Home রুহআবিষ্ট তুমি রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৫

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৫

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৫
অধরা মিনহা

ইফরাদ নিজের কেবিনের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ফোনে কিছু দেখছে। ঠিক তখনি দরজায় নক করে ভেতরে ঢোকে সাফিন। তার হাতে একটা ট্রে। তাতে লাঞ্চ আর একটা জুস। ট্রেটা টেবিলের ওপর রেখে সাফিন বলে,
— স্যার, আপনার লাঞ্চ।
ইফরাদ মাথা নেড়ে বলে,
— ওকে। যাও, তুমি লাঞ্চ করে এসো।
সাফিন হালকা হেসে বলে,
— থ্যাংকস, স্যার।
বলেই সাফিন কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। ইফরাদ লাঞ্চের প্লেটটা নিজের দিকে টেনে নেয়। চামচ দিয়ে ফ্রাইড রাইস তুলে মুখে দিতে যাবে, ঠিক তখনি হঠাৎ আনতারার কথা মনে পড়ে। আনতারা কি খেয়েছে? একবার ফোন করে জিজ্ঞেস করবে? ভাবতে ভাবতেই চামচটা নামিয়ে ফোন হাতে নেয়। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে পড়ে, আনতারার তো কোনো ফোনই নেই। তাহলে সে জানবে কিভাবে, আনতারা খেয়েছে কিনা? হঠাৎই একটা বুদ্ধি মাথায় এলো। বাড়ির ল্যান্ডলাইনে ফোন করলে মেইডের কাছ থেকে খবর নেওয়া যাবে।
ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ল্যান্ডলাইনে কল দেয়।কয়েকবার রিং হওয়ার পর একজন মেইড ফোন রিসিভ করে।

— হ্যালো, কে বলছেন?
— আমি ইফরাদ। আনতারা খেয়েছে?
মেইড একটু অবাক হয়ে বলে,
— জি স্যার? বুঝিনি….. কে খেয়েছে?
ইফরাদ এবার গলার স্বর নরম করে বলে,
— আমার বউ খেয়েছে? আই মিন, তোমাদের ম্যাম?
— না স্যার। ওনি তো খাননি।
ইফরাদ কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— কেন?
— উনি ঘুমাচ্ছেন। খাবার নিয়ে গিয়েছিল শাহানারা।
ইফরাদ হাতে থাকা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ইফরাদ বলে,
— এখন তো দুপুর আড়াইটা। এই সময় আনতারা ঘুমাচ্ছে? ওর কিছু হয়েছে? ও কি অসুস্থ?
— না স্যার। ম্যাম এমনি ঘুমিয়ে আছেন।
ইফরাদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
— আচ্ছা, আনতারার কাছে আবার খাবার নিয়ে যাও। খেয়ে তারপর ঘুমাবে।
— ওকে।
— আর আমাকে জানাবে, আনতারা খেয়েছে।
— আচ্ছা।

কল কেটে দেয় ইফরাদ। ফোনটা নামিয়ে ইফরাদ গভীর ভাবনায় ডুবে গেল। আনতারার কি শরীর খারাপ লাগছে?সকালে তো একদম ভালোই দেখেছিল। তাহলে কি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে? নাকি এমনিতেই ঘুমিয়ে গেছে?এইসব ভাবতে ভাবতেই তার আর খাওয়ার ইচ্ছা রইল না। খাবার সামনে রেখেই অপেক্ষা করতে লাগল মেইডের ফোনের। এই মুহূর্তেই ইফরাদ তীব্রভাবে অনুভব করে, আনতারার একটা ফোন থাকা কতটা জরুরি। আনতারার নিজের ফোন থাকলে এখনই তাকে কল করে কথা বলা যেত। কেমন আছে, খেয়েছে কি না, সবকিছুই নিজের মুখে শুনতে পারত। না, আনতারার জন্য একটা ফোন খুবই দরকার। নইলে সে বাইরে থাকলে আনতারার সঙ্গে যোগাযোগ করবে কীভাবে?

কিছুক্ষণ পর মেইড ফোন করে জানায়, আনতারার কাছে আবার খাবার দিয়ে এসেছে এবং সে এখন খাচ্ছে। এবার ইফরাদের বুকের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তিটা একটু কমে। সেও নিশ্চিন্ত হয়ে নিজের লাঞ্চ শেষ করে। বিকেলের দিকে ইফরাদ অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ে। আজ সাফিনকে সঙ্গে নেয় না। একাই গাড়ি চালিয়ে চলে গেল শপিংমলে। শপিংমলে ঢুকেই প্রথমে আইফোনের অফিসিয়াল স্টোরে যায়। কোনো রকম দেরি না করে আনতারার জন্য একটা iPhone 17 Pro Max (2TB) কিনে নেয়। তারপর একটা সিমকার্ড কিনে। ফোন কেনা হয়ে গেলে ইফরাদের মনে হলো, যেহেতু শপিংমলে এসেছেই, আনতারার প্রয়োজনীয় আরো কিছু জিনিস কিনে নেওয়া যাক।
হঠাৎই তার মনে পড়ে, সেদিন সে লক্ষ্য করেছিল আনতারার নামাজ পড়ার জন্য কোনো খিমার নেই। তাই কয়েকটা খিমারও কিনে নেওয়া দরকার। ইফরাদ একটা স্টোরে ঢুকতেই একজন লেডি স্টাফ এগিয়ে এসে ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করে,

— স্যার, কী লাগবে?
ইফরাদ একটু ভেবে মনে করে জিনিসটার নাম। মনে পড়তেই বলে,
— নামাজের খিমার।
— চলুন, আমি আপনাকে সেই সেকশনে নিয়ে যাচ্ছি।
লেডি স্টাফ ইফরাদকে খিমারের সেকশনে নিয়ে গেল। সেখানে নানা রঙ, ডিজাইন আর প্রিন্টের অসংখ্য খিমার সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা আছে। ইফরাদ মন দিয়ে একটার পর একটা খিমার দেখতে লাগল। রং, কাপড় আর ডিজাইন মিলিয়ে পছন্দ করতে করতে শেষ পর্যন্ত মোট আটাশটা খিমার বেছে নেয়। সবগুলো একসঙ্গে স্টাফের হাতে দিয়ে বলে,
— হুম, এগুলো প্যাকেট করে দিন।
স্টাফ হাসিমুখে উত্তর দেয়,
— ওকে, স্যার।

ইফরাদ সেখান থেকে ঘুরে চলে আসতে যাবে, ঠিক তখনি তার চোখ পড়ে একটু দূরে ঝুলিয়ে রাখা কয়েকটা বোরখার দিকে। তখনি ইফরাদের মনে পড়ে, আনতারার যে বোরখাটা আছে, সেটা সাফিন এনে দিয়েছিল। তাছাড়া ওর বোরখা মাত্র একটাই। আর সেটাও খুব একটা ফ্যাশনেবল না। মনে মনে সাফিনের পছন্দকে কয়েকটা গালি দেয়। এসব করতে করতেই ইফরাদ সেদিকে এগিয়ে যায়। কাছাকাছি গিয়ে দেখে, সেখানে নানা ডিজাইনের দারুণ সুন্দর কালো বোরখা সাজানো রয়েছে। কিছুতে হালকা কালার কম্বিনেশন, আবার কিছুতে সূক্ষ্ম নকশা। তবে ইফরাদের কাছে কালো রঙের বোরখাই সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। ইফরাদ কারচুপির কাজ করা আর এমব্রয়ডারি করা মিলিয়ে মোট এগারোটা কালো বোরখা বেছে নেয়।

সবগুলো নেওয়ার পরও তার চোখ আটকে গেল আরেকটা বোরখায়। এশ রঙের একটা কোট-স্টাইলের বোরখা। সাদা বোরখার ওপর এশ রঙের কোটের মতো ডিজাইন করা। দেখতে এতটাই সুন্দর লাগল যে, ইফরাদ সেটাও নিয়ে নেয়। সবকিছু কেনা হয়ে গেলে ইফরাদের ভেতরে অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস কাজ করতে লাগল। আনতারা এগুলো হাতে পেলে কেমন রিয়্যাক্ট করবে? ভাবতেই তার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠে। সব বোরখা, খিমার আর আইফোনসহ বাকি জিনিসগুলো নিয়ে ইফরাদ কাউন্টারে গিয়ে সুন্দর করে প্যাকেজিং করিয়ে বিল পেমেন্ট করে।শপিংমল থেকে বের হতেই দেখে, এরই মধ্যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।

বাসায় ফিরতে ফিরতে ইফরাদের প্রায় দুই ঘণ্টা লেগে গেল। বাড়িতে ফিরে নিজের রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেই সে দেখে, পুরো রুম ফাঁকা। চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে তার দৃষ্টি গিয়ে থামে বারান্দার কাঁচের দরজায়। দরজাটা আধখোলা। মনে হলো, আনতারা হয়তো ওখানেই আছে। হাতে থাকা সব শপিং ব্যাগ বিছানার ওপর রেখে ইফরাদ বারান্দার দিকে এগিয়ে যায়। বারান্দার দরজার সামনে পৌঁছাতেই তার কানে ভেসে এলো এক মধুর, স্নিগ্ধ নাশিদের সুর। ইফরাদ আর এক পা-ও এগোল না। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। শান্ত, গভীর মনোযোগে শুনতে লাগল আনতারার কণ্ঠ।
আনতারা বারান্দার মেঝেতে বসে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে নাশিদ গেয়ে চলেছে,

— Ashraqat nafsi bi noorin min fu’aadi
Hinama raddattu Ya Rabbal ‘ibaadi
Wantasht ruuhi wa saarad-dam’u yajri
Ya Ilaahi khuz bi qalbi lir-rashaadi
গাইতে গাইতেই হঠাৎ অনুভব করে, কেউ এসে আলতো করে তার কাঁধে মাথা রেখেছে। আনতারা চমকে উঠে নাসিদ গাওয়া থামিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই দেখে, ইফরাদ।
ইফরাদ মাথা তুলে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে,
— চুপ হয়ে গেলে কেন?
আনতারা অবাক হয়ে বলে,
— কখন আসলেন?
ইফরাদ এবার কাঁধ থেকে মাথা সরিয়ে একেবারে ফট করে আনতারার কোলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ে।

— একটু আগেই।
— ওহ।
কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে ইফরাদ বলে,
— কী ব্যাপার? এখন নামাজ না পড়ে যে নাশিদ গাইছো? নামাজ পড়বে না?
আনতারা কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর একটু সংকোচ নিয়ে আস্তে বলে,
— না…… নামাজ পড়ব না এখন।
ইফরাদ চোখ সরু করে আনতারার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করে,
— তোমার পিরিয়ড হয়েছে?
প্রশ্নটা শুনে আনতারার কান লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে চোখ নামিয়ে খুব আস্তে বলে,
— হুম।
কথাটা শুনেই ইফরাদ তাড়াতাড়ি উঠে বসে। মুখে হালকা দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠে।
— তাহলে তো তোমার এমনিতেই আনকমফোর্টেবল লাগছে।
আনতারা হাত বাড়িয়ে আলতো করে ইফরাদের কপালে হাত রাখে।

— না, আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
ইফরাদ নিশ্চিত হতে আবার জিজ্ঞেস করে,
— সত্যি তো?
— হুম।
ইফরাদ আবারো আনতারার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। তারপর হঠাৎ বলে উঠে,
— ওয়েট…..তুমি প্যাড পেলে কোথায়?
আনতারা আস্তে করে উত্তর দেয়।
— আছে।
ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে আবার উঠে বসে।
— সত্যি করে বলো। প্যাড তুমি কোথায় পাবে?
— শাহানারা আপু এনে দিয়েছেন।
ইফরাদ ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর নরম গলায় বলে,
— আমার সঙ্গে লজ্জা পাচ্ছ কেন? আমাকে বলবে না তো কাকে বলবে?
আনতারা চুপ করে রইল। ইফরাদ আলতো করে আনতারার গালে হাত রাখে।

— আমার সঙ্গে ফ্রি হও, আনতারা। আমি তোমার সবচেয়ে কমফোর্টেবল জায়গাটা হতে চাই। আজকের পর থেকে এসব ব্যাপার আমার কাছ থেকে লুকাবে না।
আনতারা আস্তে করে মাথা নাড়ে। সম্মতি জানায়। ইফরাদ গালে হাত রেখেই আবার জিজ্ঞেস করে,
— সত্যি ব্যথা করছে না তো?
এবার আনতারা চোখ তুলে ইফরাদের দিকে তাকায়। মৃদু হেসে খুব আস্তে বলে,
— সত্যিই ব্যথা করছে না, রাদ।
ইফরাদ ভ্রু তুলে হালকা অবাক হওয়ার ভান করে।
— রাদ? এতদিন না ইফরাদ ছিলাম?
আনতারা এবার হেসে ফেলে।
— রাদ ডাকি? এমনিতেও আপনার মা তেমন পছন্দ করেন না আমি আপনাকে নাম ধরে ডাকি।
ইফরাদ আবার নিশ্চিন্তে আনতারার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। মুখে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলে,
— এখন তুমি যদি রাদ বলে ডাকো, মাম্মা আরো বেশি রাগ করবে। কারণ, রাদ বলে আমাকে শুধু আমার খুব কাছের মানুষরাই ডাকে।

— তাহলে রাদ বলে ডাকব না?
— কেন ডাকবে না? মাম্মা তুমি যেটাই বলে ডাকো না কেন, রাগবে। তার চেয়ে বরং মাম্মার রাগের কথা ভেবো না। তুমি যা ইচ্ছে তাই ডেকো। আমি তো তোমাকে এগো শুনছো, ওগো শুনছো বলেও ডাকার পারমিশন দিয়েছি।
আনতারা হেসে ফেলে।
— এগো শুনছো, ওগো শুনছো বললে তো আপনার মা আরো বেশি রাগ করবেন।
— ওটাই তো। যাই করো না কেন, রাগবেই। আমি একটা আইডিয়া দিই?
— কী?
— যেহেতু মাম্মাকে খুশি করতেই পারছো না, তাহলে বরং রাগানোর মিশনেই নেমে যাও।
আনতারা হাসতে হাসতে বলে,

— আপনিও না!
ইফরাদ মৃদু স্বরে বলে,
— তোমার…
আনতারা অবাক হয়ে বলে,
— হুম?
ইফরাদ মুচকি হেসে বলে,
— আমার চুলে একটু হাত বুলিয়ে দাও।
আনতারা ইফরাদের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। ইফরাদ আনতারার কোলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে। সেই স্পর্শ আর শান্ত মুহূর্তটাকে গভীরভাবে উপভোগ করতে করতে বলে,
— উমমম……মুহূর্তটা খুব সুন্দর।
— হুম?
— প্রতিদিন এভাবে সময় কাটানো যায়।
আনতারা মুচকি হেসে বলে,
— আচ্ছা।
কিছুক্ষণ পর আনতারা জিজ্ঞেস করে,

— আপনি কিছু খাবেন না? বাইরে থেকে এসেছেন।
ইফরাদ চোখ না খুলেই উত্তর দেয়,
— আপাতত কিছু খেতে চাই না। তুমি শুধু আমার চুলে হাত বুলিয়ে দাও। আর এতক্ষণ যে নাশিদ গাইছিলে, সেটা আমাকে শোনাও।
আনতারা একটু ভেবে বলে,
— একটা সূরার আয়াত শুনবেন?
ইফরাদ চোখ খুলে তার দিকে তাকায়।
— তোমার কণ্ঠে হলে শুনতে চাই।
আনতারা ধীর সুরেলা কণ্ঠে তিলাওয়াত শুরু করে,
— ইয়া ইবাদিয়াল্লাযিনা আমানু, ইন্না আরদী ওয়াসিয়াতুন ফাইয়্যাইয়া ফা’বুদুন। কুল্লু নাফসিন যায়িকাতুল মাওত, ছুম্মা ইলাইনা তুরজা’উন।
আয়াত তিলাওয়াত শেষ হতেই ইফরাদ চোখ তুলে আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,

— এটা এমন কেন?
আনতারা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,
— কেমন?
— শুনেই কেমন যেন শরীরটা ঘেমে উঠলো।
আনতারা শান্ত গলায় বলে,
— আয়াতটার অর্থই এমন। শুনবেন?
— বলো।
আনতারা বলতে শুরু করে,

— “ইয়া ইবাদিয়াল্লাযিনা আমানু, ইন্না আরদী ওয়াসিয়াতুন ফাইয়্যাইয়া ফা’বুদুন।” এই আয়াতের অর্থ হলো : যদি কোথাও ঈমান ও আল্লাহর আনুগত্য পালন করা কঠিন হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহর জমিন তো অনেক প্রশস্ত। মানুষ তাঁর ইবাদতের জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজে নিতে পারে। “কুল্লু নাফসিন যায়িকাতুল মাওত, ছুম্মা ইলাইনা তুরজা’উন।” এটার অর্থ হলো : এই দুনিয়ার জীবন চিরস্থায়ী না। প্রত্যেক মানুষকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তারপর সবাইকে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে।
কথাগুলো শুনে ইফরাদের বুকের ভেতর থেকে অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। দুটি আয়াত তার এতক্ষণ শান্ত হয়ে থাকা মনটাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়ে গেল। ইফরাদ ধীরে ধীরে উঠে বসে। আনতারা তা দেখে নরম গলায় জিজ্ঞেস করে,

— কী হলো? উঠে বসলেন যে?
ইফরাদ নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
— কিছু না। রুমে চলো। তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।
এই বলে ইফরাদ উঠে দাঁড়ায়। তারপর হাত বাড়িয়ে দেয় আনতারার দিকে। আনতারা ইফরাদের হাত ধরতেই ইফরাদ তাকে আলতো করে তুলে দাঁড় করায়। দুজন একসঙ্গে রুমে ঢুকে। ভেতরে ঢুকেই আনতারার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। পুরো বিছানাজুড়ে সারি সারি শপিং ব্যাগ রাখা।
আনতার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

— এগুলো কি?
ইফরাদ মুচকি হেসে বলে,
— খুলে দেখো।
আনতারা এগিয়ে এলে ইফরাদ ছোট আকারের একটা ব্যাগ আনতারার হাতে দিয়ে বলে,
— আগে এটা খুলো।
আনতারা একবার ইফরাদের দিকে তাকায়। তারপর ধীরে ধীরে ব্যাগটা খুলে। ভেতর থেকে বের করে একটা আইফোনের বক্স।
আনতারা বিস্মিত কণ্ঠে বলে,
— মোবাইল?
ইফরাদ হালকা হাসি দিয়ে মাথা নাড়ে।
— হুম। তোমার জন্য।
— মোবাইল কেন?
ইফরাদ ঠোঁটের কোনে হালকা হাসি টেনে বলে,

— আমি বাইরে গেলে তোমার সঙ্গে কথা বলব কিভাবে? তোমার ফোন না থাকলে তোমাকে কল দেব কি করে?
আনতারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— আপনি কল দেবেন আমাকে?
ইফরাদ হেসে উঠে,
— দিতে হবে না? বাসায় একটা বিয়ে করা বউ আছে। তার খোঁজখবর তো নিতে হবে।
আনতারা লাজুক হাসি দিয়ে মাথা নিচু করে। তার সেই লাজুক হাসি দেখে ইফরাদও মুচকি হাসে। তারপর বলে,
— মোবাইলটা অন করো।
— আপনি করে দিন।
— এটা তোমার ফোন। তুমিই অন করো।
আনতারা সংকোচে বলে,
— আমি পারি না।
ইফরাদ অবাক হয়ে তাকায়।

— সিরিয়াসলি? কখনো স্মার্টফোন ব্যবহার করোনি?
— না। বছর দুয়েক আগে আব্বু একটা কিনে দিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র এক রাতই ছিল আমার কাছে। ব্যবহারই করতে পারিনি।
— তারপর কি হয়েছিল?
— তারপর আম্মা নিয়ে নিয়েছেন।
ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— তোমার সৎ মা?
আনতারা আস্তে করে মাথা নাড়ে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইফরাদ আবার বলে,

— সত্যি করে বলবে? উনি কি তোমার ওপর অত্যাচার করতেন?
প্রশ্নটা শুনে আনতারা চুপ রইল কিছুক্ষণ। তার চোখের সামনে ভেসে উঠে শেখ বাড়িতে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতি। প্রতিদিন ফজরের নামাজ পড়েই পুরো বাড়ি গুছিয়ে ফেলত। দুই-তিন বালতি কাপড় ধোয়া, পুরো বাড়ি ঝাড়ু দেওয়া, তারপর মেঝে মোছা, সবই ছিল তার দৈনন্দিন কাজ। এসব শেষ করে গোসল সেরে রান্নাঘরে ঢুকত। বাড়ির তিনজন মানুষ, আনাবি, আজাদ আর রাবেয়া মল্লিকার জন্য আলাদা আলাদা নাস্তা বানাত। নাস্তা শেষ হতে না হতেই দুপুরের রান্না করে সবকিছু টেবিলে সাজিয়ে রেখে তারপর ভার্সিটিতে যেত।
ভার্সিটি থেকে ফিরে আবার ঘর ঝাড়ু দিত। বিকেলে ছাদ থেকে শুকনো কাপড় নামিয়ে সুন্দর করে ভাঁজ করত।

এরপর সন্ধ্যার নাস্তা, আবার রাতের জন্য নানা রকম খাবার রান্না। সারাদিন এত কাজ করেও নিজের ভাগ্যে খুব একটা ভালো খাবার জুটত না। শুধু মাঝে মাঝে আজাদ শেখ বাড়িতে থাকলে একটু ভালো কিছু খেতে পেত। তা না হলে সারাদিনের পরিশ্রমের পরও ঠিকমতো খাবার জুটত না তার। এর সঙ্গে ছিল উঠতে-বসতে সৎ মায়ের তিরস্কার আর গালমন্দ। এসব কি অত্যাচার? সে জানে না। কারণ এসব নিয়ে সে কখনো আল্লাহর কাছে বিচার চায়নি। তার বিশ্বাস, আল্লাহর বিচার অত্যন্ত কঠিন। দুনিয়ায় কেউ শাস্তি না পেলেও আখিরাতে অবশ্যই পাবে।
আর আখিরাতের শাস্তি দুনিয়ার যেকোনো কষ্টের চেয়ে শতগুণ, সহস্রগুণ ভয়াবহ। সে কখনোই চায় না, তার কারণে কেউ আখিরাতে কষ্ট পাক। সে শুধু চায়, সবাই ভালো থাকুক। সবার আখিরাত সুন্দর হোক। আনতারা অনেকক্ষণ চুপ করে আছে দেখে ইফরাদের হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ে। ইফরাদ ভারী গলায় জিজ্ঞেস করে,

— তোমার গায়ে হাত তুলত?
আনতারা মাথা নিচু করে আস্তে বলে,
— না, গায়ে হাত তুলত না।
ইফরাদ আলতো করে আনতারার হাত টেনে নিজের হাতে নিয়ে বলে,
— তাহলে গায়ে হাত তোলা ছাড়া বাকি সব অত্যাচারই করত?
আনতারা কোনো উত্তর দেয় না। আনতারার নীরবতাই সব প্রশ্নের জবাব হয়ে দাঁড়ায়। ইফরাদের ভেতর চাপা রাগ জমতে লাগল। দাঁত চেপে বলে,
— তোমার বাবা নেই? সেও কি সৎ বাবা ছিল?
আনতারা মাথা তুলে অবাক হয়ে বলে,
— না, বাবা সৎ হবে কেন?
ইফরাদ এবার আরো বিরক্ত হয়ে বলে,
— তাহলে তোমার ওপর এত অত্যাচার হতো, আর তিনি কিছুই বলতেন না?
আনতারা শান্ত গলায় বলে,
— আব্বুজানের সামনে তো এসব হতো না।
ইফরাদ তিক্ত হাসে।

— এত কিছু হয়েছে তোমার সঙ্গে এত বছর ধরে আর তোমার আব্বুজানের চোখে একবারও পড়েনি? এটা কীভাবে সম্ভব? বলো, তোমার সেই সো-কল্ড আব্বুজান দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রতি এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলো যে, তোমার প্রতি সব মায়া-ভালোবাসা ভুলে গেছে!
আনতারা বিপরীতে কিছু বলার থাকে না। আসলে বলার কিছু নেই। আনতারা ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
— ছাড়ুন ওসব।
ইফরাদ বুঝে, আনতারা এই বিষয়টা নিয়ে আর কথা বাড়াতে চায় না। তাই ইফরাদও আর কিছু বলে না। একটা শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করে বলে,
— আচ্ছা, বাকিগুলো খুলো।
আনতারা মাথা নেড়ে বলে,
— না।
ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— কেন?
আনতারা আলতো করে ইফরাদেরর হাতটা ধরে মাথা নিচু করেই বলে,

— আপনি রেগে আছেন। সুন্দর করে বলুন।
ইফরাদ শান্ত গলায় বলে,
— রেগে নেই।
আনতারা ধীরস্বরে বলে,
— আপনি আমার ওপর অখুশি থাকলে এত কিছু পেয়েও আমার ভালো লাগবে না। এত উপহার পেয়েও আমার মন ভালো হবে না, যদি না আপনি আমার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেন।
ইফরাদ কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ আনতারার দিকে তাকিয়ে রইল। এই মেয়েটা সত্যিই অদ্ভুত। দুই মিনিটও তাকে রাগ করে থাকতে দেয় না। একটা কথাতেই সব রাগ গলে যায়।হালকা হেসে ইফরাদ ডান হাত দিয়ে আনতারার কোমর জড়িয়ে নিজের কাছে টেনে নেয়।

— ভালোই কথায় ভুলাতে পারো!
আনতারা ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,
— ভুলাতে আর পারলাম কোথায়? ভুলছেন তো না। আমার কথাও শুনছেন না।
ইফরাদ মুখটা আনতারার কানের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে বলে,
— ভুলে গেছি। এবার খুশি হও, মাই জানা।
কথাটা শুনেই আনতারার গাল লজ্জায় লাল হয়ে উঠে। আনতারা চোখ নামিয়ে আস্তে বলে,
— ঠিক আছে। সরে দাঁড়ান?
ইফরাদ দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে,
— দূরে যেতে বলছ? আচ্ছা, গেলাম দূরে……
বলে সত্যিই সরে যেতে উদ্যত হতেই আনতারা তাড়াতাড়ি ইফরাদের শার্টের বুকের অংশ খামচে ধরে ফেলে।

— না।
ইফরাদ থেমে গেল। ঠোঁট চেপে হাসতে হাসতে বলে,
— কী না?
আনতারা মুখ নিচু করেই বলে,
— আমি দূরে যেতে কোথায় বললাম? পাশেই থাকুন।
ইফরাদ মুচকি হেসে বলে,
— কাছে থাকতে তো বললে না। তাই ভাবলাম, চলে যাই।
বলে আবারও সরে যাওয়ার ভান করতেই আনতারা আবার তার শার্ট শক্ত করে ধরে ফেলে।
— এখন বলছি। কাছে থাকুন।
ইফরাদ আর এক মুহূর্তও দেরি করে না। আবার কোমর জড়িয়ে আনতারাকে আরো কাছে টেনে এনে নরম গলায় বলে,

— এতটা কাছে ঠিক আছে?
আনতারা লজ্জায় অস্থির হয়ে ইফরাদের বুকে আলতো ধাক্কা দেয়।
— আপনি কিন্তু আমাকে খুব জ্বালাচ্ছেন! সরুন।
ইফরাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলার ভান করে বলে,
— বিয়ের একটাই সমস্যা। বউ কাছেও থাকতে দেয় না, আবার দূরে চলে গেলেও সেটা চায় না।
আনতারার হাসি পায় অনেক ইফরাদের কথায়। সে ঠোঁট চেপে হেসে বলে,
— মাঝামাঝি থাকুন। দূরেই যেতে চান কেন?
ইফরাদ মুখটা আনতারার কানের একদম কাছে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলে,
— বউ কাছে থাকতে দেয় না বলেই তো রাগ করছি।
মুহূর্তেই আনতারার পুরো শরীর শিউরে উঠে। সে সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে ফেলে। কারণ এবার ইফরাদের মুখ প্রায় তার ঘাড় ছুঁয়ে গেছে। ইফরাদের চোয়ালের চাপা দাড়িগুলো খোঁচাচ্ছে। আবার ইফরাদের উষ্ণ নিঃশ্বাস আর নিচু স্বরের ফিসফিসানি শরীরের ভেতর অদ্ভুত এক শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে দিয়েছে। আনতারা চোখ বন্ধ রেখেই খুব আস্তে করে বলে,

— এই…..সরুন না…..
ইফরাদ দুষ্টুমিভরা গলায় জিজ্ঞেস করে,
— দূরে যেতে বলছ?
আনতারা লজ্জায় আরো গুটিয়ে গিয়ে বলে,
— আজকের মতো রেহাই দিন?
কথাটা শুনে ইফরাদ আর নিজেকে সামলাতে পারে না।জোরে হেসে উঠে। হাসতে হাসতেই আনতারার কাছ থেকে একটু সরে আসে। ইফরাদের হাসির শব্দ শুনে আনতারা চোখ খুলে। লজ্জায় তার আর কিছুই বলার মতো রইল না।
ইফরাদ হাসি থামিয়ে বলে,

— আচ্ছা, মোবাইলটা দাও। অন করে দিই।
আনতারা সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা ইফরাদের হাতে তুলে দেয়।ইফরাদ ফোনটা নিয়ে অটোমান বেঞ্চে বসে মোবাইলের পাওয়ার বাটনে চাপ দেয়। আনতারাও গিয়ে ইফরাদের পাশে বসে। আনতারা ছোট্ট বাচ্চার মতো কৌতূহল নিয়ে স্বামীর প্রতিটা কাজ মন দিয়ে দেখছে। আইফোনটা চালু হতেই ইফরাদ সিম ইমপোর্ট করে। এরপর ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় সব সেটিংস করতে শুরু করে। ফোনে সফটওয়্যার আপডেট শুরু হয়ে গেল। ফোনটা বিছানার ওপর রেখে ইফরাদ আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,

— এটা আপডেট হতে থাকুক। তুমি অন্য ব্যাগগুলো খুলো।
বলেই ইফরাদ উঠে দাঁড়ায়। তারপর হাত বাড়িয়ে আনতারাকেও উঠিয়ে দেয়। আনতারা বিছানার ওপর রাখা একটা শপিং ব্যাগ হাতে নিয়ে খুলে। ভেতর থেকে একটা খিমার বের করে। খিমারটা দেখামাত্রই আনতারার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে। মোবাইল দেখে যতটা না খুশি, খিমারটা দেখে অনেক বেশি খুশি। আনতারার ঠোঁটে ততক্ষণে প্রশস্ত হাসি ফুটে উঠেছে। খুশিভরা চোখে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে বলে,

— খিমার এনেছেন আমার জন্য?
ইফরাদ মুচকি হেসে মাথা নাড়ে।
— হুম। এখন থেকে খিমার পরে নামাজ পড়বে। আরো আছে, দেখো। পছন্দ হয় কি না।
আনতারা একে একে আরো পাঁচটা ব্যাগ খুলে। সবগুলোতেই আলাদা আলাদা ডিজাইনের খিমার।আনতারা সবগুলো খিমার বুকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে,
— সবগুলোই অনেক সুন্দর। আমার খুব পছন্দ হয়েছে।
আনতারার এমন আনন্দ দেখে ইফরাদের মুখেও তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠে। ইফরাদ বলে,
— আরেকটা গিফট আছে। ওই ব্যাগগুলোতে।
আনতারা আরেকটা ব্যাগ খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো সাদা আর গ্রে কালারের কোট-স্টাইলের বোরখা।ইফরাদ বলে,

— কালারিং বোরখা ভালো না লাগলে কালোও আছে। বাকি সবগুলোই কালো বোরখা।
আনতারা একে একে বোরখাগুলো খুলে দেখতে লাগল।
প্রতিটা মন দিয়ে দেখার পর বলে
— হুম, সবগুলোই সুন্দর। আপনি নিজে পছন্দ করেছেন?
ইফরাদ হাসি দিয়ে বলে,
— জি। একাই নিজের পছন্দে এনেছি। এখন থেকে এই বোরখাগুলো পরে বাইরে বের হবে।
আনতারা কিছুক্ষণ চুপ থেকে নরম গলায় বলে,
— বোরখাগুলো সুন্দর। কিন্তু আমি এগুলো পরে বাইরে বের হতে পারব না।
ইফরাদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কেন?
আনতারা বোরখাগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে,
— এগুলো কাজ করা বোরখা।

— তো কী হয়েছে? পর্দা করেও তো স্টাইলিশ থাকা যায়। কত মেয়ে সুন্দরভাবে বোরখা ক্যারি করছে। এই বোরখাগুলোও অনেক সুন্দর। পরলে তোমাকেও খুব সুন্দর লাগবে।
— এটাই তো আমি চাই না। আমার পর্দার উদ্দেশ্য নিজেকে আড়াল করা। কিন্তু এই বোরখাগুলো পরলে নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হবে। এমন পর্দা আমি চাই না, যেখানে বোরখা পরার পরও কেউ আমার প্রতি আকর্ষিত হয়।
ইফরাদ চুপ করে গেল। সে বুঝতে পারে, আনতারার কথায় যুক্তি আছে। যদি পর্দার মূল উদ্দেশ্য হয় নিজেকে আড়াল করা, তাহলে অতিরিক্ত কারুকাজ করা বোরখা সেই উদ্দেশ্য পূরণ করে না। বরং নতুনভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ইফরাদ হালকা গলায় বলে,

— আচ্ছা।
আনতারা ইফরাদের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— রাগ করেছেন?
ইফরাদ হেসে মাথা নাড়ে।
— ধুর, বোকা! রাগ করব কেন? বোরখাগুলো নেওয়ার সময় কথাটা মাথায় আসেনি। কিন্তু এখন বুঝতে পেরেছি। সমস্যা নেই।
— আপনি খুব ভালো।
ইফরাদ ভান করে ভ্রু তুলে।
— খুব?
আনতারা মুচকি হেসে বলে,
— খুব বেশি।
ইফরাদও হাসে।
— আর তুমি খুব সুন্দরী।

হঠাৎ এমন প্রশংসা শুনে আনতারা হেসে ফেলে। আনতারার হাসি দেখে ইফরাদও মুচকি মুচকি হাসতে থাকে। হাসতে হাসতেই ইফরাদ বিছানায় বসে আনতারার ফোনটা হাতে নেয়। ফোনের আপডেট শেষ হয়ে গেছে।
ইফরাদ বাকি সেটিংসগুলো করতে থাকে। আনতারা কিছুক্ষণ ইফরাদের কাজ দেখে। তারপর বলে,
— আমি আপনার জন্য খাবার নিয়ে আসছি।
ইফরাদ মাথা না তুলে তাকিয়ে বলে,
— পরে যেও। আগে এখানে এসে বসো। কাজ আছে।
আনতারা এসে ইফরাদের পাশে বসে। ইফরাদ নিজের ফোন নম্বরটা আনতারার ফোনে সেভ করে। নাম লিখে Hubby। তারপর ফোনটা আনতারার দিকে ঘুরিয়ে দেখিয়ে বলে,

— এটা আমার নম্বর।
নামটা দেখেই আনতারার গাল লাল হয়ে উঠে। আনতারা লজ্জা পায়। লজ্জা মিশ্রিত হাসি হাসে। আনতারার সেই হাসি দেখেই ইফরাদ বুঝে যায়, কেন আনতারা লজ্জা পাচ্ছে। ইফরাদও হেসে বলে,
— তুমি তো এমন রোমান্টিক নামে সেভ করতে না। তাই আমিই করে দিলাম।
— আপনি জানেন, তাই না?
ইফরাদ আনতারাকে টিজ করে বলে,
— তাহলে তুমি কি নামে সেভ করতে? শুনি?
আনতারা আরো বেশি লজ্জা পেয়ে বলে,
— কিছুই দিতাম না।
— জানি। সেজন্যই আমি নিজেই দিয়ে দিয়েছি।

এরপর ইফরাদ ফোনে পাসওয়ার্ড সেট করে। তারপর ফিঙ্গারপ্রিন্ট চালু করার জন্য আনতারার হাতটা আলতো করে নিজের হাতে নেয়। আনতারার বুড়ো আঙুল স্ক্রিনের ওপর কয়েকবার ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে ফিঙ্গারপ্রিন্টও সেট করে দেয়। সবকিছু শেষ করে ইফরাদ ফোনের ক্যামেরা চালু করে। ছবি তুলতে যাবে, ঠিক তখনি আনতারা তাড়াতাড়ি মুখটা সরিয়ে নেয়।
ইফরাদ অবাক হয়ে বলে,
— কী হয়েছে?
আনতারা একটু সংকোচ নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— ছবি তুলছেন আপনি?
— হুম। তো?
— আমার সঙ্গে তুলছেন?
— তো কার সঙ্গে তুলছি?
আনতারা লজ্জা পেয়ে বলে,

— ওহ। আমি ভেবেছিলাম, আপনি একা ছবি তুলবেন।
ইফরাদ কিছু না বলে হাত বাড়িয়ে আনতারার কাঁধের পেছন দিয়ে আনতারাকে আলতো করে নিজের কাছে টেনে নেয়। এতটাই কাছে, যে দুজনের মাঝখানে আর কোনো দূরত্ব রইল না। তারপর পরপর তিন-চারটা ছবি তুলে ফেলে। ছবি তোলা শেষ হলে আনতারাকে ছেড়ে ছবিগুলোর মধ্যে থেকে একটা বেছে নিয়ে আনতারার ফোনের ওয়ালপেপার হিসেবে সেট করে।
সব সেটিংস শেষ করে ইফরাদ ফোনটা আনতারার হাতে দিয়ে বলে,
— নাও। তোমার ফোনের সব সেটিং হয়ে গেছে।
আনতারা ফোনটা বিছানার ওপর রেখে উঠে দাঁড়ায়। তারপর ইফরাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,

— আপনার জন্য কী গ্রিক ইয়োগার্টই আনব?
— মেইডকে বলে দাও। ও নিয়ে আসবে।
— কেন?
ইফরাদ স্বাভাবিক গলায় বলে,
— তোমার পিরিয়ড হয়েছে। এখন সিঁড়ি ওঠানামা করার দরকার নেই।
আনতারা শান্ত গলায় বলে,
— কিছু হবে না। আমিই আনছি।
— এই সময় একটু বিশ্রাম নিতে হয়। স্বামীসেবা করার জন্য আমি আছিই।
— এখন স্বামীসেবা না করার মতো অসুস্থ আমি হইনি। এইটুকু স্বামীসেবা করাই যায়।
ইফরাদ আর কথা বাড়ায় না। জানে আনতারা শুনবে না।
— আচ্ছা, যাও।
আনতারা রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো। ইফরাদ আলমারি থেকে কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। কিছুক্ষণ পর শাওয়ার বেরিয়ে আসে। পরনে কালো রঙের একটা টি-শার্ট আর কালো প্যান্ট। ইফরাদ দেখে তার ফোনে কল এসেছে। তার ফ্রেন্ড কল করেছে। ইফরাদ কল রিসিভ করে বলে,

— হ্যালো, বল?
এমন সময় রুমে ঢুকে আনতারা। তার হাতে ট্রে। তাতে গ্রিক ইয়োগার্টের বাটি। ইফরাদ ঘুরে দাঁড়িয়ে থাকায় আনতারা খেয়াল করে না যে, ইফরাদ ফোনে কথা বলছে।
ইফরাদকে দেখেই হাসিমুখে বলে,
— আমি বানিয়েছি আজকে। খেয়ে বলুন।
আনতারার কণ্ঠ শুনে ইফরাদ ফিরে তাকায়। তখনি আনতারার চোখে পড়ে, ইফরাদ ফোনে কথা বলছে।মুহূর্তেই আনতারা চুপ হয়ে যায়। ইফরাদ হাতের ইশারায় আনতারাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে। তারপর ফোনে বলে,
— দশটার পর আসছি।
বলেই কল কেটে দেয়। আনতারা তখনো বাটিটা হাতে ধরে দাঁড়িয়ে। ইফরাদকে ফোন রাখতে দেখে নরম গলায় জিজ্ঞেস করে

— বাইরে যাবেন?
ইফরাদ মাথা নেড়ে বলে,
— হ্যাঁ। ফ্রেন্ডদের কাছে।
বলেই একটু থেমে আবার বলে,
— ছেলে ফ্রেন্ডদের সঙ্গে আড্ডা দিতে। কোনো মেয়ে ফ্রেন্ড নেই।
কথাটা শুনে আনতারা মাথা নিচু করে হেসে ফেলে।সেদিন রাতের কথা মনে পড়ে গেলো। এই ব্যাপার নিয়ে কি রাগটাই না করেছিলো। আর ইফরাদ? কিভাবে তার রাগ ভাঙিয়েছিলো!
আনতারাকে হাসতে দেখে ইফরাদও হাসি দিয়ে বলে,
— দাও তো দেখি, বেগমসাহেবার বানানো খাবার কেমন হয়েছে?
আনতারা এগিয়ে এসে বাটিটা ইফরাদের হাতে দেয়। বাটিটা নেওয়ার সময় ইফরাদ একটু ঝুঁকে আনতারার চোখে চোখ রেখে খুব আস্তে ফিসফিস করে বলে,

— বাই দ্য ওয়ে, থ্যাংকস, মাই জানা।
কথাটা বলেই ইফরাদ বিছানায় বসে। তারপর পাশের জায়গাটায় ইশারা করে আনতারাকে বসতে বলে। আনতারা এসে ইফরাদের পাশে বসে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— আচ্ছা, আপনি আমাকে মাই জানা বলে ডাকেন কেন?
ইফরাদ বাটিতে চামচ নাড়তে নাড়তেই আনতারার দিকে তাকায়। তারপর একটু হাসি চেপে জিজ্ঞেস করে,
— রাগ করবে না তো?
আনতারা মাথা নেড়ে বলে,
— না।
— প্রথমবার যখন আমার বন্ধুরা তোমার নাম জিজ্ঞেস করেছিল, তখন আমি তোমার নামটা ভুলে গিয়েছিলাম। মাথায় শুধু “ম” দিয়ে শুরু হওয়া কয়েকটা শব্দ ঘুরছিল। সেখান থেকেই মাই জানা ডাকটা চলে আসে।
আনতারা মুচকি হেসে বলে,

— কিন্তু আমার নাম তো মাই জানা না।
ইফরাদ একটু ভেবে বলে,
— কিন্তু “ম” দিয়েই তো কিছু একটা ছিল…….
— মারজানা?
ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে বলে,
— হুম! তাহলে এটা মারজানা?
— হুম।
— নামটা কিন্তু অনেক সুন্দর।
আনতারা নরম কণ্ঠে বলে,
— আমার আম্মু রেখেছিলেন।
ইফরাদ একটু থেমে বলে,
— তোমার আম্মু তো মারা গিয়েছিলেন তোমার…
— আমার জন্মের আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন। যেটা পরে দাদীজান রেখেছিলেন।
ইফরাদ হালকা হেসে বলে,

— আম্মুর চয়েজ খুব ভালো।
আনতারা অবাক হয়ে ইফরাদকে জিজ্ঞেস করে,
— আম্মু?
ইফরাদ মুচকি হেসে বলে
— তোমার আম্মু তো আমারও আম্মু, তাই না?
আনতারা হাসিমুখে মাথা নাড়ে।
— হুম।
— তোমার পুরো নাম মারজানা শেখ?
— না। আনতারা শেখ।
— তাহলে মারজানা ডাকনাম?
— না। আগে ছিল।
ইফরাদ একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,

— আগে ছিল মানে?
আনতারা শান্ত গলায় বলে,
— মানে, আমি যখন চার মাসের ছিলাম, তখন পর্যন্ত আমার নাম ছিল মারজানা। তারপর নামটা সরিয়ে ফেলা হয়।
— কে সরিয়েছিল?
আনতারা আস্তে করে বলে,
— আম্মা।
ইফরাদ কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— ওই সৎ মা তোমার?
প্রশ্নটা শুনেই আনতারার মনে পড়ে, কথা বলতে বলতে আবারো সে নিজের অতীতের অনেক কথা বলে ফেলেছে। এসব শুনলে ইফরাদ আবার রেগে যাবে। তাই দ্রুত প্রসঙ্গ বদলানোর চেষ্টা করে বলে,
— আপনি তো খাচ্ছেনই না।
ইফরাদ মাথা নাড়ে।

— খাব। আগে বলো, তোমার ওই সৎ মা……
আনতারা কথা কেটে দিয়ে বলে,
— আপনি আগে খান। আমি নিজের হাতে বানিয়ে এনেছি। খেয়ে বলুন, কেমন হয়েছে?
ইফরাদ চামচে করে একটু গ্রিক ইয়োগার্ট তুলে মুখে নেয়।খেয়ে মুচকি হেসে আনতারার দিকে ঝুঁকে বলে,
— অমৃত।
— মজা না, সত্যি করে বলুন।
ইফরাদ এবার আরো গম্ভীর গলায় বলে,
— অন্য সময় মজা করলেও, এখন হৃদয়ের গভীর থেকে সত্যিটাই বলছি, মাই জানা। এটা সত্যিই অনেক টেস্টি। এক বাটিতে হবে না। আরো দশ বাটি লাগবে। তবে দশ বাটি খেলে আবার ডায়েটে সমস্যা হবে।
কথাটা শুনে আনতারা হেসে উঠে।
— আপনি মাঝে মাঝে এমন এমন কথা বলেন, না হেসে থাকা যায় না।
ইফরাদও মুচকি হেসে বলে,
— তাহলে হাসো। হাসলে তো কোনো ট্যাক্স লাগে না। আর যদি লাগতোও, তাতেও সমস্যা নেই। তোমার হাজব্যান্ড ইজ ড্যাম রিচ। ট্যাক্স দিয়ে হলেও তোমাকে হাসাবে।
আনতারা দুষ্টুৃমি করে বলে,

— একটা কথা ভুলে গেছেন?
— কী?
— আমার জোর করে বিয়ে করা হাজব্যান্ড ইজ ড্যাম রিচ।
কথাটা শুনে ইফরাদ আনতারার আরো কাছে আসে। গভীর দৃষ্টিতে আনতারার চোখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলে,
— ভুলে যাচ্ছি, ভুলে যেতে দাও না। যদি ভুলে গিয়ে সুখী হওয়া যায়, তাহলে আমি তোমাকে ছাড়া সবকিছু ভুলে যেতে চাই।
আনতারা মাথা নিচু করে হাসতো থাকে। ইফরাদ কয়েক মুহূর্ত আনতারার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তারপর আবার মাথায় আসে আরেক কথা। জিজ্ঞেস করে,
— আচ্ছা, ওটার কী কাহিনি? বলো তো।
আনতারা হাসি থামিয়ে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করে,
— কোনটা?
— তোমার ওই সৎ মা কী করেছিল? সত্যি করে বলো।
আনতারা আস্তে করে বলে,
— বাদ দিন না?
ইফরাদ অনড়ভাবে বলে,

— এটা বাদ দেব না। আমি শুনতে চাই।
আনতারা বুঝতে পারে এড়িয়ে লাভ নেই। তাই বলতে শুরু করে,
— মারজানা নামটা আম্মা সরিয়ে দিয়েছিলেন। আগে আমার নাম ছিল মারজানা শেখ। কিন্তু মারজানা নামটা মল্লিকা নামের সঙ্গে মিল থাকায় আম্মা আমার মারজানা নামটা নিষিদ্ধ করে ফেলেন। তারপর আমার নাম হয়ে যায় আনতারা।
— মল্লিকা কে?
— আম্মার নাম রাবেয়া মল্লিকা।
কথাটা শুনে ইফরাদ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইল। তারপর অবিশ্বাসভরা কণ্ঠে বলে,
— আই’ম টোটালি স্পিচলেস! এই মহিলাকে তুমি ক্ষমা করে দিয়েছো?
আনতারা শান্ত স্বরে বলে,
— কী করব? ঘৃণা পুষে রাখব?
ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে বলে,

— ইয়েস। ঘৃণা পুষে রাখা উচিত। শুধু তাই না, সেই ঘৃণার আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া উচিত।
— কাউকে ঘৃণার আগুনে পোড়াতে গেলে, সেই আগুনে নিজেরও পুড়তে হয়। আর আমি জীবনে একটু শান্তি চাই। ঘৃণা চাই না। ভালোবাসা চাই।
শেষ কথাগুলো বলার সময় আনতারার কণ্ঠে জমে ছিল গভীর ক্লান্তি আর দীর্ঘদিনের চাপা বেদনা। ইফরাদ তা স্পষ্ট অনুভব করে। একটা মেয়ে কতটা কষ্ট পেলে ঘৃণা করতেও ক্লান্ত হয়ে যায়? কতটা ভালোবাসাহীন জীবন কাটালে মুখ ফুটে শুধু ভালোবাসা চাইতে শেখে? মুহূর্তেই ইফরাদ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে। এই মেয়েটাকে সে জীবনের সব সুখ দেবে। তার জীবনে আর কোনো কষ্ট আসতে দেবে না। বাটিতে চামচ নাড়তে নাড়তেই জিজ্ঞেস করে,

— তোমার নাম আনতারা শেখ, তাই তো?
— হুম।
ইফরাদ এবার বাম হাত দিয়ে আনতারার ডান হাত শক্ত করে নিজের মুঠোয় ধরে বলে,
— এতদিন ছিল।
একটু থেমে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— আজকের পর থেকে তোমার নাম মারজানা আনতারা শেখ। আর কেউ কোনোদিন তোমার নাম থেকে মারজানা সরাতে পারবে না। প্রয়োজন হলে তোমার সব সার্টিফিকেট, সব কাগজপত্র, সবকিছুতেই আমি এই নামটা রাখব। আজকের পর থেকে কেউ যদি তোমার নাম জিজ্ঞেস করে, শুধু আনতারা শেখ বলবে না। বলবে, মারজানা আনতারা শেখ। মারজানা নামটা আমি চিরদিনের জন্য তোমার নামের সাথে জুড়ে দিলাম।
ইফরাদের মুখের দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল আনতারা।আনতারার চোখ ভিজে উঠে। মুহূর্তেই টলমল করে উঠে দুচোখ। সেটা দেখে ইফরাদ বাটিটা টেবিলের ওপর রেখে আনতারার দিকে হাত বাড়ায়। খুব যত্ন করে চোখের কোণে জমে থাকা জল মুছে দিয়ে নরম গলায় বলে,

— কাঁদছ কেন, বোকা মেয়ে? আমি তো আছি।
আনতারা ঠোঁট চেপে কান্না সামলানোর চেষ্টা করে। কাঁপা গলায় বলে,
— দাদীজানের পর… এই প্রথম কেউ আমার হয়ে এভাবে কথা বলল। আমাকে সাহস দিল।
ইফরাদ আনতারার হাতটা আরো শক্ত করে ধরে বলে,
— শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোমাকে একা ছাড়ব না। আমি সবসময় তোমার হয়েই থাকব। তোমাকে কেউ কষ্ট দিতে পারবে না। তোমাকে আমি আমার রুহের মাঝেই রেখে দেব। রুহআবিষ্ট হয়ে তুমি আমার ভেতরেই থাকবে।

আনতারার চোখ আবারো ছলছল করে উঠে। তবে এই অশ্রু কষ্টের না। এ ছিল জীবনে মূল্যবান জিনিসটা পাওয়ার অশ্রু। যার জন্য সে জীবনের এতটা সময় অপেক্ষা করেছে। একটা সাহসী আশ্রয়। একজন মানুষ, যে নির্দ্বিধায় তার পাশে দাঁড়াবে। এই অভাবটাই তো এতদিন অনুভব করেছে। আজ ইফরাদের মতো একজন স্বামীকে পাশে পেয়ে তার মনে হলো, আল্লাহর বিশেষ রহমত তার কাছে। এই জীবনে তার আর কিছুই চাওয়ার নেই। আল্লাহ তাকে অফুরন্ত দিয়েছেন। তাকে এমন একজন স্বামী দিয়েছেন, যার পাশে দাঁড়ালে নিজেকে আর একা মনে হয় না। আনতারার চোখে আবার জল জমতে দেখে ইফরাদ আবার স্নেহভরে আনতারার অশ্রু মুছে দিল। তারপর খুব কোমল স্বরে বলে,

— কেঁদো না। তুমি কাঁদলে ইদানীং আমার খুব কষ্ট হয়। তাই প্লিজঅন্তত আমার জন্য কান্নাটা বন্ধ করো।
আনতারা ভেজা চোখে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে আস্তে বলে,
— এমনই থাকবেন? উপরে আল্লাহ আর এই জগতে আপনি ছাড়া আমার কেউ নেই।
কথাটা শুনে ইফরাদ কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে আনতারার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে নিঃশব্দে বলে,
— আমি চাই, তোমার প্রতি আমার হৃদয় আরো কোমল হোক। এতটাই কোমল, যেন তোমাকে এক মুহূর্তের জন্যও মলিন দেখলে আমার বুক ভেঙে যায়। তাহলেই আমি কোনোদিন তোমাকে কষ্ট দিতে পারব না। তোমার সঙ্গে অন্যায়ও করতে পারব না।
মনের নীরব প্রতিজ্ঞা বুকের ভেতরেই রেখে মাথা নাড়ে।

— থাকব।
কথাটা শুনে আনতারার মুখে হাসি ফুটে উঠে। ইফরাদও মৃদু হেসে আনতারার দিকে তাকিয়ে রইল। আনতারা দুই হাত দিয়ে চোখ মুছে নাক টেনে নিয়ে বলে,
— আপনি তো খাচ্ছেনই না। আজকেরটা বুঝি ভালো হয়নি?
ইফরাদ মুচকি হেসে বলে,
— তোমার বানানো খাবার কখনো খারাপ হতে পারে না, মাই জানা।
কথা শেষ করেই সে চামচে করে এক চামচ গ্রিক ইয়োগার্ট তুলে আনতারার মুখের সামনে ধরে। আনতারা কোনো আপত্তি করে না। একেবারে বাধ্য মেয়ের মতো খেয়ে নেয়।
এই যত্ন, এই ভাগ করে নেওয়া মুহূর্তগুলো দুজনেরই ভীষণ ভালো লাগে। খাওয়া শেষ করে ইফরাদ বাটিটা টেবিলের ওপর রাখতেই আনতারা উঠে দাঁড়াতে গেল। বাটিগুলো নিচে রেখে আসবে। কিন্তু ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে আনতারার হাত ধরে থামিয়ে দেয়।

— কোথায় যাচ্ছ?
— বাটিগুলো রাখতে।
ইফরাদ মাথা নেড়ে বলে,
— কোনো প্রয়োজন নেই। চুপচাপ শুয়ে থাকো। আর আমার কথার ওপর একটা কথা বললে……
আনতারা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— বললে কি?
ইফরাদ একদম স্বাভাবিক মুখে বলে,
— চুমু খাব।
আনতারা লজ্জায় হেসে ফেলে।
— কী যে বলেন না আপনি! বাটিটা রেখে আসি। এঁটো বাটি রেখে দেওয়া ভালো না।
ইফরাদ একটু ঝুঁকে আনতারার চোখের দিকে তাকিয়ে ভ্রু তুলে বলে,

— তার মানে…… চুমু চাই?
আনতারা আরো লজ্জা পেয়ে বলে,
— এমন করছেন কেন?
— চুপচাপ শুয়ে পড়ো।
— এই অসময়ে আমি শুয়ে থাকি না।
— ঠিক আছে। তাহলে বসে থাকো। আর আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও। ওই সময় খুব ভালো লেগেছিল।
আনতারা মুচকি হেসে বলে,
— আচ্ছা। আসুন।

বলেই আনতারা বিছানার ওপর উঠে পা মুড়ে বসে। ইফরাদ এক মুহূর্ত দেরি না করে এসে ফট করে মাথা রাখে আনতারার কোলে। আনতারা ইফরাদের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। কিছুক্ষণ পর ইফরাদ মাথা তুলে আনতারার বাম হাতটা আলতো করে নিজের হাতে নেয়। তারপর সেই হাত নিজের বুকের ওপর রেখে শক্ত করে ধরে রাখে। চোখ বন্ধ করে নিশ্চিন্তে শুয়ে রইল। আনতারার মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তটার চেয়ে সুন্দর কিছু আর হতে পারে না। জীবনে এমন শান্ত, এমন ভালোবাসায় ভরা সময় কোনোদিন আসবে, সে কখনো কল্পনাও করেনি। এভাবেই প্রায় বিশ মিনিট কেটে গেল। তারপর ইফরাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

— হয়েছে। আর লাগবে না।
বলেই মাথা তুলে বসে। আনতারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কী হলো? উঠলেন কেন?
— বাইরে যাব।
— ওহ…….
ইফরাদ আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,
— কিন্তু তুমি উঠবে না। চুপচাপ শুয়ে থাকবে।
কথা শেষ করেই ইফরাদ আলতো করে আনতারার দুই বাহু ধরে আনতারাকে আবার বিছানায় শুইয়ে দেয়। এবার আর আনতারা কোনো আপত্তি করে না। ইফরাদ তার গায়ে কমফোর্টারটা ভালো করে টেনে দেয়। তারপর এসির তাপমাত্রা কমাতে যাবে, ঠিক তখনি আনতারা বলে,

— এটা বন্ধ করে দিন।
ইফরাদ মাথা নেড়ে বলে,
— বন্ধ করছি না। শুধু রুম টেম্পারেচারে করে দিচ্ছি। না হলে আবার গরম লাগবে।
আনতারা চুপচাপ মাথা নাড়ে। ইফরাদ এসির তাপমাত্রা ঠিক করে আলমারি থেকে একটা জ্যাকেট বের করে পরে নেয়। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করে। হালকা পারফিউম দিয়ে ড্রয়ার থেকে গাড়ির চাবিটা নিয়ে পকেটে রাখে। সবশেষে আনতারার দিকে একবার তাকিয়ে মুচকি হেসে বাই বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।নিচে নামার সময় এক মেইডকে ডেকে বলে, আনতারার জন্য কিছু ফল কেটে রুমে দিয়ে আসতে। কিছুক্ষণ পর শাহানারা একটা ট্রেতে করে কাটা ফল নিয়ে রুমে এল।
ট্রেটা দেখে আনতারা অবাক হয়ে বলে,

— এসব কেন? আমি তো বলিনি।
— ইফরাদ স্যার বলেছেন। আর এটাও বলেছেন, এগুলো যেন আপনি খেয়ে শেষ করেন। না হলে নাকি আমার চাকরি থাকবে না।
কথাটা শুনে আনতারা হেসে ফেলে।
— আচ্ছা, খাব আমি। রেখে যান।

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৪ (২)

শাহানারা ফলের প্লেটটা বিছানার ওপর রেখে চলে গেল।আনতারা ধীরে উঠে বসে। এক টুকরো আপেলে কামড় বসাতে বসাতে অজান্তেই আনতারার ঠোঁটে মিষ্টি একটা হাসি ফুটে উঠে। ইফরাদের এমন ছোট ছোট যত্ন, এমন খেয়াল রাখা, সবকিছুই তার ভীষণ ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে, ভালোবাসা বড় বড় কথায় না, বরং এমন ছোট ছোট যত্নের মাঝেই সবচেয়ে বেশি করে প্রকাশ পায়।

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৬