Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৮

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৮

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৮
সিমরান মিমি

সোভামের দৃষ্টি এখনো অন্যদিকে। মাথা ঝুকিয়ে চেয়ে আছে ফ্লোরে। বাবার দিকে তাকানো তো দূর, একবার প্লেটটাও ছুলো না। তার মনে এখন নানা প্রশ্নের ঝড়। বাবার করুণ কন্ঠ শুনতে মস্তিষ্ক, মন দুটোই অপারাগ। সহ্য হয় না। বুকটা কেমন চিনচিন করে ওঠে ব্যথায়। তারা যাওয়ার পর শামসুল জেলে ছিলেন। দিনের পর দিন জেল খেটেছেন। কিন্তু কেনো? এ বিষয়ে তো মা কখনো কিছু জানায় নি। নাকি তিনিই জানতেন না। সোভামের ইচ্ছে হলো জেল খাটার বিষয়ে একবার প্রশ্ন করতে। কিন্তু জড়তায় আটকে রইলো।
শামসুল সরদার প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। যখন বুঝতে পারলেন ছেলে নাছোড়বান্দা, তখন আর অপেক্ষা করলেন না। ধীর পায়ে বেরিয়ে গেলেন রুমের বাইরে। স্পর্শীয়া খাবার হাতে নিয়ে ভাইকে দেখলো। কোনো রকম টু শব্দটি না করেই খেতে লাগলো নিজ মনে। একবার খেতে বলারও প্রয়োজন বোধ করলো না।
প্রায় একটানা পাঁচ মিনিট প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইলো সোভাম। অনেক কিছু ভাবলো। শেষে কি মনে করে যেনো টেনে নিলো প্লেট। জড়তা, অসস্তি, রাগ, ঘৃণা সকল কিছুর সংমিশ্রণে প্রথম লোকমা মুখে নিলো। আঁড়চোখে তা দেখে ঠোঁট চেপে হেসে দিলো স্পর্শীয়া। চোখ-মুখ উজ্জ্বল হলো খুশিতে। অবশেষে চুপচাপ তৃপ্তি নিয়ে পুণরায় খাওয়া আরম্ভ করলো।

আজ সারারাত এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারে নি পাভেল। ছটফট করেছে চাতক পাখির ন্যায়। কখন সকাল হবে,আর কখনই বা সে তার প্রশ্নের উত্তর পাবে। অবশেষে সারারাত প্রতীক্ষার পর সকাল তো হলো, কিন্তু পাভেল শিকদারকে আর দেখা গেলো না। সে গভীর ঘুমে। সারারাত জাগার পর ভোররাতে নিদ্রার দেশে তলিয়ে গেছে। অবশেষে, তার ঘুম ভাঙলো সাতটার দিকে। অবশ্য এটাকে ঘুম ভাঙা বলে না। ভয়ংকর, আতংকজনক কোনো স্বপ্ন দেখে জেগে ওঠা বলে।
পাভেল উঠলো। দুহাতে সারামুখ মুছে ঠিক করে তাকানোর চেষ্টা করলো। সময় নিয়ে মোবাইলের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলো। দ্রুত ছুটলো ওয়াশরুমে। ফ্রেশ হয়ে কোনোভাবে মুখ মুছে আর সময় ব্যয় করলো না। সোজা চলে গেলো ভাইয়ের রুমের সামনে।
পরশ ততক্ষণে উঠে পড়েছে প্রায়। খানিকক্ষণ বারান্দায় বসে ঠান্ডা আবহাওয়া এবং কুয়াশা গায়ে মেখে সবে মাত্র রুমে ঢুকেছে । তখনই ভেতরে ঢুকলো পাভেল। গম্ভীর, চিন্তিত মুখশ্রী নিয়ে নিজে থেকেই খাটে বসলো। ভীষণ শীত করছে। ফলস্বরূপ পরশের কম্বলের মধ্যে ঢুকে বসে রইলো। পরশ ভ্রুঁ কুঁচকে তা দেখলো। বললো,

— চোখ-মুখের এই অবস্থা কেনো? রাতে ঘুমাস নি?
পাভেল এই প্রশ্নের উত্তর দিলো না। বরং আরো গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে রইলো বড় ভাইয়ের দিকে। কন্ঠে দ্বিধা, দ্বন্দ, সংশয় নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— একটা প্রশ্ন করবো ভাইয়া?
পরশ সূচালো দৃষ্টিতে ছোট ভাইয়ের অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ করলো। সেই আগের ছটফটে ভাব, মুখশ্রীর উজ্জ্বলতা, দুষ্টুমি পূর্ণ হাসি আর নেই। সে চিন্তিত হলো। দু কদম এগিয়ে পাভেলের কপালে হাত রাখলো। বললো,
— কি হয়েছে? শরীর কি খারাপ লাগছে? জ্বরও তো নেই।
পরশের চিন্তিত মুখশ্রী দেখে নিজেকে সামলে নিলো পাভেল। এভাবে কথা বলা যাবে না। এখন যদি স্পর্শীয়ার কথা এভাবেই মন খারাপ নিয়ে জিজ্ঞেস করে, তবে পরশ সন্দেহ করবে। মুহুর্তে’ই বুঝতে পারবে পাভেলের দূর্বলতা। তার চেয়ে অন্যভাবে বলতে হবে। ঘুরিয়ে, পেঁচিয়ে যেভাবেই হোক — উত্তর তো পাওয়া যাবে। সে হাসার চেষ্টা করলো। দু- হাত মেলে হাই তুলে বললো,
— তোমার চিন্তায় কাল রাতে ঘুমাতে পারি নি। ভাবছিলাম কালকের ঘটনার কথা। বারবার দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো তোমায় নিয়ে। এতো মেয়ে রেখে কি-না শেষ পর্যন্ত চড়ুই এর প্রেমে পড়লে! তোমাদের ভবিষ্যৎ পুরো ইউক্রেন- রাশিয়ার মতো। প্রতিদিন অন্তত কয়েকখানা মিসাইল মারবে একে -অপরকে।
এতোক্ষণ ছোটো ভাইয়ের জন্য ঠিক যতটা চিন্তা হচ্ছিলো, তা মুহুর্তে’ই বিরক্তিতে রুপ নিলো। পরশ চোখ রাঙিয়ে পাভেলের দিকে তাকালো। বললো,

—সকাল সকাল মেজাজটা গরম করিস না।
এটা পাভেলের প্রশ্নের অন্তর্নিহিত বা বাহ্যিক, কোনো উত্তরই নয়। সে দায়সারা হয়ে উঠলো। কম্বলের ভেতর থেকে বেরিয়ে পরশের পাশে এসে দাঁড়ালো। কিছুটা উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— তোমরা কি আসলেই প্রেম করছো, ভাইয়া?
পাভেলের বাহ্যিক অভিব্যক্তি অন্যরকম। দেখে মনে হচ্ছে সে মজা করছে। পরশ সূচালো দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো। সে নিশ্চিত স্পর্শীয়া পাভেলকে উল্টাপাল্টা বুঝিয়েছে। আর সেটা নিয়েই সে তাকে জ্বালাতে সকাল সকাল ঢুকে পড়েছে। কিন্তু এসবে মোটেও পাত্তা দেওয়া যাবে না। দিলেই মাথায় চড়ে বসবে। এমনিতেও কাল বাবার সাথে উচ্চস্বরে কথা বলার পর থেকেই কেমন অস্থির লাগছে। মন বিষন্নতায় ভূগছে। এ নিয়ে অনুতপ্ত হয়ে সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছে সে। আজ দুপুরেই এ ব্যাপারে খোলামেলা কথা বলবে।
পরশ ভারিক্কি আওয়াজে, স্বল্প ধমকের সুরে বললো,
— পাভেল, এমনিতেই যথেষ্ট টেনশনে আছি নির্বাচন নিয়ে। এর মধ্যে উল্টোপাল্টা কিছু বলে বাড়িতে ঝামেলা পাকানোর চেষ্টা করিস না। চুপচাপ রুমে যা।
পাভেল বেরিয়ে এলো রুম থেকে। আসন্ন নির্বাচন নিয়ে কম দৌঁড়ঝাপ করছে না বাড়ির সবাই। সেদিক দিয়ে বলতে গেলে সে যথেষ্ট গা ছাড়া স্বভাবের। ভাই চিন্তিত, এটা সে বুঝতে পেরেছে। কিন্তু তার চিন্তা, দুশ্চিন্তা তো কেউ বুঝলো না। এমনকি উত্তরটাও দিলো না। ঘুরিয়ে – পেঁচিয়ে এড়িয়ে গেলো কথা। অথচ একবারও সরাসরি বললো না — হ্যাঁ, স্পর্শীয়া সরদারের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।

মাত্র এক রাতের জ্বরেই ঠোঁট ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। স্পর্শীয়া ঘুম ভেঙে হাই তুলতেই হতবাক হলো। সোফা খালি। সেখানে অবহেলায় পড়ে আছে কম্বল। তাহলে সোভাম কোথায়? প্রশ্নটা মস্তিষ্কে আসতেই স্পর্শীয়া দ্রুতপায়ে খাট থেকে নামলো। সারা বাড়ি খুঁজেও পেলো না ভাইকে। তবে কি সে চলে গেছে? ভাবতেই মন ভারাক্রান্ত হলো স্পর্শীর। তার সাথে দেখা না করে কি করে চলে গেলো। সে ধীর পায়ে সোফায় বসলো।
রান্নাঘর থেকে টুংটাং আওয়াজ আসছে। হয়তো সকালের নাস্তা তৈরির ব্যস্ততা চলছে বাড়ির গৃহিনীদের হাতে। স্পর্শীয়া গলার আওয়াজ উঁচিয়ে ডাকলো – ‘সোনামা।’
ঠিক কয়েক মিনিট পর ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে এলেন সোনালী। শাড়ির আচলে ভেঁজা হাত মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করলেন,
—কি হয়েছে মা, কিছু লাগবে?
মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানালো স্পর্শী। তার কিছু লাগবে না। খানিকটা হতাশ হয়ে বললো,
— ভাইয়া কি চলে গেছে?
সোনালীর মুখশ্রী জুড়ে অভিমানের প্রলেপ দেখা গেলো। মুখ ভার করে অন্যদিকে চাইলো। বললো,
— হ্যাঁ, চলে গেছে। তাকে রাখার কম চেষ্টা করি নি। অন্ততপক্ষে সকালের নাস্তাটা খেয়ে যেনো যায়, সেই অনুরোধও করেছি। কিন্তু শোনেনি। চলে গেছে।
স্পর্শীর খারাপ লাগা আরো বাড়লো। তবুও প্রকাশ করলো না। বরং সোনালীর মন খারাপ দূর করতে বললো,
— ওহহ! আসলে ওর হয়তো তাড়াতাড়ি কলেজে যেতে হবে, তাই চলে গেছে।

“আম্মু, তুমি কি যাবার আগে কেস করে গেছিলে?”
পিপাসা খানিক চমকালেন। অবাক হয়ে বললেন,
— মানে? কার নামে কেস করবো?
সোভাম বরাবরের ন্যায় শান্ত। কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— তাহলে দিনের পর দিন উনি জেলে কেনো ছিলেন?
ছেলের কন্ঠে কি যেনো খুঁজে পেলো পিপাসা। তার ভয় লাগলো, শঙ্কা বাড়লো। হতদন্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— তুই কি তোর বাবার ব্যাপারে কথা বলছিস সোভাম? কিন্তু হুট করে এসব কেনো? তুই আছিস কোথায়? ওই লোক কি তোকে ভুলভাল কিছু বুঝিয়েছে? সোভাম, তুই অন্তত তোর বোনের মতো অবুঝ হোস না। স্পর্শীকে বুঝিয়ে দ্রুত ফিরে আয়। তোর চাকরি করতে হবে না। আর আমি পার্লারও ছেড়ে দেবো। ফিরে আয় বাবা। আমি কতদিন ধরে একা আছি। অসুস্থ হয়ে পড়ে মরে গেলেও কেউ দেখার নেই।
সোভামের ভেতরটা কেমন তোলপাড় হয়ে উঠলো মায়ের মরার কথা শুনে। সত্যিই তো সে একা আছে অনেকদিন। অসুস্থ হয়ে গেলে কে দেখবে? স্পর্শীর কি একবারও মনে পড়ছে না মায়ের কথা।

— আসবো আম্মু, একটু সময় লাগছে। অল্প কয়টা দিন ধৈর্য্য ধরো।
পিপাসা একটু শান্ত হলো। কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হলো না। এরইমধ্যে পুণরায় সোভাম বললো,
— উনি যে জেলে ছিলেন, এ বিষয়ে আসলেই তুমি জানো না?
পিপাসা হতভম্ব হলো। ছেলের কন্ঠে স্পষ্ট সন্দেহের আভাস। তিনি উদগ্রীব হলেন। এক দমে বলে উঠলেন,
— এগুলো কেমন কথা সোভাম? তুই কি আমায় সন্দেহ করছিস? আমি সত্যিই তার নামে কোনো কেস-মামলা করি নি। যদি এসব করার ইচ্ছেই থাকতো, তবে সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসতাম না। আর ও বাড়ি থেকে বের হয়ে আসার পর আমি একবারও পেছন ঘুরে তাকাইনি। জানিই না সে বেঁচে আছে, নাকি জেলে আছে।
— কিন্তু আম্মু, আমি শুনলাম — উনি নাকি দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন, কষ্টে ছিলেন। আমরা যাওয়ার পরেই নাকি গ্রেফতার হয়েছেন। এমনটা কেনো?
পিপাসা রেগে গেলেন ছেলের উপর। সহসা ধমক মেরে বসলেন। বললেন,

— তোর বাবা রাজনীতি করতেন। এসব রাজনীতিতে কেস- মামলা স্বাভাবিক ব্যাপার। হয়তো কোনো কারনে জেলে গেছিলেন। কিন্তু এসব নিয়ে তোর এতো কৌতূহল কেনো? মায়া হচ্ছে, এখন কি বাবার কাছে চলে যাবি?
সোভাম এই মুহুর্তে টিচার্স রুমের অপজিটে দাঁড়িয়ে আছে। একটু পরেই ঘন্টা পরবে ক্লাসের। সে চাপা আর্তনাদ করলো। বললো,
— এসব কি বলছো তুমি? আমি যেহেতু পিরোজপুরে আছি, তাই নানা ঘটনা আমার কানে আসে। এগুলো শোনার জন্য সরদার বাড়িতে গিয়ে বসে থাকতে হবে না। আম্মু, ক্লাসে যেতে হবে। তুমি প্লিজ শান্ত হয়। আমি খুব তাড়াতাড়ি চড়ুই কে নিয়ে চলে আসবো।
পিপাসার কল কাটার সাথে সাথেই স্পর্শীয়া কল করলো। না চাইতেও ভুল ক্রমে রিসিভড হয়ে গেলো কল। স্পর্শীয়ার গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। সে ডাকছে সোভামকে। ফোন কানে নিয়ে ধীর আওয়াজে বললো,
— ক্লাসে আছি।
— আমি জানি তুই ক্লাসে আছিস। ঘটা করে আবার বলতে হবে না।
— বল।

— তোকে কি বলেছিলাম আমায় দেখতে আসতে? মরে গেলেও তো বলতাম না। স্বেচ্ছায় আসছিস ভালো কথা, কিন্তু তাই বলে সকাল বেলা ওভাবে পালিয়ে যাবি কেনো? তুই কি চোর? আমার ঘুম ভাঙা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে কি খুব বেশি সমস্যা হতো? সোনামা এতোবার বলার পরেও নাস্তাটা করে গেলে, কি এমন হতো? বয়স্ক, মায়ের বয়সী একজন, যে কিনা তোকে পেলেপুষে বড় করেছে ; তাকে অপমান করতে খুব বেশি আনন্দ লাগে?
সোভাম হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিলো। এরপর শান্ত কন্ঠে বললো,
— আর কিছু বলবি?
স্পর্শী কন্ঠে মিষ্টতা আনলো। শান্ত কন্ঠে বললো,
— আর্শির কাছে একটা টিফিনবক্স পাঠিয়েছি। চুপচাপ নিয়ে নিবি। সোনামা, কষ্ট করে তোর জন্য বানিয়েছে। মনে থাকে যেনো।
— রাখছি।
সোভাম কেটে দিলো ফোন। আজ স্কুল পর্যায়ে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণীর টেস্ট পরিক্ষা। একজন টিচার অনুপস্থিত থাকায় সেখানেই কিছুক্ষণ গার্ড দিতে হবে তাকে। তৃতীয় তলার সিড়ির পাশের কক্ষে প্রথম ঘন্টা গার্ড দেওয়ার দায়িত্ব পেয়েছে সে। সেই অনুযায়ী সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতেই একটা কন্ঠ ভেসে এলো।
আর্শিয়া অত্যন্ত নিচু স্বরে ‘স্যার’ বলে ডাকলো। অসস্তিতে তার পা জড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ কিছুক্ষণ আগেই সে ভাইয়া বলে ডেকেছিলো। সোভাম স্পষ্ট তা শুনেছে। কিন্তু পরক্ষণেই সেই ডাক শুধরে ‘ স্যার ’ ডাকাতে খুব একটা আপত্তি করলো না। তাকালো গম্ভীর হয়ে। আর্শির হাতে ছোট্ট একটা টিফিনবক্স। মেয়েটা তা বাড়িয়ে দিলো সোভামের দিকে। অথচ তার হাত দুটো অস্বাভাবিক মাত্রায় কাঁপছে। জড়তায় গলা শুকিয়ে আসছে। তবুও নিজেকে সামলে বললো,
— এটা আপনাকে দিতে বলেছে।
দশটার ঘন্টা পড়ে গেছে। এতোক্ষণে নিশ্চয়ই কেরানি খাতা দিয়ে দিয়েছে স্টুডেন্টদের। এখন যদি প্রশ্নপত্র না দেয়, তবে দেরি হয়ে যাবে। সোভাম আর্শিয়ার হাতের দিকে তাকালো। বক্সটা না নিয়েই গম্ভীর আওয়াজে বললো,
— আমার ডেস্কে রেখে এসো।
এরপর সরাসরি পা বাড়ালো সিঁড়ির দিকে। আর্শিয়া ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। সে ভাবেনি সোভাম বক্সটা নিতে সম্মতি জানাবে। কিছুটা ঘোরের মধ্যে পড়ে গেছে মেয়েটা। সম্বিত ফিরতেই দ্রুতপায়ে কলেজ ভবনের দিকে গেলো।

সোভামের কারনেই আজ নাস্তায় নানা পদ রান্না হয়েছে। নুডুলস থেকে শুরু করে রুটি পিঠা এবং হাসের মাংস পর্যন্ত। কিন্তু আয়োজনের ঠিক মাঝামাঝি পর্যায়ে ছেলেটা কোনো কথা না শুনেই বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। অথচ সোনালী এবং শামসুল ভেবেছিলো, কাল রাতে খাবার খাওয়ার পর ছেলের অভিমান কমেছে। অন্তত সকালের নাস্তাটা হলেও করবে। কিন্তু তা হয়নি।
স্পর্শীয়া হাঁসের মাংস খায় না। তাই অন্যান্য নাস্তা নিয়ে বসে পড়লো খাটের উপর। নিচে গিয়ে খেতে ভালো লাগছে না। অত্যন্ত শীত করছে। এর চেয়ে কম্বলের মধ্যে বসে অল্পস্বল্প খাওয়ার মজাই আলাদা। পাশাপাশি ফোনেও ব্যস্ত থাকা যায়। একপর্যায়ে ফোন স্ক্রল করতে করতে মনে পড়ে গেলো কাল রাতের কথা। পরশ শিকদারের সাথে কথা বলা হয়নি। তার পূর্বেই সোভামের উপস্থিতি পেয়ে কেটে দিয়েছিলো ফোন। লোকটা নিশ্চয়ই সারারাত অপেক্ষায় ছিলো তার সাথে কথা বলার জন্য। উফফ! ভাবতেই স্পর্শীর মন আনন্দে গদগদ হয়ে উঠলো। পরশ শিকদার তার প্রেমে পিছলে গেছে ভাবতেই কললিস্টে ঢুকলো। একবার ভাবলো কল দেবে। পরক্ষণেই মন সায় দিলো না। যদি সে ব্যস্ত থাকে, আর কল রিসিভড না করে— তখন? তখন তো অত্যন্ত অপমানিত হবে।
অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিলো মেসেজ করার। ঠোঁট চেপে হাসি আটকে গুটি গুটি অক্ষরে লিখলো,

_ রাতে কল কেটে দেওয়ার জন্য আমি দুঃখিত! সারা রাত চিন্তায় ঘুমাতে পারেন নি নিশ্চয়ই? কোনো সমস্যা নেই। এখন ফ্রি আছি। কল দিন, আর তারপরে শান্তিতে ঘুম দিন।
পরশ তখন গুরুত্বপূর্ণ এক মিটিং এ। ফোন টা টেবিলের উপরই রাখা আছে। মেসেজের টুং শব্দ আসতেই ফোন জ্বলে উঠলো। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে জলতে লাগলো স্পর্শীয়ার মেসেজ। সাময়িক ভাবে দিকভ্রষ্ট হলো পরশ। পরক্ষণেই আলোচনায় মন দিলো। এর মধ্যে মিনিট খানেকের ব্যবধানে আরেকটা মেসেজ আসলো। যেখানে লেখা আছে,
— শুনলাম, আপনি নাকি আমায় মিস করছিলেন? এ কথার সত্যতা যাচাই করতে চাই।
পরশ এবারেও কোনো উত্তর দিলো না। এক ঝলক তাকিয়ে পুণরায় মনোযোগ দিলো নিজের কাজে। কিন্তু স্পর্শীয়া কি থামার মতো ব্যক্তি? একের পর এক মেসেজ দিয়েই যাচ্ছে সে।
— আপনি কি খুব বেশি অভিমান করেছেন?
— এইই! রিপ্লাই কেনো দিচ্ছেন না? ইগনোর করছেন?
— কল দেইইই!

মিটিং এ সকলের উৎসুক চাহনি পরশের ফোনের দিকে। প্রথম দিকে টুংটাং আওয়াজ হলেও পরবর্তীতে মিউট করে রাখায় শুধু ভাইব্রেট হচ্ছে। আর পরশ কিছুক্ষণ পর পর স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছে। বিষয়টা তাদের জন্য কৌতূহলের। আর পরশের জন্য বিব্রতকর। শেষে বিরক্ত হয়ে ফোন হাতে নিলো মেসেজ করার জন্য। কিন্তু তা আর পারলো কই? এরইমধ্যে কল দিয়ে বসলো স্পর্শী। রিসিভড করে কানে নিয়ে চোয়াল শক্ত করে পরশ বললো,
— ব্যস্ত আছি, বিরক্ত করো না।
স্পর্শী খানিকটা ভড়কে গেলো। অনুতপ্তও হলো। কিন্তু ‘বিরক্ত করো না ‘ বাক্যটুকু হজম করতে পারলো না। সে বিরক্ত করে, এর মানে কি? ফলস্বরূপ, ক্ষ্যাপাটে আওয়াজে বললো,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৭

— আচ্ছা, করবো না। কিন্তু তার আগে বলুন ‚ আপনি আমাকে মিস করছিলেন।’
পরশ হতভম্ব হয়ে গেলো। বললো,
– মিটিং এ আছি।
– আচ্ছা,শুধু এই টুকু বলুন তবেই ফোন কাটছি — নাহলে বারবার কল করবো। বলুন আমায় মিস করছিলেন।
পরশ দাঁতে দাঁত চেপে ধরলো। বললো,
– হ্যাঁ করছিলাম, তবে তোমার বাপকে।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৯