Home রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১১

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১১

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১১
রিক্তা ইসলাম মায়া

রিদ মায়াকে নিয়ে সিঙ্গাপুর শহরে পৌঁছায় ভোরের দিকে। সিঙ্গাপুরের জনপ্রিয় হোটেল মেরিনা বে স্যান্ডস হোটেলের ১০৬ নম্বর কক্ষে ওঠে দুজন। ভোরেই রিদ গোসল সেরে মায়াকে নিয়ে হালকা-পাতলা নাস্তা করে। সারারাত জার্নি করায় রিদ ঠিক করলো ঘন্টা তিনেক ঘুমাবে দুজন, সেই অনুয়ায়ী রিদ মায়াকে সঙ্গে নিয়েই শুয়েছিল ঘুমাতে; কিন্তু অতি এক্সাইটমেন্টে মায়া ঘুমাতে পারেনি। রিদের ব্ল্যাঙ্কেটের নিচে ছটফট করে উল্টো রিদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। বিষয়টা মায়া লক্ষ্য করে চুপিসারে বিছানা থেকে উঠে যায়। রুম জুড়ে ঘুরঘুর করে বেশিক্ষণ। জীবনের দ্বিতীয়বার মায়া দেশ ছেড়ে বিদেশের মাটিতে পা রেখেছে। সেই আনন্দে মায়ার চোখে ঘুম নেই।

মায়া রুম ছেড়ে বারান্দায় পা রাখতেই মুক্ত হাওয়া এসে মায়ার শরীর ছুঁয়ে যায়। উষ্ণ নরম হাওয়া, হালকা শিরশিরে ঠান্ডা। মায়ার গায়ে ওড়না নেই, ঘুমানোর সময় মায়া ওড়না সঙ্গে নিয়ে শোয়না। বিছানার পাশে ওড়না রেখে তখন শুয়েছিল, সেটা এখনো সেখানেই আছে,সঙ্গে নিয়ে আসতে ভুলে গেছে মায়া। মায়ার ভেজা চুলগুলো সব পিঠে ছাড়া। রিদের পরপরই মায়াও গোসল করে নিয়েছে—দুপুরে দুজন শপিংয়ে বের হবে সেজন্য হোটেলে উঠেই আগে গোসল সেরে নিয়েছে দুজন। মায়া অবাক চোখে হোটেলের আশেপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করছে। সিঙ্গাপুরের ছোট শহরটি খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এতটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়তো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ঘরবাড়িও থাকে না। সবকিছু কেমন ডিসিপ্লিন আর নিয়মে চলে এখানকার। রাস্তায় ধুলোবালি নেই। কোথাও কোনো ময়লা-আবর্জনা নেই; সবকিছু কেমন সাজানো-গুছানো আর পরিপাটি। মায়া অবাক চোখে সবকিছু দেখছে।

রিদ বালিশে উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ রিদের ডানপাশটা খালি অনুভব হতেই রিদের ঘুম ছুটে যায়। ঘুমন্ত চোখে বালিশ থেকে মাথা তুলে মায়ার সন্ধান করে। মায়াকে আশেপাশে কোথাও দেখতে না পেয়ে রিদ বিরক্তি নিয়ে কপাল কুঁচকে ঘাড় ঘুরিয়ে বামে তাকিয়ে বারান্দার দরজা খোলা পেয়ে বুঝে নিল মায়া বারান্দায় আছে। রিদ গলা উঁচিয়ে ডাকল মায়াকে…
‘রিত? এই রিত! রুমে এসো।
রিদের মেজাজী ডাক মায়া শুনতে পেয়ে দৌড়ে ঘরে আসে। রিদের ঘুম অল্প সময়ে ভেঙে যেতে দেখে মায়া তৎপর হয়ে এগিয়ে এসে বলল…
‘কী হয়েছে? আপনি ঘুম থেকে উঠে গিয়েছেন কেন?
‘ তুমি বারান্দায় কী করো?
রিদের তীক্ষ্ণ গলা। মায়া স্পষ্ট জবাবে বলল…
‘ঘুম আসছিল না, তাই একটু বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু আপনি ঘুম থেকে উঠে গেছেন কেন? কোনো সমস্যা? শরীর খারাপ লাগছে?
মায়া এগিয়ে এসে রিদের কপাল ছুয়ে দেখতে রিদ ফের মেজাজী গলায় বলল..
‘হ্যাঁ লাগছে। বউ পাশে না থাকলে অকারণে শরীর খারাপ হয়ে যায় আমার। তুমি পাশে শুয়ে থাকো ঘুমাব আমি। এসো।
মায়া নাছোড়বান্দা হয়ে বলল—

‘আমার ঘুম আসছে না, আমি শোব না। আপনি ঘুমান, আমি তো রুমেই আছি।
মায়া না করায় রিদের বিরক্তি বাড়ে। এই বেয়াদব মহিলা কখনোই তার প্রয়োজন বুঝবে না। এই মহিলাকে উত্তর বললে দক্ষিণ বোঝে, পূর্ব বললে পশ্চিম বোঝে। রিদ বিরক্তি নিয়ে উঠে বসে একটানে গায়ের সাদা টি-শার্টটি খুলে ফ্লোরে ফেলে পুনরায় বালিশে মুখ গুঁজে শুতে শুতে বলল…
‘ঠিক আছে, ঘুমানোর দরকার নেই। আমার পিঠ ব্যথা করছে, মালিশ করে দাও। এসো।
মায়া আর না করলো না বরং সুন্দর করে বিছানায় উঠে বসল। রিদের পিঠ বরাবর বসে দু-হাত রিদের চওড়া বলিষ্ঠ পিঠে রাখে। মায়ার দৃষ্টি ঘুরে গেল রিদের বলিষ্ঠ পিঠে। রিদের ফর্সা পিঠে বেশ কিছু কালো ছোট তিল দেখতে পেল। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝেও মায়া কখনো রিদের উন্মুক্ত পিঠ লক্ষ্য করেনি, আজই প্রথম। মায়া ধীরে ধীরে রিদের পিঠ মালিশ করায় মনোযোগী হতে হতে রিদকে ডাকল…

‘এই যে শুনছেন? ঘুমিয়ে পড়েছেন? একটা কথা বলি?
রিদ ঘুমজড়ানো কণ্ঠে উত্তর করল…
‘হুমম।
রিদের উত্তর পেয়ে মায়া চট করে বলল…
‘আমি যে আপনার পিঠ মালিশ করছি, এতে আপনি আমাকে কী দেবেন?
মায়া রিদের পিঠ মালিশ করছে সবেমাত্র এক মিনিট পেরিয়েছে, আর এখনই মায়া রিদের পিঠ মালিশের জন্য ঘুষ চাচ্ছে। অথচ রিদ মায়াকে খুশি করতে সুদূর বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর নিয়ে এসেছে বিয়ের শপিংয়ের জন্য; মায়ার জন্য রিদের এতো কিছু করার পরও সেই মায়াই রিদের অল্প সেবাতে ঘুষ চাচ্ছে। রিদ ঘুমের তাড়নায় মায়ার মতলব ঠিকঠাক বুঝতে পারেনি, সে ভেবেছে তার বউ কোনো জিনিসপত্র চাওয়ার আবদার করবে। রিদ সেই ভেবে উত্তর দিয়ে বলল…

‘কী চাই তোমার?
‘একটা বেবি চাই। দিবেন?
মায়া অতি উৎসাহে রিদের কাছে বেবির জন্য এমনভাবে আবদার করল যেন রিদ একটু পরেই সিঙ্গাপুরের শপিং মল থেকে মায়াকে সুন্দর দেখতে একটা বেবি কিনে দিবে আর মায়া বেবি পেয়ে খুশি হয়ে যাবে। মায়ার উত্তরের আশায় রিদের মাথার দিকে তাকিয়ে রইল, অথচ রিদ মায়ার আবদারে কোনো উত্তরই দেয়নি যেন সে শুনতে পায়নি মায়ার কথা। মায়া রিদকে নিশ্চুপ দেখে রিদের পিঠ ঝাঁকিয়ে সজাগ করে বলল…

‘কী হলো? ঘুমিয়ে পড়েছেন? বলুন না আমার একটা বেবি কবে হবে?
‘ কাল।
‘ কাল? যাহ কাল কিভাবে হবে? বেবি হতে দশ মাস সময় লাগে। একদিনে বেবি হয়না জানেন না আপনি?
‘ না-তো জানি না। মাত্রই শুনালাম আপনার কাছ থেকে।
‘ যান মিথ্যা কেন বলছেন? আপনি সব জানেন। জেনে বুঝে আমাকে বোকা বানাতে চাচ্ছে। প্লিজ বলুন না আমার একটা বেবি কবে হবে?
‘ আজই হবে। একটু পর শপিংমল থেকে বড় দেখে তোমার জন্য একটা বেবি নিয়ে আসব। এখন মাথা না খেয়ে সেবা করো।
রিদের হেঁয়ালিতে মায়া চেতে উঠে বলল…
‘ আমি কিন্তু আপনাকে খেলনা বেবির কথা বলছি না। আমার সত্যিকারের একটা বেবি চাই। সবার বেবি হচ্ছে আমার কেন হয়না?
‘ কারণ তুমি মন দিয়ে স্বামীর সেবা করো না তাই। আগে স্বামীর সেবা করো মন দিয়ে, তারপর আল্লাহ খুশি হয়ে তোমাকে একটা বেবি দান করবে বুঝেছ?
মায়া উৎসাহে বলল…

‘সত্যি?
‘হুম!
‘ আর যদি মিথ্যা হয় তাহলে?
‘ তাহলে দ্বিগুণ স্বামীর সেবা করবে, তারপরও হাল ছাড়বে না, ওকে?
‘ তারমানে আপনার সেবা করলে আমার বেবি হবে?
‘ অবশ্যই। আজ পযন্ত দেখেছ? স্বামী ছাড়া বউদের বেবি হতে?
‘ না।
‘ তাহলে তোমারও হবে না আমাকে ছাড়া। আমার সেবা করলেই তোমার বেবি হবে নয়তো না। কি শুনবে আমার কথা?
‘ হ্যাঁ।

মায়া রিদকে সম্মতি দিয়েই টুপ করে রিদের খালি পিঠে শব্দ করে চুমু খেল। একটা, দুইটা, তিনটা—পরপর বেশ কয়েকটা। রিদ ঘুমের তাড়নায় মায়ার রোমাঞ্চকর মুহূর্তটা ইগনোর করল। মায়া বেশ সময় নিয়ে রিদের পিঠ মালিশ করল। রিদের পিঠ মালিশ করার এক পর্যায়ে দেখল মায়ার হাতের সোনার বালার ঘষায় রিদের পিঠে লাল হয়ে যাচ্ছে দাগে। মায়া দ্রুত হাতে চুড়িগুলো খুলে বালিশের নিচে রাখল। রিদের পিঠে আলতো মালিশ করে দাগ হয়ে যাওয়া স্থানে ঠোঁটের পরশ দিয়ে রিদের পিঠে নিজের মাথা ও বুক ঠেকিয়ে রিদকে জড়িয়ে মায়া রিদের উপর শুতে শুতে বলল…
‘আমি সেই ভাগ্যবতীদের একজন, যাদের আপনার মতো একজন অসম্ভব ভালোবাসার স্বামী আছে নেতা সাহেব। ভাগ্য সবাইকে ভাগ্যবতী করে না, আর না সবাই আমার মতো করে এত ভালোবাসার স্বামী পায়। এক জনমে ভালো থাকার জন্য খুব বেশি কিছু প্রয়োজন হয় না নেতা সাহেব, শুধু একটা সঠিক মানুষ পাশে থাকলেই হয়। আমি আপনাকে এক জনমে নয় সকল জনমে পেয়ে স্বর্গসুখী ভাগ্যবতী নারী হতে চাই নেতা সাহেব।

আয়নের মা শেফালী চৌধুরী আরাফ খানের মেজো সন্তান। নিহাল খানের ছোট শেফালী চৌধুরী। বিয়ে হয়েছিল চৌধুরী পরিবারের বড় ছেলে রায়হান চৌধুরীর সঙ্গে। দুজনের পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয়। বিয়ের দশ বছরের মাথায় রায়হান চৌধুরী নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে লন্ডন শহরে স্থানান্তর হয়ে যান। তারপর থেকে আয়ন আর ছোট মেয়ে নোহার পড়াশোনা সেখানেই হয়। নোহা আয়নের বারো বছরের ছোট। আয়নের পর শেফালী চৌধুরীর সন্তান হচ্ছিল না অনেক বছর যাবত। অনেক চিকিৎসা আর আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে দোয়া করার পর আয়নের ছোট বোন নোহা হয়েছে। নোহার বয়স সবে আঠারো, একটু চঞ্চল প্রকৃতির। সবার ছোট আর আদরের হওয়ায় আহ্লাদী সে। ভাবি হিসেবে জুইয়ের সঙ্গে নোহার বেশ ভাব। মায়ার সঙ্গেও লন্ডনে বেশ ভাব হয়েছিল, কিন্তু মায়া দেশে না থাকায় নোহার সঙ্গে এখনো মায়ার দেখা হয়নি।

রিদ-মায়া, আয়ন-জুই সবার একত্রে মেজবানের অনুষ্ঠান আগামী শুক্রবারে হওয়ায় সকলের মাঝে শপিংয়ের ব্যস্ততা। দুপুর থেকে রাত দশটা পেরিয়েছে, তখনও খান বাড়ির সকলে শপিংয়ে ব্যস্ত। নিহাল খান ও রাদিফ বাদে খান বাড়ির ছোট-বড় সকলেই সুফিয়া খানের সঙ্গে শপিং মলে উপস্থিত। আয়ন ও আরাফ খানও বাদ যাননি এতে। সকলের ভিড়ে আয়ন বেশ কয়েকবার জুইকে ডেকেছে, বারবার কথা বলার চেষ্টা করেছে, কিন্তু বরাবরই জুই আয়নকে ইগনোর করেছে। আয়ন বেশ কিছুক্ষণ জুইকে পর্যবেক্ষণ করে গিয়ে বসল আরাফ খানের সঙ্গে। শপিং শেষে খান বাড়িতে পৌঁছাতে রাত প্রায় বারোটা বাজে। দিনভর শপিং শেষে সকলেই ক্লান্তিতে যার যার ঘরে গেল ফ্রেশ হতে। আয়ন ঘরে ঢুকে জুইকে কোথাও দেখতে পেল না। বিরক্তিতে আয়নের কপাল কুঁচকে যায়। জুই অকারণে কেন আয়নকে ইগনোর করছে তাও বুঝতে পারছে না। আয়ন যে জুইয়ের সঙ্গে দু-মিনিট কথা বলবে সেই সুযোগটাই জুই আয়নকে দিচ্ছে না। আয়ন রাগে ও বিরক্তিতে ওয়াশরুমে গেল ফ্রেশ হতে। জুই নোহার রুমেই ফ্রেশ হবে, কিন্তু কাপড় আয়নের রুমে হওয়ায় সে আয়নের ঘরে আসে কাপড় নিতে। আলমারি খুলে নিজের জন্য কাপড় নেওয়ার সময় হঠাৎ ওয়াশরুম থেকে বের হয় আয়ন। জুইকে ঘরে দেখে আয়ন তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করে তৎক্ষণাৎ…

‘এতক্ষণ কোথায় ছিলেন আপনি জুই?
জুই উত্তর করল না। আয়নকে দেখেও না দেখার ভান করে নিজের কাপড় নিয়ে ঘর থেকে বেরোতে চাইলে দ্রুত পথ আটকায় আয়ন। জুইয়ের হাত নিজের দিকে টেনে নিয়ে রাগে বলল…
‘কী সমস্যা আপনার জুই? দুপুর থেকে দেখছি আপনি আমাকে ইগনোর করছেন। ডাকছি উত্তর দিচ্ছেন না, কথা বলছেন না—কী হয়েছে আপনার, এমন করছেন কেন?
জুই জোর করে আয়নের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চেয়ে বলল…
‘কিছু হয়নি আমার, ছাড়ুন আমাকে। নোহা অপেক্ষা করছে আমার জন্য। আমি আজ নোহার সাথে ঘুমাব।
আয়ন বিদ্রুপ করে বলল..

‘কেন আপনি নোহার সাথে ঘুমাবেন? নোহা আপনাকে বিয়ে করেছে? নাকি আমি করেছি?
‘বিয়ে করলেই কি আপনার সাথে ঘুমাতে হবে? আমি ঘুমাব না আপনার সাথে, ছাড়ুন বলছি।
‘কেন, আমাকে বিয়ে করার আগে আপনি জানতেন না স্বামীর সাথে ঘুমাতে হয়? আমিতো বউয়ের সাথে ঘুমানোর জন্যই আপনাকে বিয়ে করেছিলাম জুই। আমাদের বিয়ের আগেই তো আপনাকে আমি অবগত করেছিলাম যে আমার বউ লাগবে, বউ ছাড়া রাতে ঘুম হয় না—এসব বলেনি আপনাকে? আপনি জানতেন না এসব?
আয়নের কথায় জুইয়ের চোখে অশ্রু দেখা দিল। জোর করে আয়নের থেকে নিজেকে ছাড়াতে চেয়ে বলল…
‘আপনি দেহের টানে আমার কাছে আসেন, আর মন জমা রাখেন অন্য কারও কাছে। আমি আপনার নামের বউ। আপনার সাথে এমন নামের সম্পর্কে আমি আর থাকব না। আমাকে আপনি ছেড়ে দিন, আমি বাড়ি চলে যাব। আপনার সাথে আর থাকব না।

কথা শেষে জুইয়ের কান্না বাড়ে। আয়নের কপালের ভাঁজ আরও দৃঢ় হয়। তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করে বলে…
‘আপনার কী হয়েছে সত্যি করে বলুন তো জুই? কেউ কিছু বলেছে আপনাকে?
‘না।
‘তাহলে এমন করছেন কেন?
‘ কিছু করছি না আমি। আপনি যান আপনার সুন্দরী বান্ধবীর কাছে, যার সাথে দুপুরে জড়াজড়ি-গলাগলি করছিলেন। আমি আপনার সাথে থাকব না।
জেফা তালুকদার, আয়ন রিদের ছোট বেলার ফ্রেন্ড ছিল। জেফাকে সুফিয়া খান দাওয়াত করাই জেফা নিজের ছোট বোনকে নিয়ে আয়ন রিদের বিয়ের অনুষ্ঠানে এসেছে। অনেক বছর পর দুজনের হঠাৎ দেখা হওয়ায় জেফা আয়নকে জড়িয়ে ধরেছিল দুপুরে বন্ধুত্বের সম্পর্কে। কিন্তু বিষয়টা জুই খারাপ ভাবে নিয়েছে ভেবে আয়নের হাসি পেল। আয়ন দুষ্ট হেসে জুইকে শুধিয়ে বলল..
‘আপনি কি জেফাকে নিয়ে জেলাস জুই?
জুইয়ের রাগ বাড়ে। জুই রাগে কটমট করে আয়নকে বলল…
‘মোটেও না। ছাড়ুন আমাকে।
আয়নের ঠোঁট প্রসারিত হলো দুষ্ট হাসিতে। আয়ন কৌতুক করে বলল….
‘ সরি জান! ছাড়া তো যাবে না। কত যুদ্ধ করে বিয়েটা করলাম আপনাকে, বউ ছাড়লে হবে বলুন?

রিদ মায়াকে নিয়ে দুপুরে শপিংয়ে বেরিয়েছিল। সিঙ্গাপুরের জনপ্রিয় অর্চার্ড রোড: লাক্সারি এবং হাই-স্ট্রিট ব্র্যান্ডের কেনাকাটার প্রধান স্থান। রিদ মায়াকে সেখানে নিয়ে যায়। কেনাকাটায় দুজনই ব্যস্ত। রিদ মায়াকে সময় দিচ্ছে পছন্দ অনুযায়ী শপিং করতে। দুজনের শপিং শেষ করতে রাত প্রায় বারোটার ঊর্ধ্বে। রিদের বিরক্তি নেই। সে বউকে সময় দিচ্ছে। কেনাকাটার পুরোটা সময় রিদ মায়ার হাত চেপে রেখেছিল। শখের নারীর জন্য পুরুষ মন থেকেই কাজ করে—যেমন বেপরোয়া রিদ খান শত ব্যস্ততার মাঝেও শখের নারীর খেয়াল রাখছে। কেনাকাটা শেষে মধ্যরাতে মায়াকে নিয়ে রিদ হোটেলে ফিরছিল। কাল বাংলাদেশে ফিরে যাবে দুজন। এখন রাতটুকু রেস্ট নেওয়া প্রয়োজন। মায়া সারাদিনের ক্লান্তির পরও বায়না করল তাকে অল্প সময়ের জন্য হলেও সিঙ্গাপুর শহরটা ঘোরাতে। রিদ না করল না। গাড়ি পার্কিং করে মায়াকে নিয়ে নেমে গেল রাস্তায়। আশপাশটা জনমানবের ভিড়। এখানে বেশ জনপ্রিয় খাবার পাওয়া যায় ভিন্ন দেশের। রিদের ইচ্ছা মায়াকে নিয়ে আজ ইন্ডিয়ান কিছু জনপ্রিয় খাবার খাবে। মায়া অতি উৎসাহে রিদের হাত চেপে সঙ্গেই হাঁটছিল। রিদ মায়াকে নিয়ে একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে বসে। খাবার অর্ডার করে রিদ মায়াকে বলে সে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে যায়। কিন্তু ফিরে এসে মায়াকে রিদ কোথাও খুঁজে পায় না। পুরো রেস্টুরেন্টের কোণায় কোণায় খুঁজেও রিদ মায়ার সন্ধান না পেয়ে দিশেহারা পাগল হয়ে বাইরে দৌড়ায়। মায়ার নাম নিয়ে চিৎকার করে রাস্তায় দৌড়ায়—রিত! রিত! রিত! বলে।

রিদের কয়েক মিনিটের অনুপস্থিতিতে কে বা কারা মায়াকে নিয়ে যেতে পারে? মায়া কখনোই রিদকে না জানিয়ে কোথাও যাবে না, বরং শত সমস্যা হলেও রিদের বসিয়ে রেখে যাওয়া স্থানেই মায়া বসে থেকে রিদের ফেরার অপেক্ষা করবে। এই মূহুর্তে মায়া নেই তার মানে কেউ না কেউ মায়াকে রিদের অনুপস্থিতিতে ধরে নিয়ে গেছে। কিন্তু কারা? কাদের এত সাহস হতে পারে যে রিদ খানের বউয়ের দিকে হাত বাড়াতে পারে? তাও সিঙ্গাপুরে এসে?
দিশেহারা রিদ হোটেল থেকে কোনো গার্ড কিংবা ড্রাইভার নিয়ে আসেনি। সে মায়াকে নিয়ে হোটেলের গাড়ি ড্রাইভ করে একাই বেরিয়েছিল। মধ্যরাতে হঠাৎ মায়া হারিয়ে যাওয়ায় রিদের উত্তেজনা ছিল দেখার মতো। দিশেহারা রিদ মায়ার নাম নিয়ে পাগলের মতো দৌড়াচ্ছিল এদিক ওদিক।

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১০

মায়ার খোঁজা বেশ কিছুক্ষণ পর রাস্তার অদূরে মানুষের ভিড় দেখা গেল। পথচারী কেউ কেউ উত্তেজনায় সিঙ্গাপুরের পুলিশকে ফোন করেছে এখানে একটি রক্তাক্ত লাশ রাস্তায় পরে থাকতে দেখে। রিদ ভিড় ঠেলে ভেতরে যাওয়ার সাহস পেল না। মাত্র কয়েক মিনিটে কেউ মায়াকে মেরে ফেলে যাবে না নিশ্চয়ই? রিদ নিজের বিশ্বাস নিয়ে চলে যেতে গিয়েও মনের সান্ত্বনায় ফের ফিরে এসে ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই রিদের মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। রক্তাক্ত শরীরে গলা কাটা অবস্থায় মায়া রাস্তায় পড়ে আছে। চোখ দুটো উল্টানো। দুই দাঁতের মাড়িতে জিভ কামড়ে নিথর অবস্থায় পড়ে আছে মায়া। হয়তো মাত্রই মারা হয়েছে মায়াকে, এখনো গলগল করে তাজা রক্ত গলা কাটা স্থান বেয়ে রাস্তায় ভেসে যাচ্ছে। মায়ার সেই ঘোলাটে চোখে দিকে রিদ নিজের দৃষ্টি স্থির করতে না পেরে ধপ করে বসে যায় রাস্তায়।

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১২

8 COMMENTS

  1. আপু প্লিজ পর্ব ১২ এ মায়ার কোনভাবে শ্বাস প্রশ্বাস দিয়ে দেন প্লিজ ওকে বাঁচিয়ে দেন প্লিজ আপু আপনাকে অনুরোধ করছি রিক্তা আপু প্লিজ 🥹🥹🥹🥹🥹😭😭😭😭😭😭😭😭আপনাকে অনুরোধ করছি পর্ব ১২ এ প্লিজ মায়া কে বাঁচিয়ে দেন

  2. Vai ai uponnash ta ki sad ending er nahole matha shorir theke alada hoile kemne manush bache keu bolo maya apu amon na korleo parta 😭😭😭

  3. আপু 12‌ পাঠ তাড়াতাড়ি দেন প্লিজ আর মায়াকে শ্বাস দিয়ে বাঁচিয়ে দেন‌ অনুরোধ করছি আপু 12 পাঠে মায়াকে বাচায়া দিয়েন প্লিজ

Comments are closed.