রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ২৩
মহাসিন
অনেকটা সময় চলে গিয়ে ,বিকেল গড়িয়ে এসেছে।
পশ্চিম আকাশের গায়ে সূর্য ধীরে ধীরে তার শেষ আলো গুটিয়ে নিচ্ছে, যেন ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দেবে ঘুমের রাজ্যে। সোনালি আভা মিলিয়ে গিয়ে আকাশে নামছে কোমল কমলা আর হালকা বেগুনি রঙের ছায়া।
চারদিকে নেমে আসছে সন্ধ্যার নরম নীরবতা। গাছের ডালে ডালে পাখিরা ব্যস্ত কিচিরমিচিরে—যেন দিনের শেষ কথাটা বলে নিচ্ছে একে অপরকে। মাঝে মাঝে বয়ে আসছে শীতল মৃদু হাওয়া, ছুঁয়ে যাচ্ছে মুখ আর মন দুটোই।
ব্যালকনিতে বসে আছে সিয়াম। কানে ইয়ারফোন, চোখ ল্যাপটপের পর্দায় নিবদ্ধ।
গায়ে খয়েরি রঙের টিশার্ট, পরনে সাদাকালো মিশ্রিত রিপড জিন্স। খাড়া খাড়া চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে পড়েছে, তাতেই যেন তার সৌন্দর্য আরও বেড়ে গেছে।
উড়তি বয়সের যে কোনো মেয়ে দেখলেই এক পলকে আটকে যাবে—এমনই তার উপস্থিতি।
আড়াল থেকে জেরিন দাঁড়িয়ে দেখছে।
একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বুকের ভেতরটা কেমন অচেনা হয়ে উঠছে। সিয়ামকে দেখে মাথাটা হালকা ঝিমঝিম করে উঠছে, বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি। হার্টবিট বেড়ে গেলছে।
নিজেকে আর সামলাতে পারল না। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে সিয়ামের পাশে বসল।
সিয়াম টের পেল জেরিন এসেছে, কিন্তু তার দিকে না তাকিয়ে ল্যাপটপেই মন দিল।
জেরিন একটু ঝুঁকে বলল,
“এই যে মিস্টার, আর কত কাজ করবেন? সেই কখন থেকে দেখছি ল্যাপটপে মুখ গুঁজে বসে আছেন।”
সিয়াম একবার তাকাল, তারপর কান থেকে ইয়ারফোন খুলে বলল,
“তো আপনাকে দেখতে বলেছে কে?”
জেরিন ঠোঁট টিপে হাসল,
“এটা কেমন কথা! এত সুন্দর, সে*ক্সি, হ্যান্ডসাম ছেলেকে না দেখে থাকা যায় নাকি?”
একটু থেমে আবার বলল,
“তা, ল্যাপটপে কী কাজ করেন শুনি?”
সিয়াম সংক্ষেপে বলল,
“অফিসের কাজ। অফিসে যাওয়া হয় না, তাই বাড়িতে বসেই সারতে হয়।”
তারপর হালকা হেসে বলল,
“আচ্ছা, আপনি না বলেছিলেন আপনার নায়ককে দেখাবেন?”
জেরিন অবাক হয়ে বলল,
“মানে? ঠিক বুঝলাম না।”
“আরে, সেদিন না বললেন—যাকে ভালোবাসেন সেই নাকি আপনার নায়ক,” সিয়াম মনে করিয়ে দিল।
জেরিনের চোখে স্বপ্নের ঝিলিক খেলে গেল।
“হ্যাঁ, সেই আমার নায়ক। যাকে নিয়ে আমি হাজারটা স্বপ্ন দেখি। কল্পনার জগতে তার সাথে চুটিয়ে প্রেম করি।”
সিয়াম একটু অবাক হয়ে শুধালো,
“কেন? সে কি আপনাকে বাস্তব জীবনে ভালোবাসে না?”
জেরিন মাথা নিচু করল,
“আমি তাকে ভালোবাসি। সে হয়তো আমাকে ভালোবাসে না।”
সিয়াম বলল,
“আচ্ছা, যাই হোক। আপনার সেই নায়ককে তো দেখতে চাই। দেখাবেন?”
জেরিন মুচকি হেসে বলল,
“হ্যাঁ, অবশ্যই দেখাবো। তবে দেখে আবার আপনার চোখ চরকগাছ হয়ে যায় কি না!”
সিয়াম অবাক শুরে শুধালো,
“কেন? আপনার নায়ককে দেখলে আমার চোখ চরকগাছ হবে কেন?”
জেরিন রহস্যময় হাসি হাসল,
“সেটা তো ছবি দেখলেই বুঝবেন।”
এমন সময় শাপলা বারান্দার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।
জেরিন আর সিয়ামকে কথা বলতে দেখে সে থমকে দাঁড়াল। এক পাশে আড়াল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়তে লাগল।
জেরিন ফোনের ক্যামেরা অন করল। তারপর ফোনটা সিয়ামের হাতে দিয়ে বলল,
“এই নিন, একবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকান।”
সিয়াম মৃদু হেসে ফোনটা হাতে নিয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকাল।
“একি! ছবি কোথায়? আপনি তো ক্যামেরা অন করে দিয়েছেন।”
জেরিন স্বাভাবিক কন্ঠস্বরে বলল,
“ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে বলুন তো, কাকে দেখতে পাচ্ছেন?”
সিয়াম ভ্রু কুঁচকাল,
“আরে আজব! আমাকেই তো দেখাবে।”
“এত কিছু না বলে শুধু বলুন, কী দেখতে পাচ্ছেন?” জেরিন বলল।
সিয়াম সংক্ষেপে বলল,
“আমাকে।”
জেরিন ফোনটা নিজের হাতে নিয়ে সোজা চোখে তাকাল,
“আপনি আমার সেই নায়ক। যাকে আমি প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছি। যাকে নিয়ে কল্পনার জগতে চুটিয়ে প্রেম করি।”
এই কথা শুনে আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা শাপলার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।
মনে মনে সে আগেই আঁচ করেছিল—জেরিন সিয়ামকে ভালোবাসে। আজ সেটাই সত্যি হয়ে সামনে দাঁড়াল।
সিয়াম চমকে উঠে দাঁড়িয়ে গেল। জেরিনও উঠে দাঁড়িয়ে তার হাত ধরে ফেলল।
“আমি আপনাকে ভালোবাসি। অনেক ভালোবাসি। আপনি আমার হবেন। চিরদিনের জন্য আমাকে আপনার জীবনে অবরুদ্ধ করে রাখবেন।”
সিয়াম এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিল।
“আপনার মাথা ঠিক আছে তো?”
জেরিনের চোখ চকচক করে উঠল,
“না, আমার মাথা ঠিক নেই। যেদিন থেকে আপনাকে দেখেছি, সেদিন থেকেই আপনাকে পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছি। আপনি আমাকে ভালোবাসবেন তো?”
সিয়ামের গলা শক্ত হয়ে এল,
“না। আমি আপনাকে ভালোবাসতে পারব না।”
জেরিনের চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল, গলা কাঁপছে।
“কেন? আমাকে কেন ভালোবাসতে পারবেন না? আমি কি দেখতে খারাপ? আমি সুন্দর, শিক্ষিত, সব দিক থেকেই পারফেক্ট।”
সিয়াম ধীরে বলল,
“হ্যাঁ, আপনি সুন্দর, শিক্ষিত, সব দিক থেকেই পারফেক্ট। কিন্তু আমি আপনাকে ভালোবাসতে পারব না… কারণ আমি একজনকে ভালোবাসি।”
এই কথা শুনে জেরিনের বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে গেল।
কল্পনায় সাজানো সুন্দর বাড়িটা এক মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
সে এক পা পিছিয়ে গিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
_____“কে সেই ভাগ্যবতী মেয়ে, যাকে আপনি ভালোবাসেন?”
সিয়াম চোখ বন্ধ করল। চোখের পাতার আড়ালে ভেসে উঠল শাপলার মুখ।
চোখ খুলে জেরিনের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল,
_____“আমি শাপলাকে ভালোবাসি।”
নামটা শুনেই জেরিন আকাশ থেকে পরার উপক্রম।
এক মুহূর্তও আর দাঁড়াতে পারল না সে। ঘুরে চলে যেতে লাগল।
যাওয়ার সময় আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা শাপলাকে দেখতে পেল।
শাপলাও তাকাল—এক পলকের দেখা। জেরিনের চোখ বেয়ে নেমে এল শ্রাবণের অশ্রুধারা।
চাপা কান্নায় বুক ফেটে যাচ্ছে, তবু কিছু বলল না। নিঃশব্দে চলে গেল।
জেরিন চলে যেতেই শাপলা আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে সিয়াম। দুজনের চোখাচোখি হলো, কিন্তু কোনো কথা হলো না।
সিয়াম কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই শাপলা হঠাৎ ঘুরে দৌড়ে চলে গেল।
কবিতা বিছানায় শুয়ে ফোন ঘাঁটছে। হঠাৎ দরজা ঠেলে দৌড়ে ঘরে ঢুকল জেরিন।
চোখ-মুখ লাল, নিঃশ্বাস ভারী।
কবিতা সোজা হয়ে বসে বলল,
“ওই নীলাঞ্জনা ভাবি শাপলার সব বিষয় জানে। আমাদের কাছে মিথ্যে বলছে। যে করেই হোক, আমাদের সত্যিটা বের করতেই হবে।”
জেরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ধীরে বলল,
“তার আর প্রয়োজন নেই… আমি সব জেনে গেছি। শাপলা সিয়ামকে ভালোবাসে।”
কবিতা অবাক হয়ে শুধালো,
“কীভাবে জানলে?”
জেরিনের ঠোঁট কাঁপছে,
“সব কিছু বলতে হয় না। কিছু কিছু জিনিস খেয়াল করলে বোঝা যায়। আর একটা কথা জানো? সিয়ামও শাপলাকে ভালোবাসে।”
কথাটা শুনে কবিতা থমকে গেল। মুখ থেকে কথা সরল না।
জেরিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। কান্নায় ভেঙে পড়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল।
“আমি যখন সিয়ামকে বললাম আমি তাকে ভালোবাসি… তখন সে বলল, আমাকে ভালোবাসতে পারবে না! সে শাপলাকে ভালোবাসে!
এবার আমার কী হবে? আমি যে সিয়ামকে অনেক ভালোবাসি!”
কবিতা ধীরে এগিয়ে গিয়ে জেরিনকে আলতো করে টেনে তুলল।
“কান্না করো না জেরিন। এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না।”
তার চোখে চকচক করে উঠল একটা কঠিন সিদ্ধান্তের ছায়া।
“এবার আমাদের যেভাবেই হোক শাপলাকে এই বাড়ি থেকে বের করতে হবে। তাহলেই তুমি সিয়ামকে পাবে।”
জেরিন ফুঁপিয়ে উঠল,
“কিন্তু সিয়াম কি আমাকে ভালোবাসবে?”
কবিতা বলল,
“পুরুষ মানুষ বলে কথা। কত দিন আর একা থাকবে?
যাই হোক, এসব কথা এখন থাক।”
তারপর গলার স্বর নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এবার আমাদের প্ল্যান হবে একটাই—শাপলাকে এই বাড়ি থেকে বের করা।”
এরপর কবিতা গুটি গুটি পায়ে হেঁটে শাপলার রুমের দিকে চলে গেল।
শাপলা বিছানায় বসে আছে, দুই হাঁটুর মাঝে মুখ গুঁজে। জেরিন আর সিয়ামের কথাগুলোই এখনো তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
কবিতা শাপলা রুমে প্রবেশ করল।
কবিতা গলার স্বর শক্ত করে বলল,
“এই শাপলা, এভাবে বসে আছিস কেন?”
একটু থেমে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“ও সরি, ভুল বলে ফেলেছি। মহারানী, আপনি এভাবে বসে আছেন কেন?”
শাপলা চমকে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল।
“এটা আবার কেমন কথা?”
কবিতা ভ্রু তুলে বলল,
“ও মা! আমি আবার ভুল কী বললাম? আর কিছু দিন পর তো আপনি এই বাড়ির বউ হবেন। তাও যে-সে মানুষের বউ না—সিয়াম আহমেদের বউ।
তখন তো আপনি এই বাড়ির রানী হয়ে আমাদের মাথায় চড়ে বসবেন।”
শাপলা বিস্মিত হয়ে বলল,
“আপু, আপনি এসব কী বলছেন?”
কবিতা হাতের আঙুল নাচিয়ে নাচিয়ে বলল,
“চুপ! একদম চুপ। একটা কথাও বলবি না।
আগে বল, কত দিন ধরে সিয়ামের সাথে প্রেম করিস? কী হলো, চুপ করে আছিস কেন? বোবা হয়ে গেলি নাকি?”
শাপলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে মাথা নিচু করে বলল,
“আমি সিয়াম ভাইয়ার সাথে প্রেম করি না। আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।”
কবিতার মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল।
“এই ব*স্তির মেয়ে! তোর এত বড় সাহস হয় কী করে আমার সাথে মিথ্যে কথা বলিস? ছো*ট*লো*কের বাচ্চা!”
শাপলার চোখ জ্বলে উঠল।
“আপনি আপনার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন? দয়া করে নিজের সীমার মধ্যে থাকুন।”
“এই বে*য়া*দব মেয়ে! তোর এত বড় সাহস হয় কী করে আমার সাথে তর্ক করিস?
আমাদের বাড়িতে খেয়ে, আমাদের বাড়িতে থেকে আমার সাথেই বে*য়া*দবি?”
কথা শেষ হওয়ার আগেই কবিতা শাপলার গালে সজোরে একটা চ*ড় বসিয়ে দিল।
শাপলা হতবাক হয়ে গেল। গালে হাত চেপে ধরে দাঁড়িয়ে রইল নিঃশব্দে।
কবিতা কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“তোর এমন অবস্থা করব, কাউকে মুখ দেখাতে পারবি না। তাই সাবধান। আমি কিন্তু হিং*স্র জা*নো*য়ারের চেয়েও ভয়ং*কর।”
এই বলে কবিতা ঘুরে চলে গেল, দরজাটা এক ঝটকায় বন্ধ করে দিয়ে।
ঘরটা নিঃশব্দ হয়ে গেল।
শাপলা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠল। অপমানের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে তার ভেতরটা।
ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল সিয়াম।
শাপলাকে এভাবে কাঁদতে দেখে সে ছুটে গিয়ে মেঝে থেকে টেনে তুলল।
শাপলা রাগে ফুঁসে উঠে বলল,
“আমাকে স্পর্শ করবেন না! চলে যান এখান থেকে। আমার কাছে কেন এসেছেন? নাটক দেখতে?”
সিয়াম বিস্মিত হয়ে বলল,
“এসব কী কথা বলছিস তুই? কী হয়েছে তোর, আমাকে বল।”
শাপলা মুখ ফিরিয়ে নিল।
“উফ্! আমাকে বিরক্ত করবেন না। একটু একা থাকতে দিন। চলে যান, প্লিজ।”
সিয়াম ভাবল, হয়তো শাপলা তাকে আর জেরিনকে ব্যালকনিতে কথা বলতে দেখেছে। জেরিন যখন তাকে ভালোবাসার কথা বলছিল, সেটা দেখেই হয়তো রাগ করেছে।
কিছু না বলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ভাবল, রাগ কমলে আবার আসবে।
কিন্তু সিয়াম বুঝতেই পারল না—শাপলা রেগে আছে কবিতার খারাপ ব্যবহারে। অপমান, যন্ত্রণা, রাগে-দুঃখে সে সিয়ামকেই দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
দরজা বন্ধ হতেই শাপলা আবার ভেঙে পড়ল।
“এবার আমার কী করা উচিত? এসব আর সহ্য হচ্ছে না।
কেন… কেন আমি সিয়াম ভাইয়াকে ভালোবেসে ফেললাম?
এবার কী হবে?”
ঘরের নিস্তব্ধতায় শুধু তার ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দটুকুই প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
রাত দশটা বাজতেই শহরটা ধীরে ধীরে নিঃশব্দের চাদরে মুড়ে যায়, শুধু দূরে কোথাও কুকুরের ডাক সেই নীরবতা ভেঙে দেয়।
বাতাসে জমে ওঠে ক্লান্ত দিনের ধুলো-মাখা গন্ধ, সাথে হালকা শীতলতার পরশ।
জানালার কাঁচে এসে পড়ে চাঁদের ফ্যাকাসে আলো, যেন নিঃশব্দে কাউকে ডেকে বলে—দিন ফুরিয়েছে।
ঘরের কোণে পড়ে থাকা ঘড়ির টিকটিক শব্দ তখন বুকের ভেতরের কথাগুলোকে স্পষ্ট করে তোলে।
রাত দশটা মানে দিনের শেষ দীর্ঘশ্বাস আর রাতের গল্পের প্রথম পাতা।
শাপলা চুপচাপ নিরবের রুমের পাশে থেকে হেঁটে যাচ্ছিলো । ভেতর থেকে ভেসে আসছে গুনগুন কণ্ঠ—নিরব কারো সঙ্গে কথা বলছে ফোনে।
কৌতূহল সামলাতে না পেরে শাপলা দরজায় কান পাতল। কিন্তু ফোনের ওপাশের মানুষটির গলা শোনা গেল না, শুধু নিরবের কথাগুলোই কানে এল—
“হ্যাঁ”
” তুমি খেয়েছো?”
“ও আচ্ছা”
“কিন্তু তোমার কেন পছন্দ হচ্ছে না?”
“এটা কিন্তু ঠিক না।”
” প্রবলেমটা কোথায়?”
“কালো রং”
” আচ্ছা, ভালো থেকো।”
” কাল কথা হবে। এখন ঘুমাতে হবে। বাই।”
শাপলা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কার সঙ্গে এত নরম গলায় কথা বলছে নিরব ভাইয়া ? কে হতে পারে সে?
তার ভালোবাসার মানুষটা নয় তো?
মনে মনে কিছু একটা বিড়বিড় করে সে নিজের ঘরে ফিরে গেল।
ঘরে ঢুকতেই দেখল, জেরিন বিছানায় বসে আছে।
শাপলা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“একি! আপনি এখানে?”
জেরিন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“কেন, ঘরটা কি তোর নামে লিখে দিয়েছে নাকি? যে আমি এ ঘরে আসতে পারব না?”
শাপলার গলা কঠিন হলো।
“যখন আমি এই ঘরে থাকি, তখন অবশ্যই আমার অনুমতি নিয়ে ঢুকবেন।”
জেরিন হেসে উঠল, সে হাসিতে বিদ্রূপ মিশে আছে।
“এই বাড়ির বউ হওয়ার স্বপ্নটা খুব বড় তাই না তোর?
কিন্তু স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে। সিয়াম আমার হবে—একান্তই আমার।
তুই আমার কাছ থেকে সিয়ামকে নিতে পারবি না।”
শাপলা এক পা এগিয়ে বলল,
“আমি সিয়াম ভাইয়া কে আপনার কাছ থেকে নেইনি। বরং আপনিই আমার কাছ থেকে তাকে কেড়ে নিতে চাচ্ছেন।
সিয়াম ভাইয়া আমার ভালোবাসার মানুষ। আমি তাকে ভালোবাসি। আর আপনি আমার ভালোবাসাকেই ছিনিয়ে নিতে চাচ্ছেন।”
জেরিন চোখ ছোট করে বলল,
“না। সিয়াম আমার। আমি তাকে ভালোবাসি।
আমি তোর আগেই তাকে ভালোবেসেছি। তাই সিয়াম আমার।”
শাপলা দৃঢ় গলায় বলল,
“হ্যাঁ, আপনি হয়তো আগে ভালোবেসেছেন। কিন্তু সিয়াম ভাইয়া তো আপনাকে ভালোবাসে না।
সিয়াম ভাইয়া আমাকে ভালোবাসে।”
জেরিনের মুখের রং পাল্টে গেল। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে শাপলার খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
“শাপলা, তুই যদি আমার রাস্তার কাঁটা হয়ে দাঁড়াস, সেই কাঁটা উপড়ে ফেলতে আমার এক মুহূর্তও লাগবে না।
Be careful.”
রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ২২
এই বলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, দরজাটা দিয়ে একটা ঝাঁকি দিয়ে।
জেরিন চলে যেতেই শাপলা তার পেছনে মুখ ভেংচি কাটল।
কিন্তু বুকের ভেতরটা আবার অজানা আশঙ্কায় ভারী হয়ে উঠল।
