আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫৬
অরাত্রিকা রহমান
রাত গড়িয়ে ভোর এসেছে কিন্তু সময়টা যেন থেমে আছে। ঘড়ির কাঁটা চারটার কাছাকাছি। জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়া নীলচে আলো ঘরের অন্ধকারকে আলতো করে সরিয়ে দিচ্ছে। বাতাসে এখনও রাতের উষ্ণতা, নিঃশ্বাসে মিশে আছে দুইজন মানুষের কাছাকাছি থাকার নিঃশব্দ স্বীকৃতি।
রায়ান মিরায়ার উন্মুক্ত বক্ষ স্থলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। তার নিঃশ্বাস ভারী, শান্ত—যেন সারারাতের ক্লান্তি ভর করে এখন বিশ্রামে গিয়েছে। মিরায়ার চোখ আধবোজা। শরীরজুড়ে এক ধরনের অবসন্নতা ও ব্যথা আছে, তবু সে ব্যথার মাঝেই লুকিয়ে আছে নতুন জীবনের শুরুটা। উপরে রায়ানের ভারী, পুরুষালী শরীর, নড়াচড়া করার শক্তি নেই তার; চাইলেও পারছে না। তবু বিরক্তি নেই, আছে অদ্ভুত এক নিশ্চয়তা।
মিরায়া চোখের পাতা একটু নড়ায়। বুকের ওপর রাখা মাথাটার ওজন সে টের পায়। এই উপস্থিতিই তাকে স্থির করে রেখেছে। আলাদা দুইজন মানুষ, আলাদা আলাদা জীবনের পথ—তবু এই ভোরে কোনো ভাবভেদ নেই। কথার দরকার নেই, প্রমাণেরও না। নীরবতাই সব বলে দেয়।
বাইরে কোথাও আজানের ধ্বনি ভেসে আসে—দূর থেকে, খুব নরম করে। মিরায়া নিঃশ্বাস টেনে নেয়। ব্যথার সঙ্গে মিশে যায় একধরনের প্রশান্তি। রায়ানের কপালের উষ্ণতা তার ত্বকে ছুঁয়ে আছে—ভোরের শীতলতার মধ্যে একমাত্র উষ্ণ আশ্রয়।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
রায়ান মিরায়ার বুকে মাথা রেখে তার কোমর জড়িয়ে শুয়ে আছে। ভোররাতের পর মিরায়া আর নিজের সজ্ঞানে ছিল না এখনও চোখ খুলতে পারছে না মেয়েটা। কিন্তু এভাবে উন্মুক্ত হয়ে রায়ানের সাথে মিশে থাকতেও তার লজ্জা লাগছে। চোখ বন্ধ রেখেই মিরায়া কাঁপা কাঁপা হাতে রায়ানের মাথায় হাত রেখে চুলে হাত বুলিয়ে রায়ান কে ডাকার চেষ্টা করলো। হাতের আঙ্গুলের ভাঁজগুলো ও ব্যাথা করছে তার, করবে নাই বা কেন! মিরায়া যেন ছটফট না করতে পারে তাই কাল রাতে রায়ানের হাত এমন আষ্টে পিষ্টে ধরেছিল। মিরায়া রায়ানকে উঠাতে চাইলেই কি..! রায়ান তখন ও ঘোরের মাঝেই ছিল। সে মিরায়ার হাতের স্পর্শ পেতেই আরো গভীর ভাবে মিরায়ার বক্ষ যুগলের মাঝে মুখ গুজে দিলো। এহেন কান্ডে মিরায়া ব্যাথায় নিজের নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে রায়ানের চুলে নিজের হাতে শক্ত করলো মৃদু আওয়াজ করে-
“আআহহহ্…!”
মেয়েটার আওয়াজে কেমন কান্না কান্না ভাব। রায়ান কে ডাকলে আরো উল্টো পাল্টা কিছু হতে পারে এইভেবে মিরায়া আর ডাকলো না। তার কাছে আরো একবার রায়ানের বেপোরোয়া আদরের চেয়ে, তার শরীরের ভার বেশি গ্রহণযোগ্য ঠেকলো। মিরায়া কয়েক মিনিটের মাঝেই ঘুমের দেশে চলে গেল। প্রায় ১৫ মিনিট পর রায়ান চোখ খুললো- নিজেকে কোনো মতো সামলে নিয়ে মিরায়ার উপর থেকে সরে বিছানায় শুয়ে সময় দেখলো ঘড়িতে। তারপর একনজর তার পাশে শুয়ে থাকা অনাবৃত মেয়ে দেহের দিকে কিছু সময় তাকিয়ে দেখে বিজয়ের হাঁসি হাসলো যেন হিমালয় পর্বত জয় করেছে সে কাল রাতে। রায়ান মিরায়ার ছোট্ট হাতটা নিজের হাতে নিয়ে নিছক লজ্জায় রায়ান নিজের মুখটা মিরায়ার হাত দিয়ে ঢেকে ঘুম জড়ানো গলায় বিড়বিড় করলো-
“এটা কি করলে আমাকে তুমি? হুমম..? কেন নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারি না? দেখ আমার উপর তোমার এহেন প্রভাবে কষ্ট তোমারই বেশি হলো।”
রায়ান কথা গুলো বলেই মিরায়ার কপালে একটা চুমু খেয়ে বললো-
“Thank you heartbird..আমার জীবনের পূর্ণতা হওয়ার জন্য আমি তোমার কাছে চির দাসত্ব স্বীকার করে নিচ্ছি। তোমার স্বতীত্বের ভার আমার পুরুষত্বের অহংকার। আমার জন্য এতো গুলো বছর নিজেকে হেফাজতে রাখার জন্য আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। I love you পাখি। ভীষণ ভালোবাসি তোমায়।”
রায়ান কথা গুলো কাল রাতেই বলতে চেয়েছিল মিরায়াকে। কিন্তু ওই সময় মিরায়াকে সামলানোই তার ধ্যান জ্ঞ্যান হয়ে গিয়েছিল। যদিও সারা রাতে সুখের সান্নিধ্য নির্লজ্জের মতো ভালোবাসি বলেছে লক্ষ বার, আর প্রতিবারই তার সেই ভালোবাসার চিহ্ন রেখেছে মেয়েটার শরীরে। মিরায়া ও প্রশ্রয় দিয়েছে সেই লাগামহীন ভালোবাসার। রায়ান কথা গুলো বলে মিরায়ার ঠোঁটে ছোট্ট একটা চুমু খেয়ে শাওয়ার নেওয়ার জন্য মিরায়াকে কোলে নিতে যায়। কিন্তু বেচারি একটু আগেই কোনো মতে ঘুমিয়েছে এর মাঝে রায়ানের এমন কোলে নিতে চাওয়া তার পছন্দ হলো না। রায়ান গায়ে হাত দিলেই ওর দেহটা কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে আর মুখ কাঁদো কাঁদো হয়ে আসছে। রায়ানের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। সে চেষ্টা করছিল মিরায়াকে বুঝতে না দিয়ে কোলে নেওয়ার কিন্তু বুঝে উঠতে পারছিল না কিভাবে হবে সেটা।
অবশেষে না পারতে হঠাৎ করে কোলে তুলে নিলো মেয়েটাকে। মিরায়া আনমনে রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরে ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো- “আআহহহ্…ইইসস!”
রায়ান মিরায়া কপালে একটা চুমু দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল-
“একটু সহ্য করো পাখি। সরি ঘুম ভাঙানোর জন্য।”
মিরায়া একটু চোখ খুলে দেখলো রায়ান তাকে কোলে নিয়েছে আর তার শরীরেরও কিছু পড়া নেই। লজ্জা লাগলেও কিছু করার নেই মেয়েটার- যে মানুষ টার কাছে কাল সব লাজ লজ্জা বিসর্জন দিয়েছে তার সামনে লজ্জা পেলেই কি আর সে মানবে?! মিরায়ার মনে শুধু চলছিল- আবার কি চাইছে এই নষ্ট পুরুষ টা, সব তো হয়ে গেছে। এখন কি তাকে একটু ছাড় দেওয়া যায় না?
রায়ান মিরায়াকে নিয়ে সোজা ওয়াশ রুমে চলে গেল। শাওয়ার এর নিচে মিরায়াকে দাঁড়া করিয়ে শাওয়ার অন করলো। মিরায়ার শরীরের লাভ বাইট গুলোর উপরে ঠান্ডা পানির পড়তেই যেন তার শরীর জ্বলে গেল। কাঁটা স্থানে লবণ লেগেছে এমন প্রতিক্রিয়া করে মিরায়া শব্দ করে কেঁদে রায়ান কে জড়িয়ে ধরলো-
“আআআআহহহ্..!
কটেজে গিজারের ব্যবস্থা ছিল তবে গরম পানি শরীরের পড়লে অনেক বেশি জ্বলবে তাই রায়ান গিজার অন করে নি।মিরায়া জোরে জোরে কাঁদতে লাগলো একদম বাচ্চাদের মতো। কিন্তু রায়ানের কিছু করার ছিল না, ফরজ গোসল তো করতেই হবে তাদের। রায়ান মিরায়ার গালে চুমু খেয়ে ওকে শান্ত করতে বলল-
“আমার স্ট্রং বেইবি না তুমি..! আর একটু সহ্য করো। ঠিক হয়ে যাবে সোনা। আমি আছি তো। আর একটু। খুব জ্বলছে?”
মিরায়া রায়ানকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মাথা হ্যাঁ সূচক নাড়লো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে। রায়ান মিরায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিলো একটু আর যতটা সম্ভব আদুরে গলায় কথা বলল যেন মিরায়ার ভালো লাগে। মিরায়া বারবার শরীর ছেড়ে দিচ্ছে। রায়ান মিরায়া কে শক্ত করে ধরে মিরায়ার গা ভালো ভাবে ধুইয়ে দিলো। তার নিজের ও কষ্ট হচ্ছে যেহেতু মিরায়া ও কাল রাতে তার গায়ে আঁচড় কেটেছে। মিরায়া একটা সময় কান্না থামায়, তার চোখে ঘুমের ভীর। শাওয়ার শেষে রায়ান মিরায়ার গায়ে টাওয়াল জড়িয়ে নিজেও গায়েও টাওয়াল জড়িয়ে নেয়। তারপর ওয়াশ রুম থেকে ঘরে এসে মিরায়াকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে বিছানার চাদর টা পাল্টে দিলো। মিরায়া এখন আদতেও কিছু বুঝতে পারছে কিনা তা বোঝা মুশকিল। রায়ান মিরায়ার লাগেজ থেকে মিরায়ার একটা কুর্তি সালোয়ার আর ইনার নিয়ে এলো তাকে পড়াতে। মিরায়ার শরীর থেকে টাওয়াল সরিয়ে দিতেই তার মাথা হঠাৎ ঝিম ধরে গেল। পুরুষ মানুষ- এমন তো হবেই কিন্তু পরো মুহূর্তে মিরায়ার অচেতন চেহারার দিকে তাকিয়ে নিজেকে ধমকালো-
“নজর সামলা রায়ান, বউ কি চলে যাচ্ছে! একদিনে মেয়েটা আর কত নেবে? সহ্যের একটা সীমা থাকে।”
রায়ান নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে নিল। সে মিরায়ার ইনারটা হাতে নিয়ে একটু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে আনমনে বিড়বিড় করলো-
“এইটা কিভাবে পড়াব আমি..? কাল কিভাবে খুলে ছিলাম..? মনে তো পড়ছে না।”
তারপর আরো কিছু টা সময় চিন্তা করলো রাতে কিভাবে খুলে ছিল কিন্তু লাভ হলো না। তার মনে পড়ছে না। কয়েক বার চেষ্টা করে বিরক্ত হয়ে বলল-
“আমার সামনে এইগুলো পড়তে হয় কেন ওর আমি বুঝিনা। না পড়লে কত সুন্দর লাগে। স্বামীর সামনে বউ থাকবে এলোমেলো, তা না সে হাজারো পর্দা দিয়ে রাখে। আমি কি পর নাকি।”
রায়ান চেষ্টা করলো ইনারটা মিরায়াকে পড়াতে। কিন্তু বেকায়দায় পড়াতে গিয়ে মেয়েটা ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো-
“আআউউ..!”
রায়ান সাথে সাথে মিরায়াকে জিজ্ঞেস করলো-“কি..কি হলো.?”
মিরায়া চোখ খিচিয়ে বন্ধ করে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল-
“ওখানে ব্যাথা।”
মেয়েটার কোনো হুঁশ নেই কাকে কি বলছে।
রায়ান চিন্তিত হয়ে মিরায়ার বুকের দিকে তাকাতেই খেয়াল করলো গলা থেকে শুরু করে উদর অব্দি সম্পূর্ণ জায়গা হয় লাল আর নয়তো কালসিটে দাগে সাজানো। মনে হচ্ছে যেন কোনো যুদ্ধ ক্ষেত্র, যেখানে খুব ভয়ংকর যুদ্ধ চলেছে কিছু সময় আগে। রায়ান একটু লজ্জিত হলো। কিছুক্ষণ আগেই স্ত্রীর দেহের যেই অংশ তাকে আকর্ষণ করছিল এখন সেখানটা নজরে পড়তেই তার মায়া লাগছে। রায়ান নিজের গালে একটা চর দিয়ে বিড়বিড় করলো-
“এমন রাক্ষুসে কাজ কারবার কিভাবে করলি? একটু মায়া লাগে নি? বাচ্চা মেয়েটার কত কষ্টই না হয়েছে সব চুপচাপ সহ্য করতে।”
রায়ান অনুতপ্ত হয়ে ঝুঁকে মিরায়ার সম্পূর্ণ বক্ষ স্থলে ছোট ছোট চুমু দিয়ে প্রতিবার আদর করে- “সরি..সরি..!” বলতে লাগলো। মিরায়া হঠাৎ রায়ানের ঠোঁটের স্পর্শে শিহরণে গোঙাতে শুরু করল-“উফফফ্…রা.. রায়ান, প্লিজ থামুন এবার।”
রায়ান মিরায়ার বুকের থেকে মুখ উঠিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে বলল-
“সরি জান, আমি বুঝতে পারি নি তোমাকে এতো কষ্ট দিয়ে ফেলবো। আমি চাইনি তোমার কষ্ট হোক। কিন্তু আমার মাথা ঠিক ছিল না তোমাকে ওভাবে কাছে পেয়ে। I am so sorry..”
রায়ানের কাছে মেয়ে মানুষের জামা কাপড় জটিল মনে হলো। সে মিরায়াকে এগুলো পড়াতে চাইলে নির্ঘাত মেয়েটা ব্যাথা পাবে তাই আর চেষ্টা না করে নিজের একটা সাদা শার্ট এনে পড়িয়ে দিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো। ফজরের সময় চলে গেছে তবে সে তাও নামাজ পড়লো। তার পর বিছানায় এসে মিরায়াকে পিছন থেকে জাপটে ধরে তার কানের কাছে মুখ রেখে ছোট ছোট চুমু দিয়ে কাল রাতের নিজের পাগলামির জন্য ক্ষমা চাইতে লাগলো। মিরায়া ঘুমোতে পারে নি এতোক্ষণ, তার সহ্য ক্ষমতা খুব বেশি তবে সেটা শারীরিক কোনো ক্ষতের ক্ষেত্রে এই প্রথম অন্য রকম ব্যাথা অনুভব করছে সে। শরীরের বাইরে আর ভেতরে সব কিছু কেমন যেন আড়ষ্ট করে তুলছে। রায়ান কাছে এসে ক্ষমা চাওয়ার পর সাথে সাথেই সে আরো আহ্লাদি হয়ে উঠলো। ধীরে ধীরে অশ্রু সিক্ত চোখে রায়ানের দিকে ঘুরতে চাইলে রায়ান সযত্নে মিরায়াকে নিজের দিকে ফেরায়। মিরায়া চুপচাপ ছোট্ট বিড়াল ছানার মতো তার মুখ লুকিয়ে ফেলল রায়ানের বুকে। শরীর কেমন কুঁচকে যাচ্ছে। রায়ান এমন অবস্থা দেখে মিরায়াকে জিজ্ঞেস করলো-
“ঠান্ডা লাগছে পাখি?”
মিরায়া রায়ানের কোমর জড়িয়ে ধরে মাথা হ্যাঁ সূচক নাড়াতেই রায়ান কম্ফোরটার টা মিরায়ার গায়ে ভালো করে জড়িয়ে দিলো আর সাথে নিজেও মিরায়াকে জড়িয়ে ধরলো। এভাবেই ঘুমিয়ে গেল দুজনে। এতো শান্তি হয়তো দুইজনের কেউই কখনো অনুভব করে নি। কিন্তু রায়ান চেয়েও ঘুমাতে পারছিল না মিরায়ার চিন্তাতে। মেয়েটা ঘুমের মাঝেই হঠাৎ হঠাৎ কেঁপে উঠছে বারবার আর হঠাৎ করেই কাঁদছে, কাতরাচ্ছে ব্যথায়। রায়ান কি করবে কিছুই বুঝে পাচ্ছিল না, রাতে এমন কিছু হবে তার আন্দাজ ছিল না তাই কোনো প্রিপারেশন ও নেই। ব্যাথার ঔষুধ বা বার্থ কন্ট্রোল এর ঔষধ কোন টাই নেই। এখন মিরায়াকে রেখে সে বাইরে গিয়ে এগুলা নিয়ে আসবে সেই সাহস ও হচ্ছে না তার, যদি কোনো দরকার পড়ে মিরায়ার।
মিরায়া ডুকড়ে কেঁদে উঠলেই রায়ান মিরায়াকে আদর করে করে সামলে নিচ্ছে কিন্তু মনে মনে সে খুব অনুতপ্ত। অনুশোচনা হচ্ছে রাতে ওইভাবে মেয়েটাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য, বা হয়তো ভোর বেলায় আবার নিয়ন্ত্রণ হারানো টা তার উচিত হয়নি। মিরায়ার কষ্টে তার ও কষ্ট হচ্ছিল কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। চাইলেই তো আর কষ্টের ভাগ নেওয়া সম্ভব নয়।
কি জানি কি হলো হঠাৎ মিরায়া পেটে হাত চেপে ধরে জোরে জোরে কাঁদতে লাগলো। রায়ানের মাথা বিগড়ে গেলো সাথে সাথে। আচমকা ছটফট করে কান্নার কারণ বুঝতে পারছে না সে কিন্তু করবেই বা কি। রায়ান মিরায়াকে বার বার জিজ্ঞেস করতে লাগলো-
“সোনা… লক্ষ্মী বউ আমার..আমাকে ভয় দেখিও না। কি হয়েছে বলো? কোথায় ব্যাথা হচ্ছে? কিছু লাগবে তোমার?”
মিরায়ার জীবনে এসব প্রথম সে তার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে পারছে না। রায়ান এবার চিন্তিত হওয়ার পাশাপাশি বিরক্ত ও হয়ে গেল তার আর সহ হচ্ছে না মিরায়ার কষ্ট। মিরায়া কান্না থামাতে আর কান্নার কারণ জানতে রীতিমতো চেঁচিয়ে উঠলো মিরায়ার উপর-
“আরে ধুর ছাতা.. হয়েছে কি না বললে বুঝবো কিভাবে? আগে কি কখনো আমি বাসর করেছি না? যে জানবো কি হয় বউয়ের শরীরে বাসরের পর। বলতে তো হবে নাকি। কেঁদে কেঁদে টেনশন দিচ্ছে শুধু। কোথায় ব্যাথা হচ্ছে বলো আমি আছি তো..speak up damn it..!”
মিরায়া রায়ানের ধমকে আচমকা চমকে উঠলে রায়ান তাড়াতাড়ি মিরায়াকে নিজের বুকে নিয়ে বলল-
“সরি সোনা, ভয় পেয়ো না। তুমি আমাকে বলো কি সমস্যা হচ্ছে। আমি ঠিক করে দেব।”
মিরায়া রায়ানের হাত নিয়ে নিজের পেটের উপর দিয়ে একটা জায়গা পয়েন্ট করে দেখিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল-
“এই..এই জায়গায় ভী… ভীষণ ব্যাথা করছে। ভোর রাতে কম ছিল কিন্তু এখন অনেক ব্যাথা করছে। পুরোটা শরীর ই কেমন কেমন করছে। আমার ভালো লাগছে না।”
রায়ান চুপচাপ পেটের উপর হাত রেখে মিরায়ার কথা শুনছে মিরায়া ব্যাথার কবলে পড়ে রায়ানের বুকে আঘাত করতে করতে নালিশ করলো-
“কেন করলেন আমার সাথে ওইসব? কত..কতবার বলেছি থামতে আপনি একটুও ছাড় দেন নি আমাকে কাল। সারারাত ভালোবাসি বলেছেন কিন্তু আমার জন্য একটু মায়াও হয়নি। বুড়ো ধামড়া লোক সব আপনার দোষ।”
রায়ানের কিছু বলার নেই, কি উত্তর দেবে এমন কথার সে তো সত্যি মায়া দেখাই নি, বোঝেও নি এতো সিরিয়াস কিছু হবে।
রায়ান আর সহ্য করতে না পেরে মিরায়াকে ঠিক মতো কম্ফোরটার দিয়ে ঢেকে বের হলো ঔষধ আনতে। তখন সকাল ৭টা।
ড্রয়িং রুম~
রায়ান দরজা খুলে ড্রয়িং রুমে আসতেই দেখলো বাকি সবাই একসাথে চা খাচ্ছে। রায়ান কে হঠাৎ করে ঘর থেকে বের হতে দেখে সবার দৃষ্টি সেই দিকে চলে গেল। রায়ান সহ বাকিরাও অবাক। রায়ান কিভাবে রিয়েক্ট করবে বুঝে উঠতে পারছে না। খুব যে লাজুক মানুষ সে তা নয় তবে কেন যেন তার লজ্জা করছে। সবার এক দৃষ্টি দেখে একটু থতমত খেয়ে বলল-
“Go..Good morning , everyone….!”
সবাই একসাথে বলল-“Good morning…!
রায়ান এখন ভাবতে লাগলো কিভাবে বাইরে যাবে আর কেউ যদি জিজ্ঞেস করে কোথায় যাচ্ছে তাহলে কি বলবে। এরই মাঝে রুদ্র রায়ান কে প্রশ্ন করলো-
“কাল কখন এসেছিলে ভাইয়া?”
রায়ান একটু আমতা আমতা করে বলল-
“ওই..এসেছি বলতে.. রাত ১১টার দিকে হয়তো। খেয়াল নেই।”
রিমি মুচকি হেঁসে জিজ্ঞেস করলো-
“কালকের সারপ্রাইজ কেমন ছিল রায়ান ভাইয়া? বউয়ের লুক পছন্দ হয়েছে তো?”
রায়ান চুপ কিন্তু রিমির পর পর সোরায়া ও উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ভাইয়া..তুমি কি আপুকে কাল লাল শাড়িতে দেখেছিলে? লাল শাড়িতে ওকে কী অসম্ভব সুন্দর লাগছিল…তাই না?”
রায়ান মনে মনে কাল রাতের কথা মনে করে বিড়বিড় করলো-
“আমি তোর আপুকে কাপড় ছাড়াও দেখেছি—বলা বাহুল্য,
সেই অবস্থাতে সে আরো বেশি লোভনীয় সুন্দর।”
রায়ান মুখে তেমন কিছু বলল না-“আমার বউ সবকিছু তেই অসম্ভব সুন্দর। তোদের কাছেই ভিন্ন লাগে হয়তো।”
সোরায়া রিমি রায়ানের কথায় মুচকি হাসলো। ঠিক পরেই সোরায়া রায়ানের পিছন দিকে উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ভাইয়া, আপু কই? তুমি বেরোলে তো আপু কেন এলো না?”
যেই ভয় পেয়েছে রায়ান তাই হলো, ছোট বোনকে কি বলবে এখন? মাহির চুপচাপ বসে রায়ানের হাবভাব দেখছে- সোরায়ার কথায় রায়ান একটু বিব্রত হয়ে গেছে বুঝতে পেরে মাহির রায়ানকে পা থেকে মাথা অব্দি পর্যবেক্ষণ করে দেখলো- “সকাল সকাল ভেজা চুল মানে রায়ান গোসল করেছে, ভাবিও বাইরে আসছে না…হাহ্! অবশেষে…!”
মাহির চায়ের কাপ হাতে নিয়েই উঠে রায়ানের দিকে গিয়ে দেখল রায়ানের গলায় ছোট ছোট লাল দাগ। মাহির চিন্তিত কন্ঠে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলো-“ঠিক আছিস!”
রায়ান বুঝলো যে মাহির বুঝেছে তাই বন্ধু বন্ধুর মধ্যে কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলল-
“আমি তো ঠিক আছি কিন্তু মিরা.. যাক গে তোরা থাক আমি আসছি। ওর মেডিকেশন দরকার।”
মাহির হাফ ছেড়ে বলল-“যা আমি সামলে নিবো। শোন, ভাবির কি হ্যাল্প লাগবে? মানে সোরা বা রিমি কেউই যাবে?”
রায়ান সাথে সাথে মাথা নাড়িয়ে বলল- “না না, কেউ যেন ঘরে না যায়। আমি সামলে নেব ওকে, তুই ওদের সামলে নে। রুদ্র কে বল অন্য কিছুতে ব্যস্ত হয়ে যেতে।”
মাহির রায়ানের কথায় সম্মতি দিলে রায়ান কারো দিকে না দেখে সোজা বেরিয়ে যায় মেডিকেল শপের উদ্দেশ্যে।
রায়ান যাওয়ার পর সোরায়া মাহির কে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হয়েছে স্যার, ভাইয়া কোথায় গেলো?”
মাহির হেয়ালি করে সবার উদ্দেশ্যে বলল-
“দেশ স্বাধীন হয়েছে তাই মিষ্টি আনতে গেল এই আর কি।”
রুদ্র একটু হয় তো আন্দাজ করতে পারলো মাহিরের কথা তাই তৎক্ষণাৎ মাহিরের কাছে এসে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলো-
“মাহির ভাই, আমি যা ভাবছি…!”
রুদ্রর সম্পূর্ণ কথা পুরো হওয়ার আগেই মাহির হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো। রুদ্রর সাথে সাথে কাশি উঠে গেল। কোনো মতে মাথায় ট্যাপ করে শান্ত হয়ে রুদ্র চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“মিরা…মিরা ঠিক আছে?”
মাহির রুদ্রর মাঝে ভাই সুলভ চিন্তা দেখে একটু হেঁসে কাঁদে হাত রেখে বলল-
“এই চিন্তা তোর থেকে তোর ভাইয়ার বেশি সুতরাং নিশ্চিত থাক আহামরি কিছু হয় নি হয়তো।”
রুদ্রর কিছু করার নেই তাই চুপ করে গেল। এই দিকে সোরায়া রিমির কাছে গিয়ে রিমিকে জিজ্ঞেস করলো-
“আপু কিছু কি বুজতে পারছো? সবাই এমন কেন আচরণ করছে যেন চুরি করেছে?”
রিমি সোরায়াকে বুঝিয়ে বলল-“বনু, সবার একটা প্রাইভেসি থাকে। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে আমাদের কি কাজ বল। যা ইচ্ছে করুক আমাদের কি। চল বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসি।”
সোরায়া রিমির কথায় যুক্তি দেখে আর কথা পেচায়নি। স্বাভাবিক ভাবেই বলল-
“ঠিক আছে, চলো।”
রিমি হেঁসে রুদ্র আর মাহিরের উদ্দেশ্যে বলল-
“আমরা একটু বাইরে ঘুরতে যাচ্ছি। কটেজ টা দেখা হয়নি। এরপর তো চলেই যাবো ঘুরে যাই।”
মাহির সোরায়ার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করলো কিন্তু সোরায়া বুঝতে পারলো না। সে জিজ্ঞাসা সূচক মাথা নেড়ে মাহির কে ইশারা করলেন মাহির সোরায়াকে তার কথা বোঝাতে রুদ্র কে বলল-
“রুদ্র শোন আমি একটু ট্যারিসে যাচ্ছি। সকাল টা সুন্দর একটু আকাশ দেখলে ভালো লাগবে।”
কথাটা বলে মাহির সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে সোরায়া কে উপরের দিকে ইশারা দিলে সোরায়া বুঝতে পারলো। সেও রিমিকে বলল-
“আপু..বাইরে তো ঠান্ডা আমি বরং আমার চাদর টা নিয়ে আসি কেমন। একটু ওয়েট করো।”
এই বলে সোরায়া এক দৌড়ে উপরে চলে গেল। এই দিকে রিমি রুদ্রর সাথে একা থাকতে একটু ইতস্তুত বোধ করছিল বলে বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালে রুদ্রু তৎক্ষণাৎ দিয়ে রিমির হাত ধরে নিজের কাছে টেনে কোমর পেঁচিয়ে ধরে বলল-
“মিস.ডাল ভাত… I have something important to discuss with you…”
রিমি হঠাৎ ঘটনায় চমকে উঠলো। রুদ্র কখনো তাকে এভাবে স্পর্শ করেনি আজ হঠাৎ এমন কিছু হলো। রিমি ঘাবড়ে গিয়ে রুদ্রর বাঁধন থেকে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল-
“কি ইম্পরট্যান্ট কথা?”
রুদ্র আর শক্ত করে রিমিকে নিজের সাথে মিশিয়ে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল-
“এখানে না। আমার রুমে ।”
এই বলে রুদ্র রিমিকে কোলে তুলে নিয়ে নিজের ঘরে চলে যায়।
সোরায়া মাহিরের পিছন পিছন ট্যারিসে এসে মাহির কে ডাকতে লাগলো-
“স্যার…! স্যার…! আমি এসেছি। কোথায় আপনি?”
মাহির সোরায়ার পিছনেই দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সোরায়া মাহির কে সামনে না দেখে অবাক হলো। মাহির ধীর পায়ে সোরায়ার পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো সোরায়া আচমকা মাহির কে ডাকতে ডাকতে পিছন ফিরলো-
“মাহির…স..!”
-“আউউ..উমম…!”
পিছনে ফিরতেই সোরায়া মাহিরের বুক বরাবর ধাক্কা খেলো। মাহির সোরায়াকে তার ডাক পূর্ণ করতে না দিয়ে তার হাত দিয়ে সোরায়ার মুখ বন্ধ করে দিয়ে দেয়ালের সাথে মিশিয়ে দাঁড়া করিয়ে ঘোর লাগানো কন্ঠে বলল-
“ব্যাস..ততটুকুই, মাহির…!”
সোরায়া চমকে উঠে চোখ বড় বড় করে নিলো। মাহির ধীরে নিজের হাত সোরায়ার ঠোঁটে উপর থেকে সরিয়ে নিয়ে আঙ্গুলের সাহায্যে স্লাইড করে বলল-
“আমার নাম তোমার এই মিষ্টি ঠোঁটের মাঝে বেশ সুন্দর মানাচ্ছে। একদম শ্রুতিমধুর।”
সোরায়া অন্তর আত্মা শিহরণে কেঁপে উঠল মাহিরের কথায়। সে কয়েকবার পর পর পলক ফেলে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“কি..কিন্তু আ..আপনি তো আমার স্যার। স্যার ডাকবো না?”
মাহির সোরায়ার চোখে চোখ রেখে মাথা ডানে বামে নেড়ে বলল-
“কাল I love you বলে, আজ যদি অস্বীকার কর তাহলে খুব খারাপ হবে।”
সোরায়া আনমনে বলল-
“অস্বীকার করলাম কোথায়? বলেছি তো I love you..”
মাহির ঠোঁট কামড়ে হেঁসে আবেগে বলল-
“উফফফ্…! আবার বলো না…!”
সোরায়া লজ্জায় মাথা ঘুরিয়ে নিলে মাহির যেন আরো প্রশ্রয় পেল। সোরায়ার কোমর আঁকড়ে ধরে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল-
“কি হলো…! বলছো না যে?”
সোরায়রা দুই চোখ বন্ধ করে নিয়ে বলল-
“I.. Love…You..!
মাহির তৎক্ষণাৎ হাত দিয়ে বুকে খামচে ধরে আবেগ প্রকাশ করলো-“হায়েএএ…I love you infinity…!”
সোরায়া চোখ বন্ধ রেখেই ফিক করে হেসে উঠলো। মাহির সোরায়ার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা দেখে একটু কাছে ঝুঁকে গিয়ে বলল-
“কেন এলে আমার কাছে?”
সোরায়া অবাক হয়ে মাহিরের দিকে তাকালো। হঠাৎ মাহির কে এত কাছে দেখে তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে। মেয়েটা তাও পাল্টা জবাব দিল –
“আপনি ডাকলেন বলেই তো এলাম।”
মাহির একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল-
“আমি ডাকলেই আসতে হবে? কাল বলেছি না আমার থেকে দূরে থাকতে? ভয় করে না?”
সোরায়া আমতা আমতা করে বলল-
“কি…কিসের ভ..ভয়..?”
মাহির সোরায়ার কোমরে নিজের হাতের স্পর্শ আরো তীব্র করে বলল-
“ঠিক যেই ভয়ে তোমার কথা ভেঙে আসছে…যদি আমি কিছু করি?”
সোরায়া ভয়ার্ত মুখে করে জিজ্ঞেস করলো-
“কি.. কি করবেন আপনি?”
মাহির সোরায়ার মায়া মায়া মুখ টা দেখে সাথে সাথে কোমর থেকে হাতটা সরিয়ে নিয়ে দেয়ালে আঘাত করে সোরায়ার থেকে সরে গিয়ে নিজের চুল খামচে ধরে বিড়বিড় করল-
“হায় আল্লাহ.. ও ছোট কেন? একটু বড় হলে কি এমন ক্ষতি হতো।”
সোরায়া সম্পূর্ণ অবাক, ওর মাথায় ঢুকছে না একটা মানুষ নিজে ডেকে বলছে কেন এসেছ। কি অদ্ভুত! মাহির সোরায়ার দিকে এক নজর দেখে আবার ওর দিকে এগিয়ে গেল বিড়বিড় করে- “ইচ্ছে করছে আদরে আদরে শেষ করে ফেলি। পুতুল একটা।”
দুই হাতের ভঙ্গিমাও তেমন। কিন্তু আবার নিজেকে আঁটকে নিল। সোরায়া ঘাবড়ে গেছে মাহির কে দেখে।
-“স্যার..আপনার কি হয়েছে?”
সোরায়ার এই ছোট্ট প্রশ্ন টা মাহির এর গায়ে আগুন ধরিয়ে দিলো। মাহির সোরায়াকে সাথে ধাক্কা দিয়ে দেয়ালের বিপরীতে ঠেকিয়ে নিজের একহাতে দেয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আদেশ মূলক কন্ঠে বলল-
“Don’t you dare to call me- sir… You are not my student anymore…”
সোরায়া ভয় পেয়ে শুকনো ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করলো-
“তো আমি কি? আর ডাকবোই বা কি? আমাকে বলে দিন।”
মাহির নির্দ্বিধায় বলল-
“তুমি আমার হবু বউ। স্যার বাদে যা ইচ্ছা ডাকতে পারো- নাম ধরেও ডাকতে পারো।”
সোরায়া চুপ হয়ে গেল। মাহির সত্যি তাকে বিয়ে করতে চায় এইটা তার মানতে কেমন যেন লাগছিল একটু বিরম্বনার মধ্যে পড়েই বেচারি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল-
“আচ্ছা।”
-“আচ্ছা না, ডাকো।”
সোরায়া মাহিরের দিকে তাকিয়ে ভাঙা ভাঙা অক্ষরে বলল-
“মা..হির.!”
মাহির সন্তুষ্ট মনে হেঁসে সোরায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“তোমার ১৮ বছর কবে হবে?”
-“আরো দেড়-বছর পর।”
-“এতো সময় নেওয়া যাবে না। আমি এতো অপেক্ষা করতে পারবো না।”
-“মানে?”
-“ঢাকা ফেরার পরই আমি আম্মুর আব্বু আর তোমার ফেমিলির সাথে কথা বলবো। সামনের বছরই আমার বউ হয়ে আমার ঘরে উঠবে তুমি।”
-“হ্যাঁ..?”
-“হ্যাঁ… নিজেকে তৈরি করো এখন থেকে। আমি তোমাকে পরিপূর্ণ চাই। তার আগে আমি ডাকলেও আমার কাছে আসবে না। ভাইয়া যা বলেছে মাথায় রাখবে সবসময়- ছেলে জাতটা ভালো না আর তোমার ভাইয়ার পাশাপাশি আমিও তাদের একজন।”
কথাটা বলে মাহির সোরায়ার চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে চলে গেল। সোরায়া ওখানেই বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে মাহিরের শেষে বলা কথাগুলো বারবার মাথায় রিপিট করে চিন্তা করতে লাগলো। কিছু বুঝলো, কিছু বুঝলো না।
দ্বিধা থেকেই মনে মনে বিড়বিড় করলো,
-“পরিপূর্ণ ভাবে কিভাবে উনার হবো?”
এইদিকে, রুদ্র রিমিকে নিজের ঘরে এনে কোল থেকে নামিয়ে দিয়েছে। রুদ্র এতো বেপরোয়া কবে থেকে হলো তা ভাবতে ভাবতেই রিমি ব্যস্ত। রুদ্র ঘরের দরজা টা লাগিয়ে দিয়ে সোজা রিমির কাছে এসে সহজ ভাষায় বলল-
“আমি শর্তে রাজি।”
রিমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো -“কিসের শর্তে?”
-“ডাল-ভাত পাওয়ার।”
রিমি হা হয়ে আছে। ও তো মজার ছলে কাল ওসব বলেছে কিন্তু রুদ্র সত্যিই এসব নিয়ে ভেবেছে এইটাই তাকে অবাক করছে। রিমি কি বলবে তা ভেবে পাচ্ছিল না। রুদ্র রিমি দিকে খুব উৎসুক নজরে তাকিয়ে আছে দেখে রিমি রুদ্র কে বলতে চাইলো-
“রুদ্র আমি…!”
-“আমাকে বিয়ে করবেন রিমি?”
রুদ্র রিমিকে হঠাৎ কথাটা বলে বসলো। রিমির কথা অসম্পূর্ণ তার মুখেই রয়ে গেলো। রুদ্রর কথা শুনে তার মনে এক অদ্ভুত ঝড়ের সৃষ্টি হলো। বিয়ে শব্দ টা তার জীবনের সব চেয়ে অবিশ্বাস্য একটা শব্দ। বিয়ের সম্পর্কটাকে তার ঠুনকো সমাজ ব্যবস্থার বিষয় বলে মনে হয়। একটা বাঁধন যার মাধ্যমে একটা মুক্ত আত্মা আটকা পড়ে যায় চির কালের মতো।
রিমি রুদ্রর কথার কোন উত্তর নি দিয়ে রুদ্রর ঘর থেকে বের হতে উদ্যত হলে রুদ্র রিমির হাত ধরে ফেলে বলল-
“রিমি, আপনি আমাকে বাস্তবিক চিন্তা করতে বলেছিলেন। বিশ্বাস করুন বিয়ের চেয়ে বেশি বাস্তবিক আমার কাছে কিছু মনে হয় নি।”
রিমির চোখে অশ্রু ছলছল করে উঠলো। সে রুদ্র থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-
“এই বিশাল বাস্তবতা আমার জীবনের অনেক কষ্ট বয়ে এনেছে। নিজ ইচ্ছায় এই অপছন্দনীয় বাস্তবতা আপন করলে বোকামি হবে। আমায় মাফ করবেন। আমার কাল ওভাবে বলা উচিত হয় নি।”
রুদ্র রিমির সামনে এসে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলো-
“আমার অনুভূতির কি কোনো মূল্যে নেই?”
রিমি রুদ্রর দিকে তাকালো না, হয়তো আরো দূর্বল হয়ে পড়তে পারে এই ভেবে। সে সামনের দিকে নজর রেখেই বলল-
“আপনার অনুভূতির প্রতি আমার সম্মান অফুরান তবে গ্রহণ করার সাধ্য নেই।”
রিমি কথাটা বলে ঘরে দরজা খুলে চলে গেল রুদ্র জেদ ধরেই রিমিকে পিছন থেকে চেঁচিয়ে বলল-
“আমি হাল ছাড়ার পাত্র নই। আপনার আমাকে গ্রহণ করতেই হবে।”
রিমি চলে যেতে যেতেই বলল-“চেষ্টা করতে থাকুন, একটা সময় পর ঠিক হাল ছাড়বেন।”
রুদ্র চেঁচিয়ে বলল-“তা দেখা যাবে।”
প্রায় ১০মিনিট এর মাঝেই রায়ান মিরায়ার জন্য কিছু স্ন্যাকস আর প্রয়োজনীয় ঔষধ কিনে কটেজে ফিরেছিল। এর পর মিরায়াকে অল্প কিছু খাবার খাওয়ানোর পর ওষুধ গুলো খাইয়ে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। এমন অবস্থায় আর এখানে থাকা ঠিক হবে না বলে কাল সকালেই ঢাকা ফিরে যাবে সবাই এমনটাই ঠিক হলো। এর মাঝে রামিলা চৌধুরী ও ফোন করে রায়ানকে মিরায়াকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে বলেছেন। তিনি জানেন না রায়ান মিরায়ার আবারো বিয়ে হয়েছে। রায়ানও মায়ের কথায় হ্যাঁ বলেছে যে কালি তারা বাড়ি ফিরবে মিরায়ার সব জিনিস যেন তার ঘরে শিফট করে দেওয়া হয়।
বিকেলের দিকে মিরায়ার ঘুম ভাঙলে সে খেয়াল করলো পেটে আর তেমন ব্যাথা নেই শুধু শরীরের কিছু অংশে ব্যাথা করছে ওগুলো তার জন্য খুব বেশি কিছু না। মিরায়া বিছানা থেকে উঠতে চেষ্টা করলো কিন্তু পা ভর দিয়ে দাঁড়ানোর শক্তি হচ্ছে না। আশে পাশে রায়ান ও নেই যে তার সাহায্য নেবে আর তার যেই অবস্থা এখন রায়ান ছাড়া কাওকে ডাকাও যাবে না।
মিরায়া সাইড টেবিলের উপর থেকে নিজের ফোন উঠিয়ে রায়ানের নাম্বারে কল করলো। রায়ান ড্রয়িং রুমেই ছিলো- ল্যাপ্টপে কাজ করছিল একটু। মিরায়া কল দেখেই সাথে সব ফেলে দৌড়ে ঘরে ঢুকেই মিরায়াকে বসা অবস্থায় দেখে চিন্তিত হয়ে মিরায়ার গালে আলতো করে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো-
“কখন উঠেছ? আমায় ডাকলে না কেন? পেট ব্যাথা করছে? শরীর খারাপ লাগছে আবার? ডক্টরের কাছে যেতে হবে?”
মিরায়া রায়ানের প্রশ্নের ভীরে থতমত খেয়ে গেলো। রায়ান কে দেখে তার কাল রাতের কথা মাথায় আসতেই লজ্জায় মুখ দুই হাতে ঢেকে নিলো। রায়ান মিরায়ার হাত তার মুখ থেকে সরাতে চেষ্টা করে বলল-
“হৃদপাখা, ভয় দেখিও না আমাকে, প্লিজ। তোমার কি খারাপ লাগছে এখনো?”
মিরায়া বিরক্ত হয়ে ধপ করে বিছানায় শুইয়ে পড়ে কম্ফোরটার দিয়ে মুখ ঢেকে লাজুক ভঙ্গিতে বলল-
“ধুর..আপনি যান তো। প্রয়োজন নেই আপনার। আমি ঠিক আছি।”
মিরায়া ঠিক আছে এটা শুনে রায়ান হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো কিন্তু মিরায়ার লজ্জা পাওয়া দেখে সে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে মিরায়ার মুখের উপর থেকে কম্ফোরটার টা সরাতে চেয়ে বলল-
“এটা সরাও, আমি আমার বউ টাকে একটু দেখব।”
মিরায়া মুচকি হেঁসে চোখ অব্দি কম্ফোরটার সরিয়ে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে বলল-
“সরাবো না। যাবেন আপনি? আপনার লজ্জা নাই থাকতে পারে কিন্তু তাই বলে আমার থাকবে না তা তো না।”
রায়ান মুখ বাঁকিয়ে বলল-
“সারা রাত নিজের ভালোবাসায় জাগিয়ে রাখার পর যদি স্ত্রী বলে স্বামীর তাকানোতে লজ্জা করছে সেটা স্বামীর জন্য আরো বেশি অপমানজনক।”
মিরায়া চোখ বড় বড় করে তাকালেন রায়ান মিরায়ার উপর থেকে কম্ফোরটার টা টান দিয়ে উঠিয়ে ফেলে দিয়ে বলল-
“তার মানে আবারো লজ্জা ভাঙতে হবে আমার।”
মিরায়া দুই হাতে আবার মুখ লুকালো। কিন্তু তার দেহ! কম্ফোটার সরানোর সাথে সাথে রায়ানের সাদা শার্ট পরিহিত তার প্রিয়সী তার সামনে অবলকন হলো। রায়ান শুকনো ঢোক গিলে মিরায়াকে পা থেকে মাথা অব্দি দেখে নিজের মুখ দুই হাত এলোমেলো ভাবে ঘষে মিরায়াকে জিজ্ঞেস করলো-
“বেইবি, শরীর ব্যথা কমেছে?”
মিরায়া নিজের মুখ থেকে তার হাত নামিয়ে নিয়ে বিছানায় উঠে বসলো পড়নের শার্ট ঠিকঠাক করে মিষ্টি হেঁসে বলল-
“হুম.. একটু কমেছে।”
রায়ান বিছানায় মিরায়া পাশে বসে মিরায়ার গালে হাত রেখে একটু দুষ্টু হেঁসে বলল-
“Good… So may I..?”
মিরায়া রায়ানের দৃষ্টি খেয়াল করলো যা তার উন্মুক্ত বক্ষ যুগলের উপর স্থির। মিরায়া রায়ানের থুতনিতে হাত রেখে মুখ উপরে তুলে চোখ বাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“You may what?”
রায়ান অতর্কিত হামলা করে মিরায়ার গলায় আর ডেস্পারেটলি ছোট ছোট ভেজা চুমু দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল-
“May I come inside you baby, please..?”
মিরায়া ভরকে গেল- সারা রাত জ্বালাতন করে আশ মেটেনি আবার কি! সে রায়ানের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল-
“আপনি কি পাগল? সমস্যা কি আপনার?”
কে শোনে কার কথা, রায়ান মিরায়ার পড়া শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলল-
“আমার সমস্যা তুই, আর সমাধান ও তোর কাছেই আছে।”
মিরায়া বুঝতে পারছে না কিভাবে রায়ান কে সামলাবে একবার ধরা দিলে আজকের রাত টাও একই ভাবে যাবে তা সে বুঝে গেছে। মিরায়া তার বুকের কাছে থাকা রায়ানের হাতটা ধরে ফেলে বলল-
“থামুন বলছি। আমার অসহ্য লাগছে এবার।”
রায়ান মিরায়ার গলা ছেড়ে উঠে মিরায়ার ঠোঁটে একটু গভীর চুম্বন করে বলল-
“বেইবি প্লিজ, আমি পারছিনা আর।”
মিরায়া রায়ান কে তার ঠোঁট ছুঁতে বাঁধা দেয়নি কিন্তু এখন সে রায়ানের কথায় রাজি হওয়ার ভুল টুকু ও করবে না। মিরায়া রায়ানের ঠোঁটে নিজ ইচ্ছায় ছোট্ট চুমু দিয়ে বলল-
“আপনি পারুন বা না পারুন, আমি এখন কিছু করতে পারবো না।”
রায়ান মিরায়াকে আশ্বাস দিয়ে বলল-
“তোমার কিছু করতে হবে না সোনা। Just breathe and exist for me.. I’ll handle you…”
মিরায়া একটু রাগ দেখিয়ে বলল-
“আপনার মাথা ঠিক নেই। সড়ুন আমার কাছে আসবেন
না একদম।”
রায়ানও হাল ছাড়ার পাত্র নয়। মিরায়ার সামনে প্রস্তাব রাখলো একটা-
“Just once… I promise একবার এর বেশি হবে না, তুমি না চাইলে। ”
মিরায়া হঠাৎ মাথায় হাত দিয়ে অজ্ঞান হওয়ার ভাব নিয়ে বলল-
“ওহ্ আল্লাহ! আমার মাথা ঘুরে। আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম।
সরি, তবে এখন জ্ঞানে থাকা খুব বিপদজনক।”
রায়ান হতাশায় মুখ বাচ্চাসুলভ মায়া মায়া করলো যেন তার পছন্দের চকলেট তাকে দেওয়া হচ্ছে না। রায়ান মুখ ফুলিয়ে বলল-
“ভালোবাসি।”
মিরায়া মুখে ভেঙচি কেটে বলল-“ভালোবাসি ২। এবার উঠতে দিন।”
এই বলে রায়ানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আঁতকা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াতেই প্রচন্ড ব্যাথায় আবার ধস করে বসে পড়লো মিরায়া। রায়ানের কাঁদো কাঁদো মুখে হঠাৎ কেঁদে গেল এক অহংকারী হাঁসি। রায়ান বিছানায় থেকে উঠে মিরায়াকে কোলে নিলো। মিরায়াও নিজের না হাঁটতে পারার অক্ষমতা কে মেনে নিয়ে রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরলো। রায়ান মিরায়ার দিকে তাকিয়ে আবারো দুষ্টু হেঁসে মিরায়ার কপালে ছোট্ট চুমু দিয়ে বলল-
“বউয়ের না হাঁটতে পাড়ার কারণ হওয়া এতো শান্তির আগে জানতাম না। Best feel ever.. Thank you সোনা, আমাকে এতো ভালো ভালো অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য।”
মিরায়া লজ্জায় রায়ানের গলায় মুখ লুকালো। রায়ান এতেও বেশ আনন্দের সাথে হেঁসে মিরায়াকে আদরের সাথে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো।
কিছুক্ষণ পর মিরায়া নিজের জামা কাপড় পড়ে নিলে রায়ান তাকে কোলে করে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এনে দাঁড়া করিয়ে দিলো যেন সে ঠিক মতো তৈরি হতে পারে। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই মিরায়া গলায় আর কলার বনের কালচে দাগ গুলো যে হাত দিয়ে কিছু একটা ভাবলো। রায়ান আয়নায় মিরায়াকে দেখে একটু অনুতপ্ত হয়ে মাথা নিচু করে নিলে মিরায়া পিছন ফিরে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হয়েছে? মাথা নিচু করলেন কেন? আমাকে দেখতে বাজে লাগছে?”
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মিরায়ার কাছে গিয়ে মিরায়াকে দাঁড়িয়ে ধরে তার মাথায় চুমু দিয়ে বলল-
“সরি পাখি, খুব লেগেছে তাই না? আর হবে না।”
কথাটা বলে রায়ান আবারো ওই দাগ গুলো যে একটু আদর করলো। মিরায়ার চোখে পানি ছলছল করছে। মিরায়া রায়ানের বুকে মাথা রেখে বলল-
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫৫
“অনুতপ্ত হবেন না। ওগুলো আপনার দেওয়া ভালোবাসার চিহ্ন। এগুলো সেই প্রমাণ বহন করে যে আমি পুরোপুরি আপনার। আমার একটুও লাগেনি, বিশ্বাস করুন। বরং নিজেকে আজ পর্ণ মনে হচ্ছে।”
রায়ানের মনে মিরায়ার এই কথা গুলো ভীষণ স্বান্তনা দিলো। রায়ান মিরায়ার মুখ নিজের দুই হাতের মাঝে নিয়ে তার ঠোঁটের মধঙসুধায় ডুব দিলো। মিরায়াও সায় দিলো তার গলা জড়িয়ে আরো কাছে টেনে নিয়ে। স্বামী স্ত্রীর বোঝা পড়া হয় তো এমনি সুন্দর হয়।
