রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৪৮
মহাসিন
সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে সময় গড়িয়ে দিচ্ছে, আর সবার বুকের ভেতর উত্তেজনা বাড়ছে। কখন আসবে ওরা?
হঠাৎ কলিং বেলটা বেজে উঠল। টুং করে শব্দটা কানে যেতেই সবার চোখে মুখে হাসি ফুটে উঠল। নীলাঞ্জনা দ্রুত পায়ে গিয়ে সদর দরজাটা খুলে দিল। একে একে সবাই ঘরে ঢুকল। ধীর পায়ে এসে সোফায় বসল সকলে। ঘরটা নিস্তব্ধ, শুধু সবার নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
আরিফ প্রথমে নীরবতা ভাঙল। নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে শুধালো,
“কী হইছে? সবাইকে বাড়িতে ডাকলে যে?”
“আমি বলব না। কথাটা শাপলাই বলবে।”
নিরব শাপলার দিকে তাকাল। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কী বলতে চাস তুই?”
শাপলা এক পলক বিরাজের দিকে তাকাল। তারপর দৃঢ় গলায় বলল,
“আপনি কি কলিকে সত্যি সত্যি ভালোবাসেন?”
বিরাজ এক মুহূর্তও দেরি করল না। চোখে চোখ রেখে বলল,
“হ্যাঁ। আমি কলিকে ভালোবাসি।”
শাপলা মাথা নাড়ল। “কলির বাবা মা ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে।”
কথাটা শুনে সবার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
শাপলা আবার বলতে শুরু করল,
“শুধু তাই না। যার সাথে বিয়ে ঠিক করেছে, তার ব_য়_স অ_নেক বেশি। কলি এই বিয়েতে রা_জি না। ওকে জো__র করে বিয়ে দিতে চাচ্ছে। কালকেই বিয়ে।”
একটু থেমে দম নিল শাপলা। তারপর বলল,
“কলি আমাকে সব বলছে। এটাও বলেছে বিরাজ যদি ওকে সত্যি ভালোবাসে, তাহলে আজ রাতেই যেন গিয়ে ওকে নিয়ে আসে। আজ রাতেই বিয়ে করবে।”
ঘরজুড়ে পিনপতন নীরবতা। আরিফ বিরাজের দিকে তাকাল। “কী করবি তুই?”
বিরাজের উত্তর এক কথায়, “হ্যাঁ, আমি কলিকে বিয়ে করব।”
পাশ থেকে কবিতা আঁতকে উঠল, “কী বলছিস তুই? মাথা ঠিক আছে তো? এখনো শাপলাকে মেনে নিলি না, এর মাঝে যদি তুই আবার বিয়ে করিস, তাহলে কী হবে বুঝতে পারছিস?”
বিরাজ ক্লান্ত গলায় বলল, “তাহলে কী করব? এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।”
সিয়াম ওর কাঁধে হাত রাখল, “চিন্তা করিস না। একদিন ঠিকই সবাই মেনে নেবে। এখন যদি তোর ভালোবাসার মানুষটাকে বিয়ে না করিস, তাহলে ওকে চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেলবি।”
শাপলা উঠে দাঁড়াল। বিরাজের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি আমার সাথে আসুন। আপনার সাথে আলাদা কথা আছে।”
এরপর বিরাজ আর শাপলা দুজনে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল।
শাপলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“কলি আমাকে কল দিয়ে সব বলছে। ওর সামনে এখন দুটো রাস্তা খোলা। এক আপনার সাথে পা_লি_য়ে গিয়ে বিয়ে করা। আর দুই ওই ব_য়_স্ক লোকটাকে বিয়ে করা।”
একটু থেমে বিরাজের চোখে চোখ রাখল শাপলা। “ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিন। ভালোবাসার মানুষকে একবার হারিয়ে ফেললে, আর কখনো ফিরে পাওয়া যায় না।”
বিরাজের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ও ধীর গলায় বলল, “আমি কলিকে ভালোবাসি। অনেক ভালোবাসি। ওকে হারাতে পারব না।”
তারপর একটু থেমে আবার বলল, “কিন্তু এখন যদি ওকে বিয়ে করি, তাহলে মামা মামী কি মেনে নেবে?”
শাপলা মাথা নাড়ল। “না মেনে নিলে কিছু করার নেই। পরিস্থিতি যা, তাতে এটাই শেষ উপায়।
আপনি বরং কলিকে কল দিয়ে কথা বলুন।”
এই বলেই শাপলা ব্যালকনি থেকে ড্রয়িংরুমের দিকে চলে গেল।
বিরাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুকের ভেতর ঝড় বইছে, অথচ মুখটা শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। ধীর হাতে ফোনটা বের করে “আ_গু ন সুন্দরী” নামে সেভ করা নাম্বারটায় কল দিল।
ওপাশ থেকে ভেসে এলো কান্নাভেজা কণ্ঠ। কলি ফুঁপিয়ে উঠল,
“শাপলা কি সব বলেছে আপনাকে?”
“হ্যাঁ, সব বলেছে।”
কলি কাঁদতে কাঁদতেই বলল, “আমাকে নিতে আসবেন তো? যদি না আসেন… তাহলে আমাকে আর কখনো পাবেন না। আমি অন্য কারো হয়ে যাব।”
বিরাজের বুকটা হু হু করে উঠল। ও শক্ত করে ফোনটা চেপে ধরল। “আচ্ছা, তুমি একটা কথা বলো তো… আমাকে ভালোবাসো তো?”
ওপাশটা হঠাৎ নিস্তব্ধ। কলি চুপ করে গেল। শুধু ওর কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
“কী হলো? চুপ করে আছো কেন? বলো, আমাকে ভালোবাসো তো?” বিরাজের গলা ধরে আসছে।
কলি কান্নার মাঝেই ফুঁপিয়ে বলল, “হ্যাঁ… হ্যাঁ… হ্যাঁ… ভালোবাসি। অনেক ভালোবাসি আপনাকে।”
বিরাজ চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। তারপর দৃঢ় গলায় বলল, “ঠিক আছে। তৈরি থেকো। আমি আসব তোমাকে নিতে।”
“সত্যি তো? আমাকে নিতে আসবেন তো?” কলির গলায় বিশ্বাস আর ভয় একসাথে মিশে আছে।
“হ্যাঁ, আসব। কথা দিলাম,” বলে বিরাজ কলটা কেটে দিল।
ফোনটা হাতে নিয়েই ও ধীর পায়ে ব্যালকনি থেকে ড্রয়িংরুমে চলে এলো।
সিয়াম বিরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এখন বল, কী করবি?”
বিরাজ এক মুহূর্তও ভাবল না। চোয়াল শক্ত করে বলল, “আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। কলিকেই বিয়ে করব।”
কবিতা আঁতকে উঠল। “না ভাই, এমনটা করতে পারিস না। মা বাবা অনেক কষ্ট পাবে।”
বিরাজ চিৎকার করে উঠল, “তাহলে আমি কী করব? এছাড়া তো আর কোনো উপায় নেই আমার কাছে!”
কবিতা ওর হাত চেপে ধরল। “একবার বাবার সাথে কথা বল। ফোন দিয়ে সব খুলে বল। দেখ, উনি কী বলেন।”
নীলাঞ্জনা পাশ থেকে মাথা নাড়ল। “কোনো লাভ নেই। ওরা কখনো মেনে নেবে না।”
“তবুও একবার বলে দেখ,” কবিতা অনুনয়ের সুরে বলল।
বিরাজ আর দেরি করল না। কাঁপা হাতে ফোনটা বের করে মামাকে কল দিল।
ওপাশ থেকে সায়েক আহমেদের গলা ভেসে এলো, “হ্যাঁ, বিরাজ। ভালো আছিস তো?”
বিরাজের গলা ধরে আসছে। “ভালো নেই, মামা।”
“কী হয়েছে? আমাকে বল।”
বিরাজ চোখ বন্ধ করে বলল, “আমি একজনকে ভালোবাসি। ওর বাবা মা ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। আমি ওকে নিয়ে পা_লি_য়ে গিয়ে বিয়ে করতে চাই। আপনার অনুমতি চাই।”
ওপাশটা মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ। তারপর সায়েক আহমেদের কঠিন গলা, “কখনো না। তুই এমনটা করবি না।”
বিরাজের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। “মামা, আমি ওকে ভালোবাসি। ওকে ছাড়া বাঁ_চ_তে পারব না।”
সায়েক আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “যা খুশি তাই কর। তোর সাথে আমার সব সম্পর্ক শেষ।”
টুট টুট করে লাইনটা কেটে গেল।
নীলাঞ্জনা মাথা নিচু করে বলল, “আমি বলেছিলাম না? কোনো লাভ হবে না। এবার তুমি ভেবে দেখো, কী করবে।”
ঘরটা নিস্তব্ধ। বিরাজের হাত থেকে ফোনটা পড়ে যেতে চাইছে। ভালোবাসা একদিকে, পরিবার অন্যদিকে মাঝখানে দাঁড়িয়ে ওর ভেঙে যাওয়া মন।
সিয়াম বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে।
জানালার পাশে বসে আছে শাপলা। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে কাঠ, মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে দুশ্চিন্তায়। লম্বা চুলগুলো এলোমেলোভাবে পিঠে ছড়িয়ে আছে। ও সিয়ামের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
“ভাইয়া, আপনি গিয়ে বিরাজ ভাইয়াকে একটু বুঝান। কলি তার জন্য অপেক্ষা করবে। সে যদি না যায়, মেয়েটার জীবনটাই শে__ষ হয়ে যাবে।”
সিয়াম দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “বিরাজ তো কলিকে বিয়েই করতে চায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বাবা। উনি মানতে চাইছেন না।”
শাপলা জোর দিয়ে বলল, “তো কী হয়েছে? একদিন ঠিকই মেনে নেবে। আপনি গিয়ে তাকে সাহস দিন।”
সিয়াম আর শুয়ে থাকতে পারল না। বিছানা থেকে উঠে ধীর পায়ে বিরাজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
এতো ক_ষ্ট করে উপন্যাস টা লিখি , আপরানা আমার পে_জ টা ফ_লো করেন না এটা কি ঠিক বলেন
বিরাজ বিছানার কিনারায় বসে আছে। চোখে পানি টলমল করছে, বুকের ভেতর কষ্টের পাথর। একদিকে ভালোবাসার মানুষ কলি, অন্যদিকে মামা যিনি মা মা__রা যাওয়ার পর ওকে নিজের ছেলের মতো করে মানুষ করেছেন, বিদেশে পড়িয়েছেন, সব দায়িত্ব নিয়েছেন। সেই মামার কথার অবাধ্য হবে কী করে?
সিয়াম চুপচাপ এসে ওর পাশে বসল। কাঁধে হাত রাখল।
“চিন্তা করিস না। বাবা ঠিক মেনে নেবে।”
“সত্যি মেনে নেবে?”
“হ্যাঁ। আমার আর শাপলার বেলায়ও তো বলছিল বাড়িতে ঠাঁই দেবে না। দেখ, এখন আমরা এই বাড়িতেই আছি,” সিয়াম হাসল।
বিরাজের চোখে একটুখানি আলো ফুটল। সিয়াম ওর গালে হাত রেখে বলল, “তাহলে ঠিক আছে। তুই, আমি আর শাপলা গিয়ে কলিকে নিয়ে আসব। তোদের দুজনকে বিয়ে করিয়ে একদম বাড়ি ফিরব। ”
“তুই আমার সাথে থাকবি তো?”
“তোর সাথে থাকব না তো কার সাথে থাকব?”
কথা শেষ করে সিয়াম ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ির বাগানে চলে এলো। এখানে আরিফ, নীলাঞ্জনা আর নিরব কবিতা বসে কফি খাচ্ছে। সিয়াম ওদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
“বিরাজ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। ও কলিকে বিয়ে করবে,” সিয়াম বলল।
কবিতা কফির মগে চুমুক দিতে দিতে বলল, “এটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না।”
নীলাঞ্জনা কাঁধ ঝাঁকাল। “ঠিক না হলেও করার কিছু নেই।”
রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৪৭
সিয়াম দৃঢ় গলায় বলল, “আমি আর শাপলা বিরাজের সাথে যাব।ওদের বিয়ে করিয়েই বাড়ি ফিরব।”
কবিতা মুখ বাঁকাল, “যা ইচ্ছা তাই কর। একটা বিয়েতেও মজা করতে পারলাম না।”
নীলাঞ্জনা হেসে বলল, “সমস্যা নেই। আমরা নিজেরা ছোটখাটো করে মজা করে নেব।”
সিয়াম নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ দিল, “তাহলে ওদের জন্য বা_স_র ঘরটা সুন্দর করে সাজিয়ে রাখিয়েন।”
এই বলেই সিয়াম বাগান থেকে বেরিয়ে গেল।
