তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৬৫
তাবাস্সুম খাতুন
ধীরে ধীরে চৌধুরী বাড়িতে যেন আগের মতো হাস্যউজ্জ্বল হচ্ছে। অতীত ভুলে গিয়ে সবাই বর্তমান নিয়ে ভাবছে। তবুও কিছু কিছু মানুষ তাঁদের পিছুটান নিয়ে পড়ে আছে। চৌধুরী বাড়ির বড়ো কর্তা তাজউদ্দিন চৌধুরী এখনো পর্যন্ত সেইসব ভুলতে পারছেনা। আগের মতো ভাইদের সাথে মিশতে পারছেনা সবসময় রুম বন্ধ থাকে নিজেকে দোষারোপ করে এই সবকিছুর জন্য। একবেলা খাই তো দুইবেলা না খেয়ে থাকে। এইভাবে কাটাচ্ছে সে দিনগুলো। মাঝে মাঝে অফিসে যাই তবে ঘুরেই চলে আসে।
জারা তার আব্বুর কাছে দুটো কথা বলতে গেলেও নানান বাহানা দিয়ে পাঠিয়ে দেই। জারা ও এখন আর যাই না। সময় দিচ্ছে তার আব্বুকে আগের অবস্থায় ফেরার জন্য। এইদিকে তিহান সে আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে যাই না। কারোর সাথে কথা বলে না। সবসময় সিমরানের কবরের কাছে বসে হাজারো না বলা কথা বলে দেই তার পাখিকে।তিহানের এই অবস্থা দেখে রুবেল তাঁদের ব্যাবসার কাজ তিহানের কাঁধে দিয়েছে। তবুও সব কাজ শেষে যেইটুকু টাইম পাই সে চলে যাই সিমরানের কবরের কাছে। এইভাবেই চলছে তাঁদের দিনকাল। রাত এখন নয়টা বেজে দশ মিনিট। জিহান রুমে বসে কাজ করছিলো, এমন সময় সামিয়া সবকিছু গুছিয়ে রুমে ঢুকলো। দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিয়ে। বেডে গিয়ে শুয়ে পড়লো।জিহান আড়চোখে সামিয়ার দিকে তাকালো।সামিয়া চুপচাপ শুয়ে আছে। জিহান নিজের ল্যাপটপ বন্ধ করে দিলো লাইট অফ করে বেডে গেলো। আচমকা সামিয়া বললো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“সিমি কেমন আছে?”
জিহান একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
“নিশানের সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই।”
সামিয়া জিহানের দিকে ফিরলো। ভ্রু কুঁচকে বললো,
“নিশান ভাই আপনার বেস্ট ফ্রেন্ড এর থেকেও অনেক উপরে। তারপরেও আপনার সাথে তার কোন যোগাযোগ নেই হাস্যকর না ব্যাপারটা!”
জিহান সামিয়ার পাশে শুয়ে বললো,
“হাস্যকর হলেও এইটাই সত্যি ম্যাডাম। নিশান সিমিকে নিয়ে পালিয়েছে ওর খবর ও নিজে না দিলে আমরা জীবনেও খুঁজে পাবো না। তুমি বেশি চিন্তা কর না কারন নিশানের কাছে সিমি সবসময় সেফ।”
সামিয়া চোখ ছোট ছোট করে বললো,
“আমি বিশ্বাস করতে পারছিনা। কারন দেশে থাকতে যা করছে ওই ন্যাসপাতি ফল এখন বিদেশে যে কি করছে আমার সিমিকে আল্লাহই ভালো জানে।”
জিহান কাশতে কাশতে বললো,
“ন্যাসপাতি ফল মানে?”
“ন্যাসপাতি ফল মানে ওই নিশান ভাইকে বলছি। ওই শালার উপরে আমার এক চিমটি লবন পরিমান ও বিশ্বাস নেই। সেখানে তো চিন্তা করা বিলাসিতা হয়ে যাচ্ছে আমার।”
জিহান নিজের হাসি চেপে রেখে বললো,
“নিশান সিমিকে তো আর এমনি এমনি আঘাত করে না। সিমি তার অবাধ্য হয় বলে আঘাত করে।”
জিহানের কথা শুনে সামিয়া উঠে বসলো বালিশ নিয়ে জিহানকে মারতে মারতে বললো,
“আপনি আমার সিমিকে সব দোষ দিচ্ছেন? এমনি কি আর বলি আপনি একটা খাটাস জবেদর ভাতার।”
জিহান বালিশ ধরে বললো,
“বউ অন্যে কাপল দের জন্য আমাদের মাঝে ঝামেলার কি দরকার? আসো একটু রোমান্স করি।”
জিহানের দিকে বালিশটা চেলে দিয়ে মুখ ভাঙিয়ে সামিয়াও বললো,
“আসো একটু লুমান্স করি সরেন আমার থেকে।”
বলে সামিয়া শুতে গেলেই আচমকা জিহান সামিয়াকে নিজের কোলে টেনে নিয়ে বললো,
“সরে আর যাবো কই? ঘুরে ফিরে তো তোমার কাছে আসবই জান।”
বলে জিহান সামিয়ার গলায় একটা চুমু দিলো। সামিয়া আবেশে চোখ বন্ধ করে নিলো। ধীরে ধীরে তারা আরো গভীরে যেতে লাগলো। সমুদ্রের অতল পানিতে ডুব দিলো।
ইতালি টাইম এখন সকাল আটটা বেজে চার মিনিট। নিশান মাত্র ওয়াশরুম থেকে সাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে। পরনে শুধু একটা সাদা টাওয়াল জড়ানো। রুমের এক পাশে থাকা কফি ম্যাকার থেকে নিজের জন্য একটা কফি বানিয়ে নিলো। কফির মগ ধরে সে বেলকুনির কাঁচের পর্দা সরিয়ে দিলো। একপাশের পার্ট খুলে বেলকুনিতে গেলো। একটা হাত বেলকুনির রেলিং এ রেখে আরেক হাত দিয়ে কফির মগ ধরে চুমুক দিতে লাগলো। চুল থেকে এখনো টুপটাপ পানি পরছে। লোম হীন বুকে থাকা ড্রাগন এর ট্যাটু গুলোতে পানির ফোঁটা লেগে আছে। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে নিশান রাস্তার দিকে। এমন সময় কিছু পড়ার শব্দ হলো। নিশান পিছে ফিরে দেখলো সিমি বেডে বসে আছে মাথা ধরে তার পাশে টি টেবিলের উপরে থাকা ল্যাম্প পোস্টটা ফ্লোরে পড়ে আছে। নিশান কফির মগ রেখে সিমির কাছে গেলো। স্বাভাবিক ভাবে বললো,
“কি হয়েছে? মাথা ধরে আছিস কেন?”
সিমি মাথা ধরে রেখেই কোন মতে বললো,
“মাথা ঘুরছে।”
নিশান সিমির পাশে বসে বলে উঠলো,
“আমি তাহলে আবারো বাবা হতে যাচ্ছি? বাহ্ বাহ্ খুব ভালো খুব ভালো।”
নিশানের এমন কথা শুনে সিমি নিশানের দিকে তাকাতেই দেখলো সে শুধু একটা টাওয়াল পড়ে আছে। সিমি চোখ বন্ধ করে বললো,
“আপনার কি কোন পোশাক নেই?”
নিশান সিমির মুখের দিকে তাকালো একটু ঝুঁকে এসে বললো,
“আছে তবে তুই নামক পোশাকে জড়িয়ে থাকতে আমার খুব ভালো লাগে।”
সিমি চোখ খুললো নিশানের চোখে চোখ পড়তেই দ্রুত চোখ নামিয়ে নিলো। তারপর বললো,
“সরে যান আমি উঠবো।”
নিশান সরলো না নেশাক্ত চাহুনিতে তাকিয়ে রইলো সিমির মুখের দিকে। সিমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। তার সারা দেহ ব্যাথায় টনটন করছে মাথাটাও ভার আবারো পড়ে যেতে নিলেই নিশান ধরে ফেলে হাঁস্কি টোনে বললো,
“কোলে আয় জান,কষ্ট কম হবে।”
সিমি কিছু বললোনা। তার বলতে ইচ্ছা করছেনা। নিশান সিমিকে কোলে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো। সিমির হাতে ব্রাশ দিলো সিমি ব্রাশ করলো যেমন তেমন করে কারন তার হাত প্রচুর ব্যাথা। ব্রাশ শেষ হতে মুখ ধুয়ে নিলো। নিশান সুন্দর করে সিমির মুখ মুছে দিলো। আবারো সিমিকে কোলে নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে বেডে বসালো। আলমারি থেকে নিজের জন্য একটা টাউজার আর টিশার্ট বাহির করে পরে নিলো সিমি মাথা নিচু করে রইলো। নিশান এইবার আলমারির উপরে থাকা ফাস্ট এইড বক্সটা আনলো। বেডে বসলো সিমির এক হাত নিয়ে সেখানে এন্টিসেপ্তিক মলম লাগিয়ে দিলো। সিমি ব্যাথায় চোখ মুখ কুঁচকে রাখছে প্রচুর জ্বালা করছে সাথে ব্যাথাও হচ্ছে। নিশান সেখানে ব্যান্ডেজ করতে করতে বললো,
“ব্যান্ডেজ কাল রাতেই করে দিতাম। তবে আমার কাজে ডিসটার্ব হতো তাই এখন করছি। আর এই কথা যেন মনে থাকে দ্বিতীয়বার এমন করলে বেড এ এক সপ্তাহ ধরে পড়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেবো বুঝেছিস?”
সিমির চোখে পানি টলমল করছে তবুও মাথা নাড়িয়ে মুখ দিয়ে একটু শব্দ বাহির করলো,
“হুম।”
নিশান এইবার আরেকটা হাত মলম দিয়ে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিলো। তারপর সিমিকে আবারো কোলে নিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে নিশান একটা চেয়ারে বসলো সিমিকে আর অন্যে চেয়ারে বসালো না। বরং নিজের কোলে বসালো। সিমির অস্বস্তি হচ্ছে সে কোনরকমে বললো,
“আমি আর একটা চে..
বাকি কথা শেষ করার আগেই নিশান সিমির চুলগুলো একসাথে করে খোঁপা করতে করতে বললো,
“অন্যে চেয়ারে বসলে ফিল পাই না। আমার কোলে বসে থাক ভালো ফিল পাচ্ছি।”
সিমি বুঝতে না পেরে বললো,
“কোলে বসে থাকলে কিসের ফিল হয়?”
নিশান সিমির চুলগুলো গুছিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস কন্ঠে বললো,
“আমার হার্টবিট এর শব্দ শোন তাহলে বুঝবি কিসের ফিল হয় আমার মধ্যে।”
সিমি কেঁপে উঠলো। নিশান প্লেটে খাবার বাড়লো। সিমির মুখের কাছে দিলো সিমি কিছু না বলে মুখে নিলো। নিশান নিজেও খেলো। সিমি খাওয়ার মধ্যে একটু নড়তেই নিশান চোখ বন্ধ করে শান্ত কণ্ঠে বললো,
“নড়িস না জানবাচ্চা চুপচাপ বসে থাক। নয়তো তোর সমস্যা হবে।”
সিমির যেন এইবার নিশ্বাস নেওয়াটাও কষ্টকর হয়ে গেলো। সিমিকে খাইয়ে আর নিজে খেয়ে প্লেটের খাবার শেষ করলো। সিমিকে কোলে নিয়েই উঠে দাঁড়ালো। নিশান আবারো উপরে উঠতে লাগলো। সোজা রুমে গিয়ে সিমিকে বেডে বসিয়ে দিয়ে বললো,
“চুপচাপ এইখানে বসে থাক। আমি কাজ করবো।”
বলে নিশান ডিভানে গিয়ে বসলো ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করতে লাগলো। সিমি আড়চোখে নিশানের দিকে তাকিয়ে তারপর টি টেবিল থেকে টিভির রিমোর্ট নিয়ে টিভি অন করলো। সাউন্ড আস্তে দিলো নিশানের দিকে তাকালো। নিশানকে কিছু বলতে না দেখে সিমি একটা ইংলিশ মুভি অন করলো। সে যদি কোরিয়ান ড্রামা চালু করতো তাহলে নিস্চিত নিশান তাকে আস্ত রাখতো না তাই একটা মুভি অন করছে। এইদিকে নিশান ল্যাপটপ রেখে বেলকুনিতে গেলো। ফোনে কল আসছে। নিশান রিসিভ করতেই ওইপাশ থেকে সাদিক বললো,
“বস আমি আমাদের পুরো TN টিম লাগিয়ে খোঁজ করছি পুরো ইতালি। তবে মেয়েটা রোম শহরে আছে। আপনার বাড়ি থেকে কিছু দূর একটা বড়ো ফ্লাট এ আছে। আমাদের কিছু টিমের লোক সবসময় খোঁজ রাখছে।”
নিশান বাঁকা হেসে বললো,
“Gd আরো কড়া ভাবে নজরদারি কর।”
সাদিক আবারো বললো,
“বস আর একটা খবর।”
“বল।”
“বস কালকে মেয়েটা আপনার বাড়ির কাছে গিয়েছিলো। আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাবির সাথে কথা বলেছিল পেপারে কি সব লিখে। আমাদের টিম এর দুইজন ছিলো আড়ালে কি কথা হয়েছে জানেনা। তবে তারা বেশ কিছু সময় কথা বলেছিল।”
নিশান শান্ত ভাবেই বললো,
তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৬৪
“আমি আচ করতে পেরেছিলাম। যাকগে আমি দেখছি এইদিকে তুই ওইদিকে দেখ। কোন সমস্যা হলে আমাকে ইনফর্ম করিস।”
বলে কল কেটে দিলো। নিশান আকাশের দিকে তাকিয়ে বড়ো বড়ো দুই তিনটা নিশ্বাস নিয়ে বললো,
“আমার দেহে নিশ্বাস থাকা কালীন আমার ইশুকে তোরা কোন ভাবেই ছুঁতে পারবিনা শালা হারামির দল।”
