Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫৭

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫৭

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫৭
অরাত্রিকা রহমান

বিকেল থেকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে মিরায়া এর মাঝে আর ঘর থেকে বেরই হয়নি লজ্জায় আর রায়ান তাকে জোর ও করে নি। একে তো ঠিক মতো হাঁটতেই পারছে না তার উপর সবার সামনে গেলে হাজারো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। এইদিকে রিমি সোরায়া অনেকবার মিরায়ার সাথে দেখা করার চেষ্টা করেছে কিন্তু রুদ্র আর মাহির এর জন্য বিভিন্ন কারণে আর দেখা করা হয়ে উঠে নি।

আজ পাহাড়ে ঘোরাঘুরির শেষ দিন, তাই সোরায়া ছোট হিসেবে একটু মজা করতে চাইছিল। সোরায়া তার ছোট্ট আবদারটা মাহিরের কাছে রাখলে মাহির ও এক কথায় সম্মতি দেয় তার ছোট্ট প্রিয়সীর কথায়। তারপর সন্ধ্যায় কটেজে বারবিকিউ এর আয়োজন করা হয়। রিমি আর সোরায়া চিকেন ম্যারিনেশন করে রেডি করে রেখেছে রুদ্র আর মাহির ও ছাদে সুন্দর করে বসার আয়োজন করেছে সাথে গ্রিল করার জন্য আগুনের ব্যবস্থা ও করেছে। রায়ান নিজের ল্যাপটপে ব্যস্ত, বেচারা জ্ঞান ফেরার পর থেকে চার দিক থেকে কাজের চাপে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। সাইটের কাজ সম্পূর্ণ হতে আর খুব একটা সময় লাগবে না তাই শেষের দিকের কাজগুলো গুছিয়ে নিতে রায়ান একটু ব্যস্ত।
সব ঠিক মতো গোছানো হয়ে গেলে সোরায়া রায়ানের কাছে গিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো-

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“ভাইয়া ল্যাপটপ টা কি রাখবে তুমি? ঢাকা যাওয়ার পর তো কাজ আর কাজই করবে, এখন অন্তত এই সময়টা উপভোগ করো। আর সকাল থেকে আপুর দেখা নেই। আমার আপু কে তোমার কাছে বিয়ে দিয়ে কি পর করে দিয়েছি নাকি? তার দেখা ও কি মিলবে না এখন?”
রায়ান কি বলবে না বুঝে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাহিরের দিকে তাকিয়ে ইশারায় কিছু বলল। মাহির সোরায়ার কথায় মুচকি হেঁসে রায়ানের ইশারা খেয়াল করল। কিন্তু এইবার নিজের প্রিয়সীর তালেই তাল মিলালো-
“তাই তো রায়ান, আমরা ভাবিকে এখন আমাদের মাঝে চাই। ভালোয় ভালোয় নিয়ে আয় নাহলে রিমি আর সোরায়াই গিয়ে নিয়ে আসবে।”
সোরায়া আর রিমি চেঁচিয়ে উঠলো-

“অবশ্যই।”
রিমি উল্টো বারিয়ে বলল-
“বনু চল, তুই আর আমিই যাই। ভাইয়া যেহেতু কাজ করছেন বিরক্ত না করাই ভালো।”
-“ঠিক আছে চলো রিমি আপু। ভাইয়া তুমি কাজ করো। আমরাই যাচ্ছি।”
সোরায়া আর রিমি মিরায়াকে আনতে নিচে যেতে উদ্যত হতেই
রায়ান চট জলদি ল্যাপটপ বন্ধ করে ধপকরে দাঁড়িয়ে গেলো-
“ওই Wait, wait, wait, wait…!”
রিমি সোরায়া দাঁড়িয়ে গেলে রায়ান মাহিরের দিকে বিরক্ত মুখে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো-
“এক মাঘে শীত যায় না। সময় আমারও আসবে তখন দেখবো কি করিস তুই।”
মাহির কোনো পাত্তা না দিয়ে নিজের মতো ব্যস্ত হয়ে পড়লে রায়ান রিমি আর সোরায়া কে পিছনে ফেলে নিচে নামতে নামতে বলল-
“তোরা থাক এখানেই। আমার বউ কে আমিই আনতে যাচ্ছি।”
সোরায়া আর রিমি রায়ান আচরণে মুখ টিপে হেঁসে আবারো নিজের জায়গায় গিয়ে বসলো।

মিরায়া মুখ ভার করে জানালা দিয়ে তাকিয়ে আকাশ দেখছে। শরীরের ব্যাথা কমেছে অনেকটা কিন্তু কিছু একটা নিয়ে মন মেজাজ ভালো নেই, হয়তো সকাল থেকে কারো মুখমুখি হয় নি বা কথা বলে নি এই জন্য। রায়ান দরজা খুলে ঘরে ঢুকলে মিরায়া একনজর রায়ানের দিকে তাকিয়ে আবার জানালার বাইরে মন দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ঘরে এলেন যে? বাইরে কি হচ্ছে?”
রায়ান ধীর পায়ে মিরায়ার কাছে এসে বলল-
“দেখবে চলো কি হচ্ছে বাইরে। আমার চোখ দিয়ে তো আর তুমি দেখতে পাবে না।”
মিরায়া অশ্রু সিক্ত চোখে রায়ানের দিকে তাকালো কিন্তু কিছু বলল না যেন তার পরিস্থিতির জন্য অভিযোগ জানাচ্ছে। রায়ান মিরায়ার চোখের কথা ভালোই বুঝতে পারলো। কিন্তু তার কিছু করার নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরায়াকে কোলে তুলে নিতে চাইলে মিরায়া গম্ভীর কন্ঠে বলল-

“খবরদার কোলে তোলার চেষ্টা করবেন না।”
রায়ান থেমে গিয়ে সোজা হয়ে বলল-
“সোরা আর রিমি আসতে চেয়েছিল তোমাকে নিয়ে যেতে। আমি আটকেছি। এখন যদি আমার সাথে না যাও ওরা নিতে আসবে। আমার মনে হয় না সেটা তোমার খুব একটা পছন্দ হবে বলে।”
মিরায়া রায়ানের কথার প্রেক্ষিতে বলল-
“আপনি যান আমি আসছি।”
রায়ান বুকে আড়াআড়ি ভাবে হাত বেঁধে কোমল সুরে বলল-

“আচ্ছা, যাচ্ছি। তবে তুমি আগে হাটো। তোমার পিছু পিছু আসছি।”
মিরায়া তর্ক করতে চাইলো না। চুপচাপ দরজার দিকে এক পা দুটা আগাতেই পা কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে। তাও চেষ্টা করছে স্বাভাবিক ভাবেই হাঁটতে। রায়ান মিরায়াকে নিজের উপর এমন শক্ত হতে দেখে দাঁতে দাঁত চেপে তার সামনে গিয়ে হুট করে কোলে তুলে নিয়ে বলল-
“Ok fine my little headache, I admit you can walk… But you know what- I can’t let you walk.. That’s the problem…”

মিরায়া কাঁদো কাঁদো মুখ করে রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরলো। রায়ানের কথায় মুখ বাঁকিয়ে বলল-
“আমি আপনার কোলে উঠে যাবো না বাইরে। সবাই কি ভাববে?”
রায়ান কোনো কথা না শুনে দরজার পার করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে বলল-
“এভাবে দেখলে যা ভাববে, তোমাকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখলে তার চেয়ে আরো বেশি কিছু ভাববে। শুধু শুধু সবার সামনে নিজের বর কে বদনাম করার ইচ্ছে প্রকাশ করো না বউ।”
মিরায়া মুখ বাঁকিয়ে রায়ানের থেকে চোখ সরিয়ে বিড়বিড় করলো-
“অপকর্ম করে বদনামের ভয় করা আপনার মতো নির্লজ্জ লোকের মানায় না।”

-“আমি শুনতে পেয়েছি হৃদপাখি…!”
-“আমি শোনানোর জন্যই বলেছি হাবি…!”
-“That’s more like my lady..”
রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে ছাদে উঠে গেলো।

ছাদে সবার মাঝে রায়ান মিরায়াকে কোলে নিয়ে প্রবেশ করতেই সকলে হাততালি দিয়ে উঠলো। মিরায়া লজ্জায় রায়ানের গলায় মুখ গুজে লুকিয়ে রাখলো নিজেকে। রায়ান মিরায়াকে নিয়ে গিয়ে সোজা ছাদে বিছানো ম্যাট্রেস এ বসে একটা কম্ফোরটারে নিজেদের মুড়িয়ে নেয়। সোরায়া মিরায়াকে সারাদিন পরে দেখে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলো-

“আপু, তুমি ঠিক আছো তো? শরীর ঠিক আছে? জ্বর এসেছে তোমার?”
মিরায়া হালকা হেঁসে বলল-“ঠিক আছি। লম্বা জার্নির পর একটু খারাপ লাগছিল তাই ঘুমিয়েছি একটু।”
তারপর আর কেউ কোনো প্রশ্ন করেনি। সবাই চিকেন বারবিকিউ করছে, মিরায়াও আগুনের কাছে যেতে চেয়েছিল কিন্তু রায়ান ওকে যেতে দিচ্ছিল না। কিন্তু মিরায়া জেদ দেখিয়ে বারবিকিউ গ্রিল করতে চাইলো। যেই না সে রায়ানের হাতের বাঁধন ছেড়ে উঠতে যাবে তখনই উরুর মাঝে ব্যাথার অনুভূতিতে আবার নিজ জায়গায় বসে পরলো মেয়েটা। রায়ান মিরায়ার এই অবস্থা দেখে করুণা করে একটু বাঁকা হেঁসে বলল-

“কি হলো বেইবি? উঠতে পারছো না বুঝি?”
মিরায়া বাঁকা চোখে বিরক্তি সহ রায়ানের দিকে তাকাতেই রায়ান নিজের দুই হাত দুই দিকে উঁচু করে তুলে ধরে নিরপরাধ ঠাওর করালো নিজেকে। মিরায়া আবার সামনের দিকে তাকাতেই রায়ান মিরায়া কে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে কানের লতিতে চুমু দিয়ে বলল-
“কালকের পর তোমার না হাঁটতে কষ্ট হওয়ার ব্যাপারটা এতো সুন্দর কেন আমাকে বলতে পারে হৃদপাখি?”
মিরায়া রায়ানের ঠোঁটের থেকে একটু মাথা কাত করে নিয়ে বলল-
“আপনি একটা অসভ্য তো, তাই আপনার কাছে সুন্দর লাগছে ব্যাপারে টা।”

রায়ান ঠোঁট কামড়ে হাসলো। এরপর সবাই গল্প করতে করতে বারবিকিউ করে খাচ্ছিল। হঠাৎই সোরায়া রুদ্র কে গান গাইতে জোর করলে রুদ্র নিজের গিটার টা নিয়ে এলে একটা ভালো গানের আড্ডা জমে উঠলো। মাঝে মাঝে রায়ান মিরায়া ও গাইছে আবার মাহির সোরায়া ও গুনগুন করছে। সোরায়া মাহির পাশাপাশি বসেছিল‌। এমন সময় হঠাৎ সোরায়া নিজের হাতের উপর কিছু একটার ছোঁয়া অনুভব করতেই দেখলো মাহির নিজের অনামিকা আঙুল দিয়ে রেখেছে সোরায়ার হাতে। মেয়েটা মুচকি হেসে নিজের হাতের উপর চাদর ফেলে দিলো যেন কারো নজরে না পড়ে এই দৃশ্যটা।

কিন্তু এতে মাহিরের প্রেমীক মনের যেন অবনতি হলো। মাহির হঠাৎ করেই সোরায়ার হাত ধরে ফেলল শক্ত করে। কম সময়ে ঘটনাটা হয়েছে বলে সোরায়া ও অবাক হয়ে সাথে সাথে চোখ বড় বড় করে শিরদাঁড়া সোজা করে বসে মাহিরের দিকে প্রশ্ন সূচক দৃষ্টিতে তাকালো। কিন্তু মাহির ও তার দিকে তাকিয়ে নেই বরং দিব্বি মেয়েটার নরম হাত নিজের আয়ত্তে রেখে গান বাজনা উপভোগ করছে। সোরায়া মাহিরের থেকে হাত ছাড়াতে চেষ্টা করলে মাহির উল্টো আঙুলের ভাঁজে আঙ্গুল ঢুকিয়ে বন্ধন টা আরো শক্ত করে নেয়। এই দিকে সোরায়া সবার দৃষ্টি যাচাই করছে কেউ তাদের দেখছে কিনা। মাহির নিজের হাতের বাঁধন আরো শক্ত করলে সোরায়া লজ্জায় মিটিমিটি হাসতে শুরু করে। হঠাৎ রিমি সোরায়ার দিকে একটা চিকেন এর পিস এগিয়ে দিলো।

-“বনু, এটা তুই খা‌। তোর লেগ পিস।”
কিন্তু সোরায়া কিভাবে নেবে সেটা- ডান হাত তো মাহির এর হাতে‌। বেচারি বোকা বনে গেলো পুরো এই দিকে মাহির নিজে থেকেও মেয়েটার হাত ছাড়ছে না। মাহির রিমির থেকে লেগ পিস টা নিয়ে সোরায়ার মুখের কাছে ধরে জিজ্ঞেস করলো-

“খাবে..?”
সোরায়া মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল-“উঁহু…!”
মাহির কথা শুনলো না উল্টো জোর করলো-
“আআআ করো।”
সোরায়া হা করলে মাহির সোরায়াকে খাইয়ে দেয় চিকেন টা।
রিমি সবাইকে চিকেন দিয়ে রুদ্র আর নিজের টা নিয়ে গিয়ে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বলল-

“রুদ্র নিন, এটা আপনার।”
রিমি রুদ্রর দিকে তাকাতেই খেয়াল করলো রুদ্র তার দিকেই তাকিয়ে আছে। রিমি একটু বিরক্ত হয়ে বলল-
“আমার দিকে এভাবে কেন তাকিয়ে থাকেন? এভাবে দেখলে কি যে করতে ইচ্ছে করে..! উফফফ্…!”
রুদ্র চুরি ধরা পড়েছে এমন ভাবে থতমত খেয়ে হুট করে বলল-
“আমায় অন্ধ করে দাও।”
রিমি অবাক হলো তুমি সম্বোধন শুনে সাথে কথাটাতেও-

“কিহ্…!”
রুদ্র কথা ঘোরাতে চট জলদি গিটারের স্ট্রিং এ টুংটাং সুর তুলে গান ধরলো-
“উড়বো বলে ঝাঁপ দিয়েছি
মরব না কে জানে
এই আমায় দেখে হঠাৎ এমন
চমকে ওঠার মানে …!
সে তো সবাই জানে…
সবাই জানে অংক কঠিন মিলবে না একটাও
সবাই জানে অংক কঠিন মিলবে না একটাও
আমার তোমায় দেখে আস মেটে না
কোথায় যাবে যাও..!
আমায় অন্ধ করে দাও, আমায় অন্ধ করে দাও।
দৃষ্টি কেড়ে নাও গো আমায় অন্ধ করে দাও..!
আমায় অন্ধ করে দাও, আমায় অন্ধ করে দাও।
দৃষ্টি কেড়ে নাও গো আমায় অন্ধ করে দাও..!”

গানের কলিটা গাইতেই সবাই তালি দিতে শুরু করলে‌ রুদ্র রিমির দিকে ঝুঁকে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল-
“আমার আপনাকে দেখে আসি মেটে না এখানে আমার কি করার আছে বলুন? চাইলে অন্ধ করে দিতে পারেন।”
রিমি রুদ্রর কথা শুনে না চাইতেও মুচকি হেঁসে দিলো। রুদ্র ও সাথে হেঁসে উঠলো। এভাবেই অনেক টা সময় কেটে গেলে রায়ান খেয়াল করলো ছাদের কুয়াশায় আর ঠান্ডা বাতাসে মিরায়ার শরীর মৃদু কাঁপছে। সে চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো-

“হৃদপাখি..! তোমার কি খারাপ লাগছে? শরীর কাঁপছে কেন?”
-“না, ওই ঠান্ডা পড়েছে তো তাই।”
-“আচ্ছা নিচে চলো। অনেক হয়েছে আর থাকতে হবে না ছাদে। ঠান্ডা লেগে যাবে।”
মিরায়া সম্মতি দিলে রায়ান সবার উদ্দেশ্যে বলল-
“এই তোরা কি আরো থাকবি এখানে? ঠান্ডা পড়ছে, এখন নিচে যাওয়া দরকার। কাল আবার ঢাকায় যাওয়ার জন্য রওনা দিতে হবে।”
সোরায়া বাচ্চা মেয়ে তাই জেদ ধরলো-

“না না, আরো একটু থাকি না ভাইয়া, প্লিজ।”
রায়ান সোরায়াকে কিছু বলল না কিন্তু মিরায়া শাসন করলো-
“কি আরো থাকবে হ্যাঁ? দেড়মাস এর বেশি হয়েছে পড়াশোনার খবর নেই। ঢাকা যাওয়ার পর পরই যে পরীক্ষায় বসতে হবে সেই খেয়াল আছে?”
সোরায়া পড়ার কথা উঠতেই মুখ ভার করে নিলে মাহির সোরায়াকে দেখে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে মিরায়াকে বলল-
“সেটা নিয়ে ভাববেন না ভাবি। আমি না হয় ঢাকা ফেরার পর কিছু দিন ওকে গাইড করবো। আশা করি গ্যাপ ফিল হয়ে যাবে।”
মিরায়া মজা করে বলল-

“সে কি মাহির ভাই, আপনি জানেন না? আপনার ছাত্রী পড়াশোনার ক্ষেত্রে ভীষণ অলস আর অমনোযোগী।”
মাহির সোরায়ার দিকে তাকিয়ে অবাক ভাব ধরলো-
“তাই নাকি?”
সোরায়া মাথা নিচু করে নিজের অপমান সহ্য করছে দেখে মাহির হেঁসে মিরায়াকে বলল-
“কি করে জানবো ভাবি বলুন তো, আমার ক্লাসে তো সম্পূর্ণ মনোযোগ রাখে আমার উপর। তাই মনে হয় নি কখন যে সে পড়া চোর।”
সোরায়া একটু লাজুক মুখে মাহিরের দিকে তাকালে রায়ান সবাইকে সব গুছিয়ে নিচে আসতে বলে। আর সে আর ছাদে অবস্থান না করে মিরায়াকে আবারো কোলে তুলে নিয়ে নিচে নেমে আসে। মিরায়া আর কিছু বলল না রায়ানকে- জানে বলেও লাভ নেই।

মাহির রায়ান কে মিরায়াকে কোলে নিয়ে নিচে চলে যেতে দেখে একরাশ হতাশায় বিড়বিড় করলো-
“হাহ্! না আছে বউ, না আছে গরম, না আছে শরম- পুরো জীবনটাই শীত।”
সোরায়া মাহিরের কথায় হেসে উপহাস করলো-
“আহা রে…তো বিয়ে করে নিচ্ছেন না কেন?”
মাহির সোরায়ার হাত ছেড়ে দিয়ে উঠে দাড়িয়ে বলল-
“বউ আমার ছোট্ট, শীতে বড় কষ্ট। আহ্..! আর ভাল্লাগে না। এই শোনো তাড়াতাড়ি বড় হও বুঝেছ?”
সোরায়া মাহিরের দিকে তাকিয়ে হেঁসে মাথা নাড়িয়ে বলল-
“আচ্ছা..!”

মাহির সোরায়ার সামনে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দেয় সোরায়া মাহির হাতে হাত রেখে উঠে দাঁড়ালে মাহির সোরায়া কে নিজের দিকে টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“কালকের মধ্যে বড় হতে পারবে আমার জন্য প্লিজ?”
সোরায়া মাহিরের বুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে নিচে নামার জন্য সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে বলল-
“হবে না। সময় লাগবে।”
সোরায়া নেমে গেলে মাহির নিজের চুলে হাত রেখে চুল ঝাঁকিয়ে বিড়বিড় করলো- “এই সময় টাই তো দিতে পারছি না আর। কাল যদি তোমাকে বউ করে ঢাকায় নিজের বাসায় নিয়ে যেতে পারতাম সারা জীবনের মতো তাহলেই হতো।”

কিছুক্ষণ বাদে রুদ্র আর রায়ান দুই ভাই একসাথে হয় ড্রয়িং রুমে। রুদ্র রায়ানকে কিছু বলতে ডেকেছে। কিন্তু প্রায় ১০ মিনিট ধরে রায়ান রুদ্রর সামনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও রুদ্র রায়ানকে কিছুই বলতে পারছে না। রায়ান এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে বলল-
“তোর যদি কিছু না বলার থাকে আমি আমার বউয়ের কাছে যেতাম আর কি! রাত হয়েছে যথেষ্ট।”
রুদ্র ও বিরক্ত বোধ করছে তা বলতে চাইছে তা বলতে না পেরে-
“সারা দিন এতো বউ বউ করো কেন ভাইয়া? আমি কি তোমরা কেউ না? একমাত্র ছোট..!”
-“হয়েছে, আর ইমোশনাল হতে হবে না। বলবি এবার কি হয়েছে নাকি?”
-“ভাইয়া, আমি না রিমিকে প্রপোজ করে ফেলেছি।”
রায়ান হতবাক হয়ে রুদ্রর দিকে তাকালে রুদ্র আরো বলল-

“প্রপোজ তো করেছি কিন্তু রিমি রাজি হচ্ছেন না। ওনার কাছে ফ্যামিলির বিষয়টাই বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে বারবার কিন্তু আমি জানি উনিও আমাকে পছন্দ করেন।”
রায়ান মাথায় হাত রেখে সোফায় বসে পড়লে মাহির যেন কি ভেবে হন্তদন্ত হয়ে এসে রায়ান কে বলল-
“রায়ান, আমি সোরায়া কে সামনের বছরই বিয়ে করবো। তুই ম্যানেজ কর যেভাবে পারিস।”
রায়ান আড় চোখে মাহিরের দিকে তাকালো। তার মাথা যেন যায় যায় অবস্থায়। রায়ান বিরক্ত হয়ে মাহিরকে বলল-
“তোর ম্যাটার বাদ, “সোরা এখনো ছোট। বড় হক আগে পরে দেখছি কতটুকু ম্যানেজ করা যায় তোর জন্য।”
মাহির রায়ানের কথায় পাল্টা বলল-“ওর বড় হতে হতে যদি আমি পৃথিবী থেকেই চলে যাই তাহলে?”
রায়ান স্বাভাবিক কন্ঠে বলল-“আমার মনে হয় না তুই এতো
তাড়াতাড়ি পৃথিবীকে তোর ভার থেকে মুক্তি দিবি।”

মাহির আর কিছু বলার আগে রায়ান রুদ্র কে জিজ্ঞেস করল-
“আর তুই, তুই কখন রিমি কে প্রপোজ করলি?”
রুদ্র মাথা একটু নিচু করে বলল-
“কাল রান্নাঘরে রিমির রান্না করার সময় বলেছি।”
রায়ান মাথায় হাত দিয়ে আওড়ালো –
“আমার ভাই হয়ে তুই রান্নাঘরে প্রপোজ করেছিস? তাও আবার আমার বউএর ব্রেস্ট ফ্রেন্ড কে? মান ইজ্জতের ফালুদা করে দিলি চৌধুরী বাড়ির।”

মাহির রুদ্রর কথা শুনে নিমেষে হতাশা থেকে বেরিয়ে এলো। হাসতে হাসতে রুদ্রর কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো-
“তারপর বল, কি কুকিং হলো রান্নাঘরে? গরম হাতার চেকা খাসনি তো আবার?”
রুদ্র ঠোঁট উল্টে বলল-“ওই চেকা তো তাও সহ্য করার মতো কিন্তু যেই চেকা খেয়েছি তা তো সহ্য হচ্ছে না।”
মাহির রায়ানের পাশে সোফায় বসে হাত মুঠো করে মাইকের ন্যায় মুখের সামনে ধরে জিজ্ঞেস করলো-
“তো মিস্টার চৌধুরী, ছোট ভাইয়ের প্রেম নিবেদন প্রত্যাখ্যান হওয়াতে আপনার কি কোনো বিষয়ে মতামত আছে?”
রায়ান বাঁকা চোখে মাহিরের দিকে দেখে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ড্রয়িং রুম ত্যাগ করতে করতে বলল-

“মাহির ওকে বলে দে, আকাম যেহেতু করেছে রিমি কে যেন ভাই বউ হিসেবে চৌধুরী বাড়িতে দেখি। নইলে আমার জুতা আর ওর গাল। রায়ান চৌধুরীর ভাই হয়ে রিজেকশন কিভাবে মানছে ও? কি লজ্জা..!”
কথাটা বলেই রায়ান চলে গেলো। এই দিকে মাহিরও রুদ্র কাছে গিয়ে তার কাঁধে চাপড়ে বলল-
“রিমি কে তোর বউ হিসেবে চৌধুরী বাড়িতে না দেখলে। তোর এক গাল আর রায়ানের জুতা, আর এক গাল আর আমার জুতা। গুড নাইট।”
এই বলে মাহির ও চলে গেল নিজের ঘরে । রুদ্র বেচারা একা একা ড্রয়িং রুমে দাড়িয়ে।
-“ধুর ধুর, এইগুলো বড় ভাই না অন্য কিছু। কি একটু স্বান্তনা নিতে আসছিলাম, উল্টো প্যারা দিয়ে দিলো।”

রাতের খাবার খেয়ে যে যার যার ঘরে চলে গেছে। মিরায়া ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। রায়ান তখনও ঘরে আসে নি। মিরায়া আর সেই দিকে মন না দিয়ে ঘমানোর উপযোগি কিছু একটা পড়তে লাগেজ ঘটলে তেমন কিছু পেলই না। কি মনে করে যেন সে রায়ানের লাগেজ খুলে কাল রাতের মতোন রায়ানের শার্ট পরবে বলে সেখান থেকে একটা কালো শার্ট বের করে পড়ে নিলো। কাল শার্ট পড়ে তার খুব কম্ফোরটেবল লেগেছে। মিরায়া শার্টটা পড়েই কলারটা টেনে নাকের কাছে নিয়ে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিলো, শার্টে রায়ানের শরীরের একটা ঘোর লাগানো ঘ্রাণে মিরায়া মুচকি হাসলো।

-“হাহ্! কি মিষ্টি একটা সুবাস‌। কি পারফিউম ইউজ করেন উনি?”
নিজে নিজে কথা বলে মিরায়া বিছানায় গিয়ে হেড বোর্ডে হেলান দিয়ে বসতেই রায়ান ঘরের ভেতর প্রবেশ করলো। রুদ্রর জন্য মেজাজ খারাপ হয়ে ছিল তাই মিরায়ার দিকে না তাকিয়েই সোজা আয়নার সামনে গিয়ে হাতের রোলস রোয়েলস এর ঘড়িটা খুলে রেখে পড়নের শার্টের বোতাম খুলতে লাগল। মিরায়া ফোন থেকে চোখ সরিয়ে রায়ানের দিকে তাকালো। রায়ানের মুড ভালো ঠেকলো না বিধায় প্রশ্ন করলো-

“কিছু হয়েছে…!”
রায়ান মিরায়ার কথার কোনো উত্তর দিলো না। মিরায়াও আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। সবারয়েকটা পার্সোনাল স্পেস আছে, সেটার সম্মান করা উচিত। রায়ান শার্ট খুলে একটা সফ্ট টি শার্ট পড়ে ওয়াশ রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেড়লো। ভেজা মুখ টাওয়াল দিয়ে মুছতে মুছতে মিরায়াকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
“তোমার ভার্সিটির খবর নিয়েছ রিমির থেকে? অনেক হয়েছে গ্যাপ দিয়েছ। সেমিস্টার ফাইনালে এটা এফ্যাক্ট করবে। বাড়ি ফিরে পড়ায় মনোযোগী হতে হবে তোমার। একটু কষ্ট হবে সব মানিয়ে নিতে।”
মিরায়া চুপ ছিল ঠিক যেমন রায়ান প্রথমে তার সাথে কথা বলে নি।
-“কি হলো? কথা বলছো না কেন?”

রায়ান বিছানায় মিরায়ার দিকে তাকাতেই দেখলো মিরায়া কাত হয়ে শুয়ে আছি। আর পড়নে তার শার্ট। রায়ান একটু অবাক হলো মিরায়াকে নিজের শার্টে দেখে। রায়ান মিরায়ার কাছে যেতেই দেখলো মিরায়া চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। সে যে ঘুমায় নি তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কিন্তু রায়ান মিরায়ার কথা না বলার কারণ বুঝতে পারলো না। রায়ান আরো কয়েক বার মিরায়াকে ডাকার পরও যখন প্রতি উত্তর পেল তখন তার মাথায় এক দুষ্টু বুদ্ধি খেলল। রায়ান বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে মিরায়ার ঠোঁটের দিকে অগ্রসর হলে মিরায়া ধস করে বিছানায় উঠে বসে প্রশ্ন করলো-
“সমস্যা কি হ্যাঁ? যখন তখন আমার ঠোঁটে কি হ্যাঁ? আমি ঘুমোচ্ছিলাম দেখতে পাচ্ছিলেন না?”
রায়ান মিরায়ার দিকে ভালো করে তাকিয়ে বলল-

“হুম, দেখতে তো পাচ্ছি, ঠিক কতটা ঘুমের ঘোরে ছিলেন আপনি। তা মেডাম অসময়ে এমন ঘুমের কারণ?”
মিরায়া অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল-
“যেখানে আমার অস্তিত্বের মূল্য নেই, আমি কি বলছি, কি জিজ্ঞেস করছি তার কিছুই কারো কানে যায় না সেখানে ঘুমনো ছাড়া আর কি করবো।”
রায়ান মিরায়ার কথা বুঝে মাথা নাড়িয়ে বলল-
“ওহ আচ্ছা আচ্ছা, তা নাহয় বুঝলাম। কিন্তু আমার বদলে আমার শার্ট আপনার শরীর উপর কি করছে?”
মিরায়া চোখ ছোট ছোট করে বলল-
“আমার বরের শার্ট আমি পড়েছি। বেশ করেছি। আমি আমার শরীরে আমার বরকে রাখবো না তার শার্ট সেটা আমার ব্যাপার। আপনি বলার কে?”

রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেসে ঘরের বাইরে চলে গেল। আর মিরায়া সেই দিকেই তাকিয়ে রইল। বেশ কিছুক্ষণ পরে রায়ান এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে ঘরে এসে সাইড টেবিলের উপর রেখে মিরায়াকে কে বলল-
“”গ্লাসে গরম দুধ রাখা আছে,খেয়ে নাও ঠান্ডা হওয়ার আগে।”
মিরায়ার মুড অফ তাই জেদ ধরে বলল-
“আমি খাব না আপনিই খান দুধ।”

রায়ান স্বাভাবিক কন্ঠে মিরায়ার কথার প্রেক্ষিতে তাকে আরো খেপাতে দুষ্টু হেসে বলল-
“Right or left..orr both?”
মিরায়া বিছানায় রাখা বালিশটা হাতে নিয়ে রায়ানের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বকলো-
“”অসভ্য, অশ্লীল লোক কোথাকার!”
রায়ান বালিশটা কেচ ধরে ফেলে আদূশ মূলক কন্ঠে বলল-
“যা বলেছি তা করো।”
মিরায়া আবার আরেকটা বালিশ ছুঁড়ে মারলো-
“বলেছি না খাব না আমি।”
রায়ান আলোর গতিতে মিরায়ার কাছে এসে মিরায়ার কোমর জড়িয়ে নিজের কাছে টেনে ঠোঁটে ঠোঁটের সংঘর্ষে বলল-

“Talk less my little headache, or your legs gonna pay..”
রায়ানের হঠাৎ কাজে মিরায়া একেবারে ঘাবড়ে গিয়ে বলল-
“খাচ্ছি খাচ্ছি খাচ্ছি। ছা… ছাড়ুন।”
-“Be quick..”

রায়ান ছাড়তেই মিরায়া ফটাফট দুধ টা খেয়ে গ্লাসটা রেখে ধস করে চিত হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। রায়ান মিরায়াকে দেখে মুচকি হেঁসে লাইট টা অফ করে বিছানায় এলো। রায়ান বিছানায় আসতেই মিরায়া অন‌ দিকে ঘুরে গেলো। রায়ান পিছন থেকে মিরায়ার কোমর ধরে টেনে নিজের বুকের সাথে মিরায়ার পিঠ মিশিয়ে নিয়ে শুলো মিরায়া কিছু বলতে পারে না মনের দ্বিধায়- না জানি সে কিছু বললে রায়ান কি করবে তার সাথে। কিন্তু রায়ানের সাথে মিশে থাকাতে তার একটু অস্বস্তি হচ্ছিল যার জন্য একটু নড়াচড়া করছিল। হঠাৎই রায়ান মিরায়ার কানের দিকের চুল গুলো সরিয়ে কানের লতিতে হাল্কা ভেজা চুমু দিয়ে বলল-

“বেশি নড়াচড়া করে আমাকে জাগিয়ো না পাখি। এমনিতেই নিজের শার্ট টা তোমার গা থেকে খুলতে পারছিনা বলে মনে আফসোস এর শেষ হচ্ছে না। খুব কষ্টে সামলে রেখেছি নিজেকে। তোমার প্রতি আমার যত্ন আমাকে বড্ড কষ্ট দিচ্ছে। তা কি তুমি জানো?”
রায়ানের কথা শুনে মিরায়ার কেন জানি খুব মায়া হলো‌। রায়ানের থেকে দূরে যাওয়ার আর চেষ্টা করলো না উল্টো রায়ানের কাছে গেল।
রায়ান ভেবেছিল হয়তো সে ঘুমিয়ে যেতে পারবে কিন্তু কোনো একটা কারণে ছেলেটা আর ঘুমতে পারলো না। রায়ান বিরক্ত হয়ে মনে মনে বিড়বিড় করছে-

“এক রাতে এমন অভ্যাস কিভাবে হলো? ধুর.. একটুও ঘুম আসছে না বালিশে শুয়ে।”
মাঝে রাতে না পারতে রায়ান মিরায়াকে ডাকলো আলতো করে-
“হৃদপাখি…সোনা..ঘুমিয়ে গেছ?”
মিরায়ার কোনো আওয়াজ নেই। রায়ান আবারো ডাকলো-
“ও বউ পাখি..! ঘুমিয়ে গেছ?”
মিরায়া ভাঙা ভাঙা গলায় আওয়াজ করলো-“হুম, ঘুমিয়ে গেছি।”
রায়ান একটু মুখ উঁচু করে বলল-
“ঘুমির মাঝে কথা বলা কেমন অভ্যাস?”
মিরায়া অল্প ঘুরে পাল্টা প্রশ্ন করলো-

“ঘুমিয়ে থাকা মানুষ কে সে ঘুমিয়ে গেছে কিনা জিজ্ঞেস করা কেমন অভ্যাস?”
রায়ান চুপ থাকলো। মিরায়া নরম কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হয়েছে? কি চাই?”
রায়ান ইনিয়ে বিনীয়ে মিরায়ার হাতে আঙ্গুল দিয়ে কিছু একটা আঁকিবুঁকি করতে করতে বলল-
“আমি একটু আসি?”
মিরায়া অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো-“কোথায়?”
রায়ান আঁতকা মিরায়াকে সোজা করে শুইয়ে দিয়ে মিরায়ার বক্ষ যুগলের উপর মাথা রেখে বলল-“তোমার বুকে।”
মিরায়া হতভম্ব- এটা কি হলো তার সাথে! মিরায়া রীতিমতো মতো কাঁপতে শুরু করলে রায়ান বলল-
“কাঁপছে কেন তোমার শরীর? আমি কি কিছু করেছি বলো? কিছু করবো ও না আজ। ট্রাস্ট মি বেইবি। শক্ত বালিশে ঘুম আসছে না। এগুলো অনেক নরম।”

মিরায়া রায়ানের কথা বুঝেও যেন বুঝলো না। লোকটা কি বলতে চাইছে তাকে- এক রাতে বালিশ শক্ত হয়ে গেল! মিরায়া ওইভাবেই রায়ান কে বলল-
“বা..বালিশ তো অনেক নরম, এর চেয়ে আর কি নরম?”
রায়ান আরো গভীর ভাবে মিরায়ার বুকের মাঝখানে মুখ গুঁজে দিয়ে বলল-
“These sweet butter balls.. Which are mine now..
তুমি ঘুমাও নিশ্চিন্তে। I swear, I won’t do anything to them just gonna sleep..”
কথাটা বলে মিরায়ার একটা হাত নিজের মাথায় দিয়ে বলল-

“একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দেও। গুড নাইট।”
এই বলে চুপ করে গেল। মিরায়ার হৃৎস্পন্দন যে বেড়েছে তা রায়ান আর মিরায়া দুইজনেই টের পাচ্ছে। রায়ানের জন্য বিষয়টা কোনো সফ্ট মিউজিক এর কাজ করলো। মিরায়া পাথরের মতো শুধু শুয়ে আছে আর রায়ানের কথা মতো তার মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা একে বাড়ে রাত শেষে একটু ঘুমের দেখা পেয়েছে। রায়ানের মাথায় ভারে বুকে চাপ লাগায় অনেক ব্যাথা হয়ে গেছে তার উপর মাঝে মাঝেই রায়ানের অবাধ্য নড়াচড়ায় মেয়েটা ঘুমাতে পারেনি। অবশেষে চোখে ঘুম জুড়ে এলে সে ঘুমিয়ে যায়। কিন্তু মনে মনে বেশ রেগে ছিল রায়ানের উপর।

সকালটা স্বাভাবিক শান্ত। তবে সবার মাঝে ফিরার তাড়া। সকালের নাস্তা করে সবাই বের হবে বলে তাড়াতাড়ি নাস্তা সেরে নিয়েছে। সকাল থেকে মিরায়া রায়ানের সাথে কোনো কথা বলেনি। নাস্তা করার সময় ও না। রায়ান মিরায়ার সাথে অনেক ভাবেই কথা বলার চেষ্টা করছিল কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হলো না। মিরায়া ইচ্ছে করেই রায়ান কে ইগনোর করছে। রাতের জন্য একটু রাগ আর এমনি শুধু শুধু একটু জ্বালাতন করতে এই ধরনের ভাবনা এসেছে মেয়েটার মাথায়। মেয়ে মানুষের মাথায় কখন কি ঘুরে তা যদি ছেলেরা বুঝতো তাহলে তো হয়েই যেত। স্বাভাবিক ভাবেই রায়ানও বুঝলো না। তার কাছে বিষয়টা খুবই সিরিয়াস। বউ তার সাথে কথা বলছে না পাত্তা দিচ্ছে এটা তার জন্য মেনে নেওয়া কষ্টকর।

রায়ান মিরায়ার এমন আচরণে ধীরে ধীরে বিরক্ত হচ্ছে কিন্তু কিছু বলছে না। মিরায়া নাস্তা শেষে আগে আগে উঠে যায় শাওয়ার নিয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য রেডি হতে। পর পর রায়ান ও উঠে ঘরে চলে আসে‌। খাবার টেবিলের সবাই একে অপরের মুখ চাওয়া চাউয়ি করছে।
মিরায়া ঘরে গিয়ে নিজের লাগেজ থেকে একটা থ্রি পিস নিয়ে ওয়াশ রুমে যেতে চাইলে রায়ান মিরায়া্য পথ আটকে জিজ্ঞেস করলো-

“কি হয়েছে তোমার? সকাল থেকে দেখছি, এমন উগ্র ব্যবহার এর কারণ কি জানতে পারি?”
মিরায়া রায়ানের দিকে তাকালোও না সোজা ওয়াশ রুমে চলে গেল রায়ানের সাইড কাটিয়ে। মূলত মিরায়া রাগ করে আছে রায়ান রাতে তাকে ছাড়ে নি কেন? বেচারি সেই জন্য ঘুমাতেও পারে নি। তাই ইগনোর করছে ছেলেটাকে। রায়ানও ছাড়ার পাত্র নয় মিরায়ার পিছন পিছন গিয়ে মিরায়াকে ওয়াশ রুমের দরজা লক করতে না দিয়ে নিজে জোর করে ওয়াশ রুমে ঢুকে যায়।

-“হচ্ছে টা কি? আমি শাওয়ার নেব এখন। আপনি ভিতরে এলেন কেন?”
রায়ান কিছু না বলে হঠাৎ করে মিরায়ার ঠোঁটে হামলে পড়লো। মিরায়া চোখ বন্ধ করে নিয়েছে। মেয়েটার বুঝতেও কিছুটা সময় লাগলো কি হচ্ছে তার সাথে। মিরায়া বারবার ছোটার চেষ্টা করেও ঠোঁট বা শরীর কিছুই রায়ানের দখল থেকে মুক্ত করতে পারছে না। রায়ান ও পাগল হয়ে গেছে- একদিনের তৃষ্ণা মেটাতে একে বারে ক্ষুধার্ত বাঘের মতো হামলা চালাচ্ছে। মিরায়া চোখ খুলতেই দেখলো রায়ান চোখ বন্ধ করে আছে। ধীরে ধীরে সে শান্ত হলে রায়ানের পাগলামি কমে গেল, এখন শুধু নিজের চাওয়া টুকু পুরোন করছে। প্রায় ত্রিশ মিনিট পর রায়ান মিরায়ার ঠোঁট ছেঁড়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল-

“সকাল থেকে এই কারণে ইগনোর করা হচ্ছিল বুজি?”
মিরায়া হাঁপিয়ে উঠেছে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে। এরই মাঝে রায়ান শাওয়ার টা ছেঁড়ে দিয়ে মিরায়ার ঠোঁটে আবারো ডুব দেওয়ার আগে ফিসফিস করলো-
“আমি নিজেকে ধরে রাখার আর কোনো কারণ দেখছি না। So handle me like a good wife.. okay?”
মিরায়া রায়ানের দিকে ছলছল চোখে তাকাতেই রায়ান দ্বিতীয় বারের মতো মাতলো ঠোঁটের সাথে ঠোঁটের খেলায়। মিরায়া বুঝতে পারছে না শুধু ইগনোর করাতে লোকটা এতো পাগলামি করছে নাকি আর চাইতেই না নিজেকে সামলাতে! এক পর্যায়ে রায়ান মিরায়াকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ছাড়লে মেয়েটা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল-
“ইইই..ইগনোর করেছি তো কি হয়েছে? বেশ করেছি।”

রায়ানের কি হলো কে জানে, ও মিরায়ায গলায় মুখ ডুবিয়ে দিয়ে ছোট ছোট কামড়ে নিজের অধিকার বোধ দেখাতে থাকলো। মিরায়া আর কিছু বলতে চেয়েও কিছু বলতে পারছে না। রায়ানের কাঁধে চুলে খামচে ধরে আছে শুধু। রায়ান মিরায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল-
“Well done, now pay for it..”
রায়ান হঠাৎ নিজের হাত মিরায়ার দুই উরুর মাঝে দিতেই মিরায়া ব্যাথা তুর গলায় বলল-
“আআ..রা.. রায়ান, সবাই অপেক্ষা করছে নিচে। আমাদের যেতে হবে।”
রায়ান হঠাৎ মিরায়াকে সামনের থেকে জড়িয়ে কোলে নিলো। মিরায়া পা দিয়ে রায়ানের কোমরের চার পাশ জড়িয়ে ধরলো।মিরায়াকে ওভাবেই দেয়ালের সাথে চেপে ধরে রায়ান ফিসফিস করলো-
“I am not done with you yet baby..”

এরপর প্রায় ১ ঘন্টার মতো চলে গেছে। মিরায়া বা রায়ান কারোরই বাইরে আসার নাম নেই। গাড়িতে সবার লাগেজ তোলা শেষ। জুলিয়েট আর রমিও কে ও তোলা হয়েছে। রায়ান মিরায়াকে নিচে আসতে না দেখে রিমি জোরে চেঁচিয়ে মিরায়াকে ডাকলো-
“মিরা..বাইরে আয়! তোদের জন্য দেরি হয়ে যাচ্ছে। ১ঘন্টার ধরে উপরে গেছিস। এতো সময় লাগে?”
রুদ্র ও সাথে চেচালো-“মিরা ভাবি.. তাড়াতাড়ি আয়..যেতে হবে তো নাকি।”
মিরায়া রুদ্রর আওয়াজ হালকা শুনতে পেয়ে হাঁপাতে থেকেই মৃদু আর্তনাদ করলো-
“তোমার অসভ্য ভাই, আমাকে ছাড়ছে না। আমি কি করবো?”
রায়ানের এতে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই সে মিরায়ার মাঝেই ডুবে আছে।

-“আহ্! রায়ান ছাড়ুন আর পারছি না। অনেক হয়েছে। সরি..আর ইগনোর করবো না। ঘাট হয়েছে আমার।”
রায়ান হয়তো মিরায়ার এই সহজ স্বীকারোক্তি টুকুই চাইছিল। ঠিক পর মুহূর্তেই মিরায়াকে ছেঁড়ে দিয়ে কোলে থেকে নামিয়ে দিয়ে জড়িয়ে ধরে বাঁকা হেঁসে মিরায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল-
“কেন করবে না শুনি। অবশ্যই করবে, তা নাহলে এই ইগনোর করার ফায়দা কিভাবে উঠাবো আমি? কালকের দিনটা খুব অসহ্যকর ছিল। আজকের সকালটা সুন্দর করার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। মাঝে মাঝে এমন দুষ্টু করতেই পারো। ভালো লাগবে আমার।”

রায়ান যে কি বলল তা সে নিজেই জানে। রায়ান একটা টাওয়াল কোমরে পেঁচিয়ে বেড়িয়ে যাওয়ার আগে বলল-
“তাড়াতাড়ি বের হও, নয়তো ঠান্ডা লেগে যাবে। আমি নিজের রিস্ক নিচ্ছি না, নাহলে দেখা যাবে আজ হাঁটতে পারবে না। আর যদি এতো টুকু তেই কষ্ট হয় ডাকবে আমাকে বুঝেছ?”

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫৬

মিরায়া কিছু বলার আগেই রায়ান বেরিয়ে গেল। মেয়েটা ফেল ফেল করে তাকিয়ে আছে। সে কি ভেবেছিল আর কি হলো তার সাথে। এই মুহূর্তে রায়ানের তার কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা ছিল কালকের জন্য, আর এই দিকে উল্টো নিজেই ইগনোর করেছে বলে ক্ষমা চাইলো। সব ঘেঁটে ঘ। মিরায়া নিজের মাথায় কয়েক বার বারি দিয়ে বকাঝকা করলো নিজেকে। তার পর শাওয়ার নিয়ে নিলো।

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫৭ (২)