Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫৫ (২)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫৫ (২)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫৫ (২)
অরাত্রিকা রহমান

রায়ানের আজ জন্মদিন এটা জানার পর মিরায়ার মন অস্থির হয়ে উঠলো সাথে সাথে। তার এখন কি করা উচিত মাথায়ও আসছিল না। একা একা কিছু বুঝতে না পেরে ঘর থেকে বেরিয়ে সবাইকে ডাকলো কিছু একটা করা যায় কিনা রায়ান আসার আগে তার প্লেন করতে।
মিরায়ার ডাকে সবাই একসাথে হলে মিরায়া রায়ানের জন্মদিনে কথা বলল। রুদ্র মাহির এই কথা জানতো তবে এতো কিছু হচ্ছে এই কয়দিন ধরে তাই কথাটা তাদের মাথা থেকেই বেরিয়ে গেছে। মিরায়া রায়ানের জন্য স্পেশাল কিছু করতে চাইছিল কিন্তু রুদ্র মিরায়াকে এমন কিছু করতে নিষেধ করলো‌।

-“মিরা, দেখ আমি বুঝতে পারছি তুই ভাইয়াকে খুশি করতে চাইছিস। কিন্তু ভাইয়া বার্থডে নিয়ে মাতামাতি তেমন পছন্দ করে না।”
মিরায়ার মুখটা রুদ্রর কথায় একদম শুকিয়ে গেল। মাহির ও রুদ্রর সাথে তাল মিলিয়ে বলল-
“ভাবি, রায়ান যদি তেমন কিছু চাইতো তাহলে আপনাকে নিজ থেকেই বলতো। যেহেতু বলে নি হয়তো চাইছে না আলাদা করে কিছু করা হোক ওর জন্য। ছোট থেকে ওকে দেখছি, কখনো বার্থডে নিয়ে উৎসাহ দেখিনি। রুদ্র ঠিকই বলেছে, রায়ানের এগুলো পছন্দ না।”
মিরায়া মাহিরের আর রুদ্রর কথার প্রেক্ষিতে বলল-

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“পছন্দের তালিকা পরিবর্তনশীল। উনি তো আমাকেও অপছন্দ করতেন। আর এখন…! যাক গে, উনার কি পছন্দ আর কি সমস্যা বার্থডে নিয়ে তা জেনে আমার কাজ নেই। আমি বউ হিসেবে তো কিছু করতেই পারি। তোমরা আমাকে সাহায্য না করতে চাইলে বাদ দেও আমি একা যা পারি করে নেব।”
রুদ্র মাহির মিরায়ার জেদ দেখে চুপ হয়ে গেল। সোরায়া মিরায়ার কথা রাখতে মাহিরের টি-শার্ট টা একটু টেনে মাহির কে ঝুঁকতে ইশারা করলো। মাহির সোরায়ার দিকে ঝুঁকে সোরায়া মাহিরের কানে ফিসফিস করে বলল-
“বুঝুন একটু, আপু তো ভালো কিছুই করতে চাইছে। আপু যাই করুক ভাইয়া খুশিই হবে আমরা সবাই জানি। একটু সাহায্য করতে কি যাচ্ছে আপনাদের।”

মাহির সোরায়ার কথা শুনে সাথে সাথে রাজি হয়ে গেল-
“আচ্ছা ভাবি, আপনি বলুন কি করতে হবে। যা চাইবেন তাই করতে রাজি।”
কথাটা বলেই মাহির সোরায়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো আর ইশারায় জিজ্ঞেস করলো-
“happy now..!?”
সোরায়া ও সাথে মুচকি হাসলো। রুদ্র মাহিরকে এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে কিছু বলতে যাবে তখনি রিমি রুদ্রর হাতের আঙ্গুলে আঙুল ছুঁইয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল-
“মেনে যান না…!”
রুদ্র রিমির কথা ফেলতে পারলো না। সেও মাহিরের কথায় সায় দিল-
“ওকে, বল তোর কি লাগবে…?”

মিরায়ার মন প্রফুল্ল হয়ে উঠলো। তারপর সবাই মিলে রাতের খাবার খেয়ে নিল অল্প করে। কিন্তু মিরায়া খায় নি রায়ানের সাথে খাবে বলে। সে রান্নাঘরে রায়ানের জন্য হালুয়া বানাচ্ছিল। সকালে রায়ান খেতে চাইলেও মিরায়া ভালো করে বানিয়ে খাওয়াই নি তাই আবার বানাচ্ছে। খাওয়া শেষে প্লেন করতে বসলে মিরায়া রুদ্র মাহির কে একটা কেক আনতে বলল আর ফুল, বেলুন আর ফেইরী লাইট দিয়ে তাদের ঘরটা সাজিয়ে দিতে বলল। কিন্তু এই রাতে ফুল পাওয়া আর সম্ভব হবে বলে মনে হলো না কারোরই। আর বেলুন নিয়ে দ্বিধায় ছিল সবাই বাচ্চাদের বার্থডে উপলক্ষে এইসব করা হয়, রায়ান এসব দেখলে বেশ রাগ করবে হয়তো এমন চিন্তা ধারা তৈরি হলো সবার মনে।
তবুও মিরায়া যা বলেছে তাই রাখা হলো। রুদ্র মাহির ওই সময় কোনো মতো কয়েকটা বেলি ফুলের মালা আর গোলাপের ব্যবস্থা করতে পেরেছিল ফুলের মধ্যে। তাছাড়া বাকি সব সহজেই ম্যানেজ হয়ে গেছিল‌।

রাত প্রায় ৯টার দিকে, মাহির রুদ্র মিরায়া আর রায়ানের ঘরটা সাজিয়ে দেয়‌ বেলুন গুলো লাল রং এর হার্ট স্যাপের বেলুন ছিল। দেয়ালে না টানিয়ে বেলুন গুলো ঘরের সম্পূর্ণ মেঝেতে ছড়িয়ে দেওয়া ছিল। আর ঘরের চারদিকে রিবন ও ফেইরী লাইট দিয়ে সাজানো। মিরায়ার ঘর সাজানো টা বেশ ভালো লেগেছে। মিরায়া কেকটা আর নিজের হাতে বানানো হালুয়া টুকু ভালো করে একটা পাত্রের সার্ভ করে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-
“আআহহহ্! ফাইনালি, সব ডান। অনেক সুন্দর লাগছে ঘরটা। উনি খুশি তো হবেন, সিওর।”
সবাই মিরায়ার দিকে তার পা থেকে মাথা অব্দি দেখলো। মিরায়া একটু সন্দেহ নিয়ে নিজের দিকে খেয়াল করল তবে কিছু বুঝতে পারলো না। রুদ্র আর মাহির চুপচাপ ঘরে থেকে বেরিয়ে গেল মিরায়াকে পাশ কাটিয়ে। মিরায়া অবাক হলো এমন আচরণে। ছেলেরা যাওয়ার পর রিমি আর সোরায়া মিরায়ার কাছে এসে তার হাত থেকে কেক আর হালুয়ার বাটি টা নিয়ে একটা টেবিলে উপর রেখে দিলো।
রিমি মিরায়ার মাথায় একটা গাট্টা মেরে বলল-

“তোর কি মাথায় আসলে কিছু আছে?”
-“আউউ.. কেন কি হয়েছে? কি করেছি আমি?”
সোরায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-
“আপু তুমি কিছু করো নি, আর এটাই সমস্যা।”
মিরায়া অবাক হলো এমন কথায় রিমি মিরায়াকে বুঝিয়ে বলল-
“আরে গাধি, ভাইয়ার বার্থডে তে এত কিছু করেছিস কিন্তু নিজেকে দেখ! সারপ্রাইজের চেয়ে যে সারপ্রাইজ যে দেয় তাকে সুন্দর লাগাটা বেশি ইম্পরট্যান্ট। ভাইয়া ঘর সাজানো দেখে না, বরং তোকে দেখে খুশি হবে… বুঝেছিস? তাই তোকে রেডি হতে হবে এখন।”

মিরায়া অবাক ও হলো সাথে বেশ লজ্জা ও পেলো। কিন্তু এরপর শুরু হলো আসল যুদ্ধ, মেয়ে জাতের অন্যতম অভ্যাস – প্রয়োজনের সময় পাড়ার জন্য তাদের কাছে উপযোগী কাপড় থাকে না। সব লাগেজ ঘাটা ঘাঁটির পরও পড়ার জন্য কিছুই মিরায়ার মনে ধরছিল না। মিরায়া এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে উঠলো –
“ধুর, রাখ তো, আমি রেডিই হবো না। পড়ার মতো কিচ্ছু নেই। ভাল্লাগে না ছাই।”
রিমি মিরায়ার অবস্থা দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। সোরায়া হঠাৎ লাগেজের একদম নিচে পরে থাকা লাল রং এর কিছু একটা দেখে তা বের করে প্রশ্ন করলো-
“এটা কি আপু? খুব সুন্দর তো…!”
মিরায়া সোরায়ার হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল তার হাতে লাল রং এর একটা শাড়ি। মিরায়া অবাক হয়ে সেটা হাতে নিয়ে দেখলো।

-“আরে একটা তো আম্মুর বিয়ের শাড়িটা। এটাকে তো সবসময় চাচির আলমারি তে দেখেছি, আমার ব্যাগে কি করে এলো?”
মিরায়া শাড়ির ভাঁজ খুলে দেখতে নিলে একটা ছোট চিরকুট পড়লো তার মাঝখান থেকে। মিরায়া চিরকুট টা তুলে ভাঁজ খুলে পড়লো-
“এটা তোর আম্মুর তরফ থেকে তোর উপহার মা, চাচি তোকে কিছু দিতে পারি নি তবে তোর মা দিচ্ছে। খুব যত্নে তোর মা শাড়িটা তুলে রেখেছিল, সব সময় বলতো তোর বিয়ে হলে এই শাড়িতে তোকে দেখবে। তোর আমানত তোকে বুঝিয়ে দিলাম, কখনো সম্ভব হলে মায়ের ইচ্ছে পুরন করিস।
ইতি তোর চাচি।”

মিরায়ার চোখ ছলছল করে উঠলো চিরকুট টা পড়ার সাথে সাথে। সে শাড়িটা খুলে নিজের নাকের কাছে নিয়ে একটা বড় নিশ্বাস নেল, মায়ের শরীরের স্পর্শ, মিষ্টি একটা সুবাস লেগেছে আছে যেন শাড়িটাতে। রায়ান মিরায়া কে নিয়ে আসার সময় রোকেয়া বেগম মিরায়ার লাগেজের ভিতর তার মায়ের বিয়ের শাড়িটা দিয়েছিলেন মিরায়ার মায়ের ইচ্ছে অনুযায়ী। সোরায়া চিরকুট টা নিয়ে পড়লো। যদিও তার তেমন কোন স্মৃতি মনে নেই তার মা বাবাকে নিয়ে তবে সে চাচি চাচা মিরায়ার মাঝেই তাদেরকে উপলব্ধি করতো। মিরায়া নিজেকে শক্ত দেখিয়ে কখন সোরায়ার সামনে মা বাবাকে মনে করে কাঁদত না। সোরায়া মিরায়াকে আজ কাঁদতে দেখে মিরায়াকে বলল-
“আপু…আজ আম্মুর শাড়িটা পড়বে? প্লিজ..!”

মিরায়া সোরায়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। সোরায়ার মনে কোনো বোঝা নেই তবে মিরায়ার কান্না দেখে তার খুব কান্না পাচ্ছে। রিমি পরিস্থিতি বুঝলো, তারও তো মা থেকেও নেই। তবে এখন এসবের জন্য সময় কম। রিমি দুইজনকে সামলে নিয়ে বলল-
“আচ্ছা হয়েছে‌। আন্টি এসব দেখে মনে হয় তোদের বকছেন, বুঝেছিস। এই শাড়িই পড়বি আজ। চল আমি পড়িয়ে দিচ্ছি তোকে।”
রিমি মিরায়ার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে ওকে শাড়িটা পড়িয়ে দিল। মিরায়ার ফর্সা শরীরে লাল শাড়িটা ভীষণ সুন্দর লাগছিল। মিরায়াকে সাজিয়ে তোলার পর সোরায়া দুটো বেলিফুলের মালা মিরায়ার খোলা চুলে লাগিয়ে দিলো ক্লিপ দিয়ে।

-“রিমি আপু, দেখ তো বেলি ফুলের মালা গুলো চুলে সুন্দর লাগছে না?”
-“হুম, খুব সুন্দর লাগছে ওই গুলো চুলেই থাক।”
মিরায়া নিজেকে জীবনে প্রথমবার শাড়িতে দেখলো। বাইক রাইডিং এ যাওয়ার পর শাড়ি জিনিসটা তার কাছে বেজায় বিরক্তিকর লাগতো। যেহেতু পড়তে পারে না তাই পড়েও নি কখন। আজ আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে তার প্রথমবার নিজেকে সুন্দরী মনে হলো। মিরায়া মুচকি হেঁসে নিজের গায়ের আঁচলের অংশ ঠিক করে নিয়ে দ্বিধায় রিমিকে জিজ্ঞেস করলো-

“রিমু রে, শাড়ি তো পড়ালি এটা খুলবো কিভাবে আমি?”
রিমি দুষ্টু হেঁসে মিরায়ার কানে কানে বলল-
“ওইটা তোর কাজ না, যার কাজ সে ঠিক পারবে। তুই নিশ্চিত থাক।”
কথাটা জোরে না বলার কারণ সোরায়া। মিরায়া রিমির কথা শুনে লজ্জায় লাল হয়ে গেলেও মনে মনে তার খুব টেনশন হচ্ছে। মনের চিন্তা গুলো ও উঁকি দিচ্ছে -“যদি সত্যি এমন কিছু হয় কি করবো আমি? পালাবো? না না.. চিৎকার করবো? আসতাগফিরুল্লা, না না। তো কি করবো? বললে কি উনি থামবেন?”
সোরায়া হঠাৎ রিমি আর মিরায়ার মাঝে এসে বলল-
“তোমরা আমাকে সাইড করে দিয়ে কি ফুসুরফুসুর করছো হ্যাঁ?”
মিরায়ার ধ্যান ভাঙলো। রিমি মিরায়াকে বলল-

“অনেক টা সময় চলে গেছে, যার জন্য এতো কিছু সে কোথায়? মিরা রায়ান ভাই কে একটা কল দিয়ে দেখ না কখন আসবেন।”
মিরায়ার গলা এমনি তেই শুকিয়ে আছে সে রিমির কথা অনুযায়ী কাজ করতে পারবে না জানিয়ে দিল-
“আমি পারবো না কল করতে। যখন খুশি তখন আসুক গে।”
রিমি আর কি বলবে, চুপচাপ সোরায়া কে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো, রাত বাড়ছিল আর তাদের কাজ ও শেষ। সোরায়া আবার ঘরের দরজা হালকা ফাঁকা করে মাথা ঢুকিয়ে উঁকি দিয়ে বলল-
“আপু… All the best. Break a leg..!”
মিরায়া বানোয়াট হেঁসে বলল-“এমন ভাবে বলছিস যেন বাইক রেস করবো আমি। এর থেকে এইটা সহজ মনে হচ্ছে।”

রিমি ও একই ভাবে উঁকি দিয়ে বলল-
“আরে ধুর, মাথায় ঘোমটা দিয়ে চুপচাপ বসে থাক তো। আমরা গেলাম। সকালে আপডেট শুনতে আসবো।”
মিরায়া লজ্জায় ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে লিপস্টিক উঠিয়ে দরজার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল-
“তোরা যাবি এখান থেকে..!”
রিমি লিপস্টিক টা কেচ ধরে ফেলে মিটিমিটি হেসে বলল-
“যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি। দেখেছিস বনু.. আমাদের প্রয়োজন শেষ তাই ভাগিয়ে দিচ্ছে। (সোরায়া রিমির কথায় হাসলো, তবে মিরায়া বোকা বোকা চেহারা করে তাকিয়ে আছে) চল তো চলে যাই, আমাদেরও কোনো শখ নেই এখানে থাকার।”
এরপর রিমি সোরায়া কে নিয়ে মজা করতে করতে চলে গেল।
এখন সম্পূর্ণ ঘরে মিরায়া একা, অস্বস্তিরা তাকে ঘিরে ধরছে। মিরায়া কয়েকবার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের মনকে বুঝিয়ে রায়ানের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।

রাত ১১টা~
মিরায়ার মুখ ভার হয়ে আছে। রায়ানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে সে অধৈর্য হয়ে উঠেছে। ঘরের চার পাশটা দেখে আরো খারাপ লাগছিল তার, এতো সাজসজ্জার কোনো মানে দাঁড়ালো না সব শেষে। মিরায়া বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো-
“অসহ্য লোক একটা, সেই কখন গেছে এখনো আসার নাম নেই। এতো কিছু কার জন্য করলাম আমি!‌”
বেচারি এতোটা সময় নতুন বউয়ের মতো মাথায় ঘোমটা দিয়ে বসে ছিল। বিরক্ত হয়ে ঘোমটা নামিয়ে দিয়ে ঘরের সব ফেইরী লাইট অফ করে দিয়ে বারান্দায় চলে গেলো। বাইরের আবহাওয়া ভালো না, সেটা বাতাসের বেগ দেখেই মিরায়া বুঝতে পারলো। হঠাৎই বিদ্যুৎ চমকে উঠতেই মিরায়া হালকা কেঁপে উঠলো। আকাশ দেখে মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে, আর মিরায়ার বৃষ্টি খুব পছন্দ। তার মুখে মিষ্টি একটা হাসির রেখা ফুটে উঠলো। ভুলেই গেল একটু আগেও সে বিরক্ত ছিল। মিরায়া নিজের ফোন থেকে সাউন্ড বক্সে গান বাজালো-

“আমি তোমার কাছে রাখবো,
আজ মনের কথা হাজার।
দিয়ে তোমার কাজল আঁকব,
আজ সারাদিনটা আমি…
তুমি বৃষ্টি হয়ে নামলে, তুমি বৃষ্টি হয়ে নামলে
আর কমলো চিন্তা আমার…!”
আবহাওয়ার সাথে গানটা খুব সুন্দর ভাবে মিশে গেল। মিরায়া আবারো বারান্দায় চলে গেল শান্ত পরিবেশ টা উপভোগ করতে। ঠিক সেই সময় ঘরের দরজা খুলে রায়ান প্রবেশ করলো।

-“সরি হৃদপাখি…দেরি হয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারি নিইই..!”
কয়েক সেকেন্ডের জন্য ছেলেটার মাথা কাজ করা বন্ধ করলো কোনো প্রকার নোটিস ছাড়া। হঠাৎ চোখের সামনে এক রূপকথার জগতের সৃষ্টি হলো। অন্ধকার ঘর চাঁদের আলোয় আলোকিত, ঘরের বেলি আর গোলাপের মিষ্টি গন্ধ বিদ্যমান। রায়ান ধীর পায়ে ঘরের ভিতরে হেঁটে গেল যেন কোনো ঘোরের মাঝে পদার্পণ করছে। হাঁটতে গিয়ে অনুভব করলো তার পায়ে কিছু একটা বাজছে, রায়ান নিচু হয়ে অন্ধকারের মধ্যেই একটা বেলুন হাত তুলে নিলো। হাতের মাঝে বেলুন টা অনুভব করল।

-“কি এসব? মিরা.. মিরা কোথায়?”
নিজে নিজে কিছু বুঝে উঠতে না পেরে তার দুই চোখ প্রথমে তার প্রিয়সীকে খুঁজলো। রায়ান চাঁদে আলোয় সম্পূর্ণ ঘরে চোখ ঘুরিয়ে দেখলো কিন্তু মিরায়া তো ঘরে ছিল না। হঠাৎই বারান্দা থেকে একটা মিষ্টি মেয়ে গলা ভেসে এলো, কেউ বাজতে থাকা গান টা নিজের গলায় গাইছে-
“হালকা হাওয়ার মতোন, চাইছি এসো এখন…
করছে তোমায় দেখে…অল্প বেইমানি মন…
বাধবো তোমার সাথে…আমি আমার জীবন..!
…!”

রায়ান বারান্দায় দেখতেই তার হৃদস্পন্দন থেমে গেল, লাল শাড়িতে এক অপরূপা আকাশ পানে দুই হাত মেলে দিয়ে গানে গানে শরীর দোলাচ্ছে কোনো ভ্রূক্ষেপ ছাড়া। হাওয়ায় উড়ছে লম্বা কালো ঝলমলে চুল, আর লাল রঙা আঁচল। রায়ান হাত থেকে বেলুন টা কে মুক্ত করে দিয়ে বারান্দার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো। চাঁদের আলোয় আলোকিত মিরায়ার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা যেন নিজে চাঁদের রূপ ধারন করেছে। রায়ান নিজের চোখের পলক ফেলতে অক্ষম, সাথে নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতেও। কয়েক মূহুর্ত পর রায়ান বাস্তবতায় ফিরলো। তার মুখে হালকা হাঁসি ফুটে উঠলো সাথে সাথে ,এক রাশ উৎসাহ নিয়ে মিরায়ার দিকে পা বারিয়েও এগোল না। বরং বাঁকা হেঁসে ঘরের লাইট জ্বালিয়ে মিরায়ার দৃষ্টি আকর্ষন করতে চাইলো কিন্তু ঠিক তার পর মুহূর্তেই আবার কি মনে পরেই যেন চাঁদের আলো তার কাছে বেশি উৎকৃষ্ট মানের মনে হলো।

রায়ান মুখে হাঁসি রেখে ধীর পায়ে মিরায়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে পিছন থেকে মিরায়াকে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। মিরায়া পুরো পুরি অন্য ধ্যানে ছিল যার জন্য রায়ানের হঠাৎ জড়িয়ে ধরাতে সে চমকে গিয়ে জোড়সোড় হয়ে গেল। রায়ান মিরায়ার কানের লতিতে হালকা করে ঠোঁট ছুঁইয়ে বাজতে থাকা গানের লাইন গুলো গাইলো –
“চাইলে আস্কারা পাক.. বেঁচে থাকার কারণ…
চাইলে হাত ছাড়া যাক..হমম..ব্যস্ততার বারণ..
লিখবো তোমার হাতে..এএ..আমি আমার মরণ..!”
মিরায়া রায়ানের উপস্থিতিতে মুখরিত হলো তবে শেষ লাইনের তাগিতে তৎক্ষণাৎ রায়ানের দিকে ফিরে রায়ানের ঠোঁটে আঙুল রেখে রায়ান কে থামিয়ে দিতে চাইলে রায়ান মিরায়ার চোখে চোখ রেখে মিরায়ার হাত তার ঠোঁটের উপর থেকে সড়িয়ে নিয়ে আবেশে মিরায়ার ঠোঁটের কাছে ঝুঁকে গিয়ে শেষের লাইনগুলো গাইলো-

“আমি তোমার কাছেই রাখবো
আজ মনের কথা হাজার..
দিয়ে তোমার কাজল আঁকবো
আজ সারাদিন টা আমার।
তুমি বৃষ্টি হয়ে নামলে, তুমি বৃষ্টি হয়ে নামলে
আর কমলো চিন্তা আমার…!”
রায়ান নিজের কপাল মিরায়ার কপালে ঠেকিয়ে অনুভূতি জড়ানো গলায় প্রশ্ন করলো-
“আমার মরণ চাইছো..?”
মিরায়া মাথা নাসূচক নাড়ালে রায়ান আবারও প্রশ্ন করলো-
“তাহলে শাড়ি কেন পড়েছ? বিষ পরিবেশন করে যদি বলো মারতে চাও না, তাহলে তো সেটা ভারী অন্যায় মিসেস।”
দুইজনের হৃদস্পন্দন অস্থির হয়ে আছে। রায়ানের কথায় মিরায়ার অন্তরের অন্তঃস্থল কেঁপে উঠলো। মিরায়া আমতা আমতা করে রায়ানকে পাল্টা প্রশ্ন করলো-

“দে..দেরি করে এলেন কেন? আমি কতক্ষন ধরে অপেক্ষা করছি জানেন?”
রায়ান হালকা হেঁসে মিরায়ার কপালের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল-
“সরি সোনা, আমি জানতাম না আমার বউ আমাকে ঘায়েল করতে এতো তোরজোর করে বসে আছে। এর ন্যূনতম আভাস পেলে আমি স্বেচ্ছায় ঘায়েল হওয়ার অপেক্ষায় থাকতাম।”
মিরায়া পায়ের পাতার উপর ভর করে দাঁড়িয়ে রায়ানকে জাড়িয়ে ধরে কানে কানে ফিসফিস করে রায়ানকে উইস করলো-

“Happy birthday… many many happy returns of the day habby…”
রায়ান মিরায়ার উইস শুনে অবাক হলো। মিরায়াকে জড়িয়ে থেকেই জিজ্ঞেস করল-
“তুমি কিভাবে জানলে? কে বলল?”
মিরায়া মুচকি হেঁসে পা মাটিতে নামিয়ে নিয়ে রায়ান কে ঘরে নিয়ে গিয়ে ফেইরী লাইটের সুইচ টা হাতে দিয়ে বলল-
“switch it on…”
রায়ান কারণ বুঝলো না তবু মিরায়ার কথায় সুইচে চাপ দিল- সাথে সাথে লাইট গুলো জ্বলে উঠলো। রায়ান মুগ্ধ হয়ে ঘরটার চারদিকে নজর ঘুরিয়ে পিছন ফিরে মিরায়ার দিকে তাকাতেই দেখল মিরায়া একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে কেক হাতে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। রায়ান মিরায়ার দিকেই চোখ রেখে বলে উঠলো-
“মাশাআল্লাহ।”

মিরায়া লজ্জায় একটু হাসলো। রায়ান মোমবাতির আলোয় মিরায়াকে দেখতে থাকলে হঠাৎ করেই নিজে মোমবাতি হুঁ দিয়ে নিভেয়ে দিলো যেন আর কিছুটা সময় এভাবে মিরায়াকে দেখলে তার নিয়ন্ত্রণ হারাবে। রায়ান মোমবাতি হুঁ দিয়ে নিভানোর পর মিরায়া সুন্দর করে রায়ানের জন্য বার্থডে সং গেয়ে তাকে আবার উইস করলো। তার পর বিছানায় বসে একসাথে কেকটা কাটলো। মিরায়া রায়ানকে কেক খাইয়ে দিতে নিলে রায়ান মিরায়ার হাত থেকে কেক নিয়ে মিরায়াকে আগে খাইয়ে তারপর সেই এঁটো কেকটুকু খেল মিরায়ার হাত থেকে। মিরায়া হাতের ক্রিম মজা করে রায়ানের গালে লাগতে চাইলো কিন্তু তার আগেই রায়ান মিরায়ার হাত ধরে নিয়ে এক এক করে মিরায়ার আঙুলে লেগে থাকা ক্রিম গুলো লেহন দিয়ে খেয়ে নিলো। মিরায়া একটু লজ্জায় মাথা নামিয়ে নিলে রায়ান মিরায়ার চিবুক ধরে মিরায়ার মুখখানা নিজের কাছে এনে ঠোঁটের স্পর্শ নিতে চাইলে মিরায়া হঠাৎ রায়ানের থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বলল-

“আমি তো ভুলেই গেছি আরেকটা জিনিস আছে।”
রায়ান কিছু বলার আগেই মিরায়া উঠে গিয়ে হালুয়ার বাটি এনে চামচে করে রায়ানের দিকে এগিয়ে দিকে বলল-
“সকালের জন্য সরি। এটাতে চিনি দিয়েছি। সত্যি বলছি। খেয়ে দেখুন।”
রায়ান হেঁসে মিরায়া হাত থেকে চামচ টা নিয়ে আগে মিরায়ার মুখে দিলো তার পর ওটাই নিজের মুখে নিলো। রায়ানের খাওয়ার আগেই মিরায়া উৎসাহিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“কেমন হয়েছে? ভালো না?”
রায়ান হালুয়া মুখে নিয়ে খেতে খেতে মাথা হ্যাঁ সূচক নাড়িয়ে বলল-
“অনেক ভালো হয়েছে। এত ভালো হয়েছে যে মনে হচ্ছে যে বানিয়েছে তাকেই খেয়ে ফেলি।”
মিরায়া তৃপ্তির হাঁসি হাসলো। রায়ান মিরায়ার হাত থেকে হালুয়ার বাটিটা নিয়ে সাইড টেবিলের উপর রেখে মিরায়াকে কাছে টেনে মিরায়ার ঠোঁটের দিকে এগিয়ে গেলে মিরায়া রায়ানের কথায় ঠোঁট কামড়ে হেঁসে রায়ানের বুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল-

“অসভ্য লোক! শুধু এসব মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে আমাকে দুর্বল করবে সব সময়। এবার এমন কিছু হচ্ছে না, আমি রেগে আছি। আমার থেকে দূরে যান।”
রায়ান ভ্রু নাচিয়ে বলল-“ওমা, তাই নাকি? আজ আমার বউ আমার উপর দুর্বল হবে না?”
মিরায়া ভাব নিয়ে বলল- “জি ঠিক ধরেছেন, হব না দুর্বল।”
রায়ান মিরায়ার কোমর জড়িয়ে ধরে সেকেন্ডের ব্যবধানে তাকে নিজের আরো কাছে এনে বলল-
“বউ যেহেতু রাগ করেছে রাগ ভাঙাতে তো হবে। চোখ বন্ধ করো তো বেইবি।”
মিরায়া চোখ বড় বড় করে নিলো। রায়ান আবারো মিরায়াকে ধমক দিয়ে বলল-
“চোখ বড় বড় করতে বলি নি। চোখ বন্ধ করো।”
মিরায়া সাথে সাথে চোখ বন্ধ করলো। রায়ান নিজের পকেট থেকে কিছু একটা বের করে মিরায়ার সামনে ধরে বলল-

“এবার চোখ খোলো।”
মিরায়া চোখ খুলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো জিনিস টার দিকে।
-“এটা..এটা তো আপনার দেওয়া ওই ব্রেসলেট টার বক্স। এটা তো বাড়িতে ছিল। আপনার কাছে কিভাবে এলো?”
মিরায়া বক্সটা হাতে নিয়ে দেখতে লাগলো। রায়ান মিরায়ার দিকে তাকিয়ে বলল-
“এটাই আনতে ঢাকা গেছিলাম। জ্যামের জন্য দেরি হয়ে গেছে আসতে। তাই রাগ টা আমার উপর না দেখিয়ে এটার উপর দেখাও।”

মিরায়ার মুখ হঠাৎ বেজার হয়ে গেল কারণ তার মাথায় তখনি এলো, সে তো ব্রেসলেট টা বাড়িয়ে ফেলেছে। মিরায়া কাঁদো কাঁদো মুখ করে রায়ানের দিকে চাইলে রায়ান মিরায়ার মন খারাপের কারণ টা বুঝতে পারলো। তবে মনে মনে মজা পাচ্ছিল কারণ মিরায়া জানে না যে ব্রেসলেট টা রায়ানের কাছেই আছে। মূলত এ্যাকসিডেন্ট এর সময় ব্রেসলেট টা দুই টুকরো হয়ে গেছিল যেটা রায়ান বিয়ের দিন ঠিক করতে দিয়ে এসেছিল আর আজ সেটা নিয়ে আসতেই থাকে আবার ঢাকা যেতে হয়েছিল।
রায়ান মিরায়ার দিকে ঝুঁকে মিরায়াকে প্রশ্ন করলো-

“বেইবি, তোমাকে চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে আসার সময় থেকে ব্রেসলেট টা তোমার হাতে দেখি নি। আমি তোমাকে ওটা খুলতে না করেছিলাম। কোথায় এখন ওটা?”
মিরায়া একটু ভয় পেয়ে গেল কিন্তু হারিয়ে গেছে এটা শুনলে রায়ান কিভাবে নেবে বুঝতে পারছিল না বলে কিছু বলল না। রায়ান মিরায়ার ভয়ার্ত চেহারা দেখে মিরায়ার গাল টেনে বলল-
“বর কিছু দিলে সেটা যত্নে রাখতে হয়, এটা কি রাইডার কুইন রায়া জানে না?”
মিরায়ার চোখে পানি ছলছল করছিল। রায়ান রায়া বলে সম্বোধন করায় মিরায়া আরো ভয় পেয়ে রায়ান কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল-
“আমিও খুব যত্নবান, রায়াও খুব যত্নবান, কিন্তু ওটা কখন হাত থেকে খুলে পড়েছে আমি জানি না। অনেক খুঁজেছি কিন্তু পাই নি।”

রায়ান মুখ টিপে হেঁসে মিরায়াকে জড়িয়ে ধরে বলল-
“কিন্তু আমি তো পেয়েছি। না খুঁজেই পেয়ে গেছি।”
মিরায়া নিজের কান্না সাথে সাথে গিলে ফেলে রায়ানের বুকের থেকে মাথা উঠিয়ে রায়ানের থিকা তাকাতেই রায়ান মুচকি হেঁসে মিরায়াকে সোজা করে দাঁড়া করিয়ে বক্স টা খুলে ব্রেসলেট টা বের করে মিরায়ার হাত নিজের হাতে নিয়ে পড়িয়ে দিতে দিতে বলল-

“এবার যেন এটা আর না হারায়। জরুরী নয় সব সময় আমার সামনেই খুলে পড়বে আর আমি পেয়ে যাবো।”
মিরায়া রায়ানের কথা শুনে বুঝতে পারলো ওইদিন রায়ানের সামনেই এটা পড়েছে আর তাই রায়ান রায়া অস্তিত্ব সম্পর্কে জানে। মিরায়াকে ব্রেসলেট টা পড়িয়ে দিয়ে রায়ানের মিরায়ার হাতে আলতো করে চুমু খায়। মিরায়া ও কিছু বলল না। রায়ান নিজের দুই হাতের আচলায় মিরায়ার মুখটা আগলে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট মিলাতে যাবে তখনি মিরায়া রায়ানের থেকে সরে দৌড়ে বারান্দায় চলে যায়। রায়ান নিজের চুল এক হাতে খামচে ধরে বিড়বিড় করলো-
“আজকে আমার দ্বারা হবে না কন্ট্রোল, মোটেও না। কতবার পালাবে? আজ কিছুতেই মানছি না আমি হৃদপাখি। খেলা তো আজ হবেই…!”

মিরায়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে কথা গুলো বিড়বিড় করেই রায়ান মিরায়ার পিছনে দৌড়ে গেল বারান্দায়। মিরায়া বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই রায়ান মিরায়ার কাছে এসে মিরায়াকে জড়িয়ে ধরে মিরায়ার খোলা চুলে মুখ গুঁজে দিলো। মিরায়া একটু কুঁকড়ে গিলো। কিন্তু আর দূরে গেল না। রায়ান মিরায়ার চুল সরিয়ে উন্মুক্ত পিঠে ঠোঁট ছোঁয়াতেই কোমল মেয়ে দেহ শিহরণে কেঁপে উঠলো। রায়ান মিরায়াকে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা না করতে দেখে পিঠ থেকে ধীরে ধীরে ঘাড়ের দিকে উঠে এলো। ছোট ছোট চুমু যে রায়ান মিরায়ার ঘাড়ে নিজের বিচরণ করতে থাকলে মিরায়া নিজেকে একটু শান্ত করতে স্বাভাবিক প্রশ্ন করলো-
“আজ চাঁদ টা খুব জলজল করছে তাই না রায়ান?”

রায়ান দীর্ঘশ্বাস ছেঁড়ে মিরায়ার দিকে তাকালো। রায়ান বুঝতে পারলো মিরায়ার হয়তো অস্বস্তি হচ্ছে এভাবে তার কাছে আসাতে। সে চাঁদের দিকে না তাকিয়ে মিরায়ার মাথায় আলতো করে চুমু দিয়ে বলল-
“আকাশের চাঁদের থেকে আজ আমার ঘরের চাঁদটা বেশি জলজল করছে।”
মিরায়া রায়ানের কথায় হেঁসে নিজের ভার রায়ানের উপর ছেঁড়ে দিয়ে তাকিয়ে রইল আকাশ পানে। রায়ানও কিছু বলল না। নীরবতার স্থায়ীত্ব কাল বেশি হলে রায়ান মিরায়াকে জিজ্ঞেস করলো-
“Where is my birthday gift, heartbird?”
মিরায়ার হঠাৎ রায়ানের প্রশ্নের ইতস্তত বোধ করে রায়ানের দিকে ঘুরে বলল-
“বিশ্বাস করুন, আমি জানতাম না আজ আপনার বার্থডে। তেমন কিছুই প্রিপেয়ার করতে পারিনি, কোনো গিফট ও না। কি দেবো বলুন?”

রায়ান নির্দ্বিধায় নিজের চাহিদা মিরায়ার সামনে রাখলো-
“তাহলে যা প্রিপেয়ার করা দেখছি তাই দাও।”
মিরায়া অবাক বনে গিয়ে-“কিসের কথা বলছেন?”
রায়ান মিরায়াকে কাছে টেনে বলল-
“তোমার কথা বলছি। Be my birthday gift wifey..”
মিরায়ার বলার মতো আর কোনো কিছু রইল না এমন আবদারের উপর। হঠাৎ করেই এমন সময় আকাশ ফেটে বৃষ্টি নামলো। দুইজনই অবাক হয়ে আকাশের দিকে চেয়ে হেঁসে উঠলো। মিরায়া বৃষ্টির খুশিতে হাত দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ছুঁয়ে খুশি হচ্ছি দেখে রায়ান মিরায়াকে ছেড়ে দিল। মিরায়া ও মন মতো হাত ছড়িয়ে বৃষ্টি যে ভিজতে থাকলে রায়ান এক নজরে তাকে দেখতে থাকে। তার রাস্তায় সেই প্রথমবার মিরায়াকে দেখার কথা মনে পড়লো।

-“এক বৃষ্টির দিনে তোমার কাছে নিজের মন হেড়ে বসে ছিলাম আর আজ এক বৃষ্টির দিনে তুমি সম্পূর্ণ আমার। আলহামদুলিল্লাহ।”
মনে মনে কথা গুলো বলে রায়ান মিরায়ার বৃষ্টি যে ভেজা উপভোগ করতে থাকলে তার চোখে মিরায়ার ভেজা অঙ্গ গুলো আকর্ষণ করতে থাকলো রায়ান নিজের শার্টের বোতাম খুলে মিরায়ার কাছে গিয়ে বৃষ্টি তে ভিজতে থাকলে মিরায়া রায়ানের উদ্দেশ্যে বলল-
“আপনি কেন এলেন? বৃষ্টি তে ভেজার অভ্যাস আছে আপনার? জ্বর চলে আসতে পারে কিন্তু।”
রায়ান মিরায়ার বলা কিছুই যেন শুনলো না। সে নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এটা সে বুঝলেও মিরায়া বুঝতে না বলে তার অসহ্য লাগছে। রায়ান মিরায়াকে হঠাৎ টেনে নিজের বুকের উপরে ফেলে দিয়ে তার গলায় কামড়ে ধরে। মিরায়া আঁতকা আক্রমণে হতভম্ব হয়ে যায়।

-“আআহহহ্! রায়ান লাগছে আমার। কি..কি চাইছেন?”
মিরায়া রায়ানের কামড় দেওয়াতে ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো। রায়ান মিরায়ার গলায় কামড়ানো জায়গায় ভেজা চুমু খেয়ে মিরায়ার কানের দিকে ঠোঁট নিয়ে কানের লতিতে গভীর ভাবে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল-
“তুমি কি সত্যি বুঝতে পারছো না আমি কি চাইছি?”
মিরায়া স্তব্ধ হয়ে গেল। সে মনে মনে যেটার ভয় পেয়েছিল তাই হলো। মিরায়া দুই চোখ বন্ধ করে রায়ান কে বোঝানোর চেষ্টা করলো-

“রায়ান আমি…আমি এখনো…!”
মিরায়ার গলায় কথা আটকে আটকে আসছে কারণ ও যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত। রায়ানের হাতের গতি নিয়ন্ত্রণ হারালে রায়ান মিরায়ার শাড়ির আঁচল ভেদ করে মিরায়ার উন্মুক্ত কোমরে ও পেটে হাতের স্পর্শের বিচরণ ঘটতে লাগলো। মিরায়া আর কিছু বলতেও পারলো না। রায়ান গলার থেকে মুখ উঠিয়ে মিরায়ার মুখের সব জায়গায় এক এক করে চুমু দিতে থাকে- গালে, কপালে, চোখে, নাকে। মিরায়ার লাল ঠোঁট গুলো কাঁপতে থাকলো অনবরত। রায়ান তার কাঁপতে থাকা ঠোঁট জোড়ার উপর আঙ্গুল স্লাইড করতে করতে কপালে কপাল ঠেকিয়ে তার ঠোঁটে ঠোঁট ছোয়ানোর আগে অনুমতি নিতে জিজ্ঞেস করলো-“করবো?”

মিরায়া অবাক হয়ে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো-
“রা..রায়ান চৌধুরী আজ অনুমতি চাইছে?”
রায়ান মাথা নাড়িয়ে বলল-
“উঁহু, রায়ান চৌধুরীর অনুমতির প্রয়োজন পড়ে না। তোমার বর অনুমতি চাইছে। তাকে কি তোমার ঠোঁট ছোঁয়ার অনুমতি দেওয়া যায়?”
মিরায়া রায়ানের দিকে একপলক তাকিয়ে আবেশে নিজের উত্তর স্বরূপ চোখ জোড়া বন্ধ করে নিলো। কিন্তু রায়ান মানলো না।

-“এভাবে না। মুখ বলো।”
মিরায়া লজ্জায় শিটিয়ে যাচ্ছে আর বৃষ্টি কণা তো দুজনকেই ভিজিয়ে দিচ্ছে। মিরায়া কোনো উপায় না পেয়ে মাথা হ্যাঁ সূচক নাড়াল। কিন্তু রায়ান তাও জোর করলো মুখে বলার জন্য।
-“I told you to speak up.. Can I kiss you? Should I do it? Or not?”
-“Do it…. Do it…”

মিরায়া ওই অবস্থায় এমন চাপ আর নিতে পারলো না। স্বেচ্ছায় সম্মতি দিলো রায়ানের চাওয়ায়।
রায়ান এক সেকেন্ড ও দেরি না করে মিরায়ার ঠোঁট জোড়া নিজের ঠোঁট দ্বারা দখল করে নিলো। মিরায়াও রায়ানকে জড়িয়ে ধরলো। বৃষ্টির মাঝে দুজন একে অপরের মাঝে ডুবে যেতে থাকলো। রায়ানের সাথে মিরায়া কোনো ভাবেই পেরে উঠছিল না আর না রায়ান দম নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে মেয়েটাকে। এভাবেই প্রায় ৩০ মিনিট রায়ান পালা ক্রমে মিরায়ার উপরের ঠোঁট ও নিচের ঠোঁটের অমৃত মধুসুধা পান করার পর নিজের হাতের স্পর্শে মিরায়ার শরীরে নিজের রাজত্ব তৈরি করতে থাকে। মিরায়ার শরীর বাঁকিয়ে আসছে। পায়ে যেন শক্তি নেই একটুও। রায়ান নিজের হাত মিরায়ার উন্মুক্ত কোমর ও উদয়ের থেকে সরিয়ে আরো উপরের দিকে এনলে মিরায়া ছটফট করতে থাকলো কিন্তু কোনো লাভ হলো না। এমন সময় হঠাৎ বক্ষ যুগলের উপর চাপ অনুভব করেই মিরায়া নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। মিরায়াকে হঠাৎ এমন দুর্বল হয়ে যেতে দেখে রায়ান তৎক্ষণাৎ মিরায়ার ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে নিজের হাত সরিয়ে নিলো। আর শক্ত করে মিরায়াকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলো-

“কি হয়েছে সোনা?”
দুজনেই জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। মিরায়া কিছু বলার অবস্থা যে নেই। কিন্তু রায়ান নিজেও শান্ত হতে পারছে না কারণ না জেনে। মিরায়া রায়ানের বুকেই মুখ লুকিয়ে হাপাচ্ছে। রায়ান মিরায়ার চুলে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে জিজ্ঞেস করলো-
“খারাপ লাগছে?”
মিরায়া চুপ করে মাথা নাসূচক নাড়লো।
-“ব্যাথা লেগেছে?”
মিরায়া আবার মাথা নাড়লো।
-“লজ্জা লাগছে?”
রায়ান এতক্ষণে হয়তো আসল কারণ টা বুঝতে পারলো। মিরায়া হালকা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল। রায়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরায়ার মাথায় ছোট চুমু খেয়ে মিরায়াকে কোলে তুলে নিলো। মিরায়া চমকে উঠে রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরে প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে তাকাতেই রায়ান বলল-
“স্বামী স্পর্শে স্ত্রী লজ্জা পাচ্ছে এমনটা শোনা একজন স্বামীর জন্য খুব অপমানজনক।”
এই বলে ঘরের দিকে পা বাড়ালে মিরায়া আমতা আমতা করে প্রশ্ন করলো-
“ভেজা অবস্থায় ঘরে কেন যাচ্ছেন?”
রায়ান সোজা ঘরে যেতে যেতে বলল-
“তোমার লজ্জা ভাঙতে।”

ঘরের ভেতরের আবহাওয়া বাইরের আবহাওয়ার বিপরীতে পরিনত হলো কয়েক মিনিটের মধ্যে। ছেলে দেহ মেয়ে দেহের উপর বরাবরের মতো ভারী হয়ে উঠলো। মিরায়া নিজের সর্বস্বই বিলিয়ে দিলো। লজ্জার রেশ টুকুও টিকলো না বিপরীতে থাকা মানুষ টার সামনে। অনাবৃত দুটি দেহ একে অপরের মাঝে ডুবে আছে।
রায়ান মিরায়ার উপরে এসে তার গলায় মুখ গুজে রেখে বলল-
“পা মেলো পাখি…!”
মিরায়া ভয়ে রায়ান কে শেষ বারের মতো কাঁদো কাঁদো মুখে বলল-
“রায়ান একটু ধৈর্য ধরুন, প্লিজ।”
রায়ানের মিরায়ার প্রতি মায়া হলেও পুরুষ আত্মার কাছে সব বৃথা। রায়ান মিরায়ার গালে ঠোট ছুইয়ে বলল-
“বিশ্বাস করো বেইবি, আমি ভীষণ ধৈর্যশীল, শক্ত মনের মানুষ। trust me, I am..But I can’t control myself now..একটু বুঝো আমাকে এখন।”

মিরায়া রায়ানের শরীরের চাপে পড়ে এমনিতেই অষাঢ় হয়ে গেছে। নিজের শরীরের উপর তার কোনো জোর খাটছে না। অবশেষে মিলনের চূড়ান্ত মূহুর্তে রায়ান মিরায়ার কপালে চুমু দিয়ে বিসমিল্লাহ বলে তার ঠোঁট আঁকড়ে ধরলো। ব্যাথার প্রেক্ষিতে মেয়েটা আওয়াজও করতে পারলো না। কেবল তার চোখের কয়েক ফোঁটা পানি সেই ব্যাথার বহিঃপ্রকাশ হয়ে তার চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে বেরোলো। রায়ান মিরায়ার মাথায় লাগাতার হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ধীরে বলল-
“relax, relax.. It’s ok..”
মিরায়া দুই পায়ের সাহায্য রায়ানের কোমরের চার পাশ জড়িয়ে ধরলো সাথে রায়ানের উন্মুক্ত পিঠে নোট বিঁধিয়ে দিলো। রায়ান কিছু বলল না তাতে। সে মিরায়া কে নিয়েই চিন্তিত ছিল। কিছু টা সময় মিরায়াকে শান্ত করতে রায়ান স্থির থাকলো। এরপর দুটি দেহ একসাথে এক চির সুখের রাজ্যে পাড়ি জমিয়ে নিজেদের মাঝে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

রাত পার হয়ে এখন ভোর প্রায় ৩টা। রায়ান মিরায়ার উপরেই শুয়ে আছে ক্লান্ত হয়ে। মিরায়ার চোখ আধ খোলা। নিজের বুকের উপর হঠাৎ ভারী কিছুর আভাস পেতেই মিরায়া হালকা কঁকিয়ে উঠলো- “আআহহহ্!”
তারা সম্পূর্ণ শরীর ব্যাথা হয়ে আছে। মিরায়া তখনও নিজের মাঝে রায়ানের উপস্থিতি উপলব্ধি করলো। রায়ান হঠাৎ করেই মাথা তুলে আবার মিরায়ার মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে শুরু করলে মিরায়া ব্যাথা তুর গলায় কাঁদতে কাঁদতে বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো –

“আহহ্…রা..রায়ান….. please stop ! Already ৪ বার হয়ে গেছে…leave me..I can’t… please stop..!”
রায়ান মিরায়ার দিকটা বুঝতে চেয়েও পারছিল না সামলাতে। রায়ান নিজের মতো অব্যাহত থেকে আরো জোরে থ্রাস্ট করে বললো –
“Don’t stop me today, baby..I am hungry for you.. please..Aahhh…fu**..!”
মিরায়া ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে রায়ানের পিঠে নিজের না বসিয়ে দিয়ে গোঙালো-

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫৫

“আআহহহ্….! রায়ান..!”
রায়ান মিরায়ার ঠোঁটৈ ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল-
“scream my name harder baby..I love it..!”
রাতের পর ভোরটাও ভালোবাসা পূরণ সময়ের মাঝে অতিবাহিত হলো তবে চির স্মরণীয় একটা মুহূর্ত যেখানে দুইজন আলাদা মানুষের মাঝে কোনো ভাব ভেদ নেই।

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫৬