Home রোদ্দুর এবং তুমি রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ২২

রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ২২

রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ২২
ফারহানা চৌধুরী

বিড়াল পায়ে হেঁটে শুভ্রর ঘরের সামনে এসে অরু দাঁড়ালো। দুয়ারে দাঁড়িয়ে ঠকঠক আওয়াজ তুললো দোরে। শুভ্র ড্রেসিং টেবিলের জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে রাখছিলো। দরজায় শব্দ হলে মাথা তুলে তাকালো। দরজায় দাঁড়ানো অরুকে পর্যবেক্ষণ করে নিলো নিভৃতে। পরক্ষণেই চোখ ফিরিয়ে নিলো। অরু গলা খাঁকাড়ি দিলো। মনোযোগ কাঁড়তে অক্ষম হয়ে কুঁচকানো মুখে বলল,
-“খেতে আসুন।”
শুভ্র কপাল কুঁচকায়,
-“রান্না কে করলো? আমি তো করিনি।”
অরু এই পর্যায়ে মিনমিনে গলায় বলল,
-“আমি করেছি।”
-“তুমি?”

শুভ্র বিস্ফারিত চোখে চাইলো। যেন বড়সড় কোনো অন্যায় করে বসেছে সে। আশ্চর্য হয়ে বলল,
-“এই মেয়ে! তুমি রান্না পারো নাকি? সব ছড়িয়েছো রান্নাঘরে? দেখি, হাত-পা ক’জায়গায় কেঁটেছো?”
বলতে বলতে ত্রস্ত পায়ে মার্বেলের মেঝে মাড়িয়ে মেয়েটার সামনে এলো। হাত ধরে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখলো খঁতিয়ে খঁতিয়ে। অরু তার এমন বিদ্রুপে রীতিমতো ঝাঁঝিয়ে উঠলো,
-“আমাকে কি মনে হয় আপনার? সরুন! খেতে হবে না আপনার।”
হাত ছাড়িয়ে হনহন করে চলে গেলে গেলো ডাইনিং টেবিলের কাছে। শুভ্র পিছু পিছু এলো। অরুর পিছে দাঁড়িয়ে উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করলো, কি রেঁধেছে মেয়েটা। তখনই অরু পিছু মুড়লো। শুভ্র হকচকিয়ে পিছিয়ে গেলো চটপট। অরু কপাল কুঁচকে সরে পড়লো। টেবিলে খাবার বেড়ে রাখা প্লেটের দিকে চেয়ে শুভ্র বড়ো আশ্চর্য হলো। খিঁচুড়ি! মেয়েটা রান্না জানলো কবে? শুভ্র একপলক চেয়ে চেয়ার টেনে বসলো। অরু বসেছে আগেই। খাবার হাতে লাগায়নি। শুভ্র হাত ধুঁয়ে, দুই লোকমা তুললো মুখে। অরু অধীর আগ্রহে চেয়ে। তবে তার আগ্রহে দু’মগ পানি ঢেলে শুভ্র বললো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-“খাচ্ছো না কেন? আমার মুখ থেকে মধু পড়ছে না।”
অরু থতমত খেলো ওমন কাঠের মতোন খড়খড়ে কথাবার্তা শুনে। নখ আঙুলে চেপে ধরলো। ভাত মাখতে মাখতে মিনমিনে গলায় বলল,
-“আপনি কি সুন্দর করে কথা বলা শেখেননি?”
শুভ্র শুনেছে। সে হেসে ফেললো,
-“না তো। শেখায়নি কেউ আমায়৷”
অরু মুখ বাঁকালো। আড়ালে ভেঙিয়ে বলল,
-“অসহ্য!”
শুভ্র বাইরে গিয়েছিলো। গ্রোসারি কিনতে। অরু বাড়িতেই ছিলো। শুভ্র সাথে যেতে সাঁধলেও মেয়েটা যায় না। বাড়িতে রয়ে গেলো।

আকাশে ডানা মেলে পাখি ঝাপটে উড়েগেলো জোট বেঁধে। ঘুমে ঢুলুঢুলু অরুর নয়ন জোড়া কখন যে ক্লান্তিতে বুঁজে গিয়েছিলো, তা মেয়েটা নিজেও জানে না। সারাদিনের খাটাখাটুনির পর একটু ঘুমে ডুবলে, ওমনি বিরক্তি ধরা কন্ঠস্বরে শান্তির ঘুম অশান্তির দিকে ধাবিত হলো। কাঁধে স্বল্প ঝাঁকুনি অনুভব করতেই অরু নড়েচড়ে উঠলো। কোনোমতে চোখটুকুন খুলে পাশে তাকালো। শুভ্রকে দেখেই ঠিক হয়ে বসতে নিলে, শুভ্র সরে গেলো। অরু সোফায় বসায়, সে তার মুখোমুখি চেয়ার টেনে বসলো। হাতের আইসক্রিমের বাক্সটা সামনে টি-টেবিলের উপর রাখে একখানা চামচসহ। অরু কপাল গোছালো। শুভ্র বক্সটা এগিয়ে দিয়ে বলল,

-“নাও।”
অরু আড় চোখে তাকালো। পরপর চোখ সরিয়ে নিলো। কি অদ্ভুত ব্যবহার শুভ্রর! এমন করছে কেন ইদানীং? সহানুভূতি দেখাচ্ছে? অরুর অতীত জেনে করুণা করছে? এবার একটু বেশি-ই ভাবা হচ্ছে না? হয়তো হচ্ছে। তবে, তার এতো সুশ্রী আচরণ অরুর হজম হচ্ছে না। মেয়েটা কোনোমতে নিজেকে সামলে আইসক্রিমের বাক্সটা হাতে নিলো। খুলে এক চামচ মুখে পুড়তেই চোখ মুঁদে এলো মিষ্টি স্বাদে। মুখে দিতেই গলে গিয়েছে রীতিমতো। অরু তৃপ্তিদায়ক হাসে। আরামে, আয়েশে, গা এলিয়ে বসে আরো দু’চামচ মুখে নিতেই চোখ গেলো সামনে বসা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষটার দিকে। কেমন করে তাকে আপাদমস্তক পরীক্ষা করছে। অরুর অদ্ভুত লাগলো। সে কি করেছে? তাকে এমন আসামী নজরে দেখা হচ্ছে কেন? তার কি উচিত এখন শুভ্রকে আইসক্রিম সাঁধা? সৌজন্যবোধ থেকে হলেও তো উচিত। অরু বাক্সটা রেখে উঠে দাঁড়ালে শুভ্র কপাল গোটালো,

-“কি হলো?”
-“আসছি।”
বলেই, রীতিমতো ঝড়ের বেগে বেরিয়ে, ঝড়ের বেগে ফিরে এলো। হাতের চামচ আর ছোট্ট প্লেটখানা টি-টেবিলের উপর রেখে চুল গুছিয়ে নিলো কানের পিছে। মাঝেতে হাঁটু ভর করে বসতেই টেবিল সমান হলো সে। আইসক্রিমের বাক্স থেকে এক ফালি তুলে এনে সাদা ধবধবে ছোট্ট কাঁচের প্লেটখানায় তুলল। চকলেট ফ্লেবারের আইসক্রিমের ফালি, বোলে পড়তেই মাখামাখি হলো। অরু চামচ তাতে তুলে দিয়ে এগিয়ে দিলো শুভ্রর দিকে। শুভ্র অবাক হয়ে তা হাতে নিলো। অরু যেভাবে বসেছিলো, ওমনই বসে আইসক্রিম খেতে লাগলো। মাঝে আড় চোখ তুললো শুভ্রর দিকে। শুভ্র চামচ নেড়ে মজার ছলে বলে,

-“পিচ্চি-পাচ্চাদের খাবারে ভাগ বসালে, তারা যদি গলা কাটিয়ে কান্নাকাটি লাগায়? তখন?”
অরু ত্যাছড়া চোখে চাইলো। ক্ষ্যাপাটে গলায় বলল,
-“আমাকে ছোটো মনে হয় কোন দিক থেকে? একটু বলেন, আমিও শুনি।”
-“তোমার বয়স বড়জোর ১৯ থেকে ২০-ই হবে। তুমি ছোট না তো কি? তোমার বয়স দেখো, আর আমার বয়স দেখো। তোমার এতো বড় আমি, অথচ সম্মানের ‘স’ টুকুও আমাকে দাও না। কেমন মানুষ তুমি অরু?”
মিছে গম্ভীর গলায় ফরফর করে কথাগুলো বলে শুভ্র আড় চোখে তাকালো মেয়েটার দিকে। অরু চোখ ছোট ছোট করে চেয়ে আছে। শুভ্র বলে,

-“ওমন তাকিয়ে আছো কেন?”
-“আমি আপনাকে সম্মান করি না? নাকি আপনি আমাকে এতোদিন সম্মান করেননি?”
শুভ্র আমতা আমতা করে বললো,
-“আগের কথা জলে ফেলো। এখনের কথা বলছি আমি। এখন আমি তোমাকে যদ্দুর সম্মান করি, তুমি তার কানাকড়িও করো না।”
অরু মুখ বাঁকালো,
-“অ্যাহ! বলছে আপনারে!”
শুভ্র হাসে এই পর্যায়ে। পরক্ষণেই মুখ গম্ভীর করে ডাকে,
-“অরু?”
অরু তাকালো একবার ভ্রু উঁচিয়ে। চোখ ফিরিয়ে বলল,
-“হু?”
শুভ্র তৎক্ষনাৎ ছোটখাটো একখানা বোম ফাটালো,
-“প্রেম করছো?”
অরুর খাবার গলায় আটকে গেলো যেন। মেয়েটা বিস্ফারিত চোখে চাইলো,
-“কি?”

সেদিন বিকেলে অরু যখন ভার্সিটি থেকে বাড়িতে ফিরলো, ড্রয়িংরুমে বসে থাকা অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে দেখে থমকে গেলো। তামিম! পাশেই শুভ্র বসা। থমথমে মুখে। অরুকে দরজা খুলে এসেই আবার বসে ছিলো। চেয়েছিলো মেয়েটার দিকেই। নিষ্পলক। অরুকে দেখে তামিম উঠে দাঁড়ালো। অরুর মিষ্টি মুখটা তখন গম্ভীর হয়ে এসেছে। শুভ্রর দিকে তাকিয়ে চলে যেতে নিলে তামিমের কথায় দাঁড়ালো,
-“স্টপ এভোয়েডিং মি, অরু। এন্ড ইট নাও।”
অরু তাকালো,
-“এন্ড ইট? সিরিয়াসলি?”
তামিম তপ্ত শ্বাস ফেললো,
-“আমি জানি, আমি ভুল ছিলাম। তবে, আমার ইন্টেনশন বাজে ছিলো না অরু। ট্রাস্ট মি।”
-“এখানে কি করছেন?”
তামিম কিছু বলার পূর্বেই শুভ্র নিজের কথা মিটিয়ে নিলো। যন্ত্রের মতোন বলল,

-“তোমাদের কথা বলা উচিত। সবটা মিটিয়ে নেওয়া উচিত।”
অরু অবাক হলো,
-“মিটিয়ে নেবো? কি মেটাবো?”
শুভ্র তাকালো,
-“এভ্রিথিং।”
অরুর চোয়াল শক্ত হয়,
-“বাট আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু।”
তামিম বলল,
-“উই নিড টু টক অরু, প্লিজ। ফর গড সেক্!”
-“বসো তোমরা। আমি কফি আনি। আর অরু? কথা বলো। তামিমের পার্সপেক্টিভটাও তোমার শোনা উচিত।”
অরু চোখ টলমল করে উঠলো। দীঘির স্বচ্ছ টলটলে জলের মতো অশ্রু ভেসে উঠলো অক্ষিকোটরের মাঝে। লোকটা এমন করে বললো কি করে? তার থেকে শোনার প্রয়োজনও বোধ করলো না? সে চোখ মুছলো৷ তামিমকে দেখেই ক্ষ্যাপাটে গলায় বলল,

-“আপনার অতিথি আপনি আপ্যায়ন করুন, আমার কোনো যায় আসে না। আমি কথাও বলতে চাই না এর সাথে। নিজের জোর আমার উপর চাপাতে আসবেন না।”
খিটমিটে মেজাজে অরু ঘর এসে ব্যাগ ছুঁড়লো। সময় নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মুখে হাত চেপে। পরক্ষণেই দরজা ভেজিয়ে গলার স্কার্ফ বিছানায় ছুঁড়ে মারতেই দরজায় টোকা পড়লো। অরু তাকালো। নড়লো না অবধি। আরো বেশ ক’বার টোকা পড়লে নিজেকে ঠিক করে দরজা খোলে। শুভ্র দাঁড়িয়ে। অরুর মুখ কুঁচকে গেলো। শুভ্র নরম গলায় জিজ্ঞেস করে,

-“আসি?”
-“কেন? অতিথি আপ্যায়ন শেষ?”
বড্ড ঠেস মেরে বললো। শুভ্র কিছুই বলে না। তাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে গেলো৷ বিছানায় বসে অরুর দিকে তাকালো। অরুকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,
-“আমার কিছু কথা আছে।”
অরু টললো না। শুভ্র আবার বললো,
-“বসে কথা বলি?”
অরু এ যাত্রায় পাশে এসে বসে। কিছুক্ষন চুপ থেকে জিজ্ঞেস করে,
-“তামিম কোথায়?”
-“চলে গেছে।”
অরু ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো। শুভ্র শুধরে নেওয়ার ভঙ্গিতে বললো,
-“আমি চলে যেতে বলেছি তাকে।”
অরু হাসলো এই যাত্রায়। শুভ্র এবার চুপচাপ রইলো। নিজেকে গুছিয়ে উঠতে সময় নিলো। দীর্ঘ শ্বাস ত্যাগ করে বলল,

-“অরু, আমার মনে হয়, এবার আমাদের একটা ফাইনাল ডিসিশনে এগোনো উচিত।”
অরু কপাল কুঁচকালো,
-“কি ব্যাপারে?”
-“আমাদের বিয়ের ব্যাপারে।”
অরু চুপটি মেরে বসে রইলো। খানিকবাদে ভোঁতা মুখে বলল,
-“কি বলার আছে এই ব্যাপারে?”
-“অনেক কিছুই।”
শুভ্র গা ছেড়ে নরম হয়ে বসে। সময় নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। অরুর সামনে হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসলো। অরু অবাক হলো না। এমন আগেও বেশ ক’বার শুভ্র করেছে। অরু তাকালো। শুভ্র এবার অবাক করা কান্ড ঘটালো। তার হাত দু’খানা টেনে নিজের গালের কাছটায় ধরলো। অরু চোখ বড়সড় করে চাইলো। শুভ্র সেই নজরের ধার ধারে না। কোমল গলায় বলে,

-“অরু, আমি জানি, ম্যারেজ ইজ নট আ জোক। আমি তা ভাবিও না। বছর খানেক আগে করা ঘটনার জন্য আমি কি করে কি বলে মাফ চাইবো আমি জানি না। ইভেন, তোমার এখানে আসার পরেও আমার ব্যবহারও তোমার প্রতি খুব একটা ভালো ছিলো না। আমি বুঝতে পারছি। অরু, আ’ম স্যরি। আ’ম হার্টফুলি স্যরি টু ইউ।”
অরু চমকেছে ভারি। বিস্ময়ের আলোকছটা মুখে ছড়িয়ে। মেয়েটা কি বলবে খুঁজে পেলো না। অদ্ভুত চোখে চেয়ে থাকলে শুভ্র বললো,
-“আমাদের একটা সিদ্ধান্তে এগোনো উচিৎ। এভাবে জীবন চলে না। তিন বছর তো হয়েছেই। বরং আরো বেশি। আর কত? শুধু শুধু একটা সম্পর্ক এমন করে ঝুলে রয়েছে। মাঝ থেকে আমরা বাঁধা পড়ে আছি।”
-“আপনি কি চাইছেন?”
-“একটা মিউচুয়াল ডিসিশন। দ্যাটস্ ইট।”
অরু কপাল কুঁচকায়। শুভ্র স্পষ্ট করে বলল,
-“অরু, আমি সোজাসাপটাই জিজ্ঞেস করি, তুমি কি চাও? বিয়েটা টেকাতে চাও নাকি শেষ করতে চাও?”
মেয়েটা চমকে উঠলো। শেষ করতে চায় মানে? এভাবে শেষ করে দেবে? কিসব বলছে? বিয়েটা মশকরা নাকি? যেভাবেই বিয়ে হোক, হয়েছে তো! অরু তৎক্ষনাৎ মাথা নাড়ালো,

-“শেষ করতে চাইবো কেন?”
-“সম্পর্কে থাকতে চাও?”
অরু মিনমিন করে বলল,
-“চাই।”
শুভ্র চোখ সরালো। মাথা নুইয়ে ক্ষীণ দৃশ্যমাণ ঠোঁটের কোণের ফিচলে হাসিটুকুন সরিয়ে নিলো আলগোছে। বড়ো দক্ষতার সহিত। পরপর গম্ভীর গলায় বলল,

-“আমি তোমার ব্যপারে জানতে চাই। তোমার সাথে তারা কি করেছিলো ঠিক? এই দূরত্বটা কেন তাদের সাথে তোমাদের? আই ওয়ান্ট টু নো।”
অরু চমকে উঠলো। এসব কেন জানতে চাইছে শুভ্র? তার কালো অতীত কেন ঘাটতে চাইছে? আবার সবটা সামনে আসবে? অরু মরে যাবে যে! অরুর মনে হলো, সে তলিয়ে যাচ্ছে ঘন আঁধারে। আবারও সেই অতীত ভাসলো চোখে।

অর্ধসমাপ্ত

এটা পুরো টা পড়ার জন্য বই কিনতে whatsapp +8801402521946 মেসেজ করুন