রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৩০
মহাসিন
মুখোশ পরা লোকটা সমস্ত শক্তি দিয়ে শাপলার গলা চে*পে ধরেছে। দ*ম বন্ধ হয়ে আসছে, চোখ বেয়ে নোনা পানি গড়িয়ে পড়ছে। শাপলা বুঝতে পারল—আর বাঁ*চার উপায় নেই, এই মুহূর্তেই তার মৃ*ত্যু হবে।
ম*রার আগে অন্তত খু*নির মুখটা দেখার ইচ্ছে হলো। কাঁপা হাতে সে মুখোশে হাত রাখল, টেনে সরিয়ে দিল। ঠিক যখন চোখ তুলে লোকটার দিকে তাকাবে, তখনই স্বপ্নটা ভেঙে গেল।
ধড়ফড় করে উঠে বসল শাপলা। গলা শুকিয়ে কাঠ, সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। বুকের ভেতরটা এমনভাবে ধুকপুক করছে, মনে হচ্ছে পাঁজর ছিঁ*ড়ে হৃদপিণ্ডটা বেরিয়ে আসবে।
কোনোমতে নিজেকে সামলে বিছানা ছেড়ে উঠল সে। টলতে টলতে টেবিলের কাছে গিয়ে জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে ঢকঢক করে গিলে ফেলল। তারপর বিড়বিড় করে বলল,
“বাবা, আর একটু হলেই প্রাণটা বেরিয়ে যেত। এটা তো স্বপ্ন ছিল… আমি সত্যি ভেবে বসেছিলাম।”
ধীরে ধীরে আবার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
সকাল হয়ে গেছে। চারদিকে পাখির কিচিরমিচির। নতুন দিনের আলো জানালার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকছে।
শাপলা স্কুলের ইউনিফর্ম পরে ধীর পায়ে ড্রয়িংরুমে এলো। সিয়াম সোফায় বসে ফোন ঘাঁটছে।
শাপলা মৃদু স্বরে ডাকল,
“ভাইয়া, স্কুলে যাব। একটু পৌঁছে দেবেন?”
সিয়াম ফোন থেকে চোখ সরিয়ে বলল,
“তোর স্কুল তো বন্ধ ছিল। আজ খুলেছে নাকি?”
শাপলা মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ ভাইয়া, আজ থেকেই খুলেছে।”
এর পর দুজনে বেরিয়ে পড়ল। সিয়াম গাড়ি ড্রাইভ করছে। শাপলা তার পাশের সিটে বসা। শাপলা এক দৃষ্টিতে সিয়ামের ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে আছে। সিয়াম সেটা খেয়াল করে মুচকি হেসে বলল,
“কিরে, খাবি নাকি? তুই যদি খেতে চাস তাহলে খেতে পারিস।”
শাপলা চমকে উঠে আমতা আমতা করে বলল, “কি খাওয়ার কথা বলছেন?”
সিয়াম বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,
“কেন, তুই অনেকক্ষণ ধরে যেটা খেতে চাচ্ছিস সেটা।”
একটু থেমে আবার বলতে লাগল, “আচ্ছা, এটা বল—চুষে চুষে খেতে চাস, নাকি কামড়ে খেতে চাস? যদি কামড়ে খেতে চাস তাহলে খেতে দিবো না। চুষে খেতে হবে। আর নাহলে তোকে সু*খ দিতে পারব না।”
শাপলা চমকে উঠে বলল, “আরে, আপনি কি খাওয়ার কথা বলছেন? কিছুই তো বুঝতে পারছি না।”
সিয়াম মুচকি হাসি দিয়ে বলল, “থাক হয়েছে, হয়েছে। আর নাটক করতে হবে না।” একটু থেমে ফিসফিস করে বলল, “চুষে খাবি, নাকি কামড়ে খাবি?”
সিয়ামের ফিসফিস কথা শাপলার কানে যেতেই শাপলার শরীর কেঁপে উঠল। গাল লাল হয়ে গেল। নিজেকে সামলে বলল, “আরে, আপনি এটা বলেন যে কী খাওয়ার কথা বলছেন।”
সিয়াম দুষ্ট হাসি দিয়ে বলল, “আমার ঠোঁ*ট।”
শাপলা লজ্জা পেয়ে বলল, “ধ্যাত, কী সব বলছেন!”
সিয়াম নিজের মাথার চুল গুলো হাত দিয়ে খারা করতে করতে বলল, “কেন, তুই তো সেই কখন থেকে আমার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে ছিলি।” একটু থেমে আবার যোগ করল, “আচ্ছা, তুই আমার ঠোঁ*ট বাদে অন্য কিছু খেতে চাস নাকি বল। তোকে সব খাওয়াব। তবে কামড়ে খেতে পারবি না, চুষে চুষে খেতে হবে।”
শাপলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হ্যাঁ, খাবো অবশ্যই খাবো। আপনার কথা মতো চুষে চুষে খাবো।”
সিয়াম তড়িৎ শুধালো, “কী খাবি বল?”
শাপলা রাস্তার পাশে আইসক্রিমের স্টল দেখিয়ে বলল, “ওই যে আইসক্রিম। আপনার টাকায় আইসক্রিম কিনে দেন। আইসক্রিম খাবো।”
সিয়াম গাড়িটা থামাল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাপলার দিকে তাকিয়ে বলল, “শাপলা, তুই কিন্তু দিন খুব চালাক হয়ে যাচ্ছিস।”
বলেই মুচকি হেসে গাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাতে একটা আইসক্রিম নিয়ে ফিরে এলো। শাপলার হাতে বাড়িয়ে দিয়ে নিজেও গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিল।
গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। কিছু সময় পরই শাপলার স্কুলের সামনে এসে থামল।
শাপলা নেমে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি এখনই চলে যাবেন?”
সিয়াম গাড়িতে হেলান দিয়ে হাসল, “না রে। আমি এই সামনেই তোর জন্য অপেক্ষা করব। ক্লাস শেষে একসাথে ফিরব।”
শাপলা ছোট্ট করে হাসল, “আচ্ছা ঠিক আছে।”
কথা শেষ করেই সে স্কুলের গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। চারদিকে ছাত্রছাত্রীদের কোলাহল। শাপলা দ্রুত পায়ে নিজের ক্লাসরুমের দিকে এগোল।
ক্লাসরুমে এখনও তেমন কেউ আসেনি, সবাই বাহিরে। শাপলা নিজের কাঁধের ব্যাগটা বেঞ্চে রেখে চুপচাপ বসে পড়ল। চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে বান্ধবীদের খুঁজল, কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না।
অনেকক্ষণ সে চুপচাপ বসে রইল।
হঠাৎ কলি আর রাজুর গলা শোনা গেল। ওদের দেখেই শাপলার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
“কিরে, এত দেরি করে এলি কেন? সেই কখন থেকে বসে আছি।”
কলি ব্যাগটা নামিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আর বলিস না, রাস্তায় ভীষণ জ্যাম ছিল।”
শাপলা এবার রাজুর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, “আনিক এসেছে?”
রাজু মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, বটগাছের নিচে ওর বন্ধুর সাথে বসে আছে।”
শাপলার চোখ দুটো বড় বড় করে বলল,
“চল তো, আজ ওকে একটু প্রে* ম শেখাতে হবে।”
বলেই ওরা তিনজন ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে বটগাছের দিকে এগিয়ে গেল।
বটগাছের নিচে থাকা বেঞ্চটায় বসে আছে আনিক আর তার কয়েকজন বন্ধু। শাপলাকে আসতে দেখেই আনিক ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি।
শাপলা, কলি আর রাজু ধীর পায়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। শাপলা একদম নীরব। তার চোখে কোনো ভয় নেই, শুধু একটা শীতল দৃঢ়তা।
আনিক শাপলাকে ঘিরে পায়চারি করতে করতে বলল, “কী রে, শেষমেশ আমার কাছেই চলে এলি? বুঝেছি, তুইও মনে আমার সাথেই প্রেম করতে চাস। তা এত নাটক করার কী দরকার ছিল শুনি?”
একটু থেমে সে গলা নামিয়ে বলল, “আমার মতো গুড লুকিং, হ*ট, রো*মান্টি*ক ছেলেকে কে না চায় বল? সব মেয়েই তো চায়, যাতে নিজেদের যৌ*ব*নের অতৃ*প্তি মে*টা*তে পারে। তো তুই এবার ইচ্ছে মতো আমাকে দিয়ে মে*টা*তে পারবি……”
কথা শেষ হওয়ার আগেই শাপলার হাত সাঁই করে উঠল। ঠাস করে এক চ*ড় পড়ল আনিকের গালে। শব্দটা বটগাছের নিচে প্রতিধ্বনিত হলো। সবাই স্তব্ধ।
আনিক সামলাতে না সামলাতেই দ্বিতীয় চ*ড়টা পড়ল অন্য গালে। সে বড় বড় চোখ করে বলল, “এত বড় সাহস! আমাকে মা*রিস তুই?”
রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে হাত তুলল শাপলাকে মা*রতে। মুহূর্তে শাপলা তার কব্জি শক্ত করে চেপে ধরল। চোখে আ*গুন জ্বেলে বলল,
“আর কখনো আমার দিকে চো*খ তু*লে তাকাবি না। তাকালে সে চোখ আমি উ*পড়ে ফেলব। মনে থাকে যেন। বে*য়াদ*ব ছেলে! তোর পরিবার কি তোকে মানু*ষের মতো আ*চরণ শেখায়নি? তুই তো কু*কু*রের চেয়েও অ*ধম!”
হাত ছেড়ে দিয়ে এক পা পিছিয়ে এল শাপলা।
কলি ওকে নিজের কাছে টেনে নিল। ফিসফিস করে বলল, “থাক, আর না। চল এখান থেকে। এরপর যদি কিছু বলে, সোজা হেডস্যারের কাছে যাবি।”
আনিক আবার কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই ওপর থেকে বিকট একটা শব্দ হলো।
সবাই চমকে তাকাল। বটগাছের ডাল থেকে একটা মে*য়ের নি*থ*র দে*হ ছিটকে পড়ল মাটিতে।
মুহূর্তে চারদিকে চিৎকার, হুড়োহুড়ি, হইচই। ভয়ে জমে গেল চারপাশ।
শাপলা, কলি আর রাজু এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। তিনজন প্রাণপণে দৌড়ে ক্লাসরুমের দিকে ছুটল।
রুমে ঢুকে তিনজনই হাঁপাতে লাগল। গলা শুকিয়ে কাঠ।
কলি কাঁপা গলায় বলল, “আর এক মুহূর্তও এখানে থাকা যাবে না রে। আমার ভীষণ ভয় করছে।”
শাপলা দ্রুত মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ, বাড়ি ফিরতে হবে এখনই।”
তিনজনে ব্যাগ হাতে নিয়ে দৌড়ে গেটের কাছে এলো। ছাত্রছাত্রীরা যে যার মতো চলে যাচ্ছে। যে দু-একটা গাড়ি ছিল, তাও ভরে গেছে।
গেটের সামনে এখন শুধু ওরা তিনজন দাঁড়িয়ে।
পুলিশের গাড়ি এসে স্কুলের ভেতরে ঢুকছে। চারপাশটা কেমন নিস্তব্ধ, শুধু দূরের হইচই ভেসে আসছে।
কলি অস্থির হয়ে বলল, “এবার বাড়ি যাব কীভাবে? একটাও রিকশা, সিএনজি নেই।”
ঠিক তখনই একটা সিএনজি এসে দাঁড়াল। রাজু উঠে বসতে বসতে বলল, “চল, উঠে পড়।”
কলি শাপলার দিকে ফিরে বলল, “তুইও আমাদের সাথে চল।”
শাপলা মৃদু হেসে বলল, “না রে, তোরা যা। আমি ভাইয়ার সাথে যাব।”
“কিন্তু তোর ভাইয়া কোথায়?” কলি অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।
“আছে। তোরা তাড়াতাড়ি যা,” শাপলা চোখের ইশারায় ওদের বিদায় দিল।
সিএনজি চলে যেতেই গেটের সামনে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। এখন সেখানে একা দাঁড়িয়ে আছে শাপলা—চোখে অস্থিরতা, মনে অপেক্ষা।
রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ২৯
শাপলা গুটি গুটি পায়ে রাস্তার ধার ধরে হাঁটতে লাগল। চারপাশে দেখছে—সিয়াম কোথাও আছে কিনা। কিন্তু সিয়াম তো দুরের কথা জনমানবের চিহ্ন নেই।
রাস্তাটা আজ কেমন নিঃশব্দ, নিঃসঙ্গ। দূরে কুকুরের ডাকও শোনা যাচ্ছে না। সে আরও খানিকটা এগোল।
হঠাৎ চোখ আটকে গেল পথের ধারে। একটা মৃ*ত কুকুর পড়ে আছে। মাথাটা থেঁ*ত*লে গেছে, পেটের নাড়িভুঁড়ি বে*রি*য়ে এসেছে। হয়তো কোনো গা*ড়ির ধা*ক্কায় প্রা*ণটা গে*ছে। দৃশ্যটা দেখে শাপলার গা গুলিয়ে উঠল। সে মুখ ফিরিয়ে পাশ কেটে দ্রুত হাঁটতে লাগল।
ঠিক তখনই—
পেছন থেকে কেউ নিঃশব্দে এসে তার কাঁধে হাত রাখল।
শাপলা চমকে উঠল। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ভয়ে তার সারা শরীর কেঁপে উঠল।
