রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৪৭
মহাসিন
অলেকা বেগমের চিৎকারে পুরো বাড়িটা যেন কেঁপে উঠল।
“তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দে! আমার মাথায় রা_গ উঠাবি না!”
ভেতর থেকে কলির কণ্ঠস্বর ভেসে এল, সমান জোরে, কিন্তু দৃঢ়।
“আমি দরজা খুলব না। তোমার যা ইচ্ছে তাই করো। আমাকে বি_য়ে দিতে হবে না। বরং তুমি নিজে আরেকটা বিয়ে করো!”
“ওরে হা_রা_ম_জা_দি! যত বড় মুখ, তত বড় কথা!”
অলেকা বেগম রাগে ফেটে পড়ে চিৎকার করে ছেলেকে ডাকতে লাগলেন, “অগ্নি! অগ্নি! তাড়াতাড়ি এদিকে আয়!”
অগ্নি মায়ের ডাকে দৌড়ে এল। তার মুখে বিরক্তি স্পষ্ট।
“কী হয়েছে এত চেঁচামেচি করছো কেন? তোমার এই চিৎকারে ঘরে টেকা দায়!”
“কী করব? এই বা_ন্দি_র বা_চ্চা দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে আছে। তাড়াতাড়ি দরজা ভেঙে ওকে বের কর!”
অগ্নি গর্জে উঠল, “কলি! তাড়াতাড়ি দরজা খোল বলছি!”
ভেতর থেকে কলির কণ্ঠস্বর এল, “আমি দরজা খুলব না। যে ছেলে আমাকে দেখতে আসবে, তাকে তোর মাকে দেখিয়ে দিস। পছন্দ হলে তোর মাকেই বি_য়ে দিস। আমি বি_য়ে ক_রব না।”
“তোকে আজকে শে_ষ করে দি_বো!”
একথা বলেই অগ্নি দরজায় কয়েকটা জোরালো লা_থি মা_র_ল। কাঠের দরজা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভেঙে পড়ল। অগ্নি ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকে কলির চু_লে_র মু_ঠি ধরে টে_নে হিঁচ_ড়ে মায়ের পায়ের কাছে ছু_ড়ে ফেলল।
“এবার তুমি যা ইচ্ছে তাই করো।”
বলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
অলেকা বেগম বড় বড় চোখ করে কলির দিকে তাকালেন। রাগে তাঁর মুখ লাল হয়ে গেছে।
“ওরে জা_নো_য়া_রে_র বাচ্চা! আমি বিয়ে করব না? দাঁড়া, দেখাচ্ছি মজা!”
এই বলে তিনি কলির চু_লে_র মু_ঠি ধরে টেনে তুললেন এবং অনবরত গালে চ_ড় মা_র_তে লাগলেন। তারপর তাকে টে_নে হিঁ_চ_ড়ে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে জো_র করে একটা গোলাপি রঙের শাড়ি পরিয়ে দিলেন। সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে বসার ঘরের সোফায় বসিয়ে দিয়ে কঠোর গলায় বললেন,
“কোনো ঝামেলা করবি না। চুপচাপ থাকবি।”
কলি চিৎকার করে উঠল,
“আমি বি_য়ে ক_রব না! কতবার বলব?”
“ বি_য়ে তোকে করতেই হবে। আর আমি তোকে কোনো জোয়ান ছেলের সাথে বিয়ে দেব না। তোকে বিয়ে দেব সরকারি চাকরি করে, টা_ক_লা একটা লো_কের সাথে।”
এসব শুনে কলি পাগলের মতো চিৎকার করতে লাগল, “তোমার মাথা ঠিক আছে তো? এসব কী বলছো!”
একটু থেমে সে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “বাবা কোথায়?”
“তোর বাবাকে কাজে পাঠিয়ে দিয়েছি। এখানে থাকলে আবার দরদ উথলে উঠবে। সমস্যা হবে।”
ঠিক তখনই সদর দরজায় ঠকঠক আওয়াজ হলো। অলেকা বেগম কলিকে শা_সি_য়ে বললেন, “চুপ করে থাক। কোনো ঝামেলা করবি না।”
দরজা খুলতেই ঘরে প্রবেশ করলেন জাবেদ আলী। বয়স সাতচল্লিশ। মাথায় চকচকে টাক, মোটাসোটা শরীর, বড় পেট আর ঝুলন্ত তলপেট।
অলেকা বেগম হাসিমুখে বললেন, “বাবা এসো, এসো। এখানে সোফায় বসো।”
জাবেদ আলী সোফায় বসতে বসতে অলেকা বেগমের হাতে একটা মিষ্টির বাক্স তুলে দিলেন।
“এসবের কী দরকার ছিল?”
“আরে, এত সামান্য জিনিস।”
কলি লোকটাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিল। অলেকা বেগম তৎক্ষণাৎ কলির পাশে গিয়ে বসলেন এবং তার মুখ জো_র করে ঘুরিয়ে দিলেন।
“এই হচ্ছে আমার মেয়ে।”
জাবেদ আলী কলিকে দু’চোখ ভরে মে_পে দেখলেন। কলির শরীরে অস্বস্তি ঢেউ খেলে গেল।
জাবেদ আলী বললেন, “আমি কিন্তু এখুনি চলে যাব। জরুরি কাজ আছে।”
“তা বললে কী হয়? এই তো এলে, কিছু না খেয়ে চলে যাবে? আগে বলো, মেয়ে পছন্দ হয়েছে কি না।”
জাবেদ আলী হেসে বললেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই পছন্দ হয়েছে। আমি কালকেই বিয়ে করব। কোনো অনুষ্ঠানের দরকার নেই। কাজী এনে বিয়ে করে নিয়ে যাব।”
অলেকা বেগম খুশিতে বললেন, “তাহলে তো খুবই ভালো হলো।”
জাবেদ আলী উঠে চলে যাওয়ার পরপরই কলি আবার চিৎকার করে উঠল, “আমি বি_য়ে করব না! আমি কিছুতেই বি_য়ে করব না!”
কলি ছুটে নিজের ঘরে ঢুকে গিয়ে বিছানায় শুয়ে মুখ গুঁজে হু হু করে কেঁদে উঠল।ফোঁপাতে ফোঁপাতে বিড়বিড় করতে লাগল সে,
“এবার কী করব আমি? কীভাবে বাঁ_চা_ব নিজেকে? কে বাঁ_চা_বে আমাকে? আমি কিছুতেই ওই ব_য়_স্ক লোকটাকে বি_য়ে করতে পারব না। বয়সটা কম হলে না হয় মেনে নিতাম। কিন্তু ওনার বয়স তো অনেক! বি_য়ে_র পর তো আমার জীবনটাই শে__ষ হয়ে যাবে। কে বাঁ_চা_বে আমাকে? কে?”
হঠাৎ তার বন্ধ চোখের পাতার সামনে ভেসে উঠল বিরাজের মুখটা। শান্ত, ভরসার একটা ছায়া।কলি চমকে উঠে বসল।
“এখন একটাই উপায় আছে। এদের হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাকে বিরাজকেই বিয়ে করতে হবে। কিন্তু… কিন্তু সে কি এত তাড়াতাড়ি আমাকে বিয়ে করবে? আর আমি তো তাকে ভালোবাসি না। তাহলে তাকে কিভাবে বি_য়ে করবো?”
ভাবনার জাল ছিঁড়ে কলি বিছানা থেকে উঠে পড়ল। টেবিলের ওপর থেকে কাঁপা হাতে ফোনটা তুলে নিল। তারপর জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে রোদ ঝলমল করলেও তার ভেতরটা অন্ধকার। কাঁপা আঙুলে শাপলার নাম্বারে ডায়াল করল সে।
ওপাশ থেকে শাপলার উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এলো, “হ্যালো, কলি? কী অবস্থা তোর?”
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না কলি। কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল,
“আমি ভালো নেই রে, শাপলা। সব কিছু শে_ষ হয়ে যাচ্ছে। আমি কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না।”
শাপলা হতভম্ব হয়ে গেল। “কান্না করিস না, প্লি_জ। কী হয়েছে আমাকে বল।”
কলি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে একে একে সব কথা শাপলাকে বলল। সব শুনে শাপলাও স্তব্ধ হয়ে গেল কিছুক্ষণ।তারপর দৃঢ় গলায় বলল,
“কলি, এখন একটাই উপায় আছে। তোকে বাসা থেকে পা_লা_তে হবে। এ ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই।”
“পা_লি_য়ে কোথায় যাব?”
“কোথায় যাবি মানে? বিরাজ ভাইয়ার সাথে পা_লি_য়ে গিয়ে দুজনেই বিয়ে করবি।সে তোকে ভালোবাসে। অবশ্যই তোকে বিয়ে করবে।”
কলি অসহায়ভাবে বলল,
“কিন্তু আমি তো তাকে ভালোবাসি না!”
শাপলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ভালো না বাসলেও বাসতে হবে, কলি। না হলে তোর জীবনটা একেবারে ন__ষ্ট হয়ে যাবে। তবে একটা কথা জেনে রাখ, বিরাজ ভাইয়াকে যদি বিয়ে করিস, তুই অনেক সুখে থাকবি। সে তোকে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছে। তোকে অনেক ভালোবাসে।”
একটু থেমে শাপলা আবার বলল,
“এবার সিদ্ধান্তটা তোর। ভেবে আমাকে কল দিস। কী করবি তুই? পা_লি_য়ে গিয়ে বিরাজ ভাইয়াকে বিয়ে করবি, নাকি ওই ব_য়_স্ক, টাকলা লোকটাকে বিয়ে করে নিজের জী_বনটা শে_ষ করে দিবি?”
কথাটা শেষ করেই শাপলা কলটা কেটে দিল।
আর কলি? ফোনটা হাতে নিয়ে জানালার গ্রিল ধরে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সামনে এখন দুটো পথ। একটা অজানা ভরসার, আরেকটা নিশ্চিত ধ্বংসের।
কলি আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দম ফেলার সময়টুকু না নিয়ে দৌড়ে রান্নাঘরে ঢুকল। চোখে মুখে আতঙ্ক, গলার স্বর কাঁপছে।
“আমি ওই লোকটাকে বি_য়ে করতে পারব না, মা। কিছুতেই না!”
অলেকা বেগম হাতের সবজি কা_টা থামালেন। ধীরে ধীরে কলির দিকে ঘুরলেন। চোখ দুটো রাগে জ্বলছে। মুহূর্তের মধ্যে ঠাস করে একটা চ_ড় পড়ল কলির গালে।
“তোকে বি_য়ে করতেই হবে। ওই লোকটা যদি তোকে বি_য়ে করে, তাহলে আমাদের টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করবে। এটাই আমাদের লাভ। বুঝিস না কেন?”
কলি হুমড়ি খেয়ে মায়ের পা_য়ে প_ড়ল। কান্নায় গলা বুজে আসছে।
“তোমার পায়ে ধ_রি মা, আমার জী_বন_টা ন_ষ্ট করো না। আমি যদি তোমার পেটের মেয়ে হতাম, তাহলে কি এমন ক_র_তে পারতে?”
অলেকা বেগমের মুখ কঠিন হয়ে গেল।
“তুই আমার পেটের মেয়ে না। তাই তোর সাথে এম_ন ক_র_ছি। এখন পা ছা_ড়। রান্না করতে দে। ঝামেলা করিস না। তোর বি_য়ে হবেই। এটা ফাইনাল।”
“না মা, তুমি এমন করতে পারো না। আমার জী_ব_ন নিয়ে খে_ল_তে পারো না!”
কথা শেষ হওয়ার আগেই অলেকা বেগম পা দিয়ে কলিকে স_রি_য়ে দিলেন। কলি মেঝেতে লু_টি_য়ে পড়ল। এক মুহূর্তও দেরি না করে উঠে দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গেল।
বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল।
“না, আর কোনো উপায় নেই। এবার একটাই পথ খোলা… পা_লা_তে হবে।”
কাঁপা হাতে ফোনটা বের করে শাপলার নাম্বার ডায়াল করল। ওপাশ থেকে সাড়া এলো,
“হ্যাঁ, বল।”
কলি দৃঢ় গলায় বলল, “আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি।”
“কী সিদ্ধান্ত নিলি?”
“আমি বিয়ে করব।”
ওপাশ থেকে শাপলা আঁতকে উঠল,
“মানে? তুই ওই লোকটাকে বি_য়ে করবি? এটা করিস না কলি। তোর জী_ব_নটা শে_ষ হয়ে যাবে। আরেকবার ভেবে দেখ।”
কলি বিরক্ত হয়ে বলল,
“উফ্ চুপ কর তো। আগে আমার পুরো কথাটা শোন। আমি বিরাজকে বিয়ে করব।”
শাপলা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল,
“ওহ্! আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম।”
” আচ্ছা এসব কথা বাদ দে। বিরাজকে সব খুলে বল। আজ রাত বারোটায় ওকে নিয়ে আমাদের বাড়ির পেছনে চলে আসবি। ওখান থেকেই পা_লা_বো আমরা।”
“ঠিক আছে।”
” এখন রাখি।”
বলে কলি ফোনটা কেটে দিল।
শাপলা ধীর পায়ে নীলাঞ্জনার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরে ঢুকতেই দেখল কবিতাও সেখানে বসে আছে।
শাপলার মুখ থমথমে। সে নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, “ভাবী, একটা জরুরি কথা বলব।”
নীলাঞ্জনা কৌতূহলী চোখে তাকাল, “কী কথা? বলো।”
“তবে কথাটা সবাইকে সামনে রেখেই বলতে হবে,” শাপলা গম্ভীরভাবে বলল। “তুমি কল দিয়ে তাড়াতাড়ি সবাইকে বাড়িতে আসতে বলো।”
পাশ থেকে কবিতা ভ্রু কুঁচকে বলল, “কী এমন কথা যে সবাই কাজ ফেলে বাড়ি চলে আসবে?”
শাপলা শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় জবাব দিল, “সেটা সবাই আসলেই বলব।”
শাপলার গলার স্বরে এমন কিছু আছে যে নীলাঞ্জনা আর কথা বাড়াল না। সঙ্গে সঙ্গে ফোন তুলে আরিফকে কল দিল। “হ্যালো, শোনো… আপনি সবাইকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসেন। খুব জরুরি দরকার।”
ফোন রেখে নীলাঞ্জনা, কবিতা আর শাপলা তিনজনেই ড্রয়িং রুমে এসে বসল। ঘরজুড়ে একটা চাপা উৎকণ্ঠা। সময় যেন কাটতেই চাইছে না।
রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৪৬
অপেক্ষা করতে করতে কবিতা বিরক্ত হয়ে উঠল। অধৈর্য গলায় বলল, “এই শাপলা, বল তো কী বলবি? আর অপেক্ষা করতে পারছি না।”
“আগে সবাই আসুক। তারপর বলব।”
