনাদ করে বললেন,
– স্পর্শীয়া!!!
ড্রয়িংরুমের সকলে সজাগ দৃষ্টিতে তাকালো। কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই পরশ প্রবেশ করলো ড্রয়িংরুমে। ঢুকেই আশাহত হলো। নাহ, কোনো পুরুষ উপস্থিত নেই। থাকলে অন্তত রাগ-ক্ষোভ দেখাতে পারতো। কিন্তু এই মহিলাদের সাথে কি কথা বলবে সে? খানিক অসস্তি এবং জড়তায় ফেঁসে গিয়ে সোফার দিকে এগিয়ে গেলো। ধীরস্থির হয়ে শুইয়ে দিলো স্পর্শীয়াকে। ইতোমধ্যে তিনজন মহিলার আঠারো রকমের প্রশ্ন করা শেষ। তাদের চিৎকার চেঁচামেচি শুনে নিজের রুম থেকে ছুটে নিচে চলে এসেছে আর্শি। সে ঘুমাচ্ছিলো। স্পর্শীকে সোফায় অচেতন হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে চমকালো। থেমে থেমে পা বাড়ালো সিঁড়িতে। আপাতত ড্রয়িংরুমের পরিস্থিতি বোধগম্য হচ্ছে না। কিন্তু পরশ শিকদারকে দেখে কিছুটা শঙ্কিত হলো। মনে মনে অসন্তুষ্টও হলো। তিনি কি জানেন না, এ বাড়ির কেউ তাকে পছন্দ করে না। নানা কটু কথা, ধমক, অপমান সইতে হবে পুরো সময়টাতে। তারপরেও কেনো এলেন, যেচে অপমানিত হতে। আর্শিয়া এগিয়ে গেলো স্পর্শীর কাছে। সোনালী গ্লাস হাতে বসেছেন সোফায়। ব্যস্ত হাতে পানির ছিটে দিচ্ছেন স্পর্শীয়ার চোখে।

—কি হয়েছে ভাইয়া?
প্রশ্নটা আর্শি করেছে। তার কন্ঠে রয়েছে আশ্চর্যের সুর। পরশ এক ঝলক তাকিয়ে পুনরায় স্পর্শীর দিকে তাকালো। তার জ্ঞান এখনো ফেরে নি। তবে বন্ধ চোখের উপর দেখা যাচ্ছে, চোখের মণি নড়তে।
— ওর গায়ে প্রচন্ড জ্বর। মাথা ঘুরে রাস্তায় পড়ে গেছিলো। হস্পিটালে নিয়ে যেতে চেয়েছি, কিন্তু সে যাবে না। বাড়ি আসতে চাইছিলো। তাই নিয়ে এসেছি।
সোনালী চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকালেন। এরইমধ্যে সরিষার তেল গরম করে হাজির হয়েছেন রহিমা। তিনি দ্রুত পায়ের তালু ঘষতে লাগলেন। সোনালী এবং রিহানের স্ত্রী হাতের তালু ঘষতে লাগলো। আতংকিত হয়ে বললো,

— ওর তো জ্ঞানই ফিরছে না। হাত-পাও ঠান্ডা হয়ে আসছে। আল্লাহ! এতোটা জ্বর কখন এলো! কিছুই তো জানায়নি মেয়েটা।
বাড়ির মহিলারা স্পর্শীয়াকে নিয়ে ব্যস্ত। পরশ আরেকবার উঁকি মেরে দেখলো। এখন যাওয়া উচিত। এ বাড়ির মেয়ে সসম্মানে বাড়িতেই পৌঁছে দিয়েছে। কোনোরকম ঝামেলা হওয়ার পূর্বে তার প্রস্থান করা উচিত। কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? জ্ঞানহীন অসুস্থ অবস্থায় রেখে যাওয়া আদৌ কি সম্ভব। বাড়ির পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে পুরুষেরা উপস্থিত নেই। এখন যদি স্পর্শীয়ার জ্ঞান না ফেরে, সে যদি আরো অসুস্থ হয়ে যায়, তখন কি মহিলারা মিলে সবটা সামলাতে পারবে?
পরশ দ্বিধায় পড়ে গেলো। মন সায় দিলো আরেকটু সময় এখানে থাকতে। ব্যাস, স্পর্শীয়ার জ্ঞান ফেরার পর সে একবার জিজ্ঞেস করবে হস্পিটালে যাবে কি-না! তারপর পরই চলে যাবে এখান থেকে।
বাড়ির গেটে দু দুটো গাড়ি থামলো। হর্নের আওয়াজ পেতেই রিহানের স্ত্রী বলে উঠলো,
— চাচা এসে পড়েছে মনে হয়। ওকে এক্ষুণি হস্পিটালে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। দেখো, কেমন যেনো করছে এখনো।

দলের লোকের সাহায্যে স্পর্শীয়ার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন শামসুল সরদার। ওরা বলেছে, পরশের গাড়ি সরদার বাড়ির সামনে থেমেছে। ঘটেছেও তাই। গেটের সামনে পরশের গাড়ি দেখে আর এক মুহুর্ত দেরি করলেন না। বৃদ্ধ শরীরটা নিয়ে ছুটে এলেন তরুণ, টগবগে যুবকের ন্যায়।সদর দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে উদগ্রীব হয়ে মেয়ের নাম ধরে চেঁচালেন। ড্রয়িংরুমে সোফার নিকট সবাইকে বসে থাকতে দেখে আরো দ্রুত নিকটে এলেন। তাকে দেখে বাকিরা পাশে সরলো। শামসুল উদগ্রীব হয়ে মেয়েকে দেখলেন। সোফায় বসে দুগালে আলতো থাবর দিয়ে বললেন,
—আম্মু, কোথায় ব্যাথা পেয়েছো? কার গাড়ি ছিলো ওটা? ওর গাড়িসুদ্ধ আমি পিষে ফেলবো মাটিতে।
শামসুলের স্পষ্ট ইঙ্গিত পরশের দিকে। তার ধারণা, সেই এক্সিডেন্ট করাতে চেয়েছে।স্পর্শীয়ার মাথা ব্যথা করছে। যন্ত্রণায় ছিড়ে যাচ্ছে শিরা-উপশিরা। জ্ঞান ফিরেছে আরো খানিক আগেই। কিন্তু চোখ খোলা যাচ্ছে না, শরীর নাড়াতেও কষ্ট হচ্ছে। সকলের সব কথা তার কানে স্পষ্ট যাচ্ছে , তবুও উত্তর দিতে জোর পাচ্ছে না। তাই শুয়ে আছে নিথর হয়ে। সে তার হাতটা বাড়িয়ে বাবার হাত আলতো করে ছুলো। এর মানে -আমি ঠিক আছি, তুমি চেচিয়ো না।
কিন্তু এ কি কখনো সম্ভব? সে না উঠলেও রিহান গর্জে উঠলো। পরশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,

— আপনার সাহস কি করে হয় আমার বোনকে কোলে নেওয়ার? আমাদের লোক কি ছিলো না!
পরশ উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলো না। তাকালো স্পর্শীর দিকে। এখন ফিরতে হবে পার্টি অফিসে। সে পিছু ঘোরার সাথে সাথে দৃষ্টি গেলো দরজার দিকে। যেখানে হতভম্ব হয়ে ছুটে এসেছে সোভাম। শার্টের কয়েকটা বোতাম খোলা, চুলগুলো উস্কোখুস্কো আর মুখশ্রীতে উন্মাদের মতো দুশ্চিন্তা। কম জায়গায় দৌঁড়ায়নি। স্পর্শী যাওয়ার পরপরই মেইন রোডে এমন ভিড় দেখে সে চমকে ওঠে । খানিক সময় নিয়ে তবেই বের হয় বাইরে। কিন্তু এরইমধ্যে দেখা হয় দলের একটা ছেলের সাথে। সে সোভামকে জানানোর জন্যেই এগিয়ে আসছিলো। ছেলেটা বয়সে অনেক ছোটো। এইতো সতেরো কি আঠারো বছর হবে। সে দূর থেকে দেখেছে, স্পর্শীয়াকে একটা গাড়ি চাপা দিয়েছে। এরপর আর দাঁড়ায়নি। ছুটে এসেছে সোভামকে জানাতে।

এটুকু শোনার পর সোভাম শ্বাসের রোগীর ন্যায় ছটফট করে উঠলো। দাঁড়ালো না আর এক মুহুর্তও। কারো কোনো প্রশ্ন না শুনেই সর্বোচ্চ গতিতে ছুটলো হস্পিটালের দিকে। প্রতিটা ওয়ার্ডে – ওয়ার্ডে খোঁজার পর জানতে পারলো স্পর্শীয়াকে হস্পিটালে নিয়ে আসা হয়নি। বরং পরশ শিকদার নিজ গাড়িতে করে নিয়ে গেছে অন্যকোথাও। সোভাম শঙ্কিত হয়। পরপরই ছুটে যায় শিকদার বাড়ির দিকে। এই রাজনীতির মারপ্যাঁচে তার চড়ুইয়ের কিঞ্চিৎ পরিমাণ ক্ষতি হলেও, কাউকে বাঁচতে দেবে না। খুন করবে পরশ শিকদারকে। জন্মদাতা হলেও ছাড় পাবে না সে। যেতে যেতে একসময় মনে পড়লো পাভেলের কথা। সে তো স্পর্শীয়ার বন্ধু। এমনকি স্পর্শীয়াকে যখন খুঁজে পাচ্ছিলো না, সেবার পাভেলের চিন্তিত মুখটা নজর এড়ায়নি সোভামের কাছ থেকে। সে এতটুকু নিশ্চিত যে পাভেল তার বোনের ক্ষতি চাইবে না। পুরোটা ভেবে চিনতে দ্রুত কল লাগালো পাভেলের নাম্বারে। সবকিছু বলার পর জানতে পারলো স্পর্শীয়াকে নিয়ে পরশ বাড়িতে যায় নি, সে বাড়িতেই আছে। এরপর? এরপর কোথায় যাবে সোভাম? রিকশা ঘুরিয়ে দ্রুত ছুটলো সরদার বাড়ির দিকে। স্পর্শীয়াকে না পাক, অন্তত বাড়ির সবার সাহায্যে বোনকে তো খুঁজে পাবে।
অবশেষে সে খুঁজে পেলো। হতদন্ত হয়ে ছুটে গেলো ভেতরে। ফ্লোরে হাটু গেড়ে বসে শক্ত করে স্পর্শীর হাত ধরলো। ব্যস্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

— ও নাকি এক্সিডেন্ট করেছে? তাহলে হস্পিটালে না নিয়ে এখানে কেনো এনেছে?
ছেলের কথায় সম্মতি প্রকাশ করলেন শামসুল। তৎক্ষণাৎ পরশকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলেন,
— অজ্ঞান মেয়েটাকে হস্পিটালে না নিয়ে বাড়ি বয়ে নিয়ে এসেছো কেনো?
পরশ গম্ভীর স্বরে পালটা প্রশ্ন করলো। বললো,
— ও যে এক্সিডেন্ট করেছে, একথা কে জানিয়েছে আপনাদের? এসব আজগুবি, ভুলভাল প্রশ্ন করে আবার গলাবাজি করছেন! আপনার মেয়ে মেইন রোডে গিয়ে চলন্ত গাড়ির সামনে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে। ভাগ্য ভালো, ড্রাইভার কন্ট্রোল করতে পেরেছে গতি। আর আপনার দলের কেউ আসেনি আপনার মেয়েকে ধরতে। আসলে অন্তত আমাকে এ বাড়ির মাটি স্পর্শ করতে হতো না। সে যাই হোক, ওর গায়ে প্রচন্ড জ্বর। মানবিকতার খাতিরে হস্পিটালে নিয়ে যেতে চেয়েছি, কিন্তু সে রাজি না। অজ্ঞান হলেও জেদ কমে নি। বাড়িতে আসতে চেয়েছে, তাই নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি।
কথাটুকু শেষ করে বড় বড় পা ফেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো পরশ।
সোভাম ব্যস্ত হলো স্পর্শীকে নিয়ে। কপালে হাত দিয়ে জ্বর দেখলো। দুহাতে আগলে নিজের গায়ের উপর হেলান দিয়ে বসালো। বললো,

— ওর শরীর অনেক দূর্বল। আমি হস্পিটালে নিয়ে যাচ্ছি।
সায় জানালেন শামসুল। চিন্তিত কন্ঠে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—হ্যাঁ, হ্যাঁ। এক্ষুণি চলো।
স্পর্শী উঠলো না। শক্ত হয়ে বসে রইলো। চোখ এখনো বন্ধ। সোভাম যে অভিমান ভুলে তার কাছে এসেছে, তা বোধগম্য হচ্ছে। কিন্তু এই অসুস্থ শরীরে রাগ, অভিমান, কান্না — কোনো অভিব্যক্তিই প্রকাশ করতে ইচ্ছে করছে না। মন চাইছে টানা দুদিন শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকতে। কিন্তু এরা শান্তি দিচ্ছে না। ক্রমশই টানাটানি করছে। স্পর্শীয়া বিরক্ত হলো। যার দরুন রেগে কামড় মারলো সোভামের হাতে। আলতো চেঁচিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে করুন গলায় বললো,
— উফফফ! তোমরা একটু আমাকে শান্তি দিবা। কোত্থাও যাবো না আমি। একটু রুমে দিয়ে আসো, আমি ঘুমাবো।
খলিলুর সরদার ফোন হাতে নিলেন। ভাইয়ের থেকে অনুমতি নেওয়ার জন্য বললো,
— ভাইজান, ও তো এক্সিডেন্ট করে নি। শুধু জ্বর আসছে। যেতে যেহেতু চাইছে না, তাহলে থাক না। আমি বরং ডক্টরকে বাড়িতেই ডেকে আনি।
সায় দিলেন শামসুল। সোভাম কোলে নিলো বোনকে। কিন্তু কোন কক্ষে নিবে তা বুঝতে পারলো না। ফলস্বরূপ, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। সেকেন্ড খানিক কাটার পর গমগমে আওয়াজে বললো,

— আমি ওকে আমার কাছে নিয়ে যাচ্ছি। ডক্টর ওখানেই দেখিয়ে নিবো।
গর্জে উঠলেন শামসুল । তেজী কন্ঠে বললো,
— সাধ মেটেনি তোমার। দুই মা-ছেলের হাঁড়ে হাঁড়ে জেদ। অন্তত আমার প্রতি একটু করুণা করো। মেয়েটা থাকুক না আমার কাছে। জোর করে তো আর রাখছি না, স্বেচ্ছায় আছে। যদি জোর খাটাতেই পারতাম, তবে আজ স্ত্রী – সন্তান ঘৃণা করতো না আমায়।
সোভাম টু শব্দটাও করলো না। এখন এ নিয়ে বাকবিতন্ডায় জড়ানোর সময় নয়। তাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। সোনালী এগিয়ে এলো। চাপা আর্তনাদ করে বললো,
—ভাইজান, আপনি একটু শান্ত হোন না। মেয়েটা এখন অবধি চোখ খুলতে পারছে না, সে খেয়াল আছে?
শামসুল শান্ত হলেন। সোনালী সোভামের দিকে তাকিয়ে বললো,
—আব্বু, আমার সাথে এসো।
একে একে সকলে স্পর্শীর রুমে ঢুকলো। বোনকে আলগোছে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তার পাশে বসলো। ইতোমধ্যে রিহানের স্ত্রী জল এবং কাপড় নিয়ে এসেছে জলপট্টি দেওয়ার জন্য।
এভাবে চলতে লাগলো কিছুক্ষণ। ঠিক দশ মিনিটের মাথায় ডাক্তার আসলেন। তিনি স্পর্শীয়ার জ্বর মেপে দেখলেন – ১০৪°। এরপর একটা ইঞ্জেকশন ও সাথে ওষুধ দিয়ে গেলেন।

স্পর্শীয়া এখন গভীর নিদ্রায়।তার শিয়রের পাশে খাটে হেলান দিয়ে বসে আছে সোভাম। বর্তমানে সে অত্যন্ত বিচলিত। পিপাসা ফোন দিচ্ছে বারবার। জানতে চাইছে স্পর্শীর কথা। জিজ্ঞেস করছে, সোভাম ফিরিয়ে দেওয়ার পর কি অবস্থা হয়েছে স্পর্শীর? সে কি কেঁদেছে, নাকি হাসিমুখে বাবার কাছে চলে গেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি সোভাম। কি বলবেই বা সে? বরং মায়ের প্রশ্নের উত্তরে চাপা রাগ দেখিয়ে বললো — আমি জানি না তোমার মেয়ের ব্যাপারে। তোমার এতো জানার ইচ্ছে হলে, নিজে ফোন করে জেনে নাও।
এ ছাড়া আর কিইবা বলবে সে? এটাই যে স্পর্শীয়া আজ গাড়ির নিচে চাপা পড়তে পড়তে বেচেছে। এখন গায়ে ভীষণ জ্বর। শুয়ে আছে অজ্ঞানের মতো।

একথা শুনে পিপাসা কি শান্ত থাকতে পারবে? এদিকে মিথ্যাও বলা যাচ্ছে না। সবমিলিয়ে সে রাগ দেখিয়ে ফোন কেটে বসে আছে। রাত প্রায় দশটা। এখনো ঘুম থেকে জাগেনি স্পর্শীয়া। এদিকে বোনকে এভাবে রেখে সে যেতেও পারছে না। অন্যদিকে ঝামেলা করছে বাড়ির সকলে। এই যে প্রতি পাঁচ মিনিট পর পর একেক জন এসে মলিন মুখে তাকে বলছে — আব্বু, অল্পদুটো খেয়ে যাও। তোমার আব্বু বসে আছে।” এই বিষয়টা অত্যন্ত বিব্রতকর। সে এ যাবৎ কয়েকবার জানিয়েছে খাবে না। তবুও এরা তা কানেই নিচ্ছে না। এদিকে বারবার ফিরিয়ে দিলেও অসস্তি হচ্ছে।
সোনালী আবারো আসলেন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মলিন মুখে বললেন,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৫

—আব্বু, দশটা তো পার হয়ে গেলো। খেতে আসো। ভাইজান অনেক আশা নিয়া খাবার টেবিলে বসে আছেন।
সোভাম উঠে দাঁড়ালো। অন্যদিকে ফিরে গম্ভীর আওয়াজে বললো,
—ওনাকে বলুন খেয়ে নিতে। এতো গুলো বছর তো আর না খেয়ে থাকেনি। স্পর্শীর জ্ঞান ফেরার সাথে সাথে আমি বাসায় যাবো। আর প্লিজ! বারবার এসে এভাবে অনুরোধ করবেন না, চলে যেতে বাধ্য হবো।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৭